ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

পর্ব 33

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

৩৩.

চাঁদনী দাঁড়িয়ে ছিল দরজা ঘেঁষে। সোহাইল ঘরে ফরেই পরনের শার্টটা খুলে ফেলল একটানে। তারপর অলস হাত দু'টো দুপাশে ছড়িয়ে আরামে শুয়ে পড়ল খাটের উপর। চোখ বুজল ক্লান্তিতে।

চাঁদনী এগিয়ে আসে পানির গ্লাস হাতে। ওর পায়ের শব্দ পেয়েই সোহাইল একবার চোখ খুলে। তাকিয়ে দেখে, ছিপছিপে শরীরের মেয়েটার দূরত্ব তার থেকে মাত্র কয়েক হাতের। মুখের মধ্যে আগের মতো কমনীয়তা নেই। গাল ভেঙেছে, চোখের নিচে কালির দাগ বসেছে। বিতৃষ্ণায় চোখ সরিয়ে নিল সোহাইল। এই মুখ, এই শরীর আর টানে না তাকে। সাথে খাটের উপরে হাত পা নাড়তে থাকা ঐ ছোট্ট শরীরটাও মুগ্ধ করে না তাকে। চাঁদনী, চাঁদনীর মেয়ে, এই সংসার- সবকিছু অসহ্য লাগে আজকাল।

চাঁদনী বলল,"আপনি কোথায় ছিলেন?"

সোহাইল চোখ তুলল। শীতল কণ্ঠে বলল,"তার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দিব?"

"কৈফিয়ত চাইনি। জবাব চেয়েছি।"

"কাজ ছিল আমার।"

"সিদরার ডায়াপার শেষ। আগামীকাল কিনে দিবেন মনে করে।"

"ডায়াপারের কি দরকার? সারাদিন তো ঘরেই থাকে।"

চাঁদনী ধীর কণ্ঠে বলল,"আমি সকাল থেকে রান্নাঘরে কাজ করি। ওর দেখাশোনা করতে পারি না। ডায়াপার পরালে নিশ্চিন্ত থাকি। নয়ত প্রসাব করেই ভেজা কাঁথায় শুয়ে চেঁচামেচি করে, ঠান্ডা লেগে যায়।"

"তোমার ভাইজানরে বলো ডায়াপার দিতে। আমি পারব না তোমার মেয়ের জন্য ডায়াপার কিনতে। কাজ আছে আমার।"

"এইটুকুর জন্যও ভাইজানের কাছে যাব? এতো ছোটলোক ঘরে বিয়ে হয়েছে আমার যে ওরা আমার সন্তানকে একটা ডায়াপারও কিনে দিতে পারবে না?"

চাঁদনীর গলা স্পষ্ট। কোনো ভয় নেই, জড়তা নেই। সোহাইল চমকে গেল। সিদরা হওয়ার আগ পর্যন্ত ওর মুখ থেকে এমন প্রতিবাদী শব্দ সে আগে শোনেনি। সে চমকে উঠে মাথা তুলে বলল,"তোমার মাথা ঠিক আছে? আমাকে এসব বলছ?"

"হ্যাঁ, ঠিক আছে। আপনি আপনার মেয়েকে কতো অবজ্ঞা করছেন আপনি দেখেছেন? ও আপনার সন্তান। ওর হক কেন নষ্ট করছেন? এটা অন্যায়।"

সোহাইলের দুই চোখ জ্বলছিল। চট করে উঠে দাঁড়িয়ে সে ছুটে গেল চাঁদনীর কাছে। ওর চোয়াল ভর্তি রাগ। ছুটে এসেই এক থাবায় চুলের মুঠি চেপে ধরল তার। চাঁদনী গোঙাল না, ব্যথায় টু শব্দও করল না। ওর চোখে কোনো অনুভূতি নেই। পাথুরে দৃষ্টিতে সোহাইলের দিকে তাকিয়ে হাসল একচোট। ধীর গলায় বলল,"চুলের মুঠি ধরলেই সত্য মিথ্যা হবে না। আপনি আমার মেয়ের হক নষ্ট করেছেন। আমার সাথে যা অন্যায় করেছেন, আমি তা মনে রাখিনি। কিন্তু সিদরা? ওর সাথে অন্যায় করবেন না। ওর হক নষ্ট করলে আমি সেটা সহ্য করব না। কোনোদিন করব না।"

_____

আয়তি বুকশেলফের সামনে দাঁড়িয়ে একটা উপন্যাসের বই খুঁজে বের করল। ঠিক তখনই কেউ দরজায় এসে দাঁড়াল। আয়তি ঘাড় ঘোরাতেই দেখল সীমান্ত।

সীমান্ত দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে। মুখে টানা হাসি। তার কোলে ইমতিহা। ছোট ছোট দুই হাতে খুব শক্ত করে সে খাঁমচে ধরে আছে তার শার্ট। ইমতিহার দুই চোখ ভর্তি সংশয়। ভ্রু জোড়াও বাঁকিয়ে রেখেছে দুশ্চিন্তায়। এই ভদ্রলোকের উপর ভরসা করতে পারছে না কিছুতেই। এমন অদ্ভুত ভাবে ধরেছে তাকে, তার মনে হচ্ছে সে পড়ে যাবে এখনই।

সীমান্ত বলল,"ট্যান ট্যানা। দেখো আমার কোলে কে?"

আয়তি বইটা রেখে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। একনজর তাদের দু'জনকে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,"কি চাই?"

"আমরা এসেছি। তোমাকে দেখতে।"

"কেন? আমি জোকার? নাকি তুমি?"

আয়তি বিরক্ত হয়ে আবার খাটে গিয়ে বসল। সীমান্ত ঘরে ঢুকল। ধীরে ধীরে দোল দিচ্ছিল ইমতিহাকে। ইমতিহার সন্দিহান দৃষ্টি তখনো সরে নি তার উপর থেকে। খুব আতংকে বড় বড় চোখে সে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সীমান্ত মুখ নামিয়ে তাকে দেখেই ঠোঁট গোল করে বলল,"আলে আলে। ভয় পাচ্ছ নাকি? ভয়ের কিছু নেই পাখি। আমি তো তোমার চাচ্চু।"

আয়তি বলল,"তুমি আবার ওকে কোলে নিয়েছ?"

"হ্যাঁ, নিয়েছি।"

"কেন নিয়েছ?"

"বারে! নিতে পারব না বুঝি?"

"না। তোমাদের পুরুষ মানুষের হাতে মেয়ে বাবু দেখলেই আমার রাগ উঠে।"

"তোমার তো শরীর ভর্তি রাগ।"

সীমান্ত আলতো করে ইমতিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আয়তি বলল,"এতো আদর করার দরকার নেই।তোমাদের আদরেও আমার সন্দেহ হয়।"

সীমান্ত ভ্রুকুটি করল।
"তুমি সংসার করবা কেমনে আয়তি? তোমার ভেতর তো হেব্বি সমস্যা দেখি।"

"সেটা তোমার ভাবতে হবে না সীমান্ত। যে সংসার করার, সে সব জেনে বুঝেই করবে।"

"আচ্ছা যাও। তুমি অসুস্থ মানুষ। তর্ক করমু না তোমার সাথে।"

আয়তি কপাল কুঁচকে বলল,"এই সকালে এখানে এলে কেন? তুমি কি জানো তুমি কি পরিমান ইরিটেটিং?"

"জানি। তুমি তো রোজই মনে করাও আমাকে।"

ইমতিহা শব্দ করল হালকা। সীমান্ত বলল,"ওলে লে লে লে! আমার পুচু বাবুটা! যেভাবে কোলে নিচ্ছি, ওভাবেই থাকছে। আবার কি সুন্দর ধরে রেখেছে আমাকে। এ্যাই আয়তি! দেখো। কিভাবে তাকাচ্ছে আমার দিকে।"

আয়তি নির্বিকার মুখে বলল,"তোমাকে দেখে ভাবছে, মানুষের এই জাতটা কতো বদমাশ!"

"কচু! ভাবছে, এতো ভালো কেমনে হইতে পারে কেউ?"

সীমান্ত আবার কোলে নিয়ে দোল দিল তাকে। ইমতিহা ঘাটালো না ওকে। এই ছেলের চোখে মুখে বাবা চাচাদের মতো গাম্ভীর্য নেই। না জানে কখন হাতটা ছেড়ে দেয় ফট করে। তাই তার ভরসায় না থেকে ইমতিহা নিজেই নিজের প্রতিরক্ষা স্বরূপ সীমান্তর শার্ট চেপে ধরে রাখল। আয়তি সরু চোখে দু'জনের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,"ইমতিহা! তুমি যদি আমার ভাস্তি হয়ে থাকো, তাহলে এখনই ঐ সীমান্তর গায়ে হেগে দাও। পটি করে ওর পুরো শার্ট ভরিয়ে দাও। ও সেটাই ডিজার্ভ করে। ইডিয়ট কোথাকার!"

ইমতিহা এমন কিছু করল না। আয়তির কথা শেষ হতেই সে হাসল সামান্য। সীমান্ত বলল,"তোমার এই রগরগা চেহারাটা বড়ো ভালো লাগে আমার।"

"আর তোমাকে বড়ো অসহ্য লাগে আমার। দয়া করে ইমতিহাকে আমার কাছে দিয়ে এখান থেকে বিদায় হও। আমি ছেলে মানুষদের দুই পয়সারও ভরসা করি না। গেট লস্ট।"

____

ডেস্কে কেউ এসে দুই হাত রাখতেই জ্যোতি মুখ তুলে তাকাল। দেখল, আহিল কাচুমাচু মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। জ্যোতি হাসল সামান্য। বলল,"কেমন আছেন আপনি?"

বিনিময়ে আহিলের মুখটা কেমন যে নির্জীব দেখাল। ফ্যাকাশে চোখে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে সে বলল,"আমি তো ভালো আছি। কিন্তু তুমি ভালো নাই।"

"ওমা কেন? আমার আবার কি হবে?"

"বাবা নাকি আলাদা করে তলব করেছে তোমাকে?"

"ওহহ হ্যাঁ।"

"কি বলল?"

"তেমন কিছু না। সামনের মাসের প্রজেক্টের দায়িত্ব আমার কাঁধে দিয়েছে।"

"তোমাকে টিম লিডার বানিয়েছে?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে তো খুব চাপ হয়ে গেল। এখানের অবস্থা কি? কাজ শুরু করেছ?"

জ্যোতি মাথা নাড়ল। একবার ডানে বায়ে তাকিয়ে তারপর চাপা স্বরে বলল,"অবস্থা ঠিক বুঝতে পারছি না। অফিস পলিটিক্স আমি বুঝি না খুব একটা। তবে মনে হচ্ছে না এরা কেউ আমার লিডারশিপে খুশি হচ্ছে।"

"তা তো হবে না নিশ্চিত। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময়ই পোড়া গন্ধ পেলাম।"

"কিসের?"

"এদের কলিজার।"

জ্যোতি হেসে ফেলল। তাকে খুব ব্যস্ত দেখাল। সে কাজ করতে করতে বলল,"স্যরি স্যার। আপনাকে আর সাহায্য করতে পারব না। আপনার বাবা এবার চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিবে আমাকে।"

আহিল মাথা নাড়ল। ব্যস্ত গলায় বলল,"আরে না। আর কোনো সাহায্য লাগবে না। আমি উল্টো মাফ চাইতে এলাম তোমার কাছে। তুমি বিপদে পড়লে আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে।"

"সেটা কোনো বিপদ না স্যার। দোয়া করবেন, প্রজেক্টের কাজগুলো যেন ঠিক মতো ঠিক সময়ে শেষ করতে পারি।"
জ্যোতি একটু থামল। তারপর আবার ডেস্কটপের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে জানতে চাইল,"আপনার তো এখন বিপদ হয়ে গেল। আপনার কাজ এখন কে করবে?"

সামান্য আশংকা দেখা গেল তার দুই চোখে। আহিল হেসে দিয়ে বলল,"আরে চিল। আর কোনো চিন্তা নেই আমার। নেক্সট মান্থ থেকে আমার বড় ভাই জয়েন করছে কোম্পানিতে। এখন থেকে সব সে ই সামলাবে।"

"আপনার বড় ভাই?"

"হ্যাঁ। দি গ্রেট নিনীত মজুমদার। এখানকার পুরাতন স্টাফদের তার কথা জিজ্ঞেস করো। হি ইজ আ হোল প্যাকেজ। ভাইয়া থাকলে আমার আর চিন্তা নাই। তোমাদেরও চিন্তা নাই। ভাইয়া খুব টেকনিক্যালি সব হ্যান্ডেল করে।"

"আপনার ভাইয়া এতোদিন কোথায় ছিল? আসেনি কেন?"

আহিলের মুখটা গম্ভীর হলো হঠাৎ। জ্যোতি বুঝল, আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে তার সংলাপ বেশি সাবলীল হয়ে গেছে। প্রশ্নটা ব্যক্তিগত। জ্যোতি নিজে থেকে থেমে গেল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,"যাক, ভালোই তো হলো তাহলে।"

আহিল উপরনিচ মাথা নাড়ল। পরশু রাতে বড় ভাইয়া ঘোষণা দিয়েছে, সে আবার অফিসে জয়েন করবে, কোম্পানির দায়িত্ব নিবে। এরপর থেকে পূর্বাহ্ণ বাড়ির আবহাওয়া জমজমাট। আহিল জানে, বড় ভাইয়ার মতো কেউ এই কোম্পানিকে সামলাতে পারবে না।

জ্যোতি কাজ করছিল। আহিল আবার তাকে দেখে বলল,"থ্যাংক ইউ জ্যোতি। তুমি আমার যেটুকু সাহায্য করেছ, দ্যাটস হিউজ। আমি সানিয়াকেও তোমার কথা বলেছি।"

"সানিয়া কে? প্রেমিকা?"

জ্যোতি বিরক্ত হলো। আবার ব্যক্তিগত প্রশ্ন। তবে আহিলকে তেমন বিচলিত দেখাল না। ঠোঁট নেড়ে জবাব দিল,"উহহ, সিচুয়েশনশিপ আরকি।"

"সেটা আবার কি?"

"মানে কমিটমেন্ট ছাড়া প্রেম।"

"বাবা,বড়োলোকেদের কতো শব্দ।"

"কেন? তুমি বুঝি এসব জানতে না?"

জ্যোতি হাসল। কি বোর্ডে দ্রুত আঙুল চালিয়ে জবাব দিল,"না। জানতাম না। আমাদের প্রেম একটাই। বিয়ে করো, আর বরকে ভালোবাসো। ঐটাই। আর সত্যি বলতে আমরা ঐ এক প্রেমেই খুশি স্যার।"

___

শফি সাহেব উদাস গলায় বললেন,"আমার মেয়ের সাথে প্রতীকের একটা সম্পর্ক ছিল অতীতে। সেই কথা আমি কোনোদিন জানতে পারিনি।"

তিনি এখন বসে আছেন পূর্বাহ্ণ বাড়ির বাগানে। বাগানে লম্বা করে বেঞ্চ পাতা আছে বসার জন্য। তার পাশের বেঞ্চে নিনীত বসে আছে। ওর মুখটা বেশ শান্ত। আজ বিকেলেও শফি সাহেব বাড়ি এলেন। ব্যস্ততা একটু কমেছে তার। এই সপ্তাহে আর চাপ নেই তেমন। তিনি এসেছেন নিনীতের সাথে দেখা করতে। দু'জন আপাতত বসে আছে পাশাপাশি।

নিনীত তার কথা শেষ হতেই বলল,"জানবেন কেমন করে? জানার জন্য মেয়েকে সময় দিতে হয়। আপনি দিয়েছেন কখনো?"

শফি সাহেব চমকালেন। এক বাক্যে উত্তর দিলেন,"না, দেই নি।"

"সেটাই। আপনি দেন নি। এজন্যই কখনো জানতে পারেন নি।"

"বড্ড উদাসীন ছিলাম মেয়ের প্রতি।"

"ছিলেন? আমার তো মনে হয় এখনো আছেন?"

"তোমার এমনটাই মনে হচ্ছে?"

"হ্যাঁ। যদি আপনি সচেতন হতেন মেয়েকে নিয়ে, মাথা ঘামাতেন তার ব্যাপারে, তাহলে আমার মতো ছেলের সাথে তার বিয়েই দিতেন না কোনোদিন।"

"আমার তো মন্দ লাগছে না তোমাকে।"

"মন্দ নাকি জানি না। কিন্তু আমার মেয়েদের আমি কোনোদিন এমন কোনো লোকের সাথে বিয়ে দিতাম না। আই জাস্ট হেইট মাইসেলফ।"

নিনীতের দুই ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। বলল,"আমি খুব খারাপ বাবা।"
শফি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,"আমিও। আমিও ভীষণ খারাপ বাবা।"

"না, আপনি খারাপ না। আমি আপনাকে দেখে শিখেছি। পৃথিবীর যে ই অন্যায় করুক, যতো অন্যায়ই করুক, তার শাস্তি শুধু তারই প্রাপ্য। অন্য কারো না। আপনি ভালো বাবা। তবে হ্যাঁ, মিতা খুব লো এক্সপেক্টেশনসের মেয়ে। ওকে আপনি চাইলেই অল্প চেষ্টায় খুশি রাখতে পারেন। সপ্তাহে তিন চারটা ফোন কল, মাস শেষে ছোট কোনো উপহার। আর তিনমাসে একবার দেখা করা। আমার মনে হয়, মিতা ঐটুকুতেই খুশি হবে।"

শফি সাহেব আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সেদিনের পর তিনি তার অনেক বছর পুরাতন গৃহকর্মীকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন,"কুলসুম আমাকে একটা কথা বলো তো। পারমিতা যখন আমার বাড়িতে থাকত, তখন কি বাড়িতে কেউ আসত? মানে, প্রতীক কি দেখা করত তার সাথে?"

কুলসুম মাথা নেড়ে বললেন,"প্রতিদিনই তো দেখা করতো। সেই সকালে আইতো।আর রাতে যাইতো। কখনো কখনো তো রাইতেও থাকত।"

শফি সাহেব আঁতকে উঠলেন। আর কিছু জানতে চাইলেন না। আওয়াজ নামিয়ে কোনো রকমে বললেন,"আচ্ছা। তুমি এখন যেতে পারো।"

কুলসুম চলে যাওয়ার পর শফি সাহেব অনেক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। প্রতীকের উপর যতোটা না রাগ উঠল, তার চেয়েও বেশি রাগ উঠল নিজের উপর। এতো বড়ো একটা কথা তিনি জানতেন না? অথচ নিনীত জানত। মিতা তাকে বলেনি এই কথা। অথচ নিনীতকে বলেছে।

তিনি মাথা হেট করে বলে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর দুই দিন পর আজ একটু সময় বের করে এই বাড়িতে আসলেন। পারমিতার এখানে ভরা সংসার। শফি সাহেব এসে দেখলেন সে তার দুই মেয়ে সহ নিজের মাথায় ভরিয়ে ভরিয়ে তেল দিচ্ছে। তাকে দেখেই হেসে দিয়ে বলল,"বাবা, চুল সব পড়ে যাচ্ছে। সংসার এতো জ্বালা। আগে বুঝিনি। হিহিহি।"

শফি সাহেব এসেছিলেন নিনীতের সাথে কথা বলবেন বলে। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তার। এই পৃথিবীতে তার লক্ষ্য কি? তার আপন মানুষ কে? কিসের জন্য তার এতো ব্যস্ততা? শফি জানেন না কিছুই।

তিনি মাথা নিচু করেই ধিমি স্বরে বললেন,"ঠিকই বললে তুমি। মিতার জন্য আসলে কিছুই করিনি সেভাবে। আমার মেয়েটা অবহেলায় বড় হয়েছে। পেশার পেছনে ছুটতে গিয়ে ওকে আর সময় দেওয়া হয়নি।"

"আমিও কিছু করিনি আমার মেয়েদের জন্য। বিশেষ করে আমার নিকির জন্য। ওকে আমি এড়িয়েই গেছি সবসময়। কিন্তু এখন থেকে করব। আপনিও আগের কথা ভুলে যান। চলুন একসাথে প্রতিযোগিতা করি।"

"কিসের?"

"ভালো বাবা হওয়ার।"

শফি সাহেব কপাল কুঁচকে বললেন,"সেটা কেমন করে করব?"

নিনীত কফির কাপটা রেখে উঠে দাঁড়াল। সামান্য হেসে বলল,"এখনই বাড়ির ভেতরে যাব। গিয়ে আপনি আপনার মেয়েকে জড়িয়ে ধরবেন। আর আমি আমার মেয়েদের জড়িয়ে ধরব। এটাই হতে পারে ভালো বাবা হওয়ার পথে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।"

শফি সাহেব আশ্চর্য হলেন। নিনীতকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালো। শফির দ্বিধাভরা চোখের বিপরীতে সে কেবল হাসল সামান্য। এখন ঘরে গিয়ে সে সত্যিই তার দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরবে। তবে, একটু পরে, যখন সবাই ঘুমিয়ে যাবে, আর বাড়ির সামনের আম গাছের ডালে বসে হুতুম পেঁচাটা কুউ কুউ করে ডাকবে, তখন নিনীত শফি সাহেবের আদরের মেয়েটিকেও জড়িয়ে ধরবে। ধরে বলবে, দয়া করে আজ তোমার পড়ালেখার বই গুলো একপাশে রেখে আমার পাশে এসে বসো। আজকাল আমার বড়ো অসহ্য লাগে এদের!

_____

পারমিতা পড়াশোনা করছিল এমডির জন্য। সে কয়েক মাস বাদেই পরীক্ষায় বসবে। এমডি করতে তার সময় লাগবে তিন বছর। নিনীত শুনে অবাক হয়ে বলল,"এখনই তো রোগী জায়গা দিতে পারো না চেম্বারে। আর ডিগ্রি নিয়ে কি করবে?"

পারমিতা হাসতে হাসতে বলল,"রোগীর জন্য ডিগ্রি নিচ্ছি না। মনের ইচ্ছেতেই পড়াশোনা করছি। যখনই নিজেকে খুব দুর্বল মনে হয়, তখনই মনে করি, আমি নেহাতই দুর্বল নই। আমার পুথিগত বিদ্যা আর কিছু সার্টিফিকেট আছে সঙ্গে। যোগ্যতা বলতে এছাড়া আর কিইবা আছে আমার?"

নিজেকে নিয়ে পারমিতার ধারণা এমনই ছিল। নিজের চোখে সে অত্যন্ত নিকৃষ্ট আর নিচু জাতের মেয়েলোক। যার জীবনে শিক্ষা বাদে বড়াই করার আর কিছু নেই। তবে নিনীতের এমন মনে হতো না। নিনীতের মনে হতো, পৃথিবীর সব ভালো পারমিতার হওয়া উচিত।

কিছুদিন ধরে পারমিতা পড়াশোনা করছে রাত জেগে। নিনীত চুপচাপ ঘরে বসে অপেক্ষা করে তার। রাত দুইটা বাজেও পারমিতার কোনো খবর থাকে না।

আজ রাতে নিনীত নিজেই গেল তার ঘরে। পারমিতা দরজা খুলে তাকে দেখে চমকে গেল।
"এখনো জেগে আছেন? ঘুমান নি?"

"না। ঘুম আসছে না।"

"কেন?"

নিনীত একটু সময় নেয়। তারপর সোজাসাপটা গলায় বলে,"তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছ। আর আগের মতো পাত্তা দিচ্ছ না মিতা।"

পারমিতা হতভম্ব হয়ে বলল,"এমন কিছু না। আমি পড়ছি। বললাম তো আপনাকে।"

"কি এমন পড়ো? আমিও আজ বসে বসে তোমার পড়া দেখব।"

পারমিতা দরজা ছেড়ে দাঁড়াল। বলল,"আসুন ভেতরে।"

নিনীত ভেতরে এলো। দরজা বন্ধ করতে করতে একবার পারমিতার দিকে তাকাল। পারমিতা বুকে হাত বেঁধে বলল,"কি চাই? আমার তো মনে হচ্ছে না আপনার নিয়ত ভালো।"

"আমার নিয়ত ভালো। কিন্তু মন ভালো না। ঘরে কফি মেকার আছে না? জলদি দুই কাপ কফি বানাও তো মিতা।"

"কফি?"

"হু। আজ আমি তোমাকে একটা গল্প বলব। একটা মেয়ের গল্প। আজই বলব। এরপর আর কখনো তুমি এই ব্যাপারে আমার কাছে কিছু জানতে চাইবে না। ঠিক আছে?"

পারমিতা অবাক হয়ে বলল,"কোন মেয়ের গল্প?"

নিনীত গিয়ে খাটে বসল। ওর মুখটা হঠাৎ অন্যরকম দেখালো ভীষণ। পারমিতা বলল,"আপনার মন খারাপ?"

"না। চটপট দু'কাপ কফি বানিয়ে আনো না মিতা। জলদি।"

পারমিতা দশ মিনিটের মাথায় দুই হাতে দু'টো কফির কাপ ধরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। নিনীত ঝিমুচ্ছিল ঘুমে। পারমিতা সামনে আসতেই মাথা তুলল, আস্তে করে একটা কাপ নিল নিজের হাতে।

পারমিতা বসল তার পাশে। প্রায় দীর্ঘসময় কেউ কোনো কথা বলল না। নিনীতই সবার প্রথম নীরবতা ভেঙে একটা কথা বলল।
বলল,"একটা সিক্রেট জানো পারমিতা? ডিপ আনটোল্ড সিক্রেট। আমি এই কথা কখনো কাউকে জানাইনি। তোমাকেই জানাচ্ছি। কারণ তোমার জানা প্রয়োজন।"

পারমিতা শান্ত হয়ে বসল। ফাঁকা এক ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল,"জি, বলুন।"

"ইউ রিমেম্বার সিয়াশা? আমার প্রথম স্ত্রী, নিবি নিকির বায়োলজিক্যাল মাদার।"

"জি। মনে আছে।"

"সিয়াসার মৃত্যুটা ঠিক এক্সিডেন্ট না।"

পারমিতা চমকে উঠল। চোখ বড় বড় করে বলল,"তাহলে?"

আবার একটু থামল নিনীত। ঘাড় বাঁকিয়ে সোজাসুজি তাকাল পারমিতার দিকে। তার চোখের দৃষ্টি শান্ত ভীষণ। পারমিতা বোকার মতো চেয়ে থাকে। নিনীত খুব ধীরে, অথচ বেশ জোরাল ভাবে জবাব দেয়,"সিয়াশাকে আমি মেরেছি। ওটা এক্সিডেন্ট না। ওটা মার্ডার। আমি রয়ে সয়ে ছক কষে ওকে মেরেছি। এন্ড আই অ্যাম নট গিল্টি এট অল। আমি একটুও দুঃখিত নই নিজের কাজের জন্য।"

পারমিতার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল। দু'চোখের পাতা কেঁপে উঠল বিস্ময়ে। বিস্ফারিত দুই চোখে সে চেয়ে থাকল নিনীতের শীতল, নির্বিকার মুখের দিকে। নিঃশ্বাস সামলে বলল,"ক...কেন?"

"সেটা জানার জন্যই তো তোমাকে ঐ মেয়েটার গল্প শুনতে হবে। শুনবে কি?"

চলবে-

[অনেকদিন পর লিখলাম। খাপছাড়া হলো নাকি জানি না।সম্ভব হলে একটু রেসপন্স করবেন পোস্টে।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 33 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন