তোমাতেই পূর্ণতা
পর্ব ২:
লেখিকা: ইসরাত জাহান রিমি
সকাল ৭টা ১৫ মিনিট।
কবির বাড়ির সবাই কমবেশি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। শুধু একজনেরই কোনো খবর নেই।
সে হলো এই বাড়ির একমাত্র শান্তির শত্রু—ইরতিজা ইবনাত ইরা!
মেয়েটা কম্বল মুড়ি দিয়ে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন পৃথিবীতে স্কুল নামের কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই।
এদিকে ইরার বড় ভাই সামির কবির সোজা তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজা খুলে উঁকি দিতেই তার মুখে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
— ওহহো! আমার আদরের বোন এখনো ঘুমাচ্ছে?
কোনো উত্তর নেই।
— ইরু?
নীরবতা।
— ইরতিজা ইবনাত ইরা!
কম্বলের ভেতর থেকে গুমগুমে আওয়াজ এল,
— কী হইছে? মরছিস?
সামির দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
— না, আমি মরিনি। কিন্তু তোর স্কুলে যাওয়ার সময় প্রায় শেষ!
ইরা চোখ না খুলেই বলল,
— তুই গিয়ে আমার হয়ে ক্লাস কর।
— বাহ! আমি তোর হয়ে ক্লাস করব, তোর হয়ে পরীক্ষা দেব, তোর হয়ে বকা খাব! আর তুই বাসায় বসে রাজত্ব করবি, তাই তো?
— হুম। বুদ্ধি থাকলে বুঝতি!
সামির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বিছানার পাশে গিয়ে জোরে বলল,
— আম্মুউউ! তোর মেয়ে মনে হয় স্কুল ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিছে!
ইরা ধড়মড় করে উঠে বসল।
— কীইই?! তুই আমার বিয়ের কথা কইলি কেন?!
সামির হেসে কুটিকুটি।
— ওরে! বিয়ের নাম শুনে ঘুম কই গেল তোর?
ইরা বালিশটা হাতে নিয়ে বলল,
— তুই না একটা আস্ত শয়তান!
— ধন্যবাদ। তোর কাছ থেকে এমন প্রশংসা পেয়ে আমি গর্বিত।
— তোরে আমি এখন দেখাচ্ছি!
ইরা বালিশ ছুড়ে মারল।
ধপাস!
সামির বালিশটা ধরে ফেলল।
— এইটুকু শক্তি? তোরে তো মশাও ভয় পায় না!
— তুই দাঁড়া!
ইরা বিছানা থেকে নেমে আরেকটা বালিশ তুলে নিল। সামিরও আরেকটা বালিশ হাতে নিয়ে যুদ্ধের ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
— প্রস্তুত, মিস ইরতিজা?
— আয়, মিস্টার বাঁদর!
পরের মুহূর্তেই শুরু হলো বালিশ যুদ্ধ!
একবার ইরা মারছে, আরেকবার সামির। বালিশের তুলা উড়ছে, কম্বল মেঝেতে পড়ছে, আর দুজনের চিৎকারে পুরো বাড়ি মাথায় উঠেছে।
সামির বালিশ দিয়ে ইরার মাথায় হালকা টোকা দিয়ে বলল,
— এই নে! তোর ফাজলামির পুরস্কার!
ইরা তার হাত থেকে বালিশ কেড়ে নিয়ে বলল,
— আর এই নে! তোর অতিরিক্ত কথা বলার জরিমানা!
ধুপ! ধাপ! ধুপ!
হঠাৎ ইরা বালিশ তুলতে গিয়ে নিজের পায়ে কম্বল পেঁচিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
সামির হেসে বলল,
— হাহাহাহা! তুই নিজের সঙ্গেই মারামারিতে হেরে গেলি!
ইরা রেগে গিয়ে বলল,
— হাসিস না! তোর হাসির দাঁত ফেলে দেব!
— আগে নিজের পা খুঁজে বের কর!
— সামির!
— জি, ম্যাডাম?
— তুই একটা বাঁদর!
— আর তুই বাঁদরের হেডমিসট্রেস!
ইরা এবার উঠে সামিরের হাত ধরে টান দিল। সামিরও তার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। দুজনেই হাসতে হাসতে বিছানার পাশে রাখা নরম গদির ওপর গড়িয়ে পড়ল।
সামিরের চুল এলোমেলো, ইরার ওড়না বিছানার নিচে, আর ঘরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এখানে কোনো ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে।
ঠিক তখনই দরজার সামনে একটা গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল।
— এখানে কি কুস্তি প্রতিযোগিতা হচ্ছে?
দুজন একসঙ্গে মাথা তুলে তাকাল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ফারহান কবির। পাশে নওশীন আরা। দুজনের মুখেই চাপা হাসি।
সামির তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জামা ঠিক করল।
— আব্বু, আসলে আমি ইরাকে ব্যায়াম করাচ্ছিলাম।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— মিথ্যা! এই বাঁদরটা আমারে মারছে!
সামির চোখ বড় করে বলল,
— আমি মারছি?! তুই আমারে পাঁচবার বালিশ দিয়ে মারছিস!
— তুই আগে শুরু করছিস!
— তুই আগে ঘুম থেকে উঠতে চাস নাই!
— তুই আগে আম্মুর কাছে আমার নামে নালিশ করছিস!
— তুই আগে বালিশ ছুড়ছিস!
— তুই আগে—
নওশীন দুহাত তুলে বললেন,
— থাম! তোরা দুইজন কি জন্মের পর থেকে ঝগড়া করার চুক্তি করে আসছিস?
দুজন চুপ।
ফারহান গম্ভীর মুখে বললেন,
— আমার মনে হয়, তোদের দুজনকে একটা আলাদা ঘর দেওয়া উচিত।
ইরা অবাক হয়ে বলল,
— সত্যি, আব্বু?!
— হ্যাঁ। একটা ঘরে তোরা দুইজন থাকবি, আর বাকি বাড়ির মানুষ শান্তিতে থাকবে।
সামির হেসে উঠল।
— আব্বু, দারুণ আইডিয়া!
ইরা সামিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই হাসিস কেন? তোরে ওই ঘরে আটকে রাখব!
সামির তার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
— আগে স্কুলে যা, ছোট্ট পাগলি!
ইরা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিল।
— আমার চুলে হাত দিবি না! তোর হাতের মধ্যে কী আছে, জানি না!
— বুদ্ধি আছে। তোর মাথায় একটু ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
— তোর নিজের মাথাতেই তো বুদ্ধি নাই!
— তোর মাথায় ঢোকাতে গিয়ে আমার বুদ্ধি সব শেষ!
— আম্মুউউ! দেখো, এই বাঁদরটা আবার শুরু করছে!
নওশীন কপালে হাত দিয়ে বললেন,
— আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও!
_____💗
সকালের নাশতার টেবিলে
কিছুক্ষণ পর সবাই নাশতার টেবিলে বসেছে।
ইরা মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। সামির তার পাশের চেয়ারে বসে এমনভাবে পরোটা খাচ্ছে, যেন একটু আগের মারামারির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
ইরা তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এই, তুই আমার পরোটা খাচ্ছিস কেন?
সামির মুখভর্তি খাবার নিয়ে বলল,
— এটা তোর পরোটা? প্লেটে তোর নাম লেখা আছে?
— আম্মু আমার জন্য দুইটা পরোটা দিছে!
— এখন একটা আছে। জীবনে সবকিছু ধরে রাখা যায় না, বোন!
ইরা চামচ নামিয়ে বলল,
— তুই আমার পরোটা ফেরত দে!
— খাবার একবার পেটে গেলে ফেরত দেওয়া কঠিন।
— তুই ইচ্ছা করে আমারে রাগাস!
— আর তুই ইচ্ছা করে রাগিস!
ইরা সামিরের প্লেট থেকে একটা ডিম তুলে নিজের প্লেটে রাখল।
সামির সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করল,
— এই! আমার ডিম!
ইরা নির্বিকার মুখে বলল,
— তোর প্লেটে কি তোর নাম লেখা আছে?
ফারহান হেসে ফেললেন।
— বাহ! প্রতিশোধ নিতে শিখে গেছে দেখি!
সামির ইরার দিকে আঙুল তুলে বলল,
— আব্বু, তোর মেয়েকে সামলাও। বড় হয়ে এই মেয়ে আমাদের সবাইকে পথে বসাবে!
ইরা ডিমে কামড় দিয়ে বলল,
— তুই আগে নিজের জীবন সামলা। আমারটা পরে দেখিস!
নওশীন বললেন,
— ইরা, তাড়াতাড়ি খেয়ে স্কুলে যা। আর সামির, ওকে একটু সাহায্য কর। প্রতিদিন ঝগড়া না করে বোনকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময়টুকু শান্তিতে কাটাতে পারিস না?
সামির নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আম্মু, শান্তি আমার জীবনে একটা বিলুপ্ত প্রাণী!
ইরা হেসে বলল,
— তোর জীবনে শান্তি আসবে না, কারণ তুই নিজেই একটা অশান্তি!
— তোরে একদিন—
— কী করবি? কী করবি?
নওশীন টেবিলে হাত রাখলেন।
— আর একটা কথা বললে, দুজনের ফোন এক দিনের জন্য বন্ধ!
দুজন একসঙ্গে চুপ করে গেল।
সামির আস্তে করে বলল,
— আম্মু, তুই অনেক শক্তিশালী।
ইরা মাথা নেড়ে বলল,
— একদম। আম্মুর সামনে আমরা দুইজনই বিড়াল!
স্কুলে যাওয়ার আগে শেষ যুদ্ধ!
ইরা তাড়াহুড়ো করে ঘরে গিয়ে ব্যাগ গোছাতে লাগল।
বই ঢোকাচ্ছে, খাতা ঢোকাচ্ছে, কলম খুঁজছে—কিন্তু তার বিজ্ঞান বইটা কোথাও নেই!
— আম্মুউউ! আমার বিজ্ঞান বই কই?!
সামির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে থেমে বলল,
— বইও কি তোর সঙ্গে ঝগড়া করে পালাইছে?
ইরা চোখ রাঙাল।
— তুই জানিস বইটা কোথায়?
— জানি।
— কই?!
— বলব না।
ইরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— সামির, প্লিজ বল না!
সামির অবাক হয়ে বলল,
— ও মা! আজ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠছে নাকি? আমার বোন আমারে প্লিজ বলছে!
ইরা দাঁত চেপে বলল,
— তুই বইয়ের কথা বলবি, নাকি তোর কান টানব?
সামির হেসে বলল,
— তোর বিজ্ঞান বইটা তোর বালিশের নিচে।
ইরা দৌড়ে বিছানায় গিয়ে বালিশ তুলল। সত্যিই বইটা সেখানে!
বই হাতে নিয়ে সে ফিরে এসে বলল,
— তুই জানতি, তাও আগে বলিস নাই?!
— একটু বিনোদন দরকার ছিল।
— তোর বিনোদনের জন্য আমার জীবন অতিষ্ঠ!
— তুই আমার বোন। আমার বিনোদনের স্থায়ী ব্যবস্থা!
ইরা বইটা ব্যাগে ঢুকিয়ে সামিরের দিকে বালিশ ছুড়ে মারল।
সামির হেসে বলল,
— স্কুলে গিয়ে স্যারকে বলিস, তোর বিজ্ঞান বইও তোর কাছ থেকে পালাতে চায়!
ইরা জুতা পরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— তুই বাসায় থাক। ফিরে এসে তোর খবর আছে!
সামির পেছন থেকে চিৎকার করল,
— আগে স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফিরিস, তারপর আমার খবর নিস!
ইরা এক মুহূর্ত থেমে গেল।
তারপর ঘুরে বলল,
— তুই আমার ভাই না, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ!
সামির বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— আহা! এত ভালোবাসা! আমার চোখে পানি চলে আসছে!
ইরা আর কথা না বাড়িয়ে স্কুলের উদ্দেশে রওনা দিল।
স্কুলের গেটে
স্কুলের গেটে ঢুকতেই ইরার সঙ্গে দেখা হলো তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী আলভিনা নূর, ওরফে আলভির।
আলভি ইরার এলোমেলো চুল আর হাঁপানো অবস্থা দেখে বলল,
— কী রে? তুই কি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আসছিস?
ইরা ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বলল,
— না রে, আমার জীবনের প্রধান শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছি।
— কে আবার?
— আমার ভাই সামির!
আলভি হেসে বলল,
— তোদের বাসায় প্রতিদিন মারামারি হয় না?
— হয় না মানে? সকালে বালিশ যুদ্ধ, নাশতার সময় পরোটা যুদ্ধ, তারপর বই খোঁজার যুদ্ধ!
আলভি পেট ধরে হাসতে লাগল।
— তোদের বাসায় একদিন থাকতে চাই। বিনা টিকিটে কমেডি শো দেখা যাবে!
ইরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— তুই থাকলে তোকে আর আমার ভাইকে এক ঘরে আটকে রাখব। দেখি কে কাকে বেশি জ্বালাতে পারে!
আলভি হেসে বলল,
— আমি তোর ভাইকে পাঁচ মিনিটেই হারিয়ে দেব!
— আগে আমার বিজ্ঞান স্যারকে হারাতে সাহায্য কর। কাল রাতে পাঁচটা প্রশ্ন পড়ার কথা ছিল। আমি দুইটা পড়ছি, একটার উত্তরও ঠিকমতো মনে নাই!
আলভির হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল।
— কীইই?! তুই দুইটা পড়ছিস? আমি তো একটা প্রশ্নের উত্তরও পড়ি নাই!
দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একসঙ্গে বলল,
— আজকে আমাদের কপালে দুঃখ আছে!
ঠিক তখনই স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ইরা বিজ্ঞান বইটা বুকে চেপে ধরে বলল,
— আল্লাহ, আজকে যেন স্যার আমাকে কিছু না জিজ্ঞেস করে!
আলভি বলল,
— আমিন!
দুজন ক্লাসের দিকে দৌড় দিল।
কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে ইরা যা দেখল, তাতে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আরশ খান স্যার ইতিমধ্যেই ক্লাসে উপস্থিত। হাতে বিজ্ঞান বই, চোখে সেই চিরচেনা গম্ভীর দৃষ্টি।
তিনি দুজনকে দেখে বললেন,
— খুব ভালো। তোমরা দুজন ঠিক সময়েই এসেছ। আজকের ক্লাস শুরু করব তোমাদের দিয়ে।
ইরা আলভির দিকে তাকাল।
আলভি ইরার দিকে তাকাল।
দুজনের মুখেই একটাই কথা—
“আমাদের আজকে বাঁচার কোনো উপায় নাই!”
আরশ স্যার বই বন্ধ করে বললেন,
— ইরতিজা, দাঁড়াও। প্রথম প্রশ্নটা তোমাকেই করছি।
ইরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা—
“হে আল্লাহ, সামির ভাইয়ার সঙ্গে আর কখনো ঝগড়া করব না। শুধু আজকের ক্লাসটা পার করে দাও!”
কিন্তু সে জানত না, ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরলে সামির তার জন্য আরও বড় একটা কাণ্ড অপেক্ষা করিয়ে রেখেছে!
চলবে… 😂💗