তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ০৬
সকাল ৭টা।
খান বাড়ির সবাই তখনো ঘুম থেকে ঠিকমতো ওঠেনি। কিন্তু আইরার ঘরে সকাল সকালই হইচই শুরু হয়ে গেছে।
কারণ রাদিফ!
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে একের পর এক ডাকছে।
— ভাবিইইই! ও ভাবি! উঠুন!
ভেতর থেকে আইরার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল,
— কে?
— আপনার দেবর। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো দেবর!
আইরা চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
— পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর দেবরও আপনি। যান তো, ঘুমাতে দিন!
রাদিফ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নাটকীয় কণ্ঠে বলল,
— ভাবি, আপনি আমাকে এভাবে অবহেলা করতে পারেন না। আমার একটা জরুরি কথা আছে।
আইরা বিরক্ত হয়ে উঠে দরজা খুলল।
— কী হয়েছে? বাড়িতে আগুন লেগেছে?
রাদিফ মাথা নেড়ে বলল,
— না।
— তাহলে ভূমিকম্প?
— না।
— তাহলে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে?
রাদিফ থমকে গেল।
— ভাবি! সকাল সকাল এমন ভয়ংকর কথা বলবেন না!
আইরা হেসে ফেলল।
— তাহলে কী হয়েছে?
রাদিফ দাঁত বের করে বলল,
— আজকে আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাব।
— সবাই মানে?
— আমি, আপনি, আর—
কথাটা শেষ করার আগেই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
— আর কেউ কোথাও যাবে না।
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
রুশো দাঁড়িয়ে আছে।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাই, তুই সকাল সকাল আমাদের ব্যক্তিগত আলোচনায় বাধা দিচ্ছিস কেন?
রুশো চোখ সরু করে বলল,
— সকাল সাতটায় কারও ঘুম ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত আলোচনা হয়?
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— আপনার ভাইয়ের মাথায় একটু সমস্যা আছে। আপনি ডাক্তার দেখান।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ ভাই, আমার মাথায় সমস্যা আছে। তবে ভাবির সঙ্গে থাকলে সেটা আরও বেড়ে যায়।
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোরা দুজন মিলে আমাকে পাগল করে দিবি।
আইরা দরজায় হেলান দিয়ে বলল,
— তাহলে একটু বিশ্রাম নিন। আমরা পরে কথা বলব।
রাদিফ হেসে ফেলল।
রুশো দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
সকাল ১০টা।
নাশতার টেবিলে রাদিফ আবার তার পরিকল্পনা নিয়ে হাজির।
— মা, আজকে সবাই মিলে বাইরে গেলে কেমন হয়?
রুশোর মা বললেন,
— মন্দ হয় না। অনেক দিন সবাই একসঙ্গে কোথাও যাওয়া হয়নি।
রাদিফ খুশি হয়ে বলল,
— তাহলে ঠিক আছে। ভাবি আর আমি—
রুশো মাঝখান থেকে বলল,
— ভাবি আর তুই না। সবাই মিলে যাব।
রাদিফ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আমি কি বলেছি শুধু আমরা দুজন যাব?
আইরা চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
— আপনি একটু বেশি কথা বলেন।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাবি, আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার পর থেকে আমার কথার পরিমাণ বেড়ে গেছে।
রুশো এবার আইরার দিকে তাকাল।
— আপনারও কি কোনো কাজ নেই?
আইরা শান্তভাবে বলল,
— আছে। কিন্তু আপনার ভাই আমাকে কাজ করতে দিচ্ছে না।
রাদিফ বুক ফুলিয়ে বলল,
— শুনেছিস ভাই? আমি কত ভালো মানুষ!
রুশো আর কিছু বলল না।
তবে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই দুজনের কথার লড়াই তার সকালের নাশতার স্বাদ নষ্ট করে দিয়েছে।
দুপুর ১২টা।
সবাই মিলে কাছের একটি সুন্দর রিসোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
রাদিফ গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আইরা নিচে নামতেই সে বলল,
— ভাবি, আপনি আমার গাড়িতে বসবেন।
রুশো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— না। আইরা আমার গাড়িতে যাবে।
রাদিফ অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন? তোর গাড়িতে কি এসি বেশি?
রুশো গম্ভীরভাবে বলল,
— আমি বলেছি, আমার গাড়িতে যাবে।
আইরা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— আমার মনে হয়, আমি রিকশায় চলে যাই। আপনাদের ঝগড়া শেষ হলে খবর দেবেন।
রাদিফ হেসে উঠল।
— ভাবি, আপনি আমার গাড়িতেই আসুন। আমরা দুইজন গান শুনতে শুনতে যাব।
রুশো এবার সরাসরি বলল,
— রাদিফ, তুই আমার গাড়িতে বস।
রাদিফ হতভম্ব।
— কী! আমি?
— হ্যাঁ।
— তাহলে ভাবি?
রুশো আইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সে আমার সঙ্গে যাবে।
রাদিফ এবার আইরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।
— বুঝেছি ভাবি। আজকে ভাইয়ের মেজাজ একটু অন্যরকম।
আইরা মুখে কিছু বলল না। তবে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
দুপুর ১টা।
রিসোর্টে পৌঁছানোর পর সবাই নিজেদের মতো সময় কাটাতে লাগল।
আইরা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছিল। রাদিফ কিছুক্ষণ পর এসে তার পাশে দাঁড়াল।
— ভাবি, কী দেখছেন?
— ফুল।
— ফুলের মধ্যে এমন কী আছে?
আইরা একটা ফুলের দিকে ইশারা করে বলল,
— এই ফুলটা সুন্দর না?
রাদিফ ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— হ্যাঁ। তবে আপনার মতো না।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
— এইসব কথা কোথা থেকে শিখেছেন?
রাদিফ হেসে বলল,
— ভাবিকে খুশি করার জন্য একটু প্রশংসা করতেই হয়।
আইরা হাসল।
— বেশি প্রশংসা করলে কিন্তু আপনার কাছ থেকে কাজ আদায় করব।
— কী কাজ?
— আমার জন্য আইসক্রিম কিনে আনবেন।
রাদিফ বুক চাপড়ে বলল,
— এইটুকু কাজ! ভাবি, আপনি চাইলে আমি পুরো দোকান কিনে আনতে পারি।
আইরা হেসে বলল,
— দোকান কেনার দরকার নেই। দুইটা আইসক্রিম আনলেই হবে।
রাদিফ চলে গেল।
কিন্তু দূর থেকে সবকিছু দেখছিল রুশো।
তার চোখে বিরক্তি।
নিজের অজান্তেই সে কয়েকবার ঘড়ির দিকে তাকাল। রাদিফ এতক্ষণ কোথায় গেল, সেটাও তার খেয়াল হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর রাদিফ ফিরে এল। হাতে দুইটা আইসক্রিম।
একটা আইরাকে দিয়ে আরেকটা নিজে খেতে শুরু করল।
আইরা বলল,
— ধন্যবাদ, দেবর সাহেব।
রাদিফ বলল,
— সবসময়, ভাবি।
ঠিক তখনই রুশো তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
— রাদিফ, আমার সঙ্গে আয়।
রাদিফ আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাই, একটু পরে আসি?
— এখনই।
রাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আইরার দিকে তাকাল।
— ভাবি, আমার সুখের সংসার ভাইয়ের সহ্য হয় না।
আইরা হাসতে হাসতে বলল,
— যান, নয়তো আপনার আইসক্রিমটাও নিয়ে যাবে।
রাদিফ দ্রুত আইসক্রিম শেষ করে রুশোর সঙ্গে চলে গেল।
বিকেল ৪টা।
রিসোর্টের একটি বেঞ্চে বসে আইরা ফোনে ছবি দেখছিল।
রুশো এসে তার পাশে দাঁড়াল।
— বাড়ি ফিরতে হবে।
আইরা ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— সবাই কি চলে যাবে?
— হ্যাঁ।
— আচ্ছা।
রুশো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
— রাদিফের সঙ্গে এত হাসাহাসি করার কী আছে?
আইরা এবার ফোন নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
— আবার সেই কথা?
— আমি শুধু জিজ্ঞেস করছি।
— ও আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। আমার সঙ্গে মজা করে, গল্প করে। তাই আমিও ওর সঙ্গে মজা করি। এতে সমস্যা কোথায়?
রুশো চুপ করে রইল।
আইরা এবার একটু মুচকি হেসে বলল,
— আপনি চাইলে আপনাকেও হাসাতে পারি।
— দরকার নেই।
— চেষ্টা করে দেখতে পারেন। হয়তো আপনার মুখেও একদিন হাসি ফুটবে।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না।
আইরা উঠে দাঁড়াল।
— চিন্তা করছি না। শুধু ভাবছি, আপনার মুখে হাসি থাকলে এই বাড়ির মানুষ একটু শান্তিতে থাকতে পারত।
রুশো কিছু বলল না।
আইরা সামনে এগিয়ে গেল।
রুশো কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা সবসময় তাকে কথা শুনিয়ে যায়। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, তার সঙ্গে ঝগড়া না হলে এখন দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে।
এই অনুভূতির নাম কী, রুশো এখনো জানে না।
রাত ১০টা।
বাড়ি ফিরে সবাই যার যার ঘরে চলে গেছে।
রুশো ঘরে ঢুকে দেখল আইরা বিছানায় বসে রাদিফের পাঠানো একটা ছবি দেখছে। ছবিটা দেখে সে একা একাই হাসছে।
রুশো জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?
আইরা ফোনের দিকে তাকিয়েই বলল,
— আপনার ভাই একটা ছবি পাঠিয়েছে।
— কী ছবি?
আইরা ফোনটা এগিয়ে দিল।
ছবিতে রাদিফ অদ্ভুত একটা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা—
“ভাবি, আপনার ভাইয়ের রাগ থেকে বাঁচতে হলে আমাকে প্রতিদিন একটা করে আইসক্রিম খাওয়াতে হবে।”
রুশো ছবিটা দেখে ফোনটা ফিরিয়ে দিল।
— ওর এসব বাচ্চামি আর কতদিন চলবে?
আইরা হেসে বলল,
— যতদিন আপনার মতো রাগী ভাই থাকবে, ততদিন।
রুশো বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার কাছে রাদিফের সবকিছুই ভালো লাগে?
আইরা একটু ভেবে বলল,
— হ্যাঁ। অন্তত ওর সঙ্গে কথা বললে মনে হয় না কেউ আমাকে সবসময় ধমক দেওয়ার জন্য বসে আছে।
রুশো চুপ হয়ে গেল।
আইরা আবার ফোনের দিকে মন দিল।
কিছুক্ষণ পর রুশো হঠাৎ বলল,
— কাল থেকে রাদিফকে নিয়ে এত ঘোরাঘুরি করবেন না।
আইরা ফোন নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
— কেন?
রুশো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমার ভালো লাগে না।
কথাটা বলেই সে আলমারির দিকে চলে গেল।
আইরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— ওহ্! তাহলে ব্যাপারটা এই!
রুশো পেছন ফিরে তাকাল।
— কী ব্যাপার?
আইরা মাথা নেড়ে বলল,
— কিছু না। ঘুমান।
কিন্তু মনে মনে আইরা ঠিক করে ফেলেছে, কাল রুশোকে আরও একটু জ্বালানো হবে!
আর রুশো?
সে নিজেও বুঝতে পারছে না, কেন আইরার মুখে রাদিফের প্রশংসা শুনলে তার এত অস্বস্তি হয়।
চলবে…
পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: রুশো অবশেষে বলে ফেলল, আইরার রাদিফের সঙ্গে ঘোরাঘুরি তার ভালো লাগে না! এবার আইরা কী করবে বলে মনে হয়? রুশোকে আরও জ্বালাবে, নাকি একটু শান্তি দেবে? গল্পটি ভালো লাগলে লাইক দিও এবং সুন্দর মন্তব্য করে জানিও। তোমাদের প্রতিটি মন্তব্যই লেখার অনুপ্রেরণা। ❤️