মাত্র ৩৫ টাকার একটা কিটক্যাট নষ্ট করার অপরাধে যে ছেলেটাকে একটু আগে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে কুত্তার মতো গালাগালি করে গুষ্টি উদ্ধার করে এসেছে, কলেজে ঢুকেই নৌশি আবিষ্কার করল, সেই ছেলেটাই তাদের কলেজের ইংরেজির নতুন প্রফেসর! দৃশ্যটা চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নৌশির হাত-পা, পুরো শরীর, হাড়গোড় সহ সবকিছু একসঙ্গে কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিল। নিজের আগামী দিনের কলেজ লাইফের কথা চিন্তা করতেই নৌশির কপালে ঘাম জমে গেল। এখন নির্ঘাত এই ছেলে প্রফেসর হওয়ার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নৌশির কলেজ লাইফটাকে তেজপাতা বানিয়ে ছাড়বে!
নৌশি আতঙ্কিত গলায় পাশে বসা বান্ধবী সাবাকে বলে,
— দোস্ত, এই লোকটাকে আমি এক ঘণ্টা আগে রাস্তায় কুত্তার মতো গালাগালি করে এসেছি আমার ৩৫ টাকার কিটক্যাট নষ্ট করার জন্য। আর এখন কলেজে এসে দেখি, এই লোক আমাদের নতুন প্রফেসর?
নৌশির কথা শুনতেই সাবা চমকে উঠে। আপনাআপনি তার মুখ হা হয়ে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— বলিস কী দোস্ত! উনি তো আমাদের ইংরেজির নতুন প্রফেসর। এখন কী হবে?
সাবার কথার কোনো উত্তর দিল না নৌশি। মুখটা কাঁদো কাঁদো করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর অসহায় গলায় বলে,
— দোস্ত, আমার সাথেই এমন হয় কেন? মানুষের কারমা হিট করে বছর, মাস পরে। আর আমি ইন্সট্যান্ট কারমা পেয়ে ফেলি।
সাবা এবার বিরক্ত হয়ে রাগী গলায় বলে,
— আরো কর গালিগালাজ। এখন তোকে আলভী স্যার বুঝাবে গালিগালাজ করার কারমা!
নৌশি আলভীর দিকে তাকায়। লম্বা-চওড়া দেহ। উচ্চতা পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি। গায়ের বর্ণ শ্যামলা। চোখে চশমা। গালে চাপ দাড়ি। পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। এমন গম্ভীর চেহারার মানুষটাকেই যে সে আধা ঘণ্টা আগে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে যা-তা বলে গালাগালি করে এসেছে। ভাবতেই নৌশির বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল।
নৌশি ঠোঁট উল্টে সাবাকে জিজ্ঞেস করে,
— এই জলহস্তির নাম আলভী?
সাবা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। মেহমেত হোসেন আলভী।
নৌশি এবার বেঞ্চের নিচে হাত তুলে মোনাজাত ধরে। মুখটা ফ্যানের দিকে তুলে ফিসফিস করে বলে,
— আল্লাহ, তুমি মেহমেত হোসেনের ব্রেইনটা মেরামত করে আমার গালিগালাজের সিনটা ডিলিট মেরে দাও। আল্লাহ, এমন হলে মসজিদে ১০ টাকা দিবো।
সাবা সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলে,
— চুপ কর! আলভী স্যার আমাদের দিকেই আসছে।
নৌশি সামনে তাকিয়ে দেখে, সত্যিই একটু আগে যাকে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে গালাগালি করে এসেছে, সেই প্রফেসর আলভী সোজা তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।নৌশির বুকটা ভয়ে ধক করে উঠে। মনে হলো, এই বুঝি তার পুরো কলেজ লাইফের জানাজা পড়ে গেল! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আলভী এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। তারপর তীক্ষ্ণ নজরে নৌশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— স্ট্যান্ড আপ!
নৌশি ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মুখে জোর করে একটা নিরীহ ভাব এনে বলে,
— আসসালামু আলাইকুম স্যার।
আলভী শান্ত গলায় জবাব দেয়,
— ওয়ালাইকুম সালাম।
তারপর সাবার দিকে ইশারা করে আলভী জিজ্ঞেস করে,
— কী বলছো ওকে?
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে দেয়,
— কই স্যার, কিছু বলছিলাম না তো।
আলভী ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁকা হাসি এনে বলে,
— ওহ ইয়াহ! তুমি তো কিছু বলো না, ডিরেক্ট গালাগালি করো।
নৌশি অবাক হওয়ার এমন অভিনয় করে, যেন জীবনে গালাগালি নামের শব্দটাই সে প্রথমবার শুনেছে।
— গালাগালি? মানে? বুঝালম না, আসলে!
আলভী এবার একটু এগিয়ে এসে বলে,
— একটু আগে এতো গালাগালি করে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছো? অবশ্য যে গালি দেয়, সে ভুলে যায়। কিন্তু যে গালি খায়, সে ভুলে না। কখনোইই ভুলে না।
নৌশি এবার বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে মুখ গম্ভীর করে বলে,
— স্যার, ওটা আমি না। ওটা আমার জমজ বোন। একদম আমার মতো দেখতে। ও ভীষণ গালাগালি করে। আমি গালি দেই না। হয়তো ও-ই আপনাকে গালি দিয়েছে।
আলভী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
— মুভি চলছে? মিথ্যা বলবে, আমি গাধার মতো বিশ্বাস করব?
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আল্লাহ, আমি মিথ্যা বলছি না। আপনার কসম!
নৌশির কথা শুনে আলভী এবার সামান্য ধমকে উঠে।
— এই মেয়ে! তোমার সাহস কত বড়! একটু আগে গালি দিয়ে আবার এখন আমার নামেই মিথ্যা কসম খাচ্ছো!
নৌশি এবার সত্যিই মুখটা ভার করে ফেলে। তারপর নরম গলায় বলে,
— আচ্ছা, সরি। কিন্তু ওটা সত্যিই আমার জমজ বোন। প্রমাণ দেখাতে পারি। দুজনের একসাথে ছবি আছে। আপনি চাইলে দেখাতে......
আলভী গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
— দেখাও!
নৌশি মুহূর্তেই ফেঁসে গেল। সে ভেবেছিল, প্রমাণের কথা বললে আলভী হয়তো বিশ্বাস করে নেবে কিংবা ছবি দেখতে চাইবে না। কিন্তু হলো তার ঠিক উল্টো! এখন তো সত্যিই প্রমাণ দেখাতে হবে।
নৌশিকে চুপ করে থাকতে দেখে আলভী আবার বলে,
— কী হলো? দেখাও?
নৌশি এবার অসহায় মুখে বলে,
— সরি, স্যার। আসলে একটা বয়স্ক মহিলা কিটক্যাট খেতে চেয়েছিল। আমার কাছে মাত্র একটা কেনার টাকাই ছিল। ওটা আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন। তাই রাগে কী থেকে কী বলে দিয়েছি। ওসব আপনি মনে রাখবেন না।
আলভী ভ্রু তুলে নৌশির দিকে তাকায়।
— মনে রাখব না? তুমি আমাকে কী কী গালি দিয়েছো, ওগুলো ভোলার মতো? নরমাল কোনো মানুষ শুনলে ট্রমাটাইজড হয়ে যাবে।
নৌশি এক মুহূর্তও না ভেবে মাথা তুলে ফট করে বলে উঠে,
— তাহলে কি স্যার আপনি এবনর্মাল? তাই জন্য আপনি এখনো ট্রমাটাইজড হননি?
কথাটা শেষ হতেই আলভীর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
— তোমাকে তো ইচ্ছে করছে মাটিতে পিষে ফেলি।
নৌশি এবার আর কোনো বাহাদুরি দেখায় না। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ছোট করে বলে,
—সরি স্যার।
আলভী একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
— যাও, ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও। বাইরে গিয়ে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকো।
নৌশির চোখ কপালে উঠে গেল।
—এ্যা?
আলভী ভ্রু কুঁচকে বলে,
—এ্যা না, হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি যাও, নয়তো পানিশমেন্ট বাড়বে।
নৌশি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। একবার অসহায় চোখে সাবার দিকে তাকায়। তারপর মাথা নত করে ধীরে ধীরে বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে গেল। আলভী গমগমে চেহারা নিয়ে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। নৌশি চুপচাপ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আলভীও সেখান থেকে সরে সামনে বোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ক্লাস নেওয়ার মাঝেই একবার বারান্দার দিকে উঁকি দেয়। নৌশি সত্যিই কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
যখন দেখল, নৌশি কান ধরে যথারীতি দাঁড়িয়ে আছে, তখন আলভী সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং আবার ক্লাস করানোয় মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নৌশি দুই হাত দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই কিন্তু মুখে বিরক্তির ছাপ। আর মনে মনে যার গুষ্টি উদ্ধার করছে, সে আর কেউ না, আলভী!
নৌশি মনে মনে বকতে লাগল,
— শালা কুত্তার লেজ! তোকে আরো বেশি গালি দেওয়া উচিত ছিল। এমন গালি দেওয়া উচিত ছিল, যাতে তুই সেখানেই গালি শুনে হার্ট অ্যাটাক করে ফেলতি। ভালো মানুষ তো কম গালি দিছিলাম। এখন ইচ্ছে করছে বেল্ট দিয়ে মারতে, শালা!
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা।
টানা দুই দিন বাসায় বিরক্তিতে কাটানোর পর গত রাতে নৌশি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সকালে কলেজে যাবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল নৌশি। এরপর রুদ্রিককে বলে তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসতে। কিন্তু রুদ্রিক সোজাসাপ্টা মানা করে দেয়। বলে, নৌশির জন্য তার এত সময় নেই যে সে নৌশিকে কলেজে আনা-নেওয়া করবে। অগত্যা বাড়ির গাড়ি দিয়েই কলেজে চলে এলো নৌশি। কলেজে এসে গাড়ি থেকে নামার পর হঠাৎ করেই তার ভীষণ চকলেট খেতে ইচ্ছে হলো। একেবারে প্রচণ্ড ক্যাভিংস! নৌশি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ খুলে টাকাপয়সা খুঁজতে শুরু করে। গুনে দেখে, তার কাছে ৯০ টাকা আছে।
টাকাগুলো দেখেই তার মনে পড়ে গেল, লাস্ট যেদিন কলেজে এসেছিল, সেদিন বাবা তাকে কলেজের জন্য ২২০ টাকা দিয়েছিল। সেদিন তার ১৩০ টাকা খরচ হয়েছিল। যাওয়া-আসার বাস ভাড়া ৬০ টাকা। আর ৩৫ টাকা করে দুটো কিটক্যাট কিনেছিল। একটা নিজে খেয়েছিল, আরেকটা দিয়েছিল সাবাকে। বাকি টাকা ব্যাগেই রয়ে গিয়েছিল। বাবার দেওয়া সেই শেষ টাকার কথা মনে পড়তেই নৌশির মনটা কেমন করে উঠে। তার বাবা তাকে সবসময় গাড়ি ভাড়া বাদ দিয়ে বাড়তি টাকা দেন কিটক্যাট খাওয়ার জন্য। কারণ কিটক্যাট নৌশির ভীষণ পছন্দ।
তারা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। এত টাকা-পয়সা তাদের হাতে সবসময় থাকে না। তবুও নৌশির বাবা সবসময় তার দুই মেয়ের শখ পূরণ করার চেষ্টা করেন। এই কথাটা ভাবতেই নৌশির বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।সে মনে মনে ঠিক করে, এই ৯০ টাকা থেকে একটা কিটক্যাট কিনবে। বাবার দেওয়া টাকা দিয়ে। এই টাকাটার সঙ্গে আলাদা একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই একটা কিটক্যাট কিনে বাকি টাকাগুলোও যত্ন করে রেখে দেবে।সেটাও একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। এই ভাবনা নিয়েই নৌশি রাস্তার পাশের একটা গ্রোসারি শপে ঢুকে দোকানদারকে বলে,
— আঙ্কেল, একটা কিটক্যাট দেন। ছোটটা।
দোকানদার তাকে একটা কিটক্যাট দিয়ে দেয়। নৌশি টাকা পরিশোধ করে কিটক্যাটটা হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু বের হওয়ার মুহূর্তেই বিপত্তি ঘটে। হঠাৎ একটা ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে নৌশির। আর ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই নৌশির হাত থেকে কিটক্যাটটা ছিটকে গিয়ে সোজা ড্রেনের মধ্যে পড়ে গেল!
নৌশি জোরে চিৎকার করে উঠে,
— আল্লাহ! আমার কিটক্যাট!
তারপর নৌশি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ড্রেনের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখ হা হয়ে গেল তার। পরক্ষণেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
— এই মিয়া! দেখে চলতে পারেন না? চোখ কি খুলে বের হয়েছেন!
ছেলেটা সামান্য অবাক হয়ে বলে,
—এক্সকিউজ মি!
নৌশির রাগ এবার আরো দ্বিগুণ হয়ে গেল।
— এক্সকিউজ মির চৌদ্দ কিলাই! তুই আমার ৩৫ টাকার কিটক্যাট নষ্ট করে ইংরেজি মারাস?
ছেলেটা এবার বিরক্ত হয়ে বলে,
— ন্যূনতম ম্যানার্স নেই দেখছি একজন পরিচিত মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়!
নৌশি ঠোঁট বাঁকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
— না, ম্যানার্সের নানি মারা গেছে। যাবি তুই ম্যানার্সের বাড়ির চল্লিশাতে কামলা দিতে? তোকে দেখলে কামলাই লাগে। কাজের ভটকা বেডা!
নৌশির কথা শুনে ছেলেটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠে,
— বস্তির মেয়ে!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— বস্তির মানুষ হচ্ছিস তুই আর তোর বউ বাচ্চা। তোর কারণে আমার ৩৫ টাকার কিটক্যাটটা নষ্ট হয়েছে। গু খা তুই। ট্রাক ভর্তি গু খা, শালা বজ্জাত হিজড়া!
কথাটা বলেই নৌশি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না।রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে গেল।এদিকে ততক্ষণে রাস্তার আশপাশের মানুষজন থেমে গিয়ে পুরো ঝগড়াটা দেখছিল। আর অন্যদিকে সেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিল। মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির একটা মেয়ে, সে কিনা ভরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকে এভাবে গালাগালি করে চলে গেল! তার ইচ্ছে করছিল, মেয়েটাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে।
বর্তমানে ফিরে আসা যাক।
বারান্দায় কানে ধরে দাঁড়িয়ে নৌশি এখনো মনে মনে আলভীর গুষ্টি উদ্ধার করছে। তখনি সেখানে সাবাও এসে হাজির হলো। এসেই নৌশির পাশেই কানে ধরে দাঁড়িয়ে গেল।
নৌশি অবাক হয়ে সাবার দিকে তাকায়।
— তুই কেন?
সাবা স্বাভাবিক গলায় বলে,
— তুই বাইরে থাকবি আর ভেতরে আমার মন বসবে? আমি ইচ্ছে করে কথা বলেছি, তাই স্যার আমাকেও ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছে।
কথাটা শুনে নৌশির মুখে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠে। একই সঙ্গে সাবাও হেসে উঠে। দুই বান্ধবী এমনই। একজনকে ছাড়া আরেকজনের চলে না। ক্লাস করাই হোক কিংবা একসঙ্গে পানিশমেন্ট পাওয়া। যেখানেই যাক, দুজন একসঙ্গেই যাবে। হাসি থামিয়ে সাবা এবার বলে,
— হয়েছে, হাসি থামিয়ে বল। এতদিন কলেজে আসিসনি কেন? আর ফোনে বলছি, কলেজে এসে কিছু বলবি। কী বলবি বল এখন?
নৌশি নিচু গলায় বলে,
— এখানে না। পানিশমেন্ট শেষ হলে ক্যাম্পাসে বলব। এখানে বলার সময় না।
সাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা। কিন্তু এখন চুপ থাকব?
নৌশির দুষ্টু হেসে ফিসফিস করে বলে,
— না। এখন দুজন ফিসফিস করে আলভী কুত্তাটাকে বকব! এক ছোট নাকি দুই ছোট? আলভী কুত্তার মন ছোট!
সাবা নৌশির কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। নৌশি তাতেও থামে না। তার প্রতিভার যেন আজ কোনো সীমা নেই। আবার ফিসফিস করে বলে,
— সকালে কোকিল গান গায়, রাতে কুত্তা আলভী গু খায়।
এভাবেই নৌশি নিজের অসাধারণ প্রতিভা কাজে লাগিয়ে আলভীকে গালাগালি করে তার গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকল। আর পাশে দাঁড়িয়ে সাবা নৌশির একের পর এক প্রতিভাবান কবিতা শুনে হাসতেই থাকে। ভেতরে আলভী তখন ক্লাস নিচ্ছে। আর বাইরে দুই বান্ধবী কানে ধরে দাঁড়িয়ে তারই নামে কবিতা রচনা করে যাচ্ছে!
----
— ডক্টর রুদ্রিকের কি বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে? তুই সম্পর্কে ওনার ভাতিজি হোস আর তোকে উনি জোর করে বিয়ে করেছেন? জাস্ট ফর রিভেঞ্জ?!
চরম বিস্ময় আর অবিশ্বাস মিশে কথাগুলো বলে সাবা। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, মাত্র এই এক সপ্তাহের মধ্যে তার বান্ধবীর জীবনে এতগুলো ঝড় ঝাপটা কীভাবে এসে পড়ে! সাবার চোখে পানি চলে এসেছে।নৌশি একটা ভীষণ ভালো মেয়ে। অথচ শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গেই কিনা এমন হলো! নিজেরই সম্পর্কে চাচা তাকে জোর করে বিয়ে করেছে, এই কথাটা ভাবতেই সাবার বুকটা ভার হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে, নৌশির জীবনটা বুঝি শেষ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে সাবার মাথায় শুধু এই কথাটাই ঘুরছিল।
দুজনেই ক্যাম্পাসের এক নিরিবিলি পাশে একটা বেঞ্চে বসে আছে। চারপাশে অন্যদের কোলাহল থাকলেও এই জায়গাটা বেশ নিরব তাদের দুজনের জন্য।
নৌশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উদাসীন গলায় বলে,
— জানিস? সেদিন আম্মু আর বাবা হাত জোর করেছিল ওনার সামনে। শুধু আমাকে একটু দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু উনি অপমান করে বাবা আর আম্মু চাচ্চুকে বের করে দিয়েছেন। আমি আম্মু আর বাবাকে শেষবারও দেখতে পারিনি। উনি আমাকে নিষেধ করেছেন আমার বাবা-মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। বলেছেন, যদি যোগাযোগ করি, উনি আমার পরিবারকে মেরে ফেলবেন।
কথাগুলো বলতে বলতে নৌশির গলাটা ভারী হয়ে এল।কিন্তু চোখের পানি সে বের হতে দিল না। সাবা আঁতকে উঠে বলে,
— কী ভয়ংকর! আমার শুনেই গায়ে কাটা দিচ্ছে!
একটু থেমেউ সাবা হঠাৎ বলে উঠে,
— নৌশি তুই বরং পালিয়ে যা। তুই অমন অমানুষের সঙ্গে থাকলে মরেই যাবি।
নৌশি শান্ত গলায় বলে,
— পালাবো কোথায়? আর আমি পালিয়ে গেলে উনি আগের থেকে বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে যাবেন। সবটা গিয়ে পড়বে বাবা, আম্মু আর চাচ্চুর ওপর।
সাবা অসহায় গলায় বলে,
— তাই বলে তুই অমন একটা নরকে থাকবি?
নৌশি এবার সাবার দিকে তাকায়। তার বান্ধবীটা যে ভেতর থেকে অনেকটা ভেঙে পড়েছে, সেটা বুঝতে তার একটুও কষ্ট হলো না। কিন্তু নৌশি চায় না, তার জন্য সাবা আরো চিন্তা করুক। তাই ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দেয়। ঠোঁটে জোর করে হাসি এনে বলে,
— ধুর বোকা! চিন্তা করিস না। তুই আমাকে চিনিস না? আমাকে কে নরক দেখাবে? এই নৌশি সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়। সো চিল, দোস্ত।
সাবা এবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়।
— তুই মিথ্যা বলছিস। লুকাচ্ছিস!
নৌশি মাথা নাড়িয়ে বলে,
— নারে দোস্ত, কিছু লুকাচ্ছি না। সত্যি বলছি। ওই রাক্ষসটা আমার কিছু করতে পারবে না। উল্টো রাক্ষসটাকে জ্বালিয়ে মারবো।
তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো একটা গম্ভীর কণ্ঠ,
— তোমার রেডিও ক্যাসেটটা বন্ধ হয় না কেন?
নৌশি আর সাবা দুজনেই একসঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। আর তাকিয়েই দুজনের চোখ কপালে উঠে। সামনে আলভী দাঁড়িয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে আলভী। নৌশি আর সাবা দুজনেই তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে গেল। একসঙ্গে বলে উঠে,
— জি স্যার?
আলভী রাগী দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— কলেজে কি আসো ক্লাস না করে ক্যাম্পাসে ঘুরাঘুরি করতে?
সাবা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না স্যার।
আলভী গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
— তো এখানে কী করছো? ক্লাস চলছে না? ক্লাস করো গিয়ে?
সাবা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— জি স্যার, যাচ্ছি।
আলভীর ভ্রু আরো কুঁচকে গেল।
— যাচ্ছি কী? এক্ষণই যাও!
— জি স্যার!
তারপর নৌশি আর সাবা আর এক মুহূর্তও দেরি করে না।দুজনেই তাড়াতাড়ি ছুট লাগায় ক্লাসের দিকে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে আলভী ভ্রু কুঁচকে তাদের চলে যাওয়া দেখতে থাকে। তার মাথায় তখন প্রশ্ন ঘুরছে, একটা মেয়ে মানুষ এত গালি দেয় কীভাবে? এই মেয়ের মুখে সারাক্ষণ গালি আর উদ্ভট সব কথা! এই তো একটু আগেই কাকে যেন রাক্ষস বলছিল। কথাটা মনে পড়তেই আলভী হঠাৎ থেমে গেল। তার ভ্রু কুঁচকে গেল আরো একটু। রাক্ষস?
তাকে না তো?
---
সন্ধ্যা তখন প্রায় ৮টা। নৌশি সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে।বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর সেই ঘুম ভাঙল এখন। ঘুম থেকে ওঠার পর নৌশির কাছে সবকিছুই বিরক্তিকর লাগছে। ফোন চালাতেও ইচ্ছে করছে না। রিলস দেখতে মন চাইছে না। কোনো কিছুতেই তার মন বসছে না। ঠিক এমন সময় রুমের দরজায় নক করার শব্দ হলো।
নৌশি ভেতর থেকে বলে,
— ভেতরে আসো।
দরজা খুলে দোলা ভেতরে ঢুকে। এসেই নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— নাস্তা কী খাবেন?
ঘুম থেকে ওঠার পর নৌশিরও বেশ ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই বেশি কিছু না ভেবে বলে,
— চা-বিস্কুট।
কেননা এই সময়টায় বাড়িতে সে চা বিস্কুটই খেতো। দোলা মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা।
দোলা চলে যেতে ঘুরতেই নৌশি আবার ডেকে উঠে,
— দোলা আপু?
দোলা ফিরে তাকিয়ে বলে,
— জি?
নৌশি জিজ্ঞেস করে,
— লুডু খেলবেন?
দোলা একটু অবাক হয়।
— লুডু?
— হ্যাঁ। তুমি, আমি, ইয়াসমিন আন্টি আর সাহেরা আন্টি—আমরা চারজন মিলে খেলব। ফ্রি না তোমরা?
— হ্যাঁ, আমাদের এখন কোনো কাজ নেই।
— আচ্ছা, তাহলে তুমি সাহেরা আন্টি আর ইয়াসমিন আন্টিকে নিয়ে আসো। এখানেই খেলব। শুনো, চারজনের জন্যই চা এনো। চারজন খেতে খেতে খেলব।
— ঠিক আছে।
দোলা চলে গেল। নৌশি আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে তিনজনের অপেক্ষা করতে লাগল। মিনিট দশেক পর দোলা, সাহেরা আন্টি আর ইয়াসমিন আন্টি তিনজনই এসে হাজির হলো। সঙ্গে লুডুর ঘর আর চা-বিস্কুট। নৌশি শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ে। তারপর চারজন মিলে শুরু হলো লুডু খেলা।।চা-বিস্কুট খেতে খেতে, হাসতে হাসতে লুডু খেলতে লাগল তারা। একটা ম্যাচ শেষ হলো। তারপর আরেকটা। তারপর তৃতীয়টা। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় কখন যে কেটে গেল, কেউ টেরই পেল না। এতক্ষণের খেলায় তিনটা ম্যাচ খেলেছে। আর তিনটাতেই হেরেছে!এখন চলছে চার নম্বর ম্যাচ। আর এই ম্যাচেই নৌশি জেতার একেবারে দোরগোড়ায়।
তার গুটি এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, এই ম্যাচটা জিতলে এতক্ষণে হারের সব হিসাব এক মুহূর্তেই উসুল হয়ে যাবে। তখনি রুমের দরজা খুলে গেল। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে রুদ্রিক। সঙ্গে সঙ্গেই চারজনের লুডু খেলার দিকে থাকা সমস্ত মনোযোগ সরে গেল। চার জোড়া চোখ একসঙ্গে ঘুরে তাকায় দরজার দিকে। আর মুহূর্তেই ঘরের হাসি আড্ডায় বিরতি পড়ে গেল। রুমের দরজায় দাঁড়িয়েই রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে ভেতরের দৃশ্যটা দেখতে লাগল। তার বেডের ওপর বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা শুয়ে লুডু খেলছে!
দৃশ্যটা দেখেই রুদ্রিকের ভেতরটা রাগে জ্বলে উঠে। ব্যাপারটা তার একদমই পছন্দ হলো না। তবুও সে কোনো শব্দ করে না। কিন্তু রুদ্রিককে দেখামাত্র দোলা সহ বাকি সবাই যেন শকট খায়। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই বেড থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর দোলা আর অন্যরা তাড়াতাড়ি লুডুর ঘরটা উঠিয়ে নিতে যাবে, তখনি নৌশি বলে উঠে,
— এই খেলা শেষ হয়নি তো।
দোলা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
— স্যার এসেছেন।
নৌশি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
— তো কী হয়েছে!
দোলা আর কেউই আর কোনো কথা বলে না। চুপচাপ লুডুর ঘরটা হাতে নিয়ে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।এদিকে নৌশি বিছানায় বসে রাগে ফুঁসতে লাগল। তিনটা ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর সবে চতুর্থ ম্যাচটা জেতার পথে ছিল বেচারি তখনি রুদ্রিক এসে সব ভেস্তে দিল! নৌশির মেজাজটা মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল। রুদ্রিক রুমের ভেতরে ঢুকে সোফার ওপর নিজের মেডিকেল ব্যাগটা রাখতে রাখতে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
— রুমে কী করছিলে?
নৌশি বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বলে,
— কেন? আপনি চোখে দেখেন না?
— দেখি আমি। বাড়ির কাজের লোকদের বেডরুমে এনে বেডে শোয়ায় কে? ক্লাস মেইনটেইন করো।
নৌশির ভ্রু কুঁচকে গেল।
— কাজ করে বলে কি মানুষ না?
রুদ্রিক এবার তীর্যক হেসে বলে,
— ওহ, আমি কাকে কী বলছি! তুমি কি ক্লাস মেইনটেইন করবে? তুমি আর তোমার ফ্যামিলি তো ওদের ক্লাসেরই!
ব্যস! এই কথাটা নৌশির কানে যেতেই তার রাগ সপ্তম আকাশে উঠে গেল। নৌশি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠা কন্ঠে বলে উঠে,
— এই কামলা বেডা, আমার বাড়ির কে এসে আপনার বাড়িতে কামলা দিছে?
রুদ্রিক দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— ঠাটিয়ে দুটো মারব। ভদ্রভাবে কথা বলো।
নৌশি এবার আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। মুখে কৃত্রিম ভদ্রতার ভাব এনে বলে,
— ওহে কামলা মহোদয়, আমার বাড়ির কে এসে আপনাহার বাড়িতে কামলা দিয়েছে, তাহা আপনার ভটকা ভটকা ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা বচন করিবেন?
রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তিতে বলে,
— তোমার এসব কথা শুনলে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়!
নৌশি এবার বিছানা থেকে নেমে এল। রুদ্রিকের সামনে গিয়ে হাতটা মাইকের মতো ধরে এমনভাবে বলে, যেন কোনো সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করছে।
— কি দাদা, মাথায় সমস্যা? আপনার রক্তে কি রকেট আছে? আমার কথা শুনলেই দ্রুত গতিতে পায়ের রক্ত মাথায় চলে যায়? তাহলে আপনার জন্য কেয়া কসমেটিকসের পক্ষ থেকে একটা আইস ব্যাগ দান করা হলো!
রুদ্রিকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— ফাজিল মেয়ে! অসভ্য মেয়ে! মেরে দাঁত ভেঙে ফেলব!
নৌশি তাতে একটুও ভয় পেল না। বরং চুল ঝাড়া দিয়ে রুদ্রিকের মুখের ওপর চুল ছুড়ে দিয়ে আবার বিছানায় এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ে। তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
— হুহ্! টাইম নাই, পরে আসেন।
রুদ্রিকের চোখ কপালে উঠে গেল। সে এগিয়ে এসে নৌশির সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
— সারাদিনই ফোন চালাও! পড়ালেখা নাই না?
নৌশি ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতেই বলে,
— না!
রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কলেজে কোনো পড়া দেয়নি?
— না।
— যাও, বই-খাতা এনে পড়তে বসো!
নৌশি ফোন থেকে চোখ তুলে না।
— বললাম তো, কলেজে কোনো পড়া দেয়নি। কী পড়ব!
রুদ্রিক এবার গম্ভীর গলায় বলে,
— কলেজে যা পড়ানো হয়েছে, তাই পড়ো!
নৌশি আগের মতোই ফোন টিপতে টিপতে বলে,
— আপাতত বিজি আছি। পরে এসে কথা বলুন।
রুদ্রিক এবার মাত্রাতিরিক্ত বিরক্ত হয়ে গেল।
— তোমার এচিভমেন্ট জিরো, অথচ তোমার এটিটিউড দেখলে মনে হয় পুরো দুনিয়াটা জয় করে নিয়েছো!
নৌশি এবার ফোন থেকে চোখ তুলে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। তারপর একদম নির্বিকার গলায় বলে,
— আমার এটিটিউড এটাই যে আমি এটিটিউড দেখাই!
রুদ্রিক আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হঠাৎ ছোঁ মেরে নৌশির হাত থেকে ফোনটা টান দিয়ে নিয়ে নেয়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
— যাও, পড়তে বসো!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। এক লাফে বেডের ওপর দাঁড়িয়ে রুদ্রিকের কাছ থেকে নিজের ফোনটা নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে,
— আমার ফোন দিন আমাকে! আমার ইচ্ছে হলে পড়ব! আপনি কে বলার?
রুদ্রিক ফোনটা নিজের হাতের মুঠোয় আরো শক্ত করে ধরে বলে,
— আমি তোমার হাসবেন্ড!
— মানি না। আপনি আমার ফোন দেন!
রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
—তোমার মানা আর না মানাতে কী আসে যায়?!
নৌশি রুদ্রিকের কথার পাত্তা দিল না। নিজের ফোনটা নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। বেডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় নৌশি এবার রুদ্রিকের প্রায় সমান সমান উচ্চতায় চলে এসেছে। নৌশি একদিকে হাত বাড়িয়ে ফোন ধরার চেষ্টা করছে, আর রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা অন্যদিকে সরিয়ে নিচ্ছে। একবার ডানে। একবার বাঁয়ে।নৌশির হাত যতবার ফোনের কাছে যাচ্ছে, রুদ্রিক ততবারই ফোনটা সরিয়ে নিচ্ছে।
রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
— পড়া শেষ করো, তারপর ফোন পাবে!
নৌশি রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটে। তারপর ফোনটা নেওয়ার জন্য হঠাৎ লাফ দিতেই বিপত্তি ঘটে। পা পিছলে গেল নৌশির! মুহূর্তের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে নৌশি পড়ে যেতে নেয়। তখনি রুদ্রিক দ্রুত এগিয়ে এসে নৌশির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে সামলে নেয়।।অন্যদিকে পড়ে যাওয়ার ভয় পেয়ে নৌশিও রুদ্রিকের গলা জড়িয়ে ধরে। আর তারপর দুজনেই থেমে গেল। একেবারে খুব কাছাকাছি চলে এসেছে তাদের মুখ।এতটাই কাছাকাছি যে, একে অপরের চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চোখে চোখ পড়ল। কোনো কথা নেই কেবল নীরব দৃষ্টি বিনিময়।
মনে হলো, মুহূর্তটা হঠাৎ থেমে গেছে। নৌশি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল রুদ্রিকের দিকে। এত কাছ থেকে রুদ্রিককে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। ভীষণ সুন্দর। মায়াবী একটা চেহারা। কঠিন মুখটার আড়ালেও এই মানুষটার মধ্যে এমন একটা আকর্ষণ আছে, যা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু হঠাৎ করেই দুজনের নিজেদের অবস্থানের কথা মনে পড়ে গেল। রুদ্রিক দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। তারপর নৌশিকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়। নৌশিও নিজের জগতে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ আগের সেই মুহূর্তটাকে পাত্তাই না দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— মোবাইল দিন।
রুদ্রিক এবার আগের মতোই কঠোর হয়ে বলে,
— আমি আমার কথা থেকে নড়ি না। এক কথা, পড়া শেষ করো, তবেই ফোন পাবে। নয়তো ফোন লকারে রেখে দেব। দ্যান এক মাসেও পাবে না।
নৌশি বুঝতে পারে, রুদ্রিক সত্যিই ফোন দেবে না। পড়তে না বসলে কোনোভাবেই ফোন ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই আপাতত মেনে নেওয়াই ভালো। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে নৌশির মাথায় আরেকটা কুবুদ্ধিও এসে গেল। তার সঙ্গে এমন করার শোধ সে তুলবেই। জোর করে তাকে পড়াতে বসানোর উচিত শিক্ষা রুদ্রিককে সে দেবেই।
এই পরিকল্পনা মনে রেখেই নৌশি শেষমেশ রাজি হয়ে বলে,
— আচ্ছা, বসছি পড়তে।
কথাটা বলেই নৌশি বেড থেকে নেমে গেল। সোফার ওপর থেকে নিজের কলেজ ব্যাগটা নিয়ে এসে বিছানার ওপর রাখে। তারপর ব্যাগ থেকে বই-খাতা বের করে বেডের ওপর বসে পড়তে শুরু করে। এদিকে রুদ্রিকও বাইরে পরা পোশাক বদলে টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নেয়। সারাদিন পেশেন্ট দেখার চাপে শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত। তাই এসে একটু রেস্ট নেওয়া দরকার। কিন্তু এই বেডশিটে শোয়া সম্ভব না। কারণ একটু আগেই বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা এই বেডে শুয়ে লুডু খেলেছে। তাই বেডশিটটা বদলানো দরকার। রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— বই-খাতা নিয়ে উঠো একটু।
নৌশি বই থেকে চোখ তুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
— উঠতে বলেছি, উঠো না।
নৌশি বিরক্তিতে ভেংচি কাটে। তারপর বই-খাতাগুলো বুকের সঙ্গে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বেড থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে দাঁড়ায়। নৌশি নিচে নামতেই রুদ্রিক বেডে বিছানো বেডশিটটা এক টানে তুলে নেয়।
নৌশি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
— কি করছেন?
রুদ্রিক বেডশিটটা হাতে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে,
— দেখছো না, চেঞ্জ করছি।
বলতে বলতেই রুদ্রিক কাভার্ড খুলে আরেকটা পরিষ্কার বেডশিট বের করে আনে। তারপর পুরো বেডে নতুন বেডশিটটা বিছিয়ে দেয়। বেডশিটটা ঠিকঠাক করে বিছানো শেষ হতেই নৌশি আর দেরি করে না। বই-খাতাগুলো হাতে নিয়ে আবার বেডে উঠে বসে।
তারপর আগের মতোই বই খুলে পড়ায় মন দেয় নৌশি।
রুদ্রিক বেডের মাথার দিকের বালিশটা ঝেড়ে ঠিক করে রুদ্রিক আধশোয়া হয়ে শুয়েছে মাত্র তখনি নৌশির ডাক।
— এটা বুঝতে পারছি না।
রুদ্রিক মাত্র আধশোয়া হয়েছিল। নৌশির ডাক শুনে আবার উঠে বসে। তারপর তাকিয়ে দেখে, নৌশি বাংলা বই নিয়ে বসে আছে। বাংলা সাহিত্য পাঠ বইয়ের কিছু একটা বুঝতে পারছে না সে।
রুদ্রিক অবাক হয়ে বলে,
— বাংলা আবার বুঝতে পারে না কে?
নৌশি কোনো দ্বিধা ছাড়াই জবাব দেয়,
— আমি।
রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলে,
— ডিম-দুধ খাও। ব্রেইনটা মারাত্মক দুর্বল।
নৌশি বিরক্ত মুখে বইয়ের একটা শব্দ দেখিয়ে বলে,
— উফফ! বুঝিয়ে দিন না এটা।
রুদ্রিক শব্দটার দিকে তাকিয়ে বলে,
— কপোল অর্থ গাল! এই সামান্য শব্দের অর্থ বুঝো না?
নৌশি একদম নির্লিপ্তভাবে বলে,
— না।
রুদ্রিক আর কথা বাড়ায় না। আবার গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে। মাথাটা বালিশে এলিয়ে চোখ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তার বিশ্রাম যেন নৌশির অভিধানে নেই। কিছুক্ষণ পর আবার ডাক এলো,
— এটার অর্থ?
রুদ্রিক এবার প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। তবুও কোনো কথা না বলে চোখ খুলে আবার উঠে বসে। তারপর শব্দটার অর্থ বলে। এবার রুদ্রিক প্রায় পাঁচ মিনিট বসে রইল। মনে মনে ভাবে, এখন যদি আবার শুয়ে পড়ে, তাহলে নিশ্চিত কিছুক্ষণ পর নৌশি আবার ডাক দেবে। আবার কোনো শব্দের অর্থ জানতে চাইবে। কিন্তু রুদ্রিককে অবাক করে দিয়ে নৌশি আর ডাকে না। সে চুপচাপ পড়তেই থাকে।রুদ্রিক মনে মনে ভাবে, হয়তো কোনো শব্দে সমস্যা হচ্ছে না। তাই আবার একটু শুয়ে নেওয়া যাক। রুদ্রিক আবার গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে। চোখ বন্ধ করে। মাত্র কয়েক মুহূর্ত গেছে, আবার সেই পরিচিত ডাক।
— এই লাইনটার অর্থ কী?
রুদ্রিকের মনে হলো, তার ধৈর্যের পরীক্ষা চলছে। তবুও নিজেকে সংযত করে। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তারপর উঠে বসে নৌশির দিকে তাকিয়ে লাইনটার অর্থ বলে দেয়।এরপর আবার গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু এবারও শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মিনিট দুয়েক যেতে না যেতেই নৌশি আবার ডাকে,
— এটার মানে বুঝতে পারছি না।
রুদ্রিক এবার চোখ খুলে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— বুঝবে কিভাবে, সুইটহার্ট? তোমার উদ্দেশ্য তো আমার কলিজা খাওয়া। যাও আর পড়তে হবে না।
কথাটা বলেই রুদ্রিক নিজের নিচে থাকা বালিশের নিচ থেকে নৌশির ফোনটা বের করে নেয়। তারপর ফোনটা নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নাও, মোবাইল নাও তোমার। যা ইচ্ছা করো, কিন্তু আমাকে জ্বালাবে না। আমাকে রেস্ট নিতে দাও।
নৌশির মুখে মুহূর্তেই ফুটে উঠে বিশ্বজয়ী হাসি। এক তীরে দুই শিকার! একদিকে রুদ্রিককে ইচ্ছেমতো ডিস্টার্ব করে নিয়েছে। অন্যদিকে পড়াশোনা না করেই নিজের মোবাইলটাও ফেরত পেয়ে গেছে।।এর চেয়ে বড় জয় আর কী হতে পারে! নৌশি ফোনটা হাতে নিয়ে রুদ্রিককে জ্বালানোর জন্য মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে টেনে টেনে বলে,
— থাংকুউউউউউউউউউ রুদ্রিক চাচ্চুওওওওওওওওওওওওও!
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৬
[ #তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি গল্পের প্রতিটা পর্বে ১ লাখ ৩০ কিংবা ৩৫ হাজার ভিউ হচ্ছে। পেজে ঢুকে গল্পটা পড়ছেন প্রায় ৭০ হাজারের মতো মানুষ। তারপরও গল্পে ৩ হাজারের মতো লাইকও হয় না। এর কারণ কী?গল্প যদি এভাবে চুপিচুপি পড়েন, তাহলে গল্প বন্ধ করে দিবো। এতগুলো মানুষ গল্প পড়ছেন, অথচ রেসপন্সের বেলায় ডিম! এখন বলবেন না, ধৈর্য সহকারে লিখতে! যদি বলেন, তাহলে আপনাদের জন্য দুটো তালি! ধৈর্য সহকারেই লিখছি, নয়তো এতদিনে বন্ধ করে দেওয়ার কথা। প্রতিটি পর্বে ৭০ কিংবা ৮০ হাজারের মতো মানুষ পেজে ঢুকে গল্পটা পড়ছেন! আর অনেকে তো ফিড থেকেই পড়েন। এত মানুষ চুপিচুপি পড়ে চলে যান, আর এটা আমি সহ্য করবো? যদি এমন হয়, গল্প বন্ধ করে দিবো। যখন ভালো রেসপন্স পাবো, তখন দিবো। তাই এই পর্বে রেসপন্স করবেন গল্প টা চাইলে। ]