ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বর্ণ কোমল

২০তম পর্ব

লেখক: পরিণীতা আরান হৃৎ

#স্বর্ণকোমল

#পরিণীতা_আরা_হৃৎ

#পর্ব_২০

[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]

🕊️

খোদা চাইলে মৃত্যুর মুখ থেকেও তার অসহায় বান্দাকে বাঁচাতে পারে। তাঁর মোক্ষম প্রমাণ আমি সেদিন পেয়েছিলাম। যখন জ্যাক আমার সাথে নোংরা কাজ করতে এসেছিল তখন মনে মনে আমি ওই এক খোদার কাছেই তখন সাহায্য চেয়েছিলাম। “প্লীজ একবার এদের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দাও তুমি খোদা” এই একটাই কথা বার বার মনে মনে জপ করছিলাম। আর সেদিন খোদা আমাকর বাঁচিয়ে নিয়েছিলো। জ্যাক আমার সাথে খারাপ কিছু করার আগেই মিসির আংকেল আর আইলিন আন্টি সেখানে উপস্থিত হয়। যেহেতু দরজা বাহির থেকে লাগানো ছিলো তাই তাদের ভিতরে ঢুকতে কোনো কষ্ট হয়নি। আইলিন আন্টি বিছানার চাদরের সাহায্যে দ্রুত ঢেকে দেন আমাকে আর মিসির আংকেল সহ আরও কিচ্ছু লোক জ্যাককে ধরে পুলিশের হতে তুলে দেয়। আর আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এই ঘটনার কথা আমিই আন্টি আর আংকেলকে বলেছিলাম কাউকে যেনো না বলে কিছু। নাহলে আমি সুইসাইড করবো। তারাও রাজি হয়েছিলেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আজও পর্যন্ত সেই কথা কাউকে বলেনি। যেহেতু মা কিংবা নানা নানু বাড়িতে ছিলো না তাই কোনো অসুবিধাও হয়নি তেমন। তবে এই সকল বিষয়ের অন্যতম মাথা এলিসা আরামছে বাহিরে ঘুরছিলো। ওই ঘরে আমার সাথে শুধু জ্যাক থাকায় ওকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আর এলিসা বেঁচে এসব থেকে। তবে শাকচুন্নিটা নিজের খোলস ছেড়ে দিতে নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছিলো। তার পর থেকেই। এই কারণেই বর্তমানে আমার বন্ধুত্বের লিস্ট শূন্য।

সেই ঘটনার পর থেকে আমি বাহিরে খুব কম যেতাম। স্কুলে যেতাম না ঠিক মতো। এক কথায় যেতামই না।

একদিন আন্টি আমাকে ঠেলে ঠুলে স্কুলে পাঠালেন। বাহিরের হাওয়া গায়ে লাগলে ভালো লাগবে তাই। সেই ঘটনার সত্যতা প্রথম আমি স্কুলে গেলাম। আমিও রাজি হয়ে গেলাম স্কুলে যেতে। তবে কে জানতো সেই স্কুলে আমার সেদিনই শেষ দিন হবে?

চুপচাপ করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের ক্লাসের দিকে যাচ্ছিলাম। দৃষ্টি ছিলো নিচের দিকে। ক্লাশে প্রবেস করে নিজের জন্য বরাদ্দ করা ডেস্ক এ জিয়ে বস্তে যাবো তার আগেই ডেস্ক এ চোখ আটকে গেলো আমার। গলা রোধ হয় আসলো।

পুরো ডেস্ক জুরে শুধু দুটো কথাই লেখা ছিলো।

“Raped girl”

“Fatherless”

চোখ পানিতে টইটম্বুর হলো পানিতে। বুঝতে বাকি রইলো না আমার এতিম হওয়ার ব্যাপারে এলিসা সকলকে বলেছে। একমাত্র ও ছাড়া ক্লাসের আর কেউ জানতো না এই ব্যাপারে।

তবুও কাঁধের ব্যাগ টাকে নামিয়ে রাখলাম ডেস্কের উপরে। চুপচাপ বসলাম চেয়ারে। বসেই মনে হলো চেয়ারে চিটচিটে কিছু ছিলো যা আমার ড্রেসের স্কার্টটাকে পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে দেখলাম চেয়ারে লাল রং লেগে রয়েছে। এট দেখে চোখ থেকে অনবরত পানি নের হতে লাগলো আমার। কোনো মোট দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। সেখানে গিয়েই দেখি ওয়াশরুমের আয়নায় লিপস্টিক দিয়ে

“Fatherless”

লেখা। দ্রুত পানি দিয়ে হাতের সাহায্যে সেগুলো ডলে তুলতে লাগলাম। উঠেও গেলো লিপস্টিকের দাগ। টিস্যু আর পানির সাহায্যে কোনো মতে ড্রেস পরিষ্কার করে ক্লাসে ফেরত এলাম। আমার নিয়ত ছিলো ব্যাগ নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে ততক্ষনে ক্লাসে স্যার চলে আসায় আমার আর ছলে যাওয়া হলো না। ওই স্যারের ক্লাস করলাম কোনো রকম কষ্টে। ক্লাসের সব স্টুডেন্ট তখন চুপচাপ ক্লাস করছিলো। স্যার বেরিয়ে যেতেই সকলের আসল রূপ দেখিয়ে দিলো। আমি ব্যাগ নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে নিতেই এলিসা কিছু মেয়েদের সাথে করে আমার ডেস্কের কাছে এসে আমাকে আটকে দিলো।

“কোথায় যাচ্ছিস? ক্লাস করবি না?”

আমি কোনো মতে ঢোক গিলে বললাম,

“না।”

আমি আবার ওদের পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নিলেই এবার আমার হাত ধরে জোর করে আমাকে চেয়ারে বসিয়ে দিলো। একটা মেয়ে ক্লাসের দরজা ভিতর থেকে আটকে দিলো। এই ক্লাসটা গ্যাপ ছিলো। সেই সুযোগই ওরা ব্যাবহার করলো।

জোরপূর্বক আমার কাঁধ থেকে ব্যাগ টেনে নিয়ে ব্যাগ থেকে একটা একটা করে বই, নোট বুক সব কিছু বের করতে লাগলো। আমি আটকাতে গেলে আরেকটা মেয়ে পেছন থেকে আমাকে আটকে দিলো। আমার হাত পিছন দিকে নিয়ে মুচড়ে ধরলো। ব্যথায় কাকিয়ে উঠলাম আমি। মুখ থেকে অস্ফুট ব্যাথাতুর শব্দ বেরিয়ে এলো। তবুও ওরা আমাকে ছাড়লো না। আমার ব্যাগ উলটে সব কিছু ফেললো ডেস্কের উপরে। একটা একটা করে ছিঁড়তে লাগলো আমার শখের বই গুলো।

যতোই এক ঘেয়েমি থাকি না কেনো? পড়াশোনায় সবসময় আমার ইন্টেনশন থাকতো হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ছিলাম কিনা? সেই কারণেই সকলের হিংসে করতো আমাকে। পানির বোতল খুলে আমার মাথায় পানি ঢেলে দিলো। মাথায় অতিরিক্ত ঠান্ডা পানির উপস্থিতি টের পেয়েই বুঝলাম এটা সদ্য বরফ গলা পানি। আমার আবার ঠান্ডায় প্রবলেম ছিলো তখন। এখন অবশ্য নেই। ওদের কান্ড আমি সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেলাম। যেই আমির সাথে ওরা সামান্য একটু কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকতো আজ সেই ওরাই আমাকে কি পরিমান টর্চার করছে। শেষ পর্যন্ত না পেরে চিৎকার করে উঠলাম ওদের উপর।

“কি করছিস তোরা? প্লীজ আমাকে ছেড়ে দে। কথা দিচ্ছি আর এখানে আসবো না। প্লীজ ছেড়ে দে।”

“পুনরায় আসার অবস্থায় থাকবি তবেই না আসবি? তাকিয়ে দেখ ক্লাসের সকলকে। ওদের সকলের বাবা মা দুটোই আছে। আর তোর? বাব ছোটো থাকতেই কার এক্সিডেন্টে মারা যায়। আর মা তো থেকেও নেই। তোকে কেউ ভালোবাসে না। বুঝেছিস তুই?”

এলিসার কথায় আমি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলাম সত্যিই যদি আমার বাবা থাকতো তাহলে কি আমাকে এই পরিস্থিতিতে কোনোদিন পড়তে দিতেন তিনি?

ঠিক সেই মুহূর্তে গিয়ে আমার মনে পড়লো কিছুদিন আগের এক রাতের কথা। মা তখন বাড়িতে ছিলো না। নানা নানু ঘুমিয়ে পড়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। একা একা ভালো লাগছিল

না। তাই মায়ের ঘরে গিয়ে এটা সেটা হাতাহাতি করছিলাম তখনই মায়ের আলমারির ভিতরে একটা বেশ উড়নও ডায়েরি পেলাম। ডায়েরি টা হাতে নিয়েই বুঝতে পারলাম এটা মায়ের ডায়েরি করেন। বেশ কৌতূহল হতে লাগলো সেটা হাতে পেয়ে। সেই কৌতূহল থেকেই মায়ের ঘরেই বসে সেই ডায়েরি পড়তে বসলাম। ফ্লোরে খাটের সাথে হেলান দিয়ে পা ভাঁজ করে বসলাম।

তাশরীফ চৌধুরী পড়াশোনার খাতিরে জার্মানী এসেছেন তখন বেশিদিন হয়নি। একদিন এক দুপুরে হুট করেই মাঠের মধ্যে এক মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগে ওনার। মেয়েটি ছিলো সেখানের এক ধনী পরিবারের মেয়ে। এলিজা আরা ছিলেন বেশ তুখোড় আর বুদ্ধিমতী মেয়ে। রূপ ছিলো তার যেনো এক টুকরো চাঁদের আলো। সেই ভিনদেশে এক ভিনদেশীর রূপের মোহে আটকে যায় তাশরীফ চৌধুরী। আর বেরোতে পারেনি সেই মোহ থেকে। এক সময় একে অপরকে ভালোবেসে ফেলে তারা। তবে এলিজার বাবা মা সেই বাংলাদেশি ছেলেকে মেনে নেয়নি। তাই ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে বাড়ি ছাড়লেন এলিজা আরা। সেই সাথে ছাড়লেন নিজের জন্মভুমি, নিজের দেশ।

দেশে এসে বিয়ে করে তাশরীফ চৌধুরী আর এলিজা। তাশরীফ চৌধুরীর বাড়ি থেকেও তেমন একটা ভালো ব্যবহার কখনো পায়নি এলিজা। তবুও ভালোবাসার মানুষটির কথা ভেবে চুপচাপ থেকেছে সবসময়। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে যাবে ভেবে কিছুই বলেনি কখনও।

যেদিন কোমল হলো সেদিন যেনো এলিজার চৌধুরী বাড়িতে সকল দুঃখ ফুরোলো। নাতনির রূপ দেখে শমসের চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী খুশি হয়ে গেলেন। বাড়ির সকলের চোখের মণি হয়ে উঠলো কোমল। সেই সাথে একজনের চরম আসক্তিতে পরিণত হতে লাগলো। এলিজা এসব বুঝতে পেরেছেন যেদিন সেদিন দেরি হয়ে গেছে তার বোঝার।

একদিন বাড়ির বাকি বাচ্চাদের সাথে হাইড এন্ড সিক খেলার সময় কিয়ান আর কোমল কিয়ানের ঘরে লুকালো। কোমল তখন কিয়ানের চরম আসক্তিতে রূপ নিয়েছিলো। সেখানে একা কোমলকে পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারেনি ও। কোমলের নরম গালে কামড়ে ধরেছিলো সেদিন। কিয়ানের এহেন কাণ্ডে চিৎকার করে কেঁদে উঠে কোমল। মুহূর্তেই বাড়িতে হইচই শুরু হয়ে যায়। এলিজা তো রেগে মেগে ফায়ার। তার মধ্যে কিয়ান করে বসে আরেক কান্ড। কোমলকে বিয়ে করবে বলে জেদ ধরে তখনই।

রাগে দিশা হরিয়ে এলিজা তৎক্ষণাৎ রাতেই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। নিজের স্ত্রী আর একমাত্র মেয়েকে আটকাতে তাদের পিছনে গাড়ি নিয়ে ছোটেন তাশরীফ চৌধুরী। তবে রাস্তায় ঘটে জয় বিরাট এক দুর্ঘটনা। সেই এক্সিডেন্টে কোমল আর এলিজার কিছু হয়নি। মরতে মরতে বেঁচে যায় তারা। তবে তাশরীফ চৌধুরী প্রাণ হারান সেখানেই।

#চলবে

[ ভেবেছিলাম আজকের পর্বে অতীতের কাহিনী শেষ করে দিবো। টবে সেটা হলোনা। তবে ইনশাআল্লাহ্ আগামী পর্বে অতীতের কাহিনী শেষ করে দিবো। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন