ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বর্ণ কোমল

৮ম পর্ব

লেখক: পরিণীতা আরান হৃৎ

#স্বর্ণকোমল

#পরিণীতা_আরা_হৃৎ

#পর্ব_৮

[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]

🕊️

রাত একটা বেজে পনেরো মিনিট। মাত্র বাড়িতে ফিরেছে কিয়ান। কোথায় গিয়েছিলো সেটা বাড়ির কারো জানা নেই। কাউকেই বলার প্রয়োজন মনে করেনি। ছেলেকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে রাত দশটার দিকে জাহরা বেগম ফোন করেছিল কিয়ানের নাম্বারে। তখন শুধু মাকে জানিয়েছে আসতে ওর দেরি হতে পারে।

গাড়ি পার্কিং করে বাড়ির বাহিরের টবের নিচ থেকে চাবি বের করে দরজা খুলতে যাবে তার আগেই মর মর আওয়াজ করে খুলে গেলো কাঠের ভারী দরজাটা। জাহরা বেগম ছেলের চিন্তায় ঘুমাতে যেতে পারেনি। ড্রয়িং রুমে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। গাড়ির শব্দ পেয়ে এসে দরজা খুলেছেন।

আজও একই কাহিনী। রোজকার মতো। মাকে কতবার বলেছেন যেনো তিনি ওর চিন্তায় রাত না জেগে থাকে। তাও তিনি জেগে থাকবেই। কিয়ান ঘরে ঢুকে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো মাকে। অন্য হাতে দরজা লাগিয়ে দিলো। দুই মা ছেলে হেলে দুলে এগিয়ে গেলো ডাইনিং টেবিলের দিকে।

জাহরা বেগমকে চেয়ার টেনে বসিয়ে নিজেও বসে পরে মায়ের পাশের টেবিলে। একটা প্লেটে ভাত আর মাংস নিয়ে এগিয়ে দিলো মায়ের দিকে। চোখ দিয়ে ইশারা করলো থালের দিকে।

জাহরা বেগম মিষ্টি হেসে হাত ধুয়ে ভাত মাখানো শুরু করলেন। প্রথম লোকমা তুলে দিলেন ছেলের মুখে। দ্বিতীয় লোকমা নিজে মুখে নিলেন।

কি বলবে এই ছন্নছাড়া, রগচটা, গম্ভীর মুখে ছেলেটারও প্রতিদিন রাতের বেলা মায়ের হাতে না খেলে ঘুম আসে না। আর জাহরা বেগমও যেনো ছেলেকে ছাড়া কিছু বুঝেন না। ছেলেকে না খাইয়ে নিজে রাতে কখনোই খায় না। ছোটটার থেকে বড়টার প্রতি তার মায়া যেনো বরাবরই বেশি। লোকে বলে বাবা মা নাকি ছোটো সন্তানকে বেশি ভালো বসেন। অথচ কিয়ান ছোটো থেকে দেখে এসেছে ওর বাবা মা তিয়ানের থেকে ওকেই বেশি ভালোবাসে। কিয়ান যত রাত করেই বাড়িতে ফিরুক না কেনো নিজে না খেয়ে ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করে। ছেলের সাথে খাবে বলে। চোখের মণি যে ছেলেটা।

মা ছেলের এই অপরূপ দৃশ্য উপরের বারান্দার পিলারের আড়াল থেকে দেখছে সাদমান চৌধুরী। বুকটা জুড়িয়ে যায় তার মা ছেলের এই ভালোবাসা দেখলে। আর কেউ না জানলেও সাদমান জানে ছেলে তার উপরে উপরে যতই শক্ত হোক না কেন। ভিতরে নরম মাটির মতো। তিনি ঘুমাননি। যেখানে বউ ছেলের জন্য জেগে আছে সেখানে তারও যে ঘুম আসে না। রোজ এই কাহিনি আড়ালে দাঁড়িয়ে অবলোকন করে সাদমান চৌধুরী।

জাহরা বেগম কিয়ানের মুখে ভাত তুলে দিতে বললেন,

“আজ তো অফিসে যাসনি। তাহলে ফিরতে এতো রাত হলো যে? কোথায় গিয়েছিলি?”

খুক খুক করে কেশে উঠলো কিয়ান। মাকে মিথ্যে বলতে পারে না ও কখনোই। যেই কাজ করে এসেছে তা মাকে বলবে কিভাবে? তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে আমতা আমতা করে আওড়ালো,

“ আ..আসলে একটা জরুরী কাজ ছিলো তাই একটু লেট হয়ে গেছে। আর হবে না।”

আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করলেন না জাহরা বেগম ছেলেকে। খাওয়া শেষে প্লেট বাটি গুছিয়ে তিনিই চলে গেলেন নিজের ঘরে আর কিয়ান ছাদে। খাওয়ার সময় ফোনে নোটিফিকেশন এসেছে ভাইব্রেট থাকায় শুধু ও টের পেয়েছে। ও জানে তিয়ানই মেসেজ করেছে ওকে।

ছাদে এসে দরজার সামনে দাড়াতেই দমকা হাওয়া এসে বারি লাগলো ওর গায়ে। বড় করে বুক ভরে প্রকৃতির এই ঠান্ডা সতেজ বাতাস টেনে নিলো নিজের ভিতর। এগিয়ে গেলো ছাদের কোণায় বিছানো পাটির দিকে। সেখানে ইতিমধ্যে তিয়ান, রাতুল, ইরিশ উপস্থিত রয়েছে। ও এসেই চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়লো পাকার মেঝেতে বিছানো পাটিতে। দুই হাত মাথার নিচে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।

সকলেই নীরব হয়ে বসে আছে। কিয়ান এক পেগ না খাওয়া পর্যন্ত ওরা হাত দিতে পারছে না। যতই পার্টি ফার্টি হোক না কেনো তার আগে কিয়ান ওদের বড় ভাই।

কিয়ানের কোনরূপ হেলদোল না দেখে এবার তিয়ান ন্যাকামি করে ডেকে উঠলো,

“এই ভাই। তোর জন্য তো আমরাও শুরু করতে পারছি না। কি হলো ওঠো?”

“তোরা শুরু কর। আমি খাবো না।”

তিনজনই অবাক হলো। তবে ওর বলতে দেরি ইরিশের বোতলের ছিপি খুলে ঢকঢক করে গিলতে দেরি নেই। রাতুল একটা গ্লাসে ঢেলে হালকা চুমুক দিলো। তিয়ান বোতল সহই নিলো। অল্প করে চুমুক দিয়ে কিয়ানের উদ্দেশ্য বললো,

“কি নাটক শুরু করলে এবার বলো তো? তুমি! আর বিয়ার খেতে না করে দিলে? দেখি তো মুখটা একটু দেখাও তো বাছা।”

কিয়ান বিরক্ত হলো। তবুও কথায় ঝাঁঝ না মিশিয়ে শান্ত নিরেট স্বরে বললো,

“আমি তোর বড় ভুলে গেলি?”

“এক বছরের।”

“এক দিনের হলেও বড় তো বড়ই।”

“আচ্ছা এসব বাদ দাও। সত্যি খাবে না? দেখো ওটা তোমাকে ডাকছে।”

অন্য একটা বোতল দেখিয়ে বললো।

“স্বর্ণ আসে পাশে থাকলে এইসব যে আমাকে টানে না।”

“ড্রাগর নেশাও না?”

“ওই অদ্ভুত চোখের মাতাল করা ভয়ংকর চাহনির কাছে পৃথিবীর সমস্ত ড্রাগের নেশা তুচ্ছ।”

তখনই কিয়ানের চোখ পড়লো ওদের বিপরীত পাশে ছাদের একদম কর্ণারের দিকে। মনে হচ্ছে কেউ কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।

“কে ওখানে?”

তিয়ান, রাতুল, ইরিশ চোখ তুলে তাকালো ওপর প্রান্তে। কোনো নড়াচড়া বা আওয়াজ না পেয়ে আরো দু তিনবার হাক ছেড়ে ডাকলো রাতুল। চারবারের ডাকে ফিরে তাকালো অন্ধকার ছায়া মূর্তিটি। তবে মুখ দেখা গেলো না বান্দার।তখনই অন্ধকার হতে বেরিয়ে আসলো এক ছায়া মূর্তি। ধীরে ধীরে আলোতে এসে দাড়ালো সেই ছায়া। তিয়ান বলে উঠলো,

“আপনি…”

“তূর্য…তূর্য সিকদার।”

তিয়ান ভ্রু কুঞ্চিত করলো।

“হ্যাঁ, তো তূর্য সিকদার আপনি এতো রাতে এখানে ছাদে দাড়িয়ে আছেন কেনো? তাও ভুতের মতো দাড়িয়ে থেকে আমাদের কথা শুনছিলেন?”

“ভুল বুঝছেন। আমিই আগে এসে দাঁড়িয়েছিলাম ছাদে। ঘুম আসছিলো না তাই। আপনারাই বরং আমাকে দেখেন নি। আর আপনি হয়তো দেখতে পাচ্ছেন আমার কানে এয়ারবাড লাগানো। সেহেতু আপনাদের কোনো কথা আমার পক্ষে শোনা পসিবল নয়।”

কেউ আর কিছু বললো না। কিয়ান উঠে দাঁড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। ইরিশ ওর দিকে তাকিয়ে বললো,

“সত্যি খাবেনা?”

“নো।”

অতপর গটগট পায়ে সিঁড়ির দিকে হাটা ধরলো। তূর্য উল্টো ঘুরে কাউকে হোয়াটসঅ্যাপ এ কাউকে কিয়ানের কোমল কে নিয়ে বলা কথা গুলোর ভয়েস রেকর্ড পাঠিয়ে দিলো। সাথে লিখলো ‘চলে গেছে’। ওর কানে তখন এয়ারবাড ছিলো ঠিকই তবে তাতে কিছুই বাজেনি। ও তো ওর ফোনে ওদের কথা রেকর্ড করছিলো।

_

কোমলের ঘুম ভেঙেছে কিছুক্ষণ হয়েছে। তাও পানির তৃষ্ণায়। কিন্তু জগ হাতে নিয়ে দেখে তাতে পানি নেই। খালি পরে আছে। তাই ঘুম ঘুম চোখেই ঢুলু ঢুলু পায়ে রুম থেকে বের হলো কিচেনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

দরজা ঠেলে বের হতে না হতেই ঠাস করে বারি খেলো কারো শক্ত পোক্ত বুকের সাথে। তবে পড়লো না। কিয়ান ওকে নিজের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো। কোমলও ভয়ে ওর কলার চেপে ধরলো এক হাতে। কিয়ান কে দেখেই ও ছেড়ে দিলো কিয়ান এর কলার। তবে এবার আর আগের বারের মতো কোমলকে ছেড়ে দিলো না কিয়ান। বরং আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করলো। সামান্য উচুতে উঠে গেলো কোমল। ভয়ে হাত থেকে বোতল ছিটকে পড়লো ফ্লোরে। দুই হাত আপনা আপনি জড়িয়ে গেলো কিয়ানের গলায়। কিয়ান কাল কলিম্ব না করে ছোটো করে একটা শুকনো চুমু খেলো কোমলের ঠোঁটে। কোমল চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। কানের লতি লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। যা দৃষ্টি এড়ালো না কিয়ানের। তবে মেয়েটা অসুস্থ ভেবে ছেড়ে দিলো ওকে কিয়ান।

“গুড নাইট পরি।”

নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো কিয়ান। তখন ওর কানে ভেসে আসলো কোমলের নরম কন্ঠস্বর।

“তিয়ান ভাইয়ার বিয়ে পর্যন্ত আর কিই বা করবেন আপনি। তারপর তো চলেই যাবো।”

কোমলের কথাটা বলতে দেরি কিয়ানের উল্টো ঘুরে ওর দিকে আসতে দেরি হলো না। বন্ধ করে দিলো কোমল এর ঠোঁট জোড়া। ছোট ছোট কামড় বসাতে লাগলো। জাহির করলো নিজের হিংস্রতা। মিনিট দুয়েক পর ছেড়ে দিলো ওকে। কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে লাগলো দুজনেই। কিয়ান দু হাতের আজলায় কোমলের চোয়াল আঁকড়ে বললো,

“পৃথিবীর যেই প্রান্তেই যাও না কেনো এই কিয়ান তার স্বর্ণ কে ঠিক খুঁজে বের করবে। তোমার গন্তব্য এই আমি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, জান।”

কোমলকে ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো কিয়ান। কোমল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিয়ানের দিকে। যতক্ষণ না দৃষ্টির আড়াল হলো ততক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।

#চলিত

[ সবাইকে একটা জিনিস ক্লিয়ার করি। তোমরা হয়তো অনেকেই ভাবতে পারো যে কিয়ান কোমলের সাথে এতো কিছু করছে অথচ কোমল কেনো কিছুই বলছে না কেনো। বা কাউকে কিছু কেনো জানাচ্ছে না। আর তূর্যই বা কাকে এসব পাঠালো আর। এসব কিছুর উত্তর পেয়ে যাবে আস্তে আস্তে। আর গল্পটা বেশি বড় নয়। তাই ধৈর্য ধরে পড়ো। অল্পতেই সমাপ্তি টানবো এটার। ]

হ্যাপি রিডিং 🫰

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন