তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ১২
সকাল সাড়ে সাতটা।
রুশোদের বাড়ির সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছে। রান্নাঘরে সকালের নাশতার প্রস্তুতি চলছে। বাড়ির সবাই ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠছে। তবে আজ একটা ব্যাপার আলাদা—রাদিফ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।
সাধারণত তাকে ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য দু-তিনবার ডাকতে হয়। কিন্তু আজ সে নিজেই গোসল করে, চুল ঠিকঠাক করে, একেবারে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছে।
ডাইনিং রুমে ঢুকতেই মায়ের সঙ্গে দেখা হলো।
— কী ব্যাপার রে? আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠেছে?
রাদিফ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
— মা, তোমার ছেলে এখন অনেক দায়িত্বশীল হয়েছে।
মা হেসে বললেন,
— সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। তা আজ এত সকালে ওঠার কারণটা কী?
— কারণ আছে। তবে সেটা গোপন।
ঠিক তখনই আইরা সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। রাদিফ তাকে দেখে হাত নেড়ে ডাকল।
— ভাবী! এই যে, এদিকে আসুন।
আইরা এগিয়ে এসে বলল,
— কী হয়েছে? সকাল সকাল এত চেঁচাচ্ছেন কেন?
— আপনাকে একটা কথা বলার আছে।
— আবার কী করেছেন?
রাদিফ বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— আপনি আমাকে এত খারাপ ভাবেন কেন? আমি কি কোনো অপরাধী?
আইরা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
— আপনার মুখ দেখলেই সন্দেহ হয়।
রাদিফ কিছু বলার আগেই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— সকাল সকাল আবার কী শুরু করেছ?
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
রুশো সিঁড়ি দিয়ে নামছে। পরনে কালো শার্ট আর ধূসর প্যান্ট। চেহারায় সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— কিছু না ভাইয়া। ভাবীর সঙ্গে একটু সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করছি।
রুশো চেয়ার টেনে বসল।
— তোমার সামাজিক যোগাযোগের জন্য সারাদিন পড়ে আছে। এখন নাশতা করো।
আইরা মুচকি হেসে রাদিফের দিকে তাকাল। রাদিফও চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, ভাইয়ের সামনে আজ বেশি কথা বলা যাবে না।
কিছুক্ষণ পর সবাই নাশতা করতে বসলে রাদিফ আবার শুরু করল।
— মা, আজকে কিন্তু আমি আর ভাবী বাইরে যাব।
রুশো কফির কাপ নামিয়ে তাকাল।
— কোথায়?
রাদিফ বলল,
— একটা জায়গায়।
— জায়গার নাম বলো।
— ভাইয়া, সবকিছু কি আপনাকে জানিয়ে করতে হবে?
রুশো ঠান্ডা গলায় বলল,
— হ্যাঁ। এই বাড়ির কেউ বাইরে গেলে কোথায় যাচ্ছে, সেটা জানানো উচিত।
আইরা এবার কথা বলল,
— আমি তো আপনাকে জানিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা বলিনি।
রুশো তার দিকে তাকাল।
— তোমার কথা বলছি না। রাদিফের কথা বলছি।
আইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— ওহ! তাহলে আমি নিশ্চিন্ত।
রাদিফ হাসি আটকে রাখতে পারল না।
— ভাবী, আপনি আমার সঙ্গে থাকলে আমার আর কোনো ভয় নেই।
রুশো এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
— রাদিফ, আমি কি তোমাকে কোনো মজার কথা বলেছি?
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
— না, ভাইয়া।
— তাহলে হাসছ কেন?
— এমনিই।
— খাওয়া শেষ করো। অফিসে যেতে হবে।
রাদিফ আর কোনো কথা বলল না।
আইরা মনে মনে ভাবল, এই বাড়িতে সকালের নাশতা খাওয়ার চেয়ে রুশোর মেজাজ সামলানোই বেশি কঠিন।
নাশতা শেষে আইরা নিজের ঘরে এসে আলমারি খুলল। রাদিফ বলেছিল তাকে কোথাও নিয়ে যাবে, কিন্তু কোথায় সেটা এখনো বলেনি।
সে একটা হালকা রঙের পোশাক বের করে বিছানায় রাখল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল।
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।
— আসব?
আইরা আয়নায় তাকিয়েই বলল,
— দরজা তো খোলাই আছে।
রাদিফ ঘরে ঢুকে বলল,
— ভাবী, তৈরি হয়েছেন?
— না। আপনাকে দেখে সাজতে বসেছি।
— আহা! আমার জন্য এত আয়োজন?
আইরা চিরুনি নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
— বেশি কথা বলবেন না। কোথায় নিয়ে যাবেন, সেটা আগে বলেন।
রাদিফ সোফায় বসে বলল,
— আজ আপনাকে একটা জায়গা দেখাব। আমাদের পুরোনো বাড়ির পাশে একটা ছোট্ট বাগান আছে। আগে আমরা সেখানে অনেক সময় কাটাতাম।
— পুরোনো বাড়ি?
— হ্যাঁ। দাদুর আমলের বাড়ি। এখন খুব একটা যাওয়া হয় না। তবে জায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দের।
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আপনার ভাইও যাবেন?
রাদিফ ভ্রু তুলে বলল,
— কেন? ভাইয়া গেলে আপনার আপত্তি আছে?
— আপত্তি নেই। শুধু জানতে চাইলাম।
— না, ভাইয়া অফিসে যাবে। আমরা দুজনেই যাব।
আইরা মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। তবে বেশি দূরে হলে কিন্তু যাব না।
রাদিফ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— আপনার সব শর্ত মেনে চলতে হলে আমাকে আগে থেকেই লিখিত চুক্তি করে নিতে হবে।
আইরা হেসে বলল,
— চাইলে করে নিতে পারেন।
সকাল সাড়ে দশটা।
বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রাদিফ গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে কিছু নির্দেশনা দিচ্ছিল। আইরা নিচে নেমে আসতেই সে দরজা খুলে দিল।
— আসুন, ভাবী।
আইরা গাড়িতে বসে বলল,
— আপনি নিজে গাড়ি চালাবেন না?
— আজ না। আজ আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি, কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।
— বাহ! আমাকে নিয়ে এত চিন্তা?
— অবশ্যই। আপনি যদি রাস্তায় হারিয়ে যান, তাহলে আমার ভাই আমাকে আস্ত রাখবে না।
আইরা হেসে বলল,
— আপনার ভাইকে এত ভয় পান?
রাদিফ এবার মুখটা গম্ভীর করে বলল,
— ভয় না। তবে ভাইয়া রেগে গেলে তার সঙ্গে তর্ক করার মতো বোকামি আমি করি না।
আইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— কিন্তু আপনি তো সারাক্ষণই তার সঙ্গে তর্ক করেন।
— ওগুলো তর্ক নয়। ওগুলো ভাইয়ের সঙ্গে আমার ভালোবাসার ভাষা।
— বুঝেছি। আপনার ভাষা বেশ বিপজ্জনক।
দুজনেই হেসে উঠল।
গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়ি একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে থামল।
বাড়িটা বেশ বড়। চারদিকে উঁচু দেয়াল, সামনে লোহার গেট। দেয়ালের কিছু অংশে পুরোনো লতাগুল্ম জড়িয়ে আছে। গেটের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সবুজ গাছপালা।
আইরা গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকাল।
— জায়গাটা তো সুন্দর!
রাদিফ গেট খুলতে খুলতে বলল,
— বলেছিলাম না? ছোটবেলায় এখানে কত সময় কাটিয়েছি!
ভেতরে ঢুকতেই একটা বড় উঠান চোখে পড়ল। এক পাশে পুরোনো দোলনা, অন্য পাশে কয়েকটি ফুলের গাছ। বাড়ির পেছনের দিকে একটা ছোট বাগান।
আইরা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— এখানে কি আপনারা সবাই আসতেন?
— হ্যাঁ। বিশেষ করে ভাইয়া। ছোটবেলায় ভাইয়া খুব একটা কথা বলতেন না। তবে এখানে এলে একটু অন্যরকম হয়ে যেতেন।
আইরা অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনার ভাই ছোটবেলা থেকেই এমন গম্ভীর?
রাদিফ হেসে বলল,
— প্রায়। তবে একটা সময় ছিল, যখন ভাইয়া আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। আমি হারলে কান্নাকাটি করতাম, আর ভাইয়া আমাকে আবার খেলতে বসাতেন।
— বিশ্বাস হচ্ছে না।
— কেন?
— আপনার ভাইকে দেখে মনে হয়, তিনি খেলতে বসলে জেতার জন্য মাঠের ঘাসও গুনে রাখবেন।
রাদিফ হেসে উঠল।
— ভাবী, আপনি ভাইয়াকে খুব ভালো চিনে ফেলেছেন দেখছি!
আইরা দোলনার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
— আপনারা ছোটবেলায় খুব মজা করতেন নিশ্চয়ই।
রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— করতাম। তখন সবাই একসঙ্গে থাকতাম। মা, বাবা, ভাইয়া, আমি—সবাই। এখনো সবাই আছি, কিন্তু দায়িত্ব বেড়ে গেছে। আগের মতো সময় পাওয়া যায় না।
আইরা কথাটা শুনে চুপ করে গেল।
তার নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ে গেল। একসময় সেও পরিবারের সঙ্গে কত সময় কাটাত! অথচ এখন সেই বাড়িতে ফোন করতেও তার বুকের ভেতর অস্বস্তি হয়।
রাদিফ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল।
— ভাবী, মন খারাপ করলেন?
আইরা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— না তো।
— আপনি মিথ্যা বললে চোখের দিকে তাকান না।
আইরা এবার তার দিকে তাকাল।
— আপনি এত কিছু বোঝেন কখন থেকে?
— আমি অনেক কিছু বুঝি। শুধু সবসময় প্রকাশ করি না।
আইরা একটু হেসে বলল,
— আপনার মধ্যে তাহলে বুদ্ধিও আছে!
— ভাবী!
— কী?
— আজকে আপনাকে নিয়ে এসে মনে হচ্ছে ভুল করেছি।
— কেন?
— আপনি আমাকে একটুও সম্মান করছেন না।
আইরা হেসে উঠল।
বাগানের এক পাশে একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চ ছিল। দুজন সেখানে বসে কিছুক্ষণ গল্প করল। রাদিফ ছোটবেলার নানা ঘটনা বলতে লাগল। কোনোটা শুনে আইরা হাসছে, কোনোটা শুনে অবাক হচ্ছে।
একপর্যায়ে রাদিফ বলল,
— জানেন ভাবী, একবার আমি ভাইয়ার একটা দামি ঘড়ি লুকিয়ে রেখেছিলাম।
আইরা চোখ বড় করল।
— কেন?
— মজা করার জন্য। কিন্তু ভাইয়া সেটা খুঁজে না পেয়ে এমন রেগে গিয়েছিলেন যে আমি তিন দিন তার সামনে যাইনি।
আইরা হেসে বলল,
— তারপর?
— চতুর্থ দিন নিজেই ঘড়িটা ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়া আমাকে ধরে ফেলেছিলেন।
— তারপর নিশ্চয়ই খুব বকেছিলেন?
— বকা? উনি আমাকে এমন একটা লেকচার দিয়েছিলেন, মনে হয়েছিল আমি ঘড়ি চুরি করে বিদেশে বিক্রি করে দিয়েছি।
আইরা হেসে কুটিকুটি।
— আপনার ভাইয়ের রাগের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সত্যিই কঠিন।
রাদিফও হাসল।
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে রুশোর নাম।
রাদিফ কল রিসিভ করল।
— জি, ভাইয়া।
— কোথায় আছ?
— পুরোনো বাড়িতে।
— কতক্ষণ থাকবে?
— আর কিছুক্ষণ। তারপর ফিরব।
— ঠিক আছে। ফিরেই আমার সঙ্গে দেখা করবে।
রাদিফের মুখের হাসি একটু কমে গেল।
— কোনো সমস্যা হয়েছে?
— ফোনে কথা বলার বিষয় না। ফিরে এসো।
কল কেটে গেল।
আইরা তার মুখের দিকে তাকাল।
— কী হয়েছে?
রাদিফ ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
— কিছু না। ভাইয়া ফিরতে বলেছেন।
— আপনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
— ভাবী, সবসময় কি হাসিখুশি থাকতে হবে?
আইরা একটু চুপ করে রইল। তারপর মাথা নাড়ল।
— না। তবে কিছু হলে বলতে পারেন।
রাদিফ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— সময় হলে বলব।
দুপুরে বাড়িতে ফিরে আইরা নিজের ঘরে গেল। রাদিফ সরাসরি রুশোর ঘরের দিকে চলে গেল।
রুশো তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। রাদিফ ঢুকতেই সে কল শেষ করে বলল,
— বসো।
রাদিফ বসে পড়ল।
রুশো টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে তার সামনে রাখল।
— এটা দেখো।
রাদিফ কাগজটা হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।
— এই তথ্যটা কোথা থেকে পেলেন?
— আমাদের লোক দিয়েছে। এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না।
রাদিফ আবার কাগজটা দেখল।
— তাহলে আগের সন্দেহটা সত্যি হতে পারে।
রুশো গম্ভীর গলায় বলল,
— হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে কাউকে সন্দেহ করব না।
— বুঝেছি।
— আরেকটা কথা। এই বিষয়টা আপাতত বাড়ির কারও সঙ্গে আলোচনা করবে না।
রাদিফ মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি আজ আইরাকে নিয়ে বাইরে গিয়েছিলে?
— হ্যাঁ।
— কোথায় গিয়েছিলে?
— পুরোনো বাড়িতে।
— যাওয়ার আগে আমাকে জানাতে পারতে।
রাদিফ এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— ভাইয়া, আমি তো আপনাকে বলেই গিয়েছিলাম।
রুশো কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
— ঠিক আছে। পরেরবার কোথাও গেলে ড্রাইভারকে সঙ্গে রাখবে।
— ছিল তো।
— ভালো।
রাদিফ উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— ভাইয়া, একটা কথা বলব?
— বলো।
— ভাবীকে একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করতে পারেন। মেয়েটা সারাক্ষণ আপনার রাগের মুখোমুখি হয়।
রুশো ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— তুমি এখন আমাকে শেখাবে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে?
রাদিফ শান্ত গলায় বলল,
— না। শুধু বললাম।
রুশো আর উত্তর দিল না।
রাদিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রুশো কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের কাজে মন দিল।
সন্ধ্যা।
আইরা বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ রুশো এসে দাঁড়াল।
— কী পড়ছ?
আইরা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— বই।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। কী বই?
আইরা এবার বইয়ের মলাটটা দেখাল।
— উপন্যাস।
রুশো পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।
— আজ কোথায় গিয়েছিলে?
— রাদিফের সঙ্গে পুরোনো বাড়িতে।
— ভালো লেগেছে?
আইরা একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— হ্যাঁ। জায়গাটা সুন্দর।
রুশো মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা।
আইরা আবার বইয়ে মন দিল। কিন্তু রুশো তখনো বসে আছে দেখে বলল,
— কিছু বলবেন?
— না।
— তাহলে এখানে বসে আছেন কেন?
রুশো তার দিকে তাকাল।
— বসতে হলে কি তোমার অনুমতি নিতে হবে?
আইরা মুচকি হাসল।
— না। তবে আপনি তো সাধারণত আমার আশপাশে বসতে পছন্দ করেন না।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— সবসময় তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে বসি না।
আইরা হালকা হেসে বলল,
— সেটা তো আমি জানি। আপনি ঝগড়া করতে না বসলেও ঝগড়া হয়ে যায়।
রুশোর ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। হাসি বলা যায় কি না, বোঝা গেল না।
সে উঠে দাঁড়াল।
— রাতের খাবারের সময় নিচে এসো।
আইরা বই বন্ধ করে বলল,
— আচ্ছা।
রুশো চলে যাওয়ার পর আইরা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ লোকটা অকারণে ঝগড়া করল না কেন?
তারপর নিজেই নিজের চিন্তায় হেসে ফেলল।
হয়তো আজ রাগ করার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পায়নি!
রাতের খাবারের টেবিলে আজ সবাই উপস্থিত।
রাদিফ আবার নিজের স্বাভাবিক মেজাজে ফিরে এসেছে। সে মায়ের সঙ্গে গল্প করছে, বাবাকে নানা প্রশ্ন করছে। আইরা তার কথায় মাঝেমধ্যে হাসছে।
হঠাৎ রাদিফ বলল,
— মা, ভাবী আজ আমাদের পুরোনো বাড়ি দেখে খুব খুশি হয়েছেন।
মা হাসলেন।
— তাই নাকি? ভালো লাগলে আবার নিয়ে যাস।
আইরা বলল,
— জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। বিশেষ করে বাগানটা।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তাহলে পরেরবার আপনাকে আরও একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
রুশো খাবার থামিয়ে বলল,
— রাদিফ, খাওয়ার সময় একটু চুপ থাকতে পারো?
রাদিফ মুখ বন্ধ করল।
কয়েক সেকেন্ড পর সে খুব শান্তভাবে বলল,
— জি, ভাইয়া।
আইরা মুখ নিচু করে হাসল।
রুশো সেটা লক্ষ করলেও কিছু বলল না।
খাবার শেষে সবাই যখন উঠে যাচ্ছিল, রুশোর মা আইরাকে ডাকলেন।
— মা, একটু আমার ঘরে আসবে?
আইরা কাছে গিয়ে বলল,
— জি, বলুন।
— তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
আইরা মাথা নাড়ল।
মায়ের ঘরে যাওয়ার আগে সে একবার পেছনে তাকাল। রুশো তখন বাবার সঙ্গে কথা বলছে। তাদের আলোচনার বিষয়টা সে বুঝতে পারল না।
তবে একটা ব্যাপার বুঝল—এই বাড়িতে যতই হাসি-ঠাট্টা থাকুক, রুশো আর রাদিফের জীবনের এমন কিছু দিক আছে, যেগুলো এখনো তার অজানা।
আর সেই অজানা দিকগুলোই হয়তো একদিন তার জীবনকেও বদলে দেবে।
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,
১২তম পর্বটি কেমন লাগল? রুশো, আইরা ও রাদিফের সম্পর্কের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আপনাদের ভালো লাগছে কি না, জানাবেন। গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন এবং সুন্দর মন্তব্য করবেন। আপনাদের মন্তব্যই লেখার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ❤️