ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় অক্টোবর

১৯তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তাসনিম

#প্রিয়_অক্টোবর

#সাদিয়া_তাসনিম

১৯.

চট্টগ্রামের এক নিভৃত গ্রাম, যেখানে শহরের কোলাহল পৌঁছায় না, যেখানে শুধু গ্রামের সাধারণ মানুষের বসবাস,যেখানে মাইলের পর মাইল সবুজ জমি পড়ে আছে,সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মহলের মতো একটা বাড়ি। বাড়িটা দেখলে যে কেউ বুঝবে, এখানে যারা থাকেন তারা সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ। এই বাড়িটাকে গ্রামের সকলে 'বড় বাড়ি' বলে ডাকে। বাড়ির চারপাশে সুবিশাল উঠোন, ফুলের বাগান, আর একটা পুকুর। রাতের বেলা পুরো বাড়িটা আলোয় ঝলমল করে।

এই বাড়িতেই থাকেন আবদুল জব্বার শেখ আর তার স্ত্রী রহিমা বেগম। আবদুল জব্বার শেখ এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি একজন কঠিন মেজাজের মানুষ,যা বলেন তাই করেন এবং অন্যদের দিয়ে করান। রাশভারি গম্ভীর মুখের মালিক তিনি। শ্যামলা বর্ণের লম্বাচওড়া মানুষ,মুখে সাদা চাপ দাঁড়ি। তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গ্রামের কেউ কথা বলার সাহস পায় না, এমনকি তার নিজের পরিবারের বর্তমান লোকজনও না। তবে সেদিক থেকে রহিমা বেগম একদম তার স্বামীর বিপরীত। তিনি খুবই কোমল হৃদয়ের মানুষ। সবসময় সবার জন্য চিন্তা করাই তার ধর্ম। স্বামীর কিছু কাজে তার মত না থাকলেও তিনি স্বামীর সামনে কখনো কথা বলতে পারেন না। শুধু মাঝেমধ্যে, খুব সাহস করে, কিছু কথা বলার চেষ্টা করেন যা মাঝ পথেই ছেড়ে দেন।

রাতের খাবার শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। বাড়ির কাজের লোকেরা মিলে সব থালাবাসন গুছিয়ে রাখছে। রহিমা বেগমের বয়স হয়েছে, একা সব করতে পারেন কই? মেজো ছেলের বউটা দুইদিনের জন্য বাপের বাড়িতে গেছে। রহিমা বেগম নিচে ছোট্ট-ছোট্ট কাজ শেষ করে উপরে রুমে আসলেন। রুমে এসে খাটের উপর বসলেন। আবদুল জব্বার শেখ তার প্রিয় আরামকেদারায় বসে বই পড়ছেন। কপালে চিন্তার ভাঁজ, গম্ভীর মুখে পাতা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন। পাশে টেবিলে রাখা চায়ের কাপে মাঝেমধ্যে চুমুক দিচ্ছেন। রহিমা বেগম তাকে কিছু বলতে যাবে তার আগে এশার নামাজের কথা মনে পড়ল। তিনি আজ এখনো এশার নামাজ আদায় করেন নি। একবার স্বামীর দিকে তাকালো তারপর কিছু না বলে পাশের ঘরে নামাজ পড়তে চলে আসলেন। নামাজ পড়ে শান্তিতে কথা হবে। তিনি সময় নিয়ে নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষে জায়নামাজের উপর বসে সকলের জন্য দোয়া করে তসবিহ পড়তে লাগলেন।তার এই দোয়াই মইনুল আর নয়নিকার ভালো চায়তে ভুললেন না, অবশ্য কখনো ভুলেনও না । ছেলেটাকে আজ কতগুলো দিন হলো দেখে না। এখনো চোখ দু'টো বুঝলেই বারবার চোখের সামনে বড় ছেলের মুখখানা ভেসে উঠে। সে তার প্রথম সন্তান। সে তাকে মা হাওয়ার স্বাদ দিয়েছিলো, যাকে তিনি কত আদর করে বড় করেছেন,কত স্বপ্ন দেখেছিলেন তাকে নিয়ে কিন্তু আজ কত বছর হয়ে গেলো, সেই ছেলের সাথে দেখা নেই, কথা নেই। এই সত্যি কথাটা তার নরম হৃদয় কিছুতেই মানতে চাই না। মেনে নিতে পারে না৷ রহিমা বেগম এখানে আর বসতে পারলেন না। তার চোখ থেকে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। তিনি চোখের পানি মুছে তসবিহটা রেখে দিলেন, জায়নামাজ তুললেন তারপর উঠে গেলেন স্বামীর ঘরের দিকে। রুমের এসে দরজাটা টেনে দিলেন তারপর আবদুল জব্বারের দিকে এগিয়ে গেলেন। আবদুল জব্বার শেখ স্ত্রীকে আসতে দেখলেন, কিন্তু চোখ তুললেন না। বইয়ের পাতায় তার মনোযোগ রইলো।

রহিমা বেগম আস্তে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে, প্রায় মিনমিন করে বললেন,

'শুনতিছেন?'

আবদুল জব্বার শেখ বই থেকে চোখ না তুলেই বললেন, 'হুম।'

রহিমা বেগম আরেকটু কাছে এলেন। হাতের আঁচল নিয়ে খেলতে লাগলেন। তিনি এই বয়সেও লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে সেই চৌদ্দ বছরের কিশোরী হয়ে যায়। তিনি জানেন, তিনি এখন যা বলতে চাইছেন সেটা শুনলে তার স্বামী রেগে যাবেন কিন্তু না বলে আর পারছেন না। কতদিন ধরে মনে মনে এই কথা চেপে রেখেছেন। আজ যে তাকে বলতেই হবে।

' বলছিলাম কী আমার একটা কথা ছিল।'

এবার আবদুল জব্বার শেখ মুখের সামনে থেকে বই নামিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

' ইনিয়েবিনিয়ে কথা না বলে কী বলবা সরাসরি বলো।'

রহিমা বেগম স্বামীর মুখের পানে চেয়ে,সাহস সঞ্চয় করলেন। মনে ভেতর কত-শত অস্থিরতা কাজ করছে। কথাটা বলতে তিনি মনে-মনে ভয় পাচ্ছে। একটা ঘটনার ফলে তার সবকিছু চুরমার হয়ে গিয়েছিলো। সেই কষ্ট এতোগুলো বছর শুধু সে ছটফট-ছটফট করেছেন। আবারও যদি এমন কিছু হয়? দুশ্চিন্তারা তাকে ঘিরে ধরেছে,তবে এতো কিছুর পরেও রহিমা বেগম নিজেকে শান্ত করে লম্বা-লম্বা দম ফেলে বললেন,

' আপনি কি এই জনমে আর কখনো মইনুলের কথা ভাবেন না?'

রহিমা বেগমের কথাটা শেষ হতেই আবদুল জব্বার শেখে শক্ত চোখে রহিমা বেগমের দিকে তাকালেন। তিনি হাতে থাকা বইটা জোরে টেবিলে ছুঁড়ে দিলেন। নিরুত্তেজ হওয়ার জন্য নিজেকে শান্ত করতে লাগলেন কিন্তু তা আর হলো কই? শব্দ করে বললেন।

' এই ছেলের নাম আমার সামনে আর কখনো বলবে না রহিমা। এক কথা কতবার বলবো? কথা কানে যায় না কেন?'

আবদুল জব্বারের তীব্র ঝাঁঝালো কণ্ঠ শুনে রহিমা বেগম কেঁপে উঠলেন। তিনি শীতল দৃষ্টি দিয়ে রাখলেন স্বামীর পানে। রহিমা বেগমও আজ থামলেন না। তিনি এগিয়ে গিয়ে আবদুল জব্বারের সামনে দাঁড়ালেন। চোখে পানি চিকচিক করছে তার। মানুষটার প্রতি থাকা তার ভালোবাসা-বিশ্বাস-সম্মানের জন্য কিছু বলতে পারেন না আবার সহ্য করতেও পারেন না। ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলেও চুপ থাকতে হয়।

' আজ কতগুলো দিন হয়ে গেলো আমি আমার ছেলেকে দেখি না। মেয়েটাকে দেখি না। আপনার কী একবারও ওদের জন্য কষ্ট লাগে না। আপনার মনডা কী পাষাণ হয়ে গেছে শেখ? '

কথাগুলো বলার সময় রহিমা বেগম কেঁদে উঠলেন৷ হাতের ভাজে হাত রেখে নিজেকে শক্ত করলেন। শাড়ির আঁচল তুলে মুখে চাপা দিলেন। আবদুল জব্বার শেখ উঠে দাঁড়ালেন। রহিমার এমন ব্যবহারে তার কন্ঠরোধ হয়ে আসতে লাগলো তবে তিনি নিজেকে শক্ত করলেন। তিনি রহিমা বেগমের দিকে এগিয়ে আসলেন কিন্তু রহিমা বেগম আজ পিছপা হলেন না, নরম স্বভাবের তিনিও আবদুল জব্বারের চোখের চোখ রাখলেন।

'কান খুলে শুনে রাখো,আমি সেই ছেলেমেয়েকে নিজের সন্তান ভাবি না, যে আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়েছে।'

আবদুল জব্বার শেখ ঠান্ডা ভাবে তীব্র ঘৃণার সাথে বললেন। রহিমা বেগম তার সামনে নিজের দুই হাত জোড় করে নিলেন কিন্তু সেগুলো আবার নিচেও নামিয়ে নিলেন।

' মানুষকে এতোটাও পাষাণ হতে হয় না। আল্লাহ মানুষ বানাইছে কেন? মানুষরে মন দিয়েছে কেন? মইনুল আর নয়নিকা আপনার ছেলেমেয়ে ওদরে সাথে আপনার রক্তের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক কি এত সহজে ছিন্ন করা যায়? '

আবদুল জব্বার শেখের মুখ শক্ত হয়ে গেলো। তিনি পাশ ফিরে জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে অন্ধকার। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। আজ প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর কান্না দেখে তার মুখে কোনো নরম ভাব এলো না বরং স্ত্রীর কথাগুলো শুনে মুখটা কঠোর হয়ে আসল। তিনিও কঠোর হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে অন্ধকারে কিছু দেখার চেষ্টা করল। জানালার দিকে তাকিয়ে কাট-কাট কন্ঠে বললেন,

'এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো। ওর সাথে রক্তের সম্পর্ক আছে বলে সেদিন বেঁচে যেতে পেরেছিল। ছেলে মেয়ে যদি বাবার কথা না শোনে, বাবার সম্মানের কথা না ভাবে, তাহলে বাবা কেন সেই ছেলেমেয়ের কথা ভাববে?'

আবদুল জব্বার শেখের কঠোর কন্ঠে বলা কথাগুলো শুনে রহিমা বেগম চোখ মুছলেন।

' আপনি এখনো ওদের ক্ষমা করবেন না?'

' না।'

'একজন বাবা হয়ে একটা মানুষ এতোটা পাষাণ হয় কী করে?'

এবার আবদুল জব্বার শেখ ঘুরে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। চোখ দুটো লাল হওয়ার উপক্রম, রাগে না দুঃখে, তা বোঝা গেলো না।

' পাষাণ? আমি পাষাণ? যে ছেলেমেয়েকে আমি রক্ত পানি করে বড় করেছে, যারা কিছু চাওয়ার আগেই সেটা তাদের সামনে হাজির করেছি,যাদের সব দিয়েছি, যাদের তিল তিল করে এত বড় করেছি তারাই যখন সকলে সামনে মুখে চুন কালি মাখায়,বড় ছেলে হয়ে যখন সকলের সামনে আমার গায়ে হাত তোলার জন্য হাত বাড়ায়, আমার মানসম্মান সব শেষ করে দেয় তখন আমার কী করা উচিত ছিল? হাততালি দিয়ে বলা উচিত ছিল, বাহ,মইনুল তুমি খুব ভালো করেছ, বাপে জায়গায়টা কোথায় সেটা দেখিয়ে দিয়েছো?'

রহিমা বেগম এবার মাথা নিচু করে নিলেন। ডান হাতে চোখ মুছলেন।

' আপনিও বা কী তাদের সাথে কম অপরাধ করেছেন? '

' তোমার মুখে লাগাম টানো রহিমা।'

আবদুল জব্বার শেখ প্রায় চিৎকার করে বললেন। বুড়ো বয়সে কুঁচকে যাওয়া মুখটা তার লাল হয়ে আসল। কপালের উপর থাকা কয়েকটা শিরা ফুলে উঠল। রহিমাকে নিজের দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। গলা নামিয়ে বললেন,

' আমার সামনে থেকে সরো। আমি এখন তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না। '

রহিমা বেগম সরলেন কই উল্টো আস্তে করে স্বামীকে এগিয়ে এসে তার হাত ধরলেন।

'ছেলে-মেয়েটাকে ক্ষমা করা যায় না?'

আবদুল জব্বার শেখ হাত ছাড়িয়ে নিলেন। এবার ঝাঁঝালো কণ্ঠে জবাব এলো,

' না, ওরা এমন এমন কাজ করেছে যা এই বংশে আগে কেউ করেনি। ওরা আমার বাপ-দাদার নাম খারাপ করেছে।'

এতোগুলো বছর ধরে শুধু এই না,না শব্দগুলো শুনে রহিমা বেগমের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। তিনি দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। কাঁদতে লাগলেন।আবদুল জব্বার শেখ স্ত্রীর কান্না দেখেও বিচলিত হলেন না। তিনি আবার তার চেয়ারে বসলেন। বইটা তুলে নিলেন, ঠিক আগের মতো, যেনও সবকিছু কত স্বাভাবিক।

রহিমা বেগম কান্না সামলে, চোখ মুছে আবার বললেন,

' আল্লাহ ওয়াস্তে ওদের ক্ষমা করেন।'

আবদুল জব্বার শেখ বই নামিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

' না। আমার একটা ছেলে আর একটাই মেয়ে। যারা আমাদের সাথে আছে। এছাড়া আমাদের আর কোনো সন্তান নেই রহিমা। মনে করে হওয়ার পরেই দু'জনে মরে গেছে। আমাদের মাত্র দুটি সন্তান এই কথাটা ভালো করে নিজের মাথায় পুরে নেও। '

তার কণ্ঠস্বর এতটাই ঠান্ডা ছিলো যে রহিমা বেগম শিউরে উঠলেন।এই কথা শুনে রহিমা বেগমের পা দুটো কাঁপতে লাগলো। তিনি প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। কোনোমতে নিজেকে সামলালেন।

' কী বলছেন আপনি? মইনুল আপনার ছেলে নয়? নয়নিকা আপনার মেয়ে না? এতোগুলা দিনে সকলের ঘরে আপনার নাতি-নাতনী চলে এসেছে। তারা তাদের দাদা-দাদি, চাচা,ফুফুদের চিনবে না? এ কেমন কথা?'

আবদুল জব্বার শেখ উঠে দাঁড়ালেন। তিনি স্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। আজ তার চোখে শুধু শূন্যতা ভর করল।

'যে সন্তানরা বাবার কথা শোনে না, সে আমার সন্তান না। আর যে নাতি-নাতনি এমন সন্তানের ঔরসে জন্ম নেয়, তারাও আমার রক্ত নয়। আমার পরিবার হলো আমার ছেলে আর আমার মেয়ে রুবিনা আর তাদের স্বামী-সন্তান। তারাই আমার আপনজন। বাকিরা পরজন।'

রহিমা বেগম আর দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

' না, মইনুল আর নয়নিকা আমার সন্তান। এদেরকে আমি দশ মাস পেটে ধরেছি, দুধ খাইয়েছি। যাদের জন্য রাতের পর রাত জেগেছি, যাদের জন্য আমার মুখে হাসি ফুটেছে তাদেরকে আমি কী করে ভুলতে পারি? আপনি ভুলতে পারেন কিন্তু আমি না। '

আবদুল জব্বার শেখ কোনো কথা বললেন না। তিনি শুধু ঘুরে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তার পিঠ শক্ত, কাঁধ সোজা হয়ে রয়ল তবে কেউ যদি তাকে খুব কাছ থেকে দেখতো, তাহলে হয়তো দেখতে পেতো তার মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠেছে। হয়তো বুঝতে পারতো, এই পাষাণ হৃদয়ের ভেতরে একটা যন্ত্রণা হচ্ছে কিন্তু তিনি এই যন্ত্রণাকে কখনোই বাইরে আসতে দেবেন না। তার কাছে তার সম্মান সবচেয়ে বড়। এর চেয়ে বড় কিছু নেই,এমনকি তার নিজের রক্তও না।রহিমা বেগম মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগলেন। তার কান্নার শব্দে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। পুরো বাড়িতে সেটা প্রতিধ্বনি হতে লাগলো কিন্তু আবদুল জব্বার শেখ নড়লেন না। স্ত্রীর দিকে ফিরেও তাকালেন না।

কিছুক্ষণ পর, রহিমা বেগম কান্না থামালেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। চোখ লাল, ফুলে গেছে। তিনি স্বামীর দিকে শেষবারের মতো তাকালেন। তারপর আস্তে করে বললেন,

'আপনি হয়তো মইনুল আর নয়নিকাকে ক্ষমা করবেন না। আপনি হয়তো তাদেরকে আপনার ছেলেমেয়ে বলে মানবেন না কিন্তু আমি কখনো তাদেরকে ভুলতে পারবো না। তারা আমার সন্তান,আমার সন্তান। আমি প্রতিদিন তাদের জন্য দোয়া করি। তাদের স্ত্রী-সন্তানদের জন্য দোয়া করি। যদি আপনি তাদের ক্ষমা না করেন,তবে আল্লাহ যেন তাদের ক্ষমা করেন। নিজে তিলে তিলে যন্ত্রণা পেয়ে আর ছেলেমেয়ে দুটোকে যন্ত্রণা দিয়ে কার লাভ হচ্ছে? '

কথাটা শেষ রহিমা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আবদুল জব্বার শেখ চোখের কোণে জল নিয়ে জানালার সামনে একা দাঁড়িয়ে রইলেন।

রহিমা বেগম অন্য ঘরে বিছানায় গিয়ে বসলেন। তার চোখ দিয়ে আবার জল পড়তে লাগলো। আবদুল জব্বার রুম আর এই রুমটা পাশাপাশি। তিনি ওই রুমের থেকে এই রুমপ বেশিভাগ সময়ে থাকেন। রহিমা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর সাইড টেবিলের ড্রয়ার খুললেন। সেখান থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন। সেবার বাড়িতে ক্যামেরা এনে সকলে ছবি তুলেছিলো, সেখানে তার পরিবার ছিলো,সবাই ছিলো।

তার হাতে থাকা ছবিতে একটা ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে যার কোলে একটা ছোট্ট মেয়ে। ছেলেটা বাচ্চা কোলে নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।বয়স তখন হয়তো সাত-আট বছর। রহিমা বেগম ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

'আমার সোনা... আমার বাবা...। '

ছবিটার উপর চুমু খেয়ে সেটা আবারও ড্রয়ারে রেখে দিলেন। আবদুল জব্বার এই ছবি দেখলে এটা ছিঁড়ে ফেলবেন। লোকটার ভয়ে নিজে সন্তানদের ছবিটাও লুকিয়ে রাখতে হয়। হায়!

এমন তিক্ত কষ্ট তিনি প্রতিদিন বয়ে বেড়ান কিন্তু কাউকে বলতে পারেন না।শোনার কেউ নেই যে তার। রহিমা বেগম বিছানায় শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করলেন। কিন্তু ঘুম আসলো না। চোখের সামনে ভেসে উঠলো অতীতের সেই সোনালী দিনগুলো।

যখন মইনুল আর নয়নিকা যখন ছোট ছিল, কত আদরে তাদের বড় করেছেন। তার ছেলে মেয়ে দুইটা পড়াশোনা, খেলাধুলা সব কিছুতে ভালো ছিল। মইনুল খুব মেধাবী ছিলো, নয়নিকাও ভাইয়ের মতো হয়েছিলো। পড়াশোনায় ভালো, খেলাধুলায় ভালো। সবাই তাদেরকে খুব পছন্দ করতো কিন্তু হুট করে কী থেকে কী হয়ে গেলো?

চলবে...

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন