তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ১৮
সকাল সাড়ে সাতটা।
রুশো ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিল। গত রাতে রাদিফ যে নামটি পাঠিয়েছিল, সেটি এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে।
আরমান কবির।
একসময় তাদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল লোকটি। কয়েক বছর আগে একটি বড় ধরনের আর্থিক বিরোধের পর হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে চলে যায়। এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রুশো জানে, আরমানকে বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ নেই। তবে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শত্রু ভাবার অভ্যাস তার নেই।
ঠিক তখন আইরা ঘুম থেকে উঠে বলল,
— আপনি সকাল সকাল ফোন নিয়ে বসে আছেন কেন?
রুশো ফোনটা নামিয়ে রাখল।
— কাজ আছে।
আইরা চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
— আপনার জীবনে কাজ ছাড়া আর কিছু নেই?
— আছে।
— কী?
রুশো তার দিকে তাকাল।
— তুমি।
আইরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমার সঙ্গে মজা করছেন?
রুশো নির্বিকার গলায় বলল,
— না।
আইরা মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
— আপনার সঙ্গে কথা বলাই বৃথা।
রুশো শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মৃদু স্বরে বলল,
— সেটা তো তুমি প্রতিদিনই বলো।
আইরা এবার তার দিকে তাকাল। রুশোর মুখে কোনো হাসি নেই। কিন্তু কথাটা শুনে তার নিজের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
সকাল নয়টা।
রুশো অফিসে পৌঁছাতেই রাদিফ তার কক্ষে ঢুকল। হাতে কয়েকটি কাগজ।
— ভাইয়া, আরমান কবিরের বিষয়ে কিছু তথ্য পেয়েছি।
রুশো বসতে বসতে বলল,
— বলো।
রাদিফ ফাইল খুলে বলল,
— লোকটা প্রায় চার বছর আগে শহর ছেড়েছিল। এরপর অন্য একটি শহরে ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু গত দুই মাস ধরে আবার এখানে আসা-যাওয়া করছে।
— আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে?
— সরাসরি না। তবে আমাদের পুরোনো কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে।
রুশো কাগজগুলো দেখতে লাগল।
— কেন?
— সেটা এখনো জানা যায়নি।
রুশো একটা কাগজ আলাদা করে রাখল।
— এই লোকটা কি জানে, আমাদের কাছে পুরোনো চুক্তির সব কাগজ আছে?
রাদিফ বলল,
— সম্ভবত জানে।
— তাহলে সে হয়তো সেই চুক্তির কোনো অংশ ফিরে পেতে চাইছে।
রাদিফ একটু ভেবে বলল,
— কিন্তু শুধু চুক্তির জন্য এত বছর পর ফিরে আসবে?
রুশো তাকাল।
— সেটাই জানতে হবে।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
রাদিফ এবার বলল,
— ভাইয়া, একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।
— কী?
— আমাদের পুরোনো কর্মীদের মধ্যে কেউ যদি তাকে সাহায্য করে থাকে, তাহলে আমাদের অনেক ভেতরের তথ্য তার কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
রুশো ফাইল বন্ধ করল।
— তাই কাউকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। তুমি নিজের মতো করে খোঁজ নাও। তবে কোনো তাড়াহুড়ো করবে না।
— ঠিক আছে।
দুপুর বারোটা।
বাড়িতে আইরা রুশোর মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করছিল। মা পুরোনো দিনের কথা বলছিলেন।
— জানো মা, রুশো ছোটবেলায় খুব জেদি ছিল।
আইরা হেসে বলল,
— এখনো তো কম না।
মা হেসে উঠলেন।
— এখনকার জেদ আর তখনকার জেদ এক নয়। ছোটবেলায় কোনো খেলনা পছন্দ হলে সেটা না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হতো না।
আইরা অবাক হয়ে বলল,
— সত্যি?
— হ্যাঁ। আর রাদিফ ছিল একেবারে উল্টো। যা পেত, তা নিয়েই খেলতে শুরু করত।
ঠিক তখন রাদিফ ঘরে ঢুকল।
— মা, আমার ছোটবেলার বদনাম আবার শুরু হয়েছে?
আইরা বলল,
— আপনার বদনাম করতে তো বেশি কিছু লাগে না।
রাদিফ সোফায় বসে বলল,
— ভাবী, আপনি আমাকে একদম সম্মান করেন না।
— আপনি কি সম্মান পাওয়ার মতো কাজ করেন?
— করি তো! আজ সকালে ভাইয়ার অফিসে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করেছি।
আইরা আগ্রহ নিয়ে বলল,
— কী কাজ?
রাদিফ গর্ব করে বলল,
— ভাইয়াকে নাশতা খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছি।
আইরা হেসে ফেলল।
— বাহ! খুব বড় দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাদিফ মাথা নেড়ে বলল,
— একদম। আমার মতো ভাই পেয়ে ভাইয়া ভাগ্যবান।
মা দুজনের হাসাহাসি দেখে বললেন,
— তোরা এবার একটু শান্ত হ। আমার মাথা ধরে যাচ্ছে।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
— ঠিক আছে মা। আমি যাচ্ছি।
আইরা বলল,
— কোথায়?
— আপনার জন্য শান্তি কিনতে।
আইরা কুশন ছুড়ে মারল। রাদিফ হাসতে হাসতে সরে গেল।
বিকেল চারটা।
রুশো বাড়িতে ফিরল। আজ তার মুখটা অন্য দিনের তুলনায় বেশি গম্ভীর।
বসার ঘরে বাবা বসে ছিলেন। ছেলেকে দেখে বললেন,
— কী রে, শরীর খারাপ?
— না, বাবা।
— মুখটা এমন কেন?
রুশো পাশে বসে বলল,
— অফিসের কিছু সমস্যা চলছে।
বাবা পত্রিকাটা নামিয়ে রাখলেন।
— ব্যবসায় সমস্যা থাকতেই পারে। তবে নিজের শরীর আর পরিবারের দিকে খেয়াল রাখিস।
রুশো মাথা নাড়ল।
ঠিক তখন আইরা হাতে এক কাপ চা নিয়ে সেখানে এল।
— আপনার চা।
রুশো কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
— ধন্যবাদ।
আইরা একটু অবাক হলো। আজকাল রুশো তাকে ধন্যবাদ বলছে, খোঁজ নিচ্ছে। ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো তার চোখ এড়াচ্ছে না।
বাবা মুচকি হেসে বললেন,
— আইরা, তুই কি আজকাল রুশোর জন্য চা বানাস?
আইরা বলল,
— মাঝে মাঝে।
রুশো চায়ে চুমুক দিল।
বাবা মজা করে বললেন,
— ভালো। ছেলেটাকে একটু মানুষের মতো দেখাশোনা করিস।
আইরা হেসে বলল,
— চেষ্টা করছি, বাবা। কিন্তু উনি তো কারও কথা শুনতেই চান না।
রুশো কাপ নামিয়ে বলল,
— তোমরা দুজন মিলে আমার বিরুদ্ধে কথা বলছ?
আইরা বলল,
— সত্যি কথা বললে সেটা বিরুদ্ধে কথা হয় না।
বাবা হেসে উঠলেন।
সন্ধ্যা ছয়টা।
রাদিফ নিজের ঘরে বসে ফোনে কথা বলছিল।
— তুমি নিশ্চিত, আরমান আজ এখানে এসেছিল?
ওপাশ থেকে উত্তর এল।
রাদিফের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— কার সঙ্গে দেখা করেছে?
কিছুক্ষণ চুপ করে শুনে সে বলল,
— ঠিক আছে। আর কোনো খোঁজ পেলে আমাকে জানাবে।
ফোন কেটে সে কিছুক্ষণ বসে রইল।
তারপর রুশোকে কল করল।
— ভাইয়া, আরমান আজ শহরে এসেছে।
রুশো বলল,
— কোথায়?
— পুরোনো অফিস এলাকার কাছে। একজনের সঙ্গে দেখা করেছে।
— লোকটাকে চেনো?
— না। তবে তার ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করছি।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
— সাবধানে থেকো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করবে না।
— বুঝেছি।
কল কেটে রাদিফ জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে হচ্ছিল, এতদিনের নীরবতার পর ঘটনাগুলো খুব দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।
রাত আটটা।
ডাইনিং টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। রুশো আজ সময়মতো বাড়ি ফিরেছে দেখে মা বেশ খুশি।
রাদিফ খাবার নিতে নিতে বলল,
— ভাইয়া, আজকে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে অফিসে কোনো ঝামেলা হয়নি।
রুশো বলল,
— খাওয়ার সময় অফিসের কথা বলবে না।
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করল।
আইরা পাশে বসে মৃদু হেসে বলল,
— আজকে আপনাকে ধমক খেতে হলো কেন?
রাদিফ ফিসফিস করে বলল,
— ভাবী, এটা আমার প্রতিদিনের জীবন।
রুশো শুনে ফেলল।
— রাদিফ, কী বলছ?
— বলছি, আপনার মতো ভাই পেয়ে আমি ধন্য।
রুশো মাথা নাড়ল।
— নাটক কম করো।
মা হেসে বললেন,
— তোরা দুজন খাবার খা।
রাত দশটা।
আইরা ঘরে এসে দেখল রুশো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
— লোকটার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করো। তবে আমার অনুমতি ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
ফোন কেটে সে ঘুরে দাঁড়াল।
আইরা জিজ্ঞেস করল,
— আবার কাজ?
— হ্যাঁ।
— আপনি কি কখনো আমাকে আপনার কাজের কথা বলবেন?
রুশো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— সব কথা তোমাকে বলা সম্ভব নয়।
আইরা একটু চুপ করে থেকে বলল,
— আমি সব জানতে চাইছি না। শুধু বুঝতে চাই, আপনার এত চিন্তার কারণ কী।
রুশো তার দিকে এগিয়ে এল।
— কিছু পুরোনো বিষয় সামনে আসছে। সেগুলো সামলাতে হবে।
— আপনি কি বিপদে আছেন?
প্রশ্নটা শুনে রুশো থেমে গেল।
— কেন এমন মনে হচ্ছে?
আইরা বলল,
— আপনার আচরণ বদলে গেছে। রাদিফ ভাইও আগের মতো সবসময় হাসিঠাট্টা করছেন না। বাড়িতে কিছু একটা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি।
রুশো কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— তোমাকে এখনই সব জানাতে পারব না। তবে একটা কথা মনে রেখো, তোমার কোনো দোষ নেই। এসবের জন্য নিজেকে দায়ী ভাববে না।
আইরা ধীরে মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে।
তারপর একটু থেমে বলল,
— কিন্তু একটা কথা বলি?
— বলো।
— সবকিছু একা সামলানোর চেষ্টা করবেন না। আপনার পরিবার আছে।
রুশো তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আইরা বিছানার দিকে চলে গেল।
রুশো কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। মেয়েটা তাকে খুব একটা পছন্দ করে না, কথায় কথায় ঝগড়া করে। তবু আজ তার কথাগুলো রুশোর মনে অদ্ভুতভাবে থেকে গেল।
রাত এগারোটা।
রুশোর ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
সে কল রিসিভ করল।
— হ্যালো।
ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,
— অনেক দিন পর কথা হচ্ছে, রুশো।
রুশোর চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
— কে বলছেন?
লোকটি হালকা হেসে বলল,
— নামটা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি। আরমান কবির।
রুশো কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল।
তারপর বলল,
— এত বছর পর মনে পড়ল?
— কিছু হিসাব কখনো পুরোনো হয় না।
— কী চাও?
— দেখা করতে চাই। কিছু কথা আছে।
রুশো ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমার সঙ্গে দেখা করতে হলে কারণ জানাতে হবে।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— কারণটা তোমার জানার দরকার আছে। তবে একটা কথা মনে রেখো, অতীতের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।
রুশো বলল,
— কোথায় দেখা করবে?
লোকটি একটি জায়গার নাম বলল।
— কাল বিকেল। একা এসো।
রুশো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— শর্ত দেওয়ার অধিকার তোমার নেই।
লোকটি হেসে কল কেটে দিল।
রুশো ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পর সে রাদিফকে কল করল।
— কাল বিকেলে আরমানের সঙ্গে দেখা হবে।
রাদিফ অবাক হয়ে বলল,
— সে নিজে ফোন করেছে?
— হ্যাঁ।
— আপনি একা যাবেন না, ভাইয়া।
রুশো বলল,
— সেটা আমি ঠিক করব। তবে তুমি প্রস্তুত থাকবে।
কল কেটে রুশো ধীরে জানালার দিকে তাকাল।
অন্যদিকে ঘুমন্ত আইরার দিকে একবার চোখ পড়ল তার।
সে জানে না, এই দেখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—পুরোনো হিসাব এবার সত্যিই সামনে আসতে চলেছে।
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,
১৮তম পর্বটি কেমন লাগল? অবশেষে আরমান কবির নিজেই রুশোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আপনাদের কী মনে হয়, আরমান কি সত্যিই পুরোনো হিসাব মেটাতে ফিরে এসেছে, নাকি তার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?
গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন এবং সুন্দর মন্তব্য করে জানাবেন। আপনাদের মন্তব্যই আমাকে গল্পটি এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️