ফন্ট সাইজ:
থিম:
কোনো এক শ্রাবনে

পর্ব 45

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#কোনো_এক_শ্রাবণে [দ্বিতীয় অধ্যায়]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

(৪৫)

সাদা রঙের মিনি বাসটা রাঙামাটি গিয়ে পৌঁছুলো সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ।গাড়ি থামতেই সবাই নড়ে চড়ে উঠল।আরহাম নবনীতার কাঁধে মাথা রাখা অবস্থাতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে প্রশ্ন করে,'এসে গেলাম নাকি?চাকা ঘুরে না কেন?'

নবনীতা আড়চোখে তার দিকে তাকায়।থমথমে মুখে বলে,'জ্বী।এসে পড়েছি।এবার মাথাটা সরান।কাঁধ ব্যথা হয়ে গেছে আমার।'

রিমি বাস থামতেই সবার আগে দৌঁড়ে দৌঁড়ে বেরিয়ে এলো।এসেই বড় করে দু'টো শ্বাস নিল।আহা! মুক্ত বাতাসের ঘ্রাণ! কাল রাতটা তার কিভাবে কেটেছে সেই জানে।কয়েকবার তো মনে হচ্ছিল সে বমি করেই দিবে।পরে অবশ্য ওয়াজিদের আতঙ্কিত মুখটা দেখেই সে বহু কষ্টে বমি চেপে রেখেছিল।পুরো বাসে তার চেয়েও ছোট ছোট মানুষরা বমি করছে না,আর সে বমি করছে।কি জঘন্য আর লজ্জাজনক ব্যাপার! যদিও দুই তিনবার সে ওয়াক ওয়াক করেছে,কিন্তু বমি আসেনি।ওয়াজিদ দ্বিধান্বিত হয়ে প্রশ্ন করেছিল,'বাস থামাতে বলব?একটু বের হয়ে পানি খাবে?'

রিমি শুধু মাথা চেপে উত্তর দিয়েছে,'নাহ,দরকার নেই।'

---

'এখন কেমন লাগছে রিমি?'

পেছন থেকে ওয়াজিদের আওয়াজ শুনতে পেয়েই রিমি ঘুরে দাঁড়ায়।সামান্য হেসে জবাব দেয়,'আগের চেয়ে অনেক ভালো।'

ওয়াজিদ সৌজন্যসূচক হেসে সামনে এগিয়ে গেল।মেয়েটির উপর শুরুতে রাগ হলেও শেষে তার ফ্যাকাসে মুখটা দেখে তার ভীষণ মায়া হয়েছে।ইশশ! মেয়েটা নিজেও তো ভীষণ কষ্ট পেয়েছে! ভোরের একটু আগে তার ক্লান্ত মাথাটা সে এলিয়ে দিয়েছিল ওয়াজিদের কাঁধে।ওয়াজিদ কিছু বলেনি।শুধু ঠান্ডা কন্ঠে একবার বলেছিল,'বেশি খারাপ লাগলে আমাকে জানাবে।দু'মিনিট বাস থামালে এমন কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে না।'

রিমি পাশ ফিরে একবার ওয়াজিদকে দেখে।যে কি না ধীর পায়ে সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।এই লোকটিকে রিমি কি বিশেষণ দিয়ে বিশেষায়িত করবে?নিখাঁদ ভদ্রলোক?অত্যন্ত ধৈর্যশীল?নাকি ভীষণ অমায়িক?কে জানে।তবে সে এইটুক জানে এই মানুষটা অনেক আলাদা।তার জায়গায় অন্য লোক থাকলে এতোদিনে রিমি নিশ্চিত দু'টো চড় খেয়ে ফেলত।ওয়াজিদ আক্ষরিক অর্থে ভদ্রলোক বলেই রিমি এখন পর্যন্ত কোনো চড় থাপ্পড় খায়নি।

নবনীতা গাড়ি থেকে নেমে চারদিক দেখে বলল,'ইশশ! কি সুন্দর!'

চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়।সবুজে সবুজে মিশে একাকার অবস্থা।মাথার উপর গাঢ় নীল আকাশ।আরহাম গাড়ি থেকে বের হতেই মিলিটারি দের একটি গাড়ি তাদের সামনে এসে থামল।নবনীতা কপাল কুঁচকে বলল,'আর্মিদের গাড়ি কেন?'

আরহাম আড়মোড়া ভেঙে জবাব দেয়,'পাহাড়ি এলাকা।সিকিউরিটি পারপাস।'

'ওহহ।'

গাড়ি থেকে সবার প্রথমেই যে লোকটা বেরিয়ে এলো,তার উচ্চতা চোখে পড়ার মতো।উঁচা,লম্বা,পেটানো শরীর।এক দেখায় বলা যায় লোকটা সুদর্শন।সে গাড়ি থেকে নামতেই আরহাম তার বুকের পাশের ব্যাচটা দেখে।সেখানে লিখা মুহিত তাশদীদ।তিনি সামনে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করলেন।হাস্কি স্বরে বললেন,'ওয়েলকাম স্যার।আমি মেজর মুহিত।এই দুইদিন আপনাদের সব সিকিউরিটির দায়িত্ব আমার।আপনাদের যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ইনফর্ম করতে পারেন।'

আরহাম জবাবে কেবল স্মিত হাসল।মুহিত তার থেকে চোখ সরিয়ে তার পাশে থাকা মেয়েটাকে দেখে।দেখতেই তার চোখ স্থির হয়।তার সাথে চোখাচোখি হতেই মেয়েটা দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়।মুহিত একটা শুকনো ঢোক গিলে।একবার মেয়েটার মুখ,আরেকবার তার হাত দু'টো দেখে।যেই হাতে সে শক্ত করে নিজের কুচি চেপে ধরেছে।

আদি ডাকতেই আরহাম কথা বলতে বলতে তার দিকে এগিয়ে গেল।নবনীতা পড়েছে এক অথৈ সাগরে।এই সাগরের নাম অস্থিরতার সাগর।কি বিচ্ছিরি আর বিব্রতকর মুহূর্ত! মুহিত গলা খাকারি দেয়।ঠান্ডা গলায় জানতে চায়,'হাই মিসেস নবনীতা।কেমন আছো?'

আবারো একরাশ অস্বস্তি।নবনীতা ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো,'জ্বী ভালো।'

'বাসার বাকিরা কেমন আছে?'

'জ্বী ভালো আছে।'

মুহিত স্মিত হেসে বলল,'অবশেষে তাহলে তুমি বিয়ে করেই নিলে।গুড।গুড চয়েজ।গুড ডিসিশন।পাত্র আমার চেয়েও বেশি পাওয়ারফুল পারসন আই মাস্ট সে।'

নবনীতা অন্যদিক দেখতে দেখতে কন্ঠ স্বাভাবিক করে বলল,'জ্বী।আপনি না বললেও আমি জানি।'

'সেটা ঠিক।তবে তুমি যেটা জানো না তা হলো আমিও বিয়ে করে নিয়েছি।একটা ছোট্ট ছেলেও আছে।'

নবনীতা অল্প হাসল।মাথা নেড়ে বলল,'দারুন ব্যাপার।সংসার জীবনের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।'

'তোমাকেও।'

'ধন্যবাদ।'

নবনীতা কোনোরকমে উত্তর দিয়ে সামনে হেঁটে যায়।মুহিত চট করে পেছন ঘুরে প্রশ্ন ছুড়ে,'তুমি বলেছিলে রাজনীতিবিদ তোমার একদমই পছন্দের না।'

নবনীতা থামে।কথাটা কেন যেন গায়ে গিয়ে লেগেছে।সে পেছন ফিরেই কটমট করে বলল,'রাজনীতিবিদ পছন্দ না।তবে সেটা বর হলে অন্য বিষয়।আরহামকে আমার পছন্দ।আপনি আমার পছন্দ নিয়ে না ভেবে নিজের পছন্দ নিয়ে ভাবুন।'

বলেই সে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায়।কি অদ্ভুত বিষয়! এই লোক এখন এসব কথা তুলছে কেন?দেখছে না নবনীতার ইতোমধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে।এখন এসব কথা তুলে লাভ আছে?উপরন্তু তার নিজেরও সংসার আছে।তার উচিত নিজের বউ বাচ্চা নিয়ে ভাবা।এখন এসব কথা বলার কোনো মানেই নেই।

সে এগিয়ে গিয়ে আরহামের একহাত জড়িয়ে ধরে।আরহাম কপাল কুঁচকে সন্দিহান গলায় জানতে চাইল,'ঘটনা কি বলো তো?তুমি হঠাৎ এতো ভালো ব্যবহার করছ কেন?তোমার হুটহাট পতিব্রতা আচরণ আমার ভীষণ ভয় লাগে কেন জানি।'

নবনীতা ঠোঁট চেপে হাসল।নিজের মাথাটা আলতো করে আরহামের কাঁধে রেখে সামনে হাঁটতে হাঁটতে হাসি হাসি মুখ করে বলল,'ঘটনা কিছুই না।এমনিই মন চাইছে দু'জন মিলে হাঁটতে।আমি না আপনার অর্ধাঙ্গিনী?অর্ধেক অঙ্গ ছাড়া আপনি চলবেন কেমন করে শুনি?'
.
.
.
.
সানশাইন অরফানেজ সেন্টার।প্রায় একশো শতাংশ জমি নিয়ে পুরো অরফানেজ হোমটা বানানো হয়েছে।সামনে সুন্দর একটা বাগান।একপাশে স্কুল,স্কুলের সামনে খেলার মাঠ।আরেক পাশে থাকার জায়গা।সবমিলিয়ে জায়গাটা দেখতে ভালোই লাগে।

নবনীতা অরফানেজ সেন্টারের নাম দেখেই ঠোঁট উল্টে বলল,'বাপরে! অরফানেজ সেন্টারের নাম তো খুব ইউনিক।আপনার বাবা মনে হয় খুব এস্থেটিক মানুষ ছিলেন।বাটারফ্লাই,সানশাইন-দু'টো নামই ভীষণ এস্থেটিক।'

আরহাম তার কথা শুনেই খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠে বলল,'আমার বাবা যদি জানতো ভবিষ্যতে তার দেওয়া নাম নিয়ে কেউ এতো কৌতূহল দেখাবে,তাহলে বাড়ির নামটাও আজিজ ভিলা না দিয়ে এস্থেটিক কিছু একটা দিতো।'
বলেই সে আরো কিছুক্ষণ হাসে।নবনীতা চোখ পাকিয়ে কেবল একনজর তাকে দেখলো।সবকিছু নিয়ে হাসি ঠাট্টা করাই বোধহয় আরহামের স্বভাব।সে কতো সুন্দর একটা কথা বলেছে,আর আরহাম সেটাকে স্রেফ উপহাস করে উড়িয়ে দিলো।

অরফানেজ হোমের একদম কাছাকাছি কয়েকটা কটেজ আছে।সবাই ক্লান্ত শরীরটা টেনে কোনোরকম হেঁটে এসে যার যার কটেজে গিয়ে বিশ্রাম করল।আরহাম ঘরে ঢুকেই ধাম করে খাটে শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে কতোক্ষণ শ্বাস নিল।নবনীতা কটেজে আসা মাত্রই সে মুখ খিঁচে বিরক্ত হয়ে বলল,'কাল রাতে আমি একটুও ভালো করে ঘুমুতে পারিনি।তোমার কাঁধ এতো শক্ত! বাপরে বাপ।হাড্ডি ছাড়া তো কিছুই নেই শরীরে।খেয়ে খেয়ে মাংস বাড়াবে বুঝেছ?তাহলে আরাম করে ঘুমানো যাবে।'

নবনীতা তীক্ষ্ণ চোখে তাকে পরোখ করল।কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষে দুষ্টুমি করে বলল,'মাংস বাড়ার একটা সাইড ইফেক্টও আছে।আপনি তখন আর হুটহাট ঘরে ঢুকেই আমাকে কোলে তুলতে পারবেন না।একটু রয়ে সয়ে তারপর কোলে নিতে হবে।'

আরহাম সাথে সাথে চোখ খুলে।গোল গোল চোখ করে নবনীতাকে দেখে তব্দা খেয়ে বলে,'কি বললে তুমি?'

নবনীতা আর উত্তর দিলো না।সে খুব ভালো করেই জানে আরহাম তার কথা শুনেছে।শুনেছে বলেই এমন প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।
আরহাম তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়।এক ছুটে নবনীতা কাছে গিয়ে তার থুতনি উঁচু করে বড় বড় চোখ করে বলে,'সিরিয়াসলি?তুমি ইদানিং লাগাম ছাড়া কথা বলছ পরী।আমার কিন্তু লজ্জা লাগে এসব।'

নবনীতা ঠোঁট উল্টে বলল,'আরে বাবারে! কতো লজ্জা আপনার! আর আপনি যখন রাতে বাড়ি ফিরে ঘর ভর্তি লোকের সামনে ডাকেন এ্যাই পরী! রুমে এসো তো।তখন লজ্জা লাগে না?'

'না লাগে না।কারণ জামাই একশোটা কারণে বউকে ডাক দিতে পারে।কেন ডাকছে সেটা মানুষ কি করে জানবে?মানুষ কি আমার রুমে ঢুকে বসে আছে নাকি?'

নবনীতা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,'জ্বী বুঝেছি।আপনিই ঠিক।এবার ছাড়ুন আমায়।'

আরহাম তাকে ছাড়ল না।উল্টো আচমকাই তাকে কোলে তুলে একপেশে হেসে বলল,'ছাড়ার জন্য তো ধরিনি ডার্লিং।'

নবনীতা আঁতকে উঠে চারপাশ দেখে চাপা স্বরে চেঁচায়,'কি সর্বনাশ! এখনই?'

'হ্যাঁ তো কি হয়েছে?'

'কেউ ডাকলে?'

'ডাকুক।সব ক'টা আ বিয়াত্তা।এগুলো ডাকলেও পাত্তা দিব না ব্যাস।এরা কেমন করে বুঝবে ম্যারিড লাইফের মজা?'

নবনীতা তার বচনভঙ্গি দেখেই ফিক করে হেসে ফেলল।সে তার সেট করে রাখা চুলগুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে বলল,'এখন লজ্জা করে না?'

'নাহ করে না।তোমার আর আমার মাঝে লজ্জা নামের কোনো ফাংশন নেই।গট ইট?'

***

বিকেলে সবাই মিলে অরফানেজ সেন্টারের সামনের খোলা মাঠটায় গিয়ে পৌঁছায়।একেবারে খোলা মাঠ,উপরে উন্মুক্ত আকাশ,থেমে থেমে বাতাস বইছে।আবহাওয়াটা এক শব্দে চমৎকার।

বাচ্চারা চোখ মেলে এক ঝাঁক আগন্তুক দের দেখে।এরা নাকি দুই দিন এখানেই থাকবে।এই মানুষগুলোকে তাদের ভালোই লাগছে।কতো সুন্দর হেসে হেসে আদর দিচ্ছে তাদের।তাদের অভাবের জীবনে সবচেয়ে বেশি অভাব বোধহয় এই আদরটুকুর ই।

আজকে রাতে বেশ ভালো রান্নার আয়োজন করা হয়েছে।আরহাম আগেই জানিয়ে রেখেছিল এই ব্যাপারে।সেই রান্নার ঘ্রান একটু পর পর এসে নাকে লাগছে।রিমি নাক টেনে টেনে বলল,'বিরিয়ানি তে ঝাল বেশি হয়েছে।'

আদি ভড়কে গিয়ে বলল,'কি আশ্চর্য! গন্ধ শুনে স্বাদ বুঝে গেছ তুমি?'

রিমি বোকা বোকা হেসে জবাব দেয়,'জ্বী ভাইয়া।আমার ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় অনেক শক্তিশালী।আমি শুঁকে শুঁকেই সব টের পেয়ে যাই।'

ওয়াজিদ তার কথা শুনেই মাথা নামিয়ে চাপা কন্ঠে বিড়বিড় করে,'তুমি তো টের পাবেই।ভাল্লুকদের ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় এমনিতেও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রখর।'

আদি রিমির দিকে দেখে দাঁত কেলিয়ে বলল,'তোমার মতো মানুষই তো রোজার সময় দরকার।আমরা রান্না করব।আর তুমি গন্ধ শুঁকে বলে দিবা কি কম হয়েছে।দারুণ একটা ব্যাপার!'

'না ভাইয়া।এখানে একটা সমস্যা আছে।'

'আবার কি সমস্যা?'

'আমি ঝাল,তেতো আর টকের বিষয়টা বুঝত পারি।কিন্তু লবনের বিষয়টা কেবল গন্ধ শুঁকে বলতে পারি না।'

আদি আশাহত হলো।মাটিতে থাকা কয়েকটা ঘাস ছিঁড়ে দূরে ছুড়ে মেরে বলল,'ধ্যাত! তুমি তো তাহলে আসল জিনিসটাই পারো না।'
.
.
.
.
সবাই বিস্তীর্ণ মাঠটায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে।বাচ্চারা এখানে সেখানে ছুটোছুটি করছে।আদি মাথা তুলে আকাশ দেখে।খোলা আকাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মিটমিট করে জ্বলতে থাকা তারা গুলো দেখে সে ভরাট গলায় বলে,'আহা কি সুন্দর আবহাওয়া! কেউ একটা সুন্দর গান গাও না।এ্যাই ওয়াজিদ।তুই ই একটা গান গা।তাক লাগিয়ে দে আমাদের।দেখিয়ে দে তোর লুকানো প্রতিভা।'

ওয়াজিদ বিরক্ত হয়ে বলল,'বাজে বকিস না তো।এসব গান টান আমি পারি না।'

শুভ্রা প্রফুল্ল স্বরে বলল,'আপাই কিন্তু দারুণ গান গায়।একদম সত্যি কথা।'

সাথে সাথেই সবাই নবনীতাকে চেপে ধরল একটা গান গেয়ে শোনানোর জন্য।নবনীতা বোকা বোকা হেসে বলল,'আরে ধ্যাত! আমি এতোও ভালো গাই না।'

'যাই পারো।একটা গেয়ে শোনাও।'

নবনীতা আর বেশি মানা করল না।সে গালের নিচে হাত রেখে কতোক্ষণ ভাবল।আরহামের স্থির দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ।সে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছে।সে কি গান গায় এটা শোনার জন্য সে উদগ্রীব।নবনীতা কতোক্ষণ ভেবেচিন্তে একটা গান মনে করল।তারপরই সুমিষ্ট কন্ঠে অল্প স্বল্প সুর তুলে গাইলো,

Chaahe tum kuchh na kaho maine sun liya
Ki saathi pyaar ka mujhe chun liya
Chun liya... maine Sun liya haa!

Pehla nasha, pehla khumar
Naya pyaar hai naya intezar
Kar loon main kya apna haal
Aye dil-e-bekaraar
Mere dil-e-bekaraar
Tu hi bata... mm..

আরহাম তব্দা খেয়ে তার দিকে তাকায়।সে না হিন্দি পারে না?তাহলে এখন সে কোন দেশের গান গাইছে?আমেরিকার নাকি কানাডার?সে চাপা স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,'সব বুঝেও না বুঝার ভান ধরে।বেয়াদব একটা!'

***

সেই রাতে তারা বেশ জমিয়ে আড্ডা দিলো।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষেও যে যার মতো হেঁটে বেড়ালো।সেনাবাহিনীর লোকজন আশেপাশেই আছে।তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।আরহাম নিজেই বলেছে সবাই মন মতো ঘুরতে।যেকোনো প্রয়োজনে মুহিতকে সবকিছু জানাতে।

নবনীতা,শুভ্রা আর চিত্রা বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল।তারা তাদের সাথে লুকোচুরি,রক পেপার সিজার,কানামাছির মতো ছেলেমানুষি খেলা খেলছিল।মাঝে মাঝে এই বাচ্চাদের বাহানায় নিজেদের শৈশবে পরিভ্রমণ করালে মন্দ হয় না।আরহাম ব্যস্ত ছিল কালকের দিনের প্রস্তুতি নিয়ে।সে চাইছে কালকে এদিকে একটা পিকনিকের আয়োজন করতে।বাচ্চাগুলো ছুটোছুটি আর খেলাধুলার সুযোগ পাবে।সেই সাথে তারা নিজেরাও ভালো সময় কাটাতে পারবে।সে রান্নাঘরে গিয়েই ব্যস্ত হয়ে বলল,'সবকিছু পরিমান মতো আছে তো?না হলে আমাকে জানাবে কিন্তু।'

বাকিরা বেরিয়েছে নৈশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।সারাহ ফোন দিয়ে নানারকম শর্ট স্ন্যাপ নিচ্ছিল।আদি তার ফোনের ছবিগুলো দেখে প্রসন্ন হেসে বলল,'বাহ! তোমার ফোনের ছবি গুলো চমৎকার হয়েছে।মেইল করে পাঠিয়ে দিও তো আমাকে।'

তাসনুভা তার হাঁটুতে কিল বসাল।দাঁত কিড়মিড় করে নিচু স্বরে বলল,'তুমি যদি আর একবারো সারাহ-র সাথে কথা বলো,তাহলে আমি আর জীবনেও তোমার সাথে কথা বলব না।'

আদি এক হাতে তার হুইলচেয়ারের হাতল আর অন্যহাতে নিজের কান ধরে মাথা ঝুকিয়ে বলল,'সরি সরি।এই যে কানে ধরলাম।আর হবে না বাচ্চা।তবুও তুমি মনে কষ্ট নিও না।'

রিমি নেটওয়ার্কের আশায় সামনে হাঁটতে হাঁটতে একদম পাহাড়ের ধাঁর ঘেঁষে দাঁড়ালো।কয়েকবার ফোনটা নেড়ে চেড়ে পুনরায় কানে চেপে বলল,'হ্যালো হ্যালো।শুনছো তো তোমরা?আমি ঠিক আছি।এ্যাই আব্বু।শুনো কথা?'

ওয়াজিদ তার পেছন পেছন এগিয়ে আসে।খানিকটা ধ'মকের সুরে বলে,'এখানে কেন এসেছ?এদিকে তো লোকজন কেউ নেই।সবাই অন্য দিকে।এদিক থেকে সরে এসো।পাহাড়ি এলাকায় এতো একা একা ঘুরা ভালো না।'

রিমি হঠাৎ তার আওয়াজ শুনেই লাফ দিয়ে উঠে।তারপরই পেছন ফিরে বড় বড় চোখ করে বলে,'ওহহ আপনি।ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি।'

সে চটপটে হয়ে সামনে পা বাড়ায়।হঠাৎই তার জুতোটা স্লিপ কেটে তার এক পা রাস্তা থেকে ছিটকে নিচের দিকে গিয়ে পড়ল।রিমি তাল হারাতে হারাতে এক চিৎকার দিলো,'ওয়াজিদ ভাইয়া বাঁচান!'

ওয়াজিদ চমকের পিলে পেছন ফিরে।সে কিছু বুঝে উঠার আগেই রিমি তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়।টান খেতেই ওয়াজিদ আঁতকে উঠে চিৎকার দেয়,'এটা কি করছ তুমি?'

রিমি তাল হারিয়ে সোজা পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে এলো।পুরোটা সময় সে শক্ত করে ওয়াজিদের হাত চেপে রাখল।মরলে সে একা মরবে কেন?জীবনসঙ্গী যেমন আছে,তেমন একটা মরণসঙ্গীও থাকা দরকার।যার সাথে শান্তিতে মরা যায়।ওয়াজিদ হবে তার মরণসঙ্গী।

ওয়াজিদ বিক্ষিপ্ত মেজাজে খেঁকিয়ে উঠে,'একটা চড় দেবো বেয়াদব।আমাকে টানলে কেন?'

পাহাড়ের উচ্চতা খুব বেশি না।তবে বেশ ঢালু পাহাড় হওয়াতে গড়াতে গড়াতে দু'জন বেশ দূরে কোথাও গিয়ে থামল।একটা শক্ত ভূমিতে নিজের অস্তিত্ব টের পেতেই ওয়াজিদ এক লাফে উঠে দাঁড়ায়।রিমি তখনও মাটিতে।সে তাকে তুলল না।উল্টো খেঁকিয়ে উঠে বলল,'পুরাই ফালতু মাথাখারাপ আকামলা একটা মেয়ে।নিজে একা পড়ছিলে,আবার আমাকে সাথে টেনেছো কেন?সহ্যেরও একটা সীমা থাকে।'

রিমি উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়ে।কাচুমাচু মুখ করে বলে,'সরি ভাইয়া।ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।তাই এমন করেছি।নেভার মাইন্ড প্লিজ।'

'একদম ঠাটিয়ে চড় দেব বেয়াদব।এখন এই জায়গা থেকে আমি তাদের কাছে ফিরব কেমন করে?'

ওয়াজিদ পকেট হাতড়ায়।তারপরই হতাশ হয়ে মাথা নাড়ে।যা ভেবেছে তাই,মোবাইলটা গড়িয়ে কোথাও পড়ে গেছে।অবশ্য মোবাইল থাকলেও বা কি?এই জায়গায় তো নেটওয়ার্কও পাওয়া যাবে না।সে রাগে ফুসতে ফুসতে চারদিক দেখে।এই অন্ধকারে সে এই মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় যাবে?এতো রাতে খারাপ মানুষের ভয় তো আছেই।সেই সাথে আছে হিং*স্র জন্তু,জানোয়ারের ভয়।সে কতোক্ষণ নিজের চুল টেনে শেষে খপ করে রিমির হাতটা ধরে সামনে হাঁটা শুরু করল।রিমি অবাক হয়ে বলল,'সেকি!কোথায় যাচ্ছি আমরা?'

ওয়াজিদ পেছন ফিরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,'আর একটাও কথা বলবে না।নয়তো এদিকেই ফেলে রেখে চলে যাব।ছাগল কোথাকার! গর্দভ একটা!'

রিমি একহাত মুখে চেপে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল,'না না,আর কিছু বলব না।তবুও আমাকে আপনার সাথে সাথে রাখুন।'

ওয়াজিদ দ্রুত কদম ফেলে সামনে এগোয়।কেবল একটা ঘর পেলেই হবে।অন্তত আজ রাত টা কাটানোর জন্য।অবশেষে আধঘন্টার মতো হাঁটার পর সে উঁচু টিলার উপর একটা বাঁশের ঘর দেখতে পেল।দেখেই তার মুখে হাসি ফুটল।সে রিমিকে টিলার নিচে দাঁড় করিয়ে কড়া গলায় বলল,'দাঁড়াও আগে দেখে আসি ভেতরে কেউ আছে নাকি।চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।আমি ডাকলে তারপর এসো।'

সে ধুপধাপ পায়ে বাড়িটার দিকে এগিয়ে যায়।কয়েকবার কড়াঘাত করতেই একটা বৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলল।ওয়াজিদ তাকে দেখেই সালাম দিলো।অমায়িক কন্ঠে বলল,'আসলে আমরা একটা বিপদে পড়েছি।আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।আপনি কি আজকে রাতের জন্য আমাদের এদিকে থাকতে দিবেন?ভোর হতেই আমরা চলে যাব।'

লোকটা আগাগোড়া তাকে দেখেই সূচালো চোখে প্রশ্ন করে,'আমরা মানে?তুমি আর কে?'

ওয়াজিদ আঙুল তুলে রিমিকে দেখায়।রিমি বৃদ্ধ লোকটাকে দেখা মাত্রই হাত তুলে হাই দেয়।ওয়াজিদ সামনে ফিরে জোরপূর্বক সামান্য হেসে প্রতিউত্তর করে,'জ্বী।আমি আর আমার ওয়াইফ।'

সে খুব ভালো করে জানে অন্য পরিচয় দিলে তাদের কিছুতেই এখানে জায়গা দেওয়া হবে না।তারচেয়ে ভালো আপাতত জামাই বউ পরিচয় দিয়ে কোনোরকমে রাতটা পার করে দেওয়া।সকাল হলেই তারা বেরিয়ে যাবে এখান থেকে।

তার বুদ্ধিতে কাজ হয়েছে।লোকটা তাদের অবস্থা দেখে মায়া করে তাদের ঘরে জায়গা দিলো।ওয়াজিদ ঘরে এসেই হাত মুখ ধোয়ার জন্য চাপকলের কাছে গেল।আর রিমি গিয়ে বসল বসার ঘরের বেতের সোফায়।বাড়িতে কেবল দু'জন মানুষ থাকে।বৃদ্ধ লোক আর তার স্ত্রী।
রিমি সোফায় বসতেই বৃদ্ধা মহিলা এক গ্লাস পানি হাতে এগিয়ে এলেন।রিমি তাকে দেখে মিষ্টি করে হাসল।বৃদ্ধা জানতে চাইলেন,'কয় মাস হয়েছে তোমার বিয়ের?নাকি অনেক বছর আগেই বিয়ে করেছ?'

রিমি পানি খাওয়ার মাঝেই বিষম খেল।কাশতে কাশতে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,'আরে না না।আমরা কোনো জামাই বউ না।আমাদের কারো বিয়েই হয়নি এখনো।'

বৃদ্ধা মহিলাটি হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠে বললেন,'কি?তোমরা বিবাহিত নও?'

রিমি ভয়ে ভয়ে ডানে বায়ে মাথা নাড়ে।কাচুমাচু মুখে বলে,'না।আমরা পরিচিত কিন্তু বিবাহিত নই।'
____

হট্টগোলের শব্দ কানে যেতেই ওয়াজিদ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো।বসার ঘরে আসতেই বৃদ্ধ লোকটা তাকে দেখামাত্র গর্জে উঠল,'মিথ্যুক! মেয়ে নিয়ে রঙ্গতামাশা করতে এসে পরিচয় দেও জামাই বউ বলে?এটা কি আমার বাড়ি,নাকি কোনো আবাসিক হোটেল?নষ্টামি করার আর জায়গা পাও না?'

ওয়াজিদ হতভম্ব হয়ে তার কথা শুনে।তারপরই চোখ সরিয়ে রিমির কাচুমাচু মুখটা দেখে।এরপর চুপচাপ মাথা নামিয়ে নেয়।গর্দভটা নিশ্চিত আরেকটা গর্দভগিরি করেছে।

***

রাত তখন কয়টা সে হিসেব ওয়াজিদের নেই।সে চোখ নামিয়ে বাঁশের ঘরটার মেঝে দেখে।তারপরই একটা তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ে।সে বার বার বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে এই মেয়েটার সাথে তার কিছুই নেই।পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে তারা বিপদে পড়েছে,তাই সাহায্য চেয়েছে।তারা যেন তাকে সাহায্য করে এজন্যই সে মিথ্যে বলেছে।নয়তো তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।দরকার পড়লে আজ রাতটা সে দরজার সামনে থেকেই কাটিয়ে দিবে।তার এতেও কোনো সমস্যা নেই।

কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছিল না,তখন সে তাদের কাছে আরহামের পরিচয় দিলো।জানাল যে তারা আরহামের সাথেই এসেছে।তার কথায় কাজ তো কিছু হলোই না,উল্টো বৃদ্ধ লোকটি চটে গিয়ে বলল,'তোর এমপির নাম তোর কাছেই রাখ।তোর ব্যবস্থা আমি করছি।এখন থেকে আর মিথ্যা বলে নষ্টামি করতে হবে না।আমি তোর পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করছি দাঁড়া।কত্তোবড় সাহস! আমার সাথে বাহাদুরি করে।'

তারপরই তিনি এই রাতের মাঝে কোথা থেকে একজন লোক সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরল।ওয়াজিদ কথাবার্তায় বুঝল লোকটা কোনো মসজিদের ইমাম।যে এসেছে তাদের বিয়ে পড়াতে।কি অদ্ভুত আর নাটকীয় বিষয়! আদির অনেক শখ ছিলো এরকম গ্রামবাসীর খপ্পরে পড়ে বিয়ে করার।অথচ সেই শখ ওয়াজিদের জীবনে বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।আশ্চর্য বিষয়! স্রষ্টা তো আদিকে এভাবে বিয়ে করালেও পারতো।ওয়াজিদের সাথে এমন হচ্ছে কেন?সে কি দোষ করেছে যে এমন বিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে তার বিয়ে হতে হবে?কেন জগতের সব বিব্রত পরিস্থিতি ওয়াজিদের ঝুলিতে এসে জমা হয়?

সে নির্বিকার হয়ে কবুল বলে।কবুল বলার পরেও তার বিশ্বাস হচ্ছিল না তার যে বিয়ে হয়ে গেছে।এসব কি?এগুলো কোনো বিয়ে হলো?মা নাই বাপ নাই,কেউ নাই।কেবল কবুল বলল আর বিয়ে হয়ে গেল?এটাও কি সম্ভব?

সে চোখ তুলে রিমিকে দেখে।রিমি মাথা তুলে চোরা চোখে সামনে দেখতেই ওয়াজিদের চোখ মুখের অবস্থা দেখে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়।কি ভয়ংকর সে চাহনি! এতো ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে কেন এই লোক?ওয়াজিদ একহাত মুঠ করে দাঁত কিড়মিড় করে।এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।একবার এই ছাগলটাকে হাতের কাছে পাক।চড় মেরে এর বাপের নাম যদি ভুলিয়ে না দেয়,তবে সেও ওয়াজিদ না।

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 45 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন