তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ০৫
সকাল ৮টা।
খান বাড়ির ডাইনিং রুমে আজ একটু বেশিই হৈচৈ হচ্ছে। কারণ রাদিফ সকাল থেকেই ঘোষণা করেছে, আজ সে কোনো কাজ করবে না। তার একমাত্র কাজ হলো ভাবির সঙ্গে সময় কাটানো।
রাদিফ চেয়ারে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,
— মা, আজকে ভাবিকে নিয়ে বাইরে যাব।
রুশোর মা অবাক হয়ে বললেন,
— কোথায় নিয়ে যাবি?
— সেটা এখনো ঠিক করিনি। তবে ভাবিকে নিয়ে যাব, এটাই চূড়ান্ত।
আইরা পাশ থেকে বলল,
— আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন?
রাদিফ গম্ভীর মুখে বলল,
— ভাবি, পরিবারের ছোট সদস্য হিসেবে আমারও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।
আইরা হেসে বলল,
— আপনার সিদ্ধান্ত আপনার কাছেই রাখুন। আমার আজকে অনেক কাজ।
রাদিফ মুখটা ছোট করে বলল,
— দেখেছ মা? আমার নিজের ভাবিও আমাকে পাত্তা দেয় না!
রুশো এতক্ষণ চুপচাপ নাশতা করছিল। এবার বলল,
— ভালোই তো। অন্তত একটা মানুষ বুদ্ধিমানের মতো কথা বলছে।
আইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেছে?
রুশো ঠান্ডা গলায় বলল,
— না। তবুও বললাম।
রাদিফ দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— বাহ্! সকাল সকাল দম্পতির কথার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আমি একটু চা নিয়ে বসি।
আইরা রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি চুপচাপ নাশতা করুন।
— জি, ভাবি। আপনার হুকুম মাথা পেতে নিলাম।
রুশো বিরক্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
যাওয়ার আগে আইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— অযথা সারাদিন রাদিফের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর দরকার নেই।
আইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন? ও আপনার ছোট ভাই বলে?
রুশো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
— যা ইচ্ছা করুন।
এই বলে বেরিয়ে গেল।
রাদিফ মুখ বাঁকিয়ে আইরার দিকে তাকাল।
— ভাবি, ভাইয়ের কি আজকাল আমার ওপর খুব রাগ?
আইরা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
— আপনার ভাইয়ের রাগের কারণ খুঁজতে গেলে আমার নিজেরই মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
— তাহলে বাদ দেন। চলুন, আমরা ঘুরতে যাই।
— কোথায়?
— আগে বের হই, তারপর দেখা যাবে।
সকাল ১১টা।
রাদিফ আর আইরা বাড়ির কাছের একটা শপিং মলে এসেছে।
আইরা একটা দোকানে ঢুকে জামাকাপড় দেখতে লাগল। আর রাদিফ দোকানের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফোনে ছবি তুলছে।
আইরা একটা পোশাক হাতে নিয়ে বলল,
— এটা কেমন?
রাদিফ ভালো করে দেখে বলল,
— সুন্দর। তবে আপনার জন্য আরও সুন্দর কিছু পাওয়া যাবে।
— তাহলে খুঁজে দিন।
রাদিফ একের পর এক পোশাক দেখাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আইরা একটা পোশাক পছন্দ করল।
কিন্তু দাম দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেল।
— এত দাম!
রাদিফ বলল,
— সমস্যা কী? নিয়ে নিন।
— সমস্যা নেই মানে? এই দামে তো কয়েকটা পোশাক হয়ে যাবে!
রাদিফ হেসে বলল,
— ভাবি, আপনি আমার ভাইয়ের বউ। দাম দেখে এত চিন্তা করছেন কেন?
আইরা চোখ রাঙিয়ে বলল,
— আপনার ভাইয়ের বউ হয়েছি বলে কি দোকানের সব জিনিস কিনে ফেলব?
— না, তবে আমার ভাইয়ের টাকা বাঁচানোর দায়িত্বও আপনার না।
আইরা পোশাকটা রেখে বলল,
— চলুন, অন্য দোকানে যাই।
রাদিফ পেছন পেছন যেতে যেতে বলল,
— ভাবি, আপনি তো দেখি ভাইয়ের থেকেও বেশি হিসাবি!
আইরা ঘুরে তাকাল।
— কী বললেন?
— বললাম, আপনি খুব বুদ্ধিমতী!
— ভালো। বুদ্ধি করে চলুন, নয়তো আজকে আপনাকে দোকানে রেখে চলে যাব।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— না না, আমাকে একা ফেলে যাবেন না। আপনার ভাইয়ের কাছে আমার অনেক গোপন তথ্য আছে।
আইরা হেসে বলল,
— তাই নাকি? তাহলে একদিন সব শুনব।
দুপুর ১টা।
অন্যদিকে অফিসে বসে রুশোর মেজাজ ভালো নেই।
সে কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েও আইরাকে কল করেনি। শেষ পর্যন্ত রাদিফকে ফোন দিল।
রাদিফ ফোন ধরতেই বলল,
— কী ব্যাপার ভাই? আমাকে খুব মনে পড়ছে?
রুশো গম্ভীর গলায় বলল,
— কোথায় তোরা?
— আমরা শপিং করছি।
— কোথায়?
— কেন? তুইও আসবি নাকি?
— রাদিফ, ঠিকানা বল।
রাদিফ মুচকি হেসে বলল,
— আচ্ছা, বলছি। তবে ভাই, একটা কথা—
— কী?
— ভাবি কিন্তু আজ খুব সুন্দর লাগছে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রুশো বলল,
— ফোন রাখ।
রাদিফ হাসতে হাসতে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
আইরা পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কে ফোন করেছিল?
— আপনার স্বামী।
আইরা অবাক হয়ে বলল,
— কী বললেন?
রাদিফ চোখ টিপে বলল,
— কিছু না। শুধু আপনার খোঁজ নিচ্ছিল।
আইরা মাথা নাড়ল।
— আপনার ভাইয়ের হাতে কাজ নেই বুঝি?
রাদিফ হাসল।
— ভাবি, আমার মনে হয় ভাইয়ের হাতে কাজ আছে, কিন্তু মাথায় অন্য চিন্তা।
বিকেল ৪টা।
বাড়িতে ফিরে আইরা নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখল রুশো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আইরা অবাক হয়ে বলল,
— আপনি বাসায়?
রুশো ঘুরে তাকাল।
— হ্যাঁ।
— আজ এত তাড়াতাড়ি?
— আমার বাড়িতে আসার জন্যও কি এখন সময় নির্ধারণ করতে হবে?
আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— তা নয়। তবে আপনার মতো ব্যস্ত মানুষের হাতে সময় দেখে অবাক হলাম।
রুশো তার হাতে থাকা শপিং ব্যাগগুলোর দিকে তাকাল।
— এত কিছু কিনেছেন?
— হ্যাঁ। সমস্যা?
— না।
আইরা ব্যাগগুলো টেবিলের ওপর রেখে বলল,
— আপনার ভাই অনেক ভালো। অন্তত আমার পছন্দের জিনিসগুলো বুঝতে পারে।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— রাদিফ খুব ভালো হয়ে গেছে দেখছি!
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— অবশ্যই। আপনার সঙ্গে তুলনা করলে তো আরও ভালো লাগে।
রুশো এবার তার দিকে এগিয়ে এল।
— সব কথায় আমাকে টেনে আনতে হবে?
আইরা একটুও না ঘাবড়িয়ে বলল,
— আপনি সামনে থাকলে কথায় আপনাকে টানতে হয় না। আপনি নিজেই চলে আসেন।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— রাদিফের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কী দরকার?
আইরা এবার একটু অবাক হলো।
— সে আপনার ভাই। আমার দেবর। তার সঙ্গে কথা বলব না?
— কথা বলবেন। কিন্তু সারাদিন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর দরকার নেই।
আইরা মুচকি হেসে বলল,
— ওহ্! তাহলে আপনি জেলাস হচ্ছেন?
রুশো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু ভাববেন না।
— আমি তো কিছু ভাবছি না। আপনিই তো এত কিছু বলছেন।
রুশো বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল।
আইরা হাসতে হাসতে বলল,
— আচ্ছা, আর জ্বালাব না। আপনি শান্তিতে থাকুন।
কিন্তু তার মুখের হাসিটা দেখে রুশোর বিরক্তি আরও বেড়ে গেল।
রাত ৯টা।
ডিনার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে।
রাদিফ আজ বিশেষভাবে আনন্দিত। কারণ সে বুঝতে পেরেছে, ভাইকে একটু জ্বালানোর জন্য আইরাকে পাশে পাওয়া বেশ কাজে দেয়।
খেতে খেতে সে বলল,
— ভাবি, কালকে আবার কোথাও যাবেন?
আইরা বলল,
— কোথায়?
— আপনার যেখানে ইচ্ছা।
রুশো এবার খাবারের প্লেট থেকে মুখ তুলে বলল,
— কালকে রাদিফের কাজ আছে।
রাদিফ অবাক হয়ে তাকাল।
— আমার?
— হ্যাঁ।
— কী কাজ?
— সেটা কালকে বলব।
রাদিফ মুখ বাঁকিয়ে আইরার দিকে তাকাল।
— ভাবি, দেখলেন? আমার স্বাধীনতা আবারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
আইরা হেসে বলল,
— আপনার ভাইকে বলুন, আপনাকে একটু স্বাধীনতা দিতে।
রাদিফ রুশোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাই, বিয়ে করেছিস তুই, কিন্তু নিয়মকানুন আমার ওপর কেন?
সবাই হেসে উঠল।
রুশো কিছু না বলে খাওয়ায় মন দিল।
কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল আইরার দিকে।
মেয়েটা রাদিফের সঙ্গে এত সহজে মিশে গেছে! অথচ তার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই যেন ঝগড়া শুরু হয়ে যায়।
কেন এমন হয়?
প্রশ্নটার উত্তর রুশোর নিজের কাছেও নেই।
আর আইরা?
সে তো দিব্যি নিজের মনে খুশি।
রাদিফের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব জমে উঠেছে। আর রুশোকে একটু একটু করে জ্বালানোও তার কাছে বেশ মজার হয়ে উঠেছে।
তবে সে জানে না, এই ছোট ছোট হাসি-ঠাট্টার মাঝেই রুশোর মনের ভেতর অচেনা এক অনুভূতির শুরু হচ্ছে।
চলবে…
পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যে: আইরা আর রাদিফের দেবর-ভাবির দুষ্টুমি কেমন লাগছে? আর রুশোর এই চাপা রাগের কারণ কী মনে হয়? অবশ্যই লাইক ও সুন্দর মন্তব্য করে জানাবে। তোমাদের ভালোবাসা আর মন্তব্যই আমাকে গল্প লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️