#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-০৩
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
অরুনার পছন্দের সাবজেক্ট ছিলো ফিজিক্স। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে উঠার পর সেটা পরিবর্তন হয়ে হলো রসায়ন। এতোরকম যৌগ, এদের এতোরকম বিক্রিয়া আর কার্যকারিতা পড়তে পড়তে অরুনা ঝুঁকে গেল রসায়নের প্রতি।
পড়াশোনার প্রতি ঝোঁকটা কেমন করে অরুনার ভেতর ভর করেছে সে জানে না। সীমান্ত ভাই জীবনেও কোনোদিন বই খাতা খুলে বসেনি তার সামনে। কোনো রকমে টেনে টুনে পাশ করে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। তার বোন হয়ে অরুনা কেন এতো অনুরাগী হলো বই খাতার প্রতি, অরুনা সত্যিই বোঝে না।
তবে অরুনা জানে,তার জীবনের গতিপথ একটু অমসৃণ, খানাখন্দে ভরপুর। এক যুগ আগে বাবা মায়ের হাত ছেড়ে দিয়ে অন্য এক জায়গায় সংসার পাতালো। এরপর তাদের দু'জন কে নিয়ে মা পড়লো অকুল পাথারে। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করলেন নাসির নামের এক ভদ্রলোক। যিনি দুঃসম্পর্কে অরুনার মামা। তিনিই এই দুর্দিনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,তার পিতার মৃত্যুর পর তার আম্মা খুব একা হয়ে পড়েছেন। এরমধ্যে খালাতো বোনের মেয়ে আজমেরির বিবাহ বিচ্ছেদের কথা শুনে ভদ্রমহিলা আরো ভেঙে পড়লেন। চাইছিলেন, যেকোনো উপায়ে আজমেরির পাশে থাকতে।
নাসির সাহেব তাই অনুরোধ করলেন, তিনি যেন তার দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতেই এসে উঠেন।
অরুনা তার জীবদ্দশায় এতো বিনয়ী স্বভাবের লোক আর দ্বিতীয়টি দেখেনি। এই বাড়িতে তার পরিচয় সামান্য আশ্রিতা হিসেবেই আটকে ছিলো। অথচ এতো গুলো বছরে অরুনার কখনো অপমানিত কিংবা অসহায় অনুভব হয়নি।
তবে হ্যাঁ, কুণ্ঠাবোধ হতো মাঝে মাঝেই। এরা ভাই বোনরা মিলে গল্প করতো, আড্ডা দিতো। অরুনা চট করে গিয়ে মিশতে পারতো না তাদের সাথে। একটা অর্ধভেদ্য দেয়াল কাজ করতো মাঝখানে। অরুনা নিজের অবস্থান জানতো। নিজের সীমারেখাও বুঝতো।
কিন্তু সীমারেখা ভেঙে একটা অন্যায় অবশ্য করেছিল মনের অজান্তেই। কৈশোরের প্রথম ধাপে এই বাড়ির এক ছেলেকে খুব মনে ধরেছিল তার। ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে এসে সে যখন হাসিমুখে জানতে চাইতো,"অরু! তুই খেয়েছিস দুপুরে?"
তখনই অরুনার মনে হতো, তার ভেতরে আপনাআপনি একটা কিছু হয়ে গেছে। ঐ ছেলেটা এতো যত্নশীল ছিলো তার প্রতি! যদিও এক পর্যায়ে গিয়ে অরুনা বুঝেছিল, যত্নের মানে ঠিক ভালোবাসা ছিলো না। অসহায়, অবলা হিসেবে সে অরুনাকে মায়া করতো,করুণা দেখাতো। এর মানে এই না যে সে অরুকে ভালোবাসে। এমন ছাপোষা মেয়েদের মানুষ দয়াই করে কেবল, প্রান উজাড় করে ভালোবাসে না কখনো।
অরুনা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। আজমেরি সকাল থেকে ঘরে নেই। রাশেদার ইচ্ছে হয়েছে তিনি একটু ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটবেন কিছুক্ষণ। আজমেরি তার হাত ধরে ধরে তাকে হাঁটাচ্ছে। রাশেদার তাকে খুব পছন্দ। মেয়েটা একেবারে মাটির মতো। যেমন করে রাখে, অমন করেই পড়ে থাকে।
রাশেদা আজ তার হাত ধরে হেঁটে হেঁটে বাগানে এসে বসলেন। বাগানের প্রাচীর ঘেঁষে একটু পেছনের দিকে তার ইচ্ছে অনুযায়ী নাসির অনেক গুলো সুপারি আর নারিকেলের গাছ লাগিয়েছে। আর সামনের জায়গায় ছোট ছোট ফুলের চারা।
রাশেদা বললেন,"তোমার পোলার কি অবস্থা আজমেরি? কাম ধান্দা কিছু করে নি?"
আজমেরি হতাশ মুখে বললেন,"না খালাম্মা। কিসুই করে না। সারাদিন পাড়া বেড়ায়, ক্রিকেট খেলে, আর নতুন কিসু বন্ধু হইসে। ওদের নিয়া রাত কইরা হুন্ডা দিয়া ঘুরে।"
রাশেদা মাথা নাড়লেন।
"খুব বাজে স্বভাব। আমি নিশ্চিত আমার ছোটো পোলাডা হেরে নষ্ট করসে। এরে নিয়া যে কি বিপদে আছি আমি। এত্তো বড় হইসে। তাও নাকি বিয়া করবে না। দিন রাত খালি এলাকার রাস্তায় টো টো করে। এক ডজন চ্যালা বানাইসে। এরাও সারাদিন ওস্তাদের শাগরেদ হইয়া পেছন পেছন ঘুরে।"
হতাশায় রাশেদার কপাল কুঁচকে আসে। নিশ্চিন্তে তিন ছেলেকে বড় করার পর এই এক বান্দাকে পালতে গিয়ে রাশেদার সব জীবনীশক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। যদিও তার তেমন কষ্ট করতে হয়নি। বাড়ির লোকজনই আদরে যত্নে রেখেছে ইয়াজিদকে। কিন্তু রাশেদার খুব চিন্তা হয় তাকে নিয়ে, বুক দুরু দুরু করে।
মাঝবয়সে গিয়ে আল্লাহ তাকে এই ছেলে দিয়েছেন। সিরাজ সাহেব যতোদিন বেঁচে ছিলেন, নিজের ভাগের সবটা আদর ঢেলে তাকে বড় করেছেন। রাশেদার খুব আদরের এই ছেলে। কিন্তু ছেলে আদর বোঝে না।
কথা শোনে না, মায়ের কাছে এসে একটু বসে না, চুলে হাত ছোঁয়ালে ছ্যাৎ করে লাফিয়ে উঠে, কপালে একটু চুমু খেলেই বিরক্ত হয়ে বলে,আম্মা সারাক্ষণ এমন করো কেন? ভাল্লাগে না ধুর!
এই ছেলে হচ্ছে সীমান্তকে উচ্ছনে নেওয়ার কান্ডারি। সীমান্তের কি দোষ? বাড়িতে আসার পর থেকে দেখছে, একজন বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরছে, পাড়া বেড়াচ্ছে, পড়াশোনার ধাঁরে কাছেও যাচ্ছে না, অথচ কেউ তাকে কিছু বলছেও না। এসব দেখে কয়জন আর ভালো থাকে?
রাশেদা বললেন,"কোনোদিন যদি শুনো, আমি মইরা গেসি, তাইলে চোখ বন্ধ কইরা বুইঝা নিবা, এর পিছনে আমার ছোটো পোলার হাত আছে। ও আমার কলিজাটা প্রতিদিন একটু একটু কইরা চিবাইয়া খায়। "
_____
নিবেদিতা আজ অনেকদিন পর বাগানে এসেছে। নিকিতার শরীর একটু ভালো এখন। দুপুরে যখন নিকিতার হাসির শব্দ শুনলো, তখন তার মনের বিষাদ ভাব কেটে গেল।
তারপর অরুনার হাত ধরে সে বাগান পর্যন্ত নেমে এলো।
বাগান তখন ফাঁকা। বিকেল হয়েছে মাত্র। বাতাসে একটা উষ্ণ ভাব। চারপাশ দুপুরের অলসতায় নিশ্চুপ হয়ে আছে। শুধু বাড়ির সীমানা পেরিয়ে সামনে যেই শিমুল গাছটা দাঁড়ানো,তার ডালে বসে দুইটা শালিক কিচ কিচ করে ডাকছিলো।
অরুনা বলল,"সামনে চেয়ার আছে। বসবে তুমি?"
"না, বসবো না। একটু হাঁটতে ইচ্ছে করছে।"
বাড়ির টুকটাক দেখাশোনার কাজে যেই ভদ্রলোককে রাখা হয়েছে, তার নাম জহির। জহির মাঝবয়সী। বউ বাচ্চা নিয়ে একটু দূরে একটা ছাপড়া ঘরে থাকে। বিকেলের দিকে নিড়ানি হাতে বাগানে এসে গাছের গোড়া পরিষ্কার করে। কাঁচি দিয়ে ডালপালা ছেঁটে দেয়।
আজও জহির সময় মতো বাগানে এলো। তার আওয়াজ শুনে নিবেদিতা গলা তুলে ডাকলো,"জহির চাচা, আপনি এসেছেন?"
জহির ঘাড় বাঁকিয়ে তার দিকে তাকালো। লাল সাদা চ্যাকের গামছা টা গলায় ঝুলিয়ে বলল,"জে আম্মাজান। আপনার কিছু লাগবো?"
নিবেদিতা একগাল হেসে বলল,"চাচা, আমার হাতে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে দিবেন? আমি ঘ্রাণ শুকে শুকে বলবো, কোনোটা কোন ফুল।"
"আইচ্ছা, আসেন আপনি।"
নিবেদিতা ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে গেল। জহির গামছার এক মাথা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে কাজে লেগে পড়লো। মাঝে আবার দুই একটা ফুল ছিঁড়ে দিলো নিবেদিতাকে।
ঠিক এমন সময় বাড়ির লোহার গেইট দিয়ে আয়তি ভেতরে ঢুকলো। এমনিতেই কটকটে রোদ, সাথে ভ্যাপসা গরম, তার উপর পুরো রাস্তার লম্বা ট্র্যাফিক। এতো কিছু পেরিয়ে যেই না গেইটের ভেতরে পা রাখলো, অমনি মেজাজ টা চটে গেল।
নিবেদিতার পরণে একটা ফ্রক। হাঁটু ছাড়িয়ে অনেক খানি নেমে এসেছে। নিচ দিয়ে দু'টো উন্মুক্ত পা দেখা যায়। পায়ের গোড়ালিতে এক ধরণের লাল আভা। তুলতুলে নগ্ন পায়ে সে দাঁড়িয়ে আছে বাগানের সবুজ ঘাসের উপর। তাকে নানারকম ফুল ছিঁড়ে দিচ্ছে জহির।
দৃশ্যটা এক ঝলকেই আয়তির রক্ত ছলকে দিলো। কটমটে চোখে সেদিকে একনজর তাকিয়ে বাজখাঁই কণ্ঠটা চেঁচিয়ে উঠল,"নিবেদিতা! তোমার এখানে কি?"
ধড়ফড় করে উঠে হাতের ফুলগুলো ফেলে দিলো নিবেদিতা। ভয়ে, আতংকে তার চোখ মুখ নীল হতে লাগলো। ফুপি এসেছে বাড়িতে। এই সময় তার মেজাজ থাকে তুঙ্গে। তার উপর আজকের আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে মেজাজের অবস্থা বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ। তার কণ্ঠ কানে গেলেই নিবেদিতার গলা শুকিয়ে যায়।
আয়তি বড় বড় পায়ে সামনে এগোলো। রোদের তাপ মাথায় নিয়েই অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,"এদিকে কি নিবেদিতা? একা একা বাগানে কি?"
নিবেদিতা শুকনো ঢোক গিললো। মিনমিনে গলায় আস্তে করে বলল,"একা না তো। অরুনা ফুফুও তো আছে।"
"অরুনা থাকলে কি হবে? অরুনা কি কোনো পালোয়ান?"
আয়তি খপ করে নিবেদিতার হাতের কবজি চেপে ধরলো। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে বাড়ির পথ ধরলো।
নিবেদিতা চোখ মুখ খিঁচে দিশাহীন হয়ে একের পর এক পদক্ষেপ ফেলে গেল। এতো দ্রুত চলতে গিয়ে তার পায়ের পাতায় ডাল পাতা এসে চুবছিলো।
নিবেদিতা উহহহ্ করে উঠে বলল,"ফুপি! পায়ে লাগছে তো।"
"লাগুক। ন্যাংটা পায়ে নামতে বলেছিল কে?"
নিবেদিতা দমে গেল। দিদুন বলে ফুপির রাগ নাকি নাকের ডগায় এসে থেমে থাকে। একটু উনিশ বিশ হলেই ফেটে পড়ে। আজও সে রেগে আছে। কিন্তু কারণটা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।
নিবেদিতার হাতটা ঐভাবে ধরেই আয়তি লিভিং রুমে গেল। গিয়ে ধপ করে একটা সোফায় বসে নিবেদিতাকে তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো।
"নিবি!"
ভীষণ কঠিন কণ্ঠস্বর। নিবেদিতা আলতো স্বরে বলল,"জি।"
"ঐ জহিরের সাথে তোর এতো কিসের ভাব?"
নিবেদিতা আঁতকে উঠলো।
"ভাব মানে?"
"ভাব মানে বুঝিস না? ঐ জহির তোকে ফুল কেন দিলো?"
"আমি চেয়েছিলাম তাই।"
"তুই কেন জহিরের কাছে ফুল চাইবি? জহির তোর কি লাগে?"
আয়তির কণ্ঠ আরো বেশি রুক্ষ শোনালো। নিবেদিতা নিস্তেজ গলায় বলল,"জহির চাচা আমাকে বাবুদের মতো আদর করে ফুপি।"
আয়তি নাক সিটকালো প্রচণ্ডভাবে। বড়সড় কোনো কৌতুক শোনার পরে ঠোঁট দু'টো যেমন বিদ্রুপ করে হাসে, ঠিক অমন করেই হাসলো কিছুক্ষণ। তারপর নিবেদিতার হাত দু'টো কাছে টেনে হেয়ালি করে বলল,"ওহহহ তাই নাকি? বাবুদের মতো আদর করে নাকি তোমাকে? আদর করতে করতে যখন ফ্রকের নিচ দিয়ে হাত ঢোকাবে, তখন টের পাবে আদর কাকে বলে।"
লজ্জায় নিবেদিতার দুই কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। এক ঝটকায় আয়তির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে প্রতিবাদ করে বলল,"না, মিথ্যা কথা। জহির চাচা এমন না।"
"এমনই। পৃথিবীর সব পুরুষ এমন। আমি এদের বিশ্বাস করি না। হয় এদের চরিত্র খারাপ হয়, নয়তো স্বভাব খারাপ হয়। খবরদার! আর যেন তোমাকে জহিরের সাথে না দেখি।"
আয়তি থামলো। কয়েক সেকেন্ড জিরিয়ে আবার গুমোট স্বরে বলল,"অনেক সাহস হয়েছে তোমার তাই না? একা একা নিচে নামো, বাগানে যাও। পাখা গজিয়েছে খুব তাই না? পাখা সব ভেঙে রেখে দিবো।"
নিবেদিতা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নামিয়ে তার কথা শুনলো। ফুপির আরেকটা স্বভাব আছে। পুরুষ মানুষকে কারণে অকারণে তুলোধুনো করার স্বভাব।
আয়তি ফুঁসে ফুঁসে বলল,"যদি পারতাম, তাহলে আমার বাবা চাচা বাদে পৃথিবীর সব পুরুষকে গুলি মেরে মাথার খুলি উড়িয়ে দিতাম।"
নিবেদিতা মাথা তুলে বলল,"সত্যি? আহিল চাচ্চুরও খুলি উড়াতে?"
"সবার আগে ওর টাই উড়াতাম।"
আয়তি হঠাৎ থামলো। একটা কিছু ভেবে সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল,"না। সবার আগে মারতাম ঐ বদমাশ সীমান্তকে। ও বেঁচে থেকে পৃথিবীর অক্সিজেন নষ্ট করছে। হি ইজ সাচ অ্যান ইডিয়ট!"
______
আই ওয়াজ আ চিল্ড্রেন ফ্রম আ প্রিভিলেজড ফ্যামিলি। আমার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। একেকটা কেস হ্যান্ডেল করার পর যেই পরিমান টাকা তার একাউন্টে ঢুকতো, সেটা দিয়ে ঢাকা শহরের অনেক পরিবারের ছয় মাসের খরচ উঠে যেত। আমার বাবা কোটিপতি হলেও সৎ ছিলেন না। ছিলেন না বলতে একদমই ছিলেন না। তিনি বেশিরভাগ সময় রাজনীতিবিদদের মামলা মোকদ্দমা সামলাতেন। এবং এমন করেই তিনি দিনে দিনে টাকার পাহাড় গড়ে তুললেন।
আমার আম্মির গল্প একটু আলাদা। তিনি আমার বাবার চেয়েও একধাপ এগিয়ে ছিলেন। তার ইচ্ছে ছিলো মডেল হওয়ার। অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে দু'চোখ বিভোর ছিলো তার। কিন্তু এর মধ্যেই নানাভাই ধরে বেঁধে বাবার সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমার আম্মি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সারির সুন্দরীদের একজন। সেই সৌন্দর্যের কয়েক ছটাক উত্তরাধিকার সূত্রে আমিও পেলাম। কিন্তু আমার ধারণা, আমার মা সৌন্দর্যের সব সংজ্ঞা ছাপিয়ে গিয়েছিলেন নিজের বেলায়।
বিয়ে হওয়ার পরেও আম্মির অভিনেত্রী হওয়ার বাসনা গেল না। আমার জন্মের পর তার শরীরের ফিটনেস চলে গেল। তিনি আবার উঠে পড়ে ডায়েট শুরু করলেন। অভিনেত্রী তাকে হতেই হবে। শোবিজ অঙ্গনে তাকে পা রাখতেই হবে।
অন্যদিকে বাবা ব্যস্ত উকালতি নিয়ে। লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছেন, আবার খরচাও করছেন জলের মতো। ধানমন্ডিতে যেই বাসায় আমরা থাকতাম, ঐ বাসার দিকে একনজর তাকালে আপনারা স্তব্ধ হয়ে যেতেন। এত্তো আধুনিক আর চাকচিক্যময় একটা দালান!
কিন্তু এতো চাকচিক্য আর আরাম আয়েশের আড়ালে আমার জীবনটা ছিলো একেবারে ছন্নছাড়া আর অবহেলায় মুড়ানো। আমার বাবা যদিও বা সামান্য খোঁজ খবর রাখতো আমার। কিন্তু আমার মা ছিলো আমার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। তার অভিনেত্রী হওয়া চাই। আমার মনে পড়ে না আমার মা কবে আমাকে কোলে নিয়ে একটু হেঁটেছিল, একটু আদর দিয়েছিল।
বাবা আর আম্মির দাম্পত্যের সমীকরণ অত্যন্ত খাপছাড়া,আর বিচ্ছিন্ন। এমনও দিন যেতো যে ছয় মাসেও এদের দু'জনের সামনাসামনি দেখা হতো না। বাবা থাকতেন রাজনীতিবিদ দের আড্ডায়, তাদের মিটিংয়ে। আর আম্মি থাকতেন নামকরা কোনো প্রযোজকের বাড়িতে,তার রাত্রী কালীন মনোরঞ্জনের বস্তু হয়ে।
দীর্ঘদিন এমন আলাদা থাকতে থাকতে ওদের ভেতরকার ভালোলাগা-ভালোবাসা সবই ফুরিয়ে এলো। একসময় সেপারেশন, আর তারপরে ডিভোর্স। আম্মিই ডিভোর্সের জন্য বেশি অস্থির হয়ে ছিলেন। শহরের বিখ্যাত প্রযোজকের সাথে তার মাখো মাখো সম্পর্ক। তার প্রাইভেট অ্যাপার্টমেন্টে আম্মির রোজকার যাতায়াত। তার আর নায়িকা হওয়া ঠেকায় কে?
বাবাও অবশ্য জানতে পেরে বিনা বাক্যে ডিভোর্স দিয়ে দিলেন। বাবা ওসব ঝামেলার মানুষ না। টাকা আছে তো বাবার সব আছে। বউ টউ কোনো ব্যাপার না।
ডিভোর্সের পর আমি কিন্তু বাবার কাছেই থেকে গেলাম। বাবা জলের মতো অর্থ ব্যয় করেছে আমার পেছনে। প্রত্যেক মাসে খুব দামি কোনো উপহার দিয়ে আমাকে চমকে দেওয়ার পর বাবা হেসে হেসে বলতো,"এ্যাই মিতা! কেমন দিলাম বল তো? চমকে দিলাম না একেবারে? খুশি হয়েছিস?"
আমি হাসতাম। খুশি আসলে আমি হতাম না। আমি খুশি হতাম যদি বাবা তার রাতের মিটিং বাতিল করে আমার সাথে বসে একবেলা খাবার খেত, যদি বাবা একদিন সময় করে আমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হতো। কিন্তু আমার জীবনে এমন কিছুই হলো না। বাবাকে আমি দুই মাসেও একবার কাছে পেতাম না। নিজের পিতা মাতার এমন বিশ্রী দাম্পত্য আমাকে লাইফটাইম ট্রমা দিয়ে গেলো, যার দরুণ বিবাহ শব্দে আমার ফোবিয়া কাজ করা শুরু করলো। আমি....আমি প্রচণ্ড ভয় পাই বিয়েকে। আই চ্যারিশ আ ফ্যামিলি ম্যান। একটা ভদ্রগোছের লোক। যার সাথে আমার একটা ঘর হবে। যে তার সন্তানদের ভালোবাসবে, দাম্পত্যের মূল্য বুঝবে। আদৌ কি এমন ছেলে এক্সিস্ট করে পৃথিবীতে?
ডাক্তার পারমিতা ইবনাতের ডায়েরির প্রথম পাতা গুলো অনেকটা এমনই ছিলো। ব্যক্তিজীবনে প্রচণ্ড হাসিখুশি পারমিতা তার জীবনের নানান মোড়, নানান গল্প সুন্দর করে লিখে রাখতো তার ডায়েরির পাতায়। এই যেমন আজ সে লিখলো তার প্রথম পেশেন্ট নিকিতাকে নিয়ে। লিখেছে, নিকিতার চোখ তার ভালো লেগেছে। নিকিতার গুলু মুলু পা দু'টো দেখে মনে লোভ ধরে গেছে। একটা বাচ্চার লোভ। এই একটা লাইন লিখতে গিয়ে সদা উচ্ছল পারমিতা কেঁদে কেঁদে গাল ভাসিয়ে ফেললো। পারমিতার দুঃখগুলো তার ডায়েরির পাতা বাদে আর কেউ জানতো না।
আমাদের গল্পে পেডিয়াট্রিশিয়ান পারমিতা ইবনাতের এই ডায়েরিটাও অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সৃজনশীলে উদ্দীপকের ভূমিকা যেমন অপরিসীম থাকে, আমাদের গল্পে পারমিতার এই ডায়েরির ভূমিকাও তেমনি অপরিসীম।
____
ইরোজ খাটে বসে খেলনা দিয়ে খেলছিল। তার সামনে নিকিতা বসে আঙুল খাচ্ছে। নিকিতার পরণে একটা পাওডার ব্লু ফ্রক। নিকিতা এখন মোটামুটি অনেক কথাই বলতে পারে। তবে উচ্চারণে ভয়াবহ সমস্যা।
মেহরোজ খাটে বসে হাতে পায়ে লোশন মাখছিলো। ইরোজ এখনো ঘুমায়নি। তাকে ঘুম পাড়িয়ে নিকিতাকে ঘুম পাড়াতে হবে। ইশান বাড়ি এলে তার কাজ একটু কমে যেত।
ইশান প্রায় সাথে সাথেই ঘরে ঢুকলো। হাতের অফিস ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে ধপ করে ডিভানে গিয়ে শুয়ে পড়লো, একে একে খুলে ফেললো ফর্মাল শার্টের সব ক'টা বোতাম।
মেহরোজ পেছনে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,"যাক, তুমি এলে। এদের দু'জনের একজনও ঘুমায়নি। দেখো তো ঘুম পারাতে পারো কিনা। আমার শরীর আর দেয় না।"
ইশান হালকা করে মাথা তুলে বলল,"মা কে বলতে। মা নেই বাড়িতে?"
"আছে। কিন্তু মার মাথা ব্যথা।"
ইশান ছোট করে বলল,"ওহহহ।"
প্রায় দশ মিনিট জিরিয়ে নিয়ে সে ডিভান থেকে উঠলো। নিকিতা একটা খেলনা দিয়ে খেলছিলো। ইশান সামনে যেতেই কপাল তুলে পিটপিট করে তাকালো তার দিকে।"
"ওরে আমার রসগোল্লা রে!"
এক ছোঁ মেরে নিকিতাকে কোলে তুলে ইশান ওর দুই গালে ঠেসে ঠেসে চুমু খেল। নিকিতা ওর গালে হাত রেখে আধো স্বরে বলল,"চামচুউউউ।"
"চামচু না। চাচ্চু। আয়, চাচ্চুর বুকে আয়।"
ইশান লম্বা হয়ে খাটে শুয়ে পড়লো। নিকিতাকে বসালো ওর কোলের উপর। তারপর ছোট্ট মাথাটা ধরে রাখলো বুকের সাথে।
"কেমন লাগে মা?"
"ভালুউউ।"
"তুমি খেয়েছো রাতে?"
"হু।"
"আআ! তুমি তো তাহলে গুড গার্ল। না না, গুড প্রিন্সেস।"
ঠিক এমন সময় নিনীত ঘরে এলো। সে নিজের ঘর থেকে তেমন একটা বের হয় না সচরাচর। তাকে দেখেই মেহরোজের চোয়াল ঝুলে গেল। মাথা ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে বলতো,"নিনীত ভাই! আপনি?"
সাথে সাথে তার চোখ ঘুরে গেল নিকিতার দিকে। আবার না জানি বাচ্চাকে ধরে বকুনি দেয়।
নিনীত সামনে তাকালো। সবার প্রথমেই ইশানকে দেখলো। তার বুকে ফ্রক পরা একটা মেয়ে মাথা রেখে শুয়ে আছে। একেবারে মিশে আছে বুকের সাথে। এই মেয়েটার পরিচয় নিনীত জানে।
ইশান মাথা তুলে বলল,"বড় ভাইয়া! কিছু লাগবে?"
নিনীত মাথা নাড়লো। ভারি গলায় বলল,"তোর কাছে ট্রিমার আছে? আমার ট্রিমার টা পাচ্ছি না খুঁজে।"
মেহরোজ গিয়ে ট্রিমার এনে দিলো। সেটা হাতে পেতেই নিনীত উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
ততক্ষণে নিকিতা তার অস্তিত্ব টের পেয়ে গেছে। এই ভারিক্কি কণ্ঠটা নিকিতার এতো প্রিয়! সে ঘাড় বাঁকিয়ে দীর্ঘদেহী অবয়ব টা দেখেই চিৎকার করে ডাকলো,"পাপাই! পাপাই।"
ইশান শক্ত করে ওর শরীরটা বুকের সাথে চেপে ধরলো। মেহরোজ ভীত চোখে তাকালো সামনে।
ঘর থেকে প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিল নিনীত। ঐ কণ্ঠটা তাকে থামিয়ে দিলো। তুলতুলে একটা কণ্ঠ একাধারে ডাকছে তাকে,"পাপাই! পাপাহ! কুলে..... পাপাই,পাপ পা পাপাই!"
নিনীতের দুই পা বরফের মতো জমে স্থির হয়ে গেল।
একটা শুকনো ঢোক গিললো নিনীত। পেছন থেকে ঐ কণ্ঠটা বেজেই যাচ্ছে। তার হাত পা অল্প করে কাঁপছে। কপালের দুই পাশে দ্বপ দ্বপ অনুভূতি হচ্ছে। নিনীত দাঁতের পাটি খিঁচে শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। নিকিতা ইশানের কোল থেকে লাফিয়ে পড়ে ছুটতে চাইছিলো দরজার দিকে। ও ওখানে যাবে। এই লোকটার কোলে চড়বে সে।
"পাপাই!"
মাথার পেছনের দিকে অসম্ভব যন্ত্রনা হতে শুরু করলো নিনীতের। গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে নিজের কান দু'টো চেপে সে কেবল বলল,"চুপপপ।"
এরপর আর শব্দ নেই। মেহরোজ দেখলো, নিনীতের সুঠাম দেহ টলটলিয়ে হেলে যাচ্ছে মেঝের দিকে। ওর শরীরে আর কোনো প্রতিরোধ নেই। ইশান এক লাফে উঠে ফাঁকা স্বরে ডাকলো,"মা মা! বাবা....ভাইয়া!"
চলবে-
[ বিশ্বাস করবেন নাকি জানি না, আমি ডাক্তারের চেম্বারে বসে পর্ব আপলোড দিচ্ছি। আমার সিরিয়াল বাইশ।এখন চলছে বিশ। আপনাদের কেমন লাগছে জানি না, তবে আমি খুব আনন্দ পাচ্ছি এদের লিখে। রিচেক নেই। ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় আসি। এরপর রিচেক দিবো ইনশাআল্লাহ।]