তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ১৭
সকাল।
জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকেছে। আইরা ঘুম থেকে উঠে দেখল, রুশো বিছানায় নেই। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না।
সে বিছানা থেকে নেমে ঘরের চারপাশে তাকাল। টেবিলের ওপর রুশোর ফোন পড়ে আছে, পাশে কয়েকটা কাগজ। কৌতূহলবশত কাগজগুলোর দিকে তাকালেও সেগুলোতে কী লেখা আছে, তা পড়ার চেষ্টা করল না।
ঠিক তখন রুশো ঘরে ঢুকল।
— কী দেখছ?
আইরা ঘুরে তাকাল।
— কিছু না। আপনি কোথায় ছিলেন?
— নিচে।
— এত সকালে?
রুশো ঘড়ির দিকে তাকাল।
— সকাল তো হয়েছেই।
আইরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আপনার সঙ্গে কথা বলাই ভুল। সব কথার উত্তর এমনভাবে দেন, যেন আমি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি।
রুশো আলমারি খুলতে খুলতে বলল,
— তাহলে অকারণে প্রশ্ন করা বন্ধ করো।
— প্রশ্ন করার আগে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে নাকি?
রুশো শার্ট বের করে বলল,
— আইরা, সকাল সকাল ঝগড়া করার ইচ্ছা নেই।
আইরা বিছানার চাদর ঠিক করতে করতে বলল,
— আমারও নেই। কিন্তু আপনি এমনভাবে কথা বলেন যে ঝগড়া না করে থাকা যায় না।
রুশো আর উত্তর দিল না।
নাশতার টেবিলে আজ সবাই একসঙ্গে বসেছে।
রুশোর বাবা চায়ের কাপ হাতে বসে আছেন। মা খাবার পরিবেশন করছেন। রাদিফ নিজের প্লেটে খাবার নিতে নিতে আইরাকে বলল,
— ভাবী, আজকে একটা পরিকল্পনা আছে।
আইরা সন্দেহের চোখে তাকাল।
— আপনার পরিকল্পনা শুনলেই আমার ভয় লাগে।
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আজ বিকেলে আমরা সবাই মিলে বাইরে যাব।
মা বললেন,
— কোথায় যাবি?
— কোথাও একটা। অনেক দিন তো সবাই একসঙ্গে বের হইনি।
রুশোর বাবা হেসে বললেন,
— মন্দ বলিসনি। রুশো, তোর সময় হবে?
রুশো কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
— বিকেলে একটা কাজ আছে।
রাদিফ মুখ ভার করে বলল,
— আপনার কোনো কাজ শেষ হয় না?
রুশো তার দিকে তাকাল।
— তোমার কাজের মতো সব কাজ ফেলে রাখা যায় না।
— আমি কি কাজ ফেলে রাখি?
আইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— হ্যাঁ, আপনি শুধু ভাবেন। কাজটা আর করা হয় না।
রাদিফ অবাক হয়ে আইরার দিকে তাকাল।
— ভাবী, আপনি আমার বিরুদ্ধে চলে গেলেন?
— সত্য কথা বললাম।
মা হেসে উঠলেন।
রুশো কফির কাপ নামিয়ে বলল,
— তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে বাড়িতে শান্তি থাকে না।
রাদিফ হেসে বলল,
— শান্তি বেশি থাকলেও তো আবার আপনার ভালো লাগে না, ভাইয়া।
— রাদিফ!
— আচ্ছা, আর বলছি না।
সকাল সাড়ে দশটা।
অফিসে পৌঁছে রুশো সরাসরি নিজের কক্ষে গেল। রাদিফও কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হলো।
তার হাতে একটি খাম।
রুশো খামটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এটা কী?
— গত রাতের বার্তার নম্বরটা নিয়ে কিছু তথ্য পেয়েছি।
রুশো খাম খুলে কাগজগুলো বের করল।
— বলো।
রাদিফ চেয়ারে বসে বলল,
— নম্বরটা খুব বেশি দিন ব্যবহার করা হয়নি। তবে যেখান থেকে বার্তাটা পাঠানো হয়েছে, সেটা আমাদের পরিচিত একটা এলাকার কাছাকাছি।
রুশো কাগজের ওপর চোখ রেখে বলল,
— পরিচিত এলাকা বলতে?
— পুরোনো গুদামের আশপাশ।
রুশো এবার মুখ তুলে তাকাল।
— ওই জায়গাটা তো অনেক দিন বন্ধ।
— হ্যাঁ। কিন্তু কিছুদিন আগে সেখানে কয়েকজনকে দেখা গেছে।
রুশো কাগজটা টেবিলে রাখল।
— কারা?
— এখনো নিশ্চিত নই। একজন কর্মী দূর থেকে কয়েকজনকে দেখেছে। তবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি।
রুশো কিছুক্ষণ ভাবল।
— গুদামের পুরোনো কাগজপত্র বের করো। জায়গাটা কার নামে আছে, শেষ কবে ব্যবহার হয়েছে, সব জানতে চাই।
রাদিফ বলল,
— ঠিক আছে।
রুশো আবার বলল,
— আর কাউকে একা সেখানে পাঠাবে না। আগে সব তথ্য যাচাই করো।
রাদিফ মাথা নাড়ল।
— বুঝেছি।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর রাদিফ বলল,
— ভাইয়া, একটা কথা। এই বিষয়টা যদি সত্যিই পুরোনো বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হবে।
রুশো জানালার বাইরে তাকাল।
— আমি ভাবছি।
— মা-বাবাকে কিছু বলবেন?
— এখনই না। অকারণে তাদের চিন্তায় ফেলতে চাই না।
রাদিফ আর কিছু বলল না।
দুপুর।
আইরা রান্নাঘরে রুশোর মায়ের সঙ্গে ছিল। মা রান্না করতে করতে বললেন,
— মা, আজকে রুশোর পছন্দের খাবারটা বানাব ভাবছি।
আইরা বলল,
— কী পছন্দ করে?
— মাংসের ঝোল আর গরম ভাত। ছোটবেলা থেকেই খুব পছন্দ।
আইরা অবাক হয়ে বলল,
— এত গম্ভীর মানুষও ছোটবেলায় খাবারের জন্য বায়না করত?
মা হেসে ফেললেন।
— করত তো! তবে রাদিফের মতো দুষ্টু ছিল না।
ঠিক তখন রাদিফ রান্নাঘরে ঢুকল।
— মা, আমার নামে আবার কী অভিযোগ হচ্ছে?
আইরা বলল,
— আপনার নামে অভিযোগ করার জন্য আলাদা সময় লাগে না।
রাদিফ একটা আপেল হাতে নিয়ে বলল,
— ভাবী, আপনার কথার জবাব দেওয়ার জন্য আমাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
আইরা হেসে বলল,
— আগে আপেলটা ধুয়ে খান। রান্নাঘরের সবকিছুতে হাত দেবেন না।
রাদিফ আপেলটা হাতে নিয়ে বলল,
— এই বাড়িতে আমার স্বাধীনতা বলে কিছু নেই।
মা হেসে বললেন,
— বেশি কথা না বলে খাবার টেবিলে যা।
রাদিফ বেরিয়ে গেল।
আইরা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সবজি কাটতে লাগল।
মা হঠাৎ বললেন,
— রুশোকে বুঝতে একটু সময় লাগবে, মা। ও ছোটবেলা থেকেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না।
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমি তো ওকে বুঝতে পারছি না, মা। কখনো মনে হয় উনি আমাকে একদম সহ্য করতে পারেন না, আবার কখনো এমন কথা বলেন, যাতে মনে হয় আমার কষ্টটাও বোঝেন।
মা মৃদু হেসে বললেন,
— মানুষ সবসময় একরকম হয় না। সময় দাও।
আইরা আর কিছু বলল না।
বিকেল পাঁচটা।
রুশো বাড়ি ফিরেছে। বসার ঘরে বসে বাবার সঙ্গে কথা বলছিল। আইরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে বলল,
— আপনি ফিরেছেন?
রুশো তাকাল।
— হ্যাঁ।
— আজকে কি বাইরে যাবেন?
রুশো একটু অবাক হলো।
— কেন?
— রাদিফ বলেছিল সবাই মিলে বাইরে যাবে।
রুশো বাবার দিকে তাকালেন। বাবা হেসে বললেন,
— তোর ভাই তো সকাল থেকেই সবাইকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আজকে আমার কাজ আছে। তোমরা যাও।
আইরা মুখ নামিয়ে বলল,
— আচ্ছা।
কথাটা বলে সে মায়ের কাছে চলে গেল।
রুশো কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাবা সেটা লক্ষ করে বললেন,
— কী হলো? যেতে পারবি না?
— কাজ আছে, বাবা।
— কাজ তো থাকবেই। সবসময় কাজের পেছনে ছুটলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হয় না।
রুশো কোনো উত্তর দিল না।
সন্ধ্যা।
রাদিফ শেষ পর্যন্ত মা, বাবা আর আইরাকে নিয়ে বাইরে গেল। যাওয়ার আগে আইরা রুশোর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমরা যাচ্ছি।
রুশো ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— সাবধানে যেও।
আইরা একটু থেমে বলল,
— আপনি খাবেন তো?
— হ্যাঁ।
— তাহলে আপনার জন্য খাবার রেখে যাব।
রুশো এবার তার দিকে তাকাল।
— দরকার নেই। তুমি ঘুরে এসো।
আইরা মাথা নেড়ে চলে গেল।
রুশো আবার ল্যাপটপের দিকে তাকাল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই তার মনোযোগ সরে গেল।
রাত আটটা।
রাদিফ গাড়ি চালাচ্ছে। পাশে আইরা বসে। পেছনে মা-বাবা।
ফেরার পথে আইরা বলল,
— রাদিফ ভাই, আজকে কিন্তু ভালো ঘোরালেন।
রাদিফ গর্বিত গলায় বলল,
— ধন্যবাদ। আমার পরিকল্পনা কখনো খারাপ হয় না।
আইরা বলল,
— আপনার পরিকল্পনায় আজকে তিনবার রাস্তা ভুল হয়েছে।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— সেটা ছিল নতুন রাস্তা আবিষ্কারের চেষ্টা।
পেছন থেকে রুশোর বাবা হেসে উঠলেন।
মা বললেন,
— তোরা দুজন না থাকলে আমাদের বাড়ি একদম চুপচাপ হয়ে যেত।
আইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
রাত সাড়ে আটটা।
বাড়িতে ফিরে আইরা দেখল, রুশো বসার ঘরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
— আমি বলেছি, বিষয়টা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। আর গুদামের আশপাশে অযথা কেউ যাবে না।
ফোন কেটে সে ঘুরতেই আইরাকে দেখতে পেল।
আইরা জিজ্ঞেস করল,
— আপনি কি আবার অফিসের কাজ করছেন?
রুশো বলল,
— হ্যাঁ।
— আপনার কি কখনো বিশ্রাম নিতে ইচ্ছা করে না?
— কাজ শেষ হলে নেব।
আইরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার কাজ কোনো দিন শেষ হবে বলে মনে হয় না।
রুশো তার দিকে তাকাল।
— তুমি কি কিছু বলতে চাও?
আইরা মাথা নাড়ল।
— না। শুধু বলছিলাম, সারাক্ষণ কাজ করলে মানুষ একসময় নিজের মানুষদের সময় দিতে ভুলে যায়।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আইরা চলে যেতে উদ্যত হলে সে বলল,
— আজকে ঘুরতে ভালো লেগেছে?
আইরা থেমে তাকাল।
— জি। খুব ভালো।
— ভালো।
আইরা একটু হেসে বলল,
— আপনি গেলে আরও ভালো লাগত।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে রইল। আইরা আর কিছু না বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রাত এগারোটা।
রুশো নিজের ঘরে বসে ছিল। রাদিফ ফোন করল।
— ভাইয়া, গুদামের বিষয়ে আরও একটা তথ্য পেয়েছি।
— বলো।
— জায়গাটার পুরোনো দায়িত্বে যে লোকটা ছিল, সে কয়েক দিন আগে শহরে ফিরেছে।
রুশো চুপ করে গেল।
— তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?
— না। তবে সে আমাদের অফিসের একজন পুরোনো কর্মীর সঙ্গে দেখা করেছে।
রুশোর কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— নামটা আমাকে পাঠাও।
— পাঠাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটি নাম এল।
রুশো নামটা দেখে স্থির হয়ে গেল। লোকটিকে সে চেনে। বহু বছর আগে একটি বড় ঘটনার পর থেকেই লোকটি তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।
রুশো আবার ফোন করল।
— রাদিফ, কাল সকালে আমার সঙ্গে দেখা করবে। আর এই তথ্যটা আপাতত আমাদের মধ্যেই থাকবে।
— ঠিক আছে।
কল কেটে রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
ঘরের অন্য পাশে আইরা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই বাড়ির মানুষগুলোকে সে এতদিন নিজের নিরাপত্তার মধ্যে রেখেছে। কিন্তু যদি বিপদটা সত্যিই তাদের খুব কাছাকাছি এসে থাকে?
সে আর দেরি করল না। ফোন হাতে নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠিয়ে দিল।
তবে এবার তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—
যে মানুষটা এত বছর পর ফিরে এসেছে, সে কি শুধু পুরোনো হিসাব মেটাতে এসেছে, নাকি তার ফিরে আসার পেছনে আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য আছে?
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,
১৭তম পর্বটি কেমন লাগল? বহু বছর পর ফিরে আসা সেই মানুষটি কে হতে পারে বলে আপনাদের মনে হচ্ছে? রুশোর জীবনে কি নতুন কোনো বিপদ আসতে চলেছে?
গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন এবং সুন্দর মন্তব্য করে পাশে থাকবেন। আপনাদের প্রতিটি মন্তব্যই আমাকে লিখতে উৎসাহ দেয়। ❤️