#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৩
[ বিনা অনুমতিতে কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
এলিজা আরা দেশে ফিরে মেয়েকে খুঁজে চলেছে। তবে এখনো পর্যন্ত খুঁজে পায়নি তার মেয়েকে। শুধুমাত্র পুলিশকে জানানো বাকি রেখেছে বোধহয়। কারী কারী টাকা খরচ করে বিভিন্ন অলিগলিতে মেয়েকে খুঁজে চলেছে তিনি। কিয়ানের ফ্ল্যাটের অ্যাড্রেস তিনি জানে না। চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি। কিয়ানের নাম্বারে অনেক বার কল করার চেষ্টা করেছে তবে প্রতিবারই সিম অফ দেখাচ্ছে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে মেয়েটার জন্য তার। কোথায় নিয়ে গেলো মেয়েটাকে কিয়ান?
একবার মাত্র কোমলকে নিয়ে ফ্ল্যাটের বাহিরে গিয়েছে কিয়ান। তাও মাঝরাতে। মূলত ওকেই কেউ দেখেনি তাহলে আর কোমলকে কিভাবে দেখবে?
_
হাসপাতালের চারপাশে ভুরভুর করছে কড়া জীবানুনাশকের বিদঘুটে ঘ্রাণ। তবুও সেই ঘ্রাণের নিচে যেনো কিছুতেই চাপা পড়ে না মেডিসিনের ঘ্রাণ। প্রাইভেট হাসপাতাল হওয়ায় তেমন একটা ভিড় নেই। তবুও যারা রয়েছেন কিছু মানুষ মস্ক পরেও ঘ্রাণ ঠেকে বাঁচতে চাইছেন।
একটা গাইনী ডাক্তারের চেম্বারের সামনে রাফা বেগম রাইসার হাত চেপে ধরে বসে আছেন। রাইসার অবস্থা বেহাল। একে তো অসুস্থ তার উপর এই শরীরেই কতটা সময় দৌড় ঝাঁপ করে বেরিয়েছে। শরীর ভেঙে এসেছে পুরো। তবুও পথ খুজে বেরোচ্ছে কিভাবে এখান থেকে পালাতে পারে।
একটু বাদে একজন ওয়ার্ড বয় এসে বললেন,
“মিস. রাফা তালুকদার কে আছেন?”
“জ্বি আমি।”
“আপনাদের সিরিয়াল এসে গেছে ভিতরে আসুন।”
রাইসার বুকটা ধক করে উঠলো। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত ও নিজের বাচ্চাটিকে বাঁচাতে পারবে না? চোখে এসে ভিড় করলো সহস্র জলের কনারা। ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটি।
“মা প্লীজ? একবার আমার কথাটা শোনো মন দিয়ে। প্লীজ এমনটা করো না….”
তবে কি শুনে কার কথা? রাফা বেগম ওর কথার কোনো তোয়াক্কা করলেন না। একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেন ওকে ভিতরে।
ভিতরে এসে ওকে একটা বেডে দুজন নার্স মিলে জোর করে শুয়ে দিলো। হাত বেঁধে দিলো বেডের সাথে। যাতে বাধা দিতে না পারে।
ডক্টর রিশা রাফা বেগমের একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তাঁকে সবকিছু খুলে বলে রাফা বেগম। তিনি নিজ বান্ধবীকে আশ্বাস দেন সব কিছু সামলে নিবেন।
ডক্টর রিশা একটা স্টিলের স্ট্রেলারে সব কিছু দেখে নিচ্ছিলেন ঠিক রয়েছে কি না। ইমন সময় একটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো কেবিনে। সকলে চকিতে তাকালো সেদিকে।
রাফা বেগম অবাক হলেন এই ছেলেকে এখানে দেখে। বড্ড চেনা চেনা লাগলো ছেলেটার মুখ তার কাছে। তবে ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারলেন না কোথায় দেখেছে। তাই সহসা প্রশ্ন করে উঠলো,
“এই ছেলে কি তুমি? আর এখানে বিনা পারমিশন নিয়ে কেনো ঢুকেছো?”
তবে তূর্য কোনো কথার উত্তর দিলো না। কেবিনে কোনো ছেলে না থাকায় সুবিধাই হলো ওর। একটা সার্জিক্যাল নাইফ হাতে তুলে নিয়ে সকলকে দূরে সরিয়ে দিলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো রাইসার দিকে। ছেলেটাকে হাতে ছুরি নিয়ে এভাবে আক্রমণাত্মক হতে দেখে ডক্টর রিশা সাথে নার্স দুটোও ভয়ে পিছিয়ে গেলো।
তূর্য রাইসার হাতের বাধন খুলে ওকে বেড থেকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। রাইসাও যেন প্রাণ খুঁজে পেলো এতক্ষণে। তূর্য ওদের দিকে ছুরি তুলে ধরে শাসিয়ে বলল,
“সাহস কি করে হলো আপনাদের আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলতে চাইছেন? একদম খুন করে ফেলবো সবাইকে। এই বাচ্চার বাবা আমি তূর্য সিকদার। আমার অনুমতি ছাড়া আপনারা আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলতে চাইছেন?”
তূর্য নামটা শুনে রাফা বেগমের যেনো টনক নড়লো। এই ছেলেকে তো উনি চিনে। এলিজার সাথে দেখেছেন। তবে এই ছেলে ওনার মেয়েকে কেনো এভাবে ধরে রেখেছে? তাহলে কি সত্যি সত্যি…?
“তুমি আমার মেয়েকে এভাবে ধরে রেখেছো কেনো? ছাড়ো বলছি।”
“আমার বাচ্চাকে কিছুতেই মেরে ফেলতে দেবো না আমি। আর মেয়ে দাবি করছেন কোন মুখে? নিজের মেয়ের বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে চাইছেন। একবারও আত্মা কাপলো না আপনার?”
রাফা বেগম ভ্রু কুচকে তাকালেন তূর্যের দিকে।
“এটা তোমার বাচ্চা?”
“হ্যাঁ। আমার বাচ্চা। আমার রক্ত ও। আমাদের দুজনের সন্তান।”
রাইসা সন্তুষ্টি চোখে তাকালো তূর্যের। ক্রোধান্বিত মুখের দিকে। খোদার নিকট ওর এতদিনের চাওয়া পাওয়া তাহলে বিফলে যায়নি। ও ঠিক জানতো তূর্য নিজের ভুল বুঝে একদিন ফিরে আসবে। ঠিক এভাবেই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরবে। রাইসার হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো আরো। তা টের পেয়ে তূর্য নিজেও ওর হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করলো।
“কিন্তু এই বাচ্চা তো অবৈধ।”
“মুখ সামলে কথা বলুন। আপনি রাইসার মা না হলে এতক্ষনে আপনার গায়ে হাত তুলতে দুবার ভাবতাম না আমি। অবৈধ কাকে বলছেন আপনি। ইসলামিক নিয়ম নিতী মেনে বিয়ে হয়েছে আমার আর রাইসার। আমাদের সন্তান অবৈধ নয়। আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী এই সন্তান।”
“কি প্রমাণ রয়েছে তোমরা বিবাহিত?”
“আছে। অবশ্যই রয়েছে প্রমাণ। আমাদের বিয়ের কাবিন নামা এখনো আমার কাছে রয়েছে।”
সামান্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো বোধহয় রাফা বেগম। ঠিক ঠাওর করতে পারলো না তূর্য। রাফা বেগম আবার বললেন,
“তোমাদের এই বিয়ের কথা তো আর কেউ জানে না তোমরা দুজন ছাড়া। তোমার বাড়ির লোক যদি এই বিয়ে না মেনে নেয়।”
“সংসার করবো আমি আমার পরিবারের মানা না মানাতে কি আসে যায়?”
কলের পুতুলের মতোই রাফা বেগমের একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে তূর্য। এই পর্যায়ে এসে উচ্চস্বরে হেঁসে উঠলেন রাফা বেগম। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে হাসলো রাইসা, ডক্টর রিশা আর নার্স দুটোও। তূর্য ভ্রু কুঁচকে তাকালো ওদের দিকে। রাইসাকে নিজের থেকে কিছুটা আলগা করে বলল,
“হাসছো কেনো?”
“মা আগে থেকেই সব জানে। এসব কিছু তোমাকে ফেরত আনার জন্য প্ল্যান করেছিলো মা নিজেই।”
রাইসার এহেন কথায় মাথায় যেনো বাজ পড়লো তূর্যের। এতো বড় মাস্টারমাইন্ড ওর শ্বাশুড়িটা? ওকে দেশে আনার জন্য এভাবে ধোঁকা দিলো? হাতের ছুরি সশব্দে আছড়ে পড়লো ফ্লোরে। এভাবে। বউ শাশুড়ির পাল্লায় পরে সেই সুদূর জার্মানী থেকে ছুটে এসেছে ও ভাবতেই মাথা চক্কর কাটতে লাগলো ওর। ধারাম করে উল্টে পড়লো ফ্লোরে। সকলে মিলে ধরলো ওকে। চোখ বন্ধ হওয়ার পূর্বে ফিসফিস করে বলল,
“বাটপার বউয়ের সাথে বাটপার শাশুড়ি ফ্রি।”
_
কোমলকে নিয়ে একটু বাহিরে ঘুরতে বেরিয়েছে কিয়ান। রাতের শহর বড্ড পছন্দ ওদের দুজনেরই। হাতে হাত রেখে ফাঁকা নির্জন রাস্তায় হেঁটে চলেছে দুই কপোত কপোতী। হাঁটতে হাঁটতে একটা জলাশয়ের ধার এসে পৌঁছাল ওরা দুজন।
জলাশয়ের ঘটে পানিতে পা ভিজিয়ে পাশাপাশি বসলো। কিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে নিলো কোমল।
নিঃশব্দে বসে রইলো একে অপরের পাশে। কিয়ান এক হাতে জরিয়ে ধরলো কোমলকে। দৃষ্টি তার জলাশয়ের দিকে।
ক্ষণকাল কেটে গেলো নিঃশব্দটায়। কোমল কিয়ানের কাঁধে মাথা রাখা অবস্থাতেই বলল,
“ডক্টর বলেছে আমি মানসিক রোগী তাই না?”
কিয়ান চুপচাপ রইলো। কোনো শব্দ বের করলো না মুখ দিয়ে। কোমল আবার বলল,
“তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?”
এই প্রশ্নে খানিক চমকালো কিয়ান। আদও কি কোনোদিন কোমলকে ছাড়তে পারবে ও?
“যার দূরত্বে নিশ্বাস আটকে আসে তাঁকে কি ছেড়ে দেয়া সম্ভব?”
“আমার মস্তিষ্ক যে আমার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। আমার সাথে থাকা তোমার জন্য ক্ষতিকর।”
“তোমার মস্তিষ্ক তোমার নিয়ন্ত্রণে একদিন ঠিক চলে আসবে। না আসলেও সমস্যা নেই। এই পাগল তুমিটাকে নিয়েই আজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো আমি। শুনছো তুমি? অসুস্থ মস্তিষ্কের এই তুমিটাকেই আমি কিয়ান জেনে শুনে নিজ হৃদয়ে জায়গা দিয়েছি। তুমি সুস্থ হও বা মানসিক রোগী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হৃদয়ের সেই স্থানে তুমি নামক পাগলটাকে যত্নে রাখবো আমি।”
#চলবে
[ ঈদ মোবারক সকলকে 🤍
অনেক কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও গল্প দিলাম। ভোর সকালে বরিশাল এসে পৌঁছেছি। এসে যেই ঘুম দিছি এক ঘুমে দুপুর। তারপর থেকেই শুরু ঝড় বৃষ্টি। আর সামান্য একটা বাতাসেই কারেন্ট ফুস। ফোনেও চার্জ ছিলো না কালকে সারারাত গাড়িতে থাকার কারণে।
সকলে ভালো রেসপন্স করবে প্লিজ। ]