ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় অক্টোবর

৩৪তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তাসনিম

#প্রিয়_অক্টোবর

#সাদিয়া_তাসনিম

৩৪.

কয়েক মাস আগের অতীতে..

তাসনিয়ার আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে তাই সে তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে এসেছে। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটা বেশ ভালোই শুরু হয়েছে। আজ গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস না থাকলে সে আসতো না। এমনিতে মেয়েটা প্রতিদিন ক্লাসে আসে, নিজের ক্লাস করে আবার চলে যায়। কারো সাথে তেমন মিশে না। সবসময় একা-একা থাকে। ক্লাস ভালো না লাগলে লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করে তারপর ক্লাস টাইম শেষে চলে যায়। আজকাল সে তেমন একটা ক্যান্টিনেও আসে না।

রিফাত আজ ভার্সিটিতে বেশ আগে এসেছে। নিজের গাড়িটা পার্কিং-এ রেখে ক্যাম্পাসের ভেতরে হাঁটাহাটি করছে মূলত সে তার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছে তবে হঠাৎ তার চোখ পড়ল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাসনিয়ার দিকে। তার হাতে কিছু বই। মেয়েটা বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো উল্টে-পাল্টে দেখছে। মেয়েটা আর সে একই ডিপার্টমেন্ট আবার একই ক্লাসে বসে ক্লাস করে কিন্তু সে সবার থেকে দূরে থাকে, আলাদা থাকে। রিফাত তাসনিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে নির্বিকার হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়ল। নিজের অজান্তেই সে নিজের বুঁকে হাত বাধলো। অনেক্ক্ষণ সে মেয়েটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো ফাইনালি আজ সুযোগ পেলো। আজই সে তাসনিয়ার সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলবে এমন একটা আত্মাবিশ্বাস নিয়ে সে মেয়েটার দিকে পা বাড়ালো। রিফাত ধীরে-ধীরে তাসনিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। তাসনিয়া তখন বইগুলোর উপর চোখ বোলাচ্ছিল। রিফাত তার কাছে এসে দাঁড়াল। তাসনিয়া তাকে দেখল না। রিফাত গলা খাঁকারি দিল। তাসনিয়া তখনও তার দিকে তাকালো না। রিফাত একটু বিরক্ত হল কিন্তু নিজেকে শান্ত রাখল।

'এক্সকিউজ মি মিস।'

রিফাত নরম স্বরে তাসনিয়াকে বলল। তাসনিয়া এবার মুখ তুলে তাকাল। সে প্রশ্নবোধক চোখে রিফাতের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিল। তাসনিয়ার প্রশ্নোত্তর দৃষ্টি দেখে রিফাত হাসল। সে বুঝতে পারলো মেয়েটা তাকে তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

' তুমি কী লাইব্রেরি থেকে বের হচ্ছো?'

তাসনিয়া রিফাতের মুখ থেকে কথাটা শুনে মাথা নেড়ে বলল,

' হ্যাঁ'

'আচ্ছা, একটা হেল্প করবে? আমার একটা বই দরকার। লাইব্রেরিতে খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কী বলে দিতে পারবে কোথায় পাব?'

তাসনিয়া একটু ভাবুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো তারপর বলল,

' আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞাসা করুন।'

' না মানে বইটা কয়দিন আগে আপনার হাতে দেখেছিলা। '

রিফাত ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল। তাসনিয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

'কোন বই?'

' ইংলিশ লিটারেচারের একটা বই Pride and Prejudice।'

তাসনিয়া কিছুক্ষণ এই বইটার কথা ভাবলো তারপর চট করে তার মাথায় এসে গেলো। সে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল,

'ওহ। ওটা তো ফিকশন সেকশনে থাকার কথা। তৃতীয় র‍্যাকে হয়তো।'

'থ্যাংকস।'

' এখন গিয়ে দেখুন পান কিনা। আপনি ঠিকই বলেছেন কিছুদিন আগে বইটা আমিই নিয়েছিলাম এবং ওখানে রেখেছিলাম। আপনি গেলে হয়তো বইটা এখনো ওখানে পাবেন যদি কেউ না নেই তাহলে। '

'আচ্ছা তোমার নামটা কী?'

তাসনিয়ার কথাটা শেষ হতেই রিফাত অনুভূতিহীন, শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। তাসনিয়া স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

'তাসনিয়া।'

' সুন্দর নাম। আমি রিফাত। রিফাত হোসেন।'

রিফাত মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। তাসনিয়া চোখ তুলে রিফাতের দিকে তাকাল। রিফাত মৃদু হাসল তাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে। তাসনিয়া হাত বাড়ালো না এবং কিছু বললোও না। মেয়েটাকে চুপ করে যেতে দেখে রিফাত নিজেই কথা বাড়ানোর জন্য আবারও জিজ্ঞাসা করল,

'তুমি প্রতিদিনই লাইব্রেরিতে আস নাকি?'

'হুম প্রায় প্রতিদিনই আসা হয়।'

তাসনিয়া একবার হাত ঘড়িটার দিকে লক্ষ্য করল। লোকটা তো তাকে ভালোই বিরক্ত করছে। রিফাতের প্রয়োজনের থেকে যেচে পড়ে এতো বেশি কথা বলা দেখে মোটেও তাসনিয়ার সেটা ভালো লাগছে না, সে আবার সরাসরি কিছু বলতেও পারছে না। তাসনিয়া রিফাতের চোখের আড়ালেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কথাটা বলল। রিফাত আড়চোখে মেয়েটার নজরকাড়া সুন্দর মুখশ্রীটা দেখতে লাগলো। মেয়েটা কোনো অপ্সরার থেকে কোনো অংশে কম না। মেয়েটাকে দেখতে থাকলে হৃদয়ের সব দুঃখ, মনের মলিনতা উবে যেতো সময় নিবে না। রিফাত তাসনিয়ার দিকে জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল,

'আমিও মাঝে মাঝে আসি। '

তাসনিয়া রিফাতের কথা শুনলো। কপালে ভাঁজ ফেলে ছোট্ট করে বলল,

' ও আচ্ছা। '

হুট করেই রিফাত এক অযাচিত মন্ত্রমুগ্ধ কন্ঠে বলল,

' মানে এখন থেকে নিয়মিত আসব।'

তাসনিয়া সন্দিহান দৃষ্টিতে আঁড়চোখে তার দিকে তাকালো। সে বুঝলো না কথাগুলো তাকে বলার মানে কী? লোকটা আসতেই পারে এতে সমস্যা কোথায়? আর তাকেই বা বলতে হবে কেন? রিফাত বুঝতে পারল মেয়েটা তার কথার অন্য কিছু বের করবে তাই সে তাড়াতাড়ি বিষয় পরিবর্তন করল।

'তুমি কী সবসময় একা-একা থাকো?নাকি কারোর সাথে?'

হুট করে রিফাতের এমন ধরনের কথার মানে তাসনিয়া বুঝতে পারলো না তাই সে ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,

'মানে?'

রিফাত ভাবলেশহীন ভাবে জিজ্ঞাসা করল,

'মানে তোমার কী কোনো ফ্রেন্ড আছে ভার্সিটিতে?'

তাসনিয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকলো রিফাতের কথাটা শুনে।এই ছেলেটাকে সে চেনে। তারা একই ডিপার্টমেন্টে। সে জানে ছেলেটা তার সাথেই পড়ে তা তবে তাদের মধ্যে তেমন কথা হয়নি কখনো। এমনি মুখ চেনা চিনি। সে এবার রিফাতের করা প্রশ্নের মুখে পড়ে বিরক্ত হয়ে বলেই উঠল,

' আপনার জেনে কী কাজ?'

রিফাত মেয়েটাকে রাগ করতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। সে নিজের মাথা চুলকে একটু বকার মতো করে তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,

' না মানে এম্নেই। '

ছেলেটাকে ভ্যাবাচ্যাকা খেতে দেখে তাসনিয়ার ভালোই লাগলো। সে রিফাতের দিকে না তাকিয়েই বলল,

' আমার তেমন বেশি ফ্রেন্ড নেই এখানে।'

' কেন? তুমি তো মিশুক মনে হচ্ছে। ফ্রেন্ড বানাতে পারো না নাকি?'

রিফাত শূন্য দৃষ্টিতে তাসনিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

' আমি আসলে তেমন একটা কারোর সাথে মিশি না।'

তাসনিয়াও বাধ্য মেয়ের মতো আমতা-আমতা করে উত্তর দিল। মেয়েটার সহজ সরল উত্তর শুনে রিফাত অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রিফাত তাসনিয়ার দিকে তাকিয়েই আওড়ালো,

' মেশ না তবে মেশা দরকার, ভার্সিটি লাইফটা ফ্রেন্ড ছাড়া অসম্পূর্ণ। পরে অনেক আফসোস করবে। '

তাসনিয়া কিছু বলল না। তার জীবনে আফসোসের কোনো শেষ নেই। এতো বড় বড় আফসোসের ভিড়ে এই ছোট্ট আফসোসটুকু কিছুই না। সর্বদা চুপচাপ, অন্তর্মুখী স্বভাবের সে তবে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে ভুলে না।

রিফাত এবার সাহস করে স্পষ্ট কন্ঠে বলল,

' তোমার যখন ফ্রেন্ড নেই তখন চলো আমরা ফ্রেন্ড হই।'

তাসনিয়া তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

' কেন?'

রিফাত নিভে আসা কন্ঠে সরলতার সাথে বলল,

'কেন মানে? আমরা তো একই ব্যাচ। একই ডিপার্টমেন্ট। তাহলে ফ্রেন্ড হতে সমস্যা কী? '

তাসনিয়া লোকটার থেকে পিছু ছাড়াতে ছোট্ট করে বলল,

'ঠিক আছে।'

রিফাত খুশি হল। সে হাত বাড়াল তাসনিয়ার দিকে।

' ফ্রেন্ডস?'

তাসনিয়া তার হাতের সাথে নিজের হাত মেলাল না। শুধু মাথা নাড়ল। রিফাত একটু অস্বস্তি বোধ করল কিন্তু কিছু বলল না। সে উল্টো হাসল তারপর গদগদে কন্ঠে বলল,

'তাহলে আমরা এখন থেকে ফ্রেন্ড।'

তাসনিয়া চোখ তুলে রিফাতের দিকে তাকিয়ে তাকে দেখলো। তারপর লোকটার পিছু ছাড়াতে বলল,

'আমার এখন যেতে হবে। ক্লাস আছে।'

রিফাত নিজের চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে এসে চড়া গলায় বলল,

' আমার তো ক্লাস আছে। চলো একসাথে যায়।'

তাসনিয়া কিছু বললো না। সে সামনের দিকে যেতে লাগল। রিফাতও মেয়েটার পিছন-পিছন যেতে লাগল।

তাসনিয়া সামনের দিকে যাচ্ছিলো ঠিক তখনই ইটের উপরে পা বেঁকে গিয়ে সে হঠাৎ পড়ে যাচ্ছিলো তবে রিফাত তার পাশে থাকাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল। তবে তাসনিয়ার বইগুলো মাটিতে পড়ে গেল। দু'জনার চোখ শান্ত, শূণ্য, নির্জীব একে-অপরের উপরে। তাসনিয়া হুট করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। রিফাত তাকে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিলো। মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে যখন কিছুই বুঝতে পারলো না তখন নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল,

' তুমি ঠিক আছ?'

'জি, থ্যাংক ইউ পরার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। '

রিফাত স্নান হেঁসে উঠল।

' ইটস ওকে।'

তারপর সে নিচে বসে তাসনিয়ার বইগুলো কুড়াতে লাগল। তাসনিয়াও তার সাথে বসল। দু'জন মিলে বইগুলো তুলল। রিফাত বইগুলো তুলে তাসনিয়ার হাতে দিল। তাসনিয়া বইগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াল। লোকটাকে সে যত খারাপ মনে করেছিলো, লোকটা ততটাও খারাপ না৷ অন্তর্মুখী চরিত্রের মেয়েটা প্রথমবার উপলব্ধি করলো তার লোকটার সাথে কথা বলতে তেমন একটা খারাপ লাগছে না। ততটাও বিরক্তি লাগছে না। সে ছোট করে আওড়ালো,

'থ্যাংক ইউ আগেইন।'

রিফাত মেয়েটার দিকে নিজের পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রত্যুত্তরে বলল,

' ওয়েলকাম।'

রিফাত আর তাসনিয়া সামনের দিকে পা বাড়ালো। রিফাত মেয়েটার হাঁটার তালের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে একরাশ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

' আচ্ছা তুমি কী প্রতিদিন এই সময় আস?'

' আগে একবার বললাম তো।'

' তোমার হাতে কী বই? '

তাসনিয়া বইটার দিকে তাকিয়েই বলল,

'শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ।'

' এই বইটা আমার ভালো লাগে।'

তাসনিয়া এই প্রথম একটু আগ্রহী হল রিফাতের কথায়। সে সহসা নরম কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,

'পড়েছেন আপনি এটা?

'হ্যাঁ। এখানে ম্যাকবেথের ক্যারেক্টারটা খুব ইন্টারেস্টিং।'

মেয়েটাকে এই প্রথম নিজের প্রতি এতোটা মনোযোগী হতে দেখে রিফাত সহসা তরল কন্ঠে কথাটা বলল।

তাসনিয়া সামনের পানে চেয়ে সুগভীর গলায় বলল,

' ও আচ্ছা। '

রিফাত মেয়েটার সাথে আরো কথা বলতে চাইছে কিন্তু মেয়েটার মুড কেমন সেটা সে বুঝতে পারছে না। বেশি বকবক করলে যদি মেয়েটা তাকে পাগল ভাবে? রিফাত মনে মনে নিজেকে কিছু বোঝালো তারপর শক্ত একটা ঢোক গলাধঃকরণ করে আবারও আগের মতো এনার্জি অর্জন করে নতুন উদ্দামে জিজ্ঞাসা করল,

' তাসনিয়া,তুমি কী শেক্সপিয়ারের অন্য লেখাগুলো পড়েছ?'

তাসনিয়া সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে শীতল কন্ঠে উত্তর দিলো,

' হ্যাঁ। হ্যামলেট,রোমিও জুলিয়েট, অথেলো এগুলো পড়েছি।'

' শেক্সপিয়ারের লেখাগুলো আমার ভালো লাগে।'

' আমারও মোটামুটি ভালো লাগে।'

তাসনিয়ার উত্তরের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেলো রিফাতের। সে ভাবছিলো তাসনিয়ার শেক্সপিয়ার পছন্দ কিন্তু সে ভীষণ হতাশ হলো। সে নরম গলায় শুধালো,

' তোমার প্রিয় লেখক কে?'

তাসনিয়ার কিছু ভাবতে হলো না। সে চটপট বলে উঠলো,

'জেন অস্টিন, তার লেখা আমার খুব ভালো লাগে।'

রিফাত মনে মনে তাসনিয়ার বলা কথাটা নোট করে নিল কারণ পরে তাকে জেন অস্টিন সম্পর্কে জানতে হবে।

' আচ্ছা। তোমার প্রিয় বই কোনটা?'

তাসনিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,

'প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস। আপনি পড়েছেন কী?'

রিফাত তাসনিয়ার কথাটাতে না তে মাথা নাড়ল।

' না। কিন্তু শুনেছি খুব ভালো বই।'

' আপনি পড়ে দেখতে পারেন। আপনার ভালো লাগবে।'

তাসনিয়া সামনের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। রিফাত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল। সে সত্যিই মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। নিঃশব্দে ঘেরা সে অমায়িক সুন্দর হাসিটা। রিফাত আন্তরিকতার সাথে উত্তর দিলো,

' ঠিক আছে। তুমি যখন বললে তখন তো পড়ে দেখায় লাগে।'

রিফাতের সেই কথার উত্তর আর তাসনিয়া দিলো না। সে শুধু মৃদু হাসে ক্লাসের দিকে যেতে লাগলো।

কেটেছে এক সপ্তাহ আর এই এক সপ্তাহে রিফাত আর তাসনিয়ার মধ্যে একটা সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তারা এখন প্রতিদিন লাইব্রেরিতে একসাথে বসে পড়াশোনা করে। বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা করে। কখনও কখনও ক্যাফেতে একসাথে কফিও খায়। এদিকে রিফাত প্রতিদিন তাসনিয়াকে নতুন ভাবে, সুন্দর করে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করে তবে সে তাসনিয়ার অনূভুতি বুঝতে অপারগ থাকে। এই কয়দিনে সে শুধুমাত্র তাসনিয়াকে ইম্প্রেস করার জন্য জেন অস্টিনের প্রায় সব বই পড়ে ফেলেছে। তাসনিয়ার পছন্দের লেখকদের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে জেনে নিয়েছে। তাসনিয়া যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে সেও সেইগুলো নিয়ে পড়তে চেষ্টা করে।

এখন তাদের কোনো ক্লাস নেই। আবার দু'ঘন্টা পরে ক্লাস । তাসনিয়া এই সময় টুকু নষ্ট না করে লাইব্রেরিতে চলে এসেছে। সে সেখানে এসে একটা বই পড়ছিলো। ক্লাস থেকে তাসনিয়াকে বের হয়ে যেতে দেখে রিফাতও মেয়েটার পিছু পিছু বেরিয়ে এসেছে। ক্লাসে তাসনিয়া তার সাথে তেমন একটা কথা বলে না। রিফাতও ক্লাসে নিজে থেকে এগিয়ে এসে কথা বলে না। রিফাত লাইব্রেরিতে এসে তাসনিয়া যেখানে বসে আছে ঠিক তার পাশের চেয়ারেই বসল। সে খুব অস্ফুট স্বরে মেয়েটাকে ডাকলো,

' তাসনিয়া। '

তাসনিয়া বুঝলো তা পাশে কে এসে বসেছে। সে বইয়ের দিকে চোখ রেখেই উত্তর দিল,

' হুম।'

রিফাত তার ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল। সে বইটাকে তাসনিয়ার সামনে রাখলো। সে নিজের নিচের ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরে বলল,

' দেখ তোর জন্য কি নিয়ে এসেছি।'

তাসনিয়া এবার মুখ তুলে তাকাল। সে সামনে থাকা প্যাকেটটার দিকে একবার চোখ দিলো। সামনে থাকা ব্যাগটা দেখে তার মুখে সুচারু অভিব্যক্তি ধরা দিলো,

' কী?'

রিফাত বইটা তার দিকে এগিয়ে দিলো। সে বইটা ব্যাগ থেকে বের করে মেয়েটার সামনে ধরলো।

' এটা।'

তাসনিয়া বইটা দেখল। তার চোখ বড় হয়ে গেল। এই বইটা সে আর তাসনিফা কতদিন ধরে এদিকে ওদিকে খুঁজেছে কিন্তু কোথায়ও পাইনি।

'আল্লাহ্, এটা তো জেন অস্টিনের এম্মা। '

রিফাত মেয়েটার মুখে হাসি দেখে নিজেও প্রাণভরে হাসল।

' জি, তুই তো বলেছিলি তুই এটা এখনো পড়িসনি তাই তোর জন্য এনেছি।'

তাসনিয়া রিফাতের কথায় হতবাক হয়ে গেল। সে এবার একটু ইতস্তত করলো। সে আমতাআমতা করে বলল

' কষ্ট করে এটা আনতে গেলেন কেন?'

' এটা তোর গিফট।'

' কীসের?'

' সামনে তা তোর জন্মদিন তার।'

তাসনিয়া বইটা হাতে নিল। সে বইটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো।

' অনেক দাম পড়েছে তাই না?'

রিফাত মেয়েটার কথায় কাঁধ ঝাঁকাল।

'ফ্রেন্ডস ফ্রেন্ডসদের গিফট দেয় এটা স্বাভাবিক ভাই আর তুই সেখানে দাম নিয়ে পড়েছিস?'

রিফাতের কথায় তাসনিয়া রিনরিনে কন্ঠে বলে উঠলো,

' না তেমন কিছু না, শুধু আশ্চর্য হচ্ছি।'

তাসনিয়ার রিনরিনে কন্ঠস্বরও রিফাতের কাছে মায়া জড়ানো কন্ঠস্বর বলে ঠেকলো। সে নিজের কর্ণকুহর শীতল হওয়ার মতো প্রশান্তি অনুভব করলো।

' এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?'

তাসনিয়া বইটা হাতে নিয়ে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে বিগলিত হেঁসে বলল,

' তুই বুঝবি না। '

রিফাত তাসনিয়ার দিকে দৃষ্টি দিয়ে সহসাই উত্তর দিলো,

' বোঝালেই বুঝবো। বোঝা। '

তাসনিয়া এবার কথা ঘুরিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে রিফাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

'থ্যাংক ইউ।'

রিফাত আগের কথাটা ভুলে বসলো। ঠোঁটের কোণে মারাত্মক সুন্দর হাসি ফুটিয়ে বলল,

'ওয়েলকাম ম্যাম।'

তাসনিয়া নিজের ভ্রুজুগল কুঁচকে নিলো।

' আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?'

রিফাত সহসা উতলা ভঙ্গিতে প্রত্যুত্তর করলো,

' হ্যাঁ অবশ্যই।'

তাসনিয়া প্রশ্নটা করবে করবে করেও করতে পারছে না। ভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই তার রিফাতকে ভালো লাগে। ওই ছোট্ট একটা ক্রাশ আছে বলতে গেলো তাই তো ছেলেটার উবছে এসে কথা বলা তার কাছে খারাপ লাগে না। তাদের মধ্যে ক্ষণকালের নিরবতা অতিবাহিত হলো। তাসনিয়া এই নিরবতাকে ভেঙে ছোট্ট করে জিজ্ঞাসা করল,

' ভার্সিটিতে এতো লোক থাকতে আমার মতো মেয়ের সাথেই এসে আপনি বন্ধুত্ব করলেন কেন?'

তাসনিয়ার এমন কথায় রিফাত একটু থমকে গেল। মেয়েটার কথা শুনে সে থমকে যাওয়ার বদলে তার চোখেমুখে আশ্চর্য এক যাতনা দেখা দিলো। সে একটু আমতাআমতা করে ধাতস্থ স্বরে বলল,

' সত্যি বলতে তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। তুমি অন্যদের থেকে অনেক ভিন্ন তাই।'

এক অযাচিত বিষ্ময়ে তাসনিয়ার চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো।

'ভিন্ন মানে?'

রিফাত মেয়েটাকে মোহগ্রস্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করে সরল গলায় বলল,

'মানে তুমি অন্যদের মতো না। তুমি অন্য রকম যেটা বলে বোঝানো সম্ভব না।তাছাড়া আমার তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।'

তাসনিয়া রিফাতের কথা শুনে নিজের চোখ জোড়া নামিয়ে নিলো। তার ভেতরে ভেতরে নৈঃশব্দ্যে খেলে গেলো অভূতপূর্ব তড়িৎ।

' তুমি কী এখন ফ্রি আছো?'

রিফাত তাসনিয়ার ভ্রম কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল। তাসনিয়া তার দিকে তাকাল। সে রিফাতের কথায় একটু নড়েচড়ে বসল।

' দেখতেই তো পারছেন। কেন কিছু দরকার নাকি?'

রিফাত তাসনিয়ার দিকে নির্জীব দৃষ্টি দিয়ে ছোট্ট করে বলল,

' আমি ভাবছিলাম আমরা ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে যেতে পারি। তুমি যদি চাও।'

তাসনিয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। সে কোনো প্রত্যুত্তর করতে পারলো না। মেয়েটাকে চুপ থাকতে দেখে রিফাতই নিচু গলায় ডেকে বলল,

' তাসনিয়া।'

' আমি সাধারণত ক্যাফেটেরিয়ায় যাই না।'

মেয়েটার কথায় রিফাত নিজের চেহারাই গম্ভীর ভাব আনলো।

' কেন?'

তাসনিয়া নির্বিকার ভাবে উত্তর দিলো,

' সেখানে অনেক লোক থাকে। আমি ভিড় পছন্দ করি না।'

রিফাত বুঝল তাসনিয়া কী পরিমাণের ইন্ট্রোভার্ট। মেয়েটার এমন সহজসরল স্বীকারোক্তি তার বড় ভালো লাগলো। সে তাড়াতাড়ি বলল,

'ঠিক আছে। তাহলে আমরা ক্যাম্পাসের বাগানে যেতে পারি। এখানকার পরিবেশটা ভালো।'

মেয়েটা ছোট করে আওড়ালো,

' ঠিক আছে চলেন।'

সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তে এখানো কয়েক ঘন্টা বাকি। সূর্যের সুন্দর আলো চারিদিকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তাসনিয়া একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে। রিফাত দুইটা কফির কাপ নিয়ে তাসনিয়ার দিকে এগিয়ে আসল। তাসনিয়ার মাথায় তখন বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মস্তিষ্কের ভেতরে কেমন যেনও কুটকুট করছে। রিফাত এগিয়ে এসে তাসনিয়ার দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিলো।তাসনিয়া মাথা তুলে সেটা দেখলো। রিফাত বিগলিত হেঁসে বলল,

' তোমার জন্য।

তাসনিয়া হাস্যেজ্জল মুখে রিফাতের হাত থেকে কাপটা নিল।

'থ্যাংক ইউ।'

এখানে তেমন কেউ নেই তাই রিফাতই মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

' চলো সামনে গিয়ে বসি ওখানে হয়তো লোকজন আছে।'

তাসনিয়া কোনো কথা বললো না। তারা দু'জন ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করল। চারপাশে ফুলের গাছ, বিস্তৃত সবুজ ঘাস, এখানে আবার অনেক ফলের গাছও আছে। বাগানটা সত্যিই সুন্দর। তারা সামনে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসল।

'জায়গায় ভালো লাগছে।'

তাসনিয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল।

' ভালো লাগারই মতো,আমি মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে নিয়ে এখানে আসি। ভালো লাগে।'

রিফাতও নিজের কফির কাপে চুমুক দিয়ে নমনীয় গলায় বলল। তারা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর রিফাতই আগ বাড়িতে কথা বলল,

'তাসনিয়া, তুমি কী সবসময়ই এমন?'

তাসনিয়া তৎক্ষনাৎ রিফাতের দিকে তাকালো।

' মানে?'

'মানে তুমি কী সবসময় কেমন যেনও গম্ভীর দিদিমণিদের মতো বসে থাকো।'

তাসনিয়া রিফাতের কথায় হাসলো তবে মেয়েটার হাসি বেশিক্ষণ থাকলো না। তার কন্ঠে অব্যক্ত এক ব্যথা ফুটে উঠলো। সে ওই অব্যক্ত ব্যথা নিয়েই বলল,

' আমি ছোটবেলা থেকেই এমন। আমি বেশি মানুষের সাথে মিশতে পারি না। আমার সবসময় মনে হয় আমি অন্যদের থেকে আলাদা।'

' এমন কেন?'

তাসনিয়া প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,

' আম্মু মারা যাওয়ার পর থেকেই আমরা তিন ভাইবোন এমন হয়ে গিয়েছি।'

মেয়েটার উত্তর শুনে রিফাত একদম চুপ হয়ে গেলো। সে মেয়েটাকে কী উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারলো না। সে কথাটা না তুললো মেয়েটার হয়তো কষ্ট পেত না। সে ছোট্ট করো বলল,

' ও আসলে সরি আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। '

তাসনিয়া মুখে চওড়া হাসি টানার চেষ্টা করে বলল,

' আরে সমস্যা নেই।'

' তাসনিয়া'

নরম কন্ঠে তাসনিয়াকে ডাকলো রিফাত।

' হ্যাঁ?'

' তুমি আমাকে বিশ্বাস কর?'

এমন কথা শুনে তাসনিয়া তার দিকে তাকাল। রিফাতের মুখ থেকে এমন ধরনের কথা শুনে সে কথার উত্তর দিতে নিজের অজান্তেই হোচট খেতে লাগলো। তবুও সে উদ্বেলিত হৃদয়ে রিফাতের দিকে তাকালো। লোকটা মুগ্ধ চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এই কয়কটা দিনে তাসনিয়া রিফাতের সাথে মিশে ভালো করেই বুঝো গেছে লোকটা তাকে বন্ধুর থেকে বেশি কিছু ভাবে। অন্য ভাবে, নিজের প্রিয় কেউ মনে করে গুরুত্ব দেয়।

' হুম।'

মেয়েটার এমন উত্তরে রিফাতের মনে একটা যন্ত্রণা হল। সে আর কোনো কথাই বলতে পারলো না। তারা আরো কিছুক্ষণ বাগানে বসে রইল। এবার তাসনিয়াই বেশি বেশি কথা বলতে লাগলো। সে তার জীবনের কথা, তার পরিবারের কথা বলল। রিফাতও চুপচাপ সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনল। এবার তাসনিয়ার কথাগুলো শুনে রিফাতের মেয়েটার প্রতি আলাদা একটা দুর্বলতা তৈরি হলো। সে কী মেয়েটাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে? হয়তো।

এদিকে সন্ধ্যা নামবে কিছু পরে।

'আমার এখন যেতে হবে।'

তাসনিয়া নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে বলল।

' আমি একটু পরে যাবো চলো, তোমাকে গেইট পর্যন্ত পৌঁছে দিই।'

তাসনিয়া কিছু বললো না। রিফাত মেয়েটার পিছুপিছু হাঁটতে লাগল। তারা দু'জন গেইটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রিফাত সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,

' আজকের দিনটা আমার খুব ভালো লেগেছে। থ্যাংক ইউ এতোক্ষণ সাথে থাকার জন্য।'

' আমারও ভালো লেগেছে।'

তাসনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে। একরাশ অনূভুতি নিয়ে কথাটা বলল।

চলবে....

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন