তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ০১
সকাল ৮টা।
খান বাড়ি।
বিশাল বাড়িটার ভেতরে আজ সকাল থেকেই অদ্ভুত এক ব্যস্ততা। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যেই কেমন একটা উত্তেজনা কাজ করছে। বাড়ির ড্রয়িংরুম ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে। রান্নাঘরে চলছে হরেক রকম খাবারের আয়োজন। বাড়ির বড়রা কেউ ফোনে কথা বলছেন, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছেন।
কিন্তু এই সমস্ত আয়োজনের মূল কারণটা বাড়ির একজন মানুষ ছাড়া সবাই জানে।
আর সেই একজন মানুষ হলো রুশো খান।
রুশো খান।
খান পরিবারের বড় ছেলে। বয়স আটাশের কাছাকাছি। প্রচণ্ড গম্ভীর, রাগী এবং জেদি স্বভাবের মানুষ। তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার আগে মানুষকে দুবার ভাবতে হয়। নিজের সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য কারও সিদ্ধান্তকে সে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না।
সকাল থেকেই নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল রুশো।
হঠাৎ দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল তার ছোট ভাই রাদিফ।
রাদিফ খান।
বাড়ির একমাত্র এমন ছেলে, যার কাজ হচ্ছে নিজের ভাইয়ের মাথা খাওয়া আর পরিবারের সবাইকে হাসানো। দুষ্টুমি, ফাজলামি আর আজগুবি কথা বলার ক্ষেত্রে তার কোনো জুড়ি নেই।
রাদিফ ঘরে ঢুকেই গলা পরিষ্কার করে বলল,
— সুপ্রভাত, আমার প্রিয়, শ্রদ্ধেয়, সম্মানিত, অত্যন্ত বদমেজাজি বড় ভাই!
রুশো ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— বের হয়ে যা।
রাদিফ একবার নিজের দিকে তাকাল, তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আশ্চর্য! আমি তো এখনো ঢুকলাম। বের হওয়ার সময় কোথায় পেলাম?
— রাদিফ!
— জি ভাইজান?
— মাথা খারাপ করিস না।
রাদিফ মুখটা গম্ভীর করে বিছানার একপাশে বসে পড়ল।
— ভাই, একটা জরুরি কথা ছিল।
— বল।
— আমাদের বাড়িতে আজকে এত সাজসজ্জা কেন?
— জানি না।
— কীভাবে জানিস না? তুই তো এই বাড়ির বড় ছেলে। বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে, অথচ তুই জানিস না?
রুশো এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— কার বিয়ে?
রাদিফ মুখ চেপে হাসল।
— সেটা তোকে একটু পরেই জানানো হবে। তবে একটা কথা, বিয়েতে কিন্তু তোর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুই কি কোনো কাজের কথা বলতে এসেছিস, নাকি সকাল সকাল আমার মাথা খেতে?
রাদিফ উঠে দাঁড়াল।
— দুটোই। তবে দ্বিতীয় কাজটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কথাটা বলেই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রুশো বিরক্ত হয়ে আবার কাজে মন দিল।
তার ধারণাও নেই, আজকের সকালটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে।
অন্যদিকে,
একটি বাড়ির দোতলার ঘরে বসে আছে আইরা।
সামনে বিছানার ওপর ছড়িয়ে আছে কয়েকটি পোশাক। মেয়েটার মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
আইরা নামের মেয়েটি দেখতে যতটা শান্ত মনে হয়, স্বভাবে ঠিক ততটাই উল্টো।
ঘাড়ত্যাড়া, জেদি, তেরামি স্বভাবের। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু হলে পৃথিবীর সব মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করতে তার একটুও সময় লাগে না।
আর মুখের ওপর কথা বলার অভ্যাসটা তো আছেই।
আইরা হাতে একটা পোশাক নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
— আমি এই কাপড় পরব না!
পাশ থেকে একজন বললেন,
— আইরা, একটু বুঝতে চেষ্টা করো।
— বুঝতে চেষ্টা করব মানে? আমার বিয়ে, আমার জীবন, আর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অন্য মানুষ! বাহ্! খুব সুন্দর ব্যবস্থা!
— তোমার ভালোর জন্যই তো সব হচ্ছে।
আইরা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— আমার ভালো? আমার ভালোটা আমি বুঝব, নাকি আপনারা বুঝবেন?
— মেয়েদের জীবনে বিয়ে একটা স্বাভাবিক বিষয়।
— অবশ্যই স্বাভাবিক। কিন্তু জোর করে বিয়ে দেওয়াটা কোন দেশের স্বাভাবিক নিয়ম, একটু জানাবেন?
কথাটা শুনে ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
আইরা বিছানার ওপর বসে পড়ল।
তার চোখে রাগ, মুখে অভিমান।
সে জানে, আজ তার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু যাকে বিয়ে করতে হবে, সেই মানুষটাকে সে ঠিকমতো চেনেও না।
তার ওপর শুনেছে ছেলেটা নাকি প্রচণ্ড রাগী।
আইরা মনে মনে বলল,
'বাহ্! নিজের জীবনেই এবার একটা আস্ত রাগী ভূত জুটল!'
সকাল ১০টা ৩০ মিনিট।
খান বাড়ির ড্রয়িংরুম।
রুশো নিচে নেমে আসতেই দেখল বাড়ির সবাই উপস্থিত। তার বাবা, মা, চাচা-চাচি, পরিবারের অন্য সদস্যরা—সবাই যেন কোনো বিশেষ অপেক্ষায় আছে।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এখানে সবাই বসে আছেন কেন?
তার বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
— তোমার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা আছে।
— বলুন।
— বসো।
রুশো সোফায় বসল।
রাদিফ পাশের সোফায় বসে চুপিচুপি হাসছে।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— হাসছিস কেন?
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে মুখ সোজা করে বলল,
— না ভাই। জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে পড়ছে।
— তোর জীবন থেকে সুন্দর মুহূর্তগুলো মুছে দেব?
— না না! আমার জীবনটা এমনিতেই সুন্দর। তুই শুধু নিজের জীবনটা একটু সুন্দর কর।
রুশো এবার বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
তার বাবা কথা শুরু করলেন।
— রুশো, আমরা তোমার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কথাটা শুনে রুশো কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমি বিয়ে করব না।
বাড়ির সবাই যেন আগে থেকেই এই উত্তর আশা করছিল।
তার মা বললেন,
— সবকিছু কি তোমার ইচ্ছেমতো হবে?
— আমার বিয়ে। অবশ্যই আমার ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।
— সবকিছু সবসময় নিজের ইচ্ছায় হয় না, রুশো।
রুশো এবার বাবার দিকে তাকাল।
— কাকে বিয়ে করতে হবে?
তার বাবা একটি নাম বললেন।
— আইরা।
রুশো নামটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— আমি মেয়েটাকে চিনি না।
— বিয়ের পর চিনে নেবে।
— আমি এই বিয়েতে রাজি নই।
তার বাবা এবার কঠিন গলায় বললেন,
— এই বিয়ে তোমাকে করতেই হবে।
রুশোর চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
— আমাকে জোর করছেন?
কেউ উত্তর দিল না।
রাদিফ পাশ থেকে আস্তে করে বলল,
— ভাই, বিয়েতে কিন্তু বিরিয়ানি থাকবে। ব্যাপারটা একটু ইতিবাচকভাবে দেখ।
রুশো এমনভাবে তাকাল যে রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে সোফার পেছনে সরে গেল।
— আমি শুধু খাবারের কথা বলেছি!
দুপুর ১২টা।
আইরাকে নিয়ে আসা হয়েছে খান বাড়িতে।
গায়ে সুন্দর একটা পোশাক, হাতে কয়েকটি চুড়ি। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে, তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে নয়, বরং কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেই সে চারপাশে তাকাল।
রাদিফ দূর থেকে মেয়েটাকে দেখে নিজের মনে বলল,
'ওহ! ভাবি দেখতে তো বেশ সুন্দর। কিন্তু মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে ভাইয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছেন।'
আইরা সোফায় বসতে গিয়েই রাদিফের দিকে তাকাল।
রাদিফ এগিয়ে এসে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম, ভাবি!
আইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— ভাবি কে?
রাদিফ নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
— আপনিই তো। আর আমি আপনার দেবর। পরিচয়—রাদিফ খান। পেশায় ছাত্র, নেশায় বিরক্তিকর মানুষ।
আইরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
— বেশ। আপনার পরিচয়টা অন্তত সত্যি মনে হচ্ছে।
রাদিফ হেসে ফেলল।
— ভাবি, আপনাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
— কেন?
— কারণ আপনি প্রথম দেখাতেই আমার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার ভাই হলে এতক্ষণে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিত।
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— আপনার ভাইকে দেখে তো মনে হচ্ছে দরকার আছে।
রাদিফ এবার জোরে হেসে উঠল।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল রুশো।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। মুখে গম্ভীর ভাব। চোখে বিরক্তি।
আইরা তার দিকে তাকাল।
রুশোও একবার আইরার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল।
রাদিফ দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল,
— পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি আমার বড় ভাই রুশো খান। আর ইনি আমাদের বাড়ির ভবিষ্যৎ...
রুশো ধমকে উঠল,
— রাদিফ!
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— আপনার ভাই সবসময় এমন চেঁচামেচি করেন?
রুশো সরাসরি তার দিকে তাকাল।
— কী বললেন?
— কানেও সমস্যা আছে নাকি? বললাম, আপনার ভাই সবসময় এমন চেঁচামেচি করেন?
রাদিফ মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
রুশো গম্ভীর গলায় বলল,
— নিজের সীমার মধ্যে থাকবেন।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— সীমাটা কোথায়, একটু দেখিয়ে দেবেন? নাকি আপনার বাড়ির দেয়ালে লিখে রাখতে হবে?
চারপাশে নীরবতা নেমে এল।
রুশো জীবনে খুব কম মানুষের কাছ থেকেই এমন উত্তর শুনেছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— আপনার সঙ্গে কথা বলার আমার কোনো আগ্রহ নেই।
আইরা মিষ্টি করে হাসল।
— আমারও না। চিন্তা করবেন না।
রাদিফ মনে মনে বলল,
'আল্লাহ! বিয়ের আগেই যদি এই অবস্থা হয়, বিয়ের পরে তো বাড়িতে বিনোদনের অভাব হবে না!'
দুপুর ২টা।
বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন।
রুশো নিজের ঘরে বসে আছে। মুখে প্রচণ্ড বিরক্তি। একের পর এক ফোন আসছে, কিন্তু সে কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না।
হঠাৎ রাদিফ ঘরে ঢুকল।
— ভাই!
— কী?
— কাজী সাহেব এসেছেন।
— তো?
— বিয়ে পড়াবেন।
— রাদিফ, বের হয়ে যা।
রাদিফ দরজা বন্ধ করে তার সামনে দাঁড়াল।
— ভাই, একটা কথা বলি?
— না।
— তোর জীবনে প্রথমবার একটা মেয়ে আসছে, যে তোকে ভয় পায় না। ব্যাপারটা উদ্যাপন করা উচিত।
রুশো চোখ তুলে তাকাল।
— তুই কি খুব বেশি কথা বলিস না?
— বলি তো। কিন্তু তুই তো শুনিস না। তাই আজকে সুযোগ পেয়েছি, সব বলে নিচ্ছি।
রুশো উঠে দাঁড়াল।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে দৌড় দিল।
— আমি যাচ্ছি! তবে একটা কথা, ভাই—ভাবিকে কিন্তু বেশি বকিস না। উনি কিন্তু পাল্টা বকে দেন!
অবশেষে সেই মুহূর্ত এসে গেল।
কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন।
একদিকে বসে আছে রুশো। অন্যদিকে আইরা।
দুজনের মুখেই বিরক্তি।
আইরা মনে মনে ভাবছে, এই বিয়েটা যদি কোনোভাবে আটকানো যেত!
আর রুশো ভাবছে, নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণই যদি না থাকে, তাহলে এতদিন ধরে সে কীসের জন্য এত কিছু করেছে?
কাজী সাহেব আইরার সম্মতি চাইলেন।
আইরা একবার চারপাশে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— আমি...
কথাটা শেষ করার আগেই পরিবারের একজন তাকে বুঝিয়ে দিলেন, এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আইরা চোখ বন্ধ করল।
অন্যদিকে রুশোও পরিবারের চাপে বিয়েতে সম্মতি দিল।
কবুল বলা শেষ হলো।
দুটি মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলো।
কিন্তু তাদের কারও মুখে আনন্দের ছাপ নেই।
বরং দুজনের চোখেই জমে আছে রাগ আর অভিমান।
রাদিফ দূর থেকে হাততালি দিয়ে বলে উঠল,
— অভিনন্দন! আমাদের বাড়িতে নতুন একজন সদস্য এলেন। আর আমার জীবনে নতুন একজন মানুষ এলেন, যিনি আমার ভাইকে জ্বালানোর দায়িত্ব নেবেন!
আইরা রাদিফের দিকে তাকিয়ে হাসল।
রুশো চোখ রাঙিয়ে বলল,
— চুপ কর!
রাদিফ মুখ নিচু করে বলল,
— বিয়ে করেও মানুষের ব্যবহার ভালো হলো না!
রাত ৯টা।
রুশোর ঘর।
ঘরের দরজা খুলে আইরা ভেতরে প্রবেশ করল।
রুশো তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল।
আইরাকে দেখে ফোন রেখে দিল।
— আমার কিছু নিয়ম আছে।
আইরা ক্লান্ত মুখে বলল,
— এখন আবার কী?
— এই ঘরে আমার অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুতে হাত দেবেন না। আমার ব্যক্তিগত কাজে নাক গলাবেন না। অযথা প্রশ্ন করবেন না।
আইরা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— শেষ?
রুশো ভ্রু কুঁচকাল।
— মানে?
— মানে আর কিছু আছে? থাকলে একসঙ্গে বলে ফেলুন। বারবার শুনতে আমার ভালো লাগে না।
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার সমস্যা কী?
আইরা এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— আমার সমস্যা হলো, আমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার ইচ্ছার কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। আর এখন আপনি এসে আমাকে নিয়ম শেখাচ্ছেন!
— আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি।
— আমিও কি খুব শখ করে আপনাকে বিয়ে করেছি?
রুশো চুপ করে গেল।
আইরা বিছানার একপাশে নিজের জিনিসপত্র রাখতে রাখতে বলল,
— একটা কথা শুনুন, আমি আপনার স্ত্রী হয়েছি বলে আপনার সব কথা মাথা নিচু করে মেনে নেব, এমনটা ভাববেন না। আমার নিজের সম্মান আছে, নিজের মতামত আছে। আমাকে সম্মান দিলে আমিও সম্মান করব।
রুশো কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম কেউ তার ঘরে দাঁড়িয়ে এতটা নির্ভয়ে কথা বলছে।
সে গম্ভীর গলায় বলল,
— বেশি কথা বলা আমার পছন্দ নয়।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— তাহলে কম কথা বলা মানুষ বিয়ে করতেন।
রুশো চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
রাদিফ দরজা খুলে মাথা ঢুকিয়ে বলল,
— আসতে পারি?
রুশো গর্জে উঠল,
— না!
রাদিফ তবুও ভেতরে ঢুকে পড়ল।
তার হাতে একটা প্লেট।
— ভাবি, আপনার জন্য খাবার এনেছি। ভাইয়ার জন্য আনিনি। কারণ ভাইয়ার মুখ দেখেই মনে হচ্ছে উনি সারাদিন রাগ খেয়ে পেট ভরিয়েছেন।
আইরা হেসে ফেলল।
রাদিফ প্লেটটা টেবিলে রেখে বলল,
— আরেকটা কথা, ভাবি। ভাইয়া রাগ করলে ভয় পাবেন না। ওনার রাগের মেয়াদ সাধারণত অনেক লম্বা, তবে মাঝে মাঝে চা খেলে কমে।
রুশো দাঁত চেপে বলল,
— রাদিফ, বের হ!
রাদিফ দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,
— যাচ্ছি, যাচ্ছি। নতুন বিয়ে, আপনাদের ব্যক্তিগত সময় নষ্ট করব না। তবে ঝগড়া একটু আস্তে করবেন। পাশের ঘরেও মানুষ থাকে!
দরজা বন্ধ।
আইরা এবার হেসে কুটিকুটি।
রুশো বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাল।
— হাসছেন কেন?
আইরা হাসি থামিয়ে বলল,
— আপনার ভাইটা বেশ ভালো।
— ওকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন না।
— কেন? আপনার মতো গম্ভীর হয়ে থাকতে হবে নাকি?
রুশো আর কোনো উত্তর দিল না।
জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল।
আর আইরা মনে মনে বলল,
'এই লোকটার সঙ্গে আমার জীবন কীভাবে কাটবে, আল্লাহই জানেন!'
অন্যদিকে রুশোর মনেও একই প্রশ্ন।
সে কখনো ভাবেনি, তার জীবনে এমন একজন মানুষ আসবে, যে প্রথম দিনেই তার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া শুরু করবে।
কিন্তু এই বিয়ে যে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্কের গল্প নয়, বরং তাদের চারপাশের অনেক পুরোনো হিসাব, সম্পর্ক আর অজানা ঘটনার সূচনা—সেটা তখনো কেউ জানত না।
চলবে…
পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: নতুন করে শুরু হলো রুশো আর আইরার গল্প। ❤️ প্রথম পর্ব কেমন লাগল জানাবে। লাইক দেবে এবং সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করবে। তোমাদের মন্তব্যই লেখার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।