লেখনীতে: মৃদুলা বর্মন
পর্ব: ৩
“আমায় হিয়ার মাঝে,
লুকিয়ে ছিলে.....
দেখতে আমি পাইনি।
তোমায় দেখতে আমি পাইনি,
আমার হিয়ার মাঝে
লুকিয়ে ছিলে......
বাহির পানে চোখ মেলেছি,
বাহির পানে......”
মৃদু শব্দে বেজে চলা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে নিজেও গুনগুন করছে শালিক। মেয়েটা যে ভীষণ সঙ্গীতপ্রিয়! অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে এখন একটু কথা বললেই হাঁপিয়ে ওঠে। যার কণ্ঠের শব্দে একসময় বাড়ি মুখরিত থাকত, সে আজ প্রায় নিশ্চুপ!
কোনো এক ঘটনা ধ্বংস করে দিয়েছে ষোড়শীকে। কিশোরীটির সমস্ত স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে সেই ঘটনা!
গান শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। খিদে পেয়েছে শালিকের। মায়ের কাছ থেকে খাবার চাওয়ার জন্য হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে সে অগ্রসর হলো ঠাকুরঘরের দিকে।
ঠাকুরঘরের দরজার সামনে গিয়ে থেমে পড়ল সে। শারীরিক নিয়মের কারণে এখন তার কিছুদিনের জন্য সেখানে প্রবেশ করা বারণ। বাইরে থেকেই নিজের মা, শিউলিকে ডেকে উঠল শালিক—
—‘মা, তোমার পূজা হলে আমায় খেতে দিও।’
ভদ্রমহিলা নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেই মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
শালিক সেখান থেকে প্রস্থানের জন্য হুইলচেয়ার ঘোরাতেই দেখল, উজান শার্টের হাতা ফোল্ড সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে।
শালিক দেখলো তার দাদাটাকে কি সুদর্শন লাগছে!মুচকি হেসে আওরালো,
-' কেউর নজর না লাগুক।
শালিক সেদিকে এগিয়ে গেল।
উজান প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাল শালিকের দিকে। বোধহয় জানতে চাইল, শালিক তাকে কিছু বলবে কি না।
শালিক বলল—
—‘সত্যি বলতে, এখনও খাওয়া হয়নি।’
উজান একটু রাগান্বিত হলো। কারণ আজ শালিককে হাসপাতালে নিতে হবে। আজ তার রক্ত নেওয়ার দিন। থ্যালাসেমিয়া যেন মেয়েটার জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে!
উজান প্রত্যেকবার আগে থেকেই বলে রাখে, যেন শালিক সকাল সকাল তৈরি হয়ে থাকে। অথচ প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে দেরি হয়ে যায়।
রাগ দমিয়ে উজান বলল—
—‘চল, খাবার বেড়ে দিই।’
বলেই শালিকের হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে তাকে নিয়ে ডাইনিং রুমে গেল।
দুটো থালায় রুটি, সেদ্ধ ডিম, ডাল আর সবজি নিল উজান। নিজে একটি চেয়ার টেনে শালিকের পাশে বসল।
শালিককে খাওয়াতে শুরু করল সে, সঙ্গে নিজেও খেতে লাগল।
আদরের ছোটো বোনটাকে যে ভীষণ ভালোবাসে উজান! সেই ছোটবেলা থেকেই দুই ভাই চোখে হারাত শালিককে। কিন্তু মেয়েটার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যেন আজ সে স্মরণের চোখের বিষ হয়ে উঠেছে।
স্মরণ যেন মেয়েটাকে সহ্যই করতে পারে না। অথচ উজান! বোনের সকল অবস্থাতেই সে তার পাশে থাকে।
শালিক মনে মনে ভাবে, জীবনের এত না-পাওয়ার মাঝেও তার এই ভাইয়াটা কত বড় পাওয়া!
তার এই দুই ভাই একসময় ছিল তার সৌভাগ্য। মাঝপথে স্মরণটাই যেন দুর্ভাগ্য হয়ে গেল। কিন্তু উজান? সে তো শালিকের জীবনে ভগবানের দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। এমন ভাই পেলে আর কী লাগে!
উজানের মা বাইরে দাঁড়িয়ে ভাই-বোনের এই দৃশ্য দেখছিলেন। ভদ্রমহিলার চোখে জল!
ছেলেটা যে তাঁরও সৌভাগ্যের ফল!
খাওয়া শেষ হতেই উজান মায়ের উদ্দেশে বলল—
—‘আমি তাহলে শালিককে নিয়ে যাই।’
—‘যা বাবা।’
বলেই উজানের মা উজানের কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিলেন। আদরের সহিত কয়েকবার ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। শেষে মেয়েকেও স্নেহভরে আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তিনি।
উজান মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। দিয়েও হয়তো লাভ নেই। কারণ এটা যে তাদের নিত্যদিনের নিয়ম!
উজান মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে শালিককে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
---
রাতের দীর্ঘ অবসানের পর ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে উঁকি দিল রক্তিম সূর্য। জানালার ফাঁক গলে আসা কোমল সোনালি আলো এসে পড়ছে ময়ূরীর মুখমণ্ডলে। জ্বরের ক্লান্তি কাটিয়ে আজ যেন শরীরটা বেশ হালকা লাগছে তার। পাখিদের মিষ্টি কূজনে ধীরে ধীরে খুলে গেল তার আঁখিযুগল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শুয়ে থেকে ময়ূরী গভীরভাবে শ্বাস নিল। জ্বরের ঘোর কেটে যাওয়ার পর সকালের নির্মল বাতাস যেন নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিল তাকে। বাইরে সূর্যের আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে সকালের নানা ব্যস্ততার ক্ষীণ শব্দ।
ময়ূরী আরামোড়া ভেঙে উঠে বসল। ঠিক তখনই পুরোনো কাঠের দরজা খোলার ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ হলো।ময়ূরী চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল, তার কাকি প্রভা ঘরের ভেতরে আসছে।
ময়ূরী একটু অবাক হলো।
প্রভা এসেই ময়ূরীকে সোজাসাপটা কথায় অপমান করল—
—‘মহারানীর সকাল অইল, তাইলে? বাড়ির কাম কাইজ কি তোর মরা মা আইয়া কইরা দিয়া যাইব? পরের ঘাড়ে পইড়া আছস, আবার আরাম চাস? নির্লজ্জ মেয়েছেলে!’
নিজের কথার কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আকস্মিক ময়ূরীর কেশগুচ্ছ টেনে ধরল সে।
হঠাৎ আক্রমণে খেই হারাল ময়ূরী। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে ‘আহ্’ সূচক শব্দ করে উঠল।
প্রভা চুলে টানতে টানতে আরও কিছু অপমানজনক কথা বলতে লাগল, ময়ূরীর মা ও তাকে নিয়ে কটূক্তি করতে লাগল।
ময়ূরী প্রভার হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করতে লাগল। রোজ রোজ কেন তার সঙ্গে এমন আচরণ করবে এই মহিলা?
আবার দুটো কথা বললেও দোষ!
আজ শিক্ষা দিতেই হবে।
আর সহ্য করবে না সে। এতদিন নিজের নামে বলা কথা সহ্য করলেও মায়ের নামে এসব কথা কেন শুনবে সে?
তাই এবার ময়ূরী এক অদ্ভুত কাজ করে বসল। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় প্রভার শাড়ির ফাঁক দিয়ে হাত দিয়ে উদরে খামচি বসিয়ে দিলো।
ময়ূরীর এহেন কাণ্ডে প্রভা নিজের পেট চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
ময়ূরী রাগে গজগজ করে বলে উঠল—
—‘কিছু বলি না বলে ভেবো না যে, সবসময় সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করব।’
বলেই দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অনেকটা দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো ময়ূরী।সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে যাবে, তখনই দেখল নীলা এঁটো হাত নিয়ে উপরে আসছে।
ময়ূরীকে থামিয়ে দিয়ে নীলা জিজ্ঞেস করল—
—‘কী হয়েছে? তুই এমন হন্তদন্ত হয়ে আসছিস কেন? মায়ের চিৎকার আর তোর চিৎকার শুনলাম। আবার কি কিছু হয়েছে?’
ময়ূরী সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। কোনো জড়তা ছাড়াই।
মেয়ের মুখে সব কথা শুনে নীলার মনে মায়ের জন্য আফসোসের বদলে একরাশ ঘৃণা জন্মাল।
নীলা অল্প হেসে বলল—
—‘বেশ করেছিস। ওই মহিলা তোকে মারতে আসবে আর তুই চুপ করে থাকবি? না, আর এমন করবি না। আজকের মতো নিজের সুরক্ষা নিজেরই নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সহ্য করেছিস।’
বলেই ময়ূরীকে বুকে জড়িয়ে ধরল সে।
ইচ্ছে করছে ছোটো বোনটাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে! পারলে হয়তো সবসময় এভাবেই আগলে রাখত, ওই মহিলার হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে।
এভাবেই কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলো।
নীলা ময়ূরীকে বলল—
—‘নিচে আয়, এক্ষুনি খাবি আমার সঙ্গে।’
—‘হাত-মুখ ধুইনি।’
—‘বেসিন থেকে কুলকুচি করে আয়। পরে ব্রাশ করিস। ওই মহিলার তো আবার তোর খাবার সহ্য হয় না। আমার সঙ্গে বস।’
ময়ূরী বাধ্য মেয়ের মতো কুলকুচি করে খেতে বসে পড়ল।
নীলা নিজের থালায় আরও ভাত নিয়ে নিজেও খেল, আবার ময়ূরীকেও খাইয়ে দিল।
উপর থেকে এসব দৃশ্য দেখছে প্রভা, আর ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে।
নিজের মতো বিলাপ করতে করতে বলছে—
—‘মেয়েকে ছোটো থেকে বড় করিয়েছি। নিজে খেয়ে খাইয়েছি। নিজে না পইড়া, তরে পরিয়েছি...।’
কিছু হলেই এই মহিলা এমন করে। কে আর কান দেয় তাঁর কথায়? নিজের মতো বিলাপ করতে করতে একসময় আপনা-আপনিই চুপ হয়ে যায় তিনি।
খাওয়া শেষে নীলা বেরিয়ে গেল।
এঁটো থালাবাসন ধুয়ে ময়ূরী নিজের ঘরে চলে গেল।
আর প্রভা হয়তো তখনও ঢঙ করে নিজের লোক দেখানো শোক পালন করে চলেছে।
চলবে.......