ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি শুধুই আমার বউ

পর্ব 2

লেখক: Oyshe Chowdhury

তুমি শুধুই আমার বউ

 লেখিকা: Oyshe Chowdhury

পর্ব: ০২

সকাল ৭টা।

খান বাড়ি।

বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠলেও একজনের এখনো ঘুম ভাঙেনি। সে হলো নতুন বউ আইরা। বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামীর সঙ্গে যে পরিমাণ ঝগড়া হয়েছে, তাতে তার ঘুমানোর সময়ই পাওয়া যায়নি। রাতের শেষ দিকে ঘুমিয়েছে, তাই এখন পৃথিবীর কোনো শব্দই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।

অন্যদিকে রুশো সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে নিজের কাজ সেরে ফেলেছে। সে এখন বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আইরার দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন এই পৃথিবীতে তার কোনো দায়িত্ব নেই।

রুশো গম্ভীর গলায় ডাকল,

— আইরা!

কোনো উত্তর নেই।

— আইরা, উঠুন।

এবারও কোনো সাড়া নেই।

রুশো বিরক্ত হয়ে কাঁথার একপাশ টেনে সরিয়ে দিল।

আইরা বিরক্তিতে চোখ না খুলেই বলল,

— কে? বিরক্ত করবেন না তো! ঘুমাতে দিন।

— সকাল হয়ে গেছে।

— তো হয়েছে কী? সকাল কি আপনার অনুমতি নিয়ে হয়েছে?

রুশো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

— কী বললেন?

আইরা চোখ খুলে তাকাল। সামনে রুশোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুমের মধ্যেই মুখ বাঁকাল।

— আপনি আবার কী চান?

— নিচে নাশতা করতে যেতে হবে।

— আপনি যান।

— আপনাকেও যেতে হবে।

— কেন? আমি কি আপনার সঙ্গে চুক্তি করেছি যে আপনার সঙ্গে সব জায়গায় যেতে হবে?

রুশো এবার কপাল কুঁচকাল।

— আপনি কি সব কথার উত্তর এভাবেই দেন?

আইরা বালিশটা ঠিক করে আবার শুয়ে পড়ল।

— না। ভালো মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলি।

— তাহলে আমার সঙ্গে এমন করছেন কেন?

আইরা চোখ বন্ধ রেখেই বলল,

— নিজেই বুঝে নিন।

রুশো আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আইরা চোখ খুলল।

— আল্লাহ! বিয়ে করেছি মানুষ, নাকি একটা চলন্ত রাগের কারখানা!

কথাটা বলে আবার কাঁথা টেনে নিল।

খান বাড়ির ডাইনিং রুম।

রাদিফ নাশতার টেবিলে বসে পরোটা খাচ্ছে। তার সামনে কয়েক ধরনের খাবার সাজানো। কিন্তু তার মন খাবারের চেয়ে বেশি পড়ে আছে নতুন ভাবিকে নিয়ে।

রুশো ডাইনিং রুমে প্রবেশ করতেই রাদিফ বলল,

— সুপ্রভাত, বিবাহিত পুরুষ!

রুশো কোনো উত্তর না দিয়ে চেয়ারে বসল।

রাদিফ আবার বলল,

— ভাই, একটা প্রশ্ন ছিল।

— কী?

— বিয়ের পর মানুষ কি বদলে যায়?

— জানি না।

— আমার তো মনে হচ্ছে তুই আগের চেয়েও বেশি রাগী হয়ে গেছিস।

রুশো খাবার নিতে নিতে বলল,

— তোর নাশতা শেষ হয়েছে?

— না। কেন?

— তাহলে খাওয়া শেষ করে নিজের কাজে যা।

রাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— আহা! নতুন বউ এসেছে, আর ভাই আমাকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এ সংসারে আমার আর কোনো মূল্য রইল না!

ঠিক তখনই আইরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল।

পরনে সাধারণ একটা সালোয়ার-কামিজ। চুলগুলো এলোমেলো করে বাঁধা। মুখে এখনো ঘুমের ছাপ।

রাদিফ তাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— এই যে! আমাদের বাড়ির সকালের সূর্য অবশেষে উদয় হয়েছে!

আইরা হাই তুলতে তুলতে বলল,

— সূর্য উঠেছে, কিন্তু আমার ঘুমটা এখনো শেষ হয়নি।

রাদিফ হেসে ফেলল।

— ভাবি, আসেন। আপনার জন্য নাশতা রাখা হয়েছে।

আইরা চেয়ারে বসতে বসতে বলল,

— ধন্যবাদ, দেবর সাহেব।

রাদিফ চোখ বড় করে বলল,

— ওহ! দেবর সাহেব! শুনতে কী সুন্দর লাগছে!

রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,

— রাদিফ, চুপচাপ খা।

রাদিফ পরোটার টুকরো মুখে দিয়ে বলল,

— ভাই, তুই বিয়ে করেছিস, আমি তো করিনি। আমার একটু আনন্দ করার অধিকার আছে।

আইরা পাশে বসে বলল,

— করতে পারেন। তবে আপনার ভাইয়ের সামনে বেশি আনন্দ করবেন না। উনি আনন্দেরও জরিমানা করে দেবেন মনে হয়।

রাদিফ এবার হেসে টেবিলে হাত চাপড়ে দিল।

— ভাবি! আপনি আমার মনের কথা বলে দিয়েছেন!

রুশো দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমরা দুজন কি নাশতা করতে এসেছ, নাকি আমার মাথা খেতে?

আইরা শান্ত গলায় বলল,

— আমি তো নাশতা করতে এসেছি। আপনার মাথা খাওয়ার ইচ্ছা এখনো হয়নি।

রাদিফ আবার হেসে উঠল।

রুশো খাবারের প্লেট সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।

— আমার খাওয়া শেষ।

রাদিফ পেছন থেকে বলে উঠল,

— ভাই, রাগ করে খাওয়া ছেড়ে দিস না। নতুন সংসারে পুষ্টিকর খাবার খুব জরুরি!

রুশো পেছনে না তাকিয়েই চলে গেল।

সকাল ১০টা।

রুশোর ঘর।

রুশো অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলমারি থেকে শার্ট বের করে বিছানায় রাখল। ঠিক তখনই আইরা ঘরে প্রবেশ করল।

— শুনুন।

রুশো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাফ ঠিক করতে করতে বলল,

— কী?

— আমার কিছু জিনিস লাগবে।

— কী জিনিস?

— নিজের ঘরে রাখার জন্য কিছু জিনিসপত্র। আর আমার কাপড় রাখার জন্য আলাদা জায়গা দরকার।

রুশো আলমারির দিকে ইশারা করল।

— ওই পাশটা খালি আছে।

আইরা এগিয়ে গিয়ে আলমারি খুলল।

— এইটুকু জায়গা?

— আপনার জন্য যথেষ্ট।

আইরা ঘুরে দাঁড়াল।

— আমার কাপড় কতটুকু, সেটা আপনি জানেন?

— জানার প্রয়োজন মনে করি না।

— বাহ্! তাহলে বিয়ে করার আগে অন্তত একটা প্রশ্ন করতে পারতেন।

রুশো এবার তার দিকে তাকাল।

— আপনি কি প্রতিটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করবেন?

আইরা হাসিমুখে বলল,

— আপনি যদি প্রতিটা বিষয় নিয়ে রাগ করেন, তাহলে আমি ঝগড়া না করে কী করব?

রুশো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই।

সে ঘড়ি হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোল।

আইরা পেছন থেকে বলল,

— শুনুন, দুপুরে কখন ফিরবেন?

— কেন?

— জানতে চাইলাম।

— অপেক্ষা করার দরকার নেই।

আইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— কে বলেছে অপেক্ষা করব? আমি শুধু জানতে চেয়েছি দুপুরে রান্না বেশি করব, নাকি কম!

রুশো থেমে পেছনে তাকাল।

— আমার খাবার নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।

আইরা মাথা নেড়ে বলল,

— খুব ভালো। তাহলে নিজের খাবার নিজেই ব্যবস্থা করবেন।

রুশো আর দাঁড়াল না।

দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট।

রাদিফের ঘর।

রাদিফ বিছানায় শুয়ে মোবাইল চালাচ্ছিল। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

— আসুন!

দরজা খুলে আইরা ঢুকল।

রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।

— আরে ভাবি! আসেন, আসেন। কী ব্যাপার? ভাই কি আবার ঝগড়া করেছে?

আইরা বিরক্ত মুখে বলল,

— আপনার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য কি আমাকে প্রতিদিন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে?

রাদিফ হেসে বলল,

— ভাইয়ের স্বভাবটাই এমন। ছোটবেলা থেকেই এমন। তবে একটা কথা বলি, ভাইকে একটু জ্বালাতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে।

আইরা চোখ ছোট করে তাকাল।

— কেন?

— কারণ ছোটবেলা থেকে ভাই আমাকে জ্বালিয়েছে। এখন আপনার মাধ্যমে একটু প্রতিশোধ নিতে চাই।

আইরা এবার হেসে ফেলল।

— আপনি বেশ স্বার্থপর দেবর!

— স্বীকার করছি। তবে আমি ভালো দেবর। আপনার কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবেন।

আইরা একটু নরম হয়ে বলল,

— আচ্ছা, বলব।

রাদিফ হঠাৎ গম্ভীর মুখ করে বলল,

— তবে ভাবি, একটা অনুরোধ আছে।

— কী?

— ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করলে আমাকে আগে থেকে জানাবেন। আমি পপকর্ন নিয়ে বসব।

আইরা হেসে বলল,

— আপনার ব্যবস্থা আমি করে দেব।

বিকেল ৫টা।

রুশো অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে।

ঘরে ঢুকে দেখল আইরা বিছানায় বসে ফোন চালাচ্ছে। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই আর কিছু জিনিসপত্র রাখা।

রুশো নিজের ঘড়ি খুলে রাখতে রাখতে বলল,

— সারাদিন কী করেছেন?

আইরা ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,

— ঘুমিয়েছি, খেয়েছি, ঘুরেছি, দেবরের সঙ্গে গল্প করেছি।

— আমার ভাইয়ের সঙ্গে এত গল্প করার কী আছে?

আইরা এবার মুখ তুলে তাকাল।

— আপনার ভাই অন্তত মানুষের মতো কথা বলেন।

রুশো চোখ সরু করল।

— তার মানে আমি মানুষের মতো কথা বলি না?

— আপনি নিজেই ভালো জানেন।

রুশো আলমারির কাছে গেল।

— একটা কথা পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না।

আইরা ফোনটা পাশে রেখে বলল,

— আমিও একটা কথা পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আপনি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নাক গলাবেন না।

রুশো তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

— আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আপনি এখন আমার স্ত্রী।

আইরা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর ধীর গলায় বলল,

— স্ত্রী হয়েছি, আপনার সম্পত্তি হইনি।

কথাটা শুনে রুশো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঘরের পরিবেশ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল।

আইরা আবার ফোন হাতে নিল।

— আর একটা কথা, আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে বলে আমি আমার নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলিনি। সেটা মনে রাখবেন।

রুশো কোনো উত্তর দিল না।

শুধু জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

রাত ১০টা।

খান বাড়ির ছাদ।

রাদিফ ছাদে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। আইরা ছাদে আসতেই সে ফোন রেখে দিল।

— ভাবি! এই যে!

আইরা এগিয়ে এসে বলল,

— কী করছেন?

— জীবন নিয়ে চিন্তা করছি।

— আপনার আবার কীসের চিন্তা?

রাদিফ বুকের ওপর হাত রেখে বলল,

— আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কারণ আমার বড় ভাই বিয়ে করে ফেলেছে। এখন থেকে আমার স্বাধীনতা শেষ।

আইরা হেসে ফেলল।

— কেন?

— আগে ভাইয়ের রাগের শিকার শুধু আমি হতাম। এখন আপনারাও থাকবেন। আর দুজনের ঝগড়ার মাঝে পড়ে আমার জীবন শেষ!

আইরা ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়াল।

— আপনার ভাই সবসময় এমন রাগী?

রাদিফ একটু ভেবে বলল,

— হ্যাঁ। তবে একটা বিষয় আছে।

— কী?

— ভাই কাউকে সহজে নিজের জীবনে জায়গা দেয় না। আর একবার দিলে তাকে নিজের মানুষ মনে করে।

আইরা চুপ করে রইল।

রাদিফ আবার হাসিমুখে বলল,

— অবশ্য আপনাকে জায়গা দেওয়ার আগেই ভাইয়ের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

আইরা হেসে বলল,

— আপনার ভাইয়ের ঘুম হারাম করার দায়িত্ব আমার না।

রাদিফ চোখ টিপে বলল,

— দায়িত্ব না থাকলেও কাজটা কিন্তু সুন্দরভাবে করছেন!

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু তাদের অজান্তেই ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল রুশো।

সে কিছুক্ষণ তাদের কথাবার্তা শুনল।

তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

— রাদিফ!

রাদিফের হাসি মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল।

— জি, ভাই!

— নিচে আয়।

রাদিফ আইরার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— ভাবি, আমার মনে হচ্ছে আজকে আমার কপালে দুঃখ আছে।

আইরা ঠোঁট চেপে হাসল।

রাদিফ যাওয়ার আগে আস্তে করে বলল,

— ভাবি, আমার জন্য দোয়া করবেন!

সে চলে গেল।

রুশো এবার আইরার দিকে তাকাল।

— আমার ভাইয়ের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কী আছে?

আইরা অবাক হয়ে বলল,

— আপনার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতেও এখন আপনার অনুমতি লাগবে?

রুশো গম্ভীর গলায় বলল,

— আমি যা বলেছি, সেটাই যথেষ্ট।

আইরা এবার রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল।

— আর আমি যা বলেছি, সেটাও মনে রাখবেন।

কথাটা বলে সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

রুশো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মেয়েটাকে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।

একদিকে তার নিজের রাগ, অন্যদিকে আইরার জেদ।

এই বাড়িতে যে আগামী দিনগুলোতে কী পরিমাণ অশান্তি হতে চলেছে, সেটা হয়তো রুশো নিজেও কল্পনা করতে পারেনি।

চলবে…

পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: রুশো আর আইরার নতুন সংসারের শুরুটা কেমন লাগছে? রাদিফকে কেমন লাগল, সেটাও জানাবে। সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করবে। তোমাদের ভালোবাসা আর মন্তব্যই আমাকে পরের পর্ব লেখার উৎসাহ দেয়। ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন