ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি শুধুই আমার বউ

পর্ব 19

লেখক: Oyshe Chowdhury

তুমি শুধুই আমার বউ

লেখিকা: Oyshe Chowdhury

পর্ব: ১৯

সকাল সাড়ে আটটা।

আইরা ঘুম থেকে উঠে দেখল, রুশো বিছানার এক পাশে বসে ফোনে কিছু দেখছে। তার মুখ বরাবরের মতোই গম্ভীর।

আইরা বালিশে হেলান দিয়ে বলল,

— আজকে কি অফিসে যাবেন?

— হ্যাঁ।

— কখন ফিরবেন?

— জানি না।

আইরা বিরক্ত হয়ে বলল,

— আপনার কাছে কোনো প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না কেন?

রুশো ফোনটা নামিয়ে তার দিকে তাকাল।

— সবকিছুর উত্তর কি আগে থেকে জানা সম্ভব?

— অন্তত একটা সময় তো বলতে পারেন।

— চেষ্টা করব তাড়াতাড়ি ফিরতে।

আইরা এবার একটু অবাক হলো। কারণ রুশো সাধারণত এমন আশ্বাস দেয় না।

সে বিছানা থেকে নেমে বলল,

— আচ্ছা, নাশতা করতে যাবেন?

— তুমি যাও। আমি আসছি।

আইরা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে আবার ফিরে তাকাল।

— আর শুনুন...

— কী?

— আজকে কিন্তু না খেয়ে অফিসে যাবেন না।

রুশো কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— ঠিক আছে।

আইরা চলে গেল।

রুশো নিজের অজান্তেই মৃদু নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটা সবসময় তার সঙ্গে তর্ক করে, অথচ ছোট ছোট বিষয়ে তার খেয়াল রাখে।

সকাল দশটা।

রুশোর অফিসে রাদিফ অপেক্ষা করছিল। আজ তার মুখে কোনো হাসিঠাট্টা নেই।

রুশো কক্ষে ঢুকতেই সে বলল,

— আরমানের সঙ্গে দেখা করার জায়গাটা আমি যাচাই করেছি।

— কী পেয়েছ?

— জায়গাটা শহরের বাইরে একটা পুরোনো রেস্টুরেন্ট। লোকজন খুব বেশি যায় না। তবে আশপাশে কয়েকটা দোকান আছে।

রুশো চেয়ার টেনে বসল।

— সে কেন ওই জায়গা বেছে নিয়েছে?

— সেটা জানি না। তবে আমার মনে হয়, দেখা করার উদ্দেশ্য শুধু কথা বলা নয়।

রুশো ফাইল খুলল।

— হতে পারে। কিন্তু আগে তার কথা শুনব।

রাদিফ বলল,

— ভাইয়া, আপনি কি সত্যিই একা যাবেন?

রুশো তার দিকে তাকাল।

— সে একা আসতে বলেছে। আমি একা যাচ্ছি, এমন কথা দিইনি।

রাদিফের মুখে সামান্য স্বস্তি ফুটল।

— ভালো।

রুশো কাগজে চোখ রেখে বলল,

— তবে মনে রেখো, কোনো তাড়াহুড়ো করবে না। আমি যা বলব, শুধু সেটাই করবে।

— ঠিক আছে।

দুপুর একটা।

বাড়িতে আইরা আর রুশোর মা একসঙ্গে রান্না করছিলেন।

মা বললেন,

— আজকে রুশোকে ফোন করে জিজ্ঞেস করিস, দুপুরে খাবে কি না।

আইরা বলল,

— উনি তো অফিসে থাকবেন। কাজের মধ্যে ফোন দিলে বিরক্ত হতে পারেন।

মা হেসে বললেন,

— তোকে বিরক্ত করে না?

আইরা একটু থেমে বলল,

— করে তো। কিন্তু আমি কি আর কম করি?

দুজনেই হেসে উঠলেন।

ঠিক তখন রাদিফ রান্নাঘরে ঢুকল।

— মা, কিছু খেতে দেবে?

মা বললেন,

— একটু পরেই খাবার তৈরি হবে।

রাদিফ আইরার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— ভাবী, আজকে কী রান্না হচ্ছে?

আইরা বলল,

— আপনার পছন্দের কিছু না।

— তাহলে আমার জন্য আলাদা কিছু বানাতে হবে।

— নিজের জন্য নিজেই বানিয়ে নিন।

রাদিফ নাটকীয়ভাবে বুকের ওপর হাত রেখে বলল,

— মা, আপনার ছেলেকে দেখুন। এই বাড়িতে আমার কোনো মূল্য নেই।

মা হেসে বললেন,

— তুই একটু চুপ করে বসতে পারিস না?

রাদিফ চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

— পারি। তবে সেটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ।

আইরা মাথা নাড়িয়ে বলল,

— আপনার স্বভাবের চিকিৎসা দরকার।

রাদিফ বলল,

— ভাবী, আপনার কথাগুলো লিখে রাখছি। একদিন বই প্রকাশ করব—‘ভাবীর অত্যাচারে দেবরের জীবন’।

আইরা হাসতে হাসতে তার দিকে একটা তোয়ালে ছুড়ে দিল।

বিকেল চারটা।

রুশো গাড়িতে বসে ছিল। তার পাশে রাদিফ। দুজনেই চুপ।

গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে রাদিফ বলল,

— ভাইয়া, আরমানের ব্যাপারে একটা কথা জেনেছি।

— কী?

— সে শুধু পুরোনো ব্যবসায়িক চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সেই সময় আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও তার কাছে ছিল।

রুশো তার দিকে তাকাল।

— কোন কাগজপত্র?

— ঠিক জানি না। তবে পুরোনো হিসাবের কয়েকটা নথি এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— আগে নিশ্চিত হতে হবে। অনুমানের ওপর কিছু করব না।

গাড়ি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাল।

রাদিফ বলল,

— আমি কাছেই থাকব।

রুশো গাড়ি থেকে নেমে বলল,

— নিজের মতো করে কোনো পদক্ষেপ নেবে না।

— বুঝেছি।

বিকেল সাড়ে চারটা।

রেস্টুরেন্টের এক কোণের টেবিলে বসে ছিল আরমান কবির।

বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মুখে আগের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি এখনো তীক্ষ্ণ।

রুশো সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আরমান উঠে দাঁড়াল।

— অনেক দিন পর, রুশো।

রুশো বসতে বসতে বলল,

— অপ্রয়োজনীয় সৌজন্য বাদ দাও। কী বলতে চাও?

আরমান মৃদু হাসল।

— তুমি আগের মতোই আছ। একটুও বদলাওনি।

— সময় নষ্ট করো না।

আরমান চেয়ার টেনে বসল।

— তোমার বাবা কেমন আছেন?

রুশোর চোখ সরু হয়ে এল।

— আমার পরিবার নিয়ে কথা বলবে না।

আরমান একটু থেমে বলল,

— ঠিক আছে। তাহলে ব্যবসার কথা বলি।

সে টেবিলের ওপর একটি পুরোনো কাগজ রাখল।

রুশো কাগজটির দিকে তাকাল। এটি কয়েক বছর আগের একটি চুক্তির অনুলিপি।

— এটা কোথায় পেলে?

আরমান বলল,

— আমার কাছেই ছিল।

— এতদিন পর এটা দেখানোর কারণ?

— কারণ, ওই চুক্তির কিছু অংশ এখনো অসম্পূর্ণ।

রুশো ঠান্ডা গলায় বলল,

— চুক্তি বাতিল হয়েছিল। সব হিসাব মিটে গেছে।

আরমান মাথা নাড়ল।

— সব হিসাব মেটেনি।

রুশো তার চোখের দিকে তাকাল।

— কী বাকি আছে?

আরমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— একটা নথি। যেটা তোমাদের কাছে থাকার কথা, কিন্তু নেই।

রুশোর মুখের ভাব বদলাল না।

— কোন নথি?

— সেটা তোমার বাবাই ভালো জানেন।

কথাটা শুনে রুশোর চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

— আমার বাবার নাম এই আলোচনায় আনবে না।

আরমান এবার একটু ঝুঁকে এল।

— তুমি যতই এড়িয়ে যাও, পুরোনো বিষয়গুলো তোমাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে।

রুশো উঠে দাঁড়াল।

— হুমকি দিতে ডেকেছ?

আরমানও উঠে দাঁড়াল।

— হুমকি নয়। সতর্ক করছি।

রুশো তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমার পরিবারকে নিয়ে আর একবার কথা বললে এই আলোচনা এখানেই শেষ হবে না।

আরমান কোনো উত্তর দিল না।

রুশো সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।

বিকেল পাঁচটা।

গাড়িতে উঠে রুশো রাদিফকে সব বলল।

রাদিফ মনোযোগ দিয়ে শুনে বলল,

— বাবার কাছে কি সত্যিই ওই নথির বিষয়ে কিছু জানা থাকতে পারে?

রুশো বলল,

— থাকতে পারে। তবে আগে বাবার সঙ্গে কথা বলব।

— আরমান কি আপনাকে নথির নাম বলেছে?

— না।

রাদিফ চিন্তিত গলায় বলল,

— তাহলে লোকটা আমাদের দিয়ে কিছু করাতে চাইছে।

রুশো জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু কী করাতে চাইছে, সেটাই জানতে হবে।

সন্ধ্যা সাতটা।

বাড়িতে ফিরে রুশো সরাসরি বাবার ঘরে গেল।

তার বাবা তখন বই পড়ছিলেন।

— বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

বাবা বই বন্ধ করে বললেন,

— বল।

রুশো দরজা বন্ধ করে সামনে বসল।

— আরমান কবিরের সঙ্গে আজ আমার দেখা হয়েছে।

বাবার মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।

— আরমান?

— হ্যাঁ। সে কয়েক বছর আগের একটা চুক্তির কথা বলেছে। বলেছে, সেই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি আমাদের কাছে থাকার কথা।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

— সে কি নথিটার নাম বলেছে?

— না।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— রুশো, ওই বিষয়টা আবার সামনে আনার দরকার নেই।

রুশো বাবার দিকে তাকাল।

— কেন?

বাবা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

— কারণ, ওই চুক্তির সঙ্গে এমন কিছু মানুষ জড়িত ছিল, যাদের সঙ্গে নতুন করে বিরোধে জড়ানো ঠিক হবে না।

রুশোর কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।

— কী হয়েছিল তখন?

বাবা চোখ নামিয়ে বললেন,

— সব কথা একদিনে বলা সম্ভব নয়। তবে একটা কথা মনে রাখিস, ওই নথি শুধু ব্যবসার কাগজ নয়।

রুশো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— তাহলে কী?

বাবা উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

— আপাতত আরমানের সঙ্গে দূরত্ব রাখিস।

রুশো বুঝল, বাবা কিছু একটা জানেন। কিন্তু সেটা এখনই বলতে চাইছেন না।

রাত সাড়ে আটটা।

আইরা ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিল। রুশো এসে বসতেই সে বলল,

— আজকে আপনার জন্য খাবার রেখে দিয়েছিলাম।

রুশো বলল,

— ধন্যবাদ।

আইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আজকে আপনার মুখটা আরও গম্ভীর লাগছে।

— এমন কিছু না।

— আপনি সবসময় এমন বলেন।

রুশো খাবার নিতে নিতে বলল,

— তোমার এত চিন্তা করার দরকার নেই।

আইরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— আমি চিন্তা করছি বলে কি আপনার সমস্যা হচ্ছে?

রুশো এবার তার দিকে তাকাল।

— না।

আইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— তাহলে অন্তত এমনভাবে কথা বলবেন না, যেন আমি আপনার বাইরের কেউ।

রুশো হাতের চামচটা নামিয়ে রাখল।

কথাটা তার মনে লাগল।

কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না।

আইরা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের খাবার খেতে লাগল।

রাত দশটা।

রুশো নিজের ঘরে বসে ছিল। রাদিফ দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকল।

— ভাইয়া, বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে?

রুশো মাথা নাড়ল।

— হয়েছে।

— কী বলেছেন?

রুশো বাবার কথাগুলো তাকে জানাল।

রাদিফ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,

— তাহলে নথিটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

— হ্যাঁ। কিন্তু বাবা কেন এত কিছু লুকাচ্ছেন, সেটা বুঝতে পারছি না।

রাদিফ বলল,

— হয়তো আমাদের নিরাপত্তার জন্যই বলছেন না।

রুশো জানালার দিকে তাকাল।

— হতে পারে। কিন্তু আরমান যদি জানে, তাহলে অন্য কেউও জানে।

রাদিফ উঠে দাঁড়াল।

— আমি পুরোনো নথির খোঁজ নিচ্ছি।

— সাবধানে।

— অবশ্যই।

রাদিফ চলে যাওয়ার পর রুশো টেবিলে বসে রইল।

ঠিক তখন আইরা ঘরে এল।

— রাদিফ ভাই চলে গেলেন?

— হ্যাঁ।

— আপনি কি আজও দেরি করে ঘুমাবেন?

রুশো তার দিকে তাকাল।

— কেন?

আইরা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— এমনিই। সারাদিন কাজ করেন, রাতে ঘুমান না। এভাবে চললে একদিন অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

রুশো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— তুমি কি আমার জন্য এত চিন্তা করো?

আইরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

— না। আমি শুধু চাই না, এই বাড়িতে আরেকটা ঝামেলা হোক।

রুশো মৃদু স্বরে বলল,

— বুঝেছি।

আইরা আলো বন্ধ করতে গিয়ে বলল,

— আর একটা কথা।

— বলো।

— আপনার বাবাকে আজ খুব চিন্তিত লাগছিল। উনার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলবেন।

রুশো এবার আর কোনো উত্তর দিল না।

কারণ সে নিজেও বুঝতে পারছে, বাবার নীরবতার আড়ালে এমন কিছু আছে, যা তাদের পরিবারের অতীতকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসতে পারে।

চলবে…

প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা,

১৯তম পর্বটি কেমন লাগল? আরমান যে নথির কথা বলেছে, সেটি আসলে কী? রুশোর বাবা কেন বিষয়টি নিয়ে এত চিন্তিত?

আপনাদের ধারণা ও মতামত সুন্দর মন্তব্যে জানাবেন। গল্পটি ভালো লাগলে লাইক করবেন। আপনাদের প্রতিটি মন্তব্যই আমাকে নতুন পর্ব লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 19 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন