#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৮.
আজ পরিষ্কার আকাশটা হুট করেই মেঘলা হতে শুরু করল। বাংলাদেশে অসময়ে বৃষ্টি নামা কোনো বড় বিষয় নয়। সন্ধ্যার পরে আকাশটা পরিষ্কার ছিল, তবে সেটা এখন আরও কালো হতে শুরু করেছে। আকাশে এতক্ষণ জ্বলজ্বল করা রুপালি চাঁদটা কালো মেঘের নিচে ডুবে গেছে। সায়ান আঠারো দিনের কথা বলে বাসা থেকে গিয়েছিল, কিন্তু মাসখানেক বাইরে থেকে মাত্র তিন দিন আগেই ছেলেটা বাড়িতে ফিরেছে। আসমা শেখ সারাটা দিন ছেলেটার জন্য ভালো-মন্দ রান্নাবান্না করে সবে ড্রয়িং রুমে এসেছিলেন, ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে ওঠে। সায়ানের কল দেখে তিনি বেজায় খুশি হয়ে কলটা রিসিভ করেছিলেন। তার ভবঘুরে স্বভাবের ছেলেটাও যে তাকে মনে রাখে, সেটা ভেবে কত খুশিই না হয়েছিলেন তিনি! তবে কলটা ধরে তিনি যা শুনলেন, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। আসমা শেখ হকচকিয়ে গেলেন, বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘কী বলছো তুমি?’
আসমা শেখের কণ্ঠস্বর শুনে আরাবী কেঁপে উঠল। একজন মায়ের জন্য তার সন্তানের এমন দুর্ঘটনার খবর শোনা মোটেও সুখকর নয়। আসমা শেখের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু তবুও ফোনটা শক্ত হাতে ধরে রইলেন। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি দেয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলালেন। ছেলের জন্য এতক্ষণ যে আয়েশ করে রান্না করেছিলেন, এতক্ষণ তার মুখটা যেমন জ্বলজ্বল করছিল, সেটা উধাও হয়ে গেল। আপন মনে চোখ বন্ধ করে ছেলের অবস্থা চিন্তা করে আতঙ্কে চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করল। আরাবী নরম গলায় বলল,
‘আন্টি, আপনি শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? আমরা ওনাকে ইউনাইটেড হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা দয়া করে তাড়াতাড়ি সেখানে চলে আসুন।’
আরাবী যতটা সম্ভব আসমা শেখকে স্পষ্ট করে কথাগুলো বলল। কথাগুলো বলার সময় অবশ্য আসমা শেখের কথা চিন্তা করে তার নিজের গলাও কাঁপছে। একজন মায়ের কাছে এমন খবর দেওয়া কতটা কঠিন সেটা সে বোঝে। ফোনের ওপাশ থেকে আসমা শেখের চিৎকার শোনা গেল। আরাবী ঘাবড়ে গেল, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। ফারাবী এখনো লোকটার রক্ত মুছে দিচ্ছে। এদিকে আসমা শেখ দেয়াল ধরে মেঝেতে বসে পড়লেন। তার হাত-পা নিস্তেজ হতে শুরু করেছে, তবে ফোনটা এখনো তার কানে। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু পড়ছে। কলে থাকা আরাবী ওপাশে থাকা মানুষের অবস্থাটা আন্দাজ করতে পারল। আরাবী সরল গলায় বোঝাল,
‘আন্টি, প্লিজ শান্ত হন। আমরা ওনাকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। দেখবেন আপনার ছেলের কিছু হবে না। হসপিটালের লোকেশনটা আবার শুনুন, ইউনাইটেড হসপিটাল, গুলশান।’
আরাবী আবারও কথাগুলো বলল। তার নিজের চোখেও পানি চলে এসেছে; একজন মায়ের এমন করুন ভাবে কান্না শুনে তার বুকটাও মুচড় দিয়ে উঠেছে।
মইনুল শেখ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। অফিস থেকে এসে শুয়ে পড়েছিলেন, এখন উঠলেন। তিনি সিঁড়ির ওপর থেকেই আসমা শেখের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নামলেন। নিচে এসে আসমাকে মেঝেতে বসে কাঁদতে দেখে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি দ্রুত পায়ে আসমা শেখের দিকে এগিয়ে গেলেন। আসমা শেখের কানে ফোন ধরা। মইনুল শেখ আসমা শেখের কাছে এসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? কার ফোন?’
আসমা শেখ হয়তো তার কথাগুলো শুনলেন, কিন্তু উত্তরে তিনি কিছু বলতে পারলেন না, শুধু কেঁদে চলেছেন। মইনুল শেখ বুঝলেন এভাবে সে কথা বলবে না, তাই তিনি আসমা শেখের হাত থেকে ফোনটা নিজের কানে নিয়ে বললেন,
‘হ্যালো? কে বলছেন?’
মইনুল শেখ শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। ওপাশ থেকে আরাবী অত্যন্ত ধীর এবং কম্পিত স্বরে বলল,
‘জি, আমি আরাবী বলছি। কিছুক্ষণ আগে সায়ানের একটা বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমরা ওনাকে ইউনাইটেড হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা অনুগ্রহ করে তাড়াতাড়ি সেখানে চলে আসুন।’
কথাগুলো শোনা মাত্রই মইনুল শেখের চারপাশটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেলো। শক্তপোক্ত মানুষটা কেমন দুর্বল হয়ে পড়লো। তার চারপাশের পরিচিত পৃথিবীটা মুহূর্তেই ঘোলাটে হয়ে গেল। আজন্ম শক্ত মনের এই মানুষটা আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। বুক চিরে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চাইল কিন্তু তিনি সেটা চেপে রাখলেন। অতি কষ্টে জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
‘আমার ছেলে কেমন আছে?’
‘আঙ্কেল তার জ্ঞান নেই। আমরা যত দ্রুত সম্ভব তাকে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। আপনাকে লোকেশন বলছি আপনারাও চলে আসুন।’
আরাবী আবারও মইনুল শেখকে হসপিটালের নাম বলল। মইনুল শেখ চোখ বন্ধ করে সবটা শুনলো। তিনি আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। ফোন কেটে দিলেন। চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলেন, তার চোখের কোণের জল চিকচিক করছে। তিনি আসমা শেখের দিকে তাকালেন। তার স্ত্রী এখনো কাঁদছে। হুট করে মইনুল শেখ তাকে জড়িয়ে ধরলেন। সান্ত্বনা দিতে বললেন,
‘শান্ত হও আসমা। আমার লড়াকু সায়ান একদম ঠিক হয়ে যাবে। কান্নাকাটি করো না। তাড়াতাড়ি ওঠো আমাদের এখন হসপিটালে যেতে হবে।’
কথাগুলো তিনি শক্ত কণ্ঠে বললেও, তার নিজের হাতটা এখনো কাঁপছে। তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সায়ানকে সে আর আসমা শেখ বেশিই ভালোবাসে।
‘সাফওয়ান! সাদমান! সাজিদ! সাহাদ!’
মইনুল শেখ হয়তো নিজের কণ্ঠের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার চার ছেলেকে ডাক দিলেন। ডাকটা এতো জোরে ছিল যে ওপর থেকে চার ভাইয়ের নিচে নামতে সময় লাগলো না। মইনুল শেখের এমন বজ্রনিনাদ চিৎকার আগে কখনো শোনেনি তারা। সবার আগে সাফওয়ান নামলো। সে একপ্রকার সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নেমে এল, তার পেছনে অন্যরা। লিভিং রুমে ঢুকেই তারা দেখল মা মেঝেতে বসে অঝোরে কাঁদছেন আর বাবা পাথরের মতো মাকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে। চারজনেই নিচে এসে মাকে কাঁদতে দেখে হকচকিয়ে গেল।
সাফওয়ান মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘কী হয়েছে আব্বু, আম্মু কাঁদছে কেন?’
সাদমানরাও এগিয়ে আসল। মইনুল শেখ একবার তাদের সবার দিকে তাকালেন। মইনুল শেখের চোখদুটো দেখে সাদমান আর সাজিদ ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সাহাদ আমতা আমতা করে বলল,
‘ আব্বু, কী হয়েছে? কিছু তো বলো।আমার ভয় লাগছে।’
মইনুল শেখ সবার মুখের দিকে একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর নিজের ভেতরের সবটুকু দুর্বলতা একপাশে সরিয়ে রেখে শক্ত গলায় বললেন,
‘ সায়ানের এক্সিডেন্ট হয়েছে। ওকে ইউনাইটেড হসপিটালে নেওয়া হয়েছে। সাদমান গাড়ির চাবি নিয়ে আসো। আমাদের এখনই হসপিটালের যেতে হবে।’
সাফওয়ানরা আর কোনো প্রশ্ন করলো না। সাদমান পাগলের মতো দৌড় দিয়ে গাড়ির চাবি আনতে গেল। সাফওয়ান আর সাহাদ আসমা শেখকে ধরল। সাজিদ এসে মইনুলের শেখের পাশে দাঁড়ালো৷
....
আরাবীদের গাড়ি ছুটে চলেছে। ফারাবী পেছনের সিটে বসে সায়ানের মাথা নিজের কোলে ধরে রেখেছে। সায়ানের শ্বাস-প্রশ্বাস খুব ক্ষীণ ভাবে চলছে। খুব ধীরে ধীরে তার বুক ওঠানামা করছে । ফারাবী বারবার লোকটার কপাল থেকে রক্ত মুছে দিচ্ছে। তার নিজের হাত রক্তে লাল হয়ে গেছে।
ফারাবী আবারও সায়ানের নাড়ি চেক করল। এখনও আছে কিন্তু খুব ক্ষীণ ।
‘করিম চাচা, আর কতদূর?’ ফারাবী লোকটার অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে জানতে চায়ল।
‘ আর পাঁচ মিনিট আম্মা। ’
করিম সাহেবের ধীম উত্তর আসল। ফারাবী সায়ানের মুখের দিকে তাকাল। সে এই মানুষটাকে চেনে না কিন্তু তবুও লোকটার জন্য তার খারাপ লাগলো। নিজের অজান্তেই সে সায়ানের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
‘ আপু ওনারা কী বললো?’
‘ বললো যে আসছে।’
আরাবী সামনের দিকে দৃষ্টিতে দিয়ে আছে। দুবোনের মধ্যে আর কোনো প্রকার কথা হলো না। প্রায় নয় মিনিট পরে তাদের গাড়িটা ইউনাইটেড হসপিটালের সামনে এসে থামল। গাড়িটা তারা ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে নিয়ে গেলো। গাড়ি থামতেই আরাবী দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ইমার্জেন্সির ভেতরে ছুটে গেল।
‘ গাড়িতে একজন রোগী আছে তাড়াতাড়ি সাহায্য করুন প্লিজ।’
আরাবীর কথাগুলো শুনে ইমার্জেন্সি রিসেপশনে বসে থাকা একজন নার্স দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ভেতরে গিয়ে আরো দুইজন নার্স আর একজন ডাক্তারকে ডেকে আনলেন। তারা একটা স্ট্রেচার নিয়ে দ্রুত বাইরে এল। ফারাবী আর করিম সাহেব ততক্ষণে সায়ানকে গাড়ি থেকে বের করার চেষ্টা করছিলো। নার্সরা এগিয়ে এসে সাহায্য করল। তারা সবাই মিলে সায়ানকে স্ট্রেচারে তুলল। ডাক্তার দ্রুত তাকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। তিনি সায়ানের পালস চেক করলেন, চোখে টর্চের আলো ফেলে দেখে নিলেন। তিনি নিজের কাজগুলো শেষ করে বললেন,
‘ তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে যাও। আইভি লাইন সেট করো আর ব্লাড প্রেসার চেক করো।’
নার্সরা দ্রুত স্ট্রেচার ঠেলে সায়ানকে ভেতরে নিয়ে গেল। ফারাবী, আরাবী আর করিম তাদের পিছু পিছু গেল। ভেতরে একটা ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট রুমে সায়ানকে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার আর নার্সরা দ্রুত নিজেদের কাজ করতে শুরু করল। একজন নার্স সায়ানের শার্ট কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলল। আরেকজন তার হাতে আইভি লাইন লাগাল। ডাক্তার তার মাথার ক্ষতটা চেক করছেন।
‘ মাথায় গভীর ক্ষত হয়েছে সম্ভবত স্কাল ফ্র্যাকচার হয়েছে। সিটি স্ক্যান করতে হবে। ব্লাড প্রেসার খুব কম। পালস উইক,তাকে স্ট্যাবিলাইজ করতে হবে।’
ডাক্তার সায়ানকে পরীক্ষা করে নার্সদের কথাগুলো বলছিলেন। ফারাবী, আরাবী আর করিম সকলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো। সেই সময়ে একজন নার্স ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের দিকে তাকাল।
‘ আপনারা রোগীর সাথে?’
‘জি।’
‘ কে হন? ’
‘কেউ না, আমরা ওনাকে রাস্তা পরে থাকতে দেখে এখানে নিয়ে এসেছি। ওনার পরিবারকে খবরও দিয়েছি। তারা আসছে।’ আরাবী ছোট্ট করে উত্তর দিল।
নার্স আর কিছু বললো না। সায়ানকে আবারও আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো আর ফারাবীদের ওয়েটিং রুমে বসতে বলা হলো। ফারাবী, আরাবী আর করিম সাহেব সকলে ওয়েটিং রুমে বসে রয়ল। ওয়েটিং রুমটা ছোট-খাটো, সেখানে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা বসার জন্য। দেয়ালে-দেয়ালে বিভিন্ন ডাক্তারের পোস্টার। একপাশে ছোট একটা টিভিও আছে। ফারাবী একটা চেয়ারে বসে পড়ল। সে মাথা ঝুঁকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রয়ল। তার হাত লোকটার রক্তে লাল হয়ে আছে। আরাবীও তার পাশে এসে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে বোনের হাতের দিকে তাকাতেই বলে উঠলো, ‘ ফারাবী, তোর হাত ধুয়ে নে। রক্ত লেগে আছে। ’
আরাবীর কথায় ফারাবী মাথা নাড়ল। সে উঠে ওয়াশরুমের দিকে গেল। ওয়াশরুমে ঢুকে হাত দু'টো ভালো করে ধুয়ে ফেলল। হাতের রক্তের পানি লাল হয়ে যেতে সময় লাগলো না। ফারাবী নিজের হাত ধুয়ে মুখে পানির ছিটে দিলো। তার গাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু পানির কণাগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফারাবী মুখ তুলে আয়নায় নিজের মুখটা দেখলো। তার মুখে এখনো লোকটার রক্ত লেগে আছে। রক্ত শুকিয়ে গেছে তাই উঠছে না। সে আবারও ভালো করে মুখটা ধুয়ে নিল তারপর আবার ওয়েটিং রুমে এসে আরাবীর কাঁধে মাথা রেখে বসল। আরাবী নিজের ছোট বোনটাকে মা পাখির মতো আগলে নিল।
.....
প্রায় পনেরো মিনিট পরে সাফওয়ানরা হসপিটালের এসে পৌঁছালো। গাড়ি থামতেই সাফওয়ান আর সাহাদ দৌঁড়ে ভেতরে আসল। সাদমান আমসা শেখকে ধরে-ধরে নিয়ে আসছে। সাজিদও বাবার পিছে পিছে আসছে। সাফওয়ানরা ভেতরে ঢুকেই রিসেপশনের দিকে ছুটে গেল। সাফওয়ান রিসেপশনিস্টকে দেখে জিজ্ঞাসা করল,
‘কিছুক্ষণ আগে এখানে একজন এক্সিডেন্ট কেসে ভর্তি হয়েছে। তাকে এখন কোথায় রাখা হয়েছে জানেন?’
রিসেপশনিস্ট কম্পিউটারে দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ নাম কী?’
‘সায়ান এহসান শেখ। বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ’
সায়ান এহসান শেখের নাম শুনে রিসেপশনিস্ট অবাক হলেন।তিনি সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ আমি যদি ভুল না হয় তবে তিনি কী ক্রিকেটার সায়ান এহসান? ’
সাফওয়ান সামনের লোকটাকে দেখে রাগ লাগল। সে কী উত্তর দিবে ভেবে পেলো না। এখন সত্যিটা বললে রিপোর্টারে হসপিটাল ভর্তি হতে সময় লাগবে না। সে এখন এসব কিছু ফেইস করতে চায় না তাই সংক্ষিপ্ত ভাবে বলল,
‘ না, দয়া করে এক্সিডেন্ট কেসে যাকে ভর্তি করা হয়েছে তার তথ্য দিন। ’
‘ জি, একজনকে একটু আগে এখানে আনা হয়েছে।’
‘ কোথায় এখন?’
‘ ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ’
ফারাবীরা বসে ছিলো এমন সময় ডাক্তার বেরিয়ে আসল। ডাক্তারকে বের হতে দেখে ফারাবী আর আরাবী দুইজন উঠে ডাক্তারের দিকে গেলো। ডাক্তার তাদেরকে দেখে চিন্তি গলায় প্রশ্ন করল,
‘ এখানে রোগীর পরিবারের কে আছেন?’
ফারাবী আর আরাবী দুইজনই নিজেদের মুখের দিকে তাকাল।
‘ রোগীর পরিবার এখনো এসে পৌঁছায়নি। আপনি কী বলবেন আমাদের বলেন ডাক্তার।’ আরাবী সামনে এগিয়ে এসে বলল।
‘ আপনারা হলে হবে না। আপনারা তো আর রোগীর রক্তের গ্রুপ জানেন না। ’
ফারাবীদের মুখটা ছোট হলো। ডাক্তার রায় আরো কিছু বলতে যাবে তার আগে সেখানে সাফওয়ানরা এসে পৌঁছাল।
‘ আপনারা কী সায়ানের বাসার লোক?’
আরাবী এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল। সায়ানের নামটা শুনে সকলে পা থেমে গেলে। সকলে আরাবীর দিকে তাকাল।
‘ হ্যাঁ, ও কোথায় ?’ সাদমান অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘ আপনারা আগে একটু ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। ’
আরাবীর কথাটা বলতে দেরি হলেও সাফওয়ান, সাদমান, সাহাদ আর মইনুল শেখ ডাক্তারের কাছে ছুটে যেতে দেরি হলো না ।
‘ জি কী জিজ্ঞাসা করবেন আমাকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি সায়ানের বাবা।’
ডাক্তার একবার আরাবীর দিকে তাকাল। আরাবী মইনুল শেখের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘ দেখুন আপনাদের মিথ্যা বলে লাভ নাই। রোগীর অবস্থা গুরুতর। মাথায় গভীর আঘাত পেয়েছে, অনেক রক্তপাত হয়েছে। আমরা তাকে স্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা করছি কিন্তু তার অনেক রক্তপাত হয়েছে এখন জরুরি ভিত্তিতে রক্ত লাগবে। আপনারা কি জানেন রোগীর ব্লাড গ্রুপ কী?’
সাফওয়ান এগিয়ে এসে বলল,
‘ হ্যাঁ, ওর ব্লাড গ্রুপ O নেগেটিভ।’
ডাক্তার চোখ তুলে সামনে তাকালো।
‘ O নেগেটিভ? দুঃখিত আমার জানা মতে এই মুহূর্তে এটা আমাদের ব্লাড ব্যাংকে স্টক নেই। বিশ মিনিটের মধ্যে রক্তের ব্যবস্থা করুন। নাহলে আমাদের হাতে কিছু থাকবে না বা আপনাদের মধ্যে কারো O নেগেটিভ রক্ত থাকলে দিতে পারেন। ’
ডাক্তারের কথাগুলো শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। আসমা শেখ আবারও কেঁদে উঠল কারণ এই বাড়িতে একমাত্র তার সায়ানের নেগেটিভ রক্ত। সাজিদ তার মাকে ধরে রাখতে পারলো না, চেয়ারে বসিয়ে দিলো। আরাবী আর ফারাবী দুইজনই আসমা শেখের এমন অবস্থা দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলো। ফারাবী আর আরাবী দু'জনই আসমা শেখের পাশে বসল। সাজিদ তাদের দুইজনের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাবী সাজিদকে নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শীতল কন্ঠে বলল,
‘তুমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে ওনার কথাগুলো শুনতে পারো আমরা আন্টির কাছে আছি।’
সাজিদ কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে আরাবীকে দেখে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। আসমা শেখ হুট করে আরাবীর কোলে ঢোলে পড়লো। তার কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। আরাবী আর ফারাবী দু'জনই আসমা শেখ এমন কান্ডে হকচকিয়ে গেলো। ফারাবী আসমা শেখকে চেক করে দেখল অজ্ঞান হয়ে গেছে।
‘ কী হয়ে ফারাবী? ’
‘আপু আন্টি অজ্ঞান হয়ে গেছে।’
সাফওয়ান ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমার তো AB পজিটিভ।’
‘আমার A পজিটিভ।’ কপালে হাত দিয়ে সাদমান বিড়বিড় করল । সাজিদ আর সাহাদও বলল, ‘ আমাদের B পজিটিভ।’
মইনুল শেখ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল,
‘ আমাদের সকলেই রক্তের গ্রুপ আলাদা। ’
‘কেউ ম্যাচ করছে না। ঠিক আছে আমরা অন্য হসপিটাল থেকে খোঁজ নিচ্ছি কিন্তু সময় লাগবে দোয়া করতে থাকেন।’
ডাক্তারের কথাগুলো শুনে আরাবী আসমা শেখকে মাথা ফারাবী কাঁধে দিয়ে উঠে আসল।
‘ আমার O নেগেটিভ রক্ত৷ আমি রক্ত দিলে হবে?’
চলবে…
[ কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ]