#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_৩২
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
কিয়ান আর ঘরে বসে রয়েছে। নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ঘর। চারপাশে কেমন ফাঁকা ফাঁকা। কোনো শব্দ নেই। কোনো আলো নেই। চুপচুপ খাটের সাথে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছে।
এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করে কানে ধরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“তোমার সাথে আমি অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি ফোন তুলছিলে না।”
“হ্যাঁ আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম আর কি। আর অপরিচিত ফোন নাম্বার বিধায় একটু ইগনোর করেছি। কিন্তু তোমার মেসেজ দেখে সাথে সাথেই কল ব্যাক করলাম।”
“আমার একটু সাহায্যের প্রয়োজন।”
“আগে বলো তোমার জ্ঞান ফিরলো কবে?”
“এই চার দিন হলো মাত্র।”
“খবর জানো নিশ্চই সব?”
“হ্যাঁ। এই ব্যাপারেই কথা বলার ছিলো।”
কিয়ানের মনে হলো ওপাশের ব্যক্তির কন্ঠস্বর কাপছে। তবুও ও জিজ্ঞেস করলো না একবার।
“আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভাই হিসেবে আমি ব্যর্থ।”
“এখন আমার অন্য হেল্প চাই এই ব্যাপারেই।”
“তুমি পারবে ওকে ওখান থেকে বের করতে?”
“আমাকে পারতেই হবে।”
“ওকে বের করতে তোমার যতদূর যা সাহায্য দরকার আমি করবো। তুমি শুধু বলো।”
“খুব বেশি সাহায্যের দরকার নেই।
_
কিচেনে মা ছেলে একসাথে কোমর বেঁধে রান্না করছে। তবে কিয়ান একা হাতেই নিজের স্বর্ণের জন্য রান্না করতে চাইছে। জাহরা চৌধুরী তো শুধু একটু সাহায্য করার নাম করে ওকে এটা সেটা রান্না সাহায্য করছে।
কোমলের পছন্দের চিকেন বিরিয়ানি রান্না করছে কিয়ান। সাথে ভেজিটেবল সালাদ। প্যানে মাংস ভেজে নিতে নিতে কিয়ান মায়ের দিকে এক পলক ফিরে তাঁকালো। চুলার আঁচ কমিয়ে মায়ের দিকে ফিরে মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছুক্ষন শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। কিয়ানের চোখে চোখ পড়তেই জাহরা চৌধুরীর বুকটা কেঁপে উঠলো। কিয়ানের চোখ দুটো পানিতে চিকচিক করছে। তিনি স্নেহ ভরা দৃষ্টিতে ছেলেকে সুধালেন,
“কাঁদছিস কেনো বাবা?”
কিয়ান ভেজা কন্ঠে বলল,
“মা তুমি কি চাও যে আমি ভালো থাকি?”
“হ্যাঁ বাবা। সব বাবা মাই চায় তার বাচ্চার ভালো থাকুক।”
“তাহলে আমার কথা মনে দিয়ে শোনো।”
জাহরা চৌধুরী উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে।
“মা অনেক তো দূরে থাকলে আমার থেকে। তবে প্রতিবার দূরত্বের পরে আবার আমাদের দেখা হয়েছে। কিন্তু কালকে আমি আমার স্বর্ণকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো মা। জানিনা কোথায় যাবো তবে আমার ভালো থাকতে হলে স্বর্ণকে নিয়ে পালাতে হবে মা।”
জাহরা চৌধুরী কেঁদে দিলেন ছেলের কথায়। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
“এটা তুই কি বলছিস বাবা? তোকে ছাড়া যে আমি আমরা কেউ ভালো থাকবো না।”
“আমারও ভালো থাকার এক মাত্র পন্থা আমার স্বর্ণ মা।”
_
জাহরা চৌধুরী কিছুতেই কিছু মানতে চাইছিলেন না প্রথমে। কিয়ান অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে মানালো তাকে। চুলায় রান্না প্রায় শেষ হয়ে আসছে। চারপাশে রান্নার ঘ্রাণ ভু ভু করছে। কিয়ানের হাতের রান্না দরুন। সেটা যে কেউ ওর রান্না করা খাবারের ঘ্রাণ শুকেই বলে দিতে পারবে।
জাহরা চৌধুরী মেনে নিয়েছেন। ছেলেকে সুস্থ সবল রাখাই এখন তার প্রকৃত মাতৃধর্ম। তিনি কিয়ানকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“তুই কি ভেবে রেখেছিস বাবা।”
“কালকে ওকে নিয়ে কোর্টে পৌঁছানোর পূর্বেই সময়ই যা করার করতে হবে। একবার ওকে কোর্টে তুলে ফেললে আমাদের হাতে আর কিছু থাকবে না।”
“তো কি করবি বলে ভেবে রেখেছি?”
“যা করার সেটা রাস্তায়ই করতে হবে। ওকে নিয়ে যাওয়ার সময়। তবে সেটা তোমাকে আমি বলতে চাচ্ছি না। পাছে তুমি আবার ভয় পেয়ে যাও।”
শেষ কথাটা মজা করে বলল কিয়ান। জাহরা চৌধুরী কিয়ানের হেঁয়ালি করে বলা শেষ কথাটা ঠিক ধরতে পারলো।
“উফফ বলবি কি ভেবে রেখেছিস?”
“পালাবো মা। কালকে রাস্তায় ওকে যারা নিয়ে যাবে তাদের বেঁধে রেখে কোমলকে নিয়ে পালিয়ে যাবো।”
“কোমল তো এখন ভারসাম্যহীন। তোর সাথে যাবে ও?”
“কোমল একদম ঠিক আছে মা। ওর চিকিৎসা হয়েছে এতোদিন কারাগারে থেকে। তূর্য নিজ দায়িত্বে সেটা করিয়েছে। তবে আইনের শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে এই পাগলের অভিনয় করতে হয়েছে ওকে। নাহলে এতদিনে ওর মরদেহের হাড়ও খুজে পাওয়া যেতো না।”
জাহরা বেগম বিষ্ময় নিয়ে বলল,
“সেকি! এই কাজ কে করলো। এটা তো কোমলের মাথার বুদ্ধি নয়।”
“তূর্য করেছে সব। কোমলকে ও নিজের বোনের মতো ভালোবাসে। কোমলের করা অপরাধের সঙ্গী হয়ে এখন ও অনুতপ্ত। তবে ছেলেটা সত্যি খুব ভালো।”
“হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।”
_
জাহরা বেগম আর কিয়ান আজকে এক সাথে ভিতরে প্রবেশ করেছে কোমলের সাথে দেখা করতে। উহু! পুলিশ এমনি এমনি দুজনকে একসাথে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি। মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে ভিতরে যেতে হয়েছে।
আজকে কোমল আর কোনো পাগলামি করেনি। জেলাররা অনেক অবাক হয়েছে কোমলের এই হঠাৎ পরিবর্তনে। শুধু স্বামীকে দেখেই একটা মানুষ কিভাবে সুস্থ হয়ে যায়? এ বড়ই বিস্ময় মূলক ঘটনা।
জাহরা বেগম খাবার বের করে দুজনকে একসাথে খাইয়ে দিলো। এই খাবার নিয়ে ভিতরে ঢোকার জন্যও দিতে হয়েছে মোটা অংকের টাকা। দেশ গিয়েছে রসাতলে। উপরে উপরে ভালো মানুষীর মুখোশ পরা বড় বড় রাঘব গোয়ালরাও টাকার কাছে মাথা নত করে।
খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে জাহরা চৌধুরী কোমলকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন হয়েছে?”
কোমল মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ভালো।”
পাশ থেকে কিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“শুধু ভালো?”
কোমল থতমত খেয়ে গেলো কিয়ানের এরূপ কথায়। জাহরা চৌধুরী মিষ্টি হেঁসে বলল,
“কিয়ান রান্না করেছে।”
কোমল প্রফুল্ল চিত্তে হেঁসে কিয়ানের এক বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
“অনেক ভালো হয়েছে। অনেক মনে অনেক। আমার খাওয়া বেস্ট বিরিয়ানি।”
কিয়ান আর কিছু বলবে একজন কনস্টেবল কক্ষে ঢুকে বলল,
“আপনাদের সময় শেষ। এখন বেরোতে হবে।”
কিয়ান কোমল একে অপরের দিকে তাকালো।এই ফাঁকে কিয়ান লুকিয়ে কোমলের হাতে একটা ছোট কাগজের টুকরো গুঁজে দিয়ে দিলো। বেরিয়ে গেলো দুজন জেলখানার কক্ষ থেকে।
কিয়ানরা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষন পর কোমল ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। একমাত্র এটাই একটা জায়গা যেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তখন কিয়ানরা যখন এসেছিলো ঘুষ খাওয়া অফিসারেরা তখন ক্যামেরা অফ করে রেখেছিলো। যার কারণে কিয়ানের কোমলকে চিঠি দেয়ার সিনের কোনো প্রমাণ বা সাক্ষী নেই।
কোমল হাতের চিঠিটা খুলে পরতে লাগলো একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। তবে লেখা কমই। কিভাবে কি করবে ওরা সেগুলোই শুধু লিখলো চিঠিতে।
দুইবার পরে নিয়ে চিঠিটা হাত দিয়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে কমোডের মধ্যে ফেলে ভালো মতো ফ্লাস করে নিলো। আর কোনো চিহ্ন রইলো না চিঠির।
_
কিয়ান ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি অদূরে স্থাপিত রূপোলী খুন্ডের দিকে। অত্যধিক সুন্দর সেই চাঁদের অর্ধেকাংশ।
আজকের রাত ওর জীবনের নিজের পরিবারের সাথে থাকা শেষ রাত। জীবনের এই টানাপোড়নে পড়তে হবে সেটা ওর ভাবনাতীত ছিলো। এমন সময় ওর ভাবনার মাঝে টের পেলো পিঠে করো হাতের ছোয়া। তাকিয়ে দেখলো নিজের মাকে। ঠোঁট সামান্য কেঁপে উঠলো ওর। মাকে নিয়ে দোলনায় বসিয়ে দিলো। মায়ের কোলে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। সাদমান চৌধুরী কখন এসেছে কিয়ান সেটা টের পায়নি। সাদমান চৌধুরী ছেলের পায়ের কাছে বসলেন। কিয়ান একবার তাকিয়ে আবার ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো। হয়তো এটাই শেষ রাত মা বাবার সাথে কাটানো। আর কোনোদিন এমন রাত কাটাতে পারবে নাকি সেটা সকলের অজানা।
রাতটা এভাবেই কেটে গেলো নিস্তব্ধতায়।
অপরদিকে কোমল হাসফাস করছে নিজের জেলে। ওর হাত নিশপিশ করছে। এখন সবাই জানে ও সুস্থ তবে ও জানে ও কতটা সুস্থ। নিজেকে এখন ও নিয়ন্ত্রণ করলেও ও এমনি এমনি এখান থেকে চলে যেতে চায় না। যার জন্য কিয়ানের থেকে এতো দূরত্ব তাকে কি এমনি ছেড়ে দেবে।
কোমল জানে কিয়ান ডক্টর মালিথাকে অনেক টাকা দিয়েছিলো নিজের মুখ বন্ধ রাখার জন্য। তবে আবার পুনরায় এলিজার থেকে টাকা খেয়ে কিয়ানের সাথে বেইমানি করেছে। সব কিছু পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।
ওর ভাবনার মাঝেই একজন কনস্টেবল চুপি চুপি এলো ওর কয়েদ খানার দিকে। এই সময়ে সবাই ঘুমে। তাই তার আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ক্যামেরা অফ করে রেখে এসেছেন তিনি। দরজা খুলে একটা কালো চাদর দিলেন তিনি কোমলের হাতে।
কোমল সেটা দিয়ে নাকমুখ পেঁচিয়ে চুপি চুপি হেঁটে এগিয়ে গেলো অন্য একটা কয়েদ খানার দিকে।
#চলবে
[ যতক্ষন রেসপন্স ভালো না পাবো আর গল্পই দেবো না। ]