#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৪. প্রথমাংশ
ভোর হতে শুরু করেছে। চারপাশে অন্ধকার মিলে আকাশ হালকা লাল হচ্ছে। সময়টা নব্বই দশকের মাঝামাঝি, যখন ঢাকার শহরটা এখনকার মতো এত বিস্তৃত ও কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। পুরান ঢাকার তিনতলা একটা পুরাত বাড়ির দোতলার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে মইনুল আর আসমার নতুন সংসার পেতেছে। ছয় মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছে, তবে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তাদের ছোট্ট চড়ুই পাখির সংসার।
পুরান ঢাকার একটা সরু গলির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে তিনতলা বাড়িটা। একসময় বাড়ির রং সাদা ছিল, কিন্তু এখন ধুলোবালি আর সময়ের প্রভাবে কিছুটা হলদে হয়ে গেছে। নিচতলায় একটা ছোট মুদি দোকান, বাসার সিঁড়িগুলো কাঠের,উপরে উঠার সময় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে। তাদের ফ্ল্যাটটা খুব বড় না,আবার খুব ছোটও না। দুটো ছোট রুম, একটা রান্নাঘর আর একটা বারান্দা,বারান্দাটা সামনের দিকে, সেখান থেকে রাস্তা দেখা যায়। পুরান ঢাকার শান্ত এলাকায় বাসাটা হওয়াই মইনুল প্রথম দিনই এই বাসাটা পছন্দ করে নিয়েছিলো। ভাড়াটা তার সাধ্যের মধ্যে, আর পরিবেশটাও ভালো। বাড়িওয়ালা বৃদ্ধ দম্পতি, তিনতলায় থাকেন তারা। খুব ভালো মানুষ, মইনুলকে ছেলের মতো ভালোবাসে। তবে বাসাটা ছোট্ট হলেও আসমার কাছে এই ছোট্ট বাসা এখন তার পুরো পৃথিবী। গুলশানের বিশাল বাড়িতে বড় হওয়া মেয়েটার কাছে এই সাদামাটা ফ্ল্যাট প্রথমদিন থেকেই শান্তির জায়গায়, কারণ এখানে সে তার স্বামীর সাথে থাকে। এতদিন সে বাবার ছত্রছায়ায় বড় হয়েছে, কোনো কিছুর অভাব হয়নি তার,ওটা তার বাবা মায়ের বাসা ছিলো কিন্তু এখন এটা নিজের বাসা, তার আর মইনুলের।
দেয়ালগুলো সাদা রঙের, জায়গায় জায়গায় রং একটু খসে পড়েছে। মইনুল নিজের সাধ্যের মধ্যে তাকে সব দেওয়ার চেষ্টা করছে, ড্রয়িংরুমে একটা পুরনো সোফা এনেছে, এটা মইনুল তার এক বন্ধুর কাছ থেকে কিনেছে মাত্র পাঁচশ টাকা দিয়ে। সোফার কাপড় জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া, কিন্তু লোকটা সেটারও সমাধান বের করেছে, ছেঁড়াগুলো ঢাকার জন্য একটা সুতির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের এক কোণায় একটা ছোট্ট বইয়ের তাক, যেখানে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা উপন্যাস, ইংরেজি সাহিত্যের টেক্সটবুক, আর কয়েকটা নোটবুক পড়ে আছে।
গতকাল রাতেই মইনুল আসমাকে নিয়ে এসেছে এই বাসায়। আসমা এসেই গোছগাছ করা পরিপাটি একটা ছোট্ট চড়ুই পাখির ঘর পেয়েছে, সেখানে তারা সংসার পাতবে। ছয়মাস আগে বিয়ে হলেও মইনুল আসমাকে সাথে রাখতে পারেনি। চাকরি না হওয়া পর্যন্ত সে আসমাকে তার বাবার বাড়িতেই রেখে এসেছিল। এই ছয়মাস প্রতি শুক্রবারে দেখা হতো তাদের। আসমার বাবা বুঝেছিলেন মেয়েজামাইয়ের কষ্ট, তাই তিনিও আসমাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন।
মইনুল গতমাসে বেসরকারি একটা কোম্পানিতে অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরি পেয়েছিল, এমাসে বেতন পেয়েই সে আসমাকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল, আর কাল নিয়েও আসল। তার বেতন বেশি না, কিন্তু দুজনের ভালোবাসে চলে যাবে। মইনুলের আরও ছয়মাস বাকি অনার্স শেষ করতে। পড়াশোনা আর চাকরি, দুটোই সামলাতে হবে তাকে। সে আবদুল জব্বার শেখের কাছে প্রথম তিন মাসে আটান্নটা চিঠি লিখেছে কিন্তু কোনোটার উত্তর পায়নি তাই জেদ করে এখন চিঠি পাঠানোও আপাতত বন্ধ করে রেখেছে।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় আসমার ঘুম ভেঙেছিল। রুমের ডান পাশের জানালাটা খোলা। বাহিরে মৃদু মন্দ বাতাস দিচ্ছে, জানালায় থাকা পর্দা গুলো দুলছে। সূর্যের লালচে আলোর প্রতিফলন ঘটছে আকাশ জুড়ে। আসমা আস্তেধীরে উঠে পড়,তখনও তন্দ্রাঘোরে আবদ্ধ মইনুল শেখ। আসমা ঝুঁকে লোকটার মুখের দিকে তাকালো,লোকটার দিকে তাকাতেই আসমার মনে পড়ে গেলো সেই দিনের কথা যখন মইনুল সরাসরি তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। সেদিন কী যে অবাক হয়েছিল সে! মইনুল তাকে কিছু না বলে সরাসরি বাবার কাছে চলে গিয়েছিল। ছেলে ভালো হওয়াই আসমার বাবা দ্বিমত করেননি, সেদিনই তাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। আসমা অবাক হয়েছিলো অবশ্য এত তাড়াহুড়ো করে কেন তাদের বিয়েটা হয়েছে সেটা পরে জানতে পেরেছিল।
আসমা শোনে, মল্লিকার সাথে হুট করেই এক শুক্রবারে আবদুল জব্বার শেখ মইনুলের বিয়ে পাকা করে ফেলে, ভাইকে কথা দিয়েছিলো যে, মইনুলকে অসুস্থতার কথা বলে শহর থেকে ডেকে আনে। মইনুল নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছুটে যায় বাপের অসুস্থার খবর পেয়ে কিন্তু গিয়ে যখন দেখে তাকে মিথ্যা বলে আনা হয়েছে তখনই সে শেখ বাড়ি ত্যাগ করে। আসমাকে না জানিয়ে সরাসরি তার বাবার কাছে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যেহেতু আসমা বেগম তার বাবার আদরের ছোট্ট দুই মেয়ে তাই তিনি না করেন না৷ মেয়েকে ডেকে সে বিয়েতে রাজি কিনা জিজ্ঞেস করে, আসমা রাজি থাকাই সেদিনই তাদের বিয়ে হয়, তাড়াতাড়ি বিয়ে হওয়ার কারণ আবদুল জব্বার শেখকে মইনুল আসমার কথা বললে তিনি সরাসরি না করে দেন, বলেন এ জীবনে মল্লিকা বাদের কাউকে সে মইনুলের বউ হিসাবে গ্রহণ করবে না কারণ তিনি তার ভাইকে কথা দিয়ে রেখেছে,নিজের কথা থেকে এক চুল পরিমাণ নড়বেন না তিনি, তাই মইনুলও বাধ্য হয়ে নিজের পথ নিজে খুঁজে নিয়েছে।
আসমা বিছানায় বসে ঘুমুঘুমু চোখে রুমের চারপাশে চোখ বোলালো। মইনুল বাসাটা খুব যত্ন করে সাজিয়েছে। বেশি কিছু নেই, কিন্তু যা আছে সব যত্নের। তাদের রুমে একটা পুরনো খাট আছে, যেটা লোকটা সেকেন্ডহ্যান্ড কিনেছে। একটা আলমারি, একটা ছোট্ট টেবিল আর দুটো চেয়ার। জানালার পাশে একটা ছোট্ট তাক, সেখানে মইনুলের কয়েকটা বই রাখা অবশ্য আসমার বই রাখারও জন্য ইতিমধ্যে সেখানে জায়গায়ও করা শেষ লোকটার। আসমা গতকাল রাতে গত তার কিছু জামাকাপড় আলমারিতে রাখতে সেটা খুলে ছিলো তখন লক্ষ্য করল মইনুল তার জন্য আলমারির অর্ধেক জায়গা খালি করে রেখেছে। লোকটার ছোট্ট এই ব্যাপারটা তার মনকে ছুঁয়ে নিয়েছিল। লোকটা সবসময় তার প্রতি যত্নশীল।
আসমা উঠে পড়েছে,রান্না বসাতে হবে। আসমা ধীরপায়ে খাট থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। সে রান্নাঘরে আসল। রান্নাঘরটা অনেক ছোট, দুজনে একসাথে কাজ করা মুশকিল কিন্তু তাও মইনুল সেখানেও সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে রেখেছে। আসমা সেখানে একটা মাটির চুলা আর একটা কেরোসিনের স্টোভ দেখল, কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিলও আছে দেখল। এই ছয়মাসে হয়তো লোকটা একটা একটা করে সব কিনেছে। আশেপাশে তাকাতেই মশলার কৌটা আর চাল-ডালের কৌটা দেখতে পেলো। সে এগিয়ে এসে রান্নাঘরের ছোট্ট জানালাটা খুলে দিলো। এই জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ছাদ দেখা যায়, যেখানে কেউ একজন পাখি পুষে, মাঝে মাঝে ময়নার ডাক ভেসে আসে।
আশেপাশে তাকিয়ে আসমা ভেবেনিল রুটি আর আলুভাজি করবে। আসমা কেরোসিনের স্টোভটা জ্বালানোর চেষ্টা করল কিন্তু জ্বললো না, সে স্টোভটা খুলে দেখলো তাতে কেরোসিন নেই। দরজার পাশে খালি কেরোসিনের বোতল রাখা,মানে কেরোসিন শেষ? আসমা চিন্তায় পড়ে গেলো স্টোভ বাদে কীভাবে রান্না করবে সে? চুলায় কখনও রান্না করেনি সে। বাসায় কাজের লোক আর তার বড় বুবুই সব করত। আর বিয়ের পরে এই ছয়মাস বাবার বাড়িতে থাকার সময়ও কাজের লোকই আর বুবুই সব রান্না করেছে। আগে তো রান্নাঘরে আসতে দিত না, বিয়ের পরে মোটেও আসতে দেয়নি, স্টোভে শখ করে কখনো কখনো রান্না করতো তবে সবটা শখ করে।
কিন্তু এখন? এখন তো তাকেই করতে হবে সব। মইনুল সারাদিন চাকরি করে, আবার রাতে পড়াশোনাও করতে হয় তাকে। সংসারের কাজ এখব তাকেই করতে হবে। আসমা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো কী করবে? কীভাবে সামলাবে সবটা? তার নিজেরও ক্লাস আছে কিন্তু এখন রান্না না বসালে তো চলবে না। মইনুল এত কষ্ট করছে তার জন্য আর সে একটু রান্না করে দিতে পারবে না? মাটির চুলাটা দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো আসমা। মনে সাহস নিয়ে নিজের কাজ শুরু করে দিল।
টুংটাং শব্দে ভ্রু দুয়ের মাঝে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ল মইনুলের। ডান হাত অনায়াসে কপালে চলে এলো।সে নড়েচড়ে ওঠে বসল। শব্দের উৎস খুঁজে বের করার জন্য পিটপিট করে নয়ন জোড়া মেললো। আস্তেধীরে উঠে বসে দেখলো আসমা বিছানায় নেই। শব্দের মূল উৎসকে তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারলো সে। বিছানা গুছিয়ে, গায়ে শার্ট জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল।
আসমা আটা মাখছে। বড়লোকের মেয়ে, বাবা ম্যাজিস্ট্রেট, বাসায় দুই-তিনজন কাজের লোক ছিল তাই কখনো রুটি বানাতে হয়নি, অবশ্য সে কখনো রুটি বানার চেষ্টাও করেনি তার বাসায় রুটি তেমন কেউ খেত না, সেও না। মইনুলের কাছে একবার শুনেছিলো সে নাকি রুটি, আলু ভাজা পছন্দ করে তাই সেটাই বানানোর চেষ্টা করছে।
কাঠের চুলাতে জ্বালাতে গিয়ে আসমা হিমশিম খেলো, জীবনে কাঠের চুলার ধারের কাছেও সে আসেনি কিন্তু কষ্টমষ্ট করে কাশতে কাশতে সে চুলাটা জ্বালিয়ে ফেললো।
এবার সে আটা মাখতে শুরু করল কিন্তু পানির পরিমাণ ঠিক বুঝতে পারল না,তাই বেশি হয়ে গেল আটাই পানি বেশি হয়ে গেছে। আটা আঠালো হয়ে হাতে লেগে যাচ্ছে। সে হাত ধুয়ে আবার চেষ্টা করে। তাড়াতাড়ি তাতে আরও আটা দিল, এবার শক্ত হয়ে গেল। সে আবার পানি দিল, আবার আটা দিল, শেষ পর্যন্ত আটার মন্ডটা হলো বটে, কিন্তু একটু বেশিই নরম।
রুটি বেলতে গিয়ে মুশকিলে পড়ল। সে রুটি বেলে যাচ্ছে কিন্তু রুটিগুলো গোল হচ্ছে না,কোনোটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, কোনোটা একদিকে মোটা, অন্যদিকে পাতলা। আসমা মনে মনে নিজের বোনকে ভাবতে লাগলো, তার বড় বুবু কত সহজেই গোল গোল রুটি বেলে ফেলত, তখন শিখে রাখা ভালো ছিল। আসমা কোনো মতে একটা রুটি করে সেটা তাওয়ায় দিয়ে অন্য রুটি বেলতে লাগল। এদিকে চুলার আঁচ বেশি থাকায় তাওয়ার থাকার রুটির এক পাশ পুড়ে কালো হয়ে গেল, অন্যপাশ কাঁচা থেকে গেল। আসমা লক্ষ্য করতেই সেটা তাড়াতাড়ি উল্টে দিল, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। রুটিটা শক্ত হয়ে গেল, জায়গায় জায়গায় কালো কালো পোড়া দাগ। আসমা হতাশ হয়ে গেলো। সে দ্বিতীয় রুটি দিলো এটারও প্রায় একই অবস্থা। সে কিছুতেই চুলার জ্বাল সামলাতে পারছে না,দাউদাউ করে জ্বলছে কাঠের চুলা, এখন কী করবে এই চিন্তায় আসমার কপালে ঘাম জমল, যদিও পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। মইনুল এসে এসব দেখলে কী ভাববে? তার মতো এতো বড় মেয়ে কিনা একটা রুটিও ঠিকমতো বানাতে পারছে না?
ঠিক এই সময়েই মইনুল শব্দ শুনে রান্নাঘরে চলে আসল। ঘুমু ঘুমু চোখে, ঘুমে চোখ ভারী হয়ে আছে তার। রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে দেখল আসমা পিঠ ফিরিয়ে বসে কাজ করছে। আসমাকে দেখেই তার ঠোঁটে চওড়া হাসি দেখা দিল। কিন্তু তারপরেই নজর গেল পোড়া রুটির দিকে, ভ্রু কুঁচকে গেলো তার।
‘ কী হচ্ছে এখানে?’
মইনুলের গলা শুনে আসমা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। মইনুলকে শেখে ঠোঁটের কোণে জোর করে হাসি টানার চেষ্টা করল।
‘ উঠে পড়েছেন? ’
মইনুল এগিয়ে এসে পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘ তুমি কখন উঠলে?’
‘ এই তো একটু আগে।’
মইনুল আশপাশ দেখে একটু অবাক চোখে আসমার দিকে তাকাল। নরম গলায় শুধালো ,
‘ কী করছো?’
আসমা হাসতে পারলো না তিনি আমতাআমতা করে উত্তর দিল,
‘ নাস্তা বানাচ্ছি কিন্তু রুটিগুলো পুড়ে যাচ্ছে। ’
মইনুল এগিয়ে আসল, স্নেহের চোখে তার দিকে তাকাল। আসমাকে একবার চোখ ভরে দেখে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হতে চলে গেলো। আসমা কিছু বুঝলো না, নিজের কাজ করতে লাগল। এদিকে মইনুল পাঁচ মিনিটের মাথায় ব্রাশ করে, হাতমুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে আবারও রান্নাঘরে চলে এলো। সে আগে চুলা থেকে একটা কাঠ বের করে আনল। সে জানি আসমা কত বিলাসিতার সাথে বড় হয়েছে। এখানে মেয়েটাকে কাজ করতে দেখে খারাপ লাগলো। সে সামনে এগিয়ে স্মিথ কন্ঠে বলে,
‘স্টোভের কেরাসিন শেষ হয়ে গেছে,আনতে মনে ছিলো না।’
আসমা নিজের হাতের কাজ বাদ দিয়ে সচকিত দৃষ্টিতে পাশ পিরে লোকটাকে দেখলো৷ মইনুল মুখটা ছোট্ট করে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মুখখানা দেখে বড্ড মায়া হলো তার। দৃষ্টি ঘুরালো,থুতনি চিবুকে ঠেকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ সমস্যা নেই।’
‘ দেখি।’ বলেই মইনুল আসমাকে উঠিয়ে তার যায়গা বসে তাকে নিজের পাশে আসমাকে বসতে বলল। আটার ডো দেখে লোকটার ভ্রুঁ কুঁচকে গেলো।সেটা হাত দিয়ে চাপ দিল। আসমাকে শুধাল,
‘ আটায় কুসুম গরম পানি দিয়েছে নাকি ঠান্ডা। ’
আসমা চোখ ছোট করে মইনুল শেখের দিকে তাকাল। মন্থর কন্ঠে বলল,
‘ কোনটা দিতে হয়?’
মইনুল হালকা হেঁসে বলল,
‘ হালকা গরম পানি তাহলে রুটি নরম হয়।’
অপরাধীর মতো বলল,
‘ ঠান্ডা পানি দিয়ছি।’
মইনুল একপলক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল।লোকটাকে হাসতে দেখে আসমা হতাশ হলো,নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। আসমাকে হতাশ হয়ে বসে থাকতে দেখে বলল,
‘ এটা থেকেও সুন্দর রুটি হবে চিন্তা করো না তবে একটু শক্ত হবে।’
আসমা লোকটার কথায় কান দিলো না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘তুমি রান্না করতে পারো?’
‘ হুম , যখন হোস্টেলে থাকতাম তখন থেকেই নিজেই রান্না করে খেতাম। হোস্টেলের খাবার খাওয়া যায় না। তাই শিখে নিয়েছিলাম।’
‘আমি অল্পঅল্প পারি কিন্তু চুলাই আগে কখনো রান্না করিনি।’
আসমা হতাশ স্বরে কথাটা বলল। মইনুল শেখ নিজের হাসি চাপতে নিচের ঠোঁটটা চেপে ধরল। মজা করে বলল,
‘কী বউ নিয়ে আসলামরে বাবা! এখন দেখি নিজের সাথে বউকেও রান্না করে খাওয়াতে হবে।’
আসমা কিছু বললো না। তার কান লাল হয়ে গেলো। সে এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
‘ খোটা দিচ্ছ? আমি কখনো করিনি তো! বাসায় সবাই করত..’
আসমা নিচু মুখে কথাগুলো বলছিলো। মইনুল ধীর হাতে আসমার চিবুক তুলে ধরে বলল,
‘রাগ করলে নাকি? আমি তো ঠাট্টা করছি। তুমি যা করছ, যতটুকু করেছ তাতেই আমি মহাখুশি।’
আসমার ঠোঁটের কোণে এবার হাসি দেখা দিল। মইনুল আবারও চুলার আঁচ ঠিক করে বলল,
‘ আঁচ খুব বেশি থাকলে রুটি পুড়ে যাবে, আবার কম থাকলে ভালো ফুলবে না। মাঝামাঝি রাখতে হয়। তুমি চুপচাপ বসে দেখো আমি কী করি।’
আসমা মনোযোগ দিয়ে লোকটার কাজ দেখতে লাগল।
‘ আর আটা মাখার সময় জলটা একটু একটু করে দিতে হয়। একসাথে বেশি দিলে সমস্যা হয়ে যায়।’
এটুকু বলে মইনুল নতুন করে আটা মাখতে শুরু করল। আটা মাখা হয়ে গেলে বলল,
‘ এবার বেলতে হবে। তুমি বেলো, আমি দেখছি।’
আসমা বেলন হাতে নিল কিন্তু আবারও সেই একই সমস্যা গোল হচ্ছে না।
‘ অ্যাই অ্যাই, এভাবে না। দেখো।’
মইনুল আসমার হাত থেকে সেগুলো নিয়ে রুটি বেলতে লাগল।
‘সবদিকে সমান চাপ দিতে হবে। আর মাঝে মাঝে একটু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বেলতে পারলে রুটি গোল হয়। এই যে, দেখ প্রায় গোল হয়ে গেল।’
মইনুল কাজের মধ্যে কথাগুলো বলতে লাগল। আসমা নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রয়ল। রুটিটা ভালোই গোল হয়েছে। এভাবে একেএকে তারা সব রান্না দুজনে শেষ করল।
রান্না শেষ হলে দুজনে মিলে ছোট্ট ডাইনিং টেবিলে খাবার আনল। টেবিলটা আসলে পুরনো একটা বড় কাঠের টুলের মতো, যার ওপর একটা পরিষ্কার কাপড় বিছানো। দুটো প্লেট, দুটো গ্লাস এই জিনিসই ধরে তার উপরে। তাদের সংসারের আসবাব বলতে অল্পস্বল্প কিছু আছে।
‘বসো।’
মইনুল চেয়ার টেনে আসমাকে বসতে বলল। আসমা হাঁসফাঁশ করল। লোকটা এমন কেন? মাথা নিচু করে সে বসল। দুজনে মুখোমুখি বসেছে। মইনুল আসমার প্লেটে রুটি আর আলুর তরকারি দিল সাথে চাও যা মইনুল নিজে বানিয়েছে। মইনুল একটা রুটি ছিঁড়ে আলু দিয়ে সেটা আসমার মুখে দিল। আসমা চুপচাপ খেয়ে নিল, চিবোতে লাগল। মইনুল তার দিকে উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে আছে।
‘ কেমন হয়েছে?’ সে জিজ্ঞেস করল।
আসমা কিছুক্ষণ কিছু বলল না। খাবার চিবোতে লাগল তারপর শুভ্র হেসে বলল,
‘ সুন্দর। ’
আসমাও খেতে শুরু করল। সত্যিই মন্দ হয়নি লোকটার রান্না। রুটিগুলো অনেক নরম হয়েছে, তরকারিটাও ভালো। মইনুল আসমাকে চুপচাপ খেতে দেখে হাসল।নিজেও খাওয়া শুরু করল।
‘আজ ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস আছে তোমার?’
মইনুল জিজ্ঞেস করল।
‘ আছে কিন্তু যাব না।’
‘ কেনও?’
আসমা খেতে খেতে বলল, ‘ এমনি কাল থেকে যাব।’
‘ আজ না যাওয়ার কোনো কারণ তো দেখছি না? শুধু শুধু বাসায় না থেকে ক্লাস করে আস।’
মইনুলের কথা শুনে আসমা একবার লোকটার দিকে চোখ ঘোরালো মুখে কিছু বললো না। খাওয়া শেষে দুজনে ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়াল। বারান্দা থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়। রাস্তাটায় ভালোই মানুষজনের ভিড়,লোকজন অফিসে যাচ্ছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, একটু সময় পর পর কয়েকটা রিকশা চলছে।
‘দেখো..’
মইনুল আসমাকে ইশারা করে একজনকে দেখিয়ে বলল,
‘ওই যে বুড়িটা আসছে না সে প্রতিদিন এই সময়ে মর্নিং ওয়াক করতে যায়।’
‘ ওই রাস্তায় কী আছে?’
‘ ওই রাস্তা মাথায় একটা ছোট পার্ক মতো আছে।’
‘আর ওই দোকানদার, দেখেছ? রোজ এত সকালে দোকান খোলে। ওটা চায়ের দোকান। সকালবেলা অনেক মানুষ চা খেতে আসে। মাঝে মাঝে আমিও যাই। ওখানকার মালাই চা অনেক সুন্দর।’
‘আমরাও যাব একদিন? নিয়ে যাবে?’
‘অবশ্যই। তাহলে আজ সন্ধ্যায়ই যাব কী বল?’
‘ যখন তোমার সময় হবে তখন নিয়ে গেলেই হলো।’
‘ সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি আসব আজ।’
‘ঠিক আছে।’
বারান্দায় একটা ছোট্ট টবে গাছ লাগানো একটা গোলাপ গাছ, যেটা মইনুল কিনেছিল। আসমা কাল লক্ষ্য করেনি। এখন চোখে পড়তেই সেদিকে এগিয়ে আসল। গাছটার গায়ে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ এটা কবে কিনলে?’
‘ মাস খানিক হয়ে গেছে।’
‘ গাছটা কবে ফুল দেবে?’
‘শীত শেষ হলেই,বসন্তে গোলাপ দিবে।’
‘ তখন আমাদের বারান্দায়টা কত সুন্দর দেখাবে, তাই না?’
‘ হুম, তাছাড়া তুমি যদি আরও কিছু গাছ লাগাও, তাহলে বারান্দায়টা আরও সুন্দর লাগবে।’
‘ লাগাব?’
‘ লাগাবে না কেন?’
‘ চারা এনে দিবেন আমাকে?’
‘ কী চারা দরকার? ’
‘ আপাতত তুলসী আর একটা জুঁই গাছের চারা।অন্যগুলো আমিই কিনে নিবন।’
‘ আচ্ছা আজ আনবো না হয়।’
সকাল আটটা বাজতে না বাজতে দুজনে ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি হয়ে নিল। আসমা আস্তে ধীরে তৈরি হচ্ছিল। মইনুলকে অপেক্ষা করতে দেখে বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘ বসে আছে কেন? ’
‘ তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘ আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তুমি আগে চলে যাও, তোমার ক্লাস আগে শুরু হয়।’
আসমা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল।
‘ না, একসাথে যাব। তোমাকে রেখে যাব কীভাবে?’
‘আমি পরে চলে যাব। তুমি লেট হয়ে যাবে।’
‘ আচ্ছা হলে হবো তবু আমি অপেক্ষা করছি।’
আসমা ঘুরে তাকাল।
‘ তুমিও না।’
আসমা তৈরি হয়ে নিলো আজ একটু তাড়াতাড়ি যাচ্ছে সে। দুজনে মিলে ফ্ল্যাট থেকে বেরোলো। বাড়ির গেট দিয়ে বেরোতেই রাস্তায় উঠে পরল।
‘ রিকশা নেবে?’ মইনুল জিজ্ঞেস করল।
‘না, হেঁটে যাই। বাস স্ট্যান্ড কাছেই।’
মইনুল কথা বাড়ালো না। দুজনে হাঁটতে লাগল। সকালের রোদ তাদের গায়ে লাগছে হালকা নরম, হালকা গরম। রাস্তার দুপাশে দোকান,চায়ের দোকান, মুদির দোকান, সবজির দোকান। কেউ কেউ মইনুলকে দেখে হাত নাড়ল। মইনুলও তাদের সালাম দিল।
‘এরা সবাই চেনে তোমাকে?’ আসমা অনেকটা অবাক হলো।
‘হ্যাঁ, ছ'মাস একা থাকার সময় এদের সাথে পরিচয় হয়েছে। ভালো মানুষ সবাই।’
....
কেটে গেছে সপ্তাহখানিক। আসমা এই সাতদিনে নিজের ছোট্ট সংসারটার সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিদিন সকালে উঠে চুলাই রান্না করার চেষ্টা করেছে, মইনুল সেইদিনই কেরোসিন এনে দিয়েছিলো কিন্তু মইনুলের কাঠের রান্না পছন্দ বলে আসমা সেটাও আয়ত্ত করে নিয়েছে। মইনুলের পছন্দের জন্য সে চুলায় রান্না করে। রুটি এখনও ভালো গোল হয় না, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালো হচ্ছে। মইনুল তার প্রতিটা ছোট্ট ছোট্ট কাজে অনেক বেশি পরিমাণে খুশি হয়, আর সেই খুশি দেখে আসমারও মন ভরে যায়।
বিকাল প্রায় চারটে বাজে। আসমা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসেছে দুপুরে। গোসল সেরে সুতির একটা শাড়ি পরেছে। চুল গুলো খোলা, সেগুলো এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। রাতের রান্নাবান্না শেষ হওয়াই সে গিয়ে একটু শুয়েছিল কিন্তু সেই সময়েই দরজায় টোকা পড়ল। আসমা চমকে উঠল কারণ এই সময়ে সাধারণত কারোর আসার কথা না। সে মাথায় কাপড় তুলে দরজার দিকে এগোলো। দরজা খুলতেই দেখল বাড়িওয়ালা আন্টি দাঁড়িয়ে আছে,তার পেছনে আরও দুজন মহিলা। একজন মাঝবয়সী,আরেকজন তরুণী, বয়স কম।
‘তুমি আসমা তাই না?’
খয়েরী রঙের শাড়ি পড়া, পাকা চুলওয়ালা বুড়ি মহিলা কণ্ঠে আন্তরিকতা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল। আসমা মৃদু হেঁসে মাথা নিচু করে বলল, ‘জি, আমি আসমা।’
‘মইনুলের মুখের তোমার কথা শুনে তোমাকে চেনে নিয়েছি। আমরা মা এই অসময়ের এসেছি তোমার সাথে দেখা করতে। আমি এই বাড়ির মালিক। তুমি আমাকে খালাম্মা বলতে পার। আর এরা দুজন।’
বয়স্ক মহিলাটা পেছনের দুজনকে ইশারা করে বললেন,
‘এরা এই বাড়ির দোতলার অন্য দুই ফ্ল্যাটে থাকে। এই যে নার্গিস। ’ তিনি মাঝবয়সী মহিলাকে দেখালেন।
‘আর এ সাবিনা। ’ তরুণীকে দেখিয়ে বললেন।
আসমা অচেনা মানুষগুলোকে দেখে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে হাসার চেষ্টা করল। নরম গলায় বলল,
‘আসেন, ভেতরে আসেন খালাম্মা। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। ’
সকলের হাসল আসমার কথায়। তিনজন ভেতরে ঢুকল। আসমা দ্রুত ড্রয়িংরুমের সোফাটা পরিষ্কার করে নিল, চাদরটা একটু টেনে ঠিক করে দিল। বাড়িওয়ালা সোফায় বসল, নার্গিস আর সাবিনাও পাশে বসল। আসমা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রইল, সে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। বাড়িওয়ালা বৃদ্ধা আসমাকে দেখে তার অস্থিরতা বুঝতে পারলো। তিনি আসমাকে স্বাভাবিক করতে বলল, ‘তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন মা? বসো না। ’
আসমা মাথা নাড়িয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। তার হাত দুটো কোলের ওপর রাখা, আঙুলগুলো একে-অপরের সাথে গাঁথা। সে বেশ নার্ভাস তাই ওর হাতের আঙ্গুলগুলো কাঁপছে।
‘আমি বাসায় ছিলাম না এতোদিন তাই তোমার সাথে দেখা করতে পারিনি। কেমন আছ তুমি? ভালো লাগছে তো আমাদের এখানে?’ বাড়িওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন।
‘ জি, ভালো আছি।’
আসমা নরম গলায় উত্তর দিল।
নার্গিস আসমাকে লজ্জা পেতে দেখে মুখ টিপে হাসল। সে বলল,
‘ মইনুল খুব ভালো ছেলে। ওর আলাপ ব্যবহার অনেক ভালো বোন। আমরাও মইনুলের মতো এমন একটা ভাই ছিলো। তুমি অনেক ভাগ্যবতী বোন তা না হলে এমন স্বামী পেতে কোথায়।’
কথাগুলো শুনে আসমার কান লাল হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে রইল,কোনো কথা বলল না। সাবিনা আসমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল,
‘ তুমি না ইউনিভার্সিটিতে পড়ো?’
‘জি, অনার্স করছি।’
‘হুম মইনুল ভাই পড়াতে এসে একবার তোমার কথা বলেছিলো আপু।’
‘ ও তোমাকে পড়াত?’
আসমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল। কারণ মইনুল যে সাবিনাকে পড়াই সেটা ও জানতো না।
‘ হ্যাঁ, আমাকে আর রিয়াকে চারমাস পড়িয়েছিলো তাই তো রেজাল্টটা ভালো হলো।’
আসমা কিছু বললো না,চুপচাপ শুনল। বাড়িওয়ালা একটু সামনে ঝুঁকে আসমার দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললেন,
‘তা চা-টা খাওয়াবে না আমাদের? এভাবে বসিয়ে রাখবে নাকি?’
আসমা কথাটা শুনেই লজ্জা পেলো। সে এলোমেলো পায়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘কথা বলতে বলতে ভুলেই গিয়েছিলা। আমি এখনই বানিয়ে আনছি। আপনারা একটু বসুন।’
‘ আস্তে ধীরে যাও, আমরা এখানেই আছি।’ নার্গিস হেঁসে বলল।
আসমা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে চলে গেল। স্টোভ জ্বালিয়ে পানি চড়াল, একই সাথে কিছু বিস্কুট একটা প্লেটে সাজিয়ে নিল। বিস্কুটগুলো মইনুল কাল কিনে এনেছিল তার জন্য। চা হয়ে গেলে চা আর বিস্কুট নিয়ে আসমা ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। আসমা সবাইকে চা দিল। সকলে চা নিল। নার্গিস কাপে চুমুক দিয়ে তার প্রসংশা করল,
‘ চাটা খুব ভালো হয়েছে। ’
আসমার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি দেখা দিল। নার্গিস আবারও জিজ্ঞাসা করল,
‘ রান্না করতে পারো?’
‘একটু একটু পারি। শিখছি এখনও।’
নার্গিস হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
‘তা শিখে যাবে ধীরে ধীরে। আমিও প্রথম প্রথম পারতাম না। এখন দেখো,সব অনায়াসে করে ফেলি।’
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে খালাম্মা আসমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাবার বাসা যেনও কোথায়?’
‘ গুলশানে।’
‘ মইনুল বলেছিল তুমি অনেক বড় বাড়ির মেয়ে তা এখন এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকতে, কষ্ট হচ্ছে না তো?’
আসমা মাথা নাড়ল।
‘ না, খালাম্মা কোনো কষ্ট হচ্ছে না। এই ছোট্ট বাসাটা আমার খুব ভালো লেগেছে, নিজেদের বাসা বলে কথা।’
বৃদ্ধা খালাম্মা মুচকি হাসল বলল,
‘ মইনুল বলেছিল তুমি অনেক নরম প্রকৃতির মেয়ে এখন দেখে তাই। ’
সাবিনা এবার একটু কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ আপু তোমাদের বিয়ে কবে হয়েছে?’
‘ ছ'মাস হয়ে গেছে।’
সাবিনা এক ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘ তাহলে তুমি এতোদিন পরে এখানে এলে কেন?’
এবার আসমার বদলে বৃদ্ধা তার কথার উত্তর দিল,
‘ মইনুল বড্ড দায়িত্বশীল ছেলে। চাকরি না হওয়া পর্যন্ত ওকে এখানে নিয়ে আসেনি, চাকরি পাওয়া মাত্রই নিয়ে এসেছে।’
সাবিনা ঠোঁট গোল করে বলল,‘ ওও।’
হঠাৎ নার্গিস মুখে দুষ্টু হাসি নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ আচ্ছা আসমা, তোমার স্বামী কেমন? আমরা জানি সে খুব ভালো ছেলে, কিন্তু তোমার কাছে কেমন হুম?’
সকলেই তার উত্তরের অপেক্ষায় তার দিকে তাকিয়ে আছে। এবার আসমার মুখটা একেবারে লাল হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে রইল, কোনো উত্তর দিল না। সাবিনা আর নার্গিস হেসে উঠল। আসমা আরো কাঁচুমাঁচু হয়ে গেলো।
বৃদ্ধা খালাম্মা স্নেহের হাসি দিয়ে বললেন,
‘ লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই মা। মইনুল তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করে তো?’
আসমা আস্তে আস্তে মাথা নাড়িয়ে বলল,
‘ হুম।’
‘ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবসময় মায়া মহব্বত থাকা উচিত। তা তোমরা কী হরিমুনে গিয়েছিলে?’
খালাম্মা জিজ্ঞাসা করলেন। আসমা এবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল৷ নার্গিস আর সাবিনার কপালেও ভাঁজ পড়ল।
‘ জি?’
‘ হরিমুনে যাওনি? ’
আসমা কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সাবিনা বলল,
‘ হরিমুন আবার কেন দেশে?’
বাড়িওয়ালা বৃদ্ধা নিজের চোখের চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন,
‘ আহ মরণ! হরিমুনের আবার দেশ-বিদেশ কী? ওটা তো সব দেশেই করা যায়।’
সাবিনা আবার বলল,
‘ দাদি তুমি কী হানিমুনের কথা বলছো?’
‘ হ তাই তো বলছি, হরিমুন।’
সাবিনা আর নার্গিস এবার ফিক করে হেঁসে উঠল। আসমাও ঠোঁট চেপে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। সে এতোক্ষণ ধরে হরিমুন কী সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল। সাবিনা মজা করে জিজ্ঞাসা করল,
‘ তা আপু হরিমুনে গিয়েছ তোমরা? ’
‘ না,এখনও ঘুরতে যায়নি। মইনুলের অনেক কাজ। এখন ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সময় নেই ওর কাছে।’
খালাম্মা চায়ের কাপটা টেবিলে রাখলেন, তারপর আসমার দিকে তাকিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল হুট করেই বলে দিল,
‘একখানা কথা বলি তোমাকে তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিয়ে নাও। সংসারে বাচ্চা এলে দুজনেরই সংসারের প্রতি মহব্বত বাড়ে আর নাতিনাতনির মুখ দেখলে মইনুলের বাবাও ছেলের উপর আর রাগ করে থাকতে পারবে না তাড়াতাড়ি একটা বাচ্চা নিয়ে নিও। বাচ্চা হলে দেখ সংসারে অন্য রকম এক রঙ আসবে।’
আসমা কথাগুলো শুনল। তবে বৃদ্ধা খালাম্মার মন ভরলো না,তিনি চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর শব্দ করে রাখলেন। তার চোখের দৃষ্টি তখন আসমার ওপর স্থির, আসমার অনাগত ভবিষ্যতকে তিনি এখনই পড়ার চেষ্টা করছে। সাবিনা আর নার্গিস হাসি থামিয়ে এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে বৃদ্ধার কথাগুলো শুনছে। বৃদ্ধা একটু সামনে ঝুঁকে এসে আসমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তার খসখসে হাতের স্পর্শে আসমার শরীরে কেমন একটা শিহরণ খেলে গেল। খালাম্মা বলতে লাগল,
‘শোন মা, সংসার হলো একটা কাঁচা মাটির হাঁড়ির মতো। একে যত্নে আগলে না রাখলে ফাটল ধরতে সময় লাগে না। এখন মইনুল কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত, আজ এখানে কাল ওখানে দৌড়াচ্ছে। যৌবনকাল তো, তাই রক্তের তেজ বেশি কিন্তু মনে রাখিস, পুরুষের মন থিতু হয় সন্তানের মুখ দেখে। যখন দেখবি কাজ থেকে ফিরে এসে মইনুল তোর কোলের ফুটফুটে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হাসছে, তখন বুঝবি সংসার কী জিনিস।’
আসমা মাথা নিচু করে রইল। বৃদ্ধার এমন কথায় লজ্জা আর অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরছে। সে মনে মনে দোয়া করছে যেনও বৃদ্ধা খালাম্মা এখনই থেমে যায় কিন্তু খালাম্মা থামার পাত্রী নন যে। তিনি এবার গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে বেশ রহস্যময় ভঙ্গিতে বললেন,
‘ বেশি দেরি করাটা ঠিক না। বয়স থাকতে থাকতে শরীরের বাঁধুনি শক্ত থাকে, বাচ্চা মানুষ করতেও তো কষ্ট হয় । দেরি করলে শরীর ভারী হয়ে যায়, তখন দেখবি নানা অসুখ-বিসুখ এসে শরীরে বাসা বাঁধছে। ’
নার্গিস পাশ থেকে তাকে থামাতে বলল,
‘খালাম্মা অনেক লেকচার দিয়েছ এখন আর না বাসায় চলো। কাল আবারও বল।’
বৃদ্ধা সেটা শুনেও না শোনার ভান করে আসমার দিকে তাকিয়ে আরও বড় করে শ্বাস নিল।
‘ মইনুলের বাপও নাকি ওর উপর রাগ করে আছে। দেখ মা ব্যাটাছেলেদের রাগ হলো বালির মতো। নাতি এসে যখন তার দাড়ি টেনে ধরবে আর আধো আধো গলায় 'দাদা' বলবে, তখন দেখবি ওই পাষাণ মন কেমন মোমের মতো গলে যায়। তখন তিনিই তোদের দুজনকে মাথায় তুলে নাচবেন। ওই বুড়ো মানুষটাকে বংশের একটা চেরাগ দেখতে পারলে দেখবি সব ঝামেলা মিটে গেছে। তখন বাড়ির বাতাস বদলে যাবে।’
আসমার মুখটা লজ্জায় লাল-লাল হয়ে গেছে। সেটা দেখে তিনি এবার আসমার চিবুক নাড়িয়ে বললেন,
‘একটু আধটু লজ্জা পাওয়া ভালো লক্ষণ, তবে সংসার কিন্তু লতায় পাতায় মতো বাড়ে না, সংসার বাড়ে বাচ্চাকাচ্চায়। আমি বলি কী, সামনের মাসের মধ্যেই কোনো এক ভালো ডাক্তার দেখিয়ে চেকআপ করিয়ে নে। শরীরের অবস্থাটাও জানা দরকার। আগেভাগে সব ঠিকঠাক থাকলে মনে এক ধরনের ভরসা পাওয়া যায়। আর হ্যাঁ, ওই যে মইনুলের কাজের বাহানা, ওটা কানে নিস না। পুরুষ মানুষ চিরকালই কাজের বাহানা দেবে। তুই তোর কাজটা গুছিয়ে ফেল।’
আসমা লজ্জায় হাঁসফাঁশ করছে খালাম্মা সেটা দেখেও নিজের কথার তুবড়ি থামাচ্ছে না। তিনি এখন দাম্পত্যের গভীর মনস্তত্ত্ব আর গ্রাম্য টোটকার পাঁচ মিশেল মশলা তৈরি করে আসমার সামনে ধরছেন। সাবিনা এসবের মাঝে ফোড়ন কেটে বলল,
‘দাদি, তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ বাচ্চাই হলো সব সমস্যার সমাধান?’
বৃদ্ধা ঝট করে সাবিনার দিকে ফিরল।
‘ আলবাত তাই! বাচ্চা হলো সংসারের আঠার মতো । যে সংসারে বাচ্চা নেই, সে সংসার জোড়া লাগে না ঠিকমতো। তুচ্ছ কারণে ঝগড়া হবে, মান-অভিমান হবে, আর শেষে দুজন দুদিকে মুখ করে শুয়ে থাকবে কিন্তু ঘরে একটা বাচ্চা থাকলে কার সাধ্য ঝগড়া করে মুখ ঘুরিয়ে রাখার? বাচ্চার জন্যই সব রাগ জল হয়ে যায়। একটা মা ডাক শোনার জন্য কত মেয়ে কত কি করে? আর তুই সব কিছু হেলাই হেলাচ্ছিস। ’
তিনি আর বলতে লাগল তাকে বেশি করল পুষ্টিকর খাবার খেতে, দুধ-ডিম আর শাকসবজি খেতে এমনকি কোন পীরের দোয়া নিলে খোদা মুখ তুলে চাইবেন সেটাও বলল। বৃদ্ধার কথার কাছে আশেপাশের সবকিছুই ফিকে হয়ে আসছে। বৃদ্ধা দীর্ঘ একটা উপদেশ দিল। প্রতিটা নববধূর কাছ থেকে মানুষের এই আসা আসমাকে মোটেও অবাক করলো না। সমাজের এই চিরন্তন প্রত্যাশাকে আসমা সহজভাবে নেওয়ার চেষ্টা করল। বৃদ্ধা এবার একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘যাই হোক মা, অনেক কথা বললাম। বড়দের কথা তিতা মনে হলেও এর ভেতরেই মধু আছে। আমি চাই তোদের ঘরটা হাসিখুশিতে ভরে উঠুক। ’
তিনজন মহিলা আরও কিছুক্ষণ বসে গল্প করল। পাড়া-প্রতিবেশীর নানা গল্প, পুরান ঢাকার ছোটখাটো ঘটনা, কার বাসায় কী হচ্ছে এসব নিয়ে কথা হলো। আসমা চুপচাপ শুনছিল, মাঝে মাঝে হাসছিল। এভাবে বসে গল্প করা তার ভালো লাগছিল। তাদের বাড়িতে এমন হতো না। সেখানে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত কিন্তু এখানকার মানুষগুলো খুবই আন্তরিক, একে অপরের খোঁজখবর নেয়। আসমার সেসব ভালো লাগল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে তিনজনে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। বৃদ্ধা বলল,
‘ আচ্ছা মা, আমরা এখন যাই। তোমার অনেক কাজ আছে নিশ্চয়ই। আমরা এসেছিলাম শুধু তোমাকে দেখতে। ভালো লাগল তোমার সাথে কথা বলে।’
আসমা উঠে দাঁড়াল।
‘ আপনারা আবার আসবেন। আমার খুব ভালো লাগল আপনাদের সাথে কথা বলে।’
নার্গিস স্নেহ করে আসমার মাথায় হাত রাখল।
‘ হ্যাঁ অবশ্যই আসব আর কোনো সমস্যা হলে আমাদের ডেকো।’
আসমা কৃতজ্ঞ হাসি হাসল। ‘ জি, ডাকব।’
তিনজনে বেরিয়ে গেল। আসমা দরজা বন্ধ করে ভেতরে এল। সে ড্রয়িংরুমের চায়ের কাপগুলো তুলে রান্নাঘরে নিয়ে গেল, ধুয়ে ফেলল। তারপর ঘরটা একটু গুছিয়ে নিল।
সন্ধ্যা নামছে। প্রায় সাড়ে ছয়টার দিকে মইনুল বাসায় ফিরল। আসমা দরজা খুলতেই দেখল লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা ছোট্ট পলিথিন ব্যাগ। মইনুল ভেতরে ঢুকে ব্যাগটা আসমার হাতে দিল। নরম গলায় বলল,
‘ তোমার জন্য চারা এনেছি।’
‘ কীসের?’
‘ তুলসী আর জুঁইয়ের।’
‘ কোথায় দেখি। ’
আসমা ব্যাগটা খুলল, ভেতরে ছোট্ট দুটো চারাগাছ। একটা তুলসী, আরেকটা জুঁই এর।
আসমা সেগুলো দেখে খুশি হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ এগুলো এখনই লাগাব?’
‘ ইচ্ছা হলে লাগাও। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।’
আসমা আর কথা না বাড়িয়ে বারান্দায় চলে এল। সেখানে দুটো ছোট্ট মাটির টব ছিল। মইনুল আগে থেকেই কিনে রেখেছিল। আসমা চারাগুলো সযত্নে টবে লাগাল। মাটি দিয়ে গাছের গোড়া ঠিক করল তারপর পানি এনে সেটা দিল।
মইনুল ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় এল। দেখল আসমা গাছগুলো লাগিয়ে ফেলেছে।
‘ কেমন হয়েছে চারাগুলো?’
‘ ভালো হয়েছে। এখন শুধু এগুলো বড় হওয়ার পালা।’
আসমা হাতটা মগের পরিষ্কার করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল। মইনুল তার পাশে দাঁড়াল, প্রশ্ন করল,
‘ সারাটা দিন কেমন গেল? ’
‘ ভালো। জানো আমার সাথে বাড়িওয়ালা বৃদ্ধা দেখা করতে এসেছিল ’
‘ একা?’
‘ না, সাথে নার্গিস আপা আর সাবিনাও ছিল।’
‘ তা কী বলল তারা?’
‘ অনেক কথা বললো তো জিজ্ঞেস করল আমি কেমন আছি, তুমি কেমন, আমাদের বিয়ে কবে হয়েছে এসব।’
মইনুল মাথা নাড়ল।
‘ আচ্ছা। ’
আসমা এবার চোখ তুলে মইনুলের দিকে তাকাল। একটু ইতস্তত করে বলল,
‘আর একটা কথা বলেছে।’
‘ কী?’
আসমা মাথাটা নিচু করে বলল,
‘বলেছে..তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিতে।’
মইনুল চমকে আসমার দিকে তাকাল।
‘ কী বলেছে?’
আসমা লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল।
‘ বলেছে বাচ্চা হলে নাকি তোমার বাবা নাকি আর আমাদের উপর রাগ করে থাকতে পারবে না। সব ঝামেলা মিটে যাবে।’
‘ কে বলেছে?’
‘ বাড়িওয়ালা খালাম্মা। ’
মইনুল কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখেমুখে বিস্ময়। সে রেলিং ধরে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। আসমা ভেবেছিল মইনুল হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবে কিন্তু মইনুল যা বলল, তা আসমার ধারণার বাইরে ছিল। মইনুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরস্থির গলায় বলতে শুরু করল,
‘আসমা, বাড়িওয়ালি খালাম্মা আমাদের ভালো চান বলেই কথাটা বলেছে। আমাদের সমাজে বড়দের একটা ধারণা আছে যে, সন্তান সব সমস্যার সমাধান। বিশেষ করে যখন কোনো পরিবারে অশান্তি বা সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকে, তখন বাচ্চাকে ধরা হয় একটা সেতু হিসেবে, যা দুই পক্ষকে জুড়ে দেবে। ওনি ভাবছেন, নাতি বা নাতনির মুখ দেখলে বাবা আমাদের ওপর আর রাগ করে থাকতে পারবেন না কিন্তু জীবনটা কি সত্যি এতোটা সহজ সরল?’
আসমা চোখ তুলে মইনুলের দিকে তাকাল।মইনুল বলতে থাকল,
‘সন্তান কোনো দাবার গুটি না যে তাকে নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করব। বাবা আমার ওপর রাগ করে আছেন কারণ আমি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আমার জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছি। এখন যদি আমরা একটা শিশুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তার কাছে যাই, তবে কি বাবার রাগের পরিবর্তন হবে? না। তিনি হয়তো বাচ্চার টানে আমাদের ঘরে ঠাঁই দেবেন, কিন্তু আমাদের ভেতরের সেই দূরত্বের ক্ষত তৈরি হয়েছে তা কি কখন মিটবে? সন্তানের উছিলায় যে ক্ষমা পাওয়া যায়, সেই ক্ষমায় কোনো আত্মসম্মান থাকে না আসমা। এই যে রাগ বা অভিমানটা এটা আমাদের দুই পক্ষের। এর মাঝে একটা নিষ্পাপ প্রাণকে টেনে এনে তাকে সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে দাঁড় করানো কী তার প্রতি অবিচার না? আমরা যদি আজ একটা সন্তান নিই শুধু বাবার মন জয় করার জন্য, তবে সেই বাচ্চাটা জন্ম নেবে একটা দায়বদ্ধতা নিয়ে। সে জন্মাবে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে। আমি চাই না আমার সন্তান কোনো ঝগড়া মেটানোর মাধ্যম হয়ে পৃথিবীতে আসুক।’
আসমা মইনুলের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। মইনুল আসমাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
‘ সন্তান লালন-পালন করা মানে শুধু তাকে খেতে দেওয়া বা বড় করা না। এর জন্য প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি, আর্থিক সচ্ছলতা আর সবচেয়ে বড় জিনিস একটা শান্তিময় পরিবেশ। আমরা এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেখানে আমরা নিজেরাই এখনো স্থির হতে পারিনি। বাবার সাথে সম্পর্ক কবে ঠিক হবে, বা আদৌ হবে কি না, সেটা ভবিষ্যতের হাতে, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার বোঝা আমি তোমার বা আমাদের অনাগত সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চাই না।’
মইনুল একটু থেমে আবার বলল,
‘ বাবা আমাদের মেনে নেবেন কি নেবেন না, সেটা তার সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমরা তাকে বাচ্চার লোভ দেখিয়ে বাধ্য করতে চাই না। আমরা চাই তিনি আমাদের ভালোবাসুন আমাদের জন্য। আর সন্তানের কথা যদি বলো, তবে সে তখনই আসবে যখন আমরা তাকে একটা সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং চাপমুক্ত জীবন দেওয়ার মতো সক্ষম হবো। কেবল পরিবারের চাপে বা কারোর মন জয় করার জন্য সে আসবে না।’
আসমার মনের ভেতরের এতোক্ষণ সে সংকোচ আর দ্বিধা ছিলো সেটা কর্পূরের মতো উবে গেল। সে আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কেবল আবেগ দিয়ে চলে না, তার ভেতরে একটি বলিষ্ঠ বিবেকও কাজ করে। মইনুলের এমন রূপ দেখে আসমা আবারও তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতে বাধ্য হলো। মইনুল বলতে লাগল, ‘ আমাদের সমাজ মনে করে বাচ্চা হলেই দম্পতির মধ্যকার সব দূরত্ব ঘুচে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটা শিশু আসার পর সকলের দায়িত্ব দশগুণ বেড়ে যায়। যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া বা পরিস্থিতির ভিত্তি মজবুত না থাকে, তবে সেই অতিরিক্ত দায়িত্ব অনেক সময় সম্পর্কের ফাটলকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমি চাই আমাদের দুজনের ভিত্তিটা আগে পাথরের মতো শক্ত হোক।’
আসমার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,
‘তুমি ঠিকই বলেছো। আমি আসলে খালাম্মার কথার আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল এটাই হয়তো সহজ একটা পথ হবে বাপ ছেলের মধ্যেকার সম্পর্ক ঠিক করার ।’
মইনুল আসমার কাঁধে হাত রাখল।
‘সহজ পথ সবসময় সঠিক পথ হয় না, আসমা। আমরা যদি আজ বাবার মন পাওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ নিই, তবে কাল হয়তো অন্য কোনো কিছুর জন্য আমাদের আবারও আপস করতে হবে। আমি আমাদের জীবনটা সম্মানের ওপর গড়তে চাই। মানুষের মন নরম হওয়া আর ভেতর থেকে মেনে নেওয়া এক কথা না। তাছাড়া মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব হলো একটা বিশাল সাধনা। আমরা সংসারটা মাত্র গোছাতে শুরু করেছি। বাবার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন আমরা আমাদের মতো করে মেটাব। তাছাড়া একটা সুস্থ শিশু জন্ম দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো একটা কলহমুক্ত সুস্থ পরিবেশ যা এখন আমাদের নেই। দেখো একদিন বাবার রাগ কমবে, আমরা আবারও এক হবে, কোনো আপস-মীমাংসার দলিল না, সে হলো স্রষ্টার এক স্বাধীন উপহার তাই সকলের কথায় কান দিবে না।’
আসমা সবকিছু ভালোভাবে ভাবতে লাগল। আসলেই মইনুলের কথাগুলো ঠিক। মইনুল আসমার হাত ধরে বলল,
‘ চলো এখন, খিদে পেয়েছে। খাবার দিবে। ’
মইনুল বারান্দায় গামছাটা মেলে ভেতরে ঢুকে গেল। আসমাও মইনুলের সাথে ঘরের ভেতরে পা বাড়াল। তার মনের মধ্যে চলা দ্বিধাদ্বন্দ্ব মইনুলের কথাগুলোর মাধ্যমে শেষ হয়ে গেলো। সারাটাদিন মনের মধ্যে যে ভার ছিলো সেটা এখন আর নেই, বরং এখন তার মধ্যে স্বস্তি কাজ করছে। আসমা ভালোভাবেই বুঝতে পারল, একজন প্রকৃত পুরুষ কেবল সে নয় যে পরিবার চালায়, বরং সে-ই যে তার সঙ্গিনীকে জীবনের গভীর অর্থ বুঝতে সাহায্য করে এবং একটা অনাগত প্রাণের প্রতি তার দায়িত্ব ও সম্মানবোধ বজায় রাখে। সন্তান মূলত কোনো সমস্যা সমাধানের মাধ্যম বা হাতিয়ার না। প্রত্যক বাবা মায়ের উচিত তাদের সন্তানকে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে ভালোবাসার মাধ্যমে পৃথিবীতে আনা, কোনো পারিবারিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে না।
রাত বাড়তে শুরু করেছে। খাওয়াদাওয়া শেষ। আসমা চা করে নিয়ে এল। দুজনে মুখোমুখি বসে চা খাচ্ছে আর রাতের আকাশ দেখছে। দুজনের মাঝে লম্বা একটা নিরবতা দেখা দিল। মইনুল সেই নিরবতা ভাঙতে জিজ্ঞেস করল,
‘ তোমার ক্লাস কেমন গেল আজ?’
‘ মোটামুটি। স্যার বললেন পরের সপ্তাহে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিতে হবে।’
‘ কী বিষয়ে?’
‘ বাংলা সাহিত্যের ওপর। আমি শুরু করব পরশু থেকে।’
‘ ঠিক আছে। দরকার হলে আমাকে বলো, সাহায্য করব।’
‘ তুমি তো ইংলিশে পড়ো, বাংলা সাহিত্যে আবার কী সাহায্য করবে?’
‘ বউয়ের জন্য সব করার যায়। শুধু একবার বলেই দেখ না। ’
আসমা হাসল লোকটার কথা শুনে বলল,
‘ ঠিক আছে, দরকার হলে বলব।’
রাত গভীর হতে লাগল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। আসমা একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। সে মইনুলের কাঁধে নিজের মাথাটা রাখল। মইনুল ডান হাতে আসমাকে নিজের কাছে টেনে নিল।
...
মাসখানিক পরে।সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। বিকাল বেলার মিঠে মৃদু রৌদ্র জানলা দিয়ে রান্নাঘরে আসছে। পুরান ঢাকার আসমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে ঘি এর মাদকতায় ভরা সুগন্ধ। গত তিন ঘণ্টা ধরে আসমা একা হাতে কাজ করে যাচ্ছে। এই তিন ঘন্টায় সে এক মুহূর্তও দম ফেলার সময় পায়নি। গরমের ফলে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, শাড়ির আঁচল দিয়ে সে বারবার কপাল মুছছে। খোঁপা করা চুল থেকে কয়েকটা চুল বাহিরে বের হয়ে গেছে এবং কিছু চুল কপালে লেপ্টে গেছে। চুলার ওপর বড় পিতলের কড়াইয়ে ছোলার ডালের হালুয়া হচ্ছে। আসমা একটা বড় কাঠের খুন্তি দিয়ে মনোযোগের সাথে সেটা নাড়ছে যেনও নিচ থেকে লেগে না যায়। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট নাড়ার পড়ে হালুয়ার রং সোনালি বাদামি হয়ে উঠেছে, তাতে দেওয়া ঘিও চকচক করছে, যার সুঘ্রাণে পুরো বাড়ি মোঁ-মোঁ করছে। পাশের ছোট্ট কাউন্টারে সারি-সারি করে সাজানো চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি মিহি রুটি। বড় থালায় স্তূপ করে রাখা সেসব।
রান্নাঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাহির থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। পাশের বাড়ির ছাদে ময়নার খাঁচায় থাকা ময়নাটা ডাকাডাকি করছে। শাবান মাসের এই দিনটা এদেশের মুসলিম পরিবারগুলোতে বিশেষ ব্যস্ততার দিন হিসাবে দেখতে পাওয়া যায়। আসমার মনে পড়ল ছোটবেলার কথাগুলো, এই দিনে আগে তার মা, চাচিরা সকাল থেকে সারাদিন কতই না ব্যস্ত থাকত। আসমা ছোট থেকে দেখে এসেছে কীভাবে এই দিনটা তাদের বাড়িতে উদযাপিত হয়। শবে বরাতের এই বরকতময় রাত সকলে কতই না আনন্দ মজা করত।
আসমার চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি কারণ প্রতিবেশীদের দেওয়ার জন্য এতোক্ষণ কষ্ট করে তৈরি করা রুটি-হালুয়া প্রায় হয়ে এসেছে। এগুলো সে বাসার বাহিরের গরিবদের দান করবে, আর রাতে নফল নামাজ পড়বে এগুলোই সে কল্পনা করছে।দেয়ালে বাঁধানো ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা বাজছে। বাড়ির কলিং বেল বাজল। আসমা হাতের কাজ বন্ধ করল। মইনুল ফিরেছে। সে তাড়াতাড়ি আঁচলটা ঠিক করে, হাত মুছে দরজা খুলতে ছুটল।
দরজা খুলতেই দেখল মইনুল দাঁড়িয়ে আছে। আসমা দরজা খুলতেই তার নাকে এসে লাগল এক তীব্র, মিষ্টি সুগন্ধ। মইনুল জুতো খুলে ভেতরে ঢুকল এবং সোজা সেই গন্ধের উৎস খুঁজতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মইনুল দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখ বড়-বড় হয়ে গেছে। কাউন্টারে সারি-সারি সাজানো ডজন ডজন রুটি, পিতলের বড় পাত্রে ভরা হালুয়া। আর ছোট ছোট মাটির পাত্রে আলাদা করে সাজানো বিতরণ করার জন্য রুটি-হালুয়া এগুলো দেখে মইনুলের ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘এসব কী আসমা?’
মইনুল অনেক অবাক হয়ে, কিছুটা উদ্বেগ মিশিয়ে আসমাকে প্রশ্ন করল।
আসমা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে হাসিমুখে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ভুলে গেলে নাকি? আজ তো শবে বরাত।’
‘ ভুলিনি কিন্তু এগুলো বানিয়েছ কেন?’
‘ পাগল রুটি-হালুয়া বানাব না? এটা তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। প্রতি বছর বানায়। যাও তুমি গোসল করে রেডি হও, সন্ধ্যার পর প্রতিবেশীদের বাসায় এগুলো দিয়ে এস। খালাম্মার বাসায়, নার্গিস আপার বাসায়, আর নিচতলার বাসায়ও দিতে হবে।’
মইনুল এবার আসমার কাজ কর্ম দেখে নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ড্রয়িংরুমে এসে কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রাখল, তারপর একটা চেয়ার টেনে বসল। আসমাও মইনুলের এমন আচরণ দেখে তার পিছু পিছু লোকটার পিছনে এসে দাঁড়াল,জিজ্ঞাসা করল,
‘ কী হয়েছে তোমার?’
মইনুল খুব শান্ত, নরম গলায় বলল,
‘ আমার সামনে এসে সোফায় বসো দেখি।’
আসমা কথা বাড়ালো না। সে সোফায় এসে মইনুলের সামনাসামনি বসল। লোকটা কী তার এসব কাজে বিরক্ত হয়েছে? কিন্তু এখানে বিরক্ত হওয়ার কী আছে?
‘তুমি কষ্ট করে এত সব বানিয়েছ দেখে আমি অবাক হয়েছি, অবশ্য তোমার পরিশ্রম দেখে ভালোও লেগেছে তবে একই সাথে আমি একটু বিস্মিত হচ্ছি এটা ভেবে যে তুমি এই রুটি-হালুয়া বা উৎসবের সাথে এই রাতটাকে কীভাবে জড়িয়ে ফেললে? ’
‘ মানে?’
‘ মানে কিছুই না, আমাকে বলতো তুমি যা করেছ তার সাথে ইবাদতের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়?’
এতোক্ষণ আসমার মুখে লেগে থাকা হাসিটা এক নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। সে মইনুলের কথার ধাঁচ ধরতে পারল। সে চুপ করে থাকতে পারলো না, কিছুটা প্রতিবাদের স্বরে বলল,
‘ ইবাদতের সম্পর্ক নেই মানে? কী বলছ এসব? পাগল হলে নাকি?’
মইনুল বুঝতে পারল আসমা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। ধর্মের ব্যাপারে একজন মুসলিম আবেগ প্রবণ হবে সেটাই স্বাভাবিক। সে উঠে গিয়ে আসমার পাশে বসল। তার হাত আসমার কাঁধে রাখল, খুব নরম, স্নেহমাখা সুরে বলতে শুরু করল,
‘ আসমা এতো আবেগ প্রবণ হইয়ো না, দ্বীনের ক্ষেত্রে, ধর্মের ক্ষেত্রে আবেগে গা ভাসালে হয় না। দ্বীনের ক্ষেত্রে ইবাদতের জন্য একমাত্র দলিল বা প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ এবং তার রাসুলের (সা.) কথা। চলো, আমরা ঠান্ডা মাথায় একটু কথা বলি। ’
আসমা চোখমুখ কুঁচকে বসে রইল। মইনুল আসমার এই অবস্থা দেখে ধীর গলায় বলতে শুরু করল,
‘তুমি হয়তো জানো না হাদিসে 'শবে বরাত' বলতে কোনো শব্দই নেই?’
‘ মানে?’
আসমা মইনুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘ শবে বরাত একটা ফারসি শব্দ। 'শব' মানে রাত আর 'বরাত' মানে মুক্তি বা ভাগ্য। ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরান ও তুরস্কে এই নাম প্রচলিত কিন্তু হাদিসের বইগুলোতে এই রাতকে 'লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান' বা 'শাবান মাসের মধ্য রজনী' বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বা সাহাবারা কখনো একে 'শবে বরাত' বলেননি।’
মইনুলের কথাগুলো আসমা হজম করার চেষ্টা করতে লাগল। আসমা মইনুলকে যতটুকু চেনে তাতে সে ভালো করেই জানে লোকটা ভুলভাল কথা বলে না৷ একটা বিষয়ে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করে, যাচাই-বাছাই করে তারপরেই বলে।
‘ তবে শুনেছি যে কুরআনে নাকি এই রাতের কথা উল্লেখ আছে। আজই তো আগামী বছরের হায়াত, মউত, রিজিক লেখা হয়।’
‘ না,এমন কিছুই বলা হয়নি এই রাতকে নিয়ে কুরআনের সুরা আদ-দুখানে আল্লাহ বলেছেন, 'আমি এটি (কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি যে রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।' পৃথিবীর অধিকাংশ বড় বড় মুফাসসির যেমন ইবনে কাসির, তাবারি তারা সবাই একমত যে, কুরআনে যে রাতের উল্লেখ করা হয়েছে তা আসলে 'লাইলাতুল কদর', যা রমজান মাসে আসে। শাবান মাসের এই ১৫ তারিখের রাতটি না। আমাদের এই অঞ্চলে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত হয়ে গেছে যে আজ রাতে ভাগ্য লেখা হয়। এটা ভুল তথ্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে গেছে।’
আসমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ ভুল? ইবাদতে আবার ভুল কিসের? আগেকার বড়রা সবাই এই রাতে কত কী করেছে রুটি হালুয়া করে সবাই একে অপরকে দিয়েছে,মসজিদে মসজিদে মিলাদ দিয়েছে, তাছাড়া এগুলো তো ভালো কাজ। তারা সারারাত জেগে আল্লাহর ইবাদত করত।এই ইবাদতেও সমস্যা নাকি? রবের ইবাদত করা তো ভালো কাজ।’
মইনুল নরম গলায় বলল,
‘ সমস্যা হবে কেন পাগল? কিন্তু ইসলামে ইবাদত কবুল হওয়ার দুটি শর্ত আছে। এক নিয়ত পরিষ্কার হতে হবে আর দুই কাজটি রাসুল (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হতে হবে। আমাদের নবীজি (সা.) বা তার সাহাবীরা কখনো শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খেয়েছেন বা বিলিয়েছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি এই রাতের জন্য বিশেষ কোনো সম্মিলিত ইবাদতের নিয়মও তারা রেখে যাননি। অথচ তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ইবাদতগুজার ছিলেন। তারা যদি এটা করতেন, আমরা জানতাম।’
আসমা মুখ ভার করে পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘ সবাই কি তবে অকারণে সারারাত জাগে?’
মইনুল আসমার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে সেটা চেপে ধরে তাকে বুঝিয়ে বলল,
‘ রাসুল (সা.) থেকে একটি হাসান (গ্রহণযোগ্য) হাদিস পাওয়া যায়। সহিহ ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ এসব কিতাবে আছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের মধ্য রজনীতে তাঁর সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং দুই শ্রেণির মানুষ ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।' সেই দুই শ্রেণি হলো: প্রথম, মুশরিক, যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে, তার সাথে অংশীদার করে। আর দ্বিতীয়, 'মুশাহিন' বা যারা অন্যের প্রতি মনে চরম বিদ্বেষ, ঘৃণা, হিংসা পুষে রাখে।’
আসমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল কিছু একটা চিন্তা করে বলল,
‘তাহলে আমাদের বাপ-দাদারা যা করেছেন তা সব বিদআত? তারা কি গুনাহ করেছেন? ’
মইনুলের কাছে আসমার করা প্রশ্নটার উত্তর থাকলেও, উত্তর দিতে সমস্যায় পড়ল। সে কীভাবে অন্য মানুষের ইবাদতকে, রবের প্রতি ভালোবাসাকে বিদআত বলবে? সে খুব শান্তভাবে, ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
‘দেখো, আগে বিদআত শব্দটা বুঝতে হবে। বিদআত মানে হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢোকানো যা ইবাদত হিসেবে করা হয়, কিন্তু ধর্মের মূলে, কুরআন-হাদিসে তার অস্তিত্ব নেই। আমাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো খুবই ভালো নিয়তে, সৎ মনে দান-খয়রাত বা খাওয়ানোর কথা ভেবেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন এটা ভালো কাজ কিন্তু যুগের আবর্তে, সময়ের সাথে সাথে, সেটা একটা প্রথায় পরিণত হয়ে গেছে। একটা বাধ্যতামূলক উৎসবে পরিণত হয়ে গেছে। এখন মানুষ মনে করে আজ রুটি না বানালে শবে বরাত পূর্ণ হবে না, মসজিদে না গেলে ইবাদত হবে না, হালুয়া না খেলে বরকত আসবে না। তুমি খেয়াল করে দেখেছ আমাদের সমাজে এই রাতটাকে নিয়ে কী এক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করে? বাংলাদেশে শুধু হালুয়া-রুটি বিলায় কিন্তু বাহিরের দেশে যেমন ভাতর পাকিস্তানে আরো অনেক কিছু হয়। মানুষ আজ রাতে দলে দলে কবরস্থানে যায়, মোমবাতি জ্বালায়, ফুল দেয়, এমনকি অনেক জায়গায় পুরো কবরস্থানটাকেই রঙিন বাতি দিয়ে, মোমবাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়৷ তারা কবরস্থানে যায় সেটা সাজাতে অথচ আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কবরস্থানে যেতে হবে নিজের মৃত্যু আর পরকালের কথা স্মরণ করতে, বিনম্র হতে, আল্লাহকে ভয় করতে। সেখানে মৃতদের জন্য দোয়া করতে হবে। নবীজি কী কখনো আমাদের এসব করতে বলেছেন? মৃত মানুষের আলো বা ফুলের দরকার নেই। তাদের দরকার আমাদের আন্তরিক দোয়া। কিন্তু আমরা দোয়া করা বাদ দিয়ে কবরস্থান আলোকসজ্জায় ব্যস্ত হয়ে যাই।’
আসমা এবার মইনুলের কথা চুপচাপ শুনছিল। মইনুল বলতে থাকল,
‘আরেকটা মজার কিন্তু কষ্টের ব্যাপার দেখো আসমা। আজ মাগরিবের পর থেকেই দেখবে পাড়ার মোড়ে মোড়ে সাজসাজ রব। মানুষ নতুন পাঞ্জাবি পরে, গায়ে আতর মেখে, চোখে সুরমা দিয়ে, দলে দলে মানুষ মসজিদে যাবে। তারা আজ রাতে শত রাকাত নফল নামাজ পড়বে, সারারাত জেগে জিকির করবে, কুরআন পড়বে। অনেকে তো রাত জেগে পুরো কুরআন খতম করার চেষ্টা করে। অথচ করুন বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই আছে যারা সারা বছর ফরজ নামাজের ধার ধারে না। ফজরের নামাজ পড়ে না। জোহর-আসর মিস করে। এমনকি আজ সারারাত জাগার পর আগামীকাল ফজরের ফরজ নামাজটা তারা আর পড়বে না। চিন্তা করো, যে আল্লাহ আখিরাতে ফরজ নামাজের হিসাব আগে নেবেন, যিনি ফরজকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, সেই আল্লাহ কি সারারাতের হাজারো নফলের বিনিময়ে একটা ফরজ নামাজের প্রতি অবহেলা মেনে নেবেন? এটা অনেকটা এমন যে,কোনো নৌকার তলায় বিশাল ছিদ্র হয়ে সেটা দিয়ে পানি উঠছে, আর মাঝি সেই ছিদ্র বন্ধ না করে নৌকার পাল বড় করে সেটা ওড়ানোর চেষ্টা করছে। অথচ সে যদি পাল না তুলে ছিদ্রটা বন্ধ করত তবে সে লাভবান হতো।’
আসমা মাথা নিচু করে শুনছিল। মইনুলের কথাগুলো তাকে ভাবাচ্ছে,গভীর ভাবে ভাবাচ্ছে৷
‘আসমা, ইসলাম কোনো ইমোশন বা আবেগের ধর্ম না। এটা একজন মানুষের পুরো জীবনটা গুছিয়ে দেয়, শৃঙ্খলা শেখায়। আর রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে সবকিছু পরিমিতভাবে, নিয়ম মেনে, ধারাবাহিকভাবে করতে হয়। তিনি শিখিয়েছেন শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতে, যাতে রমজানের জন্য শরীর ও মন তৈরি হয়। কিন্তু আমরা সেই সুন্নাহ বাদ দিয়ে শুধু এক রাতের নফল ইবাদত আর রোজা দিয়ে নিজের ভাগ্যকে বদলানোর চেষ্টা করি, ঘটা করে গোসল করে, নামাজ পড়ে মনে করি সব গুনাহ ধুয়ে গেল,কিন্তু পরদিন থেকে আবার আগের মতো মিথ্যা বলি, পরনিন্দা করি, ফরজ নামাজ কাজা করি,হারামে লিপ্ত হয়ে যাই।এটা কখনই কোনো মুমিনের ইবাদত হতে পারে না আসমা, এটা পরিষ্কার নিজের নফসকে ধোঁকা দেওয়া ছাড়া আর কী হতে পারে? শবে বরাত শব্দটার মানে 'মুক্তির রাত'।আর মানুষের মুক্তি আছে তো নিজের নফসের গোলামি থেকে বের হয়ে এসে আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করার মধ্যে। ’
আসমা সবটা শুনে একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘সবই তো বুঝলাম কিন্তু এই যে আমি নিয়ত করেছি কাল রোজা রাখব, সেটার কী হবে? আমাদের পাড়ার সবাই তো এই ১৫ই শাবানের রোজাটা রাখে। এটা কি রাখা যাবে না?’
‘রোজা রাখা যাবে না কেন? আমাদের নবীজি (সা.) শাবান মাসে বছরের অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে রমজান বাদে বেশি নফল রোজা রাখতেন। ’
‘ তুমি আমার কথাটা বুঝতে পারোনি।’
‘ বুঝতে পেরেছি। তুমি বলতে চাইছ শবেবরাত উপলক্ষে কাল রোজাটা রাখবে কিনা। দেখে নবিজী বা সাহাবিরা এমন কিছুই করেননি। শুধু ১৫ তারিখকে বিশেষ মনে করে একটা রোজা রাখার যে হাদিসটা আমরা শুনি, সেটা অনেক বড় বড় হাদিস বিশারদদের মতে বেশ দুর্বল। তাই শুধুমাত্র এই একটা দিনকে ঘটা করে পালন করা বা এটাকে আবশ্যক মনে করাটা সঠিক না। বিশেষ দিনে রোবটের মতো এক নাগাড়ে ইবাদত করার চেয়ে নিয়মিত মন দিয়ে অল্প ইবাদত করাকে বেশি পছন্দ করেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা।’
‘ আমার একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘ করে ফেলো আমি শুনছি।’
‘ এই যে ছোটবেলা থেকে মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি, উহুদ যুদ্ধে আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছিল। তখন তিনি শক্ত কিছু খেতে পারছিলেন না বলে নরম খাবার হিসেবে হালুয়া আর রুটি খেয়েছিলেন। তার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তো আমরা আজ নরম খাবার হিসেবে এগুলো বানাই, এটাও কী ভুল?’
‘ হুম।তুমি যে উহুদ যুদ্ধের কথা বললে, জানো সেই যুদ্ধটা ঠিক কবে হয়েছিল?’
আসমা মাথা নাড়ল, সে ঠিক মাস, তারিখ জানে না।
মইনুল বলল,
‘ ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, উহুদ যুদ্ধ হয়েছিল হিজরি তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে। আর আজ হলো শাবান মাস। মাসের ব্যবধানটা খেয়াল করো। নবীজির দাঁত শহীদ হওয়ার ঘটনার সাথে এই মাসের কোনো সম্পর্কই নেই। হালুয়া-রুটি খাওয়ার এই গল্পটি লোকমুখে ছড়ানো একটি বানোয়াট কাহিনী মাত্র। এর কোনো ঐতিহাসিক বা হাদিসগত ভিত্তি নেই। যারা ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা করে, তারা এমন সব আবেগী গল্প তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।’
আসমা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার মনে হলো, বছরের পর বছর ধরে সে যে বিশ্বাসটা মনের ভেতর পুষে রেখেছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে মৃদুস্বরে বলল,
‘ এতদিন তবে আমরা একটা ভুল ধারণার পেছনে ছুটছিলাম? আমি এগুলো সওয়াবের কাজ ভেবে করতাম। আমরা এতো ভুল করেছি?’
মইনুল আসমার হাতটা টেনে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নরম গলায় বলল,
‘ ভুল মানুষই করে কিন্তু সত্য জানার পর সেটা সংশোধন করে নেওয়াটা হলো মুমিনের কাজ। এখন থেকে আর কোনো বানোয়াট গল্পের ওপর ধর্মকে দাঁড় করাবে না।দ্বীনের পথে চলতে হলে মানুষের আবেগের থেকে বিশুদ্ধ ইলম প্রয়োজন কারণ জ্ঞানহীন ইবাদত অনেক সময় মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আর ইবাদতের মধ্যে নিজেদের পক্ষ থেকে নতুন কিছু যোগ করা মানে হলো পরোক্ষভাবে এটা মেনে নেওয়া যে, দ্বীন পূর্ণাঙ্গ নয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা নবিজি বেঁচে থাকাকালীন দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন। তাছাড়া কানে আসা সব কথাই বিশ্বাস করতে নেই। বিশেষ করে যখন বিষয়টি ধর্মের, তখন অবশ্যই তার রেফারেন্স বা উৎস যাচাই করে নেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব বুঝলে? ’
আসমা লোকটার দিকে না তাকিয়ে নিজের মাথা নাড়ল। মইনুল আবারও বলল, ‘ তোমাকে কিছু বই এনে দিব কাল নিজে পড়ে দেখ
কথাগুলো কতটুকু সঠিক আর কতটুকু ভুল।’
#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৪.দ্বিতীয়াংশ
‘ যা মা গিয়ে ওনাকে চা-টা দিয়ে আয়। ’
রহিমা বেগমের সাথে রান্নাঘরে বসেছিলো আসমা। রহিমা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লে মইনুল আসমাকে নিয়ে গ্রামে চলে আসে। রহিমা বেগমের সময় কেটেছে, আটমাসের মতো। আজ চারমাস তারা গ্রামে, আসমা বাড়ির সকলের কাছে খুব স্নেহের হলেও জব্বার শেখ তাকে বিশেষ পছন্দ করে না তবে কখনো কষ্টও দেয় না। বাড়ির সবার ব্যাপারে জব্বার শেখ বেশ সোচ্চার হলেও তার ব্যাপারে কেমন সব সময় নিরব থাকে। শ্বশুরের এমন আচরণে আসমার মনটা ভার হয়ে আসে৷ সে নিজের পক্ষ থেকে সবসময় তার শ্বশুরমশাইকে সম্মান দিয়ে আসার চেষ্টা করে তবুও লোকটার এমন ব্যবহার তাকে কষ্ট দেয়।
‘নয়নিকাকে ডেকে দি আম্মা?আমি সামনে গেলেই আব্বার মুখটা কালো হয়ে যায়।’
রহিমা বেগম চোখ তুলে আসমার দিকে তাকাল। আসমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে বসেই ববিতা দুপুরের রান্নাবান্নার জন্য তরকারি কাটছিলো। রহিমা বেগম তাকেই বলল,
‘ ববিতা এটা ওনাকে দিয়ে আস।’
ববিতা কথা বাড়ালো না। চায়ের কাপ নিয়ে বসার ঘরে চলে আসল। রহিমা বেগম বড় ছেলের বউয়ের দিকে তাকাল। শহুরের মেয়েটা এই অজপাড়া গাঁয়ে এসে যে মানিয়ে নিচ্ছে তাদের সংসারের হাল ধরেছে সেটার জন্য তিনি মেয়েটার প্রতি বড্ড কৃতজ্ঞ।
রহিমা বেগম উনুন ধারের পিঁড়িতে বসে কাজ করছিল, শরীরটা বেশ কদিন ধরেই ভালো যাচ্ছে না তার। রান্নাঘরের বিশ্রী ধোঁয়া আর গরমের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আসমা। আসমার মনটা খারাপ, মইনুল যখন তাকে শহর থেকে এই গ্রামে নিয়ে এসেছিল, আসমা ভেবেছিল হয়তো কয়েক দিনেই ফিরে যাবে কিন্তু মাস চারেক হলো তারা এই ভিটেতেই থিতু হয়েছে। ববিতা তখন কোনো কথা না বাড়িয়ে কাপটা নিয়ে বসার ঘরের দিকে চলে গেয়েছিল যার ফলে এখন রান্নাঘরে শাশুড়ি বউ ছাড়া আর কেউ নেই। রহিমা বেগম আদুরে গলায় আসমাকে কাছে ডাকলেন। আসমা নিচু হয়ে তার পাশে বসল। রহিমা বেগম বউমাকে বুঝিয়ে বলতে লাগল,
‘মা, তোর ওপর তোর শ্বশুরের কোনো রাগ নেই। উনি মানুষটাই এমন। আগ্নেয়গিরির মতো বাইরে থেকে শক্ত, কিন্তু ভেতরে নরম। মইনুল তার বিরুদ্ধে গিয়ে যখন তোকে বিয়ে করল তখন উনি ভেবেছিলেন শহরের মেয়ে হয়ে তুই এই বাড়ির পাট সামলাতে পারবে না, তাছাড়া তুই তো জানিসই তোর শ্বশুর আর চাচা শ্বশুরের সম্পর্কন কেমন ভালো। মইনুলের জন্য তিনি ভাইয়ের সামনে যেতেও লজ্জা পাচ্ছে তাই মানুষটা এমন খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছে। উনি তোকে অপছন্দ করেন না মা, আবার তোকে আপন করে নিতে না পারার অপরাধ নিজেকে ছোট মনে করেন বলেই হয়তো তোকে এড়িয়ে চলেন। তুই রাগ করিস না মা,দেখিস একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে শুধু একটু সময় লাগবে।’
রহিমা বেগমের এমন আশ্বাসময় কথায় আসমার মনে জমে থাকা কালো মেঘ এক নিমেষে কেটে গেলো। রহিমা বেগম মাটির উনুনে রান্না করছেন তিনি চুলায় কিছু পাতা দিল। মাটির উনুন থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। রহিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আসমার হাতটা ধরে নিল।
তিনি আসমার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,
‘মানুষটা সারা জীবন নিজেকে এমন একটা বেড়াজালে আটকে রেখেছেন যে,তার কাছে আবেগ প্রকাশ করাটা অনেক বড় কিছু। মইনুল যখন তোকে বিয়ে করার জন্য গ্রাম ছাড়ল, তখন গ্রামের অনেকেই অনেক কথা বলেছিল। শহরের মেয়ে গ্রামে টিকবে না, সংসার ভাঙবে, এই মেয়ে ঘরের আসার আগেই বাপ ছেলের সম্পর্ক নষ্ট করছে, আসলে না জানি কী হবে; এসব শুনে উনি খুব ভয় পেয়েছিলেন কিন্তু গত চার মাসে তুই যেভাবে এই অগোছালো সংসারটাকে আগলে ধরেছিস,আমার মনে হয় না উনি তোকে অপছন্দ করেন।’
রহিমা বেগম আসমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। রহিমা বেগম একটু থামলেন, বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আবার বললেন,
‘আমার এই শরীরটা আর কদিন ভালো থাকবে জানি না। নয়নিকা,ময়না, আর রফিকুল এখনো সংসারের কিছু বোঝে না। এই সংসারটা আগলে রাখার দায়িত্ব এখন তোর। এই সংসারটাকে তুই কোনোদিন আলগা হতে দিস না। মানুষে মানুষে মান-অভিমান থাকবেই, কিন্তু যেটা সবসময় দীর্ঘ হয় না। আমার অবর্তমানে তোকেই সংসারের হাল ধরতে হবে মা।’
রহিমা বেগমের কথাগুলো শুনে আসমা নড়েচড়ে বসল। শাশুড়ির শীর্ণ হাতটা নিজের দুহাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে সে একটা লম্বা শ্বাস নিল। নরম গলায় বলল,
‘আম্মা,এসব কথা বলেন না। আপনি এখনো শতবর্ষ বাঁচবেন। আর আব্বার থেকে দোষটা আমার বেশি, আমি ওনার গম্ভীর মুখটাই দেখেই ওনার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি, ওনার ভেতরের নরম মনের মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করিনি। আসলে আব্বার আমার প্রতি এমন নীরবতা আমাকে খুব উদাস করে দিত,একা করে দিত। মনে হতো, আমি হয়তো এই বাড়ির আগন্তুক,পরগাছা। আজ আপনি আমার মস্ত বড় একটা ভুল ভেঙে দিলেন,আম্মা। ঠিকই বললেন, মান-অভিমানের পাল্লা দীর্ঘ হয় তবে সেই অভিমান ভাঙানোর জন্য কাউকে এক কদম এগোতে হয়। এতদিন আমি ভয় পেয়ে পিছিয়ে ছিলাম, আজ থেকে আমি এক কদম এগিয়ে যাব। আব্বা যদি আমার সাথে কথা না বলেন,তাহলে আমি ওনাকে আমার কথাগুলো শোনাব। উনি যদি আমাকে দেখে মুখ কালো করেন, আমি হাসিমুখে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। দেখি কতক্ষণ উনি উনার বড় বউমাকে এড়িয়ে থাকতে পারেন।’
রহিমা বেগমের আঁচলের কোণ দিয়ে উনার চোখের কোণের জলটুকু মুছে হাসিমুখে আসমার দিকে তাকাল। আসমা আবারও একগাল হেঁসে বলল,
‘ আম্মা, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার এই ভরা সংসারটাকে আমি কোনোদিন আলগা হতে দেব না। আমি কথা দিচ্ছি আম্মা, এই ভিটেমাটির মান আমি প্রাণ দিয়ে হলেও রাখব।’
রান্নাঘরের থমথমে পরিবেশটা নিমেষেই হালকা হয়ে গেল। রহিমা বেগম আসমার পাকা কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
‘এতো পাকা পাকা কথা বলার ধরন আর গুণ গুলো কার কাছ থেকে পেলি শুনি?’
‘আগে থেকে ছিল যার জন্যই তো আপনার পোলা পটে গেছে আর তাছাড়া, আপনার কাছে থাকতে থাকতে একটু হলেও আপনার মিষ্টি-মিষ্টি গুণগুলো পেয়ে গেছি।’
রহিমা বেগমের মুখের হাসি এবার মলিন হয়ে গেলো। মলিন গলায় বলল,
‘ আমার গুণ পাওয়ার দরকার নেই,মা। আমার গুণ বলতে ওই একটু রান্নাবান্না পারা আর সব মুখ বুজে সহ্য করা। তুই তোর ভেতরকার তেজটা ধরে রাখিস। জব্বার শেখের সাথে পাল্লা দিতে গেলে কিন্তু এই তেজটুকু দরকার যে।’
আসমা চোখ তুলে রহিমা বেগমের মলিন হওয়া মুখটার দিকে তাকাল। রহিমা বেগম আসমাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বললে,
‘অনেক তো গল্প হলো। এবার একটু কাজের কাজ কর দেখি। রাতের রান্নায় ওনার জন্য ঝাল ঝাল করে চচ্চড়ি রাঁধবি বললি না? যা মা, পেছনের বাগান থেকে কয়টা তাজা কাঁচামরিচ তুলে নিয়ে আয়। গাছের মরিচের যে ঝাল৷ রান্না দিলো স্বাদ হবে। এক্ষুণি যা৷’
‘ আচ্ছা। ’
রহিমার কথা শুনে হাতে একটা ছোট্ট ঝুড়ি নিয়ে আসমা বাড়ির পেছনের বাগানে এল। বর্ষার শুরুর দিক এখন। মাঝেমাঝেই বৃষ্টি হয়। আসমা লেবু গাছ আর পেয়ারা গাছের ফাঁক গলে মরিচ গাছের সারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ঝোপের ভেতর থোকা থোকা হয়ে ঝুলে আছে গাঢ় সবুজ আর লাল টকটকে মরিচগুলো গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ছিঁড়তে লাগল। ঠিক সেই সময় মইনুল হাট থেকে বাসার পিছনের দরজা দিয়ে ফিরছিল। বাড়ির যাওয়ার সময় তার নজর গেল বাগানের দিকে। বাগানের সবুজ পাতার আড়ালে আসমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মইনুলও দাঁড়িয়ে গেল। শহরে থাকতে আসমাকে কখনও এভাবে প্রকৃতির মাঝে দেখা হয়নি। সেখানে সে ছিল চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থাকা এক প্রজাপতি, আর এখানে সে বুনো প্রজাপতি মতো প্রকৃতির সাথে মিশে বেড়াচ্ছে। মইনুল পা টিপে টিপে নিঃশব্দে আসমার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আসমা তখন নিজের মনে বড়সড় একটা মরিচ ছিঁড়তে ছিঁড়তে বিড়বিড় করছিল। সেই সময়ে মইনুলের ভরাট গলায় খড়খড়ানি শোনা গেল। মইনুল গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি লাফিয়ে উঠল। তার হাত থেকে প্রায় ঝুড়িটা পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু মইনুল ক্ষিপ্র হাতে সেটা ধরে ফেলল। আসমা বুক ধড়ফড়ানি থামিয়ে বড় বড় চোখে মইনুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তুমি? তুমি এভাবে চোরের মতো পেছনে এসে দাঁড়িয়েছ কেন? আর একটু হলে ভয়ে মরেই যেতাম।’
মইনুল মিটিমিটি করে হেঁসে বলল,‘এতো সহজে নাকি? তা এখানে কী করেছ?’
আসমা মইনুলের কথা শুনে লোকটার দিকে ফিরে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
‘বলব না?’
মইনুল হাসল। সে জানে একটু পরে আসমা নিজেই বলে দিবে সে এখানে কী করছে, তাই হলো। আসমা দিব্যি পরিস্কার গলায় বলল,
‘আপনি এখানে আসার পরে সারাদিনই তো বাইরে বাইরে থাকেন। এদিকে আপনার বাবার ওই গম্ভীর মুখ দেখে আমার যে কী অবস্থা হয়, তা তো আর আপনি বোঝেন না। তাই ভাবলাম, ঝাল দিয়ে এমন রান্না করব যে ঝালের চোটে হলেও ওনার মুখ থেকে দু-একটা কথা বেরোবে।’
মইনুল হাসল বউয়ের মেকি রাগ দেখে। সে আসমার আরও কাছে সরে এল। পিছন থেকে আসমার কোমড়ে হাত রেখে একটু দুষ্টুমির স্বরে বলল,
‘ বাবার চিন্তা তো অনেক করছ, তা এই যে, তোমার স্বামীর চিন্তাও একটু করো।রোদ-গরম মাথায় করে হাট থেকে ফিরলাম, আমার জন্য একটু ঠান্ডা ঠান্ডা শরবতের ব্যবস্থাও করলেও তো পারতে। ’
আসমা মইনুলের কথা কানে নিলো না। সে মরিচ গাছটার দিকে নজর ফেরাল। ঝুড়ি থেকে একটা কাঁচা মরিচ তুলে নিয়ে মইনুলের নাকের ডগায় ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
‘খুব তো সোহাগ দেখাচ্ছেন দেখি। হাত সরান। মুরুব্বি মানুষরা বাড়িতে, লজ্জার মাথা খেয়েছেন নাকি? ’
‘ হয়তো।’
‘ আরে আল্লাহ। হাত না সরালে খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু, হাতের মরিচটা আপনার মুখে ডলে দিব।’
‘দেও সমস্যা নেই।’
‘ সমস্যা নেই! একবার যদি মরিচটা ডলে দিই না, তখন বুঝবেন কত ধানে কত চাল। তখন আর সোহাগি কথা বেরোবে না,ঝালের চটে সারাদিন শুধু উঁ উঁ করবেন।’
মইনুল তার হাতটা না ছেড়ে আসমাকে আরও একটু টেনে কাছে এনে জিজ্ঞাসা করে,
‘কেউ দেখবে না, সকলে কাজে ব্যস্থ। বলছিলাম কি, এখানে এসে তোমার কী খুব কষ্ট হচ্ছে? আমি ভাবছিলাম তোমাকে আবার শহরে পাঠিয়ে দেব কি না।’
মইনুলের কথায় আসমার চেহারার দুষ্টুমিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গিল। সে মইনুলের চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
‘শহরে ফিরে যাওয়ার কথা আর বলবেন না। আমি আপনার, আব্বা-আম্মা,ভাই-বোন, এই গ্রাম, এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।’
মইনুল আসমার এই পরিবর্তন দেখে মনে মনে ভীষণ তৃপ্ত হলো। সে আলতো করে আসমার কপালে হাত রেখে বলল, ‘তোমার কাছে আমি সারাজীবনের জন্য ঋণী হয় গেলাম ।’
আসমা মুচকি হাসল বলল,
‘হয়েছে, হয়েছে! আর কিছু বলিয়েন না, এখন ঝুড়িটা দিন, মরিচগুলো নিয়ে যাই। দেরি হলে আম্মা আবার আপনাকে বকবেন।’
মইনুল ঝুড়িটা ফেরত না দিয়ে বলল, ‘একটা শর্ত আছে। ’
আসমা ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,‘ কেমন শর্ত।’
মইনুল চোখ বন্ধ করে আসমার দিকে ঠোঁট গোল করে দাঁড়াল। আসমা সেটা দেখল৷ সে লোকটার কাজে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল। আশেপাশে তাকাল। আসমা বুঝলো লোকটার মতলব। আসমা কিছু একটা ভেবে শয়তানি হাসি হাসল। সে একটা কাঁচা মরিচ তুলে নিয়ে মইনুলের মুখের কাছে আনল, তারপর সেটা মইনুলের মুখে গুঁজে দিয়ে মরিচের ঝুড়ি নিয়ে দৌড় দিল।
আসমার অভাবনীয় কান্ডে মইনুল অবাক হলো। তখনো তার ঘোর কাটেনি। সে পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে আসমার অধরের ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু তার বদলে মুখে যা অনুভব করল, তাতে তার চোখ বড় হয়ে গেলো।
আসমা যখন মইনুলের মুখে বোম্বাই মরিচের সদৃশ তীব্র ঝালের মরিচটা ডলে দৌড় দিল, মইনুলের প্রথমে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু তার ঠিক কয়েক মূহুর্ত পরেই আগুনের লেলিহান শিখা গায়ে লাগলে যেমন জ্বালা করে ঠিক তেমন তার ঠোঁট আর জিভ জ্বালা করল। সে যতক্ষণে চোখ খুললো ততক্ষণে আসমা চলে গেছে অবশ্য তখনও আসমার হাসির খিলখিল শব্দটা তার কানে আসছিল।
মইনুল ঝালে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বেরোলো না, পরিবর্তে বেরোলো তীব্র গোঙানির উঁ উঁ উঁ শব্দ। মরিচের কালান্তক ঝালে তার চোখের মণি উল্টে যাওয়ার উপক্রম। মনে হচ্ছে কেউ তার মুখে ফুটন্ত কয়লা ঢুকিয়ে দিয়েছে। মইনুলের দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। মইনুল মোটেও ঝাল খেতে পারেন না যার দরুন তার অবস্থা আরো খারাপ হলো। সে হাত-পা ছুঁড়ে পানির দিকে দৌড় দিল। কিন্তু এখানেও একটা সমস্যা হয়ে গেলো, তার হাতে লেগে থাকা মরিচের অবশিষ্টাংশ অজান্তেই চোখ মুছতে গিয়ে যখন চোখে হাত দিল, তখন চোখেও লাগল। চোখেও জ্বালা করলো তার। সে তাড়াতাড়ি নিচে থেকে পানি খুঁজে ভালো করে হাত ধুয়ে চোখে মুখে পানি দিল।
এদিকে আসমা রান্নাঘরে আসায় রহিমা বেগম একটু বাহিরে এসেছিলেন। বাহিরে আসতেই তিনি দেখলেন তার গুণধর ছেলে উঠোনের টিউবওয়েলের সামনে মাথা নিচু করে অনবরত পানি ঢালছে আর পাগলের মতো চোখে ফুঁ দেওয়া চেষ্টা করছে। মইনুলের অবস্থা করুণ। তার ঠোঁট দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে, জিভটা বাইরে বের করে সে বাতাস টানছে।
মইনুলের অবস্থা দেখে রহিমা বেগম ছেলের দিকে ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ কী হয়েছে বাপ? তোর একি দশা? ’
‘ ঝাল লেগেছে?’
‘ ঝাল লাগলো কী করে? দেখে মনে হচ্ছে আস্ত মরিচ চিবিয়ে খেয়েছিস। ’
মইনুল চোখেমুখে পানি ঢালতে ঢালতে আধো আধো স্বরে বলল, ‘খাইনি, খাওয়ানো হয়েছে।তোমার বউ মা এই হাল করেছে,আল্লাহ মরে গেলাম ঝালে।’
মইনুল আস্তে কথাগুলো বলায় রহিমা বেগম সেগুলো শুনতে পেলো না। রহিমা বেগম দৌড়ে রান্না ঘরে আসল। তাড়াতাড়ি কাঁচা দুধ আর চিনি নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। আসমা রহিমা বেগমের অবস্থা দেখে তার পিছনে বাহিরে আসল আর বাহিরে এসে মইনুলের অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে লোকটাকে সায়েস্তা করতে চাইছিল কিন্তু লোকটার যে এমন অবস্থা হবে সে কল্পনাও করে নি। লোকটার জন্য তার খুব মায়া লাগল। রহিমা বেগম মইনুলের সামনে চিনির বাটিটা ধরল। সে বাধ্য ছেলের মতো এক চামচ চিনি মুখে দিল। কাঁচা দুধও ঠোঁটে, চোখে লাগিয়ে দিল। চিনির মিষ্টতায় আর ঠান্ডা দুধের প্রলেপে ঝালটা হলকাটা একটু স্তিমিত হলো ঠিকই, কিন্তু চোখের জ্বালাপোড়া তখনো কমলো না। আসমা সেটা দেখে একটা নরম কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে সেটা রহিমা বেগমের হাতে দিল। তিনি সেটা মইনুলের ঠোঁটে আলতো করে চেপে ধরল।
....
‘তোমাকে ছাড়া পথ চলাটা অসম্ভব মনে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আজ আমি একাই সেই পথে চলতে শিখে গিয়েছি।ভেবেছিলাম তুমিহীন জীবন মানেই মৃত্যু, কিন্তু আজ বুঝেছি বেঁচে থাকা মানে কেবল শ্বাস নেওয়া ছাড়া আর কিছুই না। আমি বদলে গেছি মইনুল ভাই কারণ আমাকে বদলে যেতে তুমিই বাধ্য করেছ। এখন আর আগের মতো তোমার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকি না, কারণ জেনে গেছি সব অপেক্ষার শেষটা সুন্দর হয় না। ’
নিচে মইনুল আর আসমাকে একসাথে দেখে নিজেকে নিজেই বিড়বিড় করে কথাগুলো বলল মল্লিকা। সে ছাদে বসে পায়ের গোড়ালিতে মলম মাখচ্ছে। কাল রাতে কলপাড়ে পড়ে গিয়েছিলো যার জন্য মায়ে ব্যথা পেয়েছে। জায়গাটা ফুলে ওঠেছে। তখনই নিচে কলের কাছে দুজন মানব-মানবীকে দেখে ঠোঁটের কোণে বিষাদের হাসি দেখা দিল।এই বাড়িতে থেকে পছন্দের মানুষের সাথে অন্য একজনকে দেখতে মল্লিকার মোটেও ভালো লাগে না কিন্তু তার কিছুই করার নেই। পৃথিবীতে সবকিছু সবার হয় না যে! মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন সে প্রিয় মানুষটিকে ঘিরেই নিজের সবটা রচনা করে। মল্লিকাও মইনুলকে নিয়ে সেটাই করেছিল।
মানুষ প্রায়ই মনে করে, নির্দিষ্ট কাউকে ছাড়া তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে কিন্তু সত্য হলো প্রকৃতি কখনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যখনই আমাদের জীবন থেকে কেউ সরে যায়, তখন অন্য কোনো শক্তি সেই জায়গা দখল করে নেয়। মল্লিকার জীবনেও তাই হয়েছে। মইনুলের জায়গায় এখন তার দুঃখরা দখল করে নিয়েছে। সে মইনুলের সাথে সহজ-সরল একটা জীবন চেয়েছিল, যেখানে মইনুল সবসময় তার পাশে থাকবে কিন্তু তা হয়নি উল্টো মইনুল তাকে বদলে যেতে বাধ্য করেছে। অবশ্য এই বদলে যাওয়াটা কষ্টের হলেও খুব জরুরি ছিল তারজন্য কারণ, যে মানুষটি অন্যের অপেক্ষায় নিজের জীবনকে স্থবির করে রাখে, সে আসলে নিজেকেই তিলে তিলে শেষ করে দেয়।
মল্লিকা কখনোই মইনুলকে ভালোবাসতে চাইনি, তাকে মইনুলকে ভালোবাসতে শেখানো হয়েছিল। যখন তার শৈশব শেষ হয়ে কেবল বয়ঃসন্ধি চলছিল ঠিক তখন তার মনে মইনুল নামক বীজের বপন করা হয়েছিল। যেটা হয়েছিলো তার নিজের ঘরেই, অতি আপনজনদের প্রশ্রয়ে। মল্লিকা তখন পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তখন তার শরীর ও মনে প্রাকৃতিক নিয়মে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময় থেকেই তার দাদি, চাচি আর মা মিলে তার সর্বনাশটা করে দিল। মইনুল ছিল মেধাবী, ডানপিটে আর বাড়িসহপাড়ার সবার প্রিয় একজন ছেলে। দাদির খুবই ইচ্ছে ছিলো মইনুলের সাথে তার বিয়ে দেওয়ার। দাদি, চাচি উঠতে বসতে বাড়ির গিন্নি বা বড় বউ বলে ডাকত। আরো কতশত আলোচনা মল্লিকা মইনুলকে নিয়ে। মল্লিকা তখন কিছু বুঝত না, কিন্তু বড়দের এই অবিরাম আলোচনা তার অবচেতন মন দাগ কাটতে শুরু করল। বয়ঃসন্ধিকাল হলো এমন একটা সময়, যখন একটি মেয়ের মন কাদামাটির মতো নরম থাকে। সেই সময়ের যেকোনো দাগ মনে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। মল্লিকার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। বড়দের সেই তথাকথিত মইনুল আর তাকে নিয়ে করা মজা বা রসিকতা তার মনে কল্পরাজ্য তৈরি করেছিল। মইনুলের প্রতিটি কাজ, তার ডানপিটে স্বভাব,সবকিছুর মাঝেই মল্লিকা নিজেকে হারিয়ে ফেলতো। লোকটাকে অকারণেই তার ভালো লাগত। অবশ্য মইনুল তাকে ছোট বোন হিসেবেই দেখত, কিন্তু মল্লিকা! সে তার পড়ালেখা, তার নিজের ভালো লাগা সবকিছু বিসর্জন দিয়ে মইনুলের পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা শুরু করল। সে বিলীন হয়ে গেল মইনুলের ব্যক্তিত্বের কাছে। তার নিজস্ব কোনো সত্তা আর অবশিষ্ট রইল না। মইনুল যখন উচ্চশিক্ষার জন্য শহর যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল,তখনও মল্লিকা লোকটাকে পাওয়ার স্বপ্ন বুনছিল। মইনুলের সাথে সংসার বাঁধার লোভে তার মেধা চাপা পড়ে গেল রান্নাবান্না আর ঘরকুনো স্বভাবের নিচে, কারণ দাদি আর চাচিরা তাকে বুঝিয়েছিল যে, মেয়েদের পড়াশোনা শেখার থেকে রান্না শেখা হাজার ভালো৷ ভালো রান্না পাড়লে স্বামী খুশি হয়৷ বউকে বেশি ভালোবাসে।
দাদির বলা কথাগুলো সব মিথ্যা ছিল। মইনুল তার মতো ঘরকন্যা মেয়েকে না লেখাপড়া জানা আসমাকে পছন্দ করল। বয়ঃসন্ধিকালে একটা মেয়ের সামনে তার বিয়ে বা নির্দিষ্ট কোনো ছেলেকে নিয়ে রসিকতা করা কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা মল্লিকা সেদিন বুঝেছিল যেদিন মইনুল তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছিল। এমন ভয়ঙ্কর রকমের রসিকতাগুলো একটা মেয়ের ভবিষ্যতের টুটি চেপে ধরে। মল্লিকার মতো অনেক মেয়েই এভাবে বয়ঃসন্ধিতে ভুল মানুষের প্রেমে পড়ে বা বড়দের কথায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করে ফেলে।পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা বুঝতেও পারেন না যে, তাদের ছোট ছোট কথা একটা মেয়ের মনে কতটা প্রভাব ফেলে। মইনুল যখন আজ আসমাকে নিয়ে ঘরে এসেছে, তখন বড়রা সকলেই সেই পুরনো কথাগুলো বেমালুম ভুলে গেল। তারা এখন আসমাকেই বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে কিন্তু তাদের জন্য যে মল্লিকার মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে সেটা কারোর চোখেই পড়লো না।
মল্লিকা নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে, ফোলা পায়ে হাত বুলিয়ে নিজেকেই বলল,
‘ জানো মইনুল ভাই, আসমাকে ভাবিকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে না বরং আমার নিজের জন্য কষ্ট হচ্ছে। কেন আমি সেদিন দাদি আর মায়ের কথায় নিজেকে তোমার মাঝে বিলীন করে দিয়েছিলাম? কেন আমি নিজের একটা জগত তোমাকে নিয়েই তৈরি করে এতো বড় ভুলটা করলাম যার থেকে বের হতে কষ্ট হচ্ছে। ’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে আসল। মইনুলের প্রতি তার আর কোনো অভিযোগ নেই। তার সব অভিযোগ নিজের ভাগ্যের প্রতি। মল্লিকা নিজেও মেনে নিয়েছে সব অপেক্ষার শেষটা সুন্দর হয় না, আর সবার গল্পে রাজকুমার আসে না, কিছু গল্প অসমাপ্ত রেখেই শেষ করতে হয়, কারণ জোড়াতালি দিয়ে মেলাতে গেলে গল্পের সৌন্দর্যটাই নষ্ট হয়ে যায় যে! মানুষ আসলে একা। জন্ম নেয় একা, মরেও একা। মাঝখানের এই সময়টুকুতে আমরা অন্যের মায়ার জালে জড়িয়ে নিজের জীবনের সুন্দর সময়কে নষ্ট করে দি। জীবন এক বহমান নদী। এর বাঁকে বাঁকে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, আবার অনেক নতুন চরের সৃষ্টি হয়। মল্লিকা আজ সেই নতুন চরে দাঁড়িয়ে নিজেকে অতীতের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
....
অনেক আগে সন্ধ্যা হয়েছে। শেখ বাড়ির পাশে থাকা বাঁশঝাড়ের মাথার উপর একফালি চাঁদ উঠেছে, আর উঠোনে থাকা ডালিম গাছের ছায়াটা চাঁদের আলোই দীর্ঘ হতে-হতে দাওয়ায় এসে ঠেকেছে। রান্নাঘরে কুপিবাতির মৃদু আলোয় আসমা যখন চচ্চড়িটা নামাল, তখন তার ঘ্রাণে সারা বাড়ি মোঁ মোঁ করছে, কারেন্ট চলে গেছে তাই তাই কুপিবাতির আলোই রান্না সারছে আসমা। পুঁটি, খলসে আর টাকি মাছের সেই চচ্চড়িতে আসমা বাগান থেকে তুলে আনা কুচকুচে সবুজ কাঁচামরিচগুলো ফালি করে দিয়েছে। সরিষার তেলের কড়া ঝাঁঝ আর কাঁচামরিচের ফলে চচ্চড়ির সুন্দর একটা রুপ এসেছে। মাটির চুলার ধোঁয়ায় আসমার চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো রান্নাটা সুন্দর করে শেষ করতে পারার কারণে তার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা যাচ্ছে। রহিমা বেগম একপাশে বসে সালাদ কাটছে।
বসার ঘরে একে একে সকলে খেতে এসেছে। হ্যারিকেনের আলোই বাড়ির মেঝেতে একটা বড় পাটি বিছানো হয়েছে। তার ওপর সবাই বসবে। জব্বার শেখ এসে একপাশে বসলেন। তার পাশে মল্লিকার বাবা জহির শেখ বসলেন। তারপর মইনুল, রফিকুল। মেয়েদের দিকে বসল মল্লিকার মা সালেহা বেগম, ববিতা, নয়নিকা। ছোট্ট ময়নাকে নয়নিকা কোলে নিয়ে বসেছে, মইনুলের দাদি এসে পাটির বাহিরে একটা উঁচু পিঁড়িতে বসল। এখন তার বয়স হয়েছে, মেঝেতে বসতে কষ্ট হয় তাই পিঁড়িতে বসে।
আসমা আর রহিমা বেগম বড় একটা কাঁসার হাড়িতে গরম গরম আতপ চালের ভাত আর বড় বাটিতে করে ঝাল ঝাল চচ্চড়ি নিয়ে বসার ঘরে হাজির হলো। অন্য তরকারি ববিতা আর নয়নিকা আগে থেকে এনে রেখেছে। বসার ঘরে আসতেই আসমার চোখ গিয়ে পড়ল মইনুলের ওপর। মইনুল তখন জব্বার শেখের পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে। আসমা ভাত বেড়ে দিতে মইনুলের কাছে আসতেই, মইনুল চোখ তুলে একবার তার দিকে তাকাল। তারপরই মুখ ফিরিয়ে নিল। সে এগিয়ে এসে সবার সামনে থালা রাখল।
‘ আজ কী রান্না হয়েছে, বড়বউ?’ মইনুলের দাদি রহিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘পুরনো সাদা রাজা হাঁস ছিলো না ওটা তেলমশলা বেশি দিয়ে কষিয়েছি,সাথে পাতলা ডাল আর পুঁটি মাছের চচ্চড়ি। এই চচ্চড়িটা আবার আপনার নাতবউ রান্না করেছে।’
মইনুলের দাদি আসমাকে পছন্দ করে নিজের নয়নিকা, ময়না,মল্লিকার মতো। তিনি একগাল হেঁসে আসমাকে বললেন, ‘ চচ্চড়ি আমাকে আগে দেও নাতবউ। ’
আসমা ধীর পায়ে তার কাছে এসে তাকে চচ্চড়ি দিল। একে একে সবাইকে চচ্চড়ি দিয়ে দিল। সবাই যখন খাওয়া শুরু করল, তখন আসমা আড়চোখে জব্বার শেখের দিকে তাকিয়ে রইল। জব্বার শেখ চচ্চড়ি দিয়ে চুপচাপ ভাত মাখছেন। প্রথম লোকমাটা মুখে তুলতেই জহির শেখ রহিমাকে পানি দিতে বলল । বাড়ির সবাই খাওয়া থামিয়ে জহিরের মুখের দিকে তাকাল। রহিমা বেগম বুঝতে পারলেন তরকারিতে ঝাল বেশি হয়ে গেছে। জব্বার শেখেরও একই অবস্থা প্রথম গ্রাস মুখে দিতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। তড়িৎগতিতে তিনি লোকমাটা চিবিয়ে গিলে ফেললেন। তার চোখ দুটো ছোট্ট ছোট্ট হয়ে আসল, কপালে হালকা ঘাম জমতে শুরু করেছে।
জহির শেখ পানির গ্লাস মুখ থেকে নামিয়ে রাখল। তার মুখটা লাল হয়ে গেছে। রহিমা বেগম ব্যস্ত হয়ে আরও একগ্লাস পানি ঢেলে দিলেন। জহির শেখ সেই পানিও একনিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললেন। তিনি ঝট করে গ্লাসের পুরো পানিটা খেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
‘ এ কেমন ধারার রান্না বউ মা? রান্নায় কেউ এতো ঝাল দেয় নাকি?এত ঝাল কেন দিলে? মানুষ খাবে কী করে? এই চচ্চড়ি তো খাওয়াই যাচ্ছে না।’ জহির শেখ বিরক্তির গলায় বলল।
বসার ঘরে সকলে চুপ হয়ে গেলো। রফিকুল বিরক্তিকর মুখ করে তার চাচার দিকে চাইল। ববিতা আর নয়নিকা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল। রহিমা বেগম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন, কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। মইনুলের দাদি চুপচাপ খাচ্ছিলেন, কানে কম শোনে বলে জহিরে কথাগুলো তার কানে গেলো না। আসমাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জহির যেনও পেয়ে বসল কঠোরভাবে বলল,
‘এত বড় হয়েছ, এখনো রান্নাটা শিখতে পারলে না? রান্না করতে হলে ঠিকমতো করতে হবে না হলে করার দরকার নেই। বাড়িতে রান্নার এতো মানুষ থাকতে তোকে কে জোর করে রান্নার জন্য? ’
মইনুল তখন তার বাবার পাশে বসে চুপচাপ খাচ্ছিল। চাচার কথা শুনে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে চোখ তুলে আসমার দিকে তাকাল। মইনুল ভেবেছিল জহির চাচার কথায় আসমা কিছু একটা বলবে, কিন্তু সে চুপ করে রইল। জহিরের এমন রুক্ষ কথায় আসমা জড়সড় হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো মাটি ফাঁকা করে তার মধ্যে ঢুকে যেত। মইনুল তার চাচার এই বাড়াবাড়ি দেখে ভীষণ বিরক্ত হলো। রান্নায় ঝাল একটু বেশি হতেই পারে, তাই বলে ঘর ভর্তি লোকের সামনে এভাবে বাড়ির বউকে অপমান করতে হবে? মইনুল তার চাচার এই নিচু মানসিকতায় হতাশ হল। জব্বার শেখের দিকে একবার আঁড়চোখে তাকাল। তিনি নির্লিপ্ত ভাবে বসে আছে। মইনুল কিছু বলতে যাবে সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুখ খুলল জব্বার শেখ। তিনি এতক্ষণ শান্তভাবে খাচ্ছিলেন। তিনি লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো, জহির শেখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘ জহির।’
জহির শেখ ভাইয়ের দিকে তাকাল। জব্বার শেখ আস্তে আস্তে বললেন, ‘ চুপ থাকো।’
জহির শেখ জব্বারের কথা শুনলো না। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ চুপ করবো কেন? এ খাওয়া যাচ্ছে? তুমি নিজেও তো খেতে পারছ না, দেখ কেমন...’
জব্বার শেখ জহিরকে ওর কথা শেষ করতে না দিয়ে ধমক দিয়ে থামিয়ে বললেন,
‘মুখটাকে একটু সামলাও। মাছের চচ্চড়িতে একটু ঝাল না হলে মুখে রোচে?’
মইনুলের দাদি এবার এসবটা শুনতে পেলেন তিনি চড়া গলায় বললেন,
‘জহির বাহিরের লোকের মতো বাড়ির বউয়ের খুঁত ধরিস না। বউমা নিজের হাত পুড়িয়ে যত্ন করে রেঁধেছে, আর তুই তাকে অপমান করছিস?’
এরপর তিনি আসমার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
‘ নাতবউ,তুই কিছু মনে করিস না। তরকারিতে ঝালটা ঠিক আছে, চচ্চড়ি মজাও হয়েছে।এটা দিয়ে এক থালা ভাত অনায়াসেই খাওয়া যায়। জহিরটা একটু বেশি বলে, ওরে আর দিও না, সবটুকু আমার পাতে দাও তো।’
জহির শেখ মুখ বন্ধ করলেন। তিনি মুখ বন্ধ করে অন্য তরকারি দিয়ে খাওয়া শুরু করল। রফিকুল একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আসমাকে বলল,
‘ ভাবি,চচ্চড়ি খুব ভালো হয়েছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।আমাকে আর অল্প একটু দেও, পেটে যায়গা রাখতে হবে পরে আবার মাংস দিয়ে খেতে হবে না। ’
রফিকুলের কথায় সকলে হাসল। জব্বার শেখ নিজের মতো করে খাচ্ছে। মইনুল আঁড়চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। জব্বার শেখ যে মিথ্যা বলেছে সেটা মইনুলসহ বাড়ির সকলেই জানে। জব্বার শেখ ঝাল পছন্দ করে কিন্তু নর্মাল ঝাল,এতো বেশি ঝাল না। আসমা তরকারিতে একটু বেশিই ঝাল দিয়ে ফেলেছে তবু তিনি সে আসমার পক্ষে কথা বলেছে এর জন্য মইনুল কৃতজ্ঞ তার প্রতি। জাহির চাচাকে থামিয়ে, আসমাকে তার কথার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। সে চুপচাপ তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটার ঝাল লেগেছে তা বোঝা যাচ্ছে কিন্তু তবুও সে নিরবে খেয়ে যাচ্ছে। সবাই যখন নিজেদের মতো খাচ্ছিল তখন জব্বার শেখ জহিরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় নিচু স্বরে বললেন,
‘এই বাড়িতে যারা থাকে তারা সবাই আমাদের পরিবার। ভুল হতেই পারে কিন্তু সেই ভুলের জন্য তাদের অপমান করা উচিত না মনে রেখো।’
রহিমা বেগম জব্বার শেখের কাজে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি মুচকি হেসে আসমার দিকে তাকাল, যে দৃষ্টিতে ছিল একরাশ ভালোবাসা। রফিকুল ততক্ষণে দ্বিতীয়বার চচ্চড়ি চেয়ে খাচ্ছে। নয়নিকা চুপিচুপি আসমার কানে কানে বলল,
‘ভাবি, তুমি তো আব্বাকে পটিয়ে ফেললে। এবার আমাদের সব আবদার তোমার মাধ্যমে পূরণ করতে হবে দেখি।’
নয়নিকা ফাজলামো করে কথাটা বলল। আসমা নয়নিকার হাতে চাপড় মারল। এই চার মাসে নয়নিকার সাথে তার ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তারা বন্ধুর মতো হয়ে উঠেছে।
নয়নিকা নিজে খাওয়ার মাঝে মাঝে ছোট্ট ময়নাকে খাওয়াচ্ছে। রহিমা বেগমের থেকে ময়নার উপরে নয়নিকার দায়িত্ব বেশি। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে শুতে যাওয়ার আগপর্যন্ত ময়না নয়নিকার কাছেই থাকে। নয়নিকা ভাত মেখে ময়নার গালে দিল। ময়না ছোট্ট ছোট্ট করে ভাঙা গলায় বলল,
‘ আর খাব না, ঝাল লাগছে।’
‘ আর অল্প একটু খাও ঝাল নেই। দেখ, আমি তোকে শুধু ভাত আর মাছ দিচ্ছি। ঝাল দিচ্ছি না।’
নয়নিকা ধৈর্য্য ধরে ময়নাকে খাওয়াতে চেষ্টা করল কিন্তু ময়না খেলো না যার ফলে সে মাংস দিয়ে ভাত মাখল।ময়না অবশেষে মুখ খুলল। নয়নিকা তাকে খাওয়াতে লাগল। ছোট্ট মেয়েটা ভাত চিবোতে চিবোতে আসমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে আপন মনে হাসতে লাগল। খাওয়ার মাঝখানে মল্লিকা হঠাৎ হেঁসে বলে উঠল,
‘আসমা ভাবি, আপনার হাতের রান্না কিন্তু ভালো তা কোথা থেকে শিখলেন সুন্দর রান্না করার গুণ?’
আসমা মাথা তুলে মল্লিকার দিকে তাকাল। মল্লিকা হাসছে, কিন্তু তার হাসিতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কেমন যেন একটা তিক্ততা মিশে আছে। সে বলল,
‘ অল্প সল্প রান্না মায়ের কাছ থেকে শিখেছি।’
‘ভালো, ভালো। ’
মল্লিকা কথাটা বলে আবারও খেতে মনোযোগ দিল। আসমা লক্ষ্য করল মল্লিকা খুব কম খাচ্ছে আর যতটুকু ভাত নিয়েছে ততটুকু ভাতই তার থালায় আছে। মল্লিকা সশরীরে এখানে থাকলেও মনে মনে অন্য কোথাও চলে গেছে। আসমা তার দিকে তাকিয়ে থাকতেই মল্লিকা চোখ তুলল। দুজনের চোখাচোখি হলো। মল্লিকা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেলো।
......
রাত গভীর হতে শুরু করেছে। বাঁশঝাড় থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।আসমা খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। মইনুল জানালার কাছে থাকা চেয়ারে বসে বই পড়ছে। বিকালের পর থেকে মইনুল আসমার সাথে কথা বলছে না। আসমা ভেবেছিল রুমে আসলে অতন্ত্য কথা বলবে কিন্তু লোকটা তার সাথে কোনো কথা না বলে গম্ভীর মুখে বই পড়ছে এটা আসমার সহ্য হচ্ছে না। আসমা ধীর পায়ে খাট থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে গেল। আসমা পা টিপে টিপে মইনুলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল, খুব নিচু স্বরে ডাকল,
‘ শুনছো?’
আসমার ডাক শুনেও লোকটা একবারও তার দিকে তাকালো না। আসমা আবার বলল,
‘ তখন কী খুব বেশি জ্বালা করছিল? ইয়ে মানে,আমি নাবুঝতে পারিনি তোমার এমন অবস্থা হবে তা।’
মইনুল নিরুত্তর রইল। সে খুব আয়েশ করে বইয়ের পাতা উল্টালো,আসমাকে উপেক্ষা করে।
আসমা এবার তার সামনে এসে দাঁড়াল। মইনুলের দিকে ঝুঁকে তার গালে হাত চালিয়ে বলল,
‘আহা,রাগ করেছ ভালো কথা কিন্তু তাই বলে কথা বলছ না কেন? যায়হোক তখন কিন্তু তোমার মুখটা একদম টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল। পাকা টমেটো দেখেছ? ওর মতো। ’
মইনুলকে নিজের কথার কোনো উত্তর দিতে না দেখে আসমা রসিকতা করে কথাগুলো বলে নিজেই একটু খিলখিল করে হেসে উঠল, কিন্তু তখনও মইনুলের পাথুরে মুখটা দেখে তার হাসি তক্ষুনি থামিয়ে দিল।
মইনুল বইয়ের ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,
‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, গিয়ে ঘুমাও। আমার পড়ার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছ। আর হ্যাঁ, কাল সকালে তোমার বাবাকে খবর পাঠিয়ে দেব। এমন দজ্জাল মেয়ের সাথে সংসার করা আর আমার পক্ষে সম্ভব না। আবার কখন যে কী খাইয়ে দেবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
আসমা আঁড়চোখে মইনুল দিলে তাকাল। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো, যদিও সে জানে মইনুল তাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না, তবু দজ্জাল শব্দটা তার গায়ে লাগল। সে গাল ফুলিয়ে মইনুলের পায়ের কাছে মেঝেতে বসল।
‘ওমা! সামান্য একটা মরিচের জন্য তুমি এত বড় কথা বললে? বাপের বাড়ি পাঠানোর কথা বলছ তা থাকতে পারবে আমাকে ছাড়া? ’
মইনুল আসমার দিকে তাকাল,কোনো উত্তর দিল না। আসমা এদিকে মইনুলের হাঁটুর ওপর হাত রেখে আদুরে গলায় বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি কান ধরে উঠবস করছি। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও,এমন ভুল জীবনে হবে না। নিজের শাস্তি হিসেবে তোমাকে একটা সুন্দর প্রস্তাব দিচ্ছি শোন, কাল তো ছুটির দিন,শুক্রবার। চলো না আমাদের ওই পদ্ম বিলটায় যাই? শুনেছি এখন নাকি সেখানে থৈ থৈ করা পানি আর হাজার হাজার লাল পদ্ম হয়েছে। ’
‘ এটাকে শাস্তি বলে?’ মইনুল অবাক হয়ে বলল। আসমা ঠোঁট চাওয়া করে হেঁসে বলল,
‘ হুম। চলো না।’
মইনুল আবার বইয়ে মন দিল।
‘ আমার কাজ আছে, বিল দেখার সময় নেই।তুমি নয়নিকাদের নিয়ে যাও,ঘুরে এসো।’
‘ তাহলে মেলায় নিয়ে চলো।’
‘ বললাম না কাজ আছে।’
‘কাজ কাজ আর কাজ! বিয়ের আগে তো কত বড় বড় কথা বলতে।তখন বলতে আসমা, বিয়ের পরে তোমাকে আমি আমাদের গ্রামের বড় রথের মেলায় নিয়ে যাব, নাগরদোলা ওঠাব। এখন মেলা শুরু হয়েছে আর তুমি কাজ কাজ করছো? জানো, মেলায় কত সুন্দর-সুন্দর মাটির পুতুল এসেছে? খাজা আর বাতাসা পাওয়া যাচ্ছে। চলো না কাল বিকেলে? মেলা ঘুরে ফেরার পথে আমরা নদীর ঘাটে বসব।’
মইনুল কোনো উত্তর দিল না, আঁড়চোখে আসমার দিকে তাকালো। আসমার চোখের মণি দুটো হ্যারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে। তার নিষ্পাপ মুখটা দেখে মইনুলের মেকি রাগ দূর হলো কিন্তু তবুও সে মুখে গম্ভীর ভাব ধরে রেখে বলল,
‘মশার কামড় খাওয়ার জন্য নদীর ঘাটে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আর তুমি যে মেয়ে, মেলায় গেলে নিশ্চিত আবার কোনো কাণ্ড ঘটাবে। আমার দরকার নেই ওসবের,বাবা।’
আসমার এবার অভিমান হলো। সে এতক্ষণ ধরে লোকটাকে সাধাসাধি করছে, আর লোকটা কিনা একটার পর একটা অজুহাত দিয়ে যাচ্ছে, তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না! সে ঝট করে মইনুলের হাত ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চোখের কোণে জল জমল কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু মেয়েটার গলাটা ভারী হয়ে এলো। আসমার এবার অভিমান হলো। সে এতক্ষণ ধরে সাধাসাধি করছে, অথচ মইনুল !
‘ঠিক আছে, কোথাও যেতে হবে না তোমাকে। তুমি এই কাজ আর বই নিয়ে পড়ে থাক। আমিই আসলে ভুল করেছে তোমার কাছে আবদার করে ফেলেছি, আমি তো তোমার কেউ না। আমি কালই বাপের বাড়ি চলে যাব। সেখানেই ভালো ছিলাম আমি।আমার শখ-আহ্লাদের কোনো দাম নেই আপনার কাছে।’
আসমা কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। গটগট করে চলে আসল। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। মইনুল এই দৃশ্য দেখে বিপাকে পড়ল। সে আসমার উপর মেকি রাগ দেখাতে গিয়ে আসমাকে আসলেই রাগিয়ে ফেলেছে। সে চেয়েছিল আসমা আরো একটু তাকে জোরাজোরি করুক, তাহলে সে রাজি হবে কিন্তু কিভাবে যে পাশা উল্টে গেল সে বুঝলো না। সে চেয়ার ছেড়ে বিছানার কাছে আসল।মইনুল বিছানার পাশে বসে আসমার কাঁধে হাত রাখল।
‘এই আসমা, শোনো না। আমি তো এমনি বলছিলাম। রাগ করলে নাকি?’
আসমা কাঁধ ঝাঁকিয়ে মইনুলের হাত সরিয়ে দিল।
‘ছুঁবে না আমাকে! যাও গিয়ে বই পড় গে। আমি কালই চলে যাচ্ছি।’
মইনুল হেসে ফেলল আসমার রাগ দেখে।
‘আরে বাবা, মেলায় যাব তো আর সেখানে গিয়ে তোমার জন্য নতুন চুড়িও কিনে দেব।। শুধু মেলা না, নৌকায় চড়ে বিলের ওপারেও যাব। এবার রাগটা ছাড়ো তো?’
আসমা মুখ তুলে তাকালো। চোখ দুটো টলমল করছে তার তবুও হেঁসে শুধালো, ‘ সত্যি যাবে?’
‘ হুম, সত্যি। ’
…..
কয়েক সপ্তাহ পরে,সকাল বেলা। রান্নাঘরে বাড়ির বউরা রান্নাবান্নার কাজ করছে। রহিমা বেগম আজ একটু সুস্থ বোধ করছেন বলে নিজেই চুলার পিঠে বসেছেন। আসমা তার পাশে বসে আলু কুচি করছে।সালেহাও অন্য বটিতে কাজ করছে, ববিতা পানি আনতে গিয়েছে। আগুনের আঁচে অসুস্থ রহিমা বেগমের মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। তিনি মাঝে-মাঝেই কাশছেন। আসমা চিবুকটা নামিয়ে হাঁটুর উপর দিয়ে রেখেছে। সামনের দিকের বড় চুলের একটা অংশ তার মুখে আছড়ে পড়ছে। রহিমা বেগমকে বারবার কাশতে দেখে সে উদ্বিগ্ন চোখে তার দিকে তাকাল,নরম গলায় বলল,
‘ আম্মা,আপনার কষ্ট হলে, আপনি গিয়ে বিশ্রাম নেন। আমি আর চাচি মিলে রান্নাটা সেরে নিচ্ছি।’
ধোঁয়ার মধ্যে রহিমা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে স্খলিত কন্ঠে বলল,
‘ না মা, তার দরকার নেই। আজ একটু ভালো লাগছে।’
‘কাশি হচ্ছে যে।’
‘ বুকে কফ জমে তার থেকে কাশি হচ্ছে। ’
রান্নাঘরের বাইরে উঠোনে মল্লিকা একটা পিঁড়িতে বসে ধান ঝাড়ছিল। প্রাণহীন,জীর্ণ হয়ে যান্ত্রিকভাবে হাত চালাচ্ছে। নয়নিকা তার পাশে বসে ছোট্ট ময়নার চুলে তেল দিচ্ছে। ময়না ছটফট করছে,চুলে তেল দেওয়া তার মোটেও পছন্দ না। নয়নিকা চটপটে স্বভাবের মল্লিকাকে আজ কয়েকদিন ধরে চুপচাপ থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল,
‘বুবু, তোমার কী হয়েছে? কয়দিন ধরেই দেখছি কেমন চুপচাপ থাকছ।’
‘কিছু না। মনটা একটু খারাপ।’
‘ মন খারাপ কেন? চাচি কিছু বলেছে?’
‘ না, এমনি।’ মল্লিকা মাথা নিচু করে নিজের কাজ করতে করতে বলল। নয়নিকা বুঝতে পারল না কী বলবে,তার মনে দোদুল্যমানতা চলতেই থাকল। সে ময়নার চুলে তেল মাখতে মাখতে মল্লিকার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই বাড়ির সামনে থেকে রফিকুলের চিৎকার এল। রফিকুল বাড়িতে ছুটে আসল।
‘ আম্মা! চাচি! ভাবি! তাড়াতাড়ি আস! চাচা...চাচা..’
রফিকুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটার চিৎকারে সকলে উঠানে চলে আসল। রফিকুল খবর দিল যে জহির শেখ মাঠ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। মইনুলসহ আরো অনেকে তাকে নিয়ে শহরের হাসপাতালে গিয়েছে। সকলে এমন একটা খবর পেয়ে স্থির হয়ে গেলো। সালেহা আর মল্লিকা তৎক্ষণাৎ কান্না ভেঙে পড়ল। জব্বার শেখ খবর পেয়ে হাট থেকে বাড়িতে আসতেই হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে সালেহা বেগম তার সাথে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। জব্বার শেখ বাধ্য হয়ে সালেহা বেগমকেও তার সাথে নিয়ে শহরের উদ্দেশ্য বের হয়ে গেলো। নয়নিকা ময়নাকে কোলে নিয়ে এক কোণে বসে আছে। ছোট্ট ময়না কিছু বুঝতে না পারলেও সবার মুখ দেখে ভয় পেয়ে গেছে। সে চুপচাপ নয়নিকার কোলে মুখ গুঁজে আছে। শেখ বাড়িটা মৃত্যুপুরীর রূপ নিল।
আসমা উঠোনে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। বাড়ির সকলের অবস্থা খারাপ। তার নজর গেল মল্লিকার দিকে। মল্লিকা এখনো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে মুখটা শুষ্ক, শূন্য। আসমা তার কাছে গেল। মল্লিকা শূন্য চোখে আসমার দিকে তাকাল। মেয়েটার শূন্য চাউনি আসমার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। সে মল্লিকার বরফশীতল হাত দুটো নিজের হাতের তালুর উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরল।
‘ মল্লিকা, ভেতরে চলো। রোদে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না বোন।’
মল্লিকা তার কথায় কোনো সাড়া দিল না।
‘ মল্লিকা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?’
মল্লিকা যখন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আব্বা...’ আব্বা বলে সে মাটির ওপর আছড়ে পড়ল, আসমা বিদ্যুৎগতিতে তাকে জাপটে ধরল। মল্লিকা তার কাঁধে মুখ রেখে কাঁদতে শুরু করল। প্রথমে আস্তে-আস্তে, তারপর জোরে-জোরে। আসমা মল্লিকার কপালে লেগে থাকা ঘামে ভেজা অবিন্যস্ত চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল।মল্লিকার কান্নায় তার নিজের চোখও ভিজে উঠল।
‘ভাবি আব্বা... আমার আব্বা...’মল্লিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল।
‘কিছু হবে না মল্লিকা। চাচা ভালো হয়ে ফিরে আসবেন। তুমি শক্ত হও,দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু মল্লিকা আসমার কথা কানে নিলো না। সে আসমাী কাঁধে মুখ রেখে কাঁদতেই থাকল। আসমা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। নয়নিকা এগিয়ে এল। সেও মল্লিকার পাশে বসে তার হাত ধরল।
‘বুবু, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কেঁদো না।’
ববিতা এসে মল্লিকার অন্য পাশে বসল। কয়েকজনে মিলে মল্লিকাকে ঘিরে বসে রইল। মল্লিকা কাঁদছে যেন বছরের পর বছরের জমে থাকা সব কষ্টগুলো আজ একসাথে বেরিয়ে আসছে। সে আসমার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে কাঁদছে। অবশ্য আগের থেকে একটু শান্ত হলো। আসমা মেয়েটার অবশ্য দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে এক অসীম শক্তির মালিকা আল্লাহ তায়া’লার কাছে দোয়া করল যেন এই হাসিখুশি নীড়টা আবার তার আগের শ্রী ফিরে পায়। দুপুরের দিকে খবর এল জহির শেখকে শহরের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। তার অবস্থা সিরিয়াস। ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন। বাড়িতে কেউ খাওয়া-দাওয়া করল না। মইনুলের দাদি ঘরে বসে একটানা কাঁদছেন, শরীরটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আসমা মল্লিকাকে রুমে শুয়ে দিয়ে রান্নাঘরে এসে বসল। তার মনটাও অস্থির হয়ে আছে। বাড়ির এই অবস্থা দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। সকাল থেকে কেউ কিছু খায়নি বলে সে রান্নাঘরে আসল। এভাবে চলতে থাকলে সবার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। সে উঠে দাঁড়াল। আসমা চুলায় আগুন দিল। সে খিচুড়ি করার জন্য চাল-ডাল বের করল। আসমা কাজ করছিলো এমন সময় নয়নিকা এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল।
‘ ভাবি, তুমি রান্না করছ?’
‘ হ্যাঁ। সবাই সকাল থেকে না খেয়ে আছে। এভাবে চললে তো সকলেই অসুস্থ হয়ে যাবে।’
‘ কিন্তু এই অবস্থায় কেউ খাবে?’
‘খেতে হবে। না খেয়ে থাকলে সবার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। তখন আরও বিপদ হবে।’
নয়নিকা কিছু বলল না। সে ছোট্ট করে জিজ্ঞাসা করল,
‘ আমি তোমাকে সাহায্য করব?’
‘ তুমি ময়নাকে দেখো। ছোট্ট মেয়েটা ভয় পেয়ে গেছে এসব দেখি। আমি আর ববিতা সবটা সামলে নিচ্ছি। ’
তাদের কথার মাঝেই ববিতা এসে হাজির। নয়নিকা আর কথা না বাড়িয়ে ময়নার কাছে চলে গেলো। তারা দুজনে মিলে কাজ করতে লাগল। আসমার মল্লিকার কথা মনে পড়ল। মেয়েটা সে জোর করে শুয়ে দিয়ে এসেছিল। কী করছে এখন কে জানে। তার মল্লিকার জন্য চিন্তা হতে লাগল। সে ববিতাকে জিজ্ঞাসা করল,
‘ মল্লিকা কোথায়?’
‘ ওর ঘরে। তুমি যখন মাথায় তেল দিয়ে শুয়ে দিয়ে আসলে তখন থেকে শুয়ে আছে। কারও সাথে কথা বলছে না।’
আসমা অনেকটা কাজ গুছিয়ে ববিতার উপর রান্নার বাকি কাজটুকু দিয়ে মল্লিকার কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
জহির শেখ সেদিন হসপিটাল থেকে বাসায় এসেছিল,আস্তে আস্তে সুস্থও হচ্ছিল কিন্তু হসপিটাল থেকে বাসায় আসার বারোদিনের মাথায় হুট করেই সব শেষ হয়ে গেলো। ফজরের নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়েছিলেন তিনি কিন্তু তারপর তিনি আর বিছানা থেকে উঠলেন না। হার্ট অ্যাটাকে মরা গেলেন।
বাড়ির উঠানে উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদছেন সালেহা বেগম। তার বিলাপ আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মল্লিকা নির্বাক হয়ে গেছে; সে কেবল জহির শেখের লাশের পাশে বসে ফ্যালফ্যাল করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। জব্বার শেখও কাঁদছে। নয়নিকারাও কাঁদছে। মইনুলের দাদিকে ধরে রাখা যাচ্ছে না,তিনি বিলাপ করছে। কেউ ভাবতেও পারেননি জহির শেখ এমন করে চলে যাবে। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। রহিমা বেগম শোকে পাথর হয়ে সাহেলাকে সামলাচ্ছে। আসমা মল্লিকাকে সামলাচ্ছে। আজ প্রথম আসমার বাসা থেকে এই গ্রামে তার বাবা, বোনরাও এসেছে।
জহির শেখের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বাড়িটা আরও বেশি খাঁ খাঁ করতে লাগল। যে মানুষটা ফজরের নামাজ পড়ে এসে বারান্দায় বসে তামাক টানতেন, সেই মানুষটার চেয়ার শূণ্য হয়ে পড়ে রইল। পরের দিন বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনেরা এসেছিল, মিলাদ হয়েছিল। রাত-দিন নিজের মতো চলতে লাগল। এখন সালেহা বেগম সারাক্ষণই কাঁদেন। মল্লিকা কান্না করা বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু মেয়েটা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সে কারও সাথে কথা বলে না, নিজের ঘরে বসে থাকে। খাওয়া-দাওয়াও করছে না ঠিকমতো। আসমা তার দিকে বিশেষ নজর রাখছে। প্রতিদিন সে মল্লিকার ঘরে যায়, তাকে খাওয়ায়, তার সাথে বসে থাকে। মল্লিকা কিছু বলে না, কিন্তু আসমা বুঝতে পারে মেয়েটা তার উপস্থিতিতে একটু স্বস্তি পায়। এভাবে দিন কাটতে থাকে,এর মধ্যেই জানা যায় আসমা অন্তঃসত্ত্বা। আসমা নিজের অসুস্থতার মধ্যেও সকলের খেয়াল রাখার চেষ্টা করে। জব্বার শেখও এতো দিনে আসমার উপর নরম হয়ে আসে।আসমা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে বাসার সবাই তাকে আগলে রাখে। শোকের কালো মেঘের আড়ালে আসমা টুকরো প্রাণশক্তি হয়ে উঠে।যার আপ্রাণ চেষ্টাই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগে তছনছ হয়ে যাওয়া শেখ বাড়ি।
দিন যত যাচ্ছে, আসমার দায়িত্ব তত বাড়ছে। সে সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে মইনুলের দাদির ঘরে যায়। দাদি বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তারপর ছেলের শোকে আরও ভেঙে পড়েছেন। আসমা তার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে যায়, তার পাশে বসে থাকে, তার কথা শোনে,তার সাথে গল্প করে। আসমা দাদির সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পরে রান্নাঘরে চলে আসে। সালেহা বেগম আর রহিমা বেগমও তার সাথে কাজে হাত লাগাল। জহির শেখের মৃত্যুর পর রহিমা বেগমের শরীরটা আরও খারাপ হয়ে গেছে তবুও তিনি চেষ্টা করছেন সবকিছু সামলাতে। সালেহা বেগম সবে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। সকলের জন্য রান্নাটা সেই করার চেষ্টা করে। জব্বার শেখের সাথে তার সম্পর্কটাও মোটামুটি ভালো। তার পাঁচ মাসের গর্ভ, পেটটা বেশ ভারী হয়েছে। মাঝে-মধ্যেই তার শরীরটা খারাপ লাগে কিন্তু সে কাউকে কিছু বলে না। এই কঠিন সময়ে সবাই নিজেদের শোকে ডুবে আছে, তার শারীরিক কষ্টের কথা শুনে তাদের আরও চিন্তা বাড়বে তাই সে নিজের প্রতি বেশ অবহেলা করছে । জহির শেখ মারা যাওয়ার পর থেকেই জব্বার শেখ নিজের ব্যবসা,জমিজায়গা থেকে দূরে আছে। মইনুলই সব দেখছে। রফিকুল পড়াশোনার জন্য শহরের চলে গেছে,তার ভালো একটা কলেজে চান্স হয়েছে। রান্না শেষে আসমা সবাইকে খাবার পরিবেশন করল। জব্বার শেখকে খাওয়াল, দাদিকে খাওয়াল, মল্লিকাকে খাওয়াল। সবাইকে খাওয়ানোর পরে সবশেষে সে নিজে খেল। খাওয়ার পর সে মল্লিকার ঘরে গেল। মল্লিকা বিছানায় শুয়ে আছে। আসমা তার পাশে বসল। তার সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করল। সন্ধ্যা নামল। আসমা নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজের ঘরে ফিরল। মইনুল তখন বাসায় এসেছে। সে বাসাই এসেই পোশাক পরিবর্তন না করেই বিছানায় বসে কীসব জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছে। আসমা সেটা দেখে লোকটার কাছে এগিয়ে আসল। কড়া গলায় বলল,
‘ সারাদিন এতো কাজ করলে হয় নাকি?একটু বিশ্রাম নেওয়ারও তো দরকার আছে।’
‘ কথাটা নিজেকে বলো আমাকে না।’
আসমা লোকটার কথা শুনে হাসল। সে বিছানায় পা ছড়িয়ে বসল। মইনুল সেটা দেখে তার পায়ের কাছে বসে পা টিপে দিতে লাগল।
‘ নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখো। তোমার এখন বিশ্রাম দরকার। মা, ববিতা, নয়নিকা আছে। তোমাকে এতো দৌড়াদৌড়ি করতে কে বলে বলো তো?’
আসমা মইনুলের শাসন দেখে হাসে কিছুই বলে না। লোকটার শাসন করাও তার ভালো লাগে যে। এভাবে দিন কাটতে লাগল। আসমার পেট এখন বেশ বড় হয়ে গেছে। ছয় মাস পূর্ণ হতে চলল। সবাই তার যত্ন নিচ্ছে, কিন্তু সালেহা বেগম কোনো এক অজানা কারণে আসমাকে ঠিক আজকাল অপছন্দ করছে। একদিন আসমা রান্নাঘরে কাজ করছিল। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে এল। সে দেওয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়াল। ববিতা তাকে দেখে ছুটে এল তার সাথে ছিলো ববিতার ছেলে মনিরুল। মা ছেলে মিলে আসমাকে ধরল।
‘ ভাবি, কী হলো?শরীর খারাপ লাগছে?’
‘ না, মাথাটা একটু ঘুরছে।’
ববিতা আর মনিরুল তাকে ধরে বাইরে নিয়ে এল, বসিয়ে দিল। রহিমা বেগম সেটা দেখে এলেন। উদ্বিগ্ন কন্ঠে ববিতাকে জিজ্ঞাসা করল,
‘ কী হয়েছে তোর ভাবির?’
‘ জানি না চাচি, বললো একটু মাথা ঘুরেছে।’
রহিমা বেগম তার কপালে হাত রাখতেই দেখলো মেয়েটার জ্বর।
‘ জ্বর কবে বাঁধালি?’
‘ জানি না আম্মা, সকাল থেকে গা গরম গরম লাগছিল।’
রহিমা বেগম আসমার কথা শুনে চিন্তিত হলো কারণ বাড়িতে পুরুষ মানুষ কেউ নেই। তিনি চোখ তুলে ববিতার ছেলে মনিরুলকে দেখতেই স্নান গলায় বলল,
‘ ভাই যা তো, নয়নিকাকে সাথে নিয়ে ডাক্তার বাবুকে ডেকে আন।’
নয়নিকা আর মইনুল প্রায় একি জুড়ি। মইনুল নয়নিকার থেকে বছর খানিকের বড়। সে রহিমা বেগমের কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে নয়নিকাকে ডাকতে চলে গেলো। রহিমা বেগম আসমাকে ঘরে নিয়ে গেলেন, শুইয়ে দিলেন। সে ক্লান্ত, শরীরটা দুর্বল লাগছিল তাই অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ল। পরে ডাক্তার এসে তাকে তাকে দেখে গেলো।
লুকদারকে আনব নাকি মেজর শতাব্দকে??
#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
৪৪.শেষাংশ
মইনুল আর আসমার সুখের সংসারে হঠাৎ করেই কালবৈশাখীর কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। নয় মাসের পূর্ণতা নিয়ে আসমার কোলজুড়ে আসার কথা ছিল এক টুকরো চাঁদের কিন্তু নিয়তির লিখন কে খণ্ডাবে? এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় আসমার গর্ভজাত সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বিদায় নিল। সেই সাথে আসমার জীবনে নেমে এলো অমাবস্যা। জীবনের এমন একটা আঘাত সহ্য করতে তার অনেক সময় লাগল তবে সেই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আসমার জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল। দীর্ঘ চারটি বছর কেটে গেল, কিন্তু আসমার কোলে আর কেউ এলো না। আসমা তখন ভেতরে ভেতরে দুমড়েমুচড়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। তার সন্তান হারানোর যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ালো চারপাশের মানুষের বিষাক্ত কথা। পল্লীগ্রামের বদ্ধ পরিবেশে যখন কোনো বউয়ের কোলে সন্তান আসতে দেরি হয়, তখন চারপাশের মানুষ মজা নিতে শুরু করে। মইনুলের দাদি আর মল্লিকার মা সালেহা বেগম সেই সুযোগটাই নিল। তাদের বাঁকা কথা আর টিপ্পনীতে আসমার জীবন বিষিয়ে উঠল। দিনরাত আসমাকে অলক্ষ্মী আর বন্ধ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকল। আসমার উপরে সালেহা বেগমের গলার স্বর দিন দিন চড়তে থাকল। তাদের চোখে আসমা এখন কেবল একজন বন্ধ্যা নারী। সে উঠোনে বসলেই দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বংশের চেরাগ জ্বলবে কী দিয়ে? এই কুলক্ষণী তো মইনুলের জীবনটাই আন্ধার করে দিল,বন্ধ্যা যে।’ সালেহা বেগমও তাতে ঘি ঢেলে দিল। ‘ কী আর করার মা আমাদের মল্লিকার কপালটাই মন্দ। নাইলে আমার মেয়েরে ফেলে এই অপয়াকে বিয়া করত?’
‘বাঁজা মেয়েমানুষ ঘরে রেখে কী লাভ?’ এমন কথাও তারা বলতো তবে মইনুলের ভয়ে সরাসরি বলত না, কিন্তু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে, আকারে-ইঙ্গিতে তাকে কথা শোনাত। আসমা রান্নাঘরে থাকতে সেখানে গিয়ে বলত, উঠোনে বসলে সেখানে বলত আর পাড়ার মেয়ে-মহিলাদের সামনে আসমাকে ছোট্
করত,তাকে আরো বেশি-বেশি কথা শোনাত।
মইনুলের দাদি আর মল্লিকার মা সালেহা বেগম যেন আসমার পেছনে উঠেপড়ে লাগতে লাগল। আসমার মা হতে না পারার যন্ত্রণাকে তারা আরও উসকে দিতেন বিষাক্ত সব কথায়। বন্ধ্যা অপবাদটা দিয়ে আসমার বুকটা তারা প্রতিনিয়ত ঝাঁঝরা করে দিত। আসমা মুখ বুজে সব সহ্য করত, কারণ রহিমা বেগম তখন ভালোই অসুস্থ হয়ে পড়েন। নয়নিকা সবসময় আসমাকে ওদের থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করত কিন্তু সবসময় পারত না।
এদিকে মল্লিকা তখন জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছে। মইনুলকে না পাওয়া আর বাবার আকস্মিক মৃত্যুর শোক তাকে নির্বাক করে দিয়েছিল। আগে যে মেয়েটা চঞ্চল হরিণীর মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত, সে এখন বাড়ির এক কোণে চুপচাপ বসে থাকতে লাগল। বিয়ের কথা তুললেই সে ক্যাটক্যাট করে ওঠত, তার ভেতরে জমে থাকা অভিমান আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বেরিয়ে পড়তে লাগল, মল্লিকা তার মাকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাইত অথচ তার মা আর দাদি মিলে অন্য খেলায় মত্ত হয়েছিল। মেয়ের এই অবস্থা দেখে সালেহা বেগম আর মইনুলের দাদি মিলে এক নতুন ফন্দি আঁটলেন। তাদের ধারণা হলো, মইনুলের সাথে বিয়ে দিলেই হয়তো মল্লিকা আবার প্রাণ ফিরে পাবে,সুখী থাকবে। তাদের লক্ষ্য তখন একটাই হয়ে দাঁড়াল মইনুলের সাথে মল্লিকার দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়া। যার জন্য দীর্ঘ চার বছর ধরে জব্বার শেখের কানে বিষ ঢালছেন তারা। জব্বার শেখ সহজ-সরল মানুষ হলেও বংশের প্রদীপ নিভে যাওয়ার ভয়ে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিলেন। তারা তাকে বোঝাত, ‘ মইনুল নিজের পছন্দের মেয়ে বিয়ে করে আনল কিন্তু কী অলক্ষণের মেয়ে দেখ বাচ্চাকাচ্চা হয় না। ও যদি কোনোদিন মা হতে না পারে তখন? মইনুলের জীবনটার কী হবে? নষ্ট হয়ে যাবে। তারপরে মইনুলের বাচ্চাকাচ্চার মুখ দেখতে পারবো না।এটা হতে দেওয়া যাবে না। বংশের কথা ভাবতে হবে না?আর একটা বিয়ে দে । তাছাড়া মেয়ে তো আমাদের হাতের কাছেই আছে। দুটে বিয়া তো আর হারাম না। ধর্মে নিষেধ নাই তাহলে সমস্যা কোথায়? মল্লিকার সাথে মইনুলের বিয়েটা দিলে অন্তত ঘরটাতে নাতি-নাতনি আসবে। আসমার যদি আর কোনো দিন সন্তান না হয় তখন কী হবে? ভেবে দেখেছিস?’
জব্বার শেখ প্রথমে তাদের কথায় কান দিতেন না। এই কান ভাঙানিগুলো সবসময় উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু এক সময় কান ভাঙানিগুলো তার উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করল, ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে, এই কান ভাঙানি তাকে দুর্বল করে দিল। মনের ভেতরে একটা সংশয় তৈরি হল সত্যিই কি আসমার আর সন্তান হবে না? সত্যিই কি তার মইনুলের বংশ শেষ হয়ে যাবে? মইনুল যতই তার কথা না মেনে চলুক না কেনও তিনি মইনুলকে বড্ড ভালোবাসেন যে। ছেলেটার সন্তান না হওয়ার কষ্টটা তিনি বাবা হয়ে বোঝেন তাই একসময়ে জব্বার শেখ সিদ্ধান্ত নিলেন, মইনুলকে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করাবেনই। তিনি নিজের অজান্তেই ছেলের সুখের চেয়ে বংশ রক্ষার মোহে অন্ধ হয়ে পড়লেন।
দাদি আর চাচি শাশুড়ির কটু কথা, পাড়ার মানুষের হাস্যরসাত্মক কথা সে সবসময় এড়িয়ে চলত, গায়ে না মাখার চেষ্টা করত কিন্তু অভাগীর কী এতো সহজে রক্ষে আছে!
অবশেষে একদিন জব্বার শেখ মইনুলকে মল্লিকার সাথে বিয়ে করার প্রস্তাবটা দিয়েই দিলেন। বাবার মুখে এমন অনৈতিক আর নিষ্ঠুর প্রস্তাব শুনে মইনুলের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আসমার প্রতি তার ভালোবাসা আর বিশ্বাসের অবমাননা সে সইতে পারল না।
‘আব্বা আপনি কী জানেন আপনি কী বলছেন?’
‘জানি, তাছাড়া অনেক চিন্তা করেই বলছি। চার বছর তো হয়েই গেলো। আমার মনে হয় আসমার আর সন্তান হবে না। তাই তোমার দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছি।মল্লিকাকে বিয়ে করো। এই সংসারে বাচ্চাকাচ্চা দরকার। তোমার বাচ্চাকাচ্চা না হলে আমার এতো সম্পত্তির কী হবে? সব কি ঘুণে খাবে? ’
‘ঘুনে খাবে কেন? রফিকুল তো আছেই তাছাড়া আপনি এসব কার কথায় বলছেন? দাদি আর চাচির? ’
জব্বার শেখ সেদিন চুপ ছিলো। মইনুল নিজের কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেয়ে গর্জন উঠে বলেছিল,
‘এতোগুলো বছর ধরে এরা তোমার কানে বিষ ঢালছে, আর আপনি সেটাই গিলছেন।’
‘ এটা কান ভাঙ্গানোর বিষয় না। ’
‘তাহলে কীসের বিষয়? আসমা আমার স্ত্রী। আপনি কী করে বলতে পারেন তাকে ছেড়ে দিতে?’
‘ছেড়ে দিতে বলিনি । ’
‘আমার কাছে দ্বিতীয় বিয়ে মানেই প্রথমজনকে ছেড়ে দেওয়া।’
মইনুল আর জব্বার শেখের মধ্যে শুরু হলো তুমুল বাকবিতণ্ডা। দুই প্রজন্মের এই সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। তর্কের পিঠে তর্ক, অপমানের বদলে পাল্টা অভিযোগ। ঝগড়া যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাল, জব্বার শেখ রাগের বসে আসমার সম্পর্কে কিছু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে বসলেন তখন মইনুলের মস্তিষ্কে রক্ত চড়ে গেল। ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো, রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ফলে বাবাকে চড় মারতে উদ্যত হলো কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে তার হাতটা মাঝপথেই থামিয়ে দিল।রাগের মাথায় এমন মহাপাপ করার চিন্তা আসায় সে নিজের ওপর নিজেই লজ্জিত হলো।
সেইদিন এক কাপড়ে মইনুল আসমাকে নিয়ে জব্বার শেখের বাড়ির চৌকাঠ পার হলো। জব্বার শেখের কথাগুলো শুনে আসমার সেদিন চোখের পানি বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। মইনুল সেদিন আরো একবার আসমার জন্য নিজের পরিবার, পরিজন ছেড়েছিল। এবার সে নিশ্চিত ছিল এই ঘরে তার আর কখনো ফেরা হবে না। সেই বিষাদময় দিনের পর মইনুল আর আসমা শহরের যান্ত্রিকতার মাঝে আবারও নিজেদের বিলীন করে দিল। সেখানে আসমাকে কটুকথা শোনানোর জন্য কেউ ছিলো না। একে অপরের প্রতি অটুট বিশ্বাস আর আগামীর সুন্দর স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে তারা আবারও নিজেদের সংসার সাজাল।
এই চারটা বছরের প্রতিটি দিনই আসমার কাছে ছিল আগুনের মধ্যে বসবাসের মতো। সন্তান হারানোর ক্ষত যখন একটু শুকিয়ে আসত, তখনই চারপাশের মানুষের বাক্যবাণ সেই ক্ষতকে আবার তাজা,রক্তাক্ত করে দিত। মইনুলের দাদি আর সালেহা বেগমের বিদ্রূপ আসমাকে ঘরকুনো করে তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু তার মনের আশাকে বন্ধ করতে পারেনি। আসমা সেই সময়ে কেবল আল্লাহর দরবারেই মাথা নত করে থাকত। মানুষ কেবল বাহিরটাই দেখে, কিন্তু মনের গহিনের খবর একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাখেন। রাতের শেষ প্রহরে উঠে আসমা কত-শত নামাজ, দোয়া পড়ত। তখন জায়নামাজ বিছিয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসাত। সে সবমসময় একটা দোয়াই করত আর তা হলো,
‘মাবুদ তুমিই দাতা। তুমি মারিয়মকে (আ.) অলৌকিকভাবে সন্তান দিয়েছিলে, তুমি বৃদ্ধ জাকারিয়াকে (আ.) ইয়াহইয়াকে দান করেছিলে। আমিও তাদের মতো তোমার একজন বান্দা। মানুষের কথায় আমি ভেঙে পড়ি না, শুধু তুমি আমাকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দাও আর আমার জন্য যা ভালো সেটা প্রদান করো।’
সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, বৃষ্টির পরে ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে যেমন সূর্য উঠে তেমনিই একদিন তার এই কষ্টের অমানিশা কেটে রহমতের বৃষ্টি ঝরবে। শহরে এসেও আসমার এই রুটিনটা বদলায়নি কিন্তু এতো কিছুর মধ্যে আসমা অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করল।
আসমা এখন নিজের স্বাভাবিক জীবনের সাথে অভ্যস্ত হতে চাইলেও তার মনের ভেতরে জমে থাকা চার বছরের সেই পাহাড়সম কষ্টগুলো তাকে নিস্তার দিলো না।
সবসময়ই ‘বাঁজা মেয়েমানুষের ছায়া মাড়ানোও পাপ’ বলা সালেহা বেগমের কথাগুলো তার কানে বাজত। মইনুল অফিস চলে গেলে আসমা যখন একা থাকত, তখন অতীতের কথাগুলো, যন্ত্রণাগুলো তার দিকে তেড়ে আসত যার ফলে ধীরে-ধীরে আসমার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করল। তার সেই তেজদীপ্ত চোখের নিচে কালি পড়ল, খাওয়া-দাওয়ার রুচি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেলো। মইনুল আসমার এমন অবস্থা দেখে তাকে বেশি-বেশি সময় দেওয়া শুরু করল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরে ডাক্তার বলল আসমা নাকি দীর্ঘমেয়াদী সিভিয়ার ডিপ্রেশনে ভুগছেন। চারপাশের মানুষের কথা, সন্তান হারানোর শোক আর নিজের ভেতরে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আসমা নিজেকে অপরাধী মনে করতে শুরু করেছে। এই মানসিক চাপ থেকেই ওর উচ্চ রক্তচাপ আর স্নায়বিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্রেইন স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে। ডাক্তার তাকে পরামর্শ দিলো আসমাকে খুশি রাখতে, এমন কিছু করতে হবে যাতে আসমা আবার জীবনের প্রতি আগ্রহ খুঁজে পায়।
কয়েকমাস পরে আসমার অবস্থা যখন আরো একটু খারাপ হলো তখন মইনুল সিদ্ধান্ত নিল বাচ্চা দত্তক নেওয়ার। সে আসমাকে সেটা বললে আসমা সরাসরি তাকে নিষেধ করে দিল, মইনুল যেনও এমন কিছু না করে আর তাকেও এমন কথা না বলে। সে আল্লাহর কাছে চেয়েছে আর আল্লাহ তায়ালাই তাকে দিবে। মানুষের বিদ্রূপ সয়ে সে যখন চার বছর কাটিয়েছি, আরও কয়েক বছর কাটাতে পারবে। মেয়েটার এমন বিশ্বাস দেখে মইনুল তাকে আর ঘাটলো না।
এতো কিছুর মাঝেই হঠাৎ করেই একদিন সকালে আসমার শরীরটা কেমন যেন অন্যরকম লাগতে শুরু করল। প্রতিদিনের মতো ফজরের নামাজ পড়ে সে যখন মইনুলের জন্য চা বানাতে রান্নাঘরে গেল, কালকের বাসি তেলের গন্ধ নাকে আসতেই তার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার উপক্রম হলো। প্রচণ্ড বমিভাব নিয়ে সে বেসিনের কাছে ছুটে এলো। মইনুল ড্রয়িংরুমে বসে পত্রিকা পড়ছিল, আসমার গোঙানির শব্দ শুনে সেও হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলো।আসমার ফ্যাকাশে মুখ আর বমিভাব দেখে মইনুলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে আসমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে ঠান্ডা করতে লাগল।
আসমার অবস্থা দেখে মইনুলের প্রায় চার বছর আগের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ল। যখন আসমা প্রথমবার গর্ভবতী হয়েছিল, ঠিক এভাবেই তার অসুস্থতা শুরু হয়েছিল। মইনুলের মনে এক অদম্য আশার আলো দেখা দিল। তবে এবার কি সে সত্যিই বাবা হতে চলেছে? আল্লাহর কুদরত কি সত্যি হতে চলেছে?
চলবে...
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]