#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
২৫.
শহরের পুরনো এলাকায়, সরু গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরাবী। মেয়েটার পরনে হালকা নীল শাড়ি, হাতে লেডিস্ চিকন ঘড়ি, চোখেও চিকন ফ্রেমের চশমা। মেয়েটার আজ নিজের বয়েস থেকে কম বড় লাগছে না। আরাবী দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছিলো,সে নিজের চিন্তা-ভাবনায় তালা দিয়ে আরো দুয়েক পা সামনে এগিয়ে আসল। চোখ তুলে,চশমা ঠিক করে উপরের দিকে তাকালো। উপরে একটা সাইনবোর্ড আছে,আর সেই সাইনবোর্ডে বিবর্ণ অক্ষরে লেখা 'মতিনের পুরাতন ক্যাসেট, সিডি ও বইয়ের দোকান'। দোকানটা সরু গলির শেষ মাথায় হওয়ায় এখানে তেমন লোকজন নেই। লোকজনের খুব অভাব। সে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে লাগলো। আরাবী বুঝে উঠতে পারলো না ভিতরে যাবে নাকি যাবে না। শহরের এই প্রান্তে ঠিক তেমন একটা আসা হয়নি তার। ইউনিভার্সিটির এক সিনিয়র লেকচারারের কাছ থেকে সে এই দোকানের খোঁজ পেয়েছে৷ তার মুখে কত প্রসংশাটা নাই শুয়ে নিয়েছে অল্প সময়ে। এই দোকানে নাকি আশির দশকের দুর্লভ সব ক্যাসেট পাওয়া যায়। আরাবীর বাবা সেই যুগের মানুষ, গানপাগল বলা যায়। সামনেই তার জন্মদিন। আরাবী ভাবল, পুরনো দিনের কিছু গান উপহার দিতে পারলে হয়তো বাবার খুব খুশি হবে। তার বাবার যে এসব পুরাত ক্যাসেট,সিডি জমা করতে ভালো লাগে। আরাবী ডান হাতে শাড়ির কুঁচি উঁচু করে ধরে সামনের দিকে পা বাড়ালো।
দোকানের ভেতরটায় আবছা আলো। কেমন একটা গা ঝমঝমে পরিবেশ। বাহিরে আলো থাকলেও এখানে বাহিরের আলো প্রবেশ করার উপায় নেই,বড়-বড় পুরাতন বাড়ির ফাঁকে এই ছোট্ট দোকানটা পড়ে আছে। আরাবী ভেতরে ঢুকে চারপাশে চোখ মেলে তাকালো। দোকানের একপাশের তাকে সারি-সারি বই সাজানো আছে, সেটা তার চোখে পড়লো । অন্যপাশে কাঠের আলমারিতে ক্যাসেট, সিডি। মাঝখানে একটা পুরনো কাউন্টার। কাউন্টারের পেছনে বয়স্ক একজন মানুষ বসে নিজের চোখের চশমাটা পরিষ্কার করছিলেন। তিনি কারোর পায়ের শব্দ মাথা তুলে দরজার দিকে তাকালো। দরজার কাছে আরাবীলে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন। লোকটা নরম কন্ঠে শুধালো,
' কিছু লাগবে মা?'
আরাবী নরম পায়ে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে আসল। সে নম্র কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
'আঙ্কেল, পুরনো গানের ক্যাসেট আছে? মানে আশির দশকের। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, কিশোর কুমার এনাদের?
বৃদ্ধ লোকটি আরাবীর কথায় শব্দহীন ভাবে হাসলো। চোখে চশমা পরে, চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
' তুমি একদম ঠিক জায়গায়তে এসেছো মা। এসব আমার এই ছোট্ট ভান্ডারে অঢেল পরে আছে। তুমি বসো, আমি দেখছি।'
আরাবী মাথা নাড়লো। লোকটা আরাবীর বলা ক্যাসেট,সিডি খুঁজছে। আরাবী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগলো। তার চোখ গেলো তার থেকে কয়েক পা দূরে থাকা আলমারির দিকে, সেখানে কত-শত পুরাত ক্যাসের৷ সে ধীরে ধীরে ক্যাসেটের দিকে এগিয়ে গেল। আলমারির কাচে ধুলো জমে আছে, তবু ভেতরে থাকা ক্যাসেটগুলো বেশ যত্নে রাখা,সুন্দর করে সাজানো। আরাবী শাড়ির আঁচল নিজের নাকে চাপা দিলো। আলমারি খুলে হাত বাড়িয়ে একটা ক্যাসেট তুলে নিল। এই ক্যাসেটের কভারটা হলদেটে হয়ে গেছে, কত পুরাতন যে। ক্যাসেটের উপর লেখা আবার 'হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবিস্মরণীয় গান'। ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায় ভুগল আরাবী। মনের মধ্যে অদ্ভুত অনুভূতি খেলে গেলো। এই ক্যাসেটগুলো কত হাত ঘুরে এসেছে। কতগুলো দোকানে গিয়েছে, কতবার এটা বাজানো হয়েছে। কত মানুষের অনুভূতি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে।
আরাবীর হাতের ক্যাসেট দেখতে দেখতে তার চোখ গেল পাশের তাকে সাজানো বইগুলোর দিকে। সব পুরনো বই। কিছু বইয়ের মলাট ছেঁড়া,কিছু বইয়ের পাতা ছেঁড়া কিন্তু এই পুরনো বইগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে যা আরাবীকে নিজের দিকে টেনে নিল। আরাবী ক্যাসেটটা রেখে বইয়ের দিকে এগিয়ে গেল। একটা বই তুলে নিল। ‘নীলদর্পণ’
লেখক দীনবন্ধু মিত্র। পাতা উল্টাতেই একটা পুরনো ছবি নিচে পড়ে গেল। আরাবী ভ্রু কুঁচকে নিচের দিকে তাকাল, নিচে একটা সাদাকালো ছবি পড়ে আছে। আরাবী সেটা নিচু হয়ে হাতে তুলে নিলো, ছবিতে একটা পুরো পরিবার।সকলেই হাসিখুশি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আরাবী ছবিটা একপলক দেখে সেটা আবারও বইয়ের ভেতরে রেখে দিল। সে পাতা উল্টাতেই একটা শুকনো গোটা গোলাপফুল দেখলো। ফুলটা প্রায় পাউডার হয়ে গেছে। আরাবীর কপালের ভাজ এলো। সে দেখলো এই পাতায় কালো কালিতে লেখা,
“যদি কখনো ফিরে আসো, তবে আমার অপেক্ষা করো না নীল।”
এই কয়েকটা শব্দের একটা বাক্যে কী ছিলো আরাবী জানে না। তার কেন যেনও খারাপ লাগল,খুব খারাপ।
'মিস, একটু সরে দাঁড়ান প্লিজ।'
পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর শুনে সে চমকে পেছন ফিরে তাকাল। লম্বাচওড়া সেই , প্রখর চোখের লোকটাকে তার চিনতে সময় লাগলো না। সাদমানও মেয়েটাকে চিনে নিল। আরাবী একটু সরে দাঁড়াল। সাদমান আরাবীর হাতে বই দেখে বলল,
'সাহিত্যপ্রেমী নাকি?'
সাদমানের কথায় আরাবী একটু বিব্রত হয়ে বইটার দিকে দেখাল। সে তেমন সাহিত্যের বইটই পরে না। মাঝেমধ্যে একটা দুইটা। আরাবী মৃদুস্বরে বলল,
'সাহিত্যপ্রেমী বলা যায় না তবে মাঝেমধ্যে পড়ি। '
' তাহলে এখানে আসার কারণ?'
' আসলে ক্যাসেটের খোঁজে এসেছিলাম। এই বইয়ের দিকে চোখ গিয়েছিলো তাই হাতে তুলে দেখলাম।'
'ক্যাসেট?পুরনো গান শোনার শখ আছে নাকি?'
লোকটার গোয়েন্দাদের মতো প্রশ্ন করা দেখে সে চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল। সাদমানের দৃষ্টি আরাবীর দৃষ্টির সাথে মিললো।
'না, আমার এসব শখমখ নেই। আব্বু পুরাত গান পছন্দ করেন। সামনে উনার জন্মদিন তাই ভাবছি কয়েকটা ক্যাসেট উপহার দেব। তা আপনি এখানে?'
সাদমান চারপাশে তাকালো। সে বৃদ্ধ দোকানদারকে খুঁজতে লাগলো। আগের বার কয়েকটা পুরাত ক্যাসেট খুঁজে রাখতে বলেছিলো। এই দোকানে কত-শত বার আসা হয় তার।
' আমিও ক্যাসেট নিতে এসেছি। প্রায় আসা হয়। '
' প্রথম এলাম। '
তাদের কথোপকথনের মাঝেই দোকানদার ফিরে এল। হাতে বেশ কয়েকটা ক্যাসেট। তিনি হেঁসে আরাবীর দিকে সেগুলো বাড়াল।
'এই নেও মা, দেখো কোনগুলো লাগবে। '
আরাবী হেঁসে ক্যাসেটগুলো নিলো। সে কোনো কথা বললো না। ক্যাসেটগুলো দেখতে লাগল। আরাবীর পাশে সাদমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বৃদ্ধ দোকানটার বললেন,
'বাবা,তোমার ক্যাসেটগুলো সকালে এসেছে আর তুমি এখন আসলে দেখি। দাঁড়াও এনে দিচ্ছি। '
সাদমান হেঁসে বলল,
' আজ এসে দেখি ভালোই করলাম।'
আরাবী সাদমানের কথা শুনতে পেলো না। সে ভালো ক্যাসেট খোঁজা ব্যস্থ কিন্তু এই পুরাতন ক্যাসেটগুলো হাতে নিয়ে তার সব একই লাগছে। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ সে বুঝতে পারছে না। সাদমান হয়তো আরাবীর সমস্যা বুঝলো। সে কখন থেকে মেয়েটাকে ক্যাসেটগুলো নাড়াচাড়া করতে দেখছে।
'হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই রাত তোমার আমার গানটা খুব সুন্দর। এটা নিতে পারেন। আপনার বাবার পছন্দ হবে দেখেন।'
আরাবী সাদমানের কথা শুনে ক্যাসেট থেকে চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল।
'আপনিও পুরনো গান শোনেন নাকি?'
'জি মাঝেমধ্যে পুরনো গান, পুরনো বই, পুরানো সবকিছু শোনা,হয়,পড়দ হয় আর দেখা হয়। এসব পুরনো জিনিসের মধ্যে একটা চার্ম আছে যা আমাকে তাদের দিকে টানে। এসব পুরাতন জিনিসের মধ্যে এমন কিছু আছে যা নতুন যুগের,নতুন জিনিসের মধ্যে পাওয়া যায় না।'
আরাবী সাদমানের কথায় মাথা নাড়ল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁক দেখা দিলো।
' আপনার এসব পছন্দ না?'
' পছন্দ তবে সময়ের খুব অভাব। ' আরাবী ছোট করে বলল।
'লেকচারারদের তো এসব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হয়, তাদের তো এসব পড়তেই হয়। ছাত্রছাত্রীদের যে পড়াতে হয়।'
'সেটা ভিন্ন ব্যাপার। সিলেবাসের বাইরে নিজের ইচ্ছেমতো পড়ার সময় কম।'
লোকটার সাথে কথা বলতে বলতে আরাবী বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল। সাদমান মনোযোগ দিয়ে শুনছে মেয়েটার কথা।আরাবী আর কিছু বলল না। সাদমান আবারও বই দেখতে লাগল। সেই বলল,
'তা আপনার পছন্দের লেখক কে?'
' এসব বেশি পড়া হয় না তবে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর এদের লেখা খুব পছন্দ। বাংলার ক্লাসিক সাহিত্যগুলো পড়তে ভালো লাগে। '
'আর ইংরেজি সাহিত্যের?'
' লেখক নাকি?'
' জি।'
'জেন অস্টিন, শার্লট ব্রন্টি।'
'আমারও এদের ভালো লাগে। '
'আপনি ক্লাসিক জিনিস পছন্দ করেন?'
'হ্যাঁ। ক্লাসিকে এমন কিছু থাকে যা যত বার পড়ো না কেন পরের বার পড়লে নতুন কিছু পাবে। '
আরাবী প্রতুত্তরে কিছু বলল না। সাদমান নিজেই বলল।
' তবে আমি কনটেম্পরারি লেখাও পড়ি। বিশেষ করে নন-ফিকশন, ইতিহাস, রাজনীতি।'
সাদমান আরাবীর হাতে থাকা বইটা দেখে বলল,
'আপনি কি এই নীলদর্পণ বইটা কিনবে?'
আরাবী নিজের হাতে থাকা বইটার দিকে তাকাল। সে কিছুক্ষণ ভাবল তারপর বলল,
'হ্যাঁ,ভাবছি কিনব।'
আরাবী নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। লোকটার সাথে কথা বলতে বলতে ভালোই সময় পার হয়ে গেছে। সে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল,
' সন্ধ্যা হয়ে এলো আমার এবার যাওয়া উচিত। '
সাদমান মাথা নাড়ল। আরাবী কথা বাড়ালো না। সে কাউন্টারের দিকে পা ঘুরালো।সাদমান শূন্য দৃষ্টিতে আরাবীকে দেখতে লাগলো। সে সামনের কাউন্টারের কাছে এগিয়ে গিয়ে মতিন চাচার সাথে হেঁসে-হেঁসে কথা বলছে। সাদমান নিজের হাতটা বুকে বেঁধে নিল। নিজের ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে আরাবীর চঞ্চল মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আরাবী নিজের টাকা মেটালো। মুখ ঘুরিয়ে সাদমানের দিকে তাকাল৷ সে উপলব্ধি করলো লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে তা। সে নিজের দৃষ্টি নিচু করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলো। লোকটার দিকে ভুলেও আর ফিরে তাকালো না। সাদমান নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু মেয়েকে দেখে গেলো।
চলবে...
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]