#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৩. প্রথম অংশ
‘আপনি কি প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে দেবদাস হয়ে গেছেন? মনের মানুষ কি অন্য কারো সাথে রিকশায় ঘোরে? আর নেই চিন্তা! আর নেই চিন্তা, বিশেষ ভাবে বানানো তাবিজ নিয়ে আপনাদের মাঝে হাজির হয়েছে সায়ান বাবা। একটা তাবিজই যথেষ্ট। আগের প্রেম ফিরে পেতে সফল না হলে পয়সা ফেরত, সাথে এক বোতল সরিষার তেল ফ্রি, যা মাথায় মাখলে আপনার সব চিন্তা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। তাছাড়া এ তাবিজটা ব্যবহার করলে নতুন নতুন রমণীরাও আপনার পিছনে মৌমাছির মতো ঘুরঘুর করবে। তারপরে বেশি বাড়াবাড়ি করলে আপনার পশ্চাৎদেশ হুল ফোটাতে সময় নিবে না। ’
সাফওয়ান ছাঁদে দাঁড়িয়ে সিগারেটের টান দিচ্ছিলো ঠিক তখন হুট করে সায়ান কোথা থেকে তার পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে উঠলো। সাফওয়ান বিরক্তিকর চোখে তার দিকে তাকাল।
-‘ সমস্যা কী তোর?’
-‘তোর সমস্যা কী?’
-‘কোনো সমস্যা নেই।’
-‘ সিগারেট খাচ্ছিস কেন?’
সায়ান রেলিং এর কাছে দাঁড়িয়ে তার উপর ঝুঁকে নিজের ভাইকে দেখলো দুর্ধর্ষ,সুদর্শন সাফওয়ান। সায়ানের মনের হয় তাদের ভাইদের মধ্যে সে বাদে সকলেই দুর্ধর্ষ সুদর্শন।
-‘এখন কী সিগারেটও খাওয়া যাবে না?’
সাফওয়ান বিরক্ত। সাফওয়ানের বিরক্তি দেখে সায়ান চুপ করে রইল। সায়ান এসেছিলো ভাইকে কিছু বলার জন্য কিন্তু সে আজ তার ভাইকে যৌত্তিক, অযৌক্তিক, নৈতিক, অনৈতিক কিছু বললো না। লম্বা,চওড়া,সুঠাম একইভাবে বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্ববান, সৌম্য মুখের আকর্ষণীয় সায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
-‘ হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন:
মানুষের কষ্ট দেখাও কষ্টের কাজ। আবার মানুষের আনন্দ দেখাও আনন্দের কাজ। যে চলে যায়, সে তো চলেই যায়। তার জন্য পড়ে থাকা মানে নিজের জীবনকে অপচয় করা। জীবন বহমান, আজ যে পাশে আছে তাকে নিয়েই হাসতে শেখো। ’
সিগারেটে টান দিয়ে সাফওয়ান হালকা হাসল। সায়ানের দিকে তাকালো না। নিজের দৃষ্টি শূণ্যতে রেখে বলল,
-‘শূন্য স্থান পূর্ণ না হলে নতুন কিছু জন্ম নিতে পারে না। যে গেছে সে জায়গা করে দিয়েছে বলেই আজ আমার পাশে অন্য কেউ দাঁড়াতে পারছে।’
সায়ান অবাক হলো। সে ভাবলো সাফওয়ান হয়তো লাবণ্যের কারণে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছে কিন্তু তেমন কিছুই না। সায়ান এবার নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ সাফওয়ানের দিকে দিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
-‘ কোনো সমস্যা হয়েছে ভাইয়া?’
সাফওয়ান আঁড়চোখে সায়ানের দিকে তাকাল। সায়ান সাধারণ তাকে ভাই বলে ডাকে "ভাইয়া" শব্দটা বের করছে অর্থাৎ সায়ান এখন সিরিয়াস মুডে আছে। সাফওয়ান পাথরের মতো থমথমে গলায় বলল,
-‘ কোনো সমস্যা নেই। আর আমি থাকতে তোদেরও কোনো সমস্যা হতে দিব না।’
-‘ কী হয়েছে সত্যি করে বল? ’
-‘অফিসের একটা ঝামেলার মধ্যে আছে।’
সায়ান চুপ করে শুনলো। সাফওয়ান আবারও বলল,
-‘কিছুর হিসাব মেলাতে পারছি না ভাই। ’
-‘ কী হয়েছে তোর আমাকে অতন্ত্য বল।’
সাফওয়ান সিগারেট ফেলে সায়ানের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলে,
-‘ অফিসের বিশষ বুঝবি তুই? সামনে তোর বিশ্বকাপ, খেলায় মনোযোগ দে।’
সায়ান চুপ রইল৷ সে চুপ করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সাফওয়ানের চোখমুখ দেখতে লাগল।
....
উদাম হয়ে খাবার টেবিলে বসে আছে সায়ান তার পাশে আসমা বেগম। আসমা বেগম ছেলেকে গালে তুলে খায়িয়ে দিচ্ছে। মইনুল শেখ সহ সকলে খাবার টেবিলে বসেছে। সায়ানের মেদহীন ঝরঝরে ত্বক থেকে মুক্তোদানার মতো পানির বিন্দু চিকচিক করছে। সায়ানের বাড়িতে আসলে এই ত্রুটিহীন,নিটোল সায়ানকে চোখে পড়া সাধারণ একটা ব্যাপার । মইনুল শেখ সায়ানের এমন কাজে বিরক্ত হন কিন্তু আসমান বেগমের জন্য কিছু বলতে পারেন না। মইনুল শেখ নির্নিমেষ একবার তাদের দিকে চেয়ে বলল,
-‘ বুড় বয়সে গালে তুলে খাওয়াতে হচ্ছে কেন?’
সায়ান মইনুল শেখের কথা শুনে আঁড়চোখে বাপের দিকে তাকালো। ফোঁড়ন কেটে বলল,
-‘ আব্বুর মনে হয় হিংসা হচ্ছে। আম্মু আব্বুর গালেও দেও একটু। ’
মইনুল শেখ খাবার গালে তুলে না রাগার চেষ্টা করল। তিনি ভালো করেই জানেন সায়ান তাকে রাগানোর জন্য কথাটা বলেছে কিন্তু সে মোটেও কোনো প্রকার রাগ করবে না। তিনি শীতল কন্ঠে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে উচ্চারণ করল,
-‘ হিংসা হবে কেন? তুমি না হয় প্রতিবন্ধী তাই তোমাকে খাওয়া দিচ্ছে আমি তো আর না। ’
সায়ান পানিতে চুমুক দিচ্ছিলো। সে আস্তে ধীরে পানিটা শেষ করে চট করে উত্তর দিলো,
-‘ ঠিক বলেছো প্রতিবন্ধী। মাঝে মাঝে আমার নিজেকে প্রতিবন্ধী লাগে।’
মইনুল শেখ চুপ থাকলেন। রুক্ষ হাতে পানির গ্লাসটা টেনে নিলেন। সাহাদ চিবুকে হাত ঠেকিয়ে বলল,
-‘ তুমি তো সব দিক থেকেই ঠিক তাহলে প্রতিবন্ধী লাগে মানে?’
মইনুল শেখ এবার খাবার মুখে দিয়ে বলল,
-‘ ও দেখ এক্ষুনি বউ প্রতিবন্ধীর কথা বলবে। ’
সকলে মইনুল শেখের দিকে তাকাল। মইনুল শেখ বুঝল কেন তারা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ছোট করে বলল,‘ এই ছেলের হাবভাব দেখলে আমি বলতে পারি সে কখন কী বলবে তা।’
সায়ান তার বাবার দিকে চুমু ছুঁড়ে দিলো। মইনুল শেখ বিরক্ত নিয়ে বলল,
-‘ এর হাবভাব দেখ, এমন করছে যেনও আমরা জীবনে ওর বিয়ে দিব না। ’
সায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে বলল,
-‘ দিচ্ছ কই?’
মইনুল শেখ বিরক্ত হলো।সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-‘এতো তাড়া থাকলে আগে থেকে বলতে আমার বন্ধুর মেয়ে তোমার মতো রাম ছাগলকে বিয়ে করার জন্য এক পায়ে খাড়া৷ বিয়ে করার এতো তাড়া থাকলে এখনই ফোন করছি। ’
মইনুল শেখ জানেন ছেলে এখন কিছুতেই বিয়ে করবে না সে তো তাকে বিরক্ত করার জন্য কথাগুলো বলছে কিন্তু সায়ানের কথা শুনে তিনি নিজের ভ্রুঁ কুঁচকে নিলেন।
-‘তোমাদের কষ্ট করে মেয়ে দেখতে হবে না মেয়ে আমার দেখা আছে। ’
সকলেই একসাথে বলে উঠলো, ‘ মানে?’
‘ এসব মানে টানের কিছু নেই। মেয়ে আমার দেখা আছে বিয়ে করলে আমি ওকেই করব।’
মইনুল শেখ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
-‘ মেয়ের নাম কী?’
-‘ ফারাবী।’
সায়ানের এমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে সকলে অবাক হলো। সাদমানের কাশি উঠে গেলো। এই ছেলের নরজ তার শালিকার উপরে? আরাবী যাওয়ার আগে ফারাবী খেয়াল রাখতে বলেছিলো কিন্তু এই দস্যুর হাত থেকে নিজের শালিকাকে বাঁচাবে কী করে??
.....
তাসনিফা তার ভাইয়ের রুমটা গোছাচ্ছে। আজ কতগুলো দিন হয়ে গেলো রুমটা ভালো করে গোছানো হয় না। মুরাদরা বসার রুমে বসে টিভি দেখছে। তাসনিফা দ্রুত হাতে নিজের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছে। সে বিছানা বদলে নতুন বিছানা বিছিয়ে দিলো। বিছানা পরিষ্কার করার সময় বিছানার নিচ থেকে তার হাতে কিছু পুরাতন কাগজ এসেছিলো সেগুলো রাখার জন্য মুরাদের টেবিলটা খুললো। তাসনিফা কাজগুলো ভালো করে দেখে নিল। এগুলে এখন আর কোনো কাজে না। সে মুরাদের টেবিল খুলে নিচে ঝুঁকল। টেবিলের একপাশে অনেক কাগজ একসাথে করা। তাসনিফা কাগজগুলো সেখানে রাখলো, পাল্লা লাগাতে গেলো কিন্তু লাগলো না। সে আবারও নিচু হয়ে পুরাতন কাগজগুলো ঠেসেঠুসে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু তাও কাজ হলো না। সে বিরক্ত হলো তবে ধৈর্য নিয়ে বসে কাগজগুলো বের করে সব একে একে গোছাতে লাগলো। এলোমেলো হয়ে আছে বলে পাল্লা লাগছে না। পুরাতন কাগজগুলো গোছানোর সময় হুট করে তাসনিফার চোখে চকচকে কিছু কাগজ পরল। তাসনিফা কৌতুহলী হলো।
তাসনিফা সেগুলো একে একে টেনে বের করল। দুই থেকে তিনটা কাজ বের হলো। কাগজে চোখ বোলাতেই সে পাথরের ন্যায় বসে রইল।
তাসনিফা রুম থেকে বের হচ্ছে না দেখে তাকে সাহায্য করতে মুরাদের রুমে তাসনিয়াও আসল। মুরাদের রুমে আসতেই সে থমকে গেলো। তাসনিফার চোখ থেকে পানি পড়ছে। তাসনিয়া দ্রুত পায়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে এসে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
-‘ কী হয়েছে তাসনিফা? কাঁদছিস কেন?’
#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৩.দ্বিতীয় অংশ
মইনুল শেখ হাঁসফাঁস করলেন। মইনুল শেখকে নিজেদের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সায়ান সাজিদের উদ্দেশ্য বলল,
‘ এসিটা দে সাজিদ। কেউ একজন দেখছি হাঁসফাঁস করছে। ’
মইনুল শেখ খাওয়া থামালেন। ছেলের দিকে বিরক্তিকর চোখে তাকালেন এই শীতে এসি দিতে বলছে শয়তানটা? চোখ ছোট্ট করে উঁচু গলায় বললেন,
‘ ফারাবী মানে? কোন ফারাবী? আরাবীর বোন?’
বাবার এমন কথা শুনে সায়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো। ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেলো। সে একটু দম নিয়ে বলল,
‘ সেই ফারাবী ছাড়া তুমি আর কতগুলো ফারাবীকে চেনো?’
‘ মেয়েটাকে যতবার দেখেছি ততবারই ভালো লেগেছে। কী সুন্দর শান্ত, ভদ্র, নরম গোছের একটা মেয়ে। ’
আসমা বেগম খুশি হয়ে বললেন। মায়ের মুখে হাসি দেখে সায়ানও হাসল। সায়ানকে হাসতে দেখে তৎক্ষনাৎ সাজিদ বলল,
‘ ভাই তুই কী ব্লাশ করছিস?’
সায়ানের চওড়া হাসি কমে এলো। সেটা দেখে সাদমান আর সাফওয়ান হাসল। সায়ান চোখমুখ বিকৃত করে বিরক্ত নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে বলল,
‘ তোর মতো হিজরা নাকি আমি?’
সাজিদ মুখ বাকালো, বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘ আমি হিজরা নাকি হিজরা না সেটা তুই ভালো করেই জানিস।’
' ইয়াক ছিঃ সাজিদ, আমি মোটেও গে না।’
সায়ান দাঁত বের করে নাক চেপে বলল। সাহাদ পেট চেপে হাসল। অন্যরাও হাসল।
সাজিদ আঁড়চোখে তার ভাইয়ের দিকে তাকাল।
মইনুল শেখ ক্ষীণ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি হুট করে প্রশ্ন করল,
‘ মেয়েটা কী তোমাকে পছন্দ করে?’
সকলের চোখ সায়ানের দিকে। সে ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির অস্তিত্ব বজায় রেখে বলল,
‘ অল্প অল্প করে।’
মইনুল শেখ বিরক্তি হল,
‘ মজা করছি না সায়ান। ’
আসমা বেগম উল্টো বলল,
‘ বলল তো পছন্দ করে তাহলে আবার জিজ্ঞাসা করছ কেন?’
সায়ান হেঁসে তার মায়ের বাম হাত তুলে তাতে চুমু দিলো। নরম গলায় বলল,
‘ তোমার বরকে গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার দরকার ছিলো এমন ভাবে একটার পর একটা এমন এমন প্রশ্ন করছে যেনও আমি প্রেম করে কোনো অপরাধ করে ফেলেছি।’
মইনুল শেখ বিরক্তি চোখে ছেলের দিকে তাকাল। আসমা বেগম ছেলের মুখে খাবার দিলেন। সায়ান এবার সিরিয়াস হয়ে বলল,
' এখনই ফারাবীর পরিবারকে কিছু বলার দরকার নেই ওর এমবিবিএসটা শেষ হোক তারপরে না হয় কথা বল। ’
মইনুল শেখ বিরক্তি গলায় বলল,
‘ তুমি যখন এতোকিছু ভেবে রেখেছ তখন না হয় একা গিয়েই বিয়েটা করে নিয়ে এস।’
সায়ান পানি খেলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ আমি একটা গিয়ে বিয়ে করে আসলে তুমি সহ্য করতে পারবা তো? ’
মইনুল শেখ কিছুসময় চুপ থাকলেন। কী উত্তর দিবে বুঝতে পারলেন না। নিজের মুখে গাম্ভীর্য টেনে বললেন,
‘ সহ্য করতে না পারার কী আছে?’
সায়ান তার বাবার মুখ দেখে ঠোঁট চেপে হাসল। লোকটা মচকাবে কিন্তু ভাঙ্গবে না। তবে সায়ান এবার ভাঙ্গল। সে নরম গলায় বলল,
‘ কিন্তু আমার যে সহ্য হবে না। আমি যে তোমাদের কাউকে বাদে বিয়ে করব না। তোমাদের কাউকে বাদে যে আমি আমার সুখ টুকু কল্পনা করতে পারি না। ’
সায়ান হেঁসে কথাটা বলল তবে সায়ানের শেষের কথাটা টুকু শুনে খাবার টেবিলে থাকা তিনজনের মুখ থেকে হাসি মলিন হয়ে গেলো। মইনুল শেখ মাথা নিচু করে নিজের খাবারে মনোযোগ দিল।
......
তাসনিফা কাগজগুলোর দিকে নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখের সামনে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, স্টেজ থ্রি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশনসহ আরো কতশত শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। হাতের কাগজগুলো এতটাই কাঁপছে যে লেখাগুলো পড়তে তার কষ্ট হচ্ছে তবে এইটুকু সয়মের মধ্যে তাসনিফা যা পড়েছে, সেটাই অনেক ছিলো সবকিছু বুঝে যাওয়ার জন্য।তাসনিয়া যখন রুমে প্রবেশ করল রুমে সাদা আলো তির্যকভাবে তাসনিফার মুখে এসে পড়ছিল। সেই আলোতে তার গাল দিয়ে বেয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো চিকচিক করছে। তাসনিয়া সেটা দেখে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে গেলো। তাসনিফা নীরব, নিথর পাথরের মতো বসে আছে। তাসনিয়া ক্রন্দনরত তাসনিফার দিকে এগিয়ে এসে স্তিমিত কন্ঠে বলল,
-‘কী হয়েছে তাসনিফা? কাঁদছিস কেন?’
তাসনিফা বোনের দিকে তাকালো তবে কিছু বলতে পারল না।সে কাঁপা হাতে মেডিকেল রিপোর্টগুলো তাসনিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। তাসনিয়া টুঁশব্দ না করে কাগজগুলো হাতে নিয়ে প্রথম পুরো রিপোর্টটা দেখল তারপর আরো দুইটা রিপোর্ট দেখলো।সেগুলো দেখে তার মুখে কালো মেঘেরা নেমে এলো। মুখের রংটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। হাত দুটো অসাড় হয়ে আসল।
-‘এটা... এটা আব্বু?’ তাসনিয়া অবিশ্বাস্য কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল।তাসনিফা মাথা নাড়ল। শরীর কাঁপছে তার।
-‘ক্যান্সার... আব্বুর ক্যান্সার হয়েছে আপু। আর সেটা প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে থেকে। ’
বাইরে থেকে টিভির শব্দ ভেসে আসছিল, মুরাদ হয়তো কোনো খবর দেখছে আর মনিরুল ইসলাম তার পাশেই বসে আছে। তাসনিয়ার হাত থেকে রিপোর্টগুলো পড়ে গেল। সাদা কাগজের পাতাগুলো ছড়িয়ে গেল কালো মেঝের চারপাশে।
ড্রয়িংরুমে বসে মুরাদ আর মনিরুল ইসলাম টিভি দেখছিল। মুরাদ চুপচাপ বসে টিভির দিকে চোখ দিয়ে আছে আর মনিরুল ইসলাম হাতের উপরে মাথাটা একটু হেলিয়ে রেখেছে। তাসনিয়া আর তাসনিফা ড্রয়িংরুমে আসল। মুরাদ তার বোন দুটোর চোখমুখের অবস্থা দেখে অবাক হলো। তাসনয়িা তার বাবার দিকে তাকাল, গত ছয় মাসে মনিরুল ইসলাম অনেক বুড়িয়ে গেছেন। মাথার চুল কমে গেছে, সাদা চুলের সংখ্যা বেড়ে, মুখের বলিরেখা নষ্ট হয়েছে, শরীর আগের থেকেও বেশি দূর্বল হয়েছে কিন্তু এসব তাসনিয়া আর তাসনিফা লক্ষ্য করেনি বা লক্ষ্য করলেও ভাবেনি ।
-‘ভাইয়া।’
তাসনিয়ার শান্ত, শীতল কণ্ঠস্বর শুনে মুরাদ চমকে উঠল।সে এবার লক্ষ্য করলো তাসনিফার হাতে কিছু কাগজ। মুরাদের চোখ সেই কাগজগুলোতে পড়তেই তার মুখের ভাবটা বদলে গেলো। সব বুঝে গেল সে।
-‘এগুলো কী ভাইয়া?’ তাসনিফা এগিয়ে এসে মুরাদের সামনে কাগজগুলো সেন্টার টেবিলের উপর রাখলো। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু সে চেষ্টা করছিল শক্ত থাকতে। মুরাদ কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।
-’ভাইয়া, আমি জিজ্ঞেস করছি - এগুলো কী?’
তাসনিয়ার কণ্ঠে এবার কাঠিন্য এল। চারিপাশে পিনপতন নীরবতা। মনিরুল ইসলাম মেয়েদের মুখ দেখে আর ছেলের নিচু করে থাকা মুখটা দেখে অনেককিছু বুঝে গেলো। টিভি থেকে নিউজ রিডারের গলার স্বর ভেসে এসে তাদের মধ্যকার নিরবতাকে বাড়িয়ে দিলো।মনিরুল ইসলাম টিভির রিমোট তুলে নিয়ে বন্ধ করে দিল।
-‘আব্বুর ক্যান্সার হয়েছে,চার মাস আগে রোগ ধরা পড়েছে। আব্বু কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। এত বড় একটা কথা তুমি আমাদের বললে না কেন?’
মুরাদের চোখে পানি কিচকিচ করছে। সে চায়নি এতোদিন ধরে সে আর তার বাবা যে দুঃখ, কষ্ট, বেদনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর কিছু বোনদের স্পর্শ করুক। মুরাদ মুখ তুলে বোনদের দিকে তাকাল। নরম,মসৃণ কন্ঠে বলল,
-‘ বিশ্বাস কর বোন. আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি।’
-‘পারোনি? পারোনি মানে কী ভাইয়া? ’
তাসনিয়া এগিয়ে আসলো। সে তার বাবার সামনে বসল, তার হাঁটুর ওপর হাত রাখল। তাসনিফাও এগিয়ে এসে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। তাসনিয়া আর তাসনিফা দু'জনেই কেঁদে দিলো,এতোক্ষণ ধরে তারা কান্না চেপে দাঁড়িয়ে ছিলো কিন্তু এখন আর কান্না চেপে রাখতে পারলো না। মনিরুল ইসলাম চোখের কোণেও পানির বিন্দু চিকচিক করল। তবুও সে মেয়েদের সামনে ভেঙে পড়লেন না। তার জীবনে
অভিশাপ লেগেছিলো, শেখ সাহেবের অভিশাপ। বাবা সমতুল্য লোকটার বিশ্বাস যে রাখতে পারেনি যে, অন্যায় তার ছিলো পিতা সমতুল্য লোকটাকে সে নিজের সুখের জন্য কষ্ট দিয়েছিলো। সুখ তার হাতে এসেছিলো ঠিকই তবে পিতা সমতূল্য লোকটার বদ-দোয়াতে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে সে। মনিরুল ইসলাম চুপচাপ বসে মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, মেয়ে দু'টোকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা তার কাছে নেই।
-’ ভাইয়া আমরা কি আব্বু সন্তান না? তুমি একা তার ছেলে? আমরা কি তার অসুস্থতা সম্পর্কে কোনো কিছু জানার অধিকার রাখি না?’
তাসনিফা চোখের পানি মুছে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জিজ্ঞাসা করল। মুরাদ কিছুক্ষণ নিরুত্তর থাকল তারপর ছোট্ট করে বলল,
-‘ আমি তোমাদের কষ্ট দিতে চাইনি বোন।’
-‘কষ্ট?’
তাসনিয়া মুরাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। মুরাদ হতাশ মুখে বোনদের পানে চেয়ে রইল। তাসনিয়া আবারও বলল,
‘এভাবে লুকিয়ে রেখে যে তুমি কষ্ট দিলে সেটা কি কম ভাইয়া?’
মুরাদ আজ সত্যিই নিরুত্তর। নিজের কাজের জন্য তার ঠিক লজ্জা লাগছে না তবুও সে বোনদের দিকে তাকাচ্ছে না।
-‘ আব্বু তোমার একার না ভাইয়া। আল্লাহ তায়ালা সব সন্তানকে তার বাবামাকে দেখার,তাদের সম্পর্কে জানার সমান অধিকার দিয়েছে ভাইয়া। তুমি আমাকে আর তাসনিফাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কে?’
মুরাদ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরল। মনিরুল ইসলাম মেয়ের হাত চেপে ধরলেন,তাকে ইশারায় চুপ করার ইঙ্গিত করলেন। তাসনিয়া চুপ হলো কিন্তু তাসনিয়া চুপ হলো না। সে উঠে তার ভাইয়ের কাছে গেলো। ভাইয়ের পাশে বসে তার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ আমরা তোমাকে কখনো ক্ষমা করবো না ভাইয়া, কখনো না। তুমি একা একা এতো সব কিছু সহ্য করলে কী করে? আমাদের কেন পর করে দিলে?’
একদিকে তাসনিয়া তার ভাইকে জড়িয়ে আছে আর অন্য দিকে তাসনিফা তার বাবাকে জড়িয়ে বসে আছে। এবার মুরাদের চোখ থেকেও টপটপ করে অশ্রু পড়তে লাগল। মনিরুল ইসলাম নিজের চোখের পানি মুছে নিলেন। অনেক আগেই তার বেঁচে থাকার ইচ্ছে মরে গিয়েছিলো কিন্তু ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে সে এতদূর এসেছে আজও বাচ্চাগুলোর মুখ দেখে তার নতুন করে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করলো। সে বাদে এদের কেউ নেই তো। সে এতো তাড়াতাড়ি মারা গেলে বাচ্চাগুলোর কী হবে? তারা যে এতিম হয়ে যাবে।
.....
মিশা তার স্টাডি টেবিলে বসে বই পড়ছিল। প্রচন্ড হাঁসফাঁস করছে সে, দুশ্চিন্তারা মাথায় জেঁকে বসেছে। বইয়ের পাতায় চোখ দিয়ে সেটা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছে। ঠোঁটদুটো গোলা করে ফুঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করছে। সামনের পরিক্ষা তার কিন্তু ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পরেছে। নির্জীব, শান্ত ভঙ্গিতে সে বই পড়ছে। ফোন বাজার শব্দে সে বই থেকে মুখ তুললো। ফোনটা হাতে নিতেই তার চক্ষু চড়কগাছ হলো।
মিশা নির্জীবের মতো বসে রইল।সাফওয়ান? ফোন করছে তাকে? সে যেনও বিশ্বাসই করতে পারছে না। বিয়ের পর থেকে একবারও ফোন করে লোকটা তাকে। মিশা লোকটার কল আশার অপেক্ষা করত কিন্তু আসত না বলে সেই অপেক্ষা করাও বন্ধ করে দিলো। লোকটা তো তাকে আর অপেক্ষা করতে বলেনি। মিশাও লোকলজ্জার ভয়ে তাকে কল করেনি, সে তো জানে না লোকটা তাকে আবার কী ভাববে এমন হুট করে কল দিলে। সে এখন ফোন তুলল। মিশা কলটা তুলে চুপ করে থাকল।
‘ হ্যালো?’
সাফওয়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বললো কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেলো না। নিরুত্তর দেখে সে আবারও দীপ্ত কন্ঠে বলল,
‘হ্যালো, মিশা।’
এতোগুলো দিন পরে সাফওয়ানের গলা শুনে মিশার বুকটা কেঁপে উঠল। কণ্ঠস্বরটা ভারী গভীর কিন্তু একই সাথে আবার খুব শান্ত।
-‘জি।’
-‘কেমন আছিস?'
-‘ ভালো আছি।’
সাফওয়ান ওর খোঁজ খবর নিচ্ছে? মিশার ঠিক বিশ্বাস হলো না। দিঘির মতো গভীর কালো চোখদুটো একবার পিটপিট করল সে। ডান কানে ফোন এঁটে স্থির কন্ঠে শুধাল,
-‘তুমি?’
-‘আমিও ভালো।’
সাফওয়ান নিজেকে স্বাভাবিক রেখে শান্তস্বরে বলল,
-‘পড়াশোনা কেমন চলছে?’
এবার মিশার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। সাফওয়ান তার পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করছে? সাফওয়ানের এমন ব্যবহার মিশার কাছে নতুন লাগছে, একদম নতুন।
‘ ভালোই চলছে তবে একটু প্রেসারে আছি।’
‘কেন?’
‘ সামনে পরিক্ষা। ’
‘ ভালো করে পড় তাহলে।’
মিশা চুপচাপ লোকটার কথাগুলে শুনতে লাগলো। লোকটা এমন করে কথা বলছে যেনও সে ওর বড় ভাই। মিশা কত আশা নিয়ে ছিলো সাফওয়ান ফোন করেছে আহা! তার বরটার হয়তো একটু মায়া হয়েছে তার উপরে কিন্তু না, কানা মদনটা তার সাথে ভাইবোনের আলাপ পেতেছে, তাদের নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে কই একটু প্রেম প্রেম আলাপ করবে তা না,নিরামিষ একটা। এই নিরামিষর জন্য নিজের চুলগুলো নিজে ছিঁড়তে ইচ্ছে করলো তার। তবে এখন মিশা নিজেকে শান্ত করল। সে একটু দ্বিধাবোধ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ হঠাৎ ফোন করলে কেন?’
মিশার কাছ থেকে সরাসরি এমন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে সাফওয়া সেটা আশা করে নি। সে তো নিজেদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। সে কী সত্যিটা বলে দেবে নাকি কোনো অজুহাত দেবে? সাফওয়ান কিছু ভেবে পেলো না। সে ছোট করে শ্বাস ফেলে বলল,
‘ তেমন বিশেষ কোনো কারণ নেই। তোর খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কল করেছিলাম।’
‘ এতোদিন পরে?’
মিশা কটাক্ষ করে সাফওয়ানকে কথাটা বললো না বরং এক আকাশ পরিমাণ কৌতূহল নিয়ে সে প্রশ্নটা করল। সাফওয়ান কী তা বুঝতে পারলো? তার কাছে কী কথাটা কটাক্ষের মতো লাগলো? না হয়তো। সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘ সরি আসলে অনেক ব্যস্ত ছিলাম কল করবো করবো করেও করা হয়নি।’
সাফওয়ানের এমন সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে মিশা প্রথমবারের মতো, স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসল।
‘ ঠিক আছে। দেরিতে হলেও তুমি কল করেছ, সেটাই আমার জন্য অনেক।’
সাফওয়ান আজ একটু টায়ার্ড ছিলো কিন্তু তবুও মিশার সাথে সময় নিয়ে কথা বলল। সে নিজেও হালকা করে হাসল।
‘ পরীক্ষা কবে?’
‘ বারো,তেরোদিন পরে।’
‘প্রস্তুতি কেমন?’
‘ ভালো আরও ভালো করার চেষ্টা করছি।
‘ চিন্তা করিস না ভালো হবে দেখিস।’
মিশা চুপ করে রইল। সাফওয়ান তাকে উৎসাহ দিচ্ছে সেটা ভাবতেই তার মধ্যে অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেলো। সে ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি টেনে বলল,
' ইনশাল্লাহ। ’
#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৩. তৃতীয় অংশ
বিকাল তিনটা কী সাড়ে তিনটা বাজে। একেতো ঠান্ডায় একটু হাঁচি হচ্ছে এর মধ্যে সায়ান তাকে নিয়ে বাইকে করে এখানে নিয়ে এসেছে। আজ ক্লাস শেষে ফারাবী যখন বের হল তখন বাহিরের গেটে সায়ান আর ঈশানকে বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। হুট করে সায়ানকে এখানে দেখে সে বেশ অবাক হলো। শুনেছিলো দু'সপ্তাহের জন্য কক্সবাজারের যাচ্ছে সে তবে কবে আসল? আসল তা একটু বললো না। সায়ান ফারাবীর কোনো কথা না শুনে, তাকে নিয়ে বাইকে করে রওনা দিল। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে ফারাবী কিছু জানে না। ফারাবী প্রথমে আসতে চাইছিলো না কিন্তু ঈশানের খুশির জন্য আসল। সায়ান এখন তাদের একটা দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে ঈশানের জন্য আইসক্রিম আনতে গিয়েছে।
হ্যাঁচ-চোঁ!হ্যাঁ-চোঁ
হাঁচি দিয়ে ফারাবী নিজের মুখ চেপে ধরল। ঈশানের হাত ছেড়ে ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করল। ঠান্ডা লাগা ওর ধাতে আছে। সোয়েটার থেকে সে দশহাত দূরে থাকে তবে এটা মোটেও শো-অফ করার জন্য না, সে মূলত সোয়েটার পড়তে পছন্দ করে না,বিরক্ত লাগে।
অ্যাঁ-অ্যাঁ-চ্ছো! ফারাবী আবারও হাঁচি দিলো। ছোট ঈশান সেটা দেখে ফারাবী দিকে তাকাল। ফারাবী আন্টি সেই কখন থেকে হাঁচি দিচ্ছে। ঈশানের মায়া হলো। ফারাবী আবারও হাঁচি দিলো।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ’
ঈশান ছোট্ট করে ফারাবীকে উদ্দেশ্য করে বলল।ফারাবী হাসল। ঈশান গালটা টেনে দিলো বলল,‘ধন্যবাদ ডার্লিং। ’
ফারাবী মুখ তুলে উঠে দাঁড়াতেই দেখলো সায়ান হাতে আইসক্রিম নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
সায়ান আইসক্রিম নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসল। আজ সকালেই সে কক্সবাজার থেকে ফিরেছে। ফারাবীকে দেখতে মনে চাচ্ছিলো, মেয়েটার সাথে একটু থাকতে ইচ্ছা করছিলো তাই তো ঈশানকে নিয়ে চলে আসল। সারাদিনের ক্লাস শেষে মেয়েটাকে ভিষণ ক্লান্ত লাগছে। মনে হচ্ছে মেয়েটা প্রাণহীন জীর্ণ দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডাগর ডাগর চোখজোড়া ঈশানের উপর নিবদ্ধ। ঠোঁটজোড়া রক্তাভ। মেয়েটার নাকের উপরটা কেমন লাল হয়ে আছে। সায়ান ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ ফেলে তাদের দিকে এগিয়ে আসল। ফারাবীর ডান হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান। সায়ান গিয়ে তার সামনে আইসক্রিম ধরল। ঈশান খুশি হলো। সে আইসক্রিম নিল। ফারাবী বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ আপনাকে বলেছিলান না আইসক্রিম না নিয়ে আসতে। শীতে ওর ঠান্ডা লাগবে না? ’
সায়ান ফারাবীর কথা কানে নিলো না। সে ঈশানের চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। ঈশান একটু বিরক্ত হলো কিন্তু সেটা প্রকাশ করলো না, আইসক্রিম খাওয়ায় ব্যস্থ সে। সায়ান ফারাবীর দিকে আইসক্রিম বাড়ালো। ফারাবী আর কোনো ইতিউতি করলো না।
আকাশ পরিষ্কার। সারাদিনে অল্প সময়ের জন্য রোদের দেখা মিলেছিল। শীতে চারপাশ কুয়াশায় মোড়া। ফারাবী আর ঈশান চুপচাপ নিজেদের আইসক্রিম খাচ্ছে। সায়ান ধূসর বাদামি চোখের গাঢ় দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। লম্বাটে মুখের ছাঁচ নিয়ে এক দৃষ্টিতে সায়ান ছিপছিপে গড়নের ফারাবীকে দেখছে। সায়ানকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাঁসফাঁস করল ফারাবী। ফারাবীকে হাঁসফাঁস করতে দেখে সায়ানের চোখ দু'টো ছোট হলো। সে ভ্রুঁ কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ কী হয়েছে? এমন হাঁসফাঁস করছো কেন?’
ফারাবী বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘ আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’
সায়ান মুচকি হাসল। সে ফরাবী দিকে এগিয়ে ধীর স্বরে বলল,
‘আমাকে বিয়ে করবে না ফারাবী?’
ফারাবী আইসক্রিম খাচ্ছিল লোকটার কথা শুনে তার হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলো। লোকটার কথা শুনে তার বেশ নার্ভাস লাগছে। ভদ্র, শান্ত, লাজুকলতা ধরনের ফারাবী হুট করে পছন্দের মানুষের থেকে বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে লজ্জা পেলো, ভিষণ লজ্জা লাগলো তার। ঈশান সায়ানের কথা শুনতে পেলো। সে চটপট বলে উঠলো,
‘সায়ান মামু তুমি আন্টির সাথে প্রেম করছো? আমি বাড়িতে গিয়ে নানু ভাইকে বলে দিব। ’
ঈশানের কথায় ফারাবী চমকালো। সে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে ঈশানকে দেখলো। একই সাথে তার মনে অগণিত প্রশ্ন আর দোলাচলের উদয় হল। সায়ান ছেলেটার কথা কানে নিলো না কারণ এই বাদরকে সে ঘুষ দিয়ে চুপ করিয়ে দিবে। ফারাবী চোখ তুলে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সায়ানকে দেখল। সুদর্শন চেহারার লোকটা আজ ছাই রাখা কলার টিশার্ট পড়ে আছে। লোকটার চোখগুলো টানা টানা। ফারাবী আজ প্রথম সায়ানের চোখগুলো সুন্দর করে লক্ষ করলো। ছেলেদের চোখও যে টানা টানা হয় সেটা সায়ানকে না দেখলে সে বিশ্বাসই করত না।
‘ এভাবে দেখো না আমার লজ্জা করে।’
সায়ানের কথাটা শুনে ফারাবী বিব্রত হলো। সে সায়ানের প্রথম কথা ধরে সচকিতে সায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ পাগল হয়েছেন আপনি?সমস্যা কী আপনার?’
সায়ান কথা বাড়ালো না। সে কোনো ভনিতাও করলো না,উল্টো নরম গলায় আবারও বলল, ‘আমাকে বিয়ে করবে না?’
সায়ানের এমন নরম গলা শুনে ফারাবী নরম হলো।সায়ানের দিকে একবার মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকাল। তবে নিজেকে শান্ত করল, তারপ সশব্দে বাঁক্য ছুঁড়ে বলল,
‘ এতো তাড়া কিসের সায়ান? ’
ফারাবী নরম গলা শুনে সায়ান চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। ফারাবী তার দিকে বিষণ্ণ বদনে চেয়ে আছে৷ ফারাবীর এমন বিষণ্ণ মুখ দেখে তার মায়া লাগলো। সে নিজের চুলের মধ্যে হাত চালালো। ফারাবীর হাত থেকে আইসক্রিমেটা নিয়ে তাতে কামড় দিয়ে বলল,
‘আল্লাহ এই মেয়ে কী বলে দেখো। তাড়া থাকবে না আবার? আমার পেছনে এমনিতে অনেক মেয়ে পড়ে আছে তুমি যদি বিয়ে না করো তবে তো তাদের পিছনেও তো ঘুরতে হবে নাকি। বেচারাদের আর কতদিন নিজের পিছনে ঘোরাবো? ’
সায়ানের কথা শুনে ফারাবী প্রথমে অবাক হলো। সে চুপ রইল, মেজাজ তার সপ্তম আকাশে উঠে গেলো৷ লোকটার থেকে এমন উত্তর সে কখনোই আশা করেনি। সে ভেবেছিলো লোকটা হয়তো একটু ভালো হয়েছে কিন্তু না। ফারাবীর সব ভালো লাগা উবে গেলো। সে হিংস্র বাঘীনির ন্যায় দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করল। লোকটার দিক থেকে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল।লোকটার সেল্ফ কনফিডেন্স মারাত্মক। ফারাবী রাগ চাপল। সে সায়ানের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দ্রুত বলল,
‘ আই হেইট ইউ। ’
সায়ান অবাক হলো,ঘুরে তাকালো ফারাবীর চোখের দিকে৷ এবার কিছুটা নরমভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘লাভ কবে ছিলো?’
সায়ানের এমন প্রশ্নে ফারাবী বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে গেলো। সে চোখতুলে একবার লোকটার দিকে তাকালো। সায়ান তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। বেয়াদব লোকটাকে দেখে ফারাবীর মুক্তি বেগ গ্রহণ করে পৃথিবীর বাহিরে চলে যেতে ইচ্ছে করল৷ লোকটা দাঁত বের করে তাকে লজ্জা দিচ্ছে। ফারাবী শান্ত দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালো তারপর ঈশানের হাত ধরে সামনের দিকে পা বাড়ালো। সায়ান মুখ চেপে হাসল। মেয়েটাকে বিরক্ত করে সে বেশ মজা পাই। সে ফারাবীর সাথে পা মেলাতে মেলাতে বলল,
‘আমার বন্ধুরা সবসময় জিজ্ঞেস করে তোর মতো এমন কিউট আর হ্যান্ডসাম ছেলেকে কীভাবে একা ফেলে রেখেছে তোর প্রেমিকা?’
সায়ানের কথায় ফারাবী থেমে গেলো। সে চোখ পাকালো তবে সায়ান থামলো না। সে আবারও বলল,
‘ ওভাবে তাকিয়ে লাভ নেই, আমি তোমাকে মোটেও ভয় পায় না।তাছাড়া তুমি যদি ভেবে থাকো আমি সারাজীবন তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো, তবে ভুল ভাবছো। আমি কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সোল্ড আউট হয়ে যাবো তখন শুধু আফসোস করার ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না তাই আগেভাগে কিনে নাও।’
ফারাবী পা ঘুরিয়ে লোকটার দিকে দাঁড়ালো। একটা লোক লাগামহীন বেলেল্লাপনা মার্কা এতো কথা কী করে বলতে পারে? ফারাবী রাগী কন্ঠে বলল,
‘ আল্লার ওয়াস্তে একটু চুপ করবেন আপনি?’
সায়ান থামবার পাত্র না। সে মেয়েটার হত ধরে একটা হিরার আংটি পরিয়ে দিয়ে বলল,
'তোমার সেন্স অফ হিউমার ভালো তাই আমাকে তোমার ওয়ান অ্যান্ড অনলি ম্যান করে নাও ফারাবী। '
ফারাবী চুপটি করে লোকটার কাজ দেখলো। লোকটার কাজে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিলো ফারাবীর হৃদয়। ফিনফিনে ভালো লাগারা তার হৃদয়কে আবৃত করে নিচ্ছে। ফারাবীর বুকটা চিনচিন করে উঠলো কোনো এক সুখ সুখ ব্যথায়। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। তবে পরক্ষণেই সায়ান কথা শুনে সে বড় একটা শ্বাস ফেললো। লোকটা দুই মিনিটের জন্যও ভালো হবে না। আল্লাহ! একটা কার পাল্লায় ফেললে তাকে? সায়ান ফারাবীর মুখের দিকে একবার চেয়ে নিজের মতো করেই বলল,
‘সেদিন তো আংটি ছিলো না তাই আজ দিলাম।’
ফারাবী লজ্জা পেলো। ভিষণ রকমের অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরলো৷ সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে বলল,
‘ আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
সায়ান হেঁসে ফেললো। সে সরাসরি মেয়েটাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করে দিলো আর মেয়েটা কিনা কথা ঘোরাচ্ছে?
‘ আমি কী জানি কোথায় যাচ্ছো? তুমিই তো ঈশানকে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলে। ’
ও ঘুরে তাকালো, ‘ আপনার এসব উদ্ভট কাজের জন্যই তো চলে আসছিলাম।’
ফারাবীকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে দেখে হাসল। একহাতে মেয়েটার হাত ধরে এবার নিজের বাইকের দিকে পা বাড়ালো। ফারাবী কিছু বললো না আকাশকুসুম কল্পনা নিয়ে সে লোকটার পিছে পিছে যেতে লাগলো।
তারা একটা রেস্তোরাঁয় এসেছে। সায়ান প্রথমবার তাকে যে রেস্তোরাঁয় নিয়ে এসেছিলো আজও ঠিক সেখানে নিয়ে আসল। সেবার তারা রেস্তোরাঁর পিছনের দিকে লেকের পাশে বসেছিলো কিন্তু আজ ভেতরে বসল। এই রেস্তোরাঁর ভেতরটা মারাত্মক সুন্দর, মারাত্মক। রেস্তোরাঁর মাঝে একটা বড় ঝাড়বাতি, দেয়াল জুড়ে সবুজ লতাপাতারা জরিয়ে আছে, কোণায় কোণায় ছোট ছোট বিভিন্ন গাছের টব রাখা পুরো পরিবেশটাই অত্যন্ত মনোরম লাগলো ফারাবীর কাছে। অনেক মানুষজন আছে চারপাশে।
সায়ান মেনু কার্ড দেখে ঈশানকে জিজ্ঞাসা করল,
-‘ কী খাবে মামুর জান?’
‘আমি চিকেন পিৎজা আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাবো মামু।’
ঈশানের এতো উৎসাহ দেখে ফারাবী হেঁসে ঈশানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ঈশান ফারাবীর দিকে তাকাল। সে বলল, -‘ আন্টি, তুমি কী খাবে?’
-‘ আমি গ্রিল্ড চিকেন স্যালাড নেবো।’
‘ শুধু স্যালাড?’
সায়ান ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল।
‘ দুপুরে ক্যান্টির থেকে খেয়েছি। ক্ষুধা নেই আমার তাই হালকা কিছু খাবো।’
-‘ ঠিক আছে। আমি স্টেক অর্ডার করছি। ঈশান আর কী খাবে?’
-‘ চকলেট মিল্কশেক।’
ফারাবীও ঈশানের সাথে যোগ দিলে,
‘ আমার জন্যও একটা।’
সায়ান ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিল। ফারাবী চারপাশটা দেখতে লাগলো। হুট করেই তার নজর পরল রেস্তোরাঁর এক কোণে। সেখান থেকে সে কতগুলো মেয়ের কিচিরমিচিরের আওয়াজ পাচ্ছিলো কিন্তু এতোক্ষণ লক্ষ্য করেনি। ফারাবী সেদিকে তাকাল। দেখল, তিন-চারজন তরুণী খুব উত্তেজিত হয়ে কিছু একটার কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। ফারাবী কৌতূহলী হয়ে সেদিকে ভালো করে তাকাল। তার দৃষ্টি যখন সেই জিনিসের ওপর স্থির হলো, তখন তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। রেস্তোরাঁর এক কোণে, দেয়ালের পাশে সায়ানের একটা বড় স্ট্যান্ডি বসানো। সেখানে নীল স্যুট পরে আছে লোকটা, একটা হাত পকেটে, চোখে সানগ্লাস, ঠোঁটের কোণে সেই বিশ্বজয় করা মৃদু হাসি। মেয়েগুলো তার পাশে দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলছে। একজন তো সায়ানের স্ট্যান্ডির সাথে মাথা ঠেকিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেন সায়ান তার ঘাড়ে হাত রেখেছে এমন দেখাচ্ছে। আরেকজন সায়ানের হাত ধরার ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে। একজন সেটাতে চুমু খাওয়ার মতো ভঙ্গি করছে।
শুধু এাটই নয় বরং এর থেকে একটু দূরে আরেকটা পাস-থ্রু বোর্ড রাখা। পাস-থ্রুটা সায়ানের পুরো শরীর মতো শুধু মুখটা কাটা। মানুষ সেখানে নিজের মুখ বসিয়ে ছবি তুলছে।
এসকল জিনিস দেখে ফারাবীর বুকের ভেতরটা কেমন সংকুচিত হয়ে এলো। একটা অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করতে লাগলো তাকে। মেয়েগুলোর পাগলামি দেখে যে ফারাবী হাসছিলো তার ঠোঁটের কোণ থেকে হাসি মলিন হয়ে এলো। সে চোখ তুলে সায়ানের দিকে তাকাল। সায়ান ঈশানের সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে, মাথায় ক্যাপ আর মাস্ক থাকায় তাকে দূর থেকে চেনা সহজ না। এই লোকটা হাজারো মানুষের স্বপ্নে আছে, লক্ষ লক্ষ মেয়ের কল্পনায় আছে। তারা সবাই তাকে ভালোবাসে, তার জন্য কত উন্মাদ এরজন্যই ফারাবী এখন পর্যন্ত লোকটাকে তাকে ভালোবাসি বলার পরেও স্পষ্ট করে হ্যাঁ বা না উত্তর দিতে পারেনি।
সায়ানের সাথে নিজেকে তার বড্ড বেমানান মনে হয়। হীনমন্যতায় ভোগে। কে সে? একজন সাধারণ মেয়ে যার কোনো বিশেষত্ব নেই,কোনো জৌলুস নেই এমনকি জীবনে কোনো গ্ল্যামারও নেই। তার কোনো ফ্যান ফলোয়িং নেই, কোনো পাবলিসিটি নেই। সে সাধারণ একজন মানুষ যে কিনা নিজের পছন্দের কথাটাও লোকটাকে ভালো করে বলতে পারবে না। মুখ ফুটে কখনো তাকে ভালোবাসিটুকু বলতে পারবে কিনা সেটাতে সন্দেহ।
হঠাৎ তার মনে হলো সায়ানের সাথে এই জায়গায় তাকে খাপ খাচ্ছে না,তাকে মানাচ্ছে না। সায়ানের সাথে সায়ানের মতো কাউকে দরকার। সায়ান যে জগতের, যে উচ্চতার মানুষ, সেখানে সে কখনো পৌঁছাতে পারবে না। কখনোই পারবে না। তার মনে হলো সে হয়তো কখনো ভুল করে ফেলছে। ফারাবীর মুখে অন্ধকার নেমে এলো। সে যে বড্ড ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। ফারাবীর চোখ ভিজে উঠলো। সে চোখ নামিয়ে নিল। হাত দুটো কোলের ওপর রেখে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছে। একদিকে সায়ানের প্রতি তার ভালোলাগা, অন্যদিকে নিজের প্রতি এক তীব্র হীনমন্যতা।
ফারাবী আবার সেই স্ট্যান্ডির দিকে তাকাল। এখন আরও কয়েকজন সেখানে লাইন দিচ্ছে ছবি তোলার জন্য। ফারাবীর মনটা খারাপ হয়ে আসল। তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো। সে তার ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু বের করে চোখ মুছলো। সায়ান তখন ঈশানকে কিছু একটা বলছিল, হঠাৎ তার নজর পড়লো ফারাবীর দিকে। সে ফারাবীর মুখের অভিব্যক্তি দেখে থমকে গেল। ফারাবীর চোখ লাল, মুখ ম্লান হয়ে আছে। সায়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মেয়েটার কী হয়েছে?সায়ান তার চেয়ারটা টেনে ফারাবীর কাছে টেনে আনলো। ফারাবীর পাশে বসে ফারাবীর হাতটা আলতো করে ধরল। সায়ান খুব আস্তে করে, নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল,
‘কী হয়েছে?’
ফারাবী মাথা তুললো না। সে নিচু মাথায় বলল,
‘ কিছু না। ’
‘ মিথ্যা বলছো। মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেন? এতোক্ষণ তো সব ঠিকঠাক ছিল। আমার কোনো কথায় কষ্ট পেয়েছ?’
ফারাবী শান্ত, শীতল গলাতেই বলল,
‘ না,না। একটু শরীরটা খারাপ। ঠান্ডা লেগেছে। শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে।’
তাদের খারাব চলে আসল। সায়ান আর কথা বাড়াতে পারলো না। ফারাবী ঈশানকে খাওয়াতে ব্যস্থ হয়ে পড়ল। সায়ান অস্থির হয়ে গেলে ফারাবীর এমন কথায়। সে মেয়েটার কথা বিশ্বাস করতে চাইলো কিন্তু কেন যেনও বিশ্বাস করতে পারলো না। এতোক্ষণ তো ঠিকই ছিলো তাহলে এখন হুট করে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে গেলে?আজব তো!
চলবে..
[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]