ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বর্ণ কোমল

৩১তম পর্ব

লেখক: পরিণীতা আরান হৃৎ

#স্বর্ণকোমল

#পরিণীতা_আরা_হৃৎ

#পর্ব_৩১

[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]

🕊️

জার্মানির সেন্ট্রাল জেল।

কিয়ান বসে আছে ওয়েটিং রুমে। আর মতোই অনেকে সেখানে বসে অপেক্ষা করছে। কখন ডাকা হবে তাদের আর তারা তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে পারবে।

একটু পর একজন লোক এসে বললেন,

“এখানে জায়রিন চৌধুরী কিয়ান কে আছেন?”

কিয়ান নিজের নাম শুনে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল,

“আমি…আমি জায়রিন চৌধুরী কিয়ান।”

“আপনি আসুন আমার সঙ্গে।”

কিয়ান লোকটির পেছনে পেছনে গেলো। দু চারটে গলির মতো পথ পেরিয়ে ওকে একটা জেল খানার কক্ষের সামনে এনে দাঁড় করানো হলো। কক্ষে একটা মাত্র জানালা সেখানেই ওকে দাঁড়াতে বলা হলো। ও জানালার গ্রিল ধরে চাতক পাখির মতো কক্ষের মাঝে উকি ঝুকি দিতে লাগলো। লোকটি ওকে সেখানে রেখে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। একটু পর জানালার ওপর পাশে কোমলকে আসতে দেখা গেলো। জানালার এক পাশে কিয়ান আর আরেক পাশে কোমল। দুজনের মাঝে বাধা হয়ে দাড়িয়ে আছে লোহার লম্বা গ্রিল গুলো।

কোমলকে দেখে কিয়ানের গলা শুকিয়ে গেলো। চোখ ছল ছল করে উঠলো। কোমলের অবস্থা বড্ড শোচনীয়। শরীর পুরো ভেঙে গেছে। চোখের নিচে কালো কুচকুচে ডার্ক সার্কেল পড়েছে। চোখ গর্তে ঢুকে গিয়েছে। বেগুনি রঙের অদ্ভুত সুন্দর চোখ গুলো অনেকটা ভয়ানক ঠেকছে। ভয়ংকর সুন্দর চোখের আগের সেই সৌন্দর্য বিলীন হয়েছে। গালের হাড় প্রায় বেরিয়ে এসেছে। এতোটাই শুকিয়ে গিয়েছে। কোমলের গোলাপ রঙ্গা গা ফ্যাকাশে রূপ ধারণ করেছে। সোনালি রঙের লম্বা চুল গুলো জট পাকিয়ে গিয়েছে। নোংরা হয়ে রয়েছে চুল গুলো।

কিয়ান ঢোক গিলে ওর থেকে একটু দূরে দাড়ানো কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করলো,

“ওর এই অবস্থা কেনো? এখানে কি খুনী বলে রোগীর দেখা শোনা করাও বারণ?”

কনস্টেবল জার্মানী ভাষায় তিরিক্ষি মেজাজে বলল,

“এই মেয়েটা একটা পাগল। সারাদিন কিয়ান কিয়ান করে খালি। আর কাউকে তো নিজের ধারে ঘেসতেই দেয় না। কেউ ওকে ধরতে গেলেই আঘাত করে বসে। তাহলে ওর যত্ন নেয়া হবে কিভাবে?”

কিয়ান ওনার থেকে চোখ সরিয়ে তাঁকালো বিধ্বস্ত কোমলের দিকে। কোমল কিছুটা দূরে থাকা অবস্থাতেই কিয়ানকে দেখতে পেলো। কিয়ানকে দেখার সাথে সাথেই কোমল দৌড়ে গ্রিলের ধারে এলো। পারে তো গ্রিল ভেঙে কিয়ানকে জড়িয়ে ধরে। দুজনই একে অপরকে দেখে কেঁদে দিলো। প্রায় বছর হতে চললো দুজনের কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই।

গ্রিলের মধ্যে ফাঁকা স্থান দিয়েই দুজন দুজনের গাল আঁকড়ে ধরলো। গ্রিলের উপর দিয়েই কপালের সাথে কপাল একে অপরের সাথে ঠেকালো। কোমল কাদতেঁ কাদতেঁ বলল,

“কিয়ান তুমি এসেছো? কোথায় ছিলে তুমি এতোদিন? জানো ওরা আমাকে তোমার কাছে যেতে দেয়নি। বলেছে তুমি নাকি আমার সাথে কথা বলতে পারবে না। আমাকে নিয়ে চলো তোমার সাথে। ওরা ভালো না। প্রতিদিন আমার সাথে খারাপ আচরণ করে।”

কোমলের কথায় কিয়ান ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো। কোনো চিন্তা করো না। আমি চলে এসেছি তো। নিয়ে যাবো তোমাকে এখান থেকে।”

“আমাকে এখান থেকে বের করতে বলো। আমি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরবো।”

কিয়ান গ্রিল ধরে ঝাকানো শুরু করলো। লোহার গ্রিল তাতে একটু নড়লো না পর্যন্ত। কিয়ান ওকে থামাতে চেয়েও বলল,

“একটু অপেক্ষা করো জান। আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবো। তখন সারাদিন আমাকে জড়িয়ে রেখো কেমন?”

কোমল কিয়ানের কথা মানতে নারাজ।

“না আমি এক্ষুনি তোমাকে জড়িয়ে ধরবো। আমাকে ছেড়ে দিতে বলো।”

“ওরা এখন সেই পারমিশন দেবে না জান আমার। একটু অপেক্ষা করো। বেশিদিন আর থাকতে হবে না তোমাকে এখানে।”

কোমল কিয়ানের কথা তো শুনছেই না উলটো পারলে তো গ্রিল ভেঙেই কিয়ানকে জড়িয়ে ধরে। আগের চেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ছে কোমলের মস্তিষ্ক। কিন্তু লোহার গ্রিল ভাঙা যে সহজ কথা নয়। কোমল চেঁচামেচি শুরু করে দিলো।

“আমাকে বের করো এখান থেকে। আমার কিয়ান চলে এসেছে। ওর কাছে যেতে দাও আমাকে। আমি এখানে থাকবো না। বের করো আমাকে।”

সকল সিকিউরিটি টিম ফোর্স করেও কোমলের থেকে কিয়ানের হাত ছাড়াতে পারলো না। আর না তো পারলো ওকে শান্ত করতে। কোমলের এতো পাগলামি দেখে কিয়ান তাদের প্রায় মিনতি করে বলল,

“ওকে বের করতে হবে না। অন্তত আমাকে একটু ভিতরে যেতে দিন। প্লীজ!”

কিয়ানের অসহায় কণ্ঠে তাদের মন গলল বোধহয় কিছুটা। একজন দারোগা মতো ইন্সপেক্টর এগিয়ে এসে থমথমে বিরক্তি কণ্ঠে বলল,

“কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবেন না মিস্টার কিয়ান। আর খুব দ্রুত কথা শেষ করবেন।”

পারমিশন দিয়ে কিয়ানকে ভিতরে ঢোকানো হলো। দরজা খুলে ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে কোমল দৌড়ে এসে জাপটে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানকে।

কিয়ান ও জড়িয়ে ধরলো নিজের স্বর্ণকে। কিছুক্ষন পর কিয়ান ওকে ছেড়ে ওর সারা মুখে ছোট ছোট চুমু খেতে লাগলো। যেনো মরুর বুকে হারানো কোনো পথিক তার পথ খুঁজে পেয়েছে।

একে অপরকে ছেড়ে দিলো ওরা। কিয়ান কোমলকে আশ্বস্ত করে বলল,

“আমাকে ভরসা করো তো?”

“নিজের চেয়েও বেশি।”

“তাহলে মনে রেখো। আমি নিজের সাথে ফিরিয়ে নেবো তোমাকে কোর্টে তোলার আগেই।”

কোমল অবুঝ নয়নে তাকালো। ওর মাথায় ঢুকছে না কিছু কিয়ান কিভাবে ওকে এখন থেকে নিয়ে যাবে? কোমল নাক টেনে ফেসফেস আওয়াজে বলল,

“কিভাবে? ওরা যে আমাকে পরশু দিনই কোর্টে নিয়ে যাবে। আর আমার যতদূর মনে হয় আমার ফাঁসির রায় ও হতে….”

কোমলের মুখ থেকে বাকি কথা বের হওয়ার পূর্বেই কিয়ান ওর ঠোঁটে আঙুল রেখে ওকে থামিয়ে দিলো।

“হুস.. বলেছি না কোর্টে তোলার আগেই তুমি আমার সাথে যাবে? আমাকে ভরসা করো না? এখন বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দাও।”

“আমাকে এখনই নিয়ে চলো তোমার সাথে।”

কিয়ান আশেপাশে তাঁকিয়ে দেখলো রুমে কেউ নেই ওরা দুজন ছাড়া। যেহেতু পালাতে পারবে না তাই কেউই রইলো না ওদের মাঝে। সুযোগ বুঝে কিয়ান কোমলের ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো। কোমলের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটাতে লাগলো। কোমলও বাধ্য স্ত্রীর মতো স্বামীর স্পর্শে সায় দিতে চাইলো তবে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে হাজির হলো কনস্টেবল।

“আপনার সময় শে…”

কিয়ানকে ডাকতে ডাকতে ভিতরে প্রবেশ করে কনস্টেবল। তবে তার কথা পুরো বলা হলো না। ভিতরের দৃশ্য দেখে কনস্টেবল থতমত খেয়ে গেলো। দ্রুত উল্টো ঘুরে দু হাতে নিজের মুখ ঢেকে বলে উঠলো,

“আস্তাগফিরুল্লাহ!”

অপর দিকে কিয়ান আর কোমল কনস্টেবলের গলার আওয়াজে দুই জন দুই দিকে ছিটকে সরে গেলো। কোমল লজ্জায় মাথা নত করে নিলো। গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে কোমলের। চোঁখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে।

কিয়ান দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো। ভুল জায়গায় ভুল কাজ করে ফেলেছে বলে।

কনস্টেবল পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝে পেছনে ফিরে তাঁকালো। কিয়ানকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“এটা আপনার বেড রুম না মিস্টার কিয়ান। এটা জেল খানা।”

“আসলে…”

“থাক হয়েছে আর আসলে নকলে করতে হবে না। আপনি এবার আসুন।”

কোমল দ্রুত কিয়ানের হাত আঁকড়ে ধরলো। কিয়ান কোমলকে নরম সুরে বলল,

“এখন আমাকে যেতে হবে জান। কালকে যেনো এসে তোমার এই অবস্থা না দেখি কেমন?”

কোমল মাথা নেড়ে ওর কথায় সায় জানালো। কিয়ান আর থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উল্টো ঘুরে হড়বড় করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। একবারও পিছনে ফিরে তাঁকালো না। পাছে যেতে আরো বেশি কষ্ট হবে। গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম।

কোমল অশ্রুসিক্ত চোঁখে তাঁকিয়ে রইলো কিয়ানের যাওয়ার দিকে। হুট করে কানে ভেসে এলো কনস্টেবলের ঝাঁঝালো কন্ঠে বলা কথা।

“স্বামীকে দেখেই মাথা ঠিক হয়ে গেলো। হ্যাঁ? জাতে মাতাল তালে ঠিক!”

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন