ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার ধ্বংস

পর্ব 2

লেখক: নুসরাত

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার ধ্বংস

দ্বিতীয় অধ্যায়: অপেক্ষার অবসান

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে বসার ঘর পর্যন্ত আজ অন্য রকম সাজসজ্জা। বাড়ির কাজের লোকেরাও সকাল থেকে ব্যস্ত। রান্নাঘরে চলছে হরেক রকম খাবারের আয়োজন। আজ যেন বাড়ির প্রতিটি কোণে আনন্দের ছোঁয়া লেগেছে।

কারণ আজ বাড়ির বড় ছেলে ফিরছে।

আহানাফ চৌধুরী!

দীর্ঘ পনেরো বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরছে সে।

বাড়ির বসার ঘরে বসে আছেন আহিয়ান চৌধুরী। হাতে ফোন, চোখ বারবার ঘড়ির দিকে যাচ্ছে। ছেলের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেই কথা হয়েছে তাঁর। বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে রওনা হয়েছে আহানাফ।

এদিকে মাহানা চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে পারছে না। কখনো মায়ের ঘরে যাচ্ছে, কখনো বারান্দায় দাঁড়াচ্ছে, আবার কখনো মূল ফটকের দিকে তাকাচ্ছে।

মাহানা দৌড়ে মায়ের ঘরে এসে বলল,

— আম্মু!

মাহিরা বেগম বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। মেয়ের ডাক শুনে মুখ তুলে তাকালেন।

— কী হয়েছে মা?

— ভাইয়া কি সত্যিই আজ আসবে? নাকি আবার কোনো কারণে আসতে পারবে না?

মাহিরা বেগম মৃদু হেসে বললেন,

— আসবে মা। তোর ভাই এবার কথা দিয়েছে।

— জানো আম্মু, ভাইয়াকে দেখার জন্য আমার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে ভালো লাগছে না।

মাহিরা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তাঁর নিজেরও যে কতটা অপেক্ষা, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

মাহানা জানালার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,

— আম্মু! ভাইয়া এসেছে! আমার ভাইয়া এসেছে!

কথাটি শুনে বাড়ির সবাই যেন একসঙ্গে নড়েচড়ে উঠল। আহিয়ান চৌধুরী দ্রুত বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আরহাম, আরিশ ও আহসান চৌধুরীও বাড়ির মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

একটি কালো রঙের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামল।

গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নামল একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ।

পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে দামি ঘড়ি। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখে এক ধরনের শীতলতা। পনেরো বছরের প্রবাসজীবন তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে।

এই সেই আহানাফ চৌধুরী।

গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই বাড়িটার দিকে তাকাল সে। পরিচিত বাড়ি, পরিচিত পরিবেশ। অথচ সবকিছু যেন আজ নতুন মনে হচ্ছে।

ঠিক তখনই আহিয়ান চৌধুরী ছেলের সামনে এগিয়ে এলেন।

— আহানাফ!

বাবার কণ্ঠ শুনে আহানাফ তাঁর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ দুজনের চোখাচোখি হলো। তারপর আহানাফ ধীরে ধীরে বাবার কাছে এগিয়ে গেল।

আহিয়ান ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

— এতগুলো বছর পর ফিরলি বাবা!

আহানাফ নিচু স্বরে বলল,

— কেমন আছো, বাবা?

— এখন ভালো আছি। তুই ফিরে এসেছিস, এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?

বাবার কথায় আহানাফ কিছু বলল না। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

এবার মাহানা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দৌড়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।

— ভাইয়া!

আহানাফ একটু অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকাল। তারপর তার মাথায় হাত রাখল।

— কী হয়েছে? এভাবে কাঁদছিস কেন?

— তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? পনেরোটা বছর! একবারও আমাকে দেখতে এলে না!

আহানাফ মৃদু হেসে বলল,

— এত বড় হয়ে গেছিস যে এখন আমাকে বকতেও শিখে গেছিস?

মাহানা চোখ মুছতে মুছতে বলল,

— তোমাকে বকা তো আমার অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল।

আহানাফ এবার বোনকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— আচ্ছা, আর রাগ করতে হবে না। এবার এসেছি তো।

পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে একে এগিয়ে এলেন। বড় চাচা আরহাম চৌধুরী ছেলের মতো ভাতিজাকে কাছে টেনে নিলেন। মেজ চাচা আরিশ চৌধুরীও তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ছোট চাচা আহসান চৌধুরী হাসিমুখে বললেন,

— বাহ! আমাদের বাড়ির বড় সাহেব তো একেবারে বিদেশি হয়ে ফিরেছে!

আহানাফ মৃদু হেসে বলল,

— চাচা, আপনি কিন্তু একটুও বদলাননি।

রেদিতা ও রায়হানাও তাকে স্নেহভরে স্বাগত জানালেন। বাড়ির ছোটরাও একে একে তার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগল।

কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও আহানাফের চোখ যেন একজন মানুষকেই খুঁজছিল।

তার মা।

হঠাৎ সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

— আম্মু কোথায়?

আহিয়ান চৌধুরী বললেন,

— তোর আম্মু নিজের ঘরে। সকাল থেকে শুধু তোর অপেক্ষা করছে। শরীরটা ভালো নেই, তাই বাইরে আসতে পারেনি।

কথাটা শুনে আহানাফ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

ঘরের দরজা খুলতেই বিছানায় বসে থাকা মাহিরা বেগমের চোখে পড়ল ছেলেকে।

— আহানাফ!

ছেলেকে দেখে তিনি উঠে বসার চেষ্টা করলেন। আহানাফ দ্রুত মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর হাত ধরে বলল,

— আম্মু, তুমি উঠছ কেন? শুয়ে থাকো।

মাহিরা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না।

— আমার বাবা! এতদিন পর তোকে দেখতে পেলাম!

আহানাফ মায়ের হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

— কেমন আছো, আম্মু?

— তুই সামনে এসেছিস, এখন আর কী চাই আমার?

মাহিরা বেগমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন,

— কত বড় হয়ে গেছিস! শেষবার যখন তোকে দেখেছিলাম, তখন তো তুই একেবারেই ছোট ছিলি।

আহানাফ নিচু স্বরে বলল,

— আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না, আম্মু।

মাহিরা বেগম ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,

— আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক বাবা। তোর জন্য কত অপেক্ষা করেছি, জানিস?

আহানাফ মায়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ কথা বলল। মায়ের ওষুধ, চিকিৎসা এবং শরীরের খোঁজখবর নিল। মায়ের মুখে হাসি দেখে তার নিজের মনটাও কিছুটা শান্ত হলো।

কিছুক্ষণ পর মাহানা ঘরে এসে বলল,

— ভাইয়া, সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। নিচে চলো।

আহানাফ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আম্মু, তুমি বিশ্রাম নাও। আমি একটু পরেই আসছি।

রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে বিশাল ডাইনিং টেবিলে। পরিবারের প্রায় সবাই একসঙ্গে বসেছে। আহানাফকে মাঝখানে বসানো হয়েছে। মাহানা তো ভাইয়ের পাশ ছাড়তেই চাইছে না।

খাবারের মাঝখানে আরহাম চৌধুরী জানতে চাইলেন,

— তা বাবা, কানাডায় সবকিছু কেমন চলছে?

— ভালোই চলছে, বড় আব্বু। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি।

আরিশ চৌধুরী বললেন,

— এবার কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যাওয়া চলবে না। অনেক দিন পর ফিরেছিস। কিছুদিন সবার সঙ্গে থাক।

আহানাফ মাথা নাড়ল।

— দেখা যাক, মেজ আব্বু।

সবাই যখন হাসি-আনন্দে ব্যস্ত, তখন আহিয়ান চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— আহানাফ, তোর সঙ্গে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

আহানাফ বাবার দিকে তাকাল।

— বলো।

— আনিকার ব্যাপারে তোর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

নামটা শুনতেই আহানাফের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— বাবা, আমি এখন এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।

— কিন্তু বাবা, বিষয়টা তো এভাবে ফেলে রাখা যায় না। এতগুলো বছর কেটে গেছে।

আহানাফ গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল,

— আমি কাউকে অপেক্ষা করতে বলিনি। আর আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিতে চাই।

কথাটা বলে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— আমি অনেক ক্লান্ত। নিজের ঘরে যাচ্ছি।

কেউ তাকে আর আটকানোর সাহস পেল না।

নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল আহানাফ। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল। ঘরটা প্রায় আগের মতোই সাজানো রয়েছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকাল সে।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো ছবিতে। ছবিটা হাতে তুলে নিল আহানাফ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ছবিটা রেখে দিল।

তারপর নিজেকেই বলল,

— পনেরো বছর আগের সেই জীবন আর ফিরে পেতে চাই না।

কিন্তু সে জানে না, তার ফিরে আসার খবর ইতিমধ্যে আরেকজন মানুষের জীবনেও আলোড়ন তুলেছে।

চৌধুরী বাড়ির অন্য একটি ঘরে বসে আছে এক তরুণী। তার হাতে একটি পুরোনো ছবি। ছবির মানুষটির দিকে তাকিয়ে মেয়েটির চোখ ভিজে উঠেছে।

পনেরো বছর পর মানুষটা দেশে ফিরেছে।

কিন্তু সে কি একবারও মনে করেছে এই মেয়েটির কথা?

মেয়েটি ছবিটা বুকের কাছে রেখে খুব আস্তে বলল,

— ফিরে তো এলে, আহানাফ চৌধুরী। কিন্তু এবার কি আমাকে চিনতে পারবে?

জানালার বাইরে তখন রাত আরও গভীর হচ্ছে।

চৌধুরী বাড়ির সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ সেই বাড়ির দুটি মানুষের চোখে আজ ঘুম নেই।

একজন ফিরে এসেছে নিজের অতীতের মুখোমুখি হতে।

আরেকজন অপেক্ষা করছে সেই অতীতের একটি উত্তর পাওয়ার জন্য।

কিন্তু তাদের এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন