তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ১৩
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। বাড়ির চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। দোতলার করিডোরের এক পাশে রুশোর ঘর, অন্য পাশে আইরার ঘর। মাঝখানের বসার জায়গাটায় মৃদু আলো জ্বলছে।
রুশোর মা নিজের ঘরে বসে আছেন। তাঁর সামনে আইরা চুপচাপ বসে আছে। হাতে এক কাপ চা। কিছুক্ষণ আগেই তিনি আইরাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।
— মা, চা খাচ্ছ না কেন?
আইরা কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
— খাচ্ছি তো।
— তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। কিছু মনে করবে না তো?
আইরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— বলুন।
রুশোর মা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটার মধ্যে একটা চাপা অভিমান আছে, সেটা তিনি প্রথম দিন থেকেই লক্ষ করেছেন। বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বললেও নিজের কথা খুব একটা প্রকাশ করে না। হাসে, গল্প করে, রাদিফের সঙ্গে দুষ্টুমি করে; কিন্তু মাঝেমধ্যে এমনভাবে চুপ হয়ে যায়, যেন অনেক দূরের কোনো চিন্তায় ডুবে আছে।
— তোমার বাড়ি থেকে কি কেউ ফোন করেছিল?
আইরার হাত থেমে গেল।
— জি। কয়েকবার করেছে।
— তুমি কথা বলেছ?
— না।
— কেন মা?
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— কথা বলার মতো কিছু নেই।
রুশোর মা নরম গলায় বললেন,
— রাগ করে আছ?
আইরা এবার মুখ তুলে তাকাল।
— রাগ না। আসলে... যাদের সিদ্ধান্তের কারণে আমার জীবনটা এভাবে বদলে গেল, তাদের সঙ্গে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারি না।
কথাগুলো বলার সময় আইরার গলায় কোনো চিৎকার ছিল না, ছিল চাপা কষ্ট। সে কাপটা টেবিলে রেখে জানালার দিকে তাকাল।
— আমি জানি, তারা আমার পরিবার। কিন্তু তাই বলে সবকিছু ভুলে যেতে হবে, এমন তো নয়। আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করা হয়নি আমি কী চাই। আমার মতামতের কোনো মূল্যই ছিল না। শুধু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
রুশোর মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি বুঝতে পারছি মা। তবে একটা কথা বলব, মানুষের সম্পর্ক একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে শেষও হয়ে যায় না। সময় লাগতে পারে। তুমি নিজের মনকে সময় দাও।
আইরা মৃদু হেসে বলল,
— চেষ্টা করছি।
— আর একটা কথা। এই বাড়িতে তোমাকে কেউ জোর করে কিছু করতে বলবে না। নিজের মতো করে থাকো। তবে কোনো কষ্ট হলে আমাকে বলবে।
আইরা এবার সত্যিই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে মাথা নিচু করে বলল,
— ধন্যবাদ।
রুশোর মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— ধন্যবাদ দিতে হবে না। তুমি এখন এই বাড়ির মেয়ে।
আইরা আর কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল।
অন্যদিকে রুশোর ঘরে।
রুশো নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। সামনে কয়েকটি ফাইল খোলা। তার চোখ বারবার একই পাতায় আটকে যাচ্ছে।
দরজায় টোকা পড়ল।
— আসব?
রুশো চোখ না তুলেই বলল,
— এসো।
রাদিফ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার হাতে একটা ফাইল।
— ভাইয়া, এগুলো দেখবেন?
রুশো হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিল।
— কী আছে?
— আজকে যে হিসাবগুলো নিয়ে কথা হয়েছিল, সেগুলোর বিস্তারিত।
রুশো ফাইল খুলে দেখতে শুরু করল। রাদিফ সামনে চেয়ারে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর রুশো বলল,
— এই তথ্যগুলো কোথা থেকে পেয়েছ?
— আমাদের লোকের কাছ থেকে। তবে এখনো সব যাচাই করা হয়নি।
— তাহলে নিশ্চিত না হয়ে এগুলো আমার কাছে আনলে কেন?
রাদিফ শান্তভাবে উত্তর দিল,
— কারণ বিষয়টা দেরি করার মতো নয়। আমি শুধু চাইছিলাম আপনি আগে দেখে রাখুন।
রুশো কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টে আবার আগের পাতায় ফিরে গেল।
— যে লোক তথ্য দিয়েছে, তার সঙ্গে আবার কথা বলো। তবে সাবধানে। আমাদের কোনো পরিকল্পনা যেন বাইরে না যায়।
— ঠিক আছে।
রুশো এবার ফাইল বন্ধ করে বলল,
— আর একটা বিষয়। কাল থেকে অফিসের কিছু দায়িত্ব তোমাকে বেশি নিতে হবে।
রাদিফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কেন? আপনি কোথাও যাচ্ছেন?
— কয়েকটা কাজ আছে। আমাকে বাইরে থাকতে হতে পারে।
— কতদিন?
— এখনো ঠিক করিনি।
রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— ভাইয়া, আপনি একা সব সামলানোর চেষ্টা করেন কেন? আমি তো আছি।
রুশো তার দিকে তাকাল।
— জানি তুমি আছ। কিন্তু সবকিছু তোমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাই না।
রাদিফ হালকা হেসে বলল,
— আমার ওপর চাপিয়ে না দিয়ে নিজের ওপর চাপিয়ে দিলে কি সেটা খুব ভালো কাজ হয়?
রুশো কোনো উত্তর দিল না।
রাদিফ উঠে দাঁড়াল।
— আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, কাল সকালে একটু দেরি করে উঠলে কিন্তু আমাকে দোষ দেবেন না।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন?
— কারণ আজ রাতে আমাকে অনেক কাজ করতে হবে।
— কাজ করো। কিন্তু কালকের মিটিংয়ে দেরি হলে ভালো হবে না।
— জি, বস!
রুশো বিরক্ত হয়ে তাকাতেই রাদিফ দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
আইরা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। পড়ার মাঝখানে হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।
— কে?
— আমি।
রুশোর গলা শুনে আইরা বই বন্ধ করল।
— আসুন।
রুশো ঘরে ঢুকে দেখল, আইরা বিছানার ওপর বসে আছে। পাশে বই, টেবিলে পানির গ্লাস।
— এখনো ঘুমাওনি?
আইরা বলল,
— না। ঘুম আসছে না।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
— মা তোমার সঙ্গে কথা বলেছেন?
আইরা একটু অবাক হলো।
— আপনি জানলেন কীভাবে?
— মা আমাকে বলেছেন।
আইরা বইয়ের ওপর হাত রেখে বলল,
— হ্যাঁ, কথা বলেছেন।
রুশো এবার ঘরের এক পাশে রাখা চেয়ারে বসল।
— তোমার বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল?
আইরা তার দিকে তাকাল।
— আপনি কি আমার সব খবর রাখেন?
— তোমার খবর রাখার জন্য আলাদা লোক লাগবে না। এই বাড়িতে কী হচ্ছে, সেটা আমি জানি।
আইরা মৃদু হেসে বলল,
— তা হলে এটাও জানেন, আমি কথা বলিনি।
— হ্যাঁ।
— তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছেন কেন?
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— কথা বলতে চাইলে বলতে পারো। কেউ বাধা দেবে না।
আইরা এবার একটু গম্ভীর হলো।
— আপনি কি চান আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি?
— আমি কী চাই, সেটা বড় কথা নয়। তুমি কী চাও, সেটাই বড় কথা।
আইরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রুশোর মুখে আজ অদ্ভুত এক ধরনের স্থিরতা। সেই পরিচিত রাগ নেই, বিরক্তি নেই। কথাগুলোও আদেশের মতো শোনাচ্ছে না।
আইরা ধীরে বলল,
— আমি এখনো প্রস্তুত নই।
রুশো মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে।
এরপর সে উঠে দাঁড়াল।
আইরা হঠাৎ বলল,
— আপনি কি কখনো আপনার পরিবারের কারও ওপর খুব রাগ করেছেন?
রুশো থেমে গেল।
— কেন?
— এমনি জানতে ইচ্ছে হলো।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— রাগ করেছি। এখনো করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের ছেড়ে চলে যাব।
আইরা মৃদু স্বরে বলল,
— সব সম্পর্কের ভাগ্য এক হয় না।
রুশো তার দিকে তাকাল। মেয়েটার কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তাকে আর প্রশ্ন করতে দিল না।
সে শুধু বলল,
— ঘুমিয়ে পড়ো। রাত অনেক হয়েছে।
আইরা মাথা নাড়ল।
রুশো দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকাল।
— আর হ্যাঁ, কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে।
আইরা একটু অবাক হয়ে বলল,
— আপনাকে?
— হ্যাঁ, আমাকে।
কথাটা বলে রুশো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আইরা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে উঠল।
পরদিন সকাল।
ডাইনিং রুমে সবাই বসেছে। রাদিফ আজও বেশ দেরিতে এসেছে। চুল এলোমেলো, চোখে ঘুমের ছাপ।
রুশো তাকে দেখেই বলল,
— ঘড়ি দেখেছ?
রাদিফ চেয়ার টেনে বসে বলল,
— দেখেছি।
— তাহলে দেরি কেন?
— ঘড়িটা একটু দ্রুত চলে, ভাইয়া।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল।
রুশো কড়া গলায় বলল,
— রাদিফ, আজকে সকাল থেকেই শুরু করেছ?
রাদিফ এবার গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
— না ভাইয়া। আজকে আর কিছু বলব না।
মা হেসে বললেন,
— তোরা দুজন একটু শান্তিতে নাশতা কর। সকাল সকাল ঝগড়া শুরু করিস না।
রাদিফ পরোটায় কামড় দিয়ে বলল,
— মা, আমি তো কিছুই বলিনি। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা।
আইরা বলল,
— আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য আলাদা তালিকা তৈরি করতে হবে।
— ভাবী, আপনি আমার পক্ষে থাকবেন ভেবেছিলাম!
— আমি সত্যের পক্ষে থাকি।
রাদিফ বুক চাপড়ে বলল,
— এ বাড়িতে আমার কেউ নেই!
রুশো এবার কফির কাপ নামিয়ে বলল,
— নাটক বন্ধ করে খাও।
রাদিফ মুখ বন্ধ করল। তবে তার চোখে দুষ্টুমি রয়ে গেল।
নাশতার পর রুশো অফিসে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল। আইরা তখন সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুশো তাকে দেখে বলল,
— আজ কোথাও যাবে?
আইরা মাথা নাড়ল।
— না।
— ঠিক আছে।
সে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু গাড়িতে ওঠার আগে আবার ফিরে তাকাল।
— আইরা!
— জি?
— দুপুরে খেয়ো। আর মা যদি কোথাও যেতে বলেন, ড্রাইভারকে সঙ্গে নেবে।
আইরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনি কি আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করেন?
রুশো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— আমি চাই না এই বাড়ির কেউ অকারণে সমস্যায় পড়ুক।
আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— বুঝেছি। আমি এই বাড়ির একজন সদস্য, তাই দায়িত্ববোধ।
রুশো কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়িতে উঠে গেল।
আইরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়িটা বেরিয়ে যেতে দেখল।
দুপুরের দিকে বাড়িতে একটা ছোট ঘটনা ঘটল।
রাদিফ নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ আইরা এসে দরজায় দাঁড়াল।
— আসতে পারি?
রাদিফ মাথা তুলে বলল,
— ভাবী! আপনি আমার ঘরে! আজ নিশ্চয়ই কোনো বড় বিপদ হয়েছে।
আইরা চোখ পাকিয়ে বলল,
— আপনার ঘরে আসার জন্য কি বিপদ হতে হবে?
— না, তবে আপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমার ঘরে এলে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
আইরা হেসে বলল,
— আপনার কথা শেষ হবে?
— না। তবে আপনি চাইলে বিরতি দিতে পারি।
আইরা চেয়ার টেনে বসে বলল,
— একটা সাহায্য লাগবে।
রাদিফ ল্যাপটপ বন্ধ করল।
— বলুন।
— আমি রান্না শিখতে চাই।
রাদিফ অবাক হয়ে তাকাল।
— রান্না?
— হ্যাঁ। কী হয়েছে?
— না, কিছু হয়নি। শুধু ভাবছি, রান্নাঘরের কী অপরাধ হয়েছে!
আইরা একটা কুশন তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
— বেশি কথা বললে সাহায্য লাগবে না।
রাদিফ কুশনটা ধরে হেসে বলল,
— আচ্ছা আচ্ছা। কী রান্না শিখবেন?
— বিরিয়ানি।
রাদিফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— ভাবী, আপনি সরাসরি বিরিয়ানি দিয়ে শুরু করবেন?
— সমস্যা কী?
— সমস্যা নেই। তবে প্রথমে ভাত রান্না শিখলে ভালো হয়।
আইরা রাগী চোখে তাকাল।
— আমি ভাত রান্না করতে পারি।
— তাহলে তো ভালোই। আজকে আমরা বিরিয়ানি বানাব।
আইরা উঠে দাঁড়াল।
— ঠিক আছে। চলুন।
রাদিফও উঠে দাঁড়াল। তবে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে একটু থেমে গেল।
— এক মিনিট। ভাইয়াকে জানিয়ে নিই।
আইরা হাত তুলে বলল,
— আপনার ভাইকে জানাতে হবে কেন? আমরা রান্না করব, কোনো যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না।
রাদিফ হাসল।
— ভাইয়ার কাছে রান্নাঘরে আপনার সঙ্গে আমার উপস্থিতিও মাঝে মাঝে যুদ্ধের মতো মনে হয়।
রান্নাঘরে ঢুকে আইরা প্রথমেই সব উপকরণ বের করতে শুরু করল। রাদিফ পাশে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দিচ্ছে।
— ভাবী, আগে চালটা ধুয়ে নিন।
— জানি।
— মসলা বের করুন।
— সেটাও জানি।
— পেঁয়াজ কাটুন।
আইরা ছুরি হাতে নিয়ে বলল,
— আর কিছু জানেন?
রাদিফ হাসল।
— জানি। তবে সব একসঙ্গে বললে আপনি রাগ করবেন।
আইরা পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। রাদিফ মসলা মাপছে। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরে পেঁয়াজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
রাদিফ হঠাৎ চোখ কচলাতে লাগল।
আইরা তাকিয়ে বলল,
— কী হয়েছে?
— পেঁয়াজ আমাকে সহ্য করতে পারছে না।
— পেঁয়াজ আপনাকে সহ্য করতে পারছে না, নাকি আপনি পেঁয়াজকে?
— ভাবী, এই কঠিন সময়ে আমাকে নিয়ে হাসবেন না।
আইরা হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই রান্নাঘরের দরজায় রুশোর মা এসে দাঁড়ালেন।
— তোরা কী করছিস?
রাদিফ গর্বের সঙ্গে বলল,
— মা, আজকে আমরা বিরিয়ানি বানাচ্ছি।
মা অবাক হয়ে রান্নাঘরের অবস্থা দেখলেন।
— তোমরা দুজন মিলে?
আইরা হেসে বলল,
— জি। আজকে আমি রান্না শিখব।
মা খুশি হয়ে বললেন,
— বেশ তো। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।
এরপর তিনজন মিলে রান্নার কাজ শুরু করল। মা একেকটা ধাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আইরা মন দিয়ে শুনছে, আর রাদিফ মাঝেমধ্যে এমন সব মন্তব্য করছে যে আইরা হাসতে হাসতে কাজ করতে পারছে না।
একসময় রাদিফ ভুল করে মসলার একটা পাত্র বেশি উল্টে ফেলল।
আইরা চিৎকার করে উঠল,
— এই যে! কী করলেন?
রাদিফ হতভম্ব হয়ে বলল,
— আমার হাত ফসকে গেছে!
— হাত ফসকে গেছে, নাকি আপনার মাথা?
মা হেসে ফেললেন।
রাদিফ দুই হাত তুলে বলল,
— মা, দেখো! তোমার ছেলেকে কীভাবে অপমান করা হচ্ছে!
সন্ধ্যার আগে রান্না শেষ হলো।
বিরিয়ানির হাঁড়ি থেকে সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছে। আইরা নিজেই অবাক হয়ে হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
— সত্যি সত্যি হয়েছে?
রাদিফ গর্ব করে বলল,
— অবশ্যই হয়েছে। আমার তত্ত্বাবধানে কোনো কাজ খারাপ হতে পারে?
আইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনার তত্ত্বাবধান না থাকলে হয়তো আরও ভালো হতো।
রাদিফ মুখ বাঁকাল।
— ভাবী, আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।
আইরা হেসে বলল,
— আগে খেয়ে দেখি। তারপর প্রশংসা করব।
রান্নাঘরের বাইরে তখন রুশোর গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
রাদিফ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইয়া চলে এসেছেন।
আইরা একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
— উনি কি বিরিয়ানি খাবেন?
রাদিফ হাসল।
— খাবেন। তবে প্রশংসা করবেন কি না, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
আইরা হাঁড়ির ঢাকনা লাগাতে লাগাতে বলল,
— প্রশংসা না করলে কাল থেকে আর রান্না করব না।
রাদিফ হেসে বলল,
— তাহলে ভাইয়ার ক্ষতি!
দরজার বাইরে রুশোর পায়ের শব্দ শোনা গেল।
রান্নাঘরে ঢুকে সে প্রথমে দুজনের দিকে তাকাল, তারপর চুলার ওপর রাখা হাঁড়িটার দিকে।
— কী হচ্ছে এখানে?
রাদিফ উত্তর দিল,
— আজকের বিশেষ আয়োজন। ভাবীর হাতে বিরিয়ানি।
রুশো আইরার দিকে তাকাল।
— তুমি রান্না করেছ?
আইরা মাথা উঁচু করে বলল,
— জি। কোনো সমস্যা?
রুশো হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— না। শুধু জানতে চাইলাম।
রাদিফ পাশ থেকে বলল,
— ভাইয়া, আজকে কিন্তু প্রশংসা করতে হবে। ভাবী অনেক কষ্ট করেছেন।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আগে খেয়ে দেখি।
রাদিফ মুখ বাঁকাল।
— এই বাড়িতে কারও প্রশংসা পাওয়া যায় না!
আইরা হেসে ফেলল।
কিন্তু রুশো এবার আর কিছু বলল না। সে শুধু হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
আজকের রাতের খাবারটা অন্য দিনের তুলনায় একটু আলাদা হতে চলেছে।
আর আইরা জানে না, তার হাতে বানানো এই সাধারণ বিরিয়ানির টেবিলেই হয়তো এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হবে, যা ধীরে ধীরে রুশোর কঠিন স্বভাবের আড়ালে থাকা মানুষটাকে তার সামনে প্রকাশ করবে।
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,
আজকের পর্বটি কেমন লাগল? আইরা ও রাদিফের দুষ্টুমি, রুশোর গম্ভীর স্বভাব আর তাদের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো নিয়ে আপনাদের মতামত জানাবেন। গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন এবং সুন্দর মন্তব্য করবেন। আপনাদের ভালোবাসা ও মন্তব্যই লেখার অনুপ্রেরণা। ❤️