ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার ধ্বংস

পর্ব 1

লেখক: নুসরাত

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার ধ্বংস

প্রথম অধ্যায়: পনেরো বছর পর

আজ দীর্ঘ পনেরো বছর পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরছে আহানাফ চৌধুরী। যে মানুষটি একদিন নিজের পরিবার, নিজের বাড়ি, এমনকি নিজের দেশ ছেড়ে দূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিল, আজ সেই মানুষটিই আবার ফিরে আসছে নিজের শেকড়ের টানে।

পনেরো বছর! সময়টা নেহাত কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছে মানুষের চেহারা, সম্পর্কের সমীকরণ, পরিবারের পরিবেশ। কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনোই মুছে যায় না। কিছু অভিমান সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে।

কিন্তু কেন আজ হঠাৎ দেশে ফিরছে আহানাফ চৌধুরী?

গল্পের শুরুটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে পনেরো বছর আগের সেই সময়ে।

তখন আহানাফের বয়স মাত্র আঠারো বছর। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল বেশ জেদি, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন এবং স্বাধীনচেতা একজন মানুষ। নিজের জীবন নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করা এবং নিজের মতো করে জীবন সাজানোর ইচ্ছা ছিল তার।

কিন্তু তার জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার মতামতকে গুরুত্ব না দিয়েই।

তার বাবা-মা মাত্র পনেরো বছর বয়সি একটি মেয়ে, আনিকার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেন। পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়েটি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আহানাফ কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। এত অল্প বয়সে এমন একটি দায়িত্ব নিতে সে প্রস্তুত ছিল না।

সেদিন পরিবারের সামনে অনেক প্রতিবাদ করেছিল আহানাফ।

— আমি এই বিয়ে করতে চাই না! তোমরা আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমার মতামত ছাড়া কীভাবে নিতে পারো?

কিন্তু তার কথায় কেউ গুরুত্ব দেয়নি। পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তই শেষ কথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সেই দিন থেকেই পরিবারের প্রতি তার মনে অভিমান জমতে থাকে। একসময় সবকিছু ছেড়ে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। চলে যায় কানাডায়। পেছনে ফেলে যায় নিজের পরিবার, নিজের বাড়ি এবং জীবনের একটি অমীমাংসিত অধ্যায়।

এরপর কেটে যায় পনেরোটি বছর।

এই দীর্ঘ সময়ে একবারের জন্যও বাংলাদেশে ফিরে আসেনি আহানাফ। কানাডায় নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। পড়াশোনা, কাজ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও দেশে ফেরার ব্যাপারে কখনো আগ্রহ দেখায়নি।

কিন্তু ভাগ্যের কাছে মানুষের সব পরিকল্পনা সব সময় টিকে থাকে না।

সম্প্রতি আহানাফের মা মাহিরা বেগম ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ছেলেকে একবার দেখার জন্য তাঁর মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। প্রতিদিন ছেলের কথা মনে পড়ে তাঁর। কখনো পুরোনো ছবিগুলো দেখেন, কখনো ছেলের ছোটবেলার স্মৃতিগুলো মনে করে চোখের জল ফেলেন।

মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে আহানাফের বাবা আহিয়ান চৌধুরী ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন।

একদিন সন্ধ্যায় আহানাফকে ফোন করেন তিনি।

— আহানাফ, বাবা, কেমন আছিস?

— ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

— আমি ভালো আছি। কিন্তু তোর আম্মুর শরীরটা একদম ভালো যাচ্ছে না।

— কী হয়েছে আম্মুর?

— অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তোকে একবার দেখতে চায়। সারাক্ষণ তোর কথা বলে। তুই দেশে ফিরে আয় বাবা।

আহানাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

— বাবা, তোমরা তো জানো আমি কেন দেশ ছেড়েছিলাম।

— জানি বাবা। তোর অভিমানের কারণও জানি। কিন্তু সবকিছুর পরেও তুই আমাদের সন্তান। তোর আম্মু তোকে খুব দেখতে চায়।

আহিয়ান চৌধুরী আবারও বলেন,

— আর আনিকার ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করিস না। তুই যদি এই সম্পর্কটা আর রাখতে না চাস, তাহলে আমরা তোকে জোর করব না। চাইলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবি। শুধু একবার দেশে ফিরে আয়।

কথাগুলো শুনে আহানাফ অনেকক্ষণ নীরব থাকে। একদিকে পনেরো বছরের পুরোনো অভিমান, অন্যদিকে অসুস্থ মায়ের মুখ।

অবশেষে মায়ের কথা ভেবেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় সে।

আর আজ সেই দিন।

আজ পনেরো বছর পর বাংলাদেশে ফিরছে আহানাফ চৌধুরী।

অন্যদিকে চৌধুরী বাড়িতে আজ আনন্দের বন্যা বইছে। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত। কেউ ঘর গোছাচ্ছে, কেউ রান্নাঘরে ব্যস্ত, আবার কেউ বারবার মূল ফটকের দিকে তাকাচ্ছে।

চৌধুরী পরিবার একটি বড় ও সম্ভ্রান্ত পরিবার। পরিবারের বড় ছেলে আহানাফ। তার বাবা আহিয়ান চৌধুরী এবং মা মাহিরা বেগম। আহানাফের একমাত্র ছোট বোন মাহানা চৌধুরী।

আহিয়ান চৌধুরীর আরও দুই ভাই রয়েছেন। বড় ভাই আরহাম চৌধুরী এবং মেজ ভাই আরিশ চৌধুরী। পরিবারের ছোট ভাই আহসান চৌধুরী।

বড় চাচার স্ত্রী রেদিতা এবং ছোট চাচার স্ত্রী রায়হানা। পরিবারের ছেলেমেয়েরাও আজ সবাই একত্রিত হয়েছে। ছোট-বড় সবাই মিলে যেন বাড়িটাকে আনন্দে ভরিয়ে তুলেছে।

মাহানা তো আনন্দে একেবারেই স্থির থাকতে পারছে না। বারবার নিজের মায়ের কাছে ছুটে যাচ্ছে।

— আম্মু, ভাইয়া কখন আসবে? আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব?

মাহিরা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— এই তো মা, চলে আসবে। একটু ধৈর্য ধর।

— তুমি জানো আম্মু, আমি ভাইয়াকে কতগুলো কথা বলব! এতগুলো বছর আমাকে ছাড়া কীভাবে ছিল? আমার সঙ্গে তো একবারও দেখা করতে এল না!

মাহিরা বেগম মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেললেন।

— তোর ভাইটা একটু জেদি হয়েছে। এবার আসুক, সব কথা বলিস।

মাহানা আবারও দরজার দিকে তাকাল। তার মনে হচ্ছে, কখন গাড়ির শব্দ শোনা যাবে আর কখন সে নিজের ভাইকে দেখতে পাবে!

এদিকে আহিয়ান চৌধুরীও বেশ অস্থির হয়ে আছেন। এতগুলো বছর পর ছেলেকে সামনে থেকে দেখবেন। ছেলেটা কতটা বদলে গেছে, দেখতে কেমন হয়েছে, এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।

অন্যদিকে কানাডা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছে আহানাফ। বিমানের জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তার মনে পড়ছে ছোটবেলার কথা। মায়ের হাতের রান্না, বাবার সঙ্গে কাটানো সময়, ছোট বোনের দুষ্টুমি এবং সেই পুরোনো বাড়ির প্রতিটি কোণ।

সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

কিন্তু স্মৃতির মাঝেই হঠাৎ একটি নাম তার মনে পড়ে যায়।

আনিকা!

যে মেয়েটির সঙ্গে তার জীবনের একটি সম্পর্ক জড়িয়ে আছে, সেই মেয়েটি এখন কোথায়? কেমন আছে? এতগুলো বছরে তার জীবনেও কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?

আহানাফ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— যাই হোক, এবার শুধু আম্মুকে দেখতে এসেছি। পুরোনো কোনো বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে চাই না।

এদিকে চৌধুরী বাড়ির সবাই তখন শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়।

কখন গাড়ির শব্দ শোনা যাবে?

কখন বাড়ির বড় ছেলে দরজায় এসে দাঁড়াবে?

আজ চৌধুরী বাড়িতে যেন ঈদের আনন্দ। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। পরিবারের প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট।

কিন্তু কেউ জানে না, এই ফিরে আসা শুধু আনন্দই নিয়ে আসবে, নাকি সঙ্গে করে নিয়ে আসবে পুরোনো কিছু অভিমান, অজানা কিছু সত্য এবং নতুন এক ঝড়।

পনেরো বছর পর ফিরছে আহানাফ চৌধুরী।

কিন্তু এবার তার জীবনের গল্প কোন দিকে মোড় নেবে?

যে বাড়ি একদিন অভিমান করে ছেড়ে গিয়েছিল, সেই বাড়িতেই কি আবার নিজের জায়গা খুঁজে পাবে সে?

নাকি অতীতের কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন তার জীবনে নতুন করে ঝড় তুলবে?

সময়ের অপেক্ষায় রইল সব উত্তর।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন