প্রেমের অন্তরালে
লেখনীতে: মৃদুলা বর্মন
পর্ব: ২
রাত্রির তৃতীয় প্রহর চলমান। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে রজনী। ক্ষণে ক্ষণে নিশাচরদের ধ্বনি কর্ণগোচর হচ্ছে। নিশাচর বিহঙ্গদের ডাক কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলছে। গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে সম্পূর্ণ কক্ষজুড়ে। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় ময়ূরীর মুখটা আবছা বোঝা যাচ্ছে। কী মায়াবী চেহারা! এমন ঘুমন্ত রাত্রিকন্যাকে দেখলে যে কারও মায়া লেগে যাবে। চোখ ফেরাতে যেন ইচ্ছে হবে না।
কথাগুলো ভেবে আনমনে হাসল নীলা। বোনটাকে যে সে বড্ড ভালোবাসে। তাই তো কাজ থেকে ফিরে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। যখন জানতে পেরেছে তার আদরের অনুজার জ্বরাক্রান্ত অবস্থা, তক্ষুণি ছুটে এসেছে।
কাজ থেকে এসে কিচ্ছুটি মুখেও তোলেনি। কারণ সে জানে, তার বোনটাও যে সকাল থেকে অভুক্ত। তার মা অর্থাৎ ময়ূরীর কাকি প্রভা যে তাকে সকাল থেকে মারধর করে অভুক্ত রেখেছে, তা মেয়েটার মলিন চেহারায় স্পষ্ট।
এই মহিলার ওপর ভীষণ রাগ-অভিমান নীলার। মহিলাটি কীভাবে তার মা হলো, তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
ময়ূরীর মৃদু গোঙানির শব্দে নীলার ভাবনার সুতো ছিঁড়ল।
ময়ূরীর বক্ষে ও ললাটে হাত ছুঁইয়ে দেখল, শরীরের উত্তাপ অনেকটাই কমে এসেছে। তা দেখে মেয়েটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটাকে নিয়ে যে তার বড্ড চিন্তা। সে তো শুধু তার অনুজার অগ্রজাই নয়, ‘মা’-ও। শুধু জন্ম দিলেই যে মা হওয়া যায় না। বোনেরাও যে মা হতে পারে, তারই এক দৃষ্টান্ত নীলা।
ময়ূরী চোখ কচলে নিল। আবছা আবছা চোখে তাকিয়ে দিদির উদ্দেশ্যে বলল,
— ‘তুমি এত রাতে এখানে কী করছো? কাকি দেখলে...।’
তক্ষুণি ময়ূরীর অধরে তর্জনী ছুঁইয়ে তাকে চুপ করাল নীলা।
— ‘ওই মহিলার কথা বলবি না। উনার দেখা না-দেখায় আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তোর জন্য ভাত আনছি, খেয়ে ওষুধ খা। জ্বর কমেছে ঠিকই, কিন্তু একেবারে সেরে তো আর যায়নি?’
নীলা ভাত আনতে খাট থেকে উঠতেই ময়ূরী তার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিল। ভাঙা কণ্ঠে বলল,
— ‘আমার খিদে নেই। আমি খাবো না। তুমিও যে কিচ্ছুটি খাওনি, তা আমি জানি। তুমি গিয়ে আগে খেয়ে এসো।’
কিন্তু নীলা তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ভাত আনার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হলো।ময়ূরীর যে খিদে আছে কি নেই টা সে ভালো মতোই জানে।
নীলা যেতেই ময়ূরী শরীর থেকে কাঁথা নামিয়ে পায়ে রেখে, খাটের হেডবোর্ডে বালিশ রেখে হেলান দিয়ে বসল। কিছুক্ষণ একদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। হয়তো কিছু ভাবছে! আমরা অনেক সময়ই অর্থহীন ভাবনা ভাবি। যাতে করে লাভ বলতে শুধু সময় অতিবাহিত হয়।
সকাল থেকে পেটে দানাপানি পড়েনি। তার ওপর তুমুল জ্বর। শরীরের উত্তাপ অনেকখানি কমে গেছে। কিন্তু অন্তরের? বাঁকা হাসল ময়ূরী। যেতে থাক জীবন যেদিকে যায়। তার যাই হোক, তার দিদিটার যাতে একটা কুল হয়, সে চিন্তায় মগ্ন থাকে মেয়েটা সারাক্ষণ। অনেক তো তার হয়, কথা শোনে দিদি। খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে...
আনমনেই বলে উঠল ময়ূরী,
— ‘এই দিদিটা না থাকলে যে এই ময়ূরীর কী হতো?’
তার ভাবনার মাঝেই ঘরে ভাতের থালা নিয়ে প্রবেশ করল নীলা। এসে একটা মোড়া পেতে বসল, ময়ূরীর খাটের পাশে।
আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে একবার ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
মাখা শেষ হলে প্রথম লোকমাটা ময়ূরীর মুখের সামনে ধরে বলল,
— ‘হা কর।’
ময়ূরী আর বাধ সাধল না। খিদেতে যে পেটে ইঁদুরের রেস লেগে গেছে।
মুখভর্তি ভাত নিয়ে খেতে খেতে বলল,
— ‘আমি একা খাবো না। তুমিও খাও।’
— ‘এত রাতে আমি আর খাবো না। এত রাতে খাওয়া আর ঠিক হবে না। বদহজম হবে।’
— ‘তাহলে যেটা বেঠিক, সেটা আমায় দিয়ে করাচ্ছো কেনো? আমার বদহজম হবে না বুঝি? এই ভালোবাসো তুমি আমায়?’
বোনের বোকা বোকা কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল নীলা। বলল,
— ‘আমি দুপুরেও খেয়েছি। তুই সারাদিন কিছু খাসনি। খেয়ে ওষুধ খেতে হবে দেখেই নেহাত তোকে খাওয়াচ্ছি। নাহলে কি আমার ঠেকা রাত-বিরেতে খাওয়াবো?’
বলেই মুখ ভেংচি কাটল নীলা। ময়ূরীও হেসে দিল।
এই ধরণী, গগন-পবন, নিশাচর বিহঙ্গ—সাক্ষী রইল দুইবোনের অতীব মোহময় এই দৃশ্যটির।
---
ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে দুই-তিনবার ‘দাদা, দাদা’ শুনে বিরক্ত হয়ে শেষে হাতের সামনে থাকা ল্যাম্পপোস্টটা মাটিতে আছাড় দিল স্মরণ। মুহূর্তেই ল্যাম্পপোস্টটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। স্মরণের ঘরের দোরের সামনে থাকা মেয়েটি নিজের দুর্বল হাতে হুইলচেয়ারটি ঘুরিয়ে পেছনে চলে গেল।
প্রচণ্ড ক্রোধে স্মরণ মটমট করছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে শালিক থেমে রয়েছে। সামনে যে সিঁড়ি, হুইলচেয়ার দিয়ে তো আর নামতে পারবে না।
নিঃশব্দে কাঁদছে শালিক, যাতে কান্নার শব্দে পশুটা আবার না আসে। মুখটা বাঁকা হয়ে যাওয়ার দরুন বাম চোখের জল মুখে গড়িয়ে যাচ্ছে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে অশ্রুকণাগুলো লুকিয়ে ফেলল শালিক। হলো শুধু নাক টানার শব্দ।
এই শব্দটুকু কর্ণগোচর হতেই স্মরণ ঘর থেকে বেরিয়ে শালিকের গালে হাত চেপে ধরল। থেমে যাওয়া কান্নার স্রোত আবার শুরু হলো। হয়তো ছোটো বোনকে একটা বিশ্রী ভাষায় গালি দিতে যাচ্ছিল স্মরণ; তখনই সদর দরজা পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকল উজান। উপরের দিকে চোখ রাখতেই তাকে দেখল শালিক, স্মরণ—দুজনেই।
শালিকের গালে থাকা হাত সরিয়ে নিল স্মরণ। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল, উজান উপরে আসার আগেই।ভাগ্যিস আজ সদর দরজা খোলা ছিল!
উজান উপরে এসে আগে নিজের প্রতিবন্ধী বোনটাকে বক্ষস্থলে জড়িয়ে ধরল। কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে শালিক নিজের ভাইয়ের পিঠ জড়িয়ে ধরল। শালিকের কপালে উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল উজান।
তারপর হুইলচেয়ারটা নিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেল শালিককে।
ভাইয়ের সান্নিধ্য পেয়ে আবারও ফুঁপিয়ে উঠল শালিক।
উজান আদুরে হাতে শালিকের গালে স্পর্শ করল। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— ‘ওই জানোয়ারটা তোর সাথে এমন আচরণ করেছে কেনো?’
ভাইয়ের আদরে আরেকটু আহ্লাদী হয়ে উঠল শালিক। ক্রন্দনরত বাঁকা মুখ দিয়ে বলল,
— ‘মা বাড়িতে নেই, জুঁইদের বাড়ি গেছে। কারণ ওর ঠাম্মি মারা গেছে। আমায় ঘুম আসছিল না। তুমিও ছিলে না; তাই স্মরণ দাদাকে বলেছিলাম একটু ছাদে নিয়ে যেতে।
বলে থামলো।একবারে বেশি কথা বলতে পারে না।কিছুক্ষণ চুপ থেকে শালুক ফের বলা শুরু করলো,
-'প্রথমে শোনেনি বলে কয়েকবার দাদা বলে ডাক দেওয়ায় সে নিজের ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে ফেলেছে। আমি বাইরে চলে আসি...।’
কথার দ্বিতীয়াংশ।
তার কথা শুনে উজান বলল,
— ‘বুঝেছি।’
বলে নিজেই শালিককে নিয়ে ছাদে গেল উজান।
শালিক ছাদের ফুলগাছগুলোর সামনে গিয়ে সেগুলো হাতড়ে হাতড়ে দেখছে। ফুলগুলো অল্প ফুটেছে। নিশীথ কাটলে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে এই পুষ্পরাজী!
উজান প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে আনমনে আকাশপানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে, যেন এর চেয়ে বড়ো কাজ আর এখন নেই। হঠাৎ শালিকের ডাকে ধ্যানচ্যুত হলো উজান। শালিক বলল,
— ‘তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে দাদা? বাড়িতে আসোনি কেনো? এত রাত হলো কেনো?’
একসঙ্গে বোনের এতগুলো প্রশ্ন শুনে হাসল উজান। কী উত্তর দেবে?
শালিকের দিকে এক পলক তাকাল। শালিক হয়তো বুঝল, এই প্রশ্নের উত্তর এই মানবের কাছে পাবে না। তাই আর কথা বাড়াল না।
উজান ছাদের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক ময়ূরীদের বাড়ির মুখোমুখি। দেখল, প্রেয়সীর ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে। গম্ভীর মুখে হাসি আরেকটু প্রশস্ত হলো।
বিড়বিড় করে বলে উঠল,
— ‘আমার মনটা বুঝলে না কেনো, হৃদয়হরণী? কবে তোমার গোবরভরা মাথাটা নিজের বক্ষে নিয়ে এই দহন, এই জ্বালা নিবারণ করব, ময়ূরীনি?’
কেউ কি শুনল প্রেমিকের কথাগুলো?
আকাশে কোনো বিহঙ্গ নেই। কিছু বৃক্ষে শুধু নিশাচর ভবঘুরে বিহঙ্গ। তারা হয়তো শুনল। আকাশ-বাতাসের তো কান নেই, তারা হয়তো সাক্ষী রইল এক প্রেমিক পুরুষের প্রেমিকার উদ্দেশ্যে বলা দুটো প্রেমের বাক্যের।
চলবে...