ফন্ট সাইজ:
থিম:
#:তবুও_তোমার_প্রেমে_ আমি _পড়েছি

পর্ব 5

লেখক: #লেখনীতে:অধরা মিনহা

—“আমি ক্রাইম প্যাট্রোল দেখে বড় হয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি আপনি আমাকে ভুলভাল ওষুধ দিয়ে মেরে ফেলতে চাইছেন। কিংবা খারাপ কোনো ওষুধ খাইয়ে ধীরে ধীরে আমার শরীরের অঙ্গগুলো অচল করে দেবেন! এতটা ইজি হিসেবে নিবেন না এই নাবিহা আরা নৌশিকে। আপনার প্ল্যান ধরে ফেলেছি।”

সকালের নরম ঘুম এখনো পুরোপুরি কাটেনি নৌশির। অফিসে যাওয়ার আগে নৌশিকে ঘুম থেকে ডেকে ওষুধ খাইয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল রুদ্রিক। আর সেই কথাটুকু শুনেই ঘুমের মধ্য থেকেই বিরক্তিতে একনাগাড়ে এইগুলো কথা বলে মেয়েটা। কথা শেষ করে নৌশি মুখটা কুঁচকে ভেংচি কাটে রুদ্রিককে। তারপর আবার বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।

রুদ্রিক কিছুক্ষণ সরু চোখে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ দুটো আরো ছোট করে বিরক্ত গলায় বলে,
— বেশি কথা বলে সকাল সকাল আমার মাথা খেও না। নয়তো দেখা যাবে, আমার সচল হাতটা দিয়ে তোমার অচলের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রেইনটা খুলে ফেলব!

কথাটা শুনে নৌশি এবার বালিশ থেকে মাথা তুলে ফুঁসে ওঠা কণ্ঠে বলে,
— আমার ব্রেইনটা কি আপনার বাপ-দাদার সম্পত্তি?

রুদ্রিক একটুও বিচলিত হয় না। বরং নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
— না। তুমি পুরো আমার একার সম্পত্তি। তিন কবুল বলে কিনেছি।

বিয়ের কথা উঠতেই নৌশির চোখেমুখে সিরিয়াস একটা ভাব ফুটে উঠে। সে শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বলে,
— বিয়ের কথা তুলে ভালো করেছেন। আমার দেনমোহর কই? দেনমোহরও দিলেন না, আবার মাফও চেয়েছেন বলে মনে পড়ছে না।

দুই পা মুড়িয়ে বসে নৌশি নিজের কোলে বালিশটা রাখে। অন্যদিকে রুদ্রিক শার্টের হাতা ভাঁজ করতে করতে ভ্রু কুঁচকে তাকায় নৌশির দিকে।
— কিসের মাফ?

নৌশি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— ওই যে, দেনমোহর না দিয়ে মাফ চেয়ে নেয় না ছেলেরা? ওটার কথাই বলছি। আপনি তো মাফ চাননি!

রুদ্রিক কথাটা শুনে সরু কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— আমি মাফ চাইব?

কথাটা বলেই রুদ্রিক তিরস্কারের হাসি হাসে। নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— মাফ না চাওয়াই ভালো। আমি কোনো মাফ-টাফ করব না। আমি ছোট থেকেই ভেবে রেখেছি, দেনমোহরের টাকা দিয়ে আমার মোবাইলে স্ক্রিনশট করে রাখা সব ড্রেস আর জুয়েলারি কিনব। তাই মাফ চেয়ে লজ্জা পাবেন না।

নৌশির কথা শুনে রুদ্রিক আর বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে,
— তোমার মাফ তোমার কাছেই রাখো। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এসে ব্রেকফাস্ট করো। তারপর তোমাকে ওষুধ খাইয়ে আমি হাসপাতালে যাব।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
— ওষুধ খেতে আমার ভালো লাগে না।

রুদ্রিক বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে চুল আঁচড়াচ্ছে। চিরুনির চাল থামায় না। সেভাবেই উত্তর দেয়,
— তোমার খেতে ভালো লাগবে কি লাগবে না, সেই মোডের ওপর ডিপেন্ড করে ওষুধ দেওয়া হয়নি। চুপচাপ ওষুধ খাবে।

কথাটা বলেই রুদ্রিক চিরুনিটা আবার ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দেয়। তারপর টেবিল থেকে নিজের ঘড়িটা হাতে নেয়। তখনি নৌশি আবার বলে উঠে,
— না খেলে?

রুদ্রিক এবার নৌশির দিকে ফিরে তাকায়।
— আবার ইনজেকশন দিয়ে হাতে ক্যানোলা ফিট করতে হবে। তারপর স্যালাইন দিতে হবে। ওষুধ না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে থাকবে।

ইনজেকশন শব্দটা শুনতেই নৌশি একেবারে তটস্থ হয়ে গেল। ইনজেকশন তার কাছে ছোটবেলা থেকে বয়ে বেড়ানো এক আতঙ্কের নাম। তার শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে। জ্বর টাইফয়েড দুদিন পর পর হতো। সেই সময় টেস্ট আর ওষুধের জন্য তার শরীরে কত শতবার যে সুই ঢুকেছে, তার কোনো হিসাব নেই। ছোটবেলা থেকেই তাই ইনজেকশনের প্রতি তার ভীষণ ভয়। বড় হওয়ার পর অবশ্য তেমন অসুস্থ হতে হয়নি তাকে। ইনজেকশনও খুব একটা নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। তবুও ভয়টা যায়নি। বরং ইনজেকশনের কথা শুনলেই ভয় হয়।

তার ওপর গতকাল ক্যানোলা খোলার সময়ও যথেষ্ট ব্যথা পেয়েছিল। আর জীবনে দ্বিতীয়বার নিজের হাতে ক্যানোলা ফিট করাতে চায় না নৌশি। এইসব কথাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল নৌশির। রুদ্রিক কখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, নৌশি খেয়ালই করেনি। কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে রুদ্রিক জিজ্ঞেস করে,
— বসে আছো কেন? তুমি কি ওষুধ খাবে না?

চিন্তার ভেতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে নৌশি ফট করে বলে উঠে,
— আপনি চলে যান কাজে। আমি ওষুধ খেয়ে নেব।

রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
— আমি তোমাকে ওষুধ খাইয়ে ইনশিওর হতে চাই। চুপচাপ যাও। মুখ ধুয়ে আসো।

নৌশি এবার বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে। ইনজেকশনের চেয়ে ওষুধ অনেক ভালো। এই মুহূর্তে ওষুধ খেয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তেই পৌঁছাল নৌশি। গা থেকে কমফোর্টারটা সরিয়ে নৌশি বিছানা থেকে নেমে পড়ে। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর দ্রুত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো নৌশি। নৌশি বেরোতেই রুদ্রিক তার দিকে একটা সাদা তোয়ালে বাড়িয়ে দেয়। তোয়ালেটা হাতে নিতে গিয়ে নৌশির চোখ আটকে গেল তোয়ালে স্ট্যান্ডে। সেখানে আরেকটা তোয়ালে রাখা, যেটা রুদ্রিকের। অর্থাৎ, রুদ্রিক তাকে নতুন তোয়ালে দিয়েছে।

নৌশি আর কিছু বলে না। তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে এসে আবার বিছানায় বসে পড়ে। রুদ্রিক সাইড টেবিল থেকে খাবারের ট্রেটা এনে নৌশির সামনে রাখে। তারপর বলে,
— নাও, খেয়ে ফিনিশ করো। তারপর ওষুধ খাবে।

নৌশি খাবারের দিকে তাকায়। নাস্তায় ছিল তিনটা সিদ্ধ ডিম, অ্যাভোকাডো টোস্ট, হোল গ্রেইন টোস্ট, এক গ্লাস দুধ আর আপেল। সবকিছু দেখে নিয়ে নৌশি প্রথমে খাবারের দিকে, তারপর রুদ্রিকের দিকে তাকায়। মুখটা একটু কুঁচকে নিয়ে বলে,
— দুধ আর অ্যাভোকাডো টোস্ট খাবো না।

রুদ্রিক বিছানায় নৌশির ঠিক সামনে বসে পড়ে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?

— দুধ আমার পছন্দ না। আর অ্যাভোকাডো টোস্ট মানুষের কাছ থেকে শুনেছি মজা না।

রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— সবার পছন্দ এক হয় না। তোমার ভালো লাগতেও পারে। আর অ্যাভোকাডো টোস্ট অনেক হেলদি। দুধও।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে বলে,
— বললাম তো, এগুলো খাবো না। বাকিগুলো খাচ্ছি।

কথাটা বলেই নৌশি হাত বাড়িয়ে একটা সিদ্ধ ডিম তুলে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রিক বলে উঠে,
— নাবিহা, কী করছো!

নৌশি থেমে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— খাচ্ছি।

রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে বলে,
— স্পুন দিয়ে খাও।

নৌশি কথাটা শুনে বিরক্ত হয়। নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
— এত ঢং আপনি করেন, আমি পারব না। আমি পিওর বাঙালি। হাত দিয়েই খাই।

কথাটা শেষ করেই সিদ্ধ ডিমটা হাতে নিয়ে পুরোটা মুখে পুরে নেয় নৌশি। তারপর মুখভর্তি ডিম নিয়েই অস্পষ্ট গলায় বলে,
— এভাবে হাত দিয়ে খেতে সেই টেস্ট।

মুখের ভেতর পুরো ডিম থাকায় কথাটা পরিষ্কার শোনার উপায় নেই। কিন্তু নৌশি কী বলতে চেয়েছে, সেটা বুঝতে রুদ্রিকের একটুও কষ্ট হলো না। তবুও রুদ্রিক কোনো প্রতিত্তোর করে না। চুপচাপ বসে রইল। তার উদ্দেশ্য একটাই, নৌশিকে ওষুধ খাওয়াবে। তারপর নিচে গিয়ে সবার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবে। ব্রেকফাস্ট শেষ করেই সেখান থেকে সরাসরি চলে যাবে।

নৌশি ধীরে ধীরে ডিমটা শেষ করে। এরপর গ্রেইন টোস্ট খেল। সবশেষে আপেলের দুটো টুকরো মুখে দিয়ে খাওয়া শেষ করে বলে,
— শেষ, আমার খাওয়া।

রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— শেষ মানে? বাকিগুলো কে খাবে? সব দ্রুত শেষ করো।

নৌশি মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না আর খাবো না।

রুদ্রিক গম্ভীর হয়ে বলে,
— নাবিহা, অনেকগুলো ওষুধ। এত অল্প খাবারে হবে না।

নৌশি এবার আর তর্ক করে না। শুধু অনিচ্ছার সুরে বলে,
— আর খেতে ইচ্ছে করছে না।

রুদ্রিক বুঝল, জোর করে আর লাভ নেই। তাই ট্রে থেকে দুধের গ্লাসটা তুলে নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— আচ্ছা, এই দুধটা শেষ করো।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না। দুধ খেলে বমি আসে।

রুদ্রিক এবার একটু নরম হলো।
— আচ্ছা, হাফ খাও। তারপর ওষুধটা খাও। আমি আর জোর করব না।

নৌশি এবার মুখটা হালকা ফ্যাকাসে করে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। নৌশির সেই চেহারা দেখে রুদ্রিক বুঝে, নৌশি রাজি হয়েছে। রুদ্রিক দুধের গ্লাসটা নৌশির মুখের সামনে ধরে রাখে। নৌশি বাধ্য মেয়ের মতো চোখ বন্ধ করে এক টানে গ্লাসের অর্ধেক দুধ শেষ করে ফেলে। তারপর গ্লাসটা হাত দিয়ে ঠেলে মুখের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে,
— আর না।

রুদ্রিক মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা।

বলেই রুদ্রিক শরীরটা সামান্য এগিয়ে সাইড টেবিল থেকে একটা টিস্যু তুলে নেয়। তারপর নৌশির মুখের কাছে নিয়ে ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা দুধের দাগটা খুব যত্নশীল ভঙ্গিতে টিস্যু দিয়ে মুছে দেয়। তারপর রুদ্রিক উঠে দাঁড়ায়।ড্রয়ার খুলে সেখান থেকে ওষুধ বের করে। ট্যাবলেট হাতে নিয়ে এসে ওষুধগুলো নৌশির হাতে দেয়। চারটা ওষুধ।নৌশির একটুও ইচ্ছে নেই সেগুলো খাওয়ার। কিন্তু
অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুদ্রিকের হাত থেকে ওষুধগুলো নেয় নৌশি। তারপর মুখে দিয়ে ঠকঠক করে চারটা ওষুধই গিলে ফেলে পানি দিয়ে।

নৌশিকে ওষুধ খাওয়ানো শেষ হতেই রুদ্রিক আর সময় নষ্ট করে না। সোফার ওপর রাখা মেডিকেল ব্যাগ আর এপ্রোনটা তুলে নেয়। তারপর আর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্রিক বেরিয়ে যেতেই নৌশি ধপ করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে। চোখে হালকা হালকা ঘুম লেগে আছে। কিছুক্ষণ পরপর হাই উঠছে। নৌশি চোখ বন্ধ করে চুপচাপ পড়ে রইল। সকালের ঘুমটাও পুরোপুরি কাটেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘুমিয়ে পড়ে নৌশি।

দুপুরের দিকে নৌশির ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকার পর মুখ ধুয়ে নেয়। তারপর আর রুমে বসে থাকতে ইচ্ছে হলো না। সোজা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। নতুন বাড়ি। সবকিছুই তার কাছে অপরিচিত। তাই ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে পুরো বাড়িটা দেখতে শুরু করে নৌশি। বাড়িটা থ্রিপেক্স সিস্টেমের।দ্বিতীয় তলায় রুদ্রিক, রোহান, রিপ্তি আর রেজওয়ান মির্জার রুম। অর্থাৎ দ্বিতীয় তলাতেই বাড়ির সবার বেডরুম। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিচে নামার সিঁড়ির পাশেই নৌশির চোখে পড়ে একটা লিভিং রুম।

জায়গাটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এটা ফ্যামিলির মানুষের জন্য রাখা হয়েছে। নৌশি আরেকটু ঘুরে দেখে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। নিচে নেমে সোজা সামনে তাকাতেই চোখে পড়ে বাড়ির মেইন ডোরের পথ। সিঁড়ির লম্বা সোজা বরাবরই মেইন ডোরের রাস্তা। বাম পাশে আবার একটা লিভিং এরিয়া। তবে আগেরটার থেকে এটা আলাদা। দেখেই বোঝা যায়, বাইরের লোকজন বা অতিথিদের জন্যই এই লিভিং এরিয়া রাখা হয়েছে। রুমটায় কাচের দরজাও রয়েছে। ডান দিকে ডাইনিং আর কিচেন। আর তার পাশে রয়েছে দুটো গেস্ট রুম।

নতুন জায়গায় এসে নৌশি সবকিছুই নিজের চোখে চিনে নিতে চাইছে। তাই ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। সবকিছু দেখা শেষ করে অবশেষে কিচেনের দিকে গেল। কিচেনে ঢুকতেই দেখতে পেল তিনজন মহিলা কাজ করছে। নৌশিকে দেখামাত্রই তিনজন একসঙ্গে সালাম দেয়। নৌশিও সালামের উত্তর দেয়। তারপর তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনাদের নাম কী?

তিনজনই একে একে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করে।
একজন সাহেরা। আরেকজন ইয়াসমিন। তৃতীয়জন দোলা। সাহেরা আর ইয়াসমিন দুজনই মধ্যবয়সী। কিন্তু দোলা বেশ অল্প বয়সী। বয়স খুব বেশি হলে বাইশ কিংবা তেইশ হবে। কথায় কথায় নৌশি জানতে পারে, এই বাড়িতে এই তিনজন মহিলাই কাজ করে। অর্থাৎ, বাড়ির তিনজনই হেল্পিং হ্যান্ড। এ ছাড়া একজন পুরুষও আছে, তবে সে মূলত বাজার করার জন্য আসে। সে বাড়িতে থাকে না। এই তিনজনই সবসময় বাড়িতে থাকে।

কথাবার্তার একপর্যায়ে দোলা নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি দুপুরে খাবেন কী?

নৌশি অবাক হয়ে বলে,
— দুপুর তো হয়ে গেল। এখনো রান্না হয়নি?

সাহেরা নিচু স্বরে বলে,
— আসলে বাড়িতে তো কেউ দুপুরে খায় না। তাই দুপুরে রান্না করা হয়নি।

নৌশি অবাক হয়ে তিনজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনারা খান না?

সাহেরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— আমাদের জন্য তো রান্না করা হয়েছে। কিন্তু আপনি তো নতুন। আমরা জানি না আপনি কী খান। একটু আগে আপনার রুমে গিয়েছিলাম জানার জন্য, কিন্তু আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন।

নৌশি ছোট্ট করে বলে,
— ওহ। নুডলস রান্না করে দিয়ে দেন।

ইয়াসমিন একটু অবাকই হয়।
— দুপুরে নুডলস?

— হ্যাঁ। রাঁধতে পারবেন না?

নৌশির প্রশ্নে ইয়াসমিন দ্রুত মাথা নাড়ে।
— না না, পারব। আপনি দশ মিনিট অপেক্ষা করেন, রান্না করে দিচ্ছি।

— আচ্ছা।

নৌশি আর দাঁড়ায় না। কিচেন থেকে বেরিয়ে নিচতলার গেস্টদের জন্য রাখা লিভিং রুমে চলে এল। সোফায় বসে টিভির রিমোটটা হাতে নেয়। তারপর টিভি অন করে নিজের পছন্দের কার্টুন Oggy ছেড়ে দেখতে শুরু করে।দশ মিনিটের মধ্যেই দোলা নুডলস নিয়ে এসে যায়। নৌশি নুডলস খেতে খেতেই টিভি দেখতে থাকে। খাওয়া শেষ করার পরও অবশ্য টিভি দেখা শেষ হলো না। প্রায় এক ঘণ্টা সেখানেই বসে টিভি দেখল নৌশি। তারপর নিজের রুমে ফিরে এল। ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে।

রুমে ঢুকেই নৌশির হঠাৎ নিজের ফোনটার কথা মনে পড়ো। সে নিজের ফোন খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে কলেজ ব্যাগ খুলে ভেতরটা তন্নতন্ন করে খুঁজে। একবার, দুবার, তিনবার পায় না। তারপর রুমটাতেও খিলে। কোথাও নেই।
ফোনটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে নৌশি আবার রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নিচে এসে দোলাকে দেখতে পেয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
— আমার ফোনটা দেখেছেন? ব্যাগে ছিল?

দোলা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না, আমি তো দেখিনি।

নৌশি এবার বুঝতে পাে, এর পেছনে নিশ্চয়ই রুদ্রিকের হাত আছে। মুখটা গম্ভীর করে বলে,
— আচ্ছা, ওনাকে কল দিব কীভাবে?

দোলা কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কাকে কল দিবেন কীভাবে?

— আপনাদের রুদ্রিক স্যারকে।

দোলা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— ল্যান্ডলাইন আছে।

নৌশি আশ্বস্ত হয়।
— কল লাগিয়ে দেন। আমি নাম্বার জানি না ওনার।

— আচ্ছা।

দোলা লিভিং রুমের এক পাশে থাকা ল্যান্ডলাইনের কাছে গিয়ে রুদ্রিকের নাম্বারে কল লাগিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। তারপর ভেসে এল রুদ্রিকের গম্ভীর কণ্ঠ,
— হ্যালো।

নৌশি এক নিঃশ্বাসে বলে উঠে,
— আমি নৌশি বলছি। আমার মোবাইল কই?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— বাসায় এসে কথা বলব। ফোন রাখো।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— না, আপনি বলুন আমার মোবাইল কোথায়!

কিন্তু রুদ্রিক আর কিছু শুনে না। তার আগেই কল কেটে দিয়েছে। নৌশির রাগ মুহূর্তেই মাথার চূড়ায় উঠে গেল। সে আবার কল দিল। রুদ্রিক রিসিভ করে না। আরো একবার কল দেয়। তবুও কোনো সাড়া নেই। রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে নৌশি সেখান থেকে চলে এল। রুমে ফিরে বিছানায় বসে রাগে ফুঁসতে লাগল। ইচ্ছে করছে রুদ্রিকের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে! কী ভাব তার! তার ফোন নিয়ে গেছে, আবার তারই কল রিসিভ করে না!

রাগে গজগজ করতে করতে নৌশি রুদ্রিককে গালি দেওয়া শুরু করে,
— রাক্ষসের বাচ্চা রাক্ষস! আমার বাপের টাকার ফোন নিয়ে নেওয়ার তুই কে রে? জানিস ফোনটার দাম? পুরো সতেরো হাজার টাকা! আমার এত দামি ফোনটা ডাকাতি করে ফেলেছিস, তো কী হয়েছে? আল্লাহ সহ্য করবে না। তোর চারদিন পটি হবে না। বলে দিলাম!

কথা শেষ করেই নৌশির মুখটা বেঁকে গেল। পরক্ষণেই ভে ভে করে কেঁদে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দেয়। কিন্তু কান্নার মাঝেও রুদ্রিককে গালি দেওয়া বন্ধ হলো না। বালিশে মুখ গুঁজেই আবার রুদ্রিককে গালাগাল করতে লাগল নৌশি।

রাত তখন সাড়ে দশটা। রুদ্রিক বাড়ি ফিরে। রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা নৌশি শব্দ পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। দুজনের চোখে চোখ পড়ে। রুদ্রিক চোখ সরিয়ে রুমে ঢুকে। নৌশি এতক্ষণ শুধু এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল। ফট করে উঠে বসে বলে,
— আমার মোবাইল দিন।

রুদ্রিকের মধ্যে কোনো বিচলিত ভাব দেখা যায় না। সে বিছানার ওপর এসে বসে। তারপর পায়ের জুতা খুলতে খুলতে বলে,
— মোবাইল পাবে। কিন্তু ভুলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না।

নৌশির মুখ সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। কিন্তু সে কথাটার কোনো উত্তর দিল না। বলে,
— মোবাইল দিন। বিরক্ত লাগছে আমার। সারাদিনেও একটুখানিও ফোন টিপতে পারিনি।

রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— মোবাইল চালানো ভালো না। চোখে সমস্যা হয়। শরীরের জন্যও ভালো না।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা বলে উঠে,
— তো আপনি মোবাইল চালান কেন? ওটা ফেলে দিন।

রুদ্রিক ভ্রু তুলে তাকায়।
— আমি মোবাইল প্রয়োজনে ইউজ করি। তোমার মতো অকারণে টিপতে না।

নৌশি এবার বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে বলে,
— হয়েছে! আপনি ডাক্তার, জ্ঞানী মানুষ। আমি অত জ্ঞানী না, হতে চাইও না। আমি অশিক্ষিত মানুষ। দুবেলা ভাত আর একটু রিলস দেখে হাসি। সাধারণ জীবনযাপন। দিন ফোন, দিন।

রুদ্রিক আর তর্কে গেল না। নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কাভার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে একটা চাবি নেয়। তারপর একটা ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে নৌশির ফোনটা বের করে। ফোনটা বের করে আবার কাভার্ড লাগিয়ে রুদ্রিক ফিরে এল। তারপর ফোনটা নৌশির হাতে দিয়ে বলে,
— আমি আগের নাম্বার চেঞ্জ করে দিয়েছি। নতুন সিম দিয়েছি।

ফোনটা হাতে পেয়ে যেন নৌশি প্রাণ ফিরে এল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখে স্বস্তি ফুটে উঠে। কিন্তু রুদ্রিকের কথাটা শুনে সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না। নৌশি বিরক্ত হয়ে বলে,
— আপনি আমার প্রাইভেসি চটকিয়ে খেয়ে পারেন না।

রুদ্রিক পরনের শার্টটা শরীর থেকে আলগা করতে করতে নির্বিকার গলায় বলে,
— আমি তোমাকে সহ চটকিয়ে খেয়ে ফেলতে পারি, ডিয়ার।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠে। মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— কুত্তা আপনার ডিয়ার হবে!

রুদ্রিক এবার বাঁকা হেসে বলে,
— ইয়াহ। সেজন্যই তোমাকে ডিয়ার ডাকি, সুইটহার্ট।

নৌশি আবারও ফুঁসে উঠে। মুখটা বাঁকিয়ে অভিমানী সুরে বলে,
— সারাদিন বাসায় একা আমার বোরিং লাগে।

রুদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,
— কলেজে যাও।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।
— না। পড়ালেখা করতে ভালো লাগে না।

— কালকে থেকে কলেজ যাবে।

— না গেলে?

— না গেলে ফেইল করবে।

নৌশি কথাটাকে একেবারেই পাত্তা দেয় না।
— হুম, করলে করব! তো কী হয়েছে?

রুদ্রিক এবার একটু থেমে নৌশির দিকে তাকায়। তারপর বলে,
— আমার মতো পিএইচডি করা ডাক্তারের বউ ফেইল করবে? এটা কত বড় অসম্মানের জানো?

নৌশি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলে,
— তো কী হয়েছে? কত মেয়েই তো ফেইল করে বিয়ের পর। তো অন্যদের স্বামীরা স্ত্রীরা ফেইল করলে সহ্য করতে পারে, তাহলে আপনি পারবেন না কেন? অন্য স্বামীরা ভাত খায়, আপনি কি ভাত খান না?

রুদ্রিক তখন টি-শার্ট পরছিল। নৌশির শেষ কথাটা শুনে তার হাত থেমে গেল। সে ফট করে নৌশির দিকে তাকায়।চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়। এই মেয়ে বলে কী! অন্যদের স্বামীরা স্ত্রী ফেইল করলে সহ্য করতে পারে, তাহলে আপনি পারবেন না কেন? তার ওপর আবার যুক্তি দেয়? অন্য স্বামীরা ভাত খায়, আপনি কি ভাত খান না?

রুদ্রিক দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
— ফেইল করে দেখো। ভাত গিলাবো!

নৌশি মুখ বাকিয়ে বলে,
— না, আমি চিবিয়ে খাবো! ডিরেক্ট গিলব না। হুহ্!

রুদ্রিক হতাশ চোখে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার মতো ভাষাই তার কাছে নেই। মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরল, এই মেয়ে কী চিজ! একদম মাথায় সমস্যা-ওয়ালা মেয়ে। ডাক্তার হওয়ার সুবাদে জীবনে দেশ-বিদেশের কত জায়গায় গেছে রুদ্রিক। কত রকম মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার। কত ধরনের মানুষ দেখেছে। কিন্তু এমন মেয়ে? জীবনে কখনো দেখেনি। আর এমন মেয়েকে হ্যান্ডেল করা, এটাই তার জীবনের ফার্স্ট এক্সপিরিয়েন্স।

চলবে?

#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৫

[ গল্প সবার আগে পেতে আমার পেজটা ফলো করে রাখুন। সাধারণত ফলোয়ার ছাড়া অন্যদের ফিডে আমার গল্প পৌঁছায় না। তাই নিয়মিত গল্প পেতে পেজটা অবশ্যই ফলো রাখুন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন