#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
২৯.
ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। তাসনিয়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মনিরুল ইসলামের জন্য চা বানাচ্ছিল। মুরাদ এখনো বাসায় আসেনি, সে বর্তমানে তার নতুন অফিসে চাকরি করে। বড়, ভালো, নামকরা অফিস হওয়াই খাটুনিটাও বেশি। তাসনিফাও বাসায় নেই, আজ সন্ধ্যায় তার একটা পড়ানো ছিলো তাই তো একটু আগে বের হলো। তাসনিয়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের কাজ করছে আর বিভিন্ন ধরনের চিন্তা ভাবনা করছে। প্রায় সাত দিনের বেশি হয়ে গেছে মনিরুল ইসলামকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসার পর। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। নতুন ওষুধ দিয়েছেন, খরচও হয়েছে অনেক। মনিরুল ইসলামের মুরাদ তার সব সেভিংস শেষ করে ফেলেছে। তারপরও দু'তিন হাজার টাকা ধার করতে হয়েছে বন্ধুর কাছ থেকে তাসনিয়ারা তার কাছে এতো ওষুধ, এতো খরচের পিছনে তাদের বাবার ঠিক কী রোগ হয়েছে সেটা জিজ্ঞাসা করলে মুরাদ উত্তর দেয় নতুন করো রোগ হয়নি আগের সমস্যার কারণে এই নতুন ডাক্তারটা এতো ওষুধ দিয়েছে। দুই বোনই নিজেদের ভাইকে নিজেদের থেকে বেশি বিশ্বাস করে তাই সহজে মুরাদের উপরে নিজেদের বিশ্বাস নিয়ে আসে আর জিজ্ঞাসা করে না৷
তাসনিয়ার মনটা অস্থির করছে। আজ মাসের শেষ দিন। হাতে টাকা পয়সাও তেমন নেই। এই বাসায় থাকতে গেলে মাসের প্রথমেই বাসা ভাড়া দিয়ে দিতে হয়।এই যে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সময় হয়ে গেছে কিন্তু হাতে যে টাকা নেই। বাবার চিকিৎসায় যা ছিল সব শেষ।
তাসনিয়া রান্না দাঁড়িয়ে ভাবছিল একটু পরে গিয়ে বাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সবটা বলে আসবে, তার কাছ থেকে আরো কয়েক দিন সময় চাইতে যাবে। মুরাদ বা সে কোনো বেতন পেলেই দিয়ে দেবে কিন্তু তার এই ভাবনার দেয়াল ভাঙ্গে দরজায় জোরে-জোরে কড়া নাড়ার শব্দে।
তাসনিয়া বিরক্ত হয়। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা অসভ্যের মতো কড়া নেড়েই চলেছে। ওপাশে যে তার ভাই বা বোন কেউ নেই সেটা সে বুঝে গেছে। এখন কে এলো সেটা তাসনিয়া বুঝে উঠতে পারছে বা। তার মনে একটা অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে দরজা খুলল।দরজার খুলতেই সে দেখলো দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রাফি।এই রাফি হলো বাড়িওয়ালার একমাত্র ছেলে,বছর তিরিশেক বয়স হবে,লম্বা চওড়া চেহারা, কিন্তু মোটেও তেমন ভালো না। লোকটার চোখের চাইনি খুবই বাজে। আজও সেই একই চাউনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাসনিয়াকে দেখেই তার মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। তাসনিয়ার লোকটাকে দেখে বিরক্ত লাগলেও কিছু করার নেই।
' আসসালামু আলাইকুম।'
তাসনিয়া নিজের বিরক্তি চেপে রেখে ছোট্ট করে বলল। মেয়েটার কন্ঠস্বর শক্ত হয়ে এলো।এদিকে রাফি জবাব না দিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দু'টো দিয়ে তাসনিয়াকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে লাগলো। লোকটার চোখের ভঙ্গি দেখে তাসনিয়া অস্বস্তি বোধ করল। সে দরজার হাতলটা শক্ত করে ধরল।
' কী ব্যাপার রাফি ভাই? এখন এখানে?'
তাসনিয়া শক্ত গলায় প্রশ্ন করল।
তাসনিয়া যে বিরক্ত সেটা রাফি বুঝলো কিন্তু সে তো এতে বেশ মজা পেলো। রাফি একটু হেসে বলল,
' আরে ভুলে গেছিস নাকি আজ মাসের শেষ দিন? কাল থেকে নতুন মাস পড়বে বাড়ি ভাড়ার টাকা দিবি কবে?তোদের ফ্রীতে থাকার জন্য বাসা ভাড়া দিয়েছি নাকি? '
তাসনিয়ারা প্রতি মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে ভাড়াটা দিয়ে দেয়। আজ সবে একত্রিশ তারিখ। লোকটা যে তাকে বিরক্ত করতে এখানে এসেছে সেটা তাসনিয়া ভালো করেই বুঝল। তবে লোকটার কথায় তার বিরক্ত লাগলো। রাগে চোখ নিচে করে নিলো তারপর আস্তে করে বলল,
' হ্যাঁ, জানি কিন্তু এবার একটু সমস্যা আছে। আব্বু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তার চিকিৎসায় অনেক খরচ হয়ে গেছে, আর কয়েক দিন সময় দিলে ভালো হতো।'
রাফি এতোক্ষণ মুখে যে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সেটা হুট করেই চলে গেলো। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিরক্ত গলায় বলল,
' তা কয়দিন লাগবে?'
' ভাইয়ার বেতন এলেই দিয়ে দেব আর মাত্র পাঁচ-সাত দিন।'
রাফি বিরক্তিতে নিজের মাথা নাড়ল। তারপর আবারও তার মুখে সেই বিরক্তিকর হাসি ফিরিয়ে নিয়ে এসে বলল,
' আচ্ছা, তা ঠিক আছে তবে একটা কথা আছে শোন।'
তাসনিয়া ভ্রুঁ কুঁচকে লোকটার দিকে চোখ তুলে তাকাল।
'কী কথা?'
তাসনিয়ার কথাটা শেষ হতেই রাফি রুমের মধ্যে একধাপ এগিয়ে এল। তাসনিয়া সাথে সাথে একধাপ পিছিয়ে গেল। রাফি নিচু হয়ে শান্ত গলায় বলল,
'তোর তো জানাই আছে আমি তোকে পছন্দ করি। বহুবার আব্বাকে বলেছি তোর সাথে আমার বিয়ে দিতে কিন্তু আব্বা বলে তোরা নাকি রাজি না। এখন প্রায়ই আব্বার কাছে শুনি তোরা সমস্যার মধ্যে আছিস, তোদের টাকার সমস্যা হচ্ছে। ভাইয়ের ঘাড়ে বসে আর কতদিন খাবি? আমি একটা সমাধান দিচ্ছি। তুই যদি আমার সাথে বিয়েতে বসতে রাজি হস , তাহলে এই বাড়ি ভাড়াটা দেওয়া লাগবে না। শুধু তাই না, তোর আব্বার চিকিৎসার সব খরচও আমি দেব। ভালো বুদ্ধি না?'
লোকটার এমন বিকৃত চিন্তা ভাবনা দেখে তাসনিয়ার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না রাফি এত নিচে নামতে পারে। লোকটা এখন তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছে। বিবাহিত লোকটার এমন চুকচুক করা স্বভাবের জন্য এই মহলেও অনেকেই তাকে পছন্দ করে না। কয়েক বছরের ছেলে আছে আবার দুদিন পরে আরেক বাচ্চার বাপ হবে কিন্তু লোকটার চরিত্র এতো খারাপ।
' কী যাতা বলছেন আপনি?'
তাসনিয়া এবার নিজের বিরক্ত চেপে রাখতে পারলো না। তার গলা রাগে কাঁপছিল। রাফি এবার তাসনিয়ার আরও কাছে এগিয়ে এল।
' যাতার কী আছে?আমি তো পরিষ্কার করেই বলছি। বিয়ে কর আমাকে তাহলে তোদের অনেক সমস্যা সমাধান হবে।'
তাসনিয়া পিছিয়ে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। তার হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করে।
' দেখন রাফি ভাই, আমার ভাই বাপ আগে থেকেই না করে দিয়েছে, না করে। তাছাড়া আমি কখনোই আপনার সাথে বিয়ে করব না। এটা আপনার মাথা থেকে বের করে নিন।'
'কেন? আমার কী সমস্যা? আমি তো ভালো চাকরি করি। তোদের থেকে আমি অনেক ভালো অবস্থায় আছি।'
'টাকা দিয়ে সব কিছু হয় না। আর আপনি যা করছেন, এটা একদম ভুল। আমাদের বিপদের সুযোগ নিয়ে এভাবে চাপ দেওয়া কোনো ভদ্র লোকের কাজ না।'
সে আরও কাছে এসে দরজার গায়ে হাত রাখল।
'দেখ তাসনিয়া, আমি তোকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি। কিন্তু তুমি যদি না বোঝো, তাহলে আমাকে অন্যভাবে চিন্তা করতে হবে। তোমরা এই বাড়িতে থাকো আমার বাবার দয়ায়। আমি চাইলে তোমাদের এখান থেকে বের করে দিতে পারি।'
'আপনি ভয় দেখাচ্ছেন আমায়?' তাসনিয়া শক্ত গলায় কথাটা বলল।
'ভয় না, সত্য বলছি। তোমার আব্বা অসুস্থ। তোমার ভাইও একটা ছোট চাকরি করে। তোমরা বেঁচে আছো কোনোমতে। আমি তোমাকে একটা ভালো জীবন দিতে চাইছি কিন্তু তুমি বুঝছো না। ভাইয়ের ঘাড়ে আর কতদিন খাবে?'
তাসনিয়ার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রাফি আবার তার দিকে হাত বাড়াতে গেল। তাসনিয়া আর থাকতে পারল না। ঠাস করে গালি থাপ্পড় বসালো।তাসনিয়া পুরো শক্তি দিয়ে রাফির গালে একটা থাপ্পড় মারল। থাপ্পড়ের শব্দটা করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো। রাফি চমকে গিয়ে তার গালে হাত দিল। তার চোখ বড় হয়ে গেল।
' কী করলি তুই?'
রাফি রাগে কটমট করে বলে উঠলো। রাগে কটমট করে রাফি তাসনিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো কিন্তু তাসনিয়া এবার আর পিছু হটলো না। সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। তাসনিয়াকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফি ভড়কে গেলো। মেয়েটার চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছে সে এখনই তাকে জ্বালিয়ে দিবে। রাফি নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,
' আমার সাথে যা করলি তা মোটেও ভালো করলি না। অনেক সাহস হয়েছে না তোর? তোর জীবনটা নরক বানিয়ে না দিতে পারলে আমার নামও রাফি না। তোদের সবগুলোকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেব। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি তোরা। '
তাসনিয়া দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে নিল। রাফির দিকে চোখ তুলে তীব্র কন্ঠে বলল,
' এখনই বাসা থেকে বের হন না হলে লোকজন ডাকব।'
' তোকে তো...'
রাফি তাসনিয়ার দিকে এগিয়ে এসে কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই তাসনিয়া টেবিলের উপর থাকা ছুরিটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে রাফির দিকে সেটা তাক করে চিৎকার করে বলল,
' এখনই বের হন বলছি। আর এক পা সামনে আগালে আপনার চোখ দু'টো তুলে আনবো বলে দিচ্ছি।'
তাসনিয়াকে এবার হিংস্র বাঘিনীর মতো হয়ে যেতে দেখে রাফি কয়েক পা পিছিয়ে এলো। সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আরো একবার তাসনিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
' দেখে নেব তোকে।'
' বের হন বলছি।'
তাসনিয়া আবারও চিৎকার করে বলল। মনিরুল ইসলাম ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছিলেন তার এতোক্ষণ যে কতকিছু হয়ে গেলো তিনি কিছুই টের পেলেন না। তাসনিয়া এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল। এসব কথা সে নিজের বাবা-ভাইকে বলবে কী করে? লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে।তাসনিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুরিটা টেবিলের উপর রাখল। সে দরজা বন্ধ করার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল মুরাদ জুতা খুলে ঘরে ঢুকছে৷ মুরাদ হাসি মুখে সামনের দিকে আসলেও তাসনিয়ার চোখে পানি দেখে তার হাসি মাখা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেলো। কপালের চামড়া কুঁচকে এলো।
' কী হয়েছে তাসনিয়া?'
মুরাদ অবাক হয়ে বোনকে জিজ্ঞাসা করল।
' ভাইয়া...'
তাসনিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মুরাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হুট করেই কাঁদতে লাগল।মুরাদ হকচকিয়ে গেলো। সে বোনের মাথায় হাত রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
' কী হয়েছে তাসনিয়া? কাঁদছিস কেন?আমাকে বল সোনা বোন।'
তাসনিয়া ভাইয়ের অনুরোধটা ফেলতে পারলো না। সে এবার কাঁদতে কাঁদতে সবটা বলে বসল, সবটা। রাফি তাকে কী বলেছিল, কেন সে রাফিকে থাপ্পড় মেরেছে, লোকটা কীভাবে তাকে খারাপ খারাপ হুমকি দিচ্ছিল। এই সকল কথাগুলো শুনে মুরাদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তার চোয়াল কঠোর আকার ধারণ করল। মুরাদ নিজের কাঁধ থেকে অফিসের ব্যাগটা একপ্রকার ফেলে৷ তাসনিয়াকে ছেড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
' দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে যা।আজ ওই জানো**টার একদিন না হয় আমার একদিন। '
চলবে...
[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]