#কল্পনায়_তুমি_আমার
#লেখিকাঃজেরিন_রায়হানা
#পর্বঃ_৪/শেষ পর্ব
বিকেলে পুলিশ জেসিকার লাশ দিয়ে গেছে।মাহিন হসপিটাল থেকে একাই দৌড়ে চলে এসেছে বাড়িতে ঢুকেই দেখতে পায়, খাটিয়ায় করে সাদা কাফনে মোরানো আছে তার নিষ্পাপ জবা ফুল। চারিদিকে আগড় বাতির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।মাহিন পাগলের মতো কান্না করছে আবার কখনো কখনো নিজের সাথে নিজে কথা বলছে, সারাক্ষণ আবল তাবল বলেই যাচ্ছে। আস্তে করে খাটিয়ার পাশে বসে পড়লো মাহিন।লাশের কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলছে,, এই জবা ফুল দেখ তোর জন্য আমি অনেক গুলো জবা গাছ কিনে আনবো।এই জবা ফুল একবার শুধু চোখ খোল আমি পুরো পৃথিবীকে বলবো দেখো সবাই আমার জবা ফুল বেঁচে আছে আর আমি তোকে বিয়ে করবো রে জবা ফুল। তোকে মেরুন রঙের শাড়ি পড়িয়ে বিয়ে করবো। তোকে অনেক সুন্দর করে সাজিয়ে আমার বউ বানাবো। এই জবা ফুল আমাকে এতো বড় শাস্তি দিস না রে আমি মরে যাবো তোকে ছাড়া। ওও আল্লাহ আমার জবা ফুলকে তুমি আমার জন্য আবার জীবিত করে দাও আল্লাহ। তখন বাড়ির সবাই এসে বলে,,, মাহিন ওঠ এখন দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাবো চাচা, ও চাচা কোথায় নিয়ে যাবে আমার জবা ফুলকে? আমজাদ বলে ওঠে,, এখন জেসিকাকে কবর দিতে হবে। এই কথাটা শোনা মাত্র মাহিন চিৎকার করে ওঠে না........... আমার জবা ফুল কে আমি কোথাও নিয়ে যেতে দিবো না আমি আমার জবা ফুল কে বিয়ে করবো। ও বাবা আমাকে তোমরা জবা ফুলের সাথে বিয়ে দাও না? এই জবা ফুল আমাকে ছেড়ে চলে যাবি তুই? যাস না রে জবা ফুল আমি যে মরে যাবো রে। আমার ভুল হয়েছে রে আমার তাসফিয়ার সাথে বিয়েতে রাজি হওয়াতে তুই কষ্ট পেয়েছিস তাই না? আমাকে মাফ করে দে না রে? আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো বলবি মাহিন ভাই আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু তুই বলিসনি তাই রাগ করে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। আমার অনেক বড় ভুল হয়েছে রে আমাকে মাফ করে দে। তুই একবার মুখ ফুটে বললে আমি তোর হয়ে যেতাম। আর আমারই দোষ আমিই তোকে একবারও বলিনি আমি তোকে ভালোবাসি। কিন্তু দেখ এখন বলছি আমি তোকে অনেক বেশি ভালোবাসি রে। সবাই মাহিন কে রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে জেসিজার লাশ নিয়ে চলে গেলো। জেসিকার বাবা খাটিয়া নিয়ে বলে আমার কি পোড়া কপাল মেয়ের লাশের খাটিয়া বাবাকে নিয়ে যেতে হচ্ছে কথাটা বলে হু হু করে কেদে ওঠে। পরিশেষে মাটির নিচে শাহিত করা হয় জেসিকার লাশ।
মাহিন ঘরের মধ্যেই গগন ফাটানো চিৎকার আর সব কিছু জিনিস ছুড়ে ফেলছে। আর জেসিকার মা চাচিরা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। রাইশা আর নিশাও কিছু খাচ্ছে না শুধু কেদেই যাচ্ছে।
জেসিকা মরার একদিন হয়ে এলো। এখনো মাহিনের ঘরের দরজা খুলে দেয়নি কেউ। নিশা আর রাইশা জেসিকার রুমে এসে জেসিকার স্মৃতি দেখছে আর কান্না করছে। হঠাৎ করেই নিশার চোখ গেলো জেসিকার পড়ার টেবিলে, ধির পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখলো টেবিলে একটা চিঠি আর একটা ডায়েরি। নিশা তাৎক্ষণিক ডায়েরি খোলে এবং প্রথম পাতায় বড় করে লেখা মাহিন ভাই। মাহিন ভাই লেখাটা দেখেই নিশা ডায়েরি টা আর দেখলো না দ্রুত মাহিনের রুমে যাচ্ছে তখনই দেখতে পেলো রুহিও মাহিনের ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে। নিশাকে দেখেই বলে ওঠে নিশা আপু? তোমার আর মাহিন ভাইয়ের সাথে কিছু কথা আছে। তখন নিশা রুহিকে নিয়ে মাহিনের ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। নিশা আর রুহিকে দেখেই মাহিন হিংস্র বাঘের মতো তেড়ে আসে। বলে এই তোরা আমাকে ঘরে বেধে রেখেছিস কেন আর আমার জবা ফুল কোথায় আমাকে আমার জবা ফুলের কাছে নিয়ে চল। তখন রুহি শান্ত গলায় বলে ওঠে,, মাহিন ভাই তুমি শান্তি পেয়েছো?? মাহিন কিছু বুঝলো না। নিশা বললো মানে? মাহিন কেন শান্তি পাবে? রুহি বললো,, সব বলছি তোমরা শান্ত হও। হ্যা বলো। রুহি বলতে শুরু করে....
মাহিন ভাই জানো জেসিকা তোমাকে কতটা ভালোবাসে? তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যে জেসিকা তোমাকে ঠিক কতটা পছন্দ করে। আমার সাথে যতোক্ষণ থাকে সারাক্ষণ শুধু তোমার কথাই বলে। মাহিন ভাই তুমি কি এসব বোঝোনি?? নাকি বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করেছো?? মাহিন বললো.. বুঝেছি কিন্তু জবা ফুল তো কখনো আমাকে বলেনি তাই আমিও সাহস পাইনি। রুহি বাকা হেসে বললো সাহস?? তুমি ছেলে হয়েও সাহস হয়নি তাহলে একটা মেয়ের থেকে সেই সাহসীকতার আশা করছো?? আর যাইহোক তোমার গায়ে হলুদের দিন আমি আর জেসিকা তোমার রুমে কেন গিয়েছিলাম জানো?? জেসিকা তোমাকে সব বলতে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি সেটাও বলতে দিলে না তুমি তো তোমার ইগো নিয়ে ছিলে। জেসিকার কষ্টের একভাগ কষ্টও তুমি পাওনি। আর কিছু আমি বলতে চাচ্ছি না তুমি জেসিকার লেখা ডায়েরি আর একটা চিঠি আছে দেখে নিও তুমি। আমি যাই এই বাড়িতে আর থাকতে পারছি না। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড নেই আমি থেকে কি করবো, থাকো তোমরা আর মাহিন ভাই সময় হলে ডায়েরি আর চিঠি টা পরে দেখো। রুহি চলে যায়। তখন নিশা মাহিনকে জেসিকার ডায়েরি আর চিঠি দিয়ে বলে এই নে এগুলো পেয়েছি মনে হচ্ছে এগুলোর কথাই রুহি বলে গেলো। তুই পড় আমি বাহিরে যাই। আচ্ছা নিশা আপু। মাহিন জেসিকার ডায়েরি পরে কান্নায় আবার আগের মতো পাগল হয়ে গেছে। চিঠি পরে বলছে... এই জবা ফুল তুই তো বলেছিলি দূরে কোথাও চলে যাবি কিন্তু এতো দূরে চলে যাবি এটা তো কথা ছিল না রে। তুই যতোদূরই গেলিনা কেন আমি ঠিক খুজে বের করতাম কিন্তু তুই এটা কোথায় চলে গেলি এখান থেকে তো আনতে পাড়ছি না রে জবা ফুল। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি রে তোর চিন্তায় তোকে ছাড়া কিছু ভালো লাগছে না রে। এতোবড় শান্তি কেন দিলি আমায়। আমি আর পাড়ছিনা রে প্লিজ ফিরে আয় না জবা ফুল। একবার আয় আর বকা দিবো না দেখ তোর মাহিন ভাই তোকে কথা দিচ্ছি তোকে বিয়ে করবো আর অনেক আদর করবো প্লিজ ফিরে আয়। তুই আমার কলিজা তুই আমার জান তুই আমার পৃথিবী রে জবা ফুল। মাহিন ধীর কন্ঠে গেয়ে ওঠে ❝কোন ভুলে তুমি শুলে বলো..! এই ফুলসজ্জায়...স্বপ্নের লাশ কাধে নিয়ে.... ওরা কেন চলে যায়.... ❞
জেসিকার মারা যাওয়ার ৫ বছর কেটে গেলো।বাড়ির সবাই সবার মতো আছে। জেসিকার কথা তারা একেবারে ভুলে না গেলেও জেসিকাকে নিয়ে তারা আগের মতো মাতামাতি করে না। সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। নিশার বিয়ে হয়েছে একটা বাচ্চাও আছে, নিশা তার মেয়ে সন্তানের নাম রেখেছে জেসি, হয়তো সে একটু জেসিকাকে বেশিই ভালোবাসতো। রাইশা এখন কলেজে ওঠেছে বেশ পরিপাটি হয়ে থাকে। সবাই সবার জীবন সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নিলেও মাহিন তার জীবন তার মতো করে সাজিয়েছে, সে সারাদিন জেসিকার কবরের পাশেই বসে থাকে ওখানেই খাবার খায়, গ্রামের সবাই মাহিনকে পাগল ভাবে, এইতো আজকেই জেসিকার ৫ তম মৃত্যুবার্ষীকি।এই তোরা জবা ফুল নিয়ে কবরের পাশে বসে আছে মাহিন।....... কি রে জবা ফুল দেখ তোর মাহিন ভাই তোর জন্য কি এনেছি, দেখ অনেক গুলো এনেছি তুই পছন্দ করিস তো। এই জবা ফুল দেখ না? তোকে ভালোবেসে না পেয়ে আজ সবার চোখে আমি পাগল। সবাই আমাকে পাগলের চোখে দেখে তুই কেন আমার পাগলামি দেখলি না? আমি তো তোকে অনেক ভালোবাসি রে। দেখ তোর জন্য আমি বাড়িতেও যাই না কারণ ঐ বাড়িতে তুই নেই। তোকে অনেক ভালোবাসি। আমাদের ভালোবাসা পূর্নতা পেলে কি খুব ক্ষতি হতো?? না হতো না তবে কেন পেলাম না পূর্নতা? তোর মাহিন ভাই তোকে কথা দিচ্ছি পরকালে তোর সাথেই থাকবো তখন আমাদের পূর্নতা হবে। জানিস জবা ফুল? তোকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে কিন্তু দেখতে পাই না। আর দেখ আমার কাছে সবসময় তোর রেখে যাওয়া ডায়েরি আর চিঠি আমার কাছে রাখি। আমার সামর্থ নেই রে, যদি সামর্থ্য থাকতো তবে আমিও তোর জন্য ছোট তাজমহল বানাতাম। তাজমহল বানাতে না পাড়লেও ভালোবাসায় কমতি রাখছি না। তোকে আজীবন ভালোবেসে যাবো। বাস্তব না হলেও কল্পনায় তুই আমার.................সমাপ্ত...............................
আপনারা যারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উপন্যাস পড়েছেন তাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।
এই উপন্যাস থেকে সবার শেখা উচিত সময় থাকতে ভালোবাসা প্রকাশ করা উচিত, নাহলে মাহিন আর জেসিকার মতো হয়ে যাবে। আর one said love এটা অনেক সুন্দর কিন্তু অনেক বেশি কষ্ট দেয়। তাই সবাই সময় থাকতে ভালোবাসা প্রকাশ করুন। আর আমি যদি কোনো ভুল করি দয়া করে মাফ করবেন।
উপন্যাস টা কেমন লাগলো কমেন্টে জানাবেন প্লিজ প্লিজ প্লিজ ❤️🩹😌📜