#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_১১
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
রাতের আধার পেরিয়ে আকাশে উঠেছে এক রক্তিম সূর্য।
সময় ভোর ছয়টা। রাইসার ঘুম কিছুটা হালকা হয়েছে। এসির বাতাসে ঠান্ডা হয়ে আসা রুমে বিছানার উপর শুয়ে থেকে ওকেও যেনো ঠান্ডা টা জেঁকে ধরেছে। বিছানা হাতড়াতে লাগলো কিছুর হদিস পাওয়ার আশায়। কিন্তু হায়! বিছানা যে ফাঁকা। তবে ফাঁকা তো থাকার কথা নয়। তূর্য যে ওর সাথেই ছিলো। কোথায় গেলো তাহলে?
কম্বলের নিচ থেকে মাথা বের করে উকি দিয়ে দেখলো। সারা ঘরে কোথাও তূর্যের কোনো হদিস নেই। তড়াক করে উঠে বসলো রাইসা। গায়ের কম্বলটা ভালো মতো জড়িয়ে নিলো। না কোথাও নেই তূর্য। তবে? কোথায় গেলো?
উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলো হোটেল রুম থেকে। সকাল হওয়ার দরুন মানুষের ভিড় বাট্টাও কম খানিক। রাইসা এগিয়ে গেলো রিসেপশনে বসে ঝিমানো মেয়েটার দিকে।
“ আমার একটা ইনফরমেশনের দরকার ছিলো।”
রাইসার কথায় নড়ে চড়ে উঠলো মেয়েটি। বললো,
“জ্বী বলুন ম্যাম আপনাকে কিভাবে হেল্প করতে পারি?”
“তূর্য সিকদার নামে একজন ছিলেন আমার সাথে রুম নং ৪০১। উনি কি বাহিরে গেছেন? বলতে পারবেন আপনি?”
“আমাকে দুই মিনিট সময় দিন আমি আপনাকে জানাচ্ছি।”
“জি সিউর।”
মেয়েটি একটু ঘাটাঘাটি করে বললেন,
“চিন্তা করবেন না ম্যাম। স্যার সকল বিল পে করে দিয়েছে। উনি আধাঘন্টা আগেই বেরিয়ে গেছে। আমাকে বলে গেছেন আপনাকে যেনো জানাই। উনি জার্মানী ফিরে গেছেন।”
বিস্ময়ে মেয়েটার কথার কোনো উত্তর করতে পারলো না রাইসা। চলে গিয়েছে মানে? ওকে তো কিছুই বলেনি। তাহলে কি ওকে ঠকালে তূর্য। ওদের যে কালকে বিয়ে হয়েছে সেই কথাও তো কাউকে জানানো হয়নি। আর কাল রাতে। এতকিছু যে হলো তার কি হবে? ওর যে জীবন টা নষ্ট হয়ে যাবে। ও তো সাথে করে নিজের ফোন টাও আনেনি যে তূর্য কে এখন কল করবে। ওর গলা রোধ হয়ে আসছে। ও কিছু বলতে চাচ্ছে তবে পারছে না। ওকে কষ্টে শুধু বললো,
“ধন্যবাদ।”
ও দু পা ফিরিয়ে নেয়ার আগেই রিসিপশনের মেয়েটির ডাক পড়লো আবার।
“ম্যাম এটা উনি যাওয়ার আগে দিয়ে গেছেন আপনাকে দেয়ার জন্য।”
একটা খাম রাইসার হাতে ধরিয়ে দিলো মেয়েটি। রাইসা সেটি নিয়ে হাটা ধরলো বাহিরে। ইতিমধ্যে ওর চোখ থেকে পানি পরতে শুরু করেছে। বুঝে গেছে তাড়াহুড়োয় কত বড় ভুল করে ফেলেছে ও। খামটা খুলতে সেখান থেকে বেরিয়ে আসলো একটা বিশ লক্ষ টাকার চেক। এটা কিসের টাকা? তবে কি তূর্য ওকে শুধু টাকার বিনিময়ে ভোগ করতে চেয়েছে? পরক্ষনেই খাম থেকে বেরিয়ে আসলো একটা স্টিকি নোট। সেখানে ছোট করে জাস্ট দুটো অক্ষর লেখা।
তোমার পাওনা।
এবার যা বুঝার বুঝে গেলো রাইসা। তূর্য ওকে বিয়ের নাম করে শুধু ইউজ করেছে। এবার কি করবে ও? এই কথা তো কাউকে বলতেও পারবে না। আর বাড়িতে? ওকে কেউ খোজেনি তো? নিজের ভুলে। অতিরিক্ত বিশ্বাসী হওয়ায় এই ছিলো কপালে?
অত্যাধিক সকাল হওয়ার দরুন পুরো রাস্তাই ফাঁকা পরে আছে। মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি চলছে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুদূর গিয়েই মনে হলো ওর পায়ের শক্তি বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। মাটিতে হাটু ভেঙে বসে চিৎকার করে কান্না উঠলো রাইসা,
“কি দোষ করেছিলাম আমি? কেনো আমাকে এভাবে কলঙ্কিত করে রেখে গেলেন আপনি? এবার আমি কোন মুখ নিয়ে ফিরবো বাড়িতে? কি বলবো কোথায় ছিলাম আমি সারারাত? আপনাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস এত কিছু করা টা কি আমার ভুল ছিলো তবে? কেনো আপনি এমনটা করলেন? কেনো ধোঁকা দিলেন আমকে? এই মুখ নিয়ে আমি কিভাবে বাড়িতে ফিরবো? ইয়া আল্লাহ! তুমিতো জানো আমি কোনো পাপ করিনি। তাকে তো হালাল ভাবেই পেতে চেয়েছি।। পেয়েছিলাম ও । তবে কেনো তাকে এভাবে দিয়ে তাকে আবার কেড়ে নিলে তুমি? পেয়ে হারানোর কষ্ট যে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। কেনো সে আমাকে ঠকালো? আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুকে। বেঁচে থাকা যে দায় হয়ে যাচ্ছে। তবে আত্মহত্যা যে তুমি মহাপাপ বলে গন্য করেছো। যার কোনো মাফ নেই। কিভাবে বাঁচবো আমি এবার?”
বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাদতেঁ লাগলো রাইসা। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো। হেঁচকি উঠে গেলো কান্না করতে করতে।স্বামী নামক পুরুষকে বিশ্বাস করে ঠকে গেলো বেচারি। কি আছে ওর ভবিতব্যে? বেঁচে থাকার লড়াই কি চালিয়ে যেতে পারবে ও? নাকি তিয়ানের মতো রাইসাও কোনো মহাপাপ করে দুনিয়ার আযাব থেকে মুক্তি দিবে নিজেকে?
_
কোমলকে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছে কিয়ান। তবে ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই অবাক হলো ও। কেনোনা ও যেই মেডিসিন দিয়েছিলো তাতে করে সকলের খুব বেশি হলে তিন থেকে চার ঘন্টা ঘুমানোর কথা। এখন বাজে সকাল ছয়টা অথচ এখনও সকলে ঘুমিয়ে আছে। এটা কিভাবে সম্ভব?
কিয়ানের এক হাতের সাথে কোমলের এক হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে আটকে দিয়েছে কিয়ান। যাতে করে বাড়িতে এসেও ওর সাথেই থাকতে হয় ওকে। কোমল দৌড়ে ওর মার কাছে যেতে চাইলো তবে হাত আটকে থাকার কারণে পারলো না।
কিয়ানের দিকে অসহায় চোখে তাকাতেই কিয়ান এবার ওর কষ্ট টা বুঝলো বোধহয় একটু। তাই কোমলের সাথে সাথে চলতে শুরু করলো কিয়ান। তবে হাত থেকে হ্যান্ডকাফ খুললো না ভুলেও।
কোমল ডাইনিং টেবিল থেকে হাতে করে পানির জগ এনে এক এক করে সকলের মুখে পানি ছিটাতে লাগলো। এক একজন করে সকলের ঘুম ভেঙেছে তবে চোখ এখনো একটু প্রশ্রয় পেলেই ঘুমিয়ে পড়বে এমন ভাব।
এলিজা মেয়েকে কিয়ানের সাথে এমন অবস্থায় দেখে চোটে গেলেন খুব। মেয়েও মার জ্ঞান ফিরেছে দেখে ন্যাকা কান্না করে দিলো।
“মাআআআআ। কিয়ান ভাইয়া আমাকে মারার হুমকি দিয়ে জোড় করে বিয়ে করে নিয়েছে। ভাইয়াই তোমাদের অজ্ঞান করে আমাকে তুলে নিয়ে গেছে।”
এহেন কথায় বোম ব্লাস্ট হলো যেনো ড্রয়িং রুমে। ঘুম উধাও হয়ে গেলো চোখ থেকে সকলের। কোমল এখনও কেঁদেই চলেছে। এলিজা রেগে জিয়ে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন কিয়ানের গালে। তবে তাতে ওর কোনো হেলদোল হলো বলে মনে হলো না।
“বউয়ের সাথে নাহয় থাপ্পড়টা ফ্রীতেই নিলাম।”
এলিজা কটমট করে তাকিয়ে রইলো কিয়ানের দিকে। পারে তো মেরে ফেলতো বোধহয় এই বেয়াদব ছেলেকে তিনি। তবে তিনিও যে কোনো অংশে কম নয় তা দেখিয়ে দেবে উনি। এই বেয়াদব ছেলের সাথে কখনোই মেয়েকে রাখবেন না তিনি।
বাড়ির সকলে অবাক হলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করলো না। যেন এ খুব স্বাভাবিক বিষয়। তবে অবাকতা কাটলো না কারো।তবে কিয়ান সকলের দৃষ্টি কে এক প্রকার উপেক্ষা করে তিয়ানের কথা জিজ্ঞেস করতে নিয়েও করলো না। যেহেতু তিয়ান এখানে নেই তার মানে এখনও রুমে আছে সে। তবে কত সময় ঘরের দরজা আটকে বসে থাকবে তিয়ান। তাই কিয়ান ভাবলো গিয়ে একবার ডেকে দিবে। ওকে তো বড্ড ভয় পায় তিয়ান। তাহলে নিশ্চয়ই ও ডাকলে না বের হয়ে পারবে না।
কোমল কে সাথে করেই টেনে নিতে চললো নিজের সাথে করে। তিয়ান এর ঘরের সামনে এসে দাড়িয়ে আগে গোলা উচু করে ডি তিনবার ডাক দিলো। তবে তিয়ান এর কোনো সাড়াশব্দ এলো না ভিতর থেকে। এবার দরজায় হাতের সাহায্যে বারি মারলো কিয়ান। চার বারের সময় বারি দিতে নিলেই ওরা দেখলো তিয়ানের ঘরের দরজা ভেতর থেকে চাপিয়ে রাখা ছিলো। যার দরুন হালকা ধাক্কা লাগাতেই খুলে গেলো দরজা।
দুজনে এক সাথেই রুমে প্রবেশ করলো। পুরো রুম অন্ধকারে ঢাকা। বাহিরের আলোর ছিটেফোটাও ভিতরে আসার কোনো রাস্তা খোলা আছে বলে দেখে মনে হচ্ছে না।
কিয়ান দরজার পাশে হাতড়ে হাতড়ে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিলো । তাতেই দৃশ্যমান হলো ঘরের নরকীয় দৃশ্য। সিলিং ফ্যানের সাথে তিয়ানের দেহটা ঝুলছে। জিহ্বা বের হয়ে আছে কতখানি। চোখ দুটোও খোলা। চোখ দেখে মনে হচ্ছে বেরিয়ে আসবে কোটর থেকে।এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে সাথে সাথেই চিৎকার করে উঠলো কোমল। কিয়ান নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলো অর্ধাঙ্গিনীকে। ওর চোখ দিয়েও বেরিয়ে এলো দু ফোঁটা পানি। তবে তা মুছে নিলো তাড়াতাড়ি। পুরুষ মানুষ কান্না করছে সেটা দেখতে কিংবা শুনতে বড্ড বেমানান লাগে। কিয়ানের কাছে তো তাই। কষ্ট কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ করলে কি আর কষ্ট কমে যায় যে কান্না করতে হবে। অথচ তিয়ান টাকে দেখো। গতকাল একটা মেয়ের জন্য কিভাবে কান্না করেছিল। মেয়েটার পা জড়িয়ে ধরেছিলো পর্যন্ত। তবে মেয়েটি বিশ্বাস করেনি ছেলেটাকে। মৃত্যুর দুয়ারে ফেলে রেখে চলে গেছে। আচ্ছা নীলি যদি শুনে ওর জন্য তিয়ান সুইসাইড করেছে তাহলে কি হবে নীলির? তিয়ানের মতো তো নীলি ও ওকে ভালোবেসেছিলো। সামান্য একটু ভুল বোঝাবুঝিই তো হয়েছিলো। তাই বলে ছেলেটার এভাবে চলে যেতে হবে?
কোমলের চিৎকারে নিচের সকলে দৌড়ে উপরে আসে। তিয়ানের ঘরের সামনে এসে সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। জাহরা বেগম এক চিৎকারে লুটিয়ে পড়লো ফ্লোরে। মুহূর্তেই বিষাদের ছায়া ঘিরে ফেলে পুরো চৌধুরী প্যালেস।
#চলবে
( কেমন হয়েছে জানাতে ভুলবে না কিন্তু। রেসপন্স পেলে ভালো লাগে। )
হ্যাপি রিডিং 🫰