#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২২
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
রাফা বেগম ভিড় ঠেলে সামনে অগ্রসর হলেন। দেখলেন একটা মেয়ে রাস্তায় বসে হাত পা ডলে চলেছে। গাড়িতে ধাক্কা লাগতে লাগতে বেঁচে গিয়েছে মেয়েটা।
রাফা বেগমের বুক থেকে এতক্ষণ গেড়ে বসা পাথরটা নেমে গেলেন। মেয়েটি রাইসা নয়। ভয়ে পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। মুখ গোল করে ফোস করে ছাড়লেন নিঃশ্বাস। তবে মুহূর্তেই রাগটা যেনো ওনার চিরবিরিয়ে মাথায় উঠে গেলেন। এই বেহায়া নির্লজ্জ মেয়েকে তিনি হাতের কাছে পেলে আস্তো রাখবে না । বাচ্চাটাকে মেরেই ছাড়বে বলে নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করলেন। তবে রাইসা গেলো কোথায়। এতো তাড়াতাড়ি তো বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয় ওর একার পক্ষে কখনো। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালেন রাফা বেগম। চোখ দুটো রাইসাকে খুঁজে চলেছে অনবরত।
ভিড় থেকে বেরিয়ে দেখলেন ওনার দুই চেলা মোজাম্মেল আর হাসান নেই কোথাও। হুট করে এই দুই বলদ আবার কোথায় উধাও হলো? কোন কপালে যে এদের তিনি কাজে রেখেছিলেন বুঝতে পারছে না।
অন্যদিকে,
রাইসা একটা চিপা গলির মুখে ভাঙ্গা খুপরির মতো দোকানের সামনে পাতা টেবিলের নিচে লুকিয়ে রয়েছে। একটু আগে ও ভিড়ের ওদিকটা দিয়েই যাচ্ছিলো তখনি মোজাম্মেল কাকা আর হাসান কাকা দেখে নেয় ওকে। আর ও প্রাণপণে ছুটে এদিকে এসে লুকিয়ে পরে। তবে কতক্ষন এভাবে লুকিয়ে থাকতে পারবে সেটা জানা নেই ওর।
মোজাম্মেল আর হাসান দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে। দোকানের দিকটায় এসে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালেন দুজনে। এদিক সেদিক চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন আশেপাশে। এইটুকু মেয়ে ওনাদের কিভাবে ঘোল খাইয়ে পালিয়ে যেতে পারে মূলত সেটাই ভাবছে ওনারা দুজন। এতো তাড়াতাড়ি কোথাও যাওয়া সম্ভব নয় সেটা দুজনেই জানে। এখানেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে সেটা ওরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। এখন আগে রাফা বেগমকে জানানো দরকার ব্যাপারটা।
মোজাম্মেল কাকা নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে কল লাগলেন রাফা বেগমের নাম্বারে। রাফা বেগম গাড়ির সামনে দাড়িয়ে রয়েছে। আর এদিক সেদিক লোকজনকে রাইসার ছবি দেখিয়ে ওকে দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করছে। তবে রাস্তায় অবস্থান করা লোকজনের কি আর এতো খেয়াল রাখার সময় আছে যে দেখবে।
এমন সময় ওনার পার্স ব্যাগে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন বের করে দেখে মোজাম্মেল কাকা ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করে কানে লাগিয়ে মোজাম্মেল কাকাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি ধমক মারা শুরু করলেন।
“কোথাও তোমরা? অকমার ঢেকি কোথাকার। কাজ ফেলে রেখে কোন গলিতে গিয়ে বসে রয়েছো?”
“ম্যাম আমরা যে গলিতে রয়েছি আপনি কি করে জানলেন? আপনিও কি এখানে রয়েছেন ম্যাম?”
“হোয়াট? তোমরা গলিতে কি করছো?”
মোজাম্মেল কাকা আর একটাও উল্টা পাল্টা কথা যেনো না বলে তাই হাসান কাকা ওনার হাত থেকে ফোন নিয়ে বললেন,
“ম্যাম আমরা পাশেই একটা গলির মুখে দাড়িয়ে রয়েছি। রাইসা মামুনিকে দেখলাম আমাদের দেখে এদিকে দৌড়ে এসেছেন তিনি।”
“কোথায় তোমরা এখন? লোকেশন পাঠাও আমাকে আমি এক্ষুনি আসছি।”
“জি ম্যাম পাঠাচ্ছি।”
রাফা বেগমকে লোকেশন পাঠিয়ে ওরা এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো। আর রাইসা ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে।
রাইসার হাতে একটা ছোট বাটন ফোন। এই ফোনটাও ওর। তবে ওর মা জানতো না যে ওর কাছে একটা এক্সট্রা ফোন রয়েছে। তাই ওর টাচ ফোন নিয়ে গেলেও এটা রয়ে গিয়েছিলো ওর কাছে।
এটা দিয়ে অনবরত রাতুলকে কল দিয়ে চলেছে ও। তবে রাতুল ওর ফোন রিসিভ করছে না। হয়তো অচেনা নাম্বার দেখে রিসিভ করছে না। তাই বার বার দিতে লাগলো। রাতুল ফোন রিসিভ করছে না দেখে উপায় না পেয়ে আবার তূর্যের বাংলাদেশি নাম্বারে ফোন লাগালো ও। জানে বন্ধ পাবে তবুও যদি শেষ রক্ষা হয় ভেবে ফোন দিলো। তবে এবারও প্রত্যেকবারের মতো ফোনটা বন্ধ বলতে লাগলো। তবুও একটু খানি আলোর আশায় ফোন দিতে লাগলো অনবরত। তবে অদ্ভুত ভাবে চারবারের মাথায় কল ঢুকলো তূর্যের নাম্বারে। তবে কল রিসিভ হওয়ার পূর্বেই ওর হাতে জোরালো টান খেলো। রাফা বেগম টেনে বের করলেন ওকে টেবিলের অপর পাশ থেকে। ঠাস করে বাম গালে লাগিয়ে দিলেন এক জোরালো থাপ্পড়। অতঃপর ডান গালে আরও একটা।
“আজ আগে তোর এই জারজ সন্তান। টাকে মারবো তারপর তোর ব্যবস্থা করছি আমি।”
“প্লীজ মা বিশ্বাস করো ও জারজ না। ওর বাবা আছে। বিশ্বাস করো মা তোমাদের না বলে আমি বিয়ে করেছি। ওর বাবা….”
“চুপ! আর একটা মিথ্যে কথা বললে তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়বো বেয়াদব। লোক জানাজানি হওয়ার আগেই এই অপয়া বাচ্চাটাকে শেষ করতে হবে।”
রাইসা বলতে চাইলো বাচ্চার বাবার নাম। তবে রাফা বেগম যেন রাগে হুশ হারিয়েছেন। ওকে ধমক দিয়ে জোর করে টেনে নিয়ে তুললেন গাড়িতে।
“হাসান কাকা? গাড়ি সিটি হাসপাতালের দিকে নিয়ে চলুন।”
মাকে হাজার বারণ করা সত্ত্বেও কথা শুনাতে পারলো না রাইসা। অনবরত কেঁদে চলেছে মেয়েটা। নিজের প্রথম বাচ্চাটাকে কিভাবে মেরে ফেলবে ও?
_
মাত্রই এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে নিজের সিমটা চালু করেছিলো তূর্য। তখনই একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এলো ওর। ধরতে যাবে তার আগেই আবার কেটে গেলো। ভাবলো যার দরকার সে নিজেই ওকে আবার ফোন দিবে। এই ভেবে ফোনটা পকেটে নিতে যাবে তার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত সময় একটা কাঙ্ক্ষিত একটা নাম্বার থেকে কল এলো। ও দ্রুত হাতে রিসিভ করলো কলটা। ফোন কানে নিতেই ওপর পাশের ব্যক্তিটি হড়বড় করে বলতে শুরু করলো,
“স্যার! সেই কখন থেকে আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করছি। জার্মানির নাম্বার বন্ধ থাকায় আপনার এক বন্ধুর কাছে কল দিলাম তিনি বললেন আপনি নাকি বাংলাদেশের ফ্লাইটে উঠে পড়েছেন। তাই সেই কখন থেকে আবার ফোন দিলাম বাংলাদেশি নাম্বারে।”
“আরে আরে আস্তে কথা বলো। আর হয়েছে কি? তোমাকে তো বলেছিলাম রাইসার উপর সবসময় নজর রাখবে তাহলে আবার এখন আমাকে কেন ফোন দিচ্ছো?”
“সেই জন্যই তো আপনাকে কল করা স্যার। আপনাকে তো বলেছিলাম রাইসা ম্যাডাম প্রেগনেন্ট। আর সেই খবর এখন তার মা জেনে গিয়েছে। রাইসা ম্যাডামকে তার মা জোর করে ধরে সিটি হাসপাতালের দিকে নিয়ে গেছেন। আমি এখন হাসপাতালের দিকেই যাচ্ছি।”
মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ল তূর্যের। ও দ্রুত কল কেটে এক প্রকার দৌঁড়ে বের হলো এয়ারপোর্ট থেকে। গাড়ি আগে থেকেই রিজার্ভ করা ছিলো যার কারণে কোনো সমস্যা হলো না ওর। গাড়ির ড্রাইভারকে বলে সিটি হাসপাতালের দিকে ছুটলো দ্রুত।
_
সন্ধ্যার আকাশে আস্তে আস্তে আলো গিলে নিচ্ছে। ফিকে হয়ে আসছে চারপাশের আলো। জ্বলে উঠছে বিভিন্ন কৃত্রিম আলোর উৎস। বিল্ডিংয়ের চূড়ায় বিলবোর্ডের গোটা গোটা অক্ষরের লেখা গুলোতে রং বেরঙের বাতি জ্বলে উঠেছে।
প্রায় সারারাত কিরণ আর কোমল হাসপাতালে ছিলো। ভোরের দিকে ফিরেছে বাড়িতে। কোমলকে একটা ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পেরিয়েছে। নিজেও ঘুমিয়েছে ওর সাথে। একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে খাবার বানাতে কিচেনে চলে গিয়েছে কিয়ান। গত রাতে যা বানিয়েছিলো সব ফেলে দিয়েছে। এখন আবার নতুন করে খাবার বানিয়েছে। রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে ফ্রিজ থেকে চিংড়ি মাছ আর গরুর কলিজা বের করে নিলো।
দক্ষ হাতে রান্না শেষ করে আবার বেড রুমে চলে গেলো। কোমল এখনো ওঠেনি। হয়তো ইনজেকশনের প্রভাবে। মাথার কাছে বসে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো কোমলের মাথায়। কষ্টে বুকটা ফেঁটে যায় ওর এটা ভাবলেই যে ওর সামান্য একটা ভুলের কারণে কত কিছু সাফার করতে হয়েছে কোমলকে। ইভেন এখনো করে চলেছে। চোখে পানি চিক চিক করছে। ঢোক গিলে কান্না আটকালো কিয়ান। কোমলের কনের কাছে ঝুঁকে ওর কানে ফু দিতে লাগলো। একবার, দুইবার, তিনবার দিয়েই চললো।
কানে সুড়সুড়ি অনুভব হতেই নড়েচড়ে উঠলো কোমল। ঘুমটা হালকা হয়েছে বোধহয়। তবুও চোখ মেলে তাকালো না। কিয়ান এবার নরম সুরে ওর কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁই ছুঁই করে ডাকলো ওকে,
“স্বর্ণ?”
নড়চড় না দেখে আবারও ডেকে উঠলো,
“স্বর্ণকোমল? ওঠো জান আমার।”
এমন আদুরে ডাকে ঘুম কিছুটা আলগা হলো কোমলের। পিট পিট করে তাকিয়ে দেখলো কিয়ান ওর দিকেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। মৃদু হেঁসে গলা জড়িয়ে ধরলো কিয়ানের।
“আর একটু ঘুমাই প্লিজ। অনেক ঘুম পাচ্ছে।”
কিয়ান বুঝলো হয়তো মেডিসিনের প্রভাবে এখনো ঘুম যায়নি। কথাও কেমন নেশালো শোনালো। এমন আদুরে নেশালো স্বরে কিয়ানের নিজেরও ঘোর লেগে যায়। তবে ওকে এখন ঘোরে থাকলে চলবে না। কোমল এখনো মেন্টালি সিক। সেটা বুঝে চলতে হবে ওকে। তাই কোমলকে দু হাতে কোলে তুলে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলো।
#চলবে