তুমি শুধুই আমার বউ
লেখিকা: Oyshe Chowdhury
পর্ব: ২০
সকাল আটটা।
রুশো নাশতার টেবিলে বসে আছে। সামনে খাবার থাকলেও তার মনোযোগ অন্যদিকে। গত রাত থেকে বাবার বলা কথাগুলো মাথায় ঘুরছে।
পুরোনো চুক্তি, হারিয়ে যাওয়া নথি আর আরমান কবিরের ফিরে আসা—সবকিছুর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো যোগসূত্র আছে।
আইরা পাশে বসে তার প্লেটে পরোটা তুলে দিল।
— কী ভাবছেন এত?
রুশো স্বাভাবিক গলায় বলল,
— কিছু না।
আইরা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার এই ‘কিছু না’ শুনতে শুনতে আমার কান পচে গেছে।
রাদিফ পাশ থেকে হেসে বলল,
— ভাবী, ভাইয়ার অভিধানে বেশি শব্দ নেই। ‘কিছু না’, ‘খাও’, ‘চুপ করো’—এই তিনটাই বেশি ব্যবহার করেন।
আইরা হেসে ফেলল।
রুশো চোখ তুলে তাকাল।
— তোমার নাশতা শেষ হয়েছে?
— প্রায়।
— তাহলে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নাও।
রাদিফ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— দেখলেন ভাবী? আমার সঙ্গে কথা বলার স্বাধীনতাটুকুও নেই।
আইরা বলল,
— আপনার স্বাধীনতা আছে। শুধু সেটা ব্যবহার করার সময় একটু বুদ্ধি খাটাতে হয়।
রাদিফ এবার হেসে উঠল।
রুশো কফির কাপ নামিয়ে বলল,
— তোমরা দুজন মিলে একটা আলাদা সংসার শুরু করো। সারাদিন গল্প করতে পারবে।
আইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আপনি চাইলে আমাদের জন্য আলাদা ঘরও বানিয়ে দিতে পারেন।
রাদিফ হেসে বলল,
— ভাবী, ঘরটা কিন্তু বড় হতে হবে। আমার অনেক গল্প জমা আছে।
রুশো আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।
সকাল দশটা।
রুশোর অফিসের ব্যক্তিগত কক্ষে আজ তিনজন উপস্থিত। রুশো, রাদিফ এবং তাদের পুরোনো বিশ্বস্ত কর্মী কামাল।
কামাল একটি ফাইল সামনে রেখে বলল,
— স্যার, পুরোনো নথিগুলো খুঁজে দেখেছি। কয়েকটি কাগজ পাওয়া গেছে, কিন্তু মূল চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ফাইল নেই।
রুশো প্রশ্ন করল,
— ফাইলটা শেষ কবে দেখা হয়েছিল?
কামাল কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— প্রায় চার বছর আগে। তখন আরমান কবিরের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের কাজ চলছিল।
রাদিফ জিজ্ঞেস করল,
— ফাইলটা কার দায়িত্বে ছিল?
— তখনকার হিসাব বিভাগের প্রধানের কাছে।
রুশো বলল,
— তার নাম?
কামাল নামটি জানাল।
রুশো নামটা শুনে চুপ করে গেল।
লোকটি এখনো তাদের অফিসের সঙ্গে যুক্ত।
রাদিফও বিষয়টি বুঝতে পেরে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
রুশো ধীরে বলল,
— তাকে এখনই কিছু জিজ্ঞেস করবে না। তার দায়িত্বের সব কাগজপত্র যাচাই করো। আর ফাইলটি শেষ কবে কার হাতে ছিল, সেটা বের করো।
কামাল মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রাদিফ বলল,
— ভাইয়া, লোকটা যদি সত্যিই জড়িত থাকে?
রুশো শান্ত গলায় বলল,
— তাহলে প্রমাণ পাওয়া যাবে। তার আগে কাউকে দোষী ভাবার দরকার নেই।
রাদিফ বলল,
— বুঝেছি।
রুশো এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— আর বাবার সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।
দুপুর বারোটা।
বাড়িতে আইরা নিজের ঘর গোছাচ্ছিল। এমন সময় তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
মায়ের মেসেজ।
“মা, তোর সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। তুই সময় দিলে জানাস।”
আইরা মেসেজটা পড়ে চুপ করে রইল।
কয়েক দিন আগেও সে মায়ের ফোন ধরতে চাইত না। কিন্তু আজ মেসেজটা পড়ে তার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে উত্তর লিখতে শুরু করল।
আবার মুছে দিল।
কী লিখবে বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখন রুশোর মা ঘরে এলেন।
— কী করছ মা?
আইরা ফোনটা নামিয়ে বলল,
— কিছু না, মা।
মা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মন খারাপ?
আইরা কিছুক্ষণ দ্বিধা করে ফোনটা এগিয়ে দিল।
— মা মেসেজ করেছে।
রুশোর মা মেসেজটা পড়ে মৃদু স্বরে বললেন,
— দেখা করতে ইচ্ছা করছে?
আইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— জানি না। একদিকে খুব ইচ্ছা করে, আবার অন্যদিকে মনে হয়, তাদের সামনে গেলে সব কথা মনে পড়ে যাবে।
মা তার পাশে বসে বললেন,
— কষ্টের জায়গায় ফিরে যেতে ভয় লাগতেই পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তোমার। কারও চাপে কিছু করতে হবে না।
আইরা মাথা নিচু করে বলল,
— আমি একটু সময় চাই, মা।
— যত সময় প্রয়োজন নাও।
মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
আইরা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
বিকেল তিনটা।
রুশো বাড়িতে এসে সরাসরি বাবার ঘরে গেল।
বাবা তখন চশমা পরে কিছু কাগজ দেখছিলেন।
রুশো বলল,
— বাবা, তোমার সঙ্গে আবার কথা বলতে চাই।
বাবা কাগজগুলো সরিয়ে রাখলেন।
— বল।
রুশো সামনে বসে বলল,
— আরমান যে নথির কথা বলেছে, সেটা কীসের নথি?
বাবা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর বললেন,
— চার বছর আগে আমাদের একটি বড় ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছিল। চুক্তির অংশীদারদের মধ্যে আরমানও ছিল। প্রথমদিকে সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আমরা বুঝতে পারি, হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে।
রুশো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
বাবা আবার বললেন,
— তখন আমরা চুক্তি বাতিল করি। কিন্তু বাতিলের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে একটি নথিতে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা প্রকাশ্যে এলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের নাম সামনে চলে আসত।
রুশো প্রশ্ন করল,
— কী ধরনের তথ্য?
— ব্যবসায়িক লেনদেনের পাশাপাশি কিছু অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণও ছিল।
রুশোর চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
— তুমি কি সেই নথি নিজের কাছে রেখেছিলে?
বাবা মাথা নাড়লেন।
— না। নথিটা অফিসের নিরাপদ সংরক্ষণাগারে থাকার কথা ছিল। কিন্তু চুক্তি বাতিলের পর সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রুশো বলল,
— এতদিন আমাকে জানাওনি কেন?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— তখন তুই অনেক ছোট ছিলি না, কিন্তু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলি। আমি ভেবেছিলাম বিষয়টা আর সামনে আসবে না। আর যারা ওই লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে বিরোধ বাড়াতে চাইনি।
রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— এখন আরমান ফিরে এসেছে। তার মানে সে জানে নথিটা কোথায় থাকতে পারে।
বাবা বললেন,
— অথবা সে জানে নথিটা কার কাছে আছে।
রুশো উঠে দাঁড়াল।
— আমি বিষয়টা খুঁজে বের করব।
বাবা তার হাত ধরে বললেন,
— সাবধানে থাকিস। শুধু ব্যবসার ক্ষতি হবে ভেবে এগোচ্ছিস না। কিছু মানুষ নিজেদের নাম বাঁচাতে অনেক দূর যেতে পারে।
রুশো বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
বিকেল পাঁচটা।
রাদিফ অফিস থেকে ফিরে বসার ঘরে ঢুকল।
আইরা সোফায় বসে বই পড়ছিল।
রাদিফ বলল,
— ভাবী, আজকে একটা জরুরি প্রশ্ন আছে।
আইরা বই বন্ধ করে বলল,
— কী?
— আপনি কি কখনো আমার প্রশংসা করেন?
আইরা একটু ভেবে বলল,
— করি তো।
রাদিফ উৎসাহিত হয়ে বলল,
— কী প্রশংসা?
— আপনি যখন ঘুমান, তখন বাড়িটা খুব শান্ত থাকে।
রাদিফ হতাশ মুখে বলল,
— এটা প্রশংসা হলো?
আইরা হেসে বলল,
— আমার কাছে তো এটাই সবচেয়ে বড় প্রশংসা।
রাদিফ সোফার অন্য পাশে বসে বলল,
— আচ্ছা, বাদ দেন। আজকে আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।
আইরা তাকাল।
— বলুন।
রাদিফ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— আপনার মা কি আবার ফোন করেছিলেন?
আইরা অবাক হলো।
— না। কেন?
— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। সেদিন আপনাকে মন খারাপ করতে দেখেছিলাম।
আইরা মৃদু স্বরে বলল,
— মেসেজ করেছেন। দেখা করতে চান।
রাদিফ এবার আর মজা করল না।
— আপনি কি দেখা করতে চান?
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— চাই। কিন্তু ভয়ও লাগে।
রাদিফ বলল,
— ভয় লাগলে সময় নিন। তবে একটা কথা বলি, নিজের কষ্টটা একা বয়ে বেড়াবেন না।
আইরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— আপনি মাঝে মাঝে খুব ভালো কথা বলেন।
রাদিফ আবার আগের মতো হাসল।
— মাঝে মাঝে কেন? আমি তো সবসময়ই ভালো।
আইরা বলল,
— এই যে আবার শুরু হলো!
দুজনেই হেসে উঠল।
সন্ধ্যা সাতটা।
রুশো নিজের ঘরে বসে ছিল। রাদিফ এসে দরজা বন্ধ করল।
— ভাইয়া, অফিস থেকে একটা তথ্য পেয়েছি।
— বলো।
— যে লোকটার দায়িত্বে নথিটা ছিল, সে গত চার বছরে দুবার আরমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
রুশো চুপ করে রইল।
— যোগাযোগের প্রমাণ আছে?
— কিছু পুরোনো কল রেকর্ড পাওয়া গেছে। তবে কথাবার্তার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
রুশো বলল,
— লোকটাকে নজরে রাখো। কিন্তু কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না।
রাদিফ বলল,
— আরমানের সঙ্গে আবার কথা বলবেন?
— দরকার হলে বলব। আগে জানতে হবে নথিটা কোথায়।
রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ভাইয়া, আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। আরমান হয়তো নথিটা নিজেই খুঁজছে।
রুশো বলল,
— কেন?
— কারণ নথিটা যদি তার কাছেও না থাকে, তাহলে সে এতদিন পর আমাদের কাছে আসত না। হয়তো সে জানে, নথিটা পাওয়া গেলে তার নিজেরও সমস্যা হতে পারে।
রুশো কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাত সাড়ে নয়টা।
আইরা ঘরে বসে মায়ের মেসেজের উত্তর লিখছিল।
“মা, আমি এখনো সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছি না। তবে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। একটু সময় দাও।”
মেসেজটা পাঠিয়ে সে ফোনটা পাশে রাখল।
কিছুক্ষণ পর রুশো ঘরে ঢুকল।
আইরা ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি মাকে উত্তর দিয়েছি।
রুশো শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল,
— ভালো করেছ।
আইরা অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?
— কী জিজ্ঞেস করব?
— দেখা করব কি না, কখন করব—এসব।
রুশো বলল,
— সেটা তোমার সিদ্ধান্ত। তোমার পরিবারের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক নিয়ে আমি সিদ্ধান্ত দিতে চাই না।
আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— ধন্যবাদ।
রুশো তার দিকে তাকাল।
— এত ছোট একটা কথার জন্য ধন্যবাদ দিতে হবে না।
আইরা মৃদু হেসে বলল,
— আপনার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পাওয়া তো ছোট বিষয় নয়।
রুশো ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আবার শুরু করলে?
আইরা হেসে ফেলল।
রুশোও এবার মুখের কঠোরতা কিছুটা কমিয়ে ফেলল।
রাত এগারোটা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রুশো নিজের ঘরে বসে পুরোনো নথির বিষয়ে পাওয়া তথ্যগুলো দেখছিল।
হঠাৎ তার ফোনে একটি ছবি এল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অফিসের পুরোনো সংরক্ষণাগারের সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটা বেশ পুরোনো।
রুশো ছবিটা বড় করে দেখল।
লোকটিকে চিনতে তার বেশি সময় লাগল না।
এটি সেই কর্মী, যার দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ নথিটি ছিল।
ছবির নিচে একটি ছোট বার্তা—
“নথি হারানোর আগের দিন তাকে এখানে দেখা গিয়েছিল।”
রুশো সঙ্গে সঙ্গে রাদিফকে ফোন করল।
— রাদিফ, ঘুমাচ্ছ?
ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো কণ্ঠ এল,
— না ভাইয়া। কী হয়েছে?
— একটা ছবি পাঠিয়েছি। ভালো করে দেখো।
কিছুক্ষণ পর রাদিফ বলল,
— লোকটা তো সেই পুরোনো কর্মী!
— হ্যাঁ।
— তাহলে কি সে নথি সরিয়েছে?
রুশো বলল,
— এখনো নিশ্চিত নই। কিন্তু এবার তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।
রাদিফ বলল,
— কাল সকালে আমি তার সঙ্গে কথা বলব।
রুশো উত্তর দিল,
— না। আমি নিজে কথা বলব।
কল কেটে রুশো ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঘরের অন্য পাশে ঘুমিয়ে থাকা আইরার দিকে চোখ গেল।
এই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে জরুরি হলো পরিবারের নিরাপত্তা। কিন্তু যতই সে পুরোনো রহস্যের কাছে এগোচ্ছে, ততই বুঝতে পারছে—এই ঘটনা শুধু একটি হারানো নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,
২০তম পর্বটি কেমন লাগল? পুরোনো নথি হারানোর পেছনে কি সেই কর্মীর হাত রয়েছে? নাকি সে নিজেও অন্য কারও ফাঁদে পড়েছে?
গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন এবং সুন্দর মন্তব্য করে জানাবেন। আপনাদের ভালোবাসা ও মন্তব্যই আমাকে নিয়মিত লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️