#কোনো_এক_শ্রাবণে
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
(১৮)
রেস্টুরেন্টের ছাদ মূলত দোতালা বিশিষ্ট।মানে অনেকটা ছাদের উপর আরেকটা ছাদ এরকম ব্যাপার।দেখতে একেবারে রিসোর্টের মতো দেখায়।নবনীতা,শুভ্রানী আর চিত্র নিচেই ছিল।চারদিকে ছোট ছোট গাছের টব।দেখতে ভালোই লাগে।উপরে আবার খোলা আকাশ।
তাসনুভা একেবারে সবচেয়ে উপরের ছাদটার রেলিং ঘেঁষে বসেছিল।তার এক হাত গালে।তারা একটু আগেই এসেছে এদিকে।এদিকে আসার পর তার মানুষের সাথে কথা বলার সাথে প্রকৃতির সান্নিধ্যে উপভোগ করতে বেশি ভালো লাগছে।হঠাৎ তার চোখ গেল নিচের ছাদে।সেদিকে কাউকে দেখতেই তার দু'চোখ আনন্দে ঝলকে উঠে।সে চঞ্চল হয়ে ডাকে,'নবনীতা আপু!'
নবনীতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে উপরে তাকায়।তাসনুভা কে দেখতেই হাসি মুখে বলে,'কেমন আছ তাসনুভা?'
'অনেক ভালো।উপরে আসো না আপু।'
নবনীতা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার শুভ্রা আর চিত্রা কে দেখে তারপর স্মিত হেসে বলে,'ঠিক আছে আসছি।'
চিত্রা এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছিল।নবনীতা আর তাকে ধরল না।বাচ্চা মানুষ,খোলা জায়গা পেয়েছে।একটু ছুটোছুটি করুক।সে আর শুভ্রা ছোট ছোট পা ফেলে ওপরে উঠে আসে।নবনীতাকে দেখতেই আদি হাত নেড়ে বলল,'নবনীতা! তুমি?কি অদ্ভুত।একেবারে দেজাভু।দুনিয়াটা সত্যিই গোল দেখছি।'
আরিশ আদির কথা শুনেই পেছন ফিরে দাঁড়ালো।নবনীতার চেয়েও যেই জিনিসটা তাকে বেশি আশ্চর্য করেছে সেটা হলো তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা।সে তাকে দেখতেই চমকে উঠে বলল,'শুভ্রানী তুমি?'
শুভ্রানী তার চেয়েও কয়েকগুন বেশি অবাক হয়ে তাকে দেখে।সে শাহরিয়ার আরহামের ছোট ভাই?অথচ প্রথম সাক্ষাৎে তার একদমই তাকে এমন মনে হয়নি।আরিশ এগিয়ে আসে।নবনীতা কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়,'শুভি কে তুমি চেন?'
'চিনবো না কেন?সেদিন সে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছিল।'
কথাটা বলেই সে দুই আঙুল তুলে আকাশের দিকে তাক করে বলল,'আরেকটু দেরি হলেই ডিরেক্ট উপরে।আমি সময় মতো ব্রেক মে'রেছিলাম বলে বেঁচে গেছে।'
শুভ্রা দ্রুত মাথা নামিয়ে নিল।কি দরকার ছিল এতো বিশদভাবে সবকিছুর বর্ণনা করার?নবনীতা কটমট চোখে একবার তাকে দেখল,কিন্তু এর বেশি আর কিছু করল না।এই মুহুর্তে এটা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ নেই।
তাসনুভা তাকে দেখতেই আবারো একগাল হাসল।সেই হাসির জবাবে নবনীতাও তাকে স্বচ্ছ একখানা হাসি উপহার দিলো।মেয়েটা কতো মিষ্টি।তার হুইলচেয়ার টা দেখলেই নবনীতার খারাপ লাগে।এই গোলগাল মুখের আদুরে দেখতে মেয়েটা হাঁটতে পারে না।পা থাকতেও না হাঁটতে পারাটা কতো কষ্টের,তাই না?
চিত্রা একটা গাছের পাতায় হাত দিয়ে সেটা নেড়ে চেড়ে দেখছিল।তখনি কেউ একজন তার হাত টা মুঠ করে ধরল।কিছুটা ধ'মক,কিছুটা উদ্বেগ জড়ানো গলায় বলল,'এটা ধরে না চিত্র।গাছের পাতায় মাঝে মাঝে পোকা থাকে।কা'মড় দিলে কিন্তু যন্ত্র'না হবে।'
চিত্রা হাত সরিয়ে নেয়।আরহাম একবার চোখ তুলে উপরের দৃশ্য দেখতেই চিত্রাকে এক হাত ধরে টেনে অন্য পাশে নিয়ে আসে।একটা চেয়ার টেনে তাকে মুখোমুখি বসায়।বাচ্চাকাচ্চার প্রতি তার খুব বেশি টানও কাজ করে না,আবার সে তাদের খুব বেশি অপছন্দও করে না।দূরে থাকলে জোর করে কাছে ডাকে না,আবার কাছে এলে অবহেলাও করে না,অনেকটা এমন।কিন্তু এই বাচ্চাটির ব্যাপার ভিন্ন।তাকে দেখলেই আরহামের তাসনুভার বাচ্চাকাল টা মনে পড়ে যায়।ছোটবেলায় তাসনুভার গাল আর ঠোঁট অবিকল চিত্রার মতো ছিল।এই একটি দিকে এই বাচ্চাটি বাকি বাচ্চাদের চেয়ে একটু আলাদা,একটু ভিন্ন।আরেকটি কারণও আছে।তার আপাই অপছন্দ করা স্বত্তেও সে আরহামকে অপছন্দ করেনি।ত্রিশোর্ধ যুবকটির কাছে এই ব্যাপারটা অত্যন্ত উপভোগ্য।
সে কিছুটা নিচু স্বরে বলল,'চিত্র তোমার আপাই কি সারাদিনই এমন বকাঝকা করতে থাকে?'
চিত্রা মাথা নেড়ে বলল,'না আপাই তো খুব ভালো।আমাকে চকলেট কিনে দেয়,চুল বেঁধে দেয়,গোসল করিয়ে দেয়,পাপ্পি দিয়ে ঘুম থেকে তুলে,রং কিনে দেয়,খেলা করে,ঘুম পাড়িয়ে দেয়।'
আরহাম কপাল কুঁচকায়।অবাক হয়ে বলে,'তাহলে তোমার মা বাবা কি করে?সব তো তোমার আপাই করে দেয়।'
চিত্রা পা দোলাতে দোলাতে খুব স্বাভাবিক করে বলে,'আমাদের তো মা বাবাই নেই।'
আরহাম ভড়কে গিয়ে বলে,'নেই মানে?কোথায় মা বাবা?'
'আকাশে।' ছয় বছরের ছোট্ট শিশুটি খুবই নির্বিকার হয়ে জবাব দেয়।যেন কথাটা কতোই না স্বাভাবিক! অথচ আরহামের বুকে কথাটা গিয়ে বিঁ'ধে তীরের ফলার মতো।মা বাবা আকাশে?মানে তারা বেঁ'চে নেয়?এই ছোট্ট মেয়েটা,যে কি-না মৃ'ত্যুর সংজ্ঞাও ঠিকঠাক বুঝে না,তার বাবা মা নেই?
আরহাম কোনো কথা না বলে কেবল ফ্যালফ্যাল চোখে কতোক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।একটু পরেই খুব শান্ত স্বরে বলল,'তোমার সবকিছু তোমার আপাই ই করে?'
চিত্রা উপরনিচ মাথা নাড়ে।ঠোঁট গোল করে বলে,'আপাই সারাদিন কাজ করে,আর রাতে বাড়িতে এসে আমাকে অনেক আদর দেয়।শুভি আমাকে দুপুরে খাইয়ে দেয়,আর পরী আপাই রাতে।'
আরহাম মন দিয়ে তার কথা শুনে।সে টের পাচ্ছে এই কথাগুলো শুনতে সে ভীষণ আগ্রহী।সে টের পাচ্ছে তার সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম একটি নারীস্বত্ত্বার পরিচয় হতে যাচ্ছে।সে চোখ তুলে আরো একবার উপরে দেখে।নবনীতার মা বাবা নেই।এই দু'টো মেয়ের অভিভাবক তাহলে সে?সে নিজেই তো এখনো বাচ্চা।সে আবার কেমন করে এতো বড় বড় দায়িত্ব কাঁধে নিচ্ছে?
সে আরো একটু ঝুকে এসে একদম হিশহিশিয়ে বলল,'আচ্ছা চিত্র,তোমার আপাইয়ের পছন্দের জিনিস কি কি?'
চিত্রা একটু ভেবে চিন্তে বলল,'ফুচকা।আপাই খুব ফুচকা খায়।'
আরহাম মুচকি হাসে।কিছু একটা কল্পনা করে বলে,'সেটা তো জানিই।আর কি কি পছন্দ তোমার আপাইয়ের?'
প্রশ্নটা করে সে নিজেই হকচকিয়ে যায়।অদ্ভুত! চিত্রাকে সে এসব প্রশ্ন কেন করছে?নবনীতার কি পছন্দ না পছন্দ সেটা দিয়ে তার কি কাজ?সে এমন আজগুবি কাজ কারবার কেন করছে?
চিত্রা আবারো ভাবল কিছুক্ষণ।গালে হাত রেখে চিন্তিত মুখে বলল,'আপাই আর কিছু পছন্দ করে না।আপাই তো সবসময় শুভি আর আমার পছন্দের জিনিস গুলোই কিনে দেয়।আপাইয়ের কোনো পছন্দ নেই।আপাই বলেছে আমাদের পছন্দই আপাইয়ের পছন্দ।'
ছোট্ট মেয়েটি কথাটা বলেই আরো এক দফা মুচকি হাসে।আরহাম নিষ্পলক চোখে তাকে দেখল।'আপাইয়ের কোনো পছন্দ নেই' এই কথাটার মর্ম যেদিন চিত্র বুঝবে সেদিন সে অনুধাবন করতে পারবে কেন আপাইয়ের কোনো পছন্দ নেই।এই মিষ্টিমুখের বাচ্চা মেয়েটা কি জানে যে তার আপাই কেন বলেছে তাদের পছন্দই আপাইয়ের পছন্দ?হয়তো জানে না,জানার মতো বয়স এখনো হয়নি।
আরহাম চোখ তুলে উপরে দেখে।স্থির হয়ে শুধু দেখতেই থাকে।মেয়েটার জামার রং টা কি সুন্দর! একেবারে সদ্য বিবাহিতা মেয়েরা গায়ে লাল রং জড়ালে যেমন লাগে,তাকেও এমনই লাগছে।কি চমৎকার! কি অপূর্ব! এই মেয়েটির নবনীতা রূপটা আরহামের ঠিক পছন্দ হয়নি।কিন্তু পরী আপাই?পরী আপাই নামের এই অদ্বিতীয়া মেয়েটিকে অপছন্দ করার সাধ্যি কি আরহামের আছে?এই বয়সের একটি মেয়ের কোনো শখ সেই,কোনো আহ্লাদ নেই?বোনদের পছন্দই তার পছন্দ।এটা কি কখনো হতে পারে?পৃথিবীতে এমন মেয়েদের অস্তিত্ব থাকতে পারে?সে তো মেয়ে বলতে তার মা কেই চিনে এসেছে।সেই মানুষটা তো চিত্রার পরী আপাইয়ের মতো ছিল না।সে তো নিজের সন্তানদেরই কখনো এতো গভীর মমতায় লালন করে নি।আর এই টুকু মেয়েটা আরো দুইটা মেয়ের মা-বাবা উভয়ের দায়িত্ব পালন করছে।আবার বলছে বোনদের পছন্দই তার পছন্দ?মা হওয়ার পরেও একজন নারী যেই আত্মত্যাগ টুকু করতে পারে না,সদ্য গ্র্যাজুয়েট একজন বোন কি করে হাসিমুখে সেই কাজ করে দেখাচ্ছে?
তার সাথে একবার চোখাচোখি হতেই আরহাম চোখ নামিয়ে নিল।নবনীতা উপরের ফ্লোরের রেলিং ঘেঁষে নিচে দেখে বলল,'চিত্র! ওদিকে কি করছ?উপরে আসো।'
আরহাম চিত্র'র একটা হাত মুঠ করে ধরে বলল,'শোনো চিত্র! তোমার আপাই কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করবে যে আমি তোমাকে কি কি জিজ্ঞেস করেছি।তুমি কিন্তু ভুলেও সেগুলো বলবে না।বলবে কার্টুন নিয়ে কথা বলছিলাম।ঠিক আছে?এটা আমাদের সিক্রেট,ওকে?'
চিত্রা দাঁত বের করে হাসল।বলল,'ঠিক আছে আরাম ভাই।'
তারপরই চেয়ার থেকে নেমে সিঁড়ির দিকে ছুটল।সে ওপরে আসতেই নবনীতা খপ করে তার হাত টা ধরে চোখ বড় বড় করে বলল,'ঐ লোকের সাথে এতো কি গুজুরগুাজুর ফুসুরফাসুর করছিলি রে?কি বলেছে সে তোকে?'
চিত্রা খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিলো,'কার্টুন নিয়ে কথা বলছিলাম আপাই।'
সাথে আবার নিজ থেকেও কিছু কথা যোগ করল যেন ব্যাপারটা নবনীতার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।সে দুই হাত নেড়ে নেড়ে বলল,'ভাইয়ার প্রিয় কার্টুন মটু পাতলু।'
নবনীতা সন্দিহান চোখে একবার তাকে দেখে।তারপর এক আঙুল দিয়ে আলতো করে ঠোঁট চেপে ধরে বলল,'আচ্ছা তুমি খেলা কর যাও।কিন্তু কোনোকিছুতে হাত দিয়ো না কেমন?'
চিত্রা মাথা নেড়ে এক দৌঁড়ে সেখান থেকে চলে গেল।নবনীতা চুপচাপ হেঁটে তাসনুভাদের টেবিলের কাছে এলো।শুভ্রা তখন আদির সাথে কথা বলছিল।এই আদি লোকটা ভীষণ মিশুক।একটু দেখা হতেই এমন করে কথা বলছে যেন সে তার খুব চেনা কেউ।নবনীতা সেদিকে গিয়েই আশপাশ দেখে তাসনুভা কে বলল,'আমরা তাহলে ঐ টেবিলে গিয়ে বসি?'
তাসনুভা বিচলিত হয়ে বলল,'কেন?এখানেই বসো না।পুরো টেবিলই তো খালি পড়ে আছে।তোমরা তো তিনজনই।'
নবনীতা সাথে সাথেই সে প্রস্তাব নাকচ করে দিলো।হাত নেড়ে বলল,'না না।তোমরা বসো,আমরা অন্য কোথাও গিয়ে বসবো।'
একটু থেমে সে আবার বলল,'আসলে আমার একটা ফ্রেন্ডও আসবে।কিন্তু সে যে কোথায় কে জানে!'
তার কথা শুনতেই আদি বলল,'আমারও তো একটা ফ্রেন্ড আসবে।সেও যে কোথায় কে জানে!'
.
.
.
.
'বললাম তো ম্যাডাম।ভেতরে যাওয়া যাবে না।নিষেধ আছে।'
গার্ডের দায়িত্বে থাকা লোকটা চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে কথাটা বলল।
রিমি বায়না ধরে বলল,'প্লিজ আঙ্কেল।যেতে দিন না।আমার ফ্রেন্ড কে আমি বলেছি এদিকে আসতে।আউটডোরে যেতে না দিলে সে রেগে দুই দিন আমার সাথে কথাই বলবে না।'
'কিছু করার নাই ম্যাডাম।অন্য কোনো রেস্টুরেন্টে যান।এদিকে আজকে কাউকে যেতে দেওয়া যাবে না।'
রিমি উদাস মুখে বলল,'কাউকেই যেতে দেন নি ভেতরে?'
'নাহ,সবাইরে ফেরত পাঠায় দিসি।'
রিমি মলিন মুখ করে বলল,ওহ!'
তারপরই সে ব্যাগে হাত দিয়ে তার ফোনটা খুঁজতে খুঁজতে ঘুরে দাঁড়ায়।ধপ ধপ পা ফেলে ইনডোরের দিকে পা বাড়ায়।ওয়াজিদ মাত্র লিফট থেকে নেমে সামনে হাঁটা শুরু করেছিল।তক্ষুনি কারো মাথা ধাম করে তার বুকে এসে বারি খায়।ওয়াজিদ লাফিয়ে উঠে দুই কদম সরে যায়।রিমি মাথা ডলতে ডলতে উপরে তাকায়।দু'জনার চোখাচোখি হতেই রিমি আঁতকে উঠে।তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনই কেঁদে ফেলবে।সে ভাঙা গলায় মিনমিন করে বলল,'সরি ভাইয়া।মিস্টেক হয়ে গেছে।নেভার মাইন্ড।'
ওয়াজিদ স্বভাবতই ধৈর্যশীল,শান্ত প্রকৃতির মানুষ।সহজে তার রাগ হয় না,সে রাগ দেখাতেও পছন্দ করে না।এমনিতেই নিচে সে মেয়েটির সাথে কিছুটা রুক্ষ হয়ে কথা বলেছিল।সে মুখে সৌজন্যসূচক হাসি ফুটিয়ে বলল,'ইটস ওকে।পরের বার থেকে দেখে চলবে।'
'ওয়াজিদ! এসেছিস?'
প্রশ্ন শুনতেই ওয়াজিদ সামনে তাকায়।ঘুরে দাঁড়ায় রিমি নিজেও।কাঁচের দরজার অন্যদিকে আরহাম দাঁড়িয়ে আছে।যদিও সে এগিয়ে আসায় গার্ড নিজেই দরজাটা টেনে ধরেছিল।ওয়াজিদ এগিয়ে যায় তার দিকে।আরহাম তীক্ষ্ণ চোখে তার সঙ্গে থাকা মেয়েটিকে দেখে বলে,'এটা কে?'
'চিনি না।' ভাবলেশহীন হয়ে জবাব দেয় ওয়াজিদ।
আরহাম খাঁড়া চোখে আবারো মেয়েটিকে দেখে।মেয়েটির মুখটা পূর্ব পরিচিত।আগে দেখেছে মনে হচ্ছে।আরহামের দৃষ্টি দেখতেই রিমি বিনয়ী স্বরে বলল,'আসসালামু আলাইকুম আরহাম ভাইয়া।'
আরহাম সালামের জবাব দিলো।জানতে চাইল,'তুমি কি ডি.ইউ তে পড়ো?'
রিমি দ্রুত মাথা নাড়ে।জানায় সে সেখানেই পড়ে,ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট।
একটু পরে নিজ থেকেই বলে,'আমি নবনীতার ফ্রেন্ড।'
এবার তাকে ঠিক মতো চিনতে পেরেছে আরহাম।ফুচকার স্টলে সে তাকেই দেখেছিল নবনীতার সাথে।সে ঠান্ডা গলায় বলল,'এদিকে আসো।তোমার বান্ধবী টেরেসেই আছে।'
রিমি কিছু বলার আগেই ওয়াজিদ চমকে উঠে বলল'কি?নবনীতা আছে এখানে?'
আরহাম ঠোঁট গোল করে মৃদু স্বরে উত্তর দেয়,'হু'
***
নবনীতা চুপচাপ দূরের একটা টেবিলে বসেছিল।তার কেন যেন চিত্র'র উপর রাগ হচ্ছে।মেয়েটা বারবার আরহামের কোলে উঠে তার গলা জড়িয়ে ধরছিল।বেড়াতে গেলে চিত্রা কখনো তার হাত ছাড়ে না।সেই চিত্রই আজ তাকে ছাড়া দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।বার বার আরহামদের টেবিলের কাছে গিয়ে দুষ্টুমি করছে।।চিত্র দুষ্টু টা বারবার ঐ টেবিলে চলে যাচ্ছিল।
শুভ্রা,চিত্রা আর রিমি সবার সাথেই কথা বলছিল।আদি আর আরিশ চারদিক হেঁটে হেঁটে কথা বলছে,তাসনুভাও থুতনির নিচে এক হাত রেখে আশাপাশ দেখছে।ওয়াজিদ বসে আছে টেবিলের এক কোণার একটি চেয়ারে।তার আড়চোখের চাহনি দূরের টেবিলের থম মেরে বসে থাকে মেয়েটির পানে নিবদ্ধ।আদি বিষয়টা প্রথমবার এড়িয়ে গেলেও তারপর সে মনোযোগ দিয়ে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে।তারপর আবার আরিশের সাথে কথায় মন দেয়।
আরহাম রিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,'তোমার ফ্রেন্ড একা বসে আছে।গিয়ে কথা বলো যাও।'
রিমি অসহায় মুখ করে বলে,'কাজ হবে না ভাইয়া।সে এখন গেলেও মুখ ফুলিয়ে রাখবে।কতোবার গিয়েছি।কোনো কিছুই ঠিক মতো বলে না।'
'কথা বলতে গেলে কি বলে?'
'বলে আমার সাথে তোদের কিসের কথা?আমি তো বড়লোক নই।তোরা তোদের বড়লোক আরহাম ভাইয়ের সাথে কথা বল।তোদের আর আমার প্রয়োজন নেই।' ম্লান মুখে উত্তর দেয় রিমি।
আরহাম উত্তর শুনেই আলগোছে হাসে।কথা না বাড়িয়ে বলে,'আচ্ছা থাক।যেতে হবে না আর।সে নিজেই আসবে।'
কথা শেষ করে সে আদি আর আরিশের দিকে তাকায়।পকেটে একহাত গুজে সম্মুখে পা বাড়ায়।শুনতে পায় পেছন থেকে রিমি শুভ্রাকে উদ্দেশ্য করে বলছে,'শুভি তোমরা কেক কিনো নাই?'
শুভ্রা ধিমি স্বরে উত্তর দেয়,'নাহ,কিনি নাই।আপাই বলল এখান থেকে বেরিয়ে কিনবে।'
'কিসের কেক?' ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে আরহাম।
শুভ্রা সাবলীল ভঙ্গিতে জবাব দিলো,'আজ চিত্র'র বার্থডে।তাই আমরা কেক কিনব ভাবছি।'
আরহাম মাথা নাড়ে।আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে সরে আসে।যোগ দেয় আদি আর আরিশের আড্ডায়।মাঝে আবার কয়েকটা ফোনকলও রিসিভ করে।সবশেষে হাই তুলতে তুলতে বলে,'এদিকে না এসে কয়টা কাজ করে নিলে আরো ভালো হতো।কালকে সারাদিন আর দম ফেলার সময় টুকুও পাবো না।'
টেবিলে খাবার আসতেই আরহাম গলা উঁচু করে ডাকল,'এই সবাই খেতে আসো।'
তাসনুভা টেবিলের কাছেই ছিল।সে চোখ সরু করে বলল,'নবনীতা আপু তো মনে হচ্ছে আসবে না।'
আরহাম নিরুদ্বেগ হয়ে বলল,'না আসুক।আমাদের কি?এক বেলা না খেলে সে ম'রে যাবে না।সে বরং বসে বসে বাতাস খাক।প্রকৃতির বাতাস খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে।'
'ধ্যাত! এসব কেমন কথা?তুমি একটু গিয়ে বলো না তাকে আসতে।'
'কি?আমি গিয়ে তাকে বলব?কেন রে?আমার কিসের ঠেকা পড়েছে?সে কোন জায়গার প্রেসিডেন্ট শুনি?' খটখটে গলায় প্রশ্ন করে আরহাম।
তাসনুভা মুখ ভার করে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নেয়।ভাইয়া এমন কথায় কথায় তেঁতেঁ উঠে কেন?অদ্ভুত ব্যাপার!
রিমি এগিয়ে এসে কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলল,'ভাইয়া আমরা না হয় অন্য টেবিলেই খাই।আপনারা এখানে থাকুন।'
আরহাম একবার রিমিকে দেখে তারপরই তীর্যক চাহনিতে নবনীতাকে দেখে।দেখেই ওয়েটারকে ডেকে নবনীতার বসে থাকা টেবিলের দিকে একটা আঙুল তুলে বলল,'ওদের খাবার টা ঐ টেবিলে সার্ভ করে দিও।'
সাদা ফর্মাল শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা ফিটফাট মাঝবয়সী লোকটা তার কথা শুনতেই সেদিকে এগিয়ে গেল।সাথে বাকি ওয়েটারদেরও কিছু একটা নির্দেশ দিলো।মুহূর্তেই নবনীতার সামনে থাকা টেবিলটা খাবারে খাবারে ভরে গেল।
নবনীতা বিস্মিত নয়নে খাবারের প্লেট হাতে দাঁড়ানো লোকটিকে প্রশ্ন করল,'এতো খাবার কে খাবে?'
লোকটি নম্র গলায় জবাব দেয়,'আরহাম স্যারই বলেছেন ম্যাম।তাদের টেবিলে যা কিছু দেওয়া হয়েছে তাই যেন আপনাদের টেবিলে দেই।'
'আপনার আরহাম স্যারকে বলুন তার মতো টাকার ফুটানি আমরা করি না।আর এতো খাবার আমরা খেতেও পারব না।আরহাম স্যারের ডিশ আরহাম স্যার কেই দিন।আমরা এতো কিছু চাই না।' কর্কশ রসকষহীন কন্ঠে প্রতিউত্তর করে নবনীতা।
সামনে দাঁড়ানো লোকটা থতমত খেয়ে কিছু সময় তার দিকে দেখল।রিমি দুই দিক দেখে কন্ঠ নামিয়ে বলল,'আঙ্কেল,আমরা এতো কিছু খাব না।আপনি কষ্ট করে বাকি খাবার গুলো নিয়ে যান।না হয় অপচয় হবে।'
নবনীতা তার কথা শেষ না হতেই কঠিন মুখ করে বলল,'আমরা খেতেও পারব না আর এতো টাকা বিলও দিতে পারব না।নিয়ে যান এসব।'
শুভ্রানী অসহায় দু'টো চোখে তার পরী আপাইকে দেখে।আপাই যখন থেকে দেখেছে চিত্র আরহাম ভাইয়ের কোলে,তখন থেকে তার মুখের হাসি পুরো জগৎ ছাড়িয়ে অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে ঠাই নিয়েছে।আপাই চিত্রকে নিয়ে ভীষণ পজেসিভ।সে বাদে চিত্র কারো গলা জড়িয়ে ধরলেই তার মেজাজ বিগড়ে যায়।আজও তাই হয়েছে।
আরহাম আড়চোখে একবার তাদের দেখল।ম্যাডাম নবনীতা তখনও মুখ ফুলিয়ে বসে।চিত্রা আরিশ আর আদির সাথে টেনিস বল ছু'ড়ে ছু'ড়ে খেলছিল।আরহাম তাকে ডেকে বলল,'অনেক খেলেছ।এখন খেতে যাও চিত্র।'
চিত্র দৌঁড়ে দৌঁড়ে নবনীতার কাছে গিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসল।ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মাথাটা নবনীতার হাতের উপর রেখে আদুরে গলায় বলল,'পরী,খুব খিদে পেয়েছে।'
নবনীতা মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে বলল,'খিদে পেলে খাও।আমাকে বলছ কেন?এই যে সামনে প্লেট আছে।নিয়ে খাও।'
রিমি তার আচরণ দেখেই কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,'এসব কি নবনী?তুই কি মাঝে মাঝে বাচ্চা হয়ে যাস?ছোট একটা বাচ্চা।এমন করছিস কেন?'
'আমি কি করেছি?অদ্ভুত তো! সে তো আমাকে ছাড়াই এতোটা সময় ছিল।এখন সমস্যা কি?'
নবনীতা মুখটা ঘুরিয়ে চিত্রাকে দেখে কটাক্ষ করে বলল,'এক কাজ কর।তুই তোর ঐ পরানের ভাইয়ের কাছে চলে যা।সে তোকে একেবারে মেখে মেখে খাইয়ে দিবে।সামনে নির্বাচন তো,এজন্য জনদরদী ভাইয়ের হাসি থামে না।একবার জিততে দে,তারপর দেখবি আসল চেহারা।'
'আহা আপাই! তুমি চিত্র কে এতো কঠিন কঠিন কথা বলছ কেন?সে কি এসব বোঝে?আজ ওর বার্থডে।প্লিজ আপাই।এসব করো না।' অত্যন্ত করুণ চোখে নবনীতার দিকে দেখে কথাটা বলল শুভ্রা।
নবনীতা দমে গেল সাথে সাথে।একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল,'আচ্ছা হয়েছে।চলো খাওয়া শুরু করো।দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের।'
চিত্রা মলিন মুখে একবার তার আপাইকে দেখে।শুভ্রা চামচে ফ্রাইড রাইস নিয়ে তার মুখের সামনে এনে বলল,'নেও চিত্র খেয়ে নাও।শুভি খাইয়ে দিচ্ছি তোমায়।'
চিত্রা চুপচাপ খাবার টা মুখে নেয়।
নবনীতা আড়চোখে তাদের কর্মকাণ্ড দেখে,আর রিমি দেখে তাকে।চিত্রাকে যে সে কি পরিমান ভালোবাসে সেটা রিমি তার চোখ দেখেই বুঝতে পারে।
খাওয়ার ফাঁকেই একবার চিত্রার সাথে তার আপাইয়ের চোখাচোখি হয়।দু'জনই কয়েক পল স্থির হয়ে দু'জনকে দেখে।নবনীতা টের পাচ্ছে তার চোখ আর্দ্র হয়ে যাচ্ছে।অকস্মাৎ চিত্রা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলো।
সেই কান্না দেখেই নবনীতার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে,চোখ দু'টো ঝাপসা হয়।সে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরে এক হাত দিয়ে।কপালে চুমু খেয়ে অনুতপ্ত হয়ে বলে,'সরি সোনা।আপাই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।সরি,অনেক গুলো সরি।তোমার না আজকে জন্মদিন।কাঁদে না পাখি।জন্মদিনে কাঁদতে নেই।'
চিত্রা কান্না থামালো সত্যি সত্যি।তারপরই শুভ্রার হাত থেকে চামচ টা একটান দিয়ে নিজের হাতে নিয়ে সেটা নবনীতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,'আপাই খাওয়াবে,তুমি না।তুমি শুধু আপাই বাড়িতে না থাকলে খাওয়াবে।'
নবনীতা হাসল।শুভ্রা নিজেও প্রথমে চোখ পাকিয়ে পরে আবার হেসে দিলো।
'তোমরা কি নিয়ে এতো কথা বলছ?'
পাশ থেকে কেউ ডাকতেই নবনীতা সেদিকে ফিরে।দেখে তাদের চেয়ে কিছুটা দূরে তাসনুভা যার হুইল চেয়ারের হাতল দু'টো একজন ওয়েটারের হাতে বন্দি।নবনীতা তাকে দেখেই বলল,'তাসনুভা তুমি?কিছু লাগবে আপু?'
তাসনুভা কিছুটা অনুযোগ,কিছুটা অনুরোধ করে বলল,'ঐদিকে সবাই নির্বাচন নিয়ে কথা বলছে।আমার এসব ভালো লাগে না।আমি কি তোমাদের সাথে খেতে পারি?'
নবনীতা আশ্চর্য হয়।পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,'কেন নয়?অবশ্যই খেতে পারো।আসো আসো।আমার পাশে এসো।'
তাসনুভা তার পাশটায় এলো।নবনীতা হাতের চামচটা ফেলে হাত দিয়ে অল্প পরিমান ফ্রাইড রাইস নিয়ে চিত্রকে খাওয়ায়।রিমি তাকে দেখতেই নিজের চামচ টা ফেলে দিয়ে বলল,'আমিও হাত দিয়েই খেতে চাচ্ছিলাম।কিন্তু লজ্জায় খেতে পারছিলাম না।এখন আর কোনো লজ্জা নেই।'
তাসনুভা অবাক হয়ে তাদের দেখে।নবনীতা তার বিস্ময় জড়ানো চোখ জোড়া দেখেই হাসি মুখে বলল,'এতো অবাক হয়ো না তাসনুভা।আমরা গ্রামের চাচাতো বোনরা একটু এমনই।অতো স্টাইল করে খেতে পারি না।আমার এক কোটি টাকা থাকলেও আমি সারাজীবন হাত দিয়েই ফ্রাইড রাইস খাবো।'
তাসনুভা দিরুক্তি করে বলল,'ধুর,আমি মোটেও তোমাদের গ্রামের চাচাতো বোন ভাবছি না।আমার উল্টো চিত্রার খাওয়া দেখে লোভ লাগছে ভীষণ।'
নবনীতা তার কথা শুনতেই খুব হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার দিকে একটা লোকমা বাড়িয়ে দিলো।মিষ্টি হেসে বলল,'দেখো তো।খেয়ে দেখো তো কেমন লাগে।'
তাসনুভা একবার তার হাত আরেকবার তার মুখটা দেখল।সে ভাবে নি নবনীতা এতো সুন্দর করে তাকে খাইতে দিতে চাইবে।তাকে এভাবে কেউ কখনো খাইয়ে দেয়নি।ছোটবেলাটা সে বাড়ির পরিচারিকা দের সান্নিধ্যেই কাটিয়েছে।আরহাম আর আরিশ ভাইয়া তার খুব যত্ন নিত।কিন্তু তাকে কেউ কখনো এতো মমতায় খাইয়ে দিতে আসেনি।
সে আর্দ্রচোখে লোকমা মুখে তুলে।দূর থেকে এক জোড়া চোখ গভীর মনোযোগে সেই দৃশ্য দেখে।টের পায় দৃশ্যটা তার হৃদয়ে জোয়ারের বিশালাকার ঢেউরের মতো আঁছড়ে পড়ছে।টের পায় এতো স্নেহ তার ছোট্ট বোনটাকে তার নিজের ফুফুও কখনো দেয়নি।টের পায় পরীদের মধ্যে থাকা কোনো একটা পরী সত্যিই নিজের জগৎ ছেড়ে এই মর্ত্যলোকে এসে ঠায় নিয়েছে।তার ডানা নেই,কিন্ত সে সত্যিই পরী।
আরহাম একটা শুকনো ঢোক গিলে।তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।অনুমান করতে পারছে তার সাথে যা হচ্ছে সেটা স্বাভাবিক না।সে কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে?
অসম্ভব অসম্ভব।সে কখনো দুর্বল হতে পারে না।কিন্তু এই যে অবাধ্য মন বার বার একটা নিষিদ্ধ মানবীর দিকে ঝুকে যাচ্ছে,সেটার কি করবে আরহাম?একে তো আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই।
চলবে-
(পুরোটা লিখা হয়নি।প্রচুর বড় হয়ে যাচ্ছিল।সব ঠিক থাকলে রাতে অতিরিক্ত অংশ পাবেন ইনশাআল্লাহ)#কোনো_এক_শ্রাবণে
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
(১৮)
অতিরিক্ত
খাবার শেষে নবনীতা যখন বিলের কথা বলল তখন ওয়েটার তাকে জানাল তার বিল দিতে হবে না,আরহামই আজ পুরো বিল দিবে।
কথা শুনেই নবনীতার ব্রহ্মতালু ছ্যানছ্যান করে উঠে।এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে সে খ্যাক করে ওঠে,'কিহ?কে দিবে?'
তার সামনে থাকা লোকটা ভড়কে গেল।মিনমিন করে বলল,'আরহাম স্যার দিবেন।'
'কেন?তোমার আরহাম স্যার কেন দিবেন?আমরা কি ফকির?ভিখারি আমরা?'
ওয়েটারের দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোক পড়লেন বিপাকে।এই মেয়ে এমন ক্ষে'পে যাচ্ছে কেন?তার সাথে রাগ দেখিয়ে কি লাভ?সে তো আরহাম না।তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে বললেন,'ম্যাম আপনি আরহাম স্যারের সাথে কথা বলুন।আমার এদিকে কিছুই করার নেই।আমি আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না।বারণ আছে আমার।'
'আপনাদের শুধু বারণই থাকে।একবার বলেন ভেতরে ঢুকা যাবে না,বারণ আছে।আবার বলেন বিল দেওয়া যাবে না বারণ আছে।শুধু বারণ আর বারণ।যাকগে,আপনার আরহাম স্যার কোথায়?তার সাথে আমি কথা বলছি।'
লোকটা তার তর্জনী তুলে পশ্চিম দিকে দেখিয়ে বলল,'স্যার নিচের টেরেসে।সেখানেই তাকে পাবেন।'
নবনীতা আর কথা বাড়ায় না।বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে যায়।মেজাজ তার এমনিতেও খুব একটা ভালো ছিল না।এখন মনে হচ্ছে মাথায় কেউ আ'গুন ধরিয়ে দিয়েছে।লোকটা সবকিছুতে এতো টাকার বাহাদুরি দেখায় কেন?নবনীতা কি কোনো ফকির?
আরহাম বিল মিটিয়ে কেবল উপরের ছাদে উঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।তক্ষুনি তার সাথে নবনীতার একটা মুখোমুখি সং'ঘর্ষ হলো।নবনীতা তাল সামলাতে না পেরে একটু পেছন দিকে হেলে পড়ে।আরহাম সঙ্গে সঙ্গে ডান হাত দিয়ে শক্ত করে তার একহাত চেপে ধরে তাকে পুনরায় সোজা করে দাঁড় করায়।নবনীতা ঠিক মতো দাঁড়াতেই তার চোখ যায় নিজের হাতের দিকে।এক ঝাড়ায় হাত ছাড়িয়ে নেয় সে।
আরহাম গা ছাড়া ভাব নিয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে নিলেই নবনীতা গম্ভীরমুখে বলে উঠে,'আপনি আমাদের বিল কেন দিয়েছেন?আমরা চেয়েছি?'
আরহাম থামল।পাশ ফিরে নবনীতার দিকে দেখে তারই মতো গম্ভীর স্বরে বলল,'এদিকে আমাদের সাথে শুধু তোমরাই ছিলে।যেহেতু সব খাবার এক সাথেই অর্ডার হয়েছে,তাই বিলও এক সাথেই এসেছে।এখানে এমন সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই।জাস্ট কাম ডাউন।'
'নো।আই ক্যান নট।কাম ডাউন হতে পারব না আমি।আপনি আমাকে অপমান করছেন।' ভীষণ জোরাল শোনায় তরুণীর কন্ঠ।
আরহাম তব্দা খেয়ে বলল,'এক্সকিউজ মি?হোয়াট?'
নবনীতা দুই বার শ্বাস নেয়।দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলে,'আপনি কেন আমাদের বিল দিবেন?আমরা কি বিল দিতে অক্ষম? অথবা আমরা কি আপনার ইনভাইটেড গেস্ট?নো,উই আর নট।তাহলে আপনি কেন বিল দিবেন?আমাদের বিল দেওয়ার সামর্থ্য নেই?আপনি নিজে বিল দিয়ে আমায় অপমান করছেন।আমি বিল দিতে অক্ষম নই জনাব।'
আরহাম হতভম্ব হয়ে তার কথা শুনে।চোখ বড় বড় করে বলে,'মাই গড! তুমি কি সবকিছু দুই ধাপ বেশি বোঝো নাকি?তুমি যতদূর ভেবে নিয়েছ অতো দূর তো আমার মাথায়ও আসেনি।অক্ষমতা,অপমান,সামর্থ্য-ও মাই গড।আই কা'ন্ট টেইক দিস।'
নবনীতা গোমড়া মুখ করে বলল,'অতো কথা বুঝি না।আমার কি বিল হয়েছে বলুন।আমার টা আমি দিব।'
কথা শেষ হতেই সে তার ব্যাগ থেকে ২৫০০ টাকা বের করে আরহামের দিকে এগিয়ে দিলো।আরহাম এক খাবলায় টাকা টা হাতে নিয়ে সেটা পকেটে রাখল।নবনীতা আশ্চর্য হয়ে বলল,'পকেটে কেন রাখছেন?'
আরহাম তার চেয়েও দ্বিগুণ আশ্চর্য হয়ে বলল,'তো কোথায় রাখব?মাথায়?'
নবনীতা দুই হাত বুকে বেঁধে চাপা কন্ঠে বলল,'এতো টাকা আমরা খাই নি।যেটুকু খেয়েছি ঐটুকু রেখে বাকিটা ফেরত দিন।'
তার কথা শুনতেই আরহাম স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।তার মুখের চূড়ান্ত রকম বিস্ময় দেখেই নবনীতা বিরক্ত হয়ে বলল,'এভাবে দেখার কিছু নেই।এতো টাকা আমরা খাইনি।হিসেব আছে আমার কাছে।'
আরহাম কয়েক মুহুর্ত নিষ্পলক তাকে দেখে।চুপচাপ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে।ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে বলে,'তুমি তাহলে হিসেব করে বলো কতো হয়েছে।'
নবনীতা হিসেব করল।তার সেই হিসেবে পানির বোতলের দামটাও অন্তর্ভুক্ত করল।আরহাম গোল গোল চোখে তার কাজকর্ম দেখে।নবনীতা মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসেব করে জানায়,'একুশ শো আশি টাকা খেয়েছি আমরা।'
তার পরেই একটু চিন্তা করে বলল,'তিনশো বিশ টাকা ফেরত দেবেন আপনি আমাকে।আচ্ছা থাক।বিশ টাকা দিতে হবে না।তিনশো ই দিন।'
আরহাম চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,'কেন?বিশ টাকা কেন দিব না?আমি কি হোটেলের বেয়ারা?হ্যাঁ?'
নবনীতা থমথমে মুখে একবার সেদিকে তাকায়।তারপরই আবার চোখ নামিয়ে নেয়।আরহাম মানিব্যাগ বের করে একশো টাকার নোট গুনছিল।হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সে চোখ তুলে বলল,'ওহ ভালো কথা।চিত্র আমার থেকে দুই চামচ ফালুদা খেয়েছিল।আমি কি সেই দামটাও রাখব পরী আপাই?'
নবনীতা একপেশে হাসল।খোঁচা দিয়ে বলল,'জ্বী।রুচিতে যদি কুলায় তাহলে রাখতে পারেন।আমার আপত্তি নেই।আর শুনুন।আমাকে পরী আপাই বিশেষণ দিয়ে কটাক্ষ করবেন না।এই নামটা আমার কাছে অনেক প্রিয়।এই পরিচয় টা আমার জন্য গর্বের।যারা আমাকে এই নামে ডাকে তারা আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান নেয়ামত।'
আরহাম গুনে গুনে তিনশো বিশ টাকা তার হাতে তুলে দিলো।মুখ বাঁকা করে বলল,'সবকিছুতে এতো প্যাচ খুঁজবে না।আমি তোমায় কটাক্ষ করিনি।'
'স্যার,কেক এসে গেছে।'
আরহাম আরো কিছু বলার আগেই পেছন থেকে ওয়েটার ছেলেটা তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।
আরহাম ঘুরে দাঁড়িয়ে ইনডোরের দিকে দৃষ্টি নেয়।কেক হাউজের টি শার্ট জড়ানো একটা অল্পবয়সী ছেলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত বড় কেকের বক্স হাতে।
আরহাম হাত নেড়ে ইশারা করে তাকে আসার জন্য।
নবনীতা কপাল কুঁচকে বলল,'কেক কেন?'
আরহাম মুখ দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,'আজ আমার খুব প্রিয় একজনের জন্মদিন।তাই কেক এনেছি।তোমার কোনো সমস্যা?'
বলেই সে সোজা হেঁটে উপরে চলে গেল।নবনীতা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও গটগট করে উপরে উঠে এলো।
***
তিনতালা বিশিষ্ট একটা বিশাল কেক।চারদিকে শুধু চকলেট আর চকলেট।কেকের নাম চকো মাউন্টেন কেক।পুরো কেকের ডেকোরেশন করা হয়েছে নামি দামি ব্র্যান্ডের চকোলেট দিয়ে।কেক টা আনা হয়েছে হূমায়রা নূর ওরফে চিত্রার জন্মদিন উপলক্ষে।কেক আনিয়েছে তার পছন্দের আরাম ভাই।এতো সুন্দর কেক টা দেখতেই চিত্রার মন খুশিতে নেচে উঠে।এতো সুন্দর কেক সে শুধু বড় বড় দোকান গুলোতে বাইরে থেকে দেখেছে।কখনো তো সামনে থেকে দেখেনি।ইশশশ! এটা খেতে কতোই না মজা হবে!
আরহাম হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকল।আদর মাখা গলায় বলো,'দেখি চিত্র,এদিকে আসো তো।কেকের সাথে তোমার একটা ছবি তুলে দেই ভাইয়া।'
পুরো বিকেল আর সন্ধ্যা দৌঁড়ে দৌঁড়ে আরহামের কাছে ছুটে যাওয়া চিত্রা এইবার এতো বড় কেক সামনে থাকার পরেও তার ডাকে সাড়া দিলো না।তার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।চিত্রা বুঝতে পারছে এই মানুষটা আরাম ভাইয়ের সাথে তার মেলামেশা পছন্দ করে না।
সে সেদিকে গেল না।উল্টো হাত তুলে নবনীতার ডান হাতটা চেপে ধরল।দুই দিকে মাথা নেড়ে করুণ মুখে আরহাম কে জানাল সে যেতে পারবে না।তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটি তার কাছে এই দামি কেকের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
চকিতে পাশ ফিরে নবনীতা।চিত্রা আরহামের কাছে না গিয়ে তার হাত ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে,এমনটা সে ভাবেনি।চায় ও নি।চিত্রা তাকে ভয় পাচ্ছে।তার রাগ হওয়ার আ'তঙ্কে সে চকোলেট দেখেও সেদিকে ছুটে যাচ্ছে না।
তীব্র অনু'শোচনা জেঁকে ধরে নবনীতাকে।সে কি আজ বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে?সে হাঁটু মুড়ে বসে চিত্রার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,'যাও না সোনা।কেউ ভালোবেসে উপহার দিলে সেটা নিতে হয়।যাও গিয়ে ছবি তুলো,কেক কাটো।আপাই কিছু বলব না।তুমি মজা করে কেক খাও।'
তার অনুমতি দিতে দেরি হলো,কিন্তু চিত্রার এক ছুটে আরহামের কোলে চড়তে দেরি হলো না।আরহাম তাকে টুপ করে একটা চুমু খেল।নবনীতা যেই গালে খেয়েছে,তার অপর গালে।নবনীতা ওঠে দাঁড়িয়ে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ায়।তাসনুভা মোমবাতি জ্বালিয়ে সেটা কেকের উপর রাখে।আরহাম চিত্রার হাতে ছু'রি ধরিয়ে কেকটা কাটল।সবাই হাততালি দিয়ে সমস্বরে বলে ওঠল,'হ্যাপি বার্থডে চিত্রা।'
চিত্রা কেবল জবাবে মিষ্টি করে হাসে।একদিনে এতো আনন্দ তার সহ্য হচ্ছে না।খুশিতে তার চোখ চিকচিক করছে।এতো সুন্দর কেকটা তার জন্য আনা হয়েছে।এটা তার বার্থডে কেক।এতো সুন্দর তার বার্থডে কেক?
সে সবাই কে একটু একটু করে কেক খাওয়ায়।নবনীতাকেও।নবনীতা কেকটা মুখে দিয়েই মুখটা কে খুশি খুশি করে বলল,'উমমমম খুব মজা তো।নাও,এখন তুমি খেয়ে নেও বাকিটা।'
বিশাল কেকটা তারা খেয়ে শেষ করতে পারে নি।আরহাম সবার খাওয়া শেষে বাকিটা স্টাফ দের খেয়ে নিতে বলল।তার আবার ফোন বাজছে।জালালুর রহমান ফোন দিয়েছেন।হয়তো সমাবেশ নিয়ে কোনো জরুরি কথা আছে।সে ফোনটা কানে চেপে ধরে হন্তদন্ত হয়ে নিচের ছাদে নেমে এলো।
নবনীতা সেই পুরোটা সময় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।লোকটা চিত্রার জন্য কেক এনেছেন।এটা অবশ্য মন্দ কিছু না।বিষয়টা সুন্দর।চিত্রার চেহারার খুশি আর আনন্দ দেখে সে ঐ লোককে কিছুই বলতে পারবে না।কিন্তু তার ভেতর পু'ড়ছে।এই জন্য অন্য কেউ দায়ী না।এটাই বাস্তবতা।সে আবারো অনুধাবন করল জগতে ভালোবাসাই সবকিছু না।এর সাথে অর্থেরও প্রয়োজন আছে।চিত্র আর শুভিকে সে যতোই ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখুক না কেন,সে তাদের কে কখনোই এই আনন্দটুকু দিতে পারবে না।চোখের সামনে থাকা চওড়া মূল্যের কেক টি জানান দিচ্ছে নবনীতার অক্ষমতার।চিৎকার করে বলছে,'দেখ পরী।তুই স্বয়ংসম্পূর্ণ না।তুই বাচ্চা দু'টোর সব অভাব পূরণের যোগ্য না।'
নবনীতা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে।কেউ দেখে নেওয়ার আগেই অতি সন্তর্পণে চোখের কোণায় এসে জমে থাকা পানিটুকু মুছে নেয়।তার চোখের পানি দেখে লোকে তাকে স্বান্তনা দিক,এটা সে চায় না।সে চায় না কেউ তাকে করুণা করুক।করুণা জিনিসটা তার বড্ড অপ্রিয়।
তাসনুভা আদি আরিশ মিলে চিত্রার সাথে অনেক ছবি তুলল।সবাই মিলে গ্রুপ ছবিও তুলেছে দুইটার মতো।আদি তাকে ডেকে বলল,'হেই নবনীতা! এসো না।তুমিও আসো।'
নবনীতা ম্লান মুখে দু'দিকে মাথা নাড়ে।ক্লান্ত স্বরে বলে,'না না।আমি ছবি তুলব না।তোমরা তোলো প্লিজ।'
তাসনুভা হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে এগিয়ে আসে তার দিকে।অনুরোধের সুরে বলে,'আপু আমার সাথে একটা সেলফি তোলো।প্লিজ?'
নবনীতা স্মিত হাসে।তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে সামান্য ঝুকে দু'জনের বেশ কিছু ছবি তোলে।তারপর আবার সেটা তাসনুভার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে তাসনুভার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।কপালের কাছটায় ছোট করে চুমু খেয়ে বলে,'এতো রিকোয়েস্টের কিছু নেই সোনা।তুমি ছবি তুলতে চাইছ আর আমি তুলব না,এটা হতে পারে?খুব ভালো থাকো তাসনুভা।আপু তোমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করে দিলাম।'
তাসনুভা লাজুক হাসল।মাথা নামিয়ে বলল,'তোমার জন্যও অনেক দোয়া আপু।'
তার সাথে কথার ফাঁকে আনমনে একবার নিজের হাতের দিকে দেখতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল নবনীতার।অবাক হয়ে সে ফ্লোরের এদিক সেদিক দেখতে শুরু করল।তাসনুভা ভড়কে গিয়ে বলল,'কি খুঁজো আপু?'
'ঘড়ি,আমার ঘড়ি।' উদ্বিগ্ন হয়ে জবাব দেয় সে।
তারপরই সে হন্য হয়ে চারদিকে সেটা খুঁজতে শুরু করে।নিচের ফ্লোর উপরের ফ্লোর দু'টোতেই সে তন্ন তন্ন করে ঘড়িটা খুঁজল।আরহাম তার এই হম্বিতম্বি দেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করে বলল,'একটা ঘড়িই তো।এমন ভাব যেন স্বর্ণের টুকরো হারিয়েছে।'
নবনীতা চোখ মুখ শক্ত করে তাকে দেখল।কটমট করে বলল,'আমি সারাদিন বাইরে থাকি।টিউশন করাই।আমার সময় মেপে চলতে হয়।আপনার জন্য তু'চ্ছ হলেও আমার কাছে এর মূল্য আছে।'
বলেই সে তার পার্সটা হাতে তুলে নেয়।পেছন ফিরে চিত্রা,শুভ্রা আর রিমি কে দেখে বলে,'চল।যেতে হবে আমাদের।'
'আর ঘড়িটা?সেটার কি হবে?' জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করে রিমি।
নবনীতা সামনে ফেরে।কাঠকাঠ গলায় উত্তর দেয়,'আরেকটা কিনে ফেলব।'
কথা শেষ করেই সে শেষ বারের তাসনুভার কাছে গেল।তাসনুভার মাথায় হাত ছুঁয়িয়ে বলল,'গেলাম তাসনুভা। নিজের খেয়াল রেখো।কখনো মালিবাগ এলে আমাকে জানাবে।আমার বাসায় তোমার দাওয়াত রইল।'
বলেই সে মাথা তুলে বাকিদের দেখে।সৌজন্যসূচক হেসে বলে,'আপনাদেরও দাওয়াত।'
'আর আরহামের?আরহামের দাওয়াত নেই?' চঞ্চল হয়ে প্রশ্ন করল আদি।কিন্তু তারপরই আরহামের দাঁত কিড়মিড় করতে থাকা মুখটা দেখে সে দমে গেল।অস্পষ্ট স্বরে বলল,'ঐ আরকি।জাস্ট জানতে চাইছিলাম।'
নবনীতা ঠোঁটের কোণায় অল্প হাসি ফুটিয়ে সেখান থেকে চলে এলো।ওয়াজিদ রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার প্রস্থান দেখে।সে যখন হাঁটে তখন তার হাঁটার মাঝে একটা আত্মপ্রত্যয় কাজ করে।এই বিষয়টা তাকে আরো বেশি মোহনীয় করে দেয়।
তারা চলে যেতেই আরহামও আর দেরি করল না।তারা যাওয়ার মিনিট দশেকের মাথায় সে নিজেও বাকিদের নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।ওয়াজিদ কে তার বাসায় ড্রপ করে তারা আজিজ ভিলার পথ ধরে।
বাড়ি পৌঁছাতেই আরহাম সোজা তার ঘরে গেল।ঘরে গিয়েই সে এলোমেলো হয়ে কতোক্ষণ খাটের উপর শুয়ে থাকে।মস্তিষ্কে কেবল আজকের ঘটনা গুলোই ছায়াছবির মতো চলতে থাকে,কানে বাজতে থাকে চব্বিশ ছুঁই ছুঁই রমণীর সুন্দর কিন্তু দৃঢ় কন্ঠস্বর।
অনেকক্ষণ পর আরহাম শোয়া থেকে উঠে বসে।পকেট হাতড়ে বের করে একটি ধাতব বস্তু।সেটা বের করে সামনে আনতেই তার মুখে হাসি ফুটে।
অ্যান্টিক কালারের একটা ম্যাটালিক ঘড়ি।লেডিস ওয়াচ।দেখতে বেশ সুন্দর।সেই ওয়াচের মালকিন আজ হন্য হয়ে তাকে খুঁজেছে।মালকিন জানে না সেই ঘড়ি অনেক আগেই কারো হাতে পৌঁছে গেছে।
আরহাম ঘড়িটা হাতে নিয়েই পুনরায় শুয়ে পড়ল।তার ঠোঁটের কোণায় ক্ষণিকের জন্য হাসি ফুটল।সম্ভবত নিচে নেমে আরহামের সাথে ধাক্কা খেয়েই ঘড়িটা তার হাত থেকে খুলে পড়েছে।সে যখন জালাল সাহেবের সাথে কথা বলতে নিচে নেমেছে,তখনই সে সেটা পেয়ে চটপট লুফে নিয়েছে।
আরহাম ঘড়িটা দেখে।একহাত মাথার নিচে রেখে নিরেট স্বরে বলে,'পরী আপাই সারাদিন শুধু ঠাসঠাস উত্তর দেয়।তাই পরী আপাইয়ের বোবা ভার্সন বাড়ি এনেছি।একটা পরী আমার ঘরেও থাকা উচিত।তাই না?'
আরহাম একপাশ হয়ে শোয়।সে জানে সে বাড়াবাড়ি করছে।সে অসম্ভব জিনিস নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে।হয়তো সত্যিই এটা ইনফ্যাচুয়েশন।কিন্তু যেটাই হোক,যেই কৃষ্ণ গহ্বরে সে তলিয়ে গেছে,সেটা থেকে তাকে টেনে বের করার সাধ্যি কারো আছে নাকি সে জানে না।এই ইনফ্যাচুয়েশন বড্ড ভয়ংকর।একে সে যতো এড়িয়ে যেতে চাইছে,ততোই এর সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছে।আরহাম ভেবে নিয়েছে এসব ব্যাপারে সে আর নিজেকে কিংবা নিজের উপর প্রেশার ক্রিয়েট করবে না।সামনে যা হবে দেখা যাবে।এতো ভাবার কি আছে?
চলবে-