ফন্ট সাইজ:
থিম:
কোনো এক শ্রাবনে

পর্ব 46

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#কোনো_এক_শ্রাবণে[দ্বিতীয় অধ্যায়]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

(৪৬)

বিক্ষিপ্ত মেজাজে ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকেই ওয়াজিদ ফুসতে ফুসতে রিমির দিকে তাকায়।রিমি তার উপস্থিতি টের পেতেই মিনমিনে স্বরে বলল,'মিথ্যে বলেছেন সেটা তো আমাকে আগে জানাবেন নাকি?'

ওয়াজিদ তার দিকে তেড়ে এসে চেঁচায়,'আর একটা কথা যদি বলো না,এদিকেই গলা চেপে ধরব।অপদার্থ গাধা কোথাকার!'

রিমি আড়চোখে একবার তাকে দেখে।পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে তাকে ভেঙচি কাটে।ভাব এমন দেখাচ্ছে যেন এই বিয়েতে সে একাই কষ্ট পেয়েছে।আর রিমির খুব আনন্দ হচ্ছে।রিমি নিজেও তো এমন পরিস্থিতি চায় নাই।ঐ লোক কি নিজের কোনো দোষ খুঁজে পাচ্ছে না?বিষয়টা অনেকভাবেই কাটানো যেত।জামাই বউ বলার দরকার টা কি ছিল?

ওয়াজিদ অনেকক্ষণ ঘরের এই মাথা থেকে ঐ মাথা পায়চারি করে।শেষটায় বড় বড় কদমে রিমির মুখোমুখি বসে এক আঙুল তুলে কড়া গলায় বলল,'শোনো রিমি।এভাবে কোনো মানুষের বিয়ে হয় না।বিয়েতে কনের বাবা অথবা ভাইয়ের সম্মতি লাগে।মূল কথা যারা বিয়ে করছে তাদের সম্মতি লাগে।দু'জনের পরিবারের সামনে কবুল বললে তবেই সেটা বিয়ে হয়।এভাবে মাঝরাতে লোক ডাকিয়ে বিয়ে পড়ালে সেটাকে বিয়ে বলে না।অন্তত আমার এটাকে বিয়ে বলে মনে হয় না।আমি এটাকে বিয়ে হিসেবে গণ্যই করছি না।যাই হোক,সে কথা পরে।এখন যেটা বলব সেটা মন দিয়ে শুনো।কাল যখন আমরা আমাদের কটেজে ফিরব,তখন তুমি কাউকে এই ব্যাপারে কিছু বলবে না।একদম টু শব্দও করবে না।আমি সব বলব।আর তুমি চুপ থাকবে।ভুলেও বিয়ের কথা মুখে আনবে না।আমাদের কোনো বিয়ে টিয়ে হয়নি।

রিমি কোনোরকম চোখ তুলে তাকে দেখে।তারপরই জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলে,'ওকে ওকে।নো প্রবলেম।'

ওয়াজিদ খাট থেকে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে অত্যন্ত বিরক্তি ধরা কন্ঠে বলে,'তোমাকে কিছু বলে নিজের শক্তি অপচয় করতেও আমার রুচিতে লাগে।বললে তো কাজ হবেই না,খামোখা আমার শক্তি খরচ হবে।শুধু এইটুকু বলছি,তুমি আমার থেকে দূরে দূরে থাকবে।আগেও বলেছি,এখনও বলছি।বাট এখন আমি সিরিয়াস।প্লিজ রিমি,হাত জোড় করছি।দূরে থাকো তুমি।তোমাকে দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়।'

রিমি মাথা নামিয়ে বেডশিটের প্রিন্ট দেখে।যদিও খারাপ লাগা উচিত না,কিন্তু কোনো একটা অজানা কারণে তার খারাপ লাগছে।এমন দুম করে বলে দিলো তার থেকে দূরে থাকতে?রিমি কি ছ্যাচড়া?গায়ে পড়া স্বভাবের?নয়তো এমন করে বলল কেন?সে কেবল ছোট করে জবাব দিলো,'আচ্ছা ঠিক আছে।'

ওয়াজিদ কতোক্ষণ তার চুল টানে।কতোক্ষণ তার মুখটা দুই হাতে চেপে ধরে বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ে।বলে তো দিয়েছে যে সে এসব মানে না।কিন্তু তারপর কি?এতো বড় একটা বিষয় সে কতদিন ধামাচাপা দিবে?আদৌ কি সেটা সম্ভব?ওয়াজিদের মস্তিষ্ক বলে এটা সম্ভব না।কোনো না কোনো ভাবে একদিন মানুষ এটা জানবেই।এরপর কি হবে?সে দ্রুত মাথা নাড়ে।আর এসব ভাবতে পারবে না।ভাবলেই তার মাথা ব্যথা হয়।

ভোরের আলো ফুটতেই সে তাড়াহুড়ো করে বাঁশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।রিমিকে ডাকার প্রয়োজন বোধ করল না।রিমি তো দেখছেই সে বেরিয়ে যাচ্ছে।তার উচিত নিজ থেকে তার পেছন পেছন ঘর থেকে বেরিয়ে আসা।ওয়াজিদ কেন ডাকবে তাকে?এতো তোষামোদি সে করতে পারবে না।

রিমিকে অবশ্য তোষামোদ করার কিছু নেই।সে নিজেই চুপচাপ বেরিয়ে এলো।ওয়াজিদ চোখ মেলে চারদিক দেখে নিজেদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে।তারপরই অনুমানে খানিকটা সামনে এগোয়।

পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তায় রিমির চলতে কষ্ট হচ্ছিল।সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,'একটু আস্তে হাঁটুন না।'

ওয়াজিদ পেছন না ফিরেই সামনে যেতে যেতে জবাব দিলো,'পারব না আস্তে হাঁটতে।দ্রুত কটেজ যেতে হবে।আস্তে হাঁটা সম্ভব না।'

সে ইচ্ছাকৃতভাবে তার হাঁটার গতি বাড়ায়।রিমি যেতে যেতে এই টিলা ঐ টিলার সাথে হোঁচট খায়।হোঁচট খেতেই মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে।ওয়াজিদ ঘাড় ঘুরিয়ে একবারও তাকে দেখল না।
পাক,আরো কয়েকটা ব্যথা পাক।সে ব্যথা পেলে ওয়াজিদ পৈশাচিক আনন্দ পায়।হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এসে ওয়াজিদ সঠিক পথ খুঁজে পেল।সে কেবল একবার পেছন ফিরে বলল,'তাড়াতাড়ি এসো।রাস্তা পেয়ে গেছি।'

রিমি একপ্রকার ছুটতে ছুটতে তাকে অনুসরণ করে।হঠাৎই পায়ে খানিকটা যন্ত্রণা শুরু হতেই সে মাথা ঝুকায়।মুহূর্তেই তার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়।সে চওড়া গলায় চেঁচায়,'ভাইয়া!!! আমার পা দেখুন।'

ওয়াজিদ পেছন ফিরে।এগিয়ে না এসে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই প্রশ্ন করে,'সমস্যা কি?আবার কি হয়েছে?'

রিমি কোনোরকমে পা টা তুলে বলল,'আমার পায়ে জোঁক ধরেছে ভাইয়া।দেখুন রক্ত খেয়ে খেয়ে কি অবস্থা করেছে পায়ের।'

ওয়াজিদ তার কথা শুনল।তারপরই সামনে ফিরে হনহন করে হেঁটে যেতে যেতে বলল,'খেয়ে ফেলুক।সব রক্ত খেয়ে ফেলুক।আরো তো কতো মানুষ আছে।কই তাদের তো কিছু হয় না।জোঁক শুধু তোমাকেই কেন ধরে?পুরাই অসহ্য লাগছে আমার।'

'ভাইয়া! এখন কি করব?'

'জানি না আমি কি করবে।আমি কিছু করতে পারব না।'

সে বড়ো বড়ো পায়ে সামনে হেঁটে যায়।তার এখন কটেজে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে হবে।মাথা এমনিতেও যথেষ্ট গরম।এখন আর অন্য ঝামেলা সে সহ্য করতে পারবে না।

রিমি শূন্য চোখে তার প্রস্থান দেখে নেয়।তার অজান্তেই তার দুই চোখ ভরে এসেছে।সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে।ধ্যাত! এইটুকুতে কেউ রাগ করে?সে নিজেকে বোঝায় ওয়াজিদের ভাইয়ের মন খারাপ,তাই সে এমন আচরণ করেছে।নয়তো সে ঠিকই এগিয়ে এসে রিমির ব্যাপারটা ভালো করে দেখতো।

সে দ্রুত তার পেছন পেছন ছুটে।চোখ দু'টো তবুও যে কেন বারবার ভরে আসছে কে জানে!

***

রিমি আর ওয়াজিদের অনুপস্থিতি সবার আগে টের পেল আদি।সারারাত এদিক সেদিক ঘুরাঘুরির পর ভোরের দিকে তারা যখন সবাই সবার কটেজে ফিরে এলো,তখন দু'জনকে না দেখতে পেয়ে সে খানিকটা চিন্তিত হলো।প্রায় দশ মিনিট এখানে সেখানে খোঁজাখুঁজির পর সে নিশ্চিত হলো ওয়াজিদ সত্যিই আশেপাশে কোথাও নেই।

সে খানিকটা দ্বিধায় পড়ল।আরহামকে কি এখনই জানিয়ে দিবে?নাকি আরেকটু অপেক্ষা করবে?আরিশ আর তাসনুভা তো ঘুমিয়ে কাদা।আরহামকে বললে সে আবার অকারণে অস্থিরতা দেখাবে।আচ্ছা মুহিত কোথায়?তার থেকে সাহায্য নেওয়া যায়।

আদি দ্রুত মিলিটারি টেন্টের দিকে ছুটে।মুহিত তখন টেন্টের বাইরেই ছিলো।তার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে।আদি তাকে দেখতেই বড় বড় পা ফেলে তার কাছে গেল।বিচলিত গলায় বলল,'এক্সকিউজ মি মুহিত।আমি আমার ফ্রেন্ড ওয়াজিদকে অনেকক্ষণ যাবত দেখছি না।কটেজে ফেরার পর থেকে সে আর সাথে আরেকজন মেয়ে মিসিং।তুমি কি একটু দেখবে ব্যাপারটা?'

মুহিত সাথে সাথে সামনে যেতে যেতে বলল,'কতোক্ষণ আগের ঘটনা?এসো তো,আমার সাথে এসো।দেখছি আমি ব্যাপারটা।'

মুহিতের খুব বেশি মাথা ঘামাতে হলো না এই ব্যাপারে।একটু সামনে আসতেই আনুমানিক দুইশো মিটার দূরত্বে একটা ছেলের অবয়ব দেখতে পেয়ে সে দ্রুত দূরবীনে চোখ রাখে।তারপরই সেটা আদির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,'দেখো তো।এটা তোমার বন্ধু না?'

আদি দূরবীন টা চোখের উপর ধরেই চঞ্চল হয়ে বলল,'আরে হ্যাঁ।এটাই ওয়াজিদ।'

সে দূরবীনটা মুহিতের নিকট ফিরিয়ে দেয়।ওয়াজিদের আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না।সে নিজেই দৌড় লাগায় সামনের দিকে।ওয়াজিদের কাছাকাছি এসেই সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,'তুই কোথায় ছিলি এতোক্ষণ?'

ওয়াজিদ গুরুগম্ভীর স্বরে জবাব দেয়,'রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম।তাই ফিরতে দেরি হয়েছে।'

'আর রিমি?রিমি কোথায়?'

'আছে।পেছনেই আছে।'

বলে সে আর দাঁড়ায় না।আগের চেয়েও দ্রুত গতিতে হেঁটে কটেজের দিকে চলে যায়।এখানে থাকলেই সে উল্টাপাল্টা বলে ফেলবে।তার চেয়ে ভালো কটেজে কতোক্ষণ ঘুমিয়ে মনটাকে একটু ঠান্ডা করা।

রিমি ফ্যাকাশে হেসে সামনের দিকে হেঁটে এলো।আদি কপাল কুঁচকে বলল,'ঘটনা কি বলো তো?ওয়াজিদ এমন থম মেরে আছে কেন?হয়েছে টা কি?'

সে দ্রুত মাথা নেড়ে জানায়,'এমন কিছু না ভাইয়া।রাস্তা হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।'

'ওহহ আচ্ছা।'

রিমি নিজ থেকেই করুণ স্বরে ডাকে,'ভাইয়া!'

'হু?'

'ভাইয়া একটা সমস্যা হয়েছে।'

'সেটা কি?'

রিমি নিজের পা দেখায়।কাচুমাচু হয়ে বলে,'জোঁক সব রক্ত খেয়ে নিচ্ছে।'

আদি আঁতকে উঠে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে।চোখ বড় বড় করে বলে,'আল্লাহ! এসব কি?'

'এসব জোঁক।রক্ত খেয়ে শরীরের সাথে লেগে থাকে।লবন ছিটিয়ে এদের শরীর থেকে আলাদা করতে হয়।'

আদি দ্রুত নাক চেপে ধরে।মুখ খিঁচিয়ে বলে,'ইসস!! কি বিচ্ছিরি! বমি পাচ্ছে আমার।'

'বমি পেলে নাক ধরছেন কেন?'

আদি মাথা তুলে।নাক চেপে ধরেই বলে,'আমি পোকার শরীর দেখেই তার ঘ্রাণ বুঝে ফেলি।এই পোকাটার গন্ধ ভালো না।'

***

নবনীতা ঘুম ভাঙার পরেই চুপচাপ হেঁটে কটেজের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।আজকে তার ঘুম একটু দেরিতেই ভেঙেছে।আরহাম আরো অনেক আগে উঠেছে।সে ব্যস্ত কিসব রান্নাবান্না নিয়ে।কালকে আসার পর থেকে এই পর্যন্ত সে পাঁচবারের উপরে জামা পাল্টেছে।তার বডি স্প্রে-র গন্ধে ঘরে ঢোকা যায় না।একটা বডি স্পে তো বোধ হয় মাখতে মাখতে শেষই করে ফেলেছে।টি শার্ট গুলো খুলে খুলে যেখানে খুশি সেখানে ফেলে রেখেছে।এই পুরো ঘর গোছাতেও তো নবনীতার আধঘন্টা লাগবে।

সে সবকিছু গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।তাদের পাশের ঘরে শুভ্রা আর চিত্র ঘুমিয়েছে।সে লক ঘুরিয়ে ঘরের ভেতর উঁকি দিতেই দেখল তারা কেউ ঘরে নেই।নিশ্চয়ই বাচ্চাদের কাছে গিয়েছে।কোমর সমান চুলগুলোকে একহাতে পেঁচিয়ে কোনোরকমে ক্লাচারে পুরে সে তার কটেজ থেকে বের হলো।

দূরে আরিশকে দেখা যাচ্ছে।সে আকাশের ছবি তুলছে খুব মনোযোগ দিয়ে।আদি মোবাইলে একটানা বকবক করেই যাচ্ছে।নবনীতার সাথে চোখাচোখি হতেই সে হাত তুলে হাই দেয়।নবনীতা জবাবে কেবল মুচকি হাসে।

বেলা বাড়তেই সবাই দুপুরের খাবারের জন্য মাঠে এসে জড়ো হলো।শুধু ওয়াজিদ ছাড়া।আরহাম কপাল কুঁচকে বলল,'ঘটনা কি?ওয়াজিদ কোথায়?'

আদি মাথা চুলকে বলল,'কে জানে! তার নাকি ঘুম পাচ্ছে খুব।একটু পরে নাকি আসবে।'

রিমি মলিন মুখে ওয়াজিদের কটেজের দিকে তাকায়।সে আছে বলেই সম্ভবত খেতে আসতে চাইছে না।জিনিসগুলো যে হুট করে কেমন হয়ে গেল,সে নিজেও কিছু বুঝতে পারছে না।তার নিজেরও কেমন কান্না কান্না পাচ্ছে।সে ভেবে রেখেছে সে বাসায় গিয়ে মন মতো কাঁদবে।আপাতত এসব কান্না একটু চেপে রাখাই ভালো।

____

সবাই দুপুরে খাওয়ার পর পুনরায় চারদিকে হাঁটাহাঁটি করছিল।নবনীতা চিত্রার হাতটা টেনে ধরে কড়া গলায় বলল,'এভাবে ছুটছিস কেন?পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবি তো।'

চিত্রা সে কথা গায়ে মাখলো না।সে ছুটে এসে নবনীতাকে জাপ্টে ধরে বলল,'আপাই তুমি না বলেছিলে আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে একসাথে ছবি তুলব?'

নবনীতা তার থুতনিতে হাত রেখে দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,'আরে তাই তো।আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।এই শুভি এদিকে আয় তো।'

শুভ্রা হাসিমুখে এগিয়ে আসে।নবনীতা আরিশকে ডেকে মিষ্টি হেসে বলল,'ভাই আমাদের তিন বোনের একটা সুন্দর ছবি তুলে দাও তো।আমরা আবার নতুন করে অ্যালবাম সাজাবো।'

আরিশ তারই মতো মিষ্টি হেসে ক্যামেরা সেট করে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।কয়েকটা ছবি তোলার পরেই চিত্রা দু'জনকে ফেলে সামনের দিকে ছুটে যায়।

কালো রঙের টিশার্ট টা পেছন থেকে কেউ টেনে ধরতেই আরহাম পেছন ফিরে।চোখ পাকিয়ে জানতে চায়,'কিরে চিত্র! জামা ধরে টানিস কেন?জানিস না আমার টিশার্ট গুলো আমার কতো পছন্দের?'

চিত্রা তার হাত চেপে তাকে সামনে টানতে টানতে বলল,'তাত্তারি আমার সাথে এসো।'

সে তাকে টেনে নিয়ে আরিশের সামনে দাঁড় করায়।রিনরিনে গলায় বলে,'আমাদেরও অনেক গুলো ছবি তুলে দাও আরু।আমরা আমাদের নতুন অ্যালবামে সব জমাবো।'

আরিশ তার কথা শুনেই মুচকি হাসল।এই মিষ্টি বাচ্চাটা তাকে ভালোবেসে ছোট্ট করে আরু বলে ডাকে।এই সম্বোধনটা আরিশের বেশ ভালো লাগে।সে ক্যামেরার এঙ্গেল ঠিক করতে করতে বলল,'ওকে বস।এখনই তুলে দিচ্ছি।'

আরহাম আর চিত্রা অগনিত ছবি তুলল।একেক ছবির একেক পোজ।নবনীতা কপাল চাপড়ে বলল,'কি একটা অবস্থা! আপনি তো আমার সাথেও এতো গুলো তুলেননি।আর চিত্রর সাথে এতো গুলো?'

আরহাম মুখ কুঁচকে বলল,'তুমি কি চিত্র'র মতো এতো কিউট নাকি?নয়তো তোমার সাথেও তুলতাম।তুমি হচ্ছো প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারদের মতো।কেমন জানি অদ্ভুত।দেখলেই মনে হয় রেগে আছো।'

***

নবনীতা একশো বারের উপরে দরজা ধাক্কায়।অথচ আরহাম দরজা খোলা তো দূর,একবার সাড়া পর্যন্ত দিলো না।নবনীতা পড়েছে বিপাকে।সে পুনরায় অনুনয় করে ডাকলো,'আরহাম! প্লিজ দরজা টা অন্তত খুলুন।আমার কথা তো শুনুন।'

আজ আবার একটা ঝামেলা হয়েছে।বিকেলে নাস্তার জন্য অনেকরকম স্ন্যাকস বানানো হচ্ছিল।হঠাৎই মুহিত তার পাশে এসে বলল,'তুমি না ফুচকা খুব পছন্দ করো?তাই আমি তোমার জন্য সেটার ব্যবস্থাও করেছি।যদিও এখানকার ফুচকা ঢাকার মতো এতো মজা না।তবুও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।খেয়ে দেখতে পারো।'

নবনীতা বিব্রত হয়ে তার দিকে তাকায়।ভদ্রতার খাতিরে সামান্য হেসে জবাব দেয়,'জ্বী ধন্যবাদ।'

একটু এগিয়ে সামনে দেখতেই তার চোখ কপালে উঠল।যেই ভয়টা সে পেয়েছিল সেটাই হয়েছে।আরহাম তাকে আর মুহিতকে একসাথে দেখে নিয়েছে।দূরের একটা গাছের নিচে সে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।তার স্থির,অতিমাত্রায় শীতল দৃষ্টি নবনীতার দিকে নিবদ্ধ।সে বোকা না।দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো তার জন্য অসম্ভব কিছু না।নবনীতা চোরা চোখে আবারো তাকে দেখে।কি অদ্ভুত! সে এতো ভয় পাচ্ছে কেন?সে তো কোনো অন্যায় করেনি।মুহিত তো তার প্রেমিক না।তাহলে এতো ভয় কিসের?

সে ভয় পাচ্ছিল আরহামের প্রতিক্রিয়া নিয়ে।আরহাম যদি কিছু করে?যদি উল্টাপাল্টা কিছু বলে পরিস্থিতি নষ্ট করে তখন?তখন নবনীতার চেয়ে অপ্রীতিকর অবস্থায় আর কেউ পড়বে না।সে এক প্রকার ছুটতে ছুটতে আরহামের কাছে যায়।গিয়েই তার একটা হাত লুফে নিয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে অনুনয় করে,'প্লিজ আরহাম।আপনি মুহিতকে কিছু করবেন না প্লিজ।'

আরহাম আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকায়।তার কথা শুনেই তার সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠেছে।সে বিক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠল,'সিরিয়াসলি?তুমি এখনো তোমার সেই মেজর কে নিয়ে ভাবছ?'

নবনীতা ভড়কে গিয়ে বলল,'কি অদ্ভুত! তাকে নিয়ে কখন ভাবলাম?শুধু বললাম আপনাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে।মুহিত,,'

আরহাম এক ঝাড়ায় নিজের হাত সরিয়ে নেয়।দাঁত কিড়মিড় করে বলে,'চুপ করো তো।সারাক্ষণ কানের কাছে মুহিত মুহিত শুনতে ভালো লাগে না।থাকো তুমি তোমার মুহিতকে নিয়ে।নিশ্চিন্তে থাকো।আমি কিছু করব না।যা খুশি করো তুমি।'

বলেই সে হনহনিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।নবনীতা শাড়ির কুচি চেপে ধরে ছুট লাগায় তার পেছন পেছন।আরহাম পেছন ফিরে কর্কশ কন্ঠে চেঁচায়,'একদম আমার ঘরে আসবে না।তোমার মুখটা দেখতেও অসহ্য লাগছে আমার।'

বলা শেষ করে নিজের রুমে গিয়ে সেই যে সে দরজা বন্ধ করেছে,তারপর দুই ঘন্টায়ও আর খোলার নাম নেই।নবনীতা দুই ঘন্টা যাবত তার দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে একপ্রকার ক্লান্ত।সে শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,'আমি দরজার সামনেই আছি।আপনার যদি একটু করুণা হয় এই মেয়েটার জন্য,তাহলে দয়া করে দরজা টা খুলবেন।নয়তো সারারাত এভাবেই থাকুন।'

একমিনিট যেতেই খট খট শব্দে দরজা খুলে।নবনীতা বড় বড় করে দু'টো শ্বাস ছেড়ে ভেতরে পা রাখে।আরহাম দরজা খুলেই পুনরায় খাটে গিয়ে শুয়েছে।

নবনীতা ধীর পায়ে হেঁটে তার পাশটায় গিয়ে বসল।তার চুলে হাত ছুয়িয়ে নিচু স্বরে ডাকল,'আরহাম! ও আরহাম! কথা তো শুনুন।'

'কি শুনব?তোমার প্রেমকাহিনী শুনতে আমি আগ্রহী নই।'

'আগ্রহী না হলেও শুনতে হবে।'

সে এক লাফে উঠে বসে।দ্রুত কদমে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।নবনীতা তার মতিগতি বুঝতেই ছুটে গিয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।গাঢ় স্বরে বলল,'না না।এখন যাওয়া যাবে না।'

আরহাম মুখ খিঁচে তার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।বিরক্ত গলায় বলল,'ভালো লাগে না তো।সরো তুমি।বিরক্ত লাগছে ভীষণ।বালের ম্যারিড লাইফ।আমি আগেই ভালো ছিলাম।'

বলেই সে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করে।নবনীতাও নাছোড়বান্দা।সে পুনরায় শক্ত হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে।নরম গলায় বলে,'একটা গান গাই?'

আরহাম উত্তর না দিয়ে কেবল সটান দাঁড়িয়ে থাকল।নবনীতা মুচকি হেসে সুমিষ্ট কন্ঠে কেবল দুই লাইন গাইলো,
'আভি না যাও ছোড় কার,[এখনই ছেড়ে যেও না,]
ইয়ে দিল আভি ভারা নেহি।[আমার মন এখনো ভরে নাই]
.
.
.
.
ঘরের এক কোণায় হলদে রঙের বাতি জ্বলছে।নাতিশীতোষ্ণ হৃদয় জুড়ানো বাতাস পর্দা ঠেলে ঘরের ভিতর প্রবেশ করছে।অগ্রহায়ণ শুরু হবে কিছুদিন বাদেই।বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা স্পষ্ট বিদ্যমান।

চব্বিশ বছর বয়স্কা মেয়েটি আস্তে করে তার স্বামীর বক্ষস্থলে মাথা রাখে।তারপরই শক্ত করে দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে।সে অনুভব করে এই মুহুর্তটা তার ভীষণ প্রিয়।এই যে বিষন্ন আর বিক্ষিপ্ত মনটা হুট করেই কেমন ভালো হয়ে গেছে,এই ব্যাপারটা তার খুব ভালো লাগে।অন্যপাশের মানুষটাও তো আচমকাই ঠান্ডা হয়ে গেছে।মেয়েটির চেয়ে তো তার অনুভূতি আলাদা কিছু না।

মেয়েটি মুচকি হেসে বলতে শুরু করে,'তো এটা হলো আমার গল্প।যেই গল্পটা আপনাকে শুনতেই হবে।আমি ছিলাম একেবারের বাস্তবতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ।বাবা নেই,মা নেই।শুধু আছে দু'টো ছোট্ট বোন আর মাথার উপর এত্তো এত্তো দায়িত্বের বোঝা।আমি ভীষণ উদ্ভ্রান্ত ছিলাম।জীবন তার করুণতম রূপ আমার সামনে মেলে দিয়েছিল।তারপর আমার জীবনে একজন মানুষের আগমন হলো।সে এলো আর কি হলো জানি না।আমি হুট করেই নিজের কৈশোরে ফিরে গেলাম।যেই কৈশোর আমার জীবন থেকে অনেক আগেই চলে গিয়েছিল।আমি অভিমান করা শিখলাম,আমি গাল ফুলানো শিখলাম।আমি সব শিখে গেলাম।আমি নিজেকে চূড়ান্ত রকমের আবেগী নারী রূপে আবিষ্কার করলাম।অথচ আমি ছিলাম ভীষণ মজবুত,প্রখর আত্মসম্মানে ভরপুর।পরে বুঝলাম,আত্মসম্মান কমে নি।আমিই নতুন একটা আমিকে খুঁজে পেয়েছি।এই আমিটাকেও আমার ভালো লাগে খুব।আপনি জানেন,যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তাকে আমার কতোখানি ভালো লাগে?এই যে সে মন খারাপ করল,আমি নিজে ছটফট করতে করতে হয়রান হয়ে যাচ্ছি।কারণ তার মনে কষ্ট দিতে আমার ভালো লাগে না।আমি কি করে তাকে বুঝাই সে ব্যতীত আমার জীবনে আর কেউ নেই?কি করে বোঝাই সে ছাড়া আমার এতো যত্ন আর কখনো কেউ করেনি?কি করে বুঝাই তার মতো করে কেউ কখনো আমার জন্য ভাবে নি।মাঝরাতে কাকভেজা হয়ে যেই মানুষটা আমার জন্য ফুচকা হাতে হসপিটালে এসেছিল,তাকে কি করে কষ্ট দিব আমি?আমি কেমন করে তাকে বুঝাই তাকে আমি কতোখানি ভালোবাসি?ভালোবাসা কি মুখের স্বীকারোক্তি তে বোঝানো যায়?নাকি আচরণে বোঝাতে হয়?সে কি আমার আচরনে বুঝে না আমি তাকে কতোখানি ভালোবাসি?'

আরহাম চুপচাপ তার কথা শুনল।নবনীতা থামতেই সে কাঁপা স্বরে বলল,'তুমি আমাকে ভালোবাসো পরী?'

নবনীতা মাথা না তুলেই জবাব দেয়,'হু বাসি।'

সময় গড়ায়।আচমকা নবনীতা ফুপিয়ে উঠে।তার হাতের বন্ধন আরো শক্ত করে ক্রন্দনরত স্বরে বলে,'আমি এজন্য আপনাকে বারণ করিনি যে আপনি মুহিতকে কিছু করলে আমার তার জন্য কষ্ট হবে।আমি এজন্য বারণ করেছি কারণ আপনি কিছু করলে সেই ঘুরে ফিরে আপনারই সমস্যা হবে।আপনি কেন বুঝতে চান না?সবকিছুতে হঠকারিতা ভালো না।'

আরহাম সেসব কিছু শুনলো না।সে আগের মতোই বলল,'আমায় ভালোবাসো পরী?'

নবনীতা মাথা তুলে।একহাতে তার খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি গালে হাত রেখে অন্য গালটায় প্রগাঢ় চুমু খায়।ঘোরলাগা কন্ঠে বলে,'হুম বাসি।একশোবার বাসি।'

'তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো?'

'জ্বী।সত্যিই।'

'আবার বলো তো।'

নবনীতা আলগোছে হাসে।একবার বড়ো করে শ্বাস টেনে বলে,'জ্বী আমি নবনীতা নূর,চিত্র আর শুভির পরী আপাই,তাসনুভা আর আরিশের পরী ভাবি,আর আপনার পরী সত্যিই আপনাকে এতো এতো এতো বেশি ভালোবাসি।আপনি চাইলে আমি একশোবার এই কথা বলতে পারব।কারণ সত্য কথা দিনে একশোবার বলা যায়।'

আরহাম তার কথা শুনেই শব্দ করে হাসল।নবনীতা চোখ মুছে বলল,'আপনি সেদিন একটা কথা ভুল বলেছিলেন।আপনি বলেছিলেন আপনার মা আমার চেয়েও ভাগ্যবতী কারণ তিনি স্বামী হিসেবে খুব ভালো কাউকে পেয়েছিলেন।কিন্তু আজ আমি বলছি আমি আপনার মায়ের চেয়েও বেশি ভাগ্যবতী কারণ আপনার মা জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসা ধরে রাখতে পারেনি।কিন্তু আমি পারব।আমি সারাজীবন এই ঘর,সংসার এই সবকিছুকে ধরে রাখব।এই যত্ন ভালোবাসা সবকিছুতে আমার লোভ জন্মেছে।আমি আর এসব ছাড়ছি না আরহাম।'

চলবে-

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 46 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন