#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৩০.
মুরাদদের নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে ঢাকা শহরের রাতের সৌন্দর্যটা ভালো করেই উপভোগ করা যায়। চারপাশে জোনাকিপোকাদের মতো জ্বলতে থাকা আলোগুলো দেখতে তার বেশ ভালো লাগে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি জ্বলতে থাকা বাতি, সামনে থাকা ব্রিজের উপর দিয়ে চলা চলন্ত গাড়ির জ্বলতে,নিভতে থাকা হেডলাইটের আলো এক কাপ চা হাতে বেশ উপভোগ করে মুরাদ। আজও অফিস থেকে আসতে রাত আটটা বেজো গেছে।সে ফ্রেশ হতে না হতেই তাসনিফা এক কাপ চা দিয়ে গেলো। মুরাদ সেই চা খাচ্ছে আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করেছে। সে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর ভাবছে এই চাকরিটা পেয়ে তাদের জীবন কতটা পাল্টে গেছে। মাত্র এক মাস আগেও তারা ছিল পুরনো ছোট্ট একটা বাসায়, যেখানে রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর সবকিছু এক জায়গায় গাদাগাদি করে ছিলো। বাথরুমের দরজা ভালো করে বন্ধ হতো না। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়তো, দেয়ালের রংগুলো আপনাআপনি খসে খসে পড়ত আর সব থেকো বড় সমস্যা ছিলো তাদের বাড়িওয়ালার ছেলে। যার জন্য তার বোনরা ভালো করে থাকতে পর্যন্ত পাড়তো না।
' এই ভাইয়া! খেতে আয়।'
তাসনিফার ডাকে মুরাদ নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসল। এর মধ্যে তাসনিফা আরো দুইবার তাকে ডাক দিলো।
' তোরা বস,আসছি। '
মুরাদ চায়ের কাপটা হাতে তুলে তাতে আবারও চুমুক দিলো।
তাসনিয়া ভাতের হাড়িটা টেবিলের উপর রেখে সে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। নতুন ফ্ল্যাটের রান্নাঘরটা বেশ বড়। আলাদা ডাইনিং স্পেস আছে। তিনটা শোবার ঘর, দুটো বাথরুম। বসার ঘরও বেশ প্রশস্ত। মুরাদের চাকরির বেতন ভালো হওয়ায় তারা এই ফ্ল্যাটটা নিতে পেরেছে। এখন এক রুমে তার বাবা থাকে, আরেকটা রুমে মুরাদ আর অন্যরুমে তারা দুই বোন।
তাসনিয়া রান্নাঘর থেকে খাবারের থালাগুলো নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে বসল। টেবিলে ইতিমধ্যে মনিরুল ইসলাম আর মুরাদ এসে বসেছে। মনিরুল ইসলামের অবস্থা এখন আগের থেকে অনেকটা ভালো। নতুন ডাক্তারের চিকিৎসায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এখন মাঝেমধ্যে তাঁর মুখে হাসি দেখা যায়, যেটা গত কয়েক বছরে তেমন দেখা যেত না। ছেলের আর্থিক উন্নতিতে যে তিনি খুশি তা সকলেই বোঝে।
'আজকের রান্নাটা অনেক ভালো হয়েছে।'
মনিরুল ইসলাম এক টুকরো মাছ মুখে দিয়ে বললেন।তাসনিয়া আর তাসনিফা একে-অপরের দিকে তাকাল।
'তোমরা দুজনেই মিলে ভালোই রান্না করেছ।'
মনিরুল ইসলাম আরো এক গলা খাবার মুখে নিয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সাথে বললেন।
'তুমি যে মাছের তরকারি দিয়ে খাচ্ছো সেটা আমরা করিনি।'
তাসনিয়া এবার নিজের ভাতটা মাখাতে মাখাতে বলল।
' কে করেছে? মুরাদ?'
' তোমার ছেলের সময় আছে নাকি?'
তাসনিফা তার বাবার গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল।
' তাহলে?'
' আমাদের নীচ তলায় সে মারিয়াম আপুরা থাকে না? সেই আপুই এসে দিয়ে গিয়েছে।'
' কখন এলো?'
মনিরুল ইসলাম ভ্রু কুঁচকে তাসনিয়াকে জিজ্ঞাসা করল।
' সন্ধ্যার পরে আব্বু।'
মুরাদ সকলের কথা শুনলেও সে চুপচাপ খাচ্ছিল। সে এখন সারাটা দিন অনেক ব্যস্ত থাকে যার ফলে রাতে বাসায় এলে সে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই নতুন অফিসে তার দায়িত্বও বেশি। প্রায়ই রাত করে বাসায় ফেরে তবে এতোকিছুর পরেও সে সন্তুষ্ট কারণ সে জানে এখন তার পরিবারের লোকজন আগের থেকে অনেক ভালো আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো এখন তার বোনেরা নিরাপদে আছে,একটু শান্তিতে আছে।
তারা সবাই মিলে খাচ্ছিলো এমন সময় মনিরুল ইসলাম হুট করে বলে উঠলেন,
' তোমাদের সবাইকে একটা কথা বলতে চাই।'
বাবার কথা শুনে তিনজনেই খাওয়া বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল। মনিরুল ইসলামের গলার স্বর শুনেই তিনজন বুঝলো তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বলবেন।
' পরের সপ্তাহে আমরা সবাই মিলে চট্টগ্রাম যাব।'
চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা শুনে তারা তিনজনই মনিরুল ইসলামের মুখের দিকে তাকালেন। তাসনিয়া আর তাসনিফা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তবে মুরাদের কপাল ভাঁজ পড়লো। সে কপাল কুঁচকে তার বাবার দিকে তাকাল। সে জিজ্ঞাসা করল,
' হঠাৎ চট্টগ্রামে?'
' হঠাৎ না ঠিক, অনেক দিনের পরিকল্পনা ছিলো ওখানে যাওয়ার কিন্তু অসুস্থ ছিলাম বলে যাওয়া হয়ে উঠেনি।'
' চট্টগ্রামে তো আমাদের কেউ নেই তবে সেখানে যাওয়ার কী বিশেষ কোনো কারণ আছে আব্বু?'
তাসনিফা অনেক কৌতূহলী স্বভাবের তাই সে নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে বসল।
মনিরুল ইসলাম হালকা হাসলেন। তিনি তাদেরকে এখনই কিছু খুলে বলতে চান না।
'কারণ তো আছে তবে সেটা এখন বলব না। চট্টগ্রামে গেলেই সবকিছু জানতে পারবে।'
' কী হয়েছে আব্বু? '
মুরাদ একটু চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
' কী হবে কিছু হয়নি তো।'
' তাহলে এতো রহস্য করছো কেন?'
' রহস্য না বাপ একটা ব্যাপার আছে যেগুলো মুখে বলার চেয়ে তোমাদের দেখানো ভালো। তোমরা সবাই চট্টগ্রামে গেলেই সবটা বুঝতে পারবে।'
মনিরুল ইসলাম খাবার খেতে খেতে শান্ত গলায় কথাটা বললেন। মুরাদ ভাবনায় পড়ে গেল। চট্টগ্রাম মানে তাকে অফিস থেকে ছুটি নিতে হবে। নতুন চাকরিতে সে এখনো তেমন বেশি দিন হয়নি। এখনই ছুটি চাইলে সমস্যা হতে পারে।
'আব্বু, আমার অফিস থেকে মনে হয় না ছুটি দিবে।'
মুরাদ ইতস্তত করে বলল।
' মুরাদ এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি বৃহস্পতিবার অফিস থেকে আসলে আমরা রাতে বের হব। শুক্রবার বিকালে আবার চলে আসব। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নেওয়ার দরকার নেই। '
' এই শরীরে তোমার যাওয়াটা কী খুবই জরুরি?'
' শুধু আমার না আমাদের। '
মুরাদ তার বাবার কথার কোনো অর্থ খুঁজে পেলো না। তবুও শান্ত কন্ঠে বলল,
'ঠিক আছে আব্বু। '
' ভালো তাহলে পরের বৃহস্পতিবার সকালে আমরা সকলে রওনা দেব। ট্রেনের টিকিট আগে থেকেই কেটে রাখব।'
মনিরুল ইসলাম ছোট করে বললেন।
এদিকে তাসনিয়া আর তাসনিফা এখনও কৌতূহলী দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু মনিরুল ইসলাম তাদের দিকে চোখ তুলে তাকালেন না। বড় ভাই কথা বলছে বলে তারা দুইজনে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার কারণ পেলো না। তারা শুধু শুনে গেলো।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ খাবার খেতে লাগলো তবে এই নিরবতা বেশিক্ষণ থাকলো না। মনিরুল ইসলাম আবারও বলে উঠলেন,
' মুরাদ,'
মনিরুল ইসলাম তাট ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
'ওই রাফির খবর কী? কেমন আছে সে?'
প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে মুরাদ চোখ তুলে তাসনিয়ার দিকো তাকাল। তাসনিয়া মাথা নিচু করে ফেলল, তাসনিফা বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে নিল। মুরাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার হাত মুঠো হয়ে এল। সে নিজেকে শান্ত করে বলল,
'আব্বু, ওর কথা জিজ্ঞাসা করছো কেন?'
'করছি তার কারণ আছে, আমি জানি তুমি কেমন। তা এখন ওর অবস্থা কেমন?'
মনিরুল ইসলাম রাফির অবস্থা কেমন তা জানার আগ্রহ নিয়ে প্রশ্নটা আবার করলেন। মুরাদ ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলল, বাবার কাছ থেকে সে কথা এড়িয়ে যেতে পারলো না।
' ভালোই আছে হয়তো।'
মুরাদ খুব বিরক্তি নিয়ে সংক্ষেপে বলল।
' ও কোথায় আছে এখন?'
মনিরুল ইসলামের প্রশ্ন তার কানে এলো। এবার মুরাদ চুপ করে রইল। সে কী বলবে? সেদিন যা করে এসেছে সেটা কি তার বাবাকে বলা উচিত?
'মুরাদ, আমি জানি তুমি রাফিকে ভালো করেই পিটিয়েছ তাই মিথ্যা বলো না। '
মনিরুল ইসলাম শান্ত গলায় বললেন।
' কে বলেছে?'
' আমি তোমাকে ভালো করেই চিনি। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। তুমি ঠিকই করেছ। একজন তোমার বোনকে অপমান করবে আর তুমি তাকে ছেড়ে দিবে আমি সেটার পক্ষে নেই। তুমি যা করেছ সেটা একজন ভাই হিসেবে তোমার দায়িত্ব ছিল।'
' আমি তেমন কিছু করিনি শুরু দুইটা ঘুষি মেরেছিলাম যারফলে রাফির মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল। নাক ভেঙে গিয়েছিল হয়তো। '
মনিরুল ইসলাম নিরবে ছেলের কথাগুলো শুনলেন।
'তারপর?'
মনিরুল ইসলাম জিজ্ঞাসা করলেন।
' তারপর আর কী লোকজন রাফিকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। পরে শুনেছি ওকে দুদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। পাঁজরে ফাটল ধরেছিল। নাক ভাঙা ছাড়াও মুখে বেশ আঘাত লেগেছে।'
' রাফি এখন কেমন আছে?'
মনিরুল ইসলাম আবার জিজ্ঞাসা করলেন।
'শুনেছি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকে ভালোই আছে তবে নাকটা একটু বাঁকা হয়ে গেছে। '
'ভালোই হয়েছে। এই বাঁকা নাক দেখলেই মনে পড়বে কী করে ও তোমার কাছে কেলানি খেয়েছে।'
তাসনিফা পানির গ্লাস হাতে তুলতে তুলতে বলল।
'যাই হোক, বাদ দেও এসব পুরনো কথা। চট্টগ্রামের যাওয়ার ব্যাপারটা ভুলো না। পরের বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমরা রওনা দেব কিন্তু। '
চলবে...
[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]