ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুখের নেশায়

পর্ব 20

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
২৯+৩০
পর্ব___২৯

বাড়ির মেইন ফটক দিয়ে ঢোকার মুহুর্তে দারোয়ান সালাম দেয় চৈত্রিকা ও মোনার উদ্দেশ্যে। বিনিময়ে মিষ্টি হাসে চৈত্রিকা। মোনার পিছু পিছু ফাইলগুলো হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকে দ্রুত। মোনা এতো জলদি হাঁটছে ওর সাথে হেঁটে প্রায় হাঁপিয়ে উঠার উপক্রম চৈত্রিকার। তার উপর ওড়না সরে গিয়ে একটা অংশ মেঝে ছুঁয়ে দিচ্ছে। হাতে ফাইল থাকায় চৈত্রিকা ঠিক করতে পারছে না। মোনাকেও হেল্প করতে বলতে পারছে না। এই মেয়ে যা ঝাঁঝালো পরে দেখা যাবে মুখের উপর অপমান করে বসবে। মানুষের কথার আ*ঘাত সহ্য করতে করতে বড় হলেও চৈত্রিকা যথেষ্ট চেষ্টা করে যারা হেনস্তা করে, আঘা/ত করে তাদের এড়িয়ে চলার। তাছাড়া ওর খুব ইচ্ছে করছিল সাফারাতকে স্বচক্ষে একটা বার দেখবার। মোনার কাছে অনুরোধ করার পূর্বেই সে নিয়ে এসেছে এতে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ও মোনার প্রতি।

সদর দরজার কাছে আসতেই কাজের মেয়ে মিনা চৈত্রকে দেখে দৌড়ে এলো। ফাইলগুলো টেনে নিজের হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল,

' ম্যাডাম কেমন আছেন?স্যার রে দেখতে আইছেন?কান্ড তো ঘইটা গেছে। স্যার সকালে জ্বরের ঘোরে দাদির সামনে খালি কইতাছিল চৈত্র কে দেখব। দাদি তো জানে না চৈত্র কেডা। আমিও কই নাই। আপনে আইয়া পড়লেন এহন স্যার একদম চাঙ্গা হয়ে উঠব। আমি মুভিতে দেখছি জ্বরে যার নাম লই তারে দেখলে শরীলে একটা ভাব আইয়ে। '

চৈত্রিকার অবস্থা বেগতিক। মিনা দাঁত কেলিয়ে এক নাগাড়ে বলেই যাচ্ছে। অপরদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সবটা পর্যবেক্ষণ করছে মোনা। এক পর্যায়ে মিনা কে থামিয়ে বলে,

' চৈত্রিকা এই বাড়িতে আগেও এসেছিল?'
' হ আইছে তো। '
মিনা ব্যস্ত কন্ঠে সাদামাটা উত্তর দেয়। আর কিছু বলতে নিলে ড্রইং রুমে আগমন ঘটে সাফারাতের চাচী ও প্রিয়ন্তীর। দু'জনেই নত মস্তকে দাঁড়ানো চৈত্রিকা কে চিনে ফেলে। মাথা নিচু করে রাখলেও চৈত্রিকা বুঝতে পারছে সকলের দৃষ্টি। এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।তার এই বাড়িতে প্রথম পা রাখার দিনটা ছিল খুবই বিচ্ছিরি একটা দিন। লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না সে। আরেকবার যখন এসেছিল তখন বাড়ির কোনো সদস্য ছিল না বলে চৈত্রিকার লজ্জায় পড়তে হয় নি। এখন মনে হচ্ছে মুখ তুলে তাকানো টাই কষ্টকর। প্রিয়ন্তী এগিয়ে আসে। কন্ঠে তার বেশ বিস্ময়।

' আপনি তো সেই মেয়েটা যাকে জেরিন আপু থাপ্প*ড় মেরেছিল?আপনি আবারও কি করছেন এখানে?ভাইয়া দেখলে তো রাগ করবে আবার। অপমান করবে আপনাকে। '

চৈত্রিকার মুখে চরম অসহায়ত্ব ফুটে উঠে। সে তো জানত এমন কিছুর সম্মুখীন এখানে এসে হতে হবে। তবুও সাফারাতের অসুস্থতার কথা শুনে নিজের মন কে আঁটকে রাখতে ব্যর্থ হয়। মোনার বেশ মজা লাগছে চৈত্রিকা কে এমতাবস্থায় দেখে। তবে পূর্বের কোনো কাহিনি সে জানে না। থাপ্প'ড় শব্দটা শুনে এক প্রকার প্রশান্তি অনুভব করে হৃদয়পটে। প্রিয়ন্তীর মা এগিয়ে এসে ক্রুদ্ধ কন্ঠে চেঁচালেন,

' এই মেয়ে প্রিয়ন্তী কি বলছে তুমি শুনতে পাচ্ছো না?এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন?আর দারোয়ানের সাহস কি করে হয় তোমার মতো বস্তির একটা মেয়েকে আমাদের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়ার। বের হও এখুনি। '

প্রিয়ন্তী ওর মা'কে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি যেন চৈত্রিকাকে সহ্যই করতে পারছেন না। দু'হাতে জামা মুঠো করে মাথা তুলে নিজেকে ধাতস্থ করে চৈত্রিকা। অতঃপর ভাঙ্গা কন্ঠের জবাব ওর,

' আমি বস্তির মেয়ে নই ম্যাম। সাফারাত স্যারের অফিসের একজন
এমপ্লয়ী আমি। মোনা ম্যামের সাথে এসেছি। '

প্রিয়ন্তীর মা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো মোনার দিকে। মোনা নম্র স্বরে জানায়--' আমি আনি নি ম্যাম। '

স্তব্ধ, হতবাক হয়ে পড়ে চৈত্রিকা। এত বড় মিথ্যা কথা?মোনা যে ইচ্ছে করেই মিথ্যে বললো তা বুঝতে চৈত্রিকার এক সেকেন্ডও সময় লাগে নি। মোনা মনে মনে বেশ শান্তি পাচ্ছে চৈত্রিকাকে অপমানের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সক্ষম হয়ে। এটাই তো চেয়েছিল সে। কিন্তু এতো ইজিলি হয়ে যাবে একদমই ভাবে নি। প্রিয়ন্তীর মা আক্রোশে ফেটে পড়ে।

' তুমি কর্মচারী হও বা যে হও এখুনি বের হও এখান থেকে। সাফারাতের অনুমতি পেয়েছ তুমি?'

চৈত্রিকা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নাড়ায়। চক্ষু কোটর জলে টলমল করছে। গড়িয়ে পড়ার ভীষণ তাড়া জল বিন্দুদের। কাউকে চোখের জল প্রদর্শন করে নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করার কোনো প্রশ্নই আসে না। চৈত্রিকা কঠোর। শক্ত। পৃথিবীর সকল মানুষের নিকট চৈত্রিকার মন শক্ত খোলসে আবৃত। কেবল একজন মানুষের কাছে উন্মুক্ত মন এবং তা নিজের স্বামীর নিকট। মিনা সাফারাতের চাচী কে একদমই দেখতে পারে না। সারাক্ষণ কারণে অকারণে সুযোগ পেলেই মিনাকেও এই মহিলা ছাড় দেয় না। গরীব, মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের প্রতি যেন উনার এলার্জি আছে। চৈত্রিকার প্রতি উনার এমন আচরণ মিনার ভালো লাগছে না। চুপি চুপি সিঁড়ি বেয়ে উঠে কর্ণারের দিকে রুমটায় ছুট লাগায় ও।

চৈত্রিকার তীব্র ইচ্ছে করছে প্রতিবাদ করতে। সাফারাতের পরিবার মানে নিজের শশুড় বাড়ির লোকজন। তাই নিজেকে দমিয়ে নিয়ে নরম কন্ঠে শুধালো,

' আমি চলে যাচ্ছি। অস্থির হবেন না ম্যাম। পরের বার স্যার অনুৃমতি দিলেই আসব। '

কথাটা বলতে গিয়ে ওর গলা ধরে আসছিল। সাফারাত কে দেখা ব্যতীত চলে যেতে তার মন মানছে না৷ তবুও যে বাধ্য। পিছন ফিরে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হওয়া মাত্র কর্ণকুহরে ঝংকার তুলে প্রবেশ করে গম্ভীর, অস্থিরতা মাখা স্বর।

' কোথায় যাচ্ছেন আপনি চৈত্র? স্টপ দেয়ার। '

থেমে গেল পা দুটো। মুহুর্তের জন্য থমকালো হৃদপিণ্ড। সবার দৃষ্টি সাফারাতের পানে। চোখ মুখ অসম্ভব লাল তার। চুল উশকো খুশকো। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে এতো জ্বরেও। চৈত্রিকা ঠাহর করতে পারছে না জ্বরের কারণে এতো লাল বর্ণে ছেয়ে আছে ফর্সা মুখটা নাকি রাগের ছটায়?কালো একটা গেঞ্জি ও হাঁটু অব্দি থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়নে তার। বড় বড় কদম ফেলে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এক ঝটকায় উপস্থিত হলো ঠিক চৈত্রিকার সামনে৷ নিদারুণ অধিকার নিয়ে আঁকড়ে ধরে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর ডান হাত টা। শরীরের অত্যাধিক তাপমাত্রায় আঁতকে উঠলো চৈত্রিকা। সে হলে বোধ হয় এতো জ্বরে বেহুঁশ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকত অথচ এই লোক নিজের বলিষ্ঠ দেহ টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে ঠিকঠাক। অসুস্থতা যেন তাকে গ্রাস করে নি। সাফারাত কঠিন স্বরে বললো,

' নিজের বাড়ি থেকে অন্যের কথায় কেন বেড়িয়ে যাবেন আপনি?'
' আমার বাড়ি?'
ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করে চৈত্রিকা। সাফারাত হাতের বাধন শক্ত করে প্রতুত্তর করে,
' অবশ্যই আপনার বাড়ি। আপনার হাসবেন্ডের বাড়ি মানে এটা আপনারই। আপনি আমার অর্ধাঙ্গিনী। এটা শুধু নাম মাত্র সম্পর্ক নয়। আমার জীবন, আমার সবকিছুতে আপনি অংশীদার। শুধু মাত্র আপনি। '

সাফারাতের কথা শুনে সবাই হতভম্ব। মোনার মনে হচ্ছে ও কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছে। কেউ পারছে না সমীকরণ মেলাতে। সাফারাতের দাদি এসেছিলেন পিছু পিছু। তখন মিনা রুমে যেয়ে দেখে সাফারাত কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। আর ওর দাদি টুকটাক কথা বলছে। মিনা নিজের উপস্থিতি জানান দিতেই সাফারাত হাত নামিয়ে দৃষ্টি তাক করে। গড়গড় করে নিচে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা ব্যাখা করতে দুই মিনিট সময় নেয় মিনা। এমনকি মোনার কথাগুলো পর্যন্ত বাদ দেই নি ও। এই মুহুর্তে থ হয়ে রইল সকলে। সাফারাত চৈত্রিকার চোখের দিকে প্রগাঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কাজলকালো নয়নে জল থইথই করছে। সাফারাত হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চাচীর দিকে চেয়ে বললো,

' বাড়িতে আসা মানুষের সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করা উচিত হয় নি আপনার। ভাগ্যিস আপনি আমার বড় এবং একজন নারী। শ্রবণগ্রন্থি তে ভালোভাবে ঢুকিয়ে নিন এই মেয়েটা আমার স্ত্রী। আমার সুখ। এবার যদি আপনারা আমার সুখের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান তবে সকল মানবতা ভুলে গিয়ে আপনাদের রাস্তায় নামাব আমি। মাইন্ড ইট। এন্ড মিস মোনা অফিসে গিয়ে রিজাইন লেটার জমা দিবেন এবং নিজের অর্ধেক মাসের স্যালারি বুঝে নিবেন। আপনাকে এক পলকের জন্যও আমি কখনও দেখতে চাই না। বিকজ ইউ প্ল্যান টু হার্ট মাই হ্যাপিনেস। গেট লস। '

মোনা কেঁদে দিল। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে কিছু বলতে চাইলে সাফারাত মিনা কে উদ্দেশ্য করে বলে মোনা কে যেন গেইট অব্দি দিয়ে আসা হয়। চরম অপমানিত হয়ে বেড়িয়ে যায় মোনা। একেই বোধ হয় বলে অপরের জন্য ফাঁদ পাতলে সেই ফাঁদে নিজেই পড়তে হয়।

সাফারাতের দাদি থমথমে মুখে এগিয়ে এসে বললেন,
' তুমি এসব কি বলছো?'
' ঠিক বলছি। তিনদিন আগে আমি বিয়ে করেছি চৈত্রকে। '
চৈত্রিকার হাত টা ছেড়ে দিয়ে দাদির দিক দৃষ্টি জ্ঞাপন করে বললো সাফারাত। তার নিরলস, নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি দেখে উনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে ক্ষণিকের নিমিত্তে। মিনিট সময় অতিবাহিত হতেই প্রশ্ন করেন,
' চিনো না জানো না একটা মেয়েকে হুট করে বিয়ে করে নিলে?'
' হুট করে হয় নি। ওর সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘ অনেক বছরের। তুমি অসুস্থ থাকায় তোমাকে বিয়ের কথা জানাতে পারি নি। তবে আমি চাইব চৈত্রকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়ে মেনে নিবে তুমি। '
সাফারাত তাহলে সকালে জ্বরের ঘোরে এই মেয়ের নাম নিচ্ছিল?মনের কথা মনে রেখে তিনি মুখে ব্যক্ত করেন,
' ওর পরিবারের সাথে কথা বলতে চাই আমি। '
' ওর মা ও বোন আছে। তুমি চাইলে আমি উনাদের আসতে বলব। '
' ডেকে পাঠাও। '

কথাগুলো বলে সুফিয়া বেগম চৈত্রিকার কাছে এগিয়ে গেল। জহুরি চোখে পরখ করে নিল ওকে। চৈত্রিকা ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে। ওর এই অস্বস্তি না বাড়তে দিয়ে সুফিয়া বেগম হাসি মুখে বলে উঠলেন,

' বাহ!তুমি তো অপরুপ সুন্দরী। একদম সাফারাতের মায়ের মতো। কি সুন্দর টানা টানা চোখ তোমার। '

প্রশংসা শুনে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ল চৈত্রিকা। নিমিষেই পুরো মুখ জুড়ে লাল বর্ণের আস্তরণ পড়ে যায়। সাফারাত তা দেখে সূক্ষ্ণ একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে। দাদির দিকে তাকিয়ে বলে,

' কথা শেষ হলে তুমি প্রিয়ন্তী কে দিয়ে চৈত্র কে আমার রুমে পাঠিয়ে দিও দাদি। মাথা টা ভীষণ ব্যাথা করছে। আমি গেলাম। '

পিলে চমকে উঠল চৈত্রিকার। আজ কি এখানে থাকতে হবে?সুফিয়া বেগম চৈত্রিকার হাত ধরে নিজের রুমে নিয়ে এলো। পিছু পিছু এলো মিনা ও প্রিয়ন্তী। প্রিয়ন্তীর মা এতো নাটক দেখে মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলেন। উনার ছেলে জেলে পঁচে মরছে অথচ সাফারাত বিয়ে করে সুখের সংসার করবে এটা কোনো ক্রমেই মানতে পারছেন না তিনি।

চৈত্রিকা কি ভেবে এসেছিল আর কি হচ্ছে? ও কল্পনা করে নি এতো তাড়াতাড়ি এই বাড়িতে সাফারাতের বউয়ের পরিচয়ে সকলের সামনে হাজির হতে হবে। প্রিয়ন্তী ওর গা ঘেঁষে বসল। মলিন স্বরে আওড়ালো,
' স্যরি ভাবী। তখন আম্মুর ও আমার ব্যবহারের জন্য। প্লিজ ফরগিভ মি। '
মেয়েটার গালে হাত রাখে চৈত্রিকা। মৃদু হেসে বললো,
' ইটস ওকে কিউট গার্ল। '
আনন্দে, উৎসাহে চৈত্রিকাকে ঝাপটে ধরল প্রিয়ন্তী। কন্ঠে তীব্র উচ্ছ্বাস।
' এখন থেকে আমায় সারাক্ষণ একা একা থাকতে হবে না। তোমার সাথে আড্ডা দেওয়া যাবে। উফ!ভাইয়া বিয়ে করেছে আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। '
সুফিয়া বেগম একটা চেইন এনে চৈত্রিকার গলায় পড়িয়ে দিল।
' তোমার শাশুড়ি পুত্রবধূর জন্য অনেক গহনা রেখে গিয়েছে। তার মধ্য থেকে চিকন এই চেইন টা পড়িয়ে দিলাম তোমায়। প্রিয়ন্তী ওকে সাফারাতের রুমে দিয়ে আয়। '
___________

ধীরে ধীরে পা ফেলে সাফারাতের রুমে প্রবেশ করে চৈত্রিকা ও প্রিয়ন্তী। সাফারাত নেই রুমে। প্রিয়ন্তী বেলকনিতে উঁকি দিতেই দেখতে পায় সাফারাত দাঁড়িয়ে আছে।
' ভাবী ভাইয়া বেলকনিতে। তুমি থাকো তাহলে। আসছি। '

কথাটা বলেই প্রিয়ন্তী প্রগাঢ়পাড়। চৈত্রিকার অকস্মাৎ লজ্জা অনুভূত হচ্ছে। পা বাড়িয়ে বারান্দায় আসে সে। সাফারাত অভিভূত নয়নে তাকিয়ে রাশভারি গলায় বলে উঠল,

' লজ্জা পাওয়ার মতো এখনও আমি কিছুই করি নি তবুও লজ্জা পাচ্ছেন?আই থিংক আমার কিছু করা উচিত। এমনি এমনি আপনাকে দূর থেকে লজ্জা পেতে দেখে একদমই ভালো লাগছে না। '

চৈত্রিকা হকচকিয়ে যায়। কয়েক পা পিছিয়ে রুমে চলে আসে ও। সাফারাতের মতিগতি ভালো ঠেকছে না। বিড়বিড় করে বললো,
' জ্বরে পাগল হয়ে গেল না তো?'
' জ্বরে নয় আপনার প্রেমে। '

কথাটা বলেই সাফারাত রুমের দরজা লাগিয়ে আসে। পেশিবহুল হাতে পিছন হতে ঝাপটে ধরলো চৈত্রিকার কোমর। চুলে মুখ ডুবিয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস টেনে নিল নিজের মাঝে। পেটে এক হাত চেপে ধরে বললো,
' আপনি বড্ড পাষাণ চৈত্র। কি হয় একটু কাছাকাছি আসলে?নাকি আমার প্রতি ফিলিংস জাগে না আপনার?

শ্রবণেন্দ্রিয় ঝনঝন করে উঠল চৈত্রিকার। যেন কেউ কানের অতি নিকটস্থে তবলা বাজাচ্ছে। ঘাড়ে ঠোঁটের গাঢ় স্পর্শ অনুভব হতেই পেটে বিরাজমান সাফারাতের গরম হাত টা খামচে ধরল মুহুর্তেই,তৎক্ষনাৎ।

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
পর্ব___৩০

চৈত্রিকার হাতের নখ বিঁধে গেল সাফারাতের ফর্সা হাতে। তবুও টু শব্দ টুকু বের হলো না তার কন্ঠনালি হতে। উল্টো চৈত্রিকা কে পাঁজাকোলা করে বিছানার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। বুকটা ধুপধাপ শব্দে কেঁপে উঠল চৈত্রিকার। মৃদুস্বরে চেঁচিয়ে উঠে সে,
' কি করছেন?'
সাফারাত জবাব দিল না। চৈত্রিকাকে বিছানার একপাশে বসিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে রইল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে মাদকতাময় স্বরে বললো,
' ভয় পাচ্ছেন আপনি চৈত্র? আপনি এক কদম এগিয়ে এলেই আমি তিন কদম আগাবো। সো রিলেক্স। মাথাটা ব্যাথা করছে। ঘুমাবো আমি। '
' আপনি তাহলে ঘুমান। আমি নিচে যায়। '
' না। '
কঠোর গলায় নাকচ করে সাফারাত চৈত্রিকার কোলে মাথা রেখে চোখ বুঁজে নেয়। আকস্মিকতায় ভড়কে যায় চৈত্রিকা। কিছু সেকেন্ড বাদেই তার দুই ঠোঁটে স্মিত হাসির রেখা প্রতীয়মান হয়। নিজ থেকেই আঙ্গুল চালনা করতে থাকে সাফারাতের ঘন চুলের মাঝে। কপালেও হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। চৈত্রিকা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাফারাতের মুখের দিকে।

সাফারাত হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখ দুটো বুঁজে আছে ওর। একটা মানুষ বছর গড়িয়ে যেতে যেতে কত পরিবর্তন হয়। কিশোর জীবনে সাক্ষাৎ হওয়া সাফারাত এর পরিবর্তন আজ আগের চেয়েও চোখ ধাঁধানো। ক্ষণে ক্ষণে মনের উচাটন বেড়ে যাচ্ছে চৈত্রিকার। ইচ্ছে করছে সাফারাতের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ফর্সা গালে চুমু এঁকে দিতে। কিন্তু লজ্জা,ভয়ও পাচ্ছে বেশ। যদি সাফারাত বুঝে যায়?ধরা পড়ে যায়?পরমুহূর্তেই চৈত্রিকা নিজেকে শাসায় ও একটা এডাল্ট মেয়ে। নিজের স্বামীকে একটুখানি ছুঁয়ে দিতে এতো কিসের ভয়?মনে মনে সাহস জুগিয়ে ঘুমন্ত সাফারাত এর গালে গভীর,গাঢ় চুমু আঁকে চৈত্রিকা নিজের নরম ওষ্ঠযুগল দ্বারা। নিমিষেই শিরদাঁড়া বরাবর শীতল স্রোত বয়ে যায়। সময় ব্যয় না করে ঘুমের সুযোগ নিয়ে সাফারাতের কপালেও চুমু খায় ও। নিজের স্বামীর কপালে চুমু খেলে এতো শান্তি অনুভব হয়?চৈত্রিকা মনে মনে সিধান্ত নিয়ে নেয় ও যেভাবেই হোক সাফারাত এর কপালে রেগুলার চুমু খাবে। নিরবে ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে পুনরায় সাফারাত এর চুলে হাত বুলাতে থাকে।

ঘন্টা দুয়েক কেটে যায়। এবার চৈত্রিকার নিজেরই চোখ লেগে আসছে। বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে ঘাড় বাঁকা করে মাথা এলিয়ে দেয় সে। আঁখি কোটরে ভর করে ঘুম। চোখ লেগে আসার মিনিট খানেক বাদেই হুট করে ঘুমটা উবে যায়। নিজেকে বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে আবিষ্কার করে। সাফারাত নেই! ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে? চৈত্রিকা গায়ের জামা ঠিক করে ওড়না ঠিক মতো টেনে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। চারদিকে অবিন্যস্ত দৃষ্টি ফেলতেই ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ ভেসে আসে শ্রবণগ্রন্থিতে। বিছানায় বসে চৈত্রিকা অপেক্ষা করে সাফারাত এর। রুমের দেয়ালে অনেকখানি স্থান জুড়ে থাকা বিশাল দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাতেই দেখে দুপুর ১ টা বাজে। চৈত্রিকার মাথায় হাত। সেই সকালে এখানে এসেছে তার মধ্যে এতো সময় পাড় হয়ে গেল?এজন্যই বুঝি বলে-- ' সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ' রুমের কালো পর্দা গুলো উড়ছে হালকা হালকা বাতাসের ঝাপটায়। চৈত্রিকা তখন নার্ভাসনেস এর ঠ্যালায় খেয়াল না করলেও এখন পুরো রুমে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। রুমের সকল আসবাবপত্র কালো রঙের। সবকিছু। তার মধ্যে এয়ার কন্ডিশনার টা ধবধবে সাদা রঙের। বাহির থেকে তপ্ত দুপুরেও নির্মল বাতাস ধেঁয়ে আসছে রুমে। ফলস্বরূপ চৈত্রিকার মনে হলো শুধু শুধু এসি চালিয়ে রেখে অযথা কোনো কিছু নষ্ট করার মানে হয় না। যে অভাবে থাকে কেবল সেই বুঝে, অভাবের জীবন টা ঠিক কতখানি কষ্টের, যন্ত্রণার। সোফার উপর এসির রিমোট টা দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে তা হাতে তুলে এসি অফ করে দেয়।

প্রচন্ড জ্বর নিয়ে পাক্কা এক ঘন্টা পর স্নান সেরে বেরিয়ে আসে সাফারাত। পড়নে একটা লং টাউজার। কোমর হতে গলা পর্যন্ত সবটুকু দৃশ্যমান। প্রচন্ড জোরে ধ্বক করে উঠল চৈত্রিকার বুক,বক্ষস্থল। এই প্রথম সাফারাত কে উদোম শরীরে দেখল ও। পেট টা কেমন সুড়সুড়ি দিচ্ছে। পা দুটো শক্তি হারিয়ে অসাড় হয়ে পড়ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।

সাফারাত চৈত্রিকার দিকে আঁড়চোখে একবার তাকিয়ে আলমিরা থেকে একটা ধূসর রঙা গেঞ্জি বের করে পরিধান করে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চৈত্রিকার উদ্দেশ্যে বলে,
' এদিকে আসুন চৈত্র। '
' জ্বি?'
' আমার কাছে আসুন। '
টলমলে, দুর্বল পায়ে চৈত্রিকা কাছে এসে দাঁড়াল। সাফারাত আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঘুরে দাঁড়াল চৈত্রিকার দিক। পা থেকে মাথা অব্দি চৈত্রিকার সারা দেহে দৃষ্টি রাখল। এহেন কান্ডে চৈত্রিকা হকচকালো। থমকে গেল। আমতা আমতা করে প্রশ্ন করলো,
' কি হয়েছে? '
' আপনি কাঁপছেন কেন?'
' কাঁপব কেন?কই কাঁপছি না তো। '

অথচ চৈত্রিকার কন্ঠে কম্পন স্পষ্ট। সাফারাত এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে চায়। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে যায় চৈত্রিকার একদম নিকটে। তার তাগড়া, বলিষ্ঠ দেহ হতে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করা মাত্রারিক্ত ঘ্রাণে বেসামাল, মাতোয়ারা হয়ে পড়ছে চৈত্রিকা। পিছনের দিকে পড়ে যেতে নিলেই সাফারাত টেনে বুকে আনে। নত চিবুকে হাত রেখে চৈত্রিকার লজ্জা মাখা মুখটা উপরে তুলে নিল। নিস্তব্ধ, স্থবির চৈত্রিকা। হুট করেই চক্ষে বিঁধে সাফারাতের নেশার্ত দৃষ্টি। ধূসর রঙা চোখের মণিতে মত্ত হয়ে পড়ছে ও। ফাঁকা ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। সাফারাত চিবুকে হাত রেখে পুনরায় চৈত্রিকার মুখ টা তার মুখের বরাবর ধরে। রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল,
' বার বার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন?এখন কি আপনার চেহারা টা দেখাও আমার জন্য বারণ?'
চৈত্রিকা উদগ্রীব, ব্যগ্র সরে উত্তর দেয়,
' না না। বারণ হবে কেন?'
' তাহলে আমার থেকে মুখ লুকাচ্ছেন কেন?'
চৈত্রিকা নিশ্চুপ। সাফারাত বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
' দূর বিয়ে করেও শান্তি নেই। পারলাম না আর বউ থেকে দূর থাকতে। '
কথাটা কর্ণগোচর হওয়া মাত্র চৈত্রিকা বুঝে উঠার পূর্বেই ওর অধর যুগল শুষ্ক ঠোঁট জোড়া দিয়ে আঁকড়ে ধরে সাফারাত। অকস্মাৎ হতভম্ব, বাকরুদ্ধ চৈত্রিকা। বক্ষস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে তাৎক্ষণিক। শিরা উপশিরায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেগে উঠে শিহরণ। সাফারাতের স্পর্শ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। গাঢ় রূপ নিচ্ছে। জীবনের প্রথম এই অনুভূতির সান্নিধ্য পেল চৈত্রিকা ও সাফারাত দু'জনেই। সাফারাত কোমরে চাপ প্রয়োগ করতেই চৈত্রিকা ওর গলা জড়িয়ে ধরল। সম্মতি পেয়ে আরো গভীরভাবে ঠোঁটের নেশায় মত্ত হলো সাফারাত। চৈত্রিকার চক্ষুদ্বয় মুদে আসে নিমেষে। পা উঁচিয়ে সাফারাত এর গলা আঁকড়ে ধরে আরো শক্ত করে,দু হাতে।

দরজায় করাঘাতের শব্দ কর্ণধারে পৌঁছাতেই সাফারাত ছেড়ে দিল চৈত্রিকাকে। বেজায় অতিরিক্ত বিরক্ত হলো সে। বিড়বিড় করে বললো,
' সবে মাত্র বউ এক ধাপ এগিয়ে এলো, আর অন্যদের ডিস্টার্ব করা শুরু হয়ে গেল। '
চৈত্রিকা সাফারাতের বিরক্তিসূচক, মৃদু রাগ মিশ্রিত এই বাক্য টা শুনতে পেল একদম ক্লিয়ার ভাবে। লাজুকলতা হয়ে নুয়ে রইল ও একপাশে। অন্তস্থলের ঢাকঢোল পিটানো থামছে না কিছুতেই। দরজা মেলতেই মিনা বললো,
' স্যার ভাবীর মা আর বোন আইছে। দিহান স্যার ও আইছে। '
' আচ্ছা আসছি আমরা। তুমি যাও। '
' মা ও মিমু এসেছে?চলুন নিচে যাই। '
সাফারাত তুখোড় দৃষ্টিতে তাকায় চৈত্রিকার মুখশ্রীতে। গম্ভীর স্বরে বলে,
' বাহ!আপনার তো দেখছি বাড়িতে যাওয়ার ভীষণ তাড়া। '

মুখটা পানসে, থমথমে হয়ে যায় চৈত্রিকার। আসলেই কি ভীষণ তাড়া?চৈত্রিকার মন অহর্নিশি সাফারাতের আলিঙ্গনে বেঁধে থাকতে চায়। কিন্তু মস্তিষ্কে হানা দেয় মায়ের চিন্তা, মিমের চিন্তা। ওদের ফেলে কিভাবে থাকবে,ওরা একা কি করে সামলাবে? এসব চিন্তা হয় বড্ড আজকাল চৈত্রিকার। সাফারাত সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
' চলুন। '
________________

ফাহমিদা ও মিম বসে আছে সোফায়। তাদের সম্মুখে বসে আছে সুফিয়া বেগম ও প্রিয়ন্তী। দিহান একপাশে বসে অপেক্ষা করছে সাফারাতের আগমনের। প্রিয়ন্তীর মা ধারে কাছেও আসে নি ওদের। কারণ তিনি সাফারাতের খুশিতে শামিল হতে রাজি নন। ফাহমিদা ভেবেছিলেন এতো বড় বাড়ির মানুষের সামনে এসে অস্বস্তিতে পড়তে হবে। কিন্তু এমন কিছুই হয় নি। সুফিয়া বেগম হেসে হেসে দিব্যি কথা বলে যাচ্ছেন। সামনের টেবিলে হরেক রকমের নাস্তা। দিহান একটা আপেলের টুকরো মুখে পুরে মিমের দিকে দৃষ্টি তাক করলো। মেয়েটা কলেজ থেকে এসে সাথে সাথেই আবার এখানে এসেছে। চোখে মুখে ক্লান্তির রেশ। দিহান প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বললো,
' তোমাদের বাসায় গ্লুকোজ আছে প্রিয়ন্তী?'
' আছে তো ভাইয়া? আপনি খাবেন?'
' আরে না। সাফারাত এর শালী সাহেবা কে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আই থিংক ওর জন্য এক গ্লাস গ্লুকোজের পানি হলে ভালো হয়। '
মিমের ভ্রুঁ যুগল কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয়ে এলো। সামনে মানুষ আছে বলে দিহান কে কোনো কথা শুনানোর চেষ্টা করলো না। এই লোক আজকাল ওকে বড্ড জ্বালাচ্ছে। প্রত্যেক দিন কলেজে নিয়ে যাওয়া,নিয়ে আসা,লেগ পুল করা যেন তার নিত্যকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মিম একটা জিনিস খেয়াল করেছে দিহান তাকে যতই ক্ষেপায় না কেন এসবের মাঝে ওর জন্য কেয়ার লুকিয়ে থাকে। ওর মন খারাপের কারণ, অসুস্থতা সবকিছু চট করে ধরে ফেলে দিহান। একজন সার্ভেন্ট এক গ্লাস গ্লুকোজ মিশানো পানি দিয়ে যেতে মিম খেয়ে নেয়। এখন ঢের সতেজ অনুভব করছে ও।

সাফারাত দ্রুত গতিতে নেমে এলো। তার পিছু পিছু চৈত্রিকা। মেয়েটা চরম অস্বস্তিতে ভুগছে। তার এই অস্বস্তির কারণ সাফারাত। কি দরকার ছিল ওকে এতো সময় রুমে বন্দি রাখার?ফাহমিদা মেয়েকে দেখে মিহি স্বরে কাছে ডাকলেন। সাফারাত গিয়ে বসে দিহানের পাশে। ফাহমিদা জিজ্ঞেস করলেন,
' কেমন আছো?'
' ভালো। আপনি কেমন আছেন?'
' এই তো ভালো। '
সাফারাত আর কিছুই বললো না। ফাহমিদাও আর কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। এই ছেলে এতো গম্ভীর কারোই আগ বাড়িয়ে বলার মতো কিছু থাকে না। সুফিয়া বেগম বললেন,
' যাক এবার আসল কথায় আসি। বিয়েটা যেহেতু হয়ে গিয়েছে আমি চাই চৈত্রিকা আজ বাদে কাল ওর স্বামীর সংসারে, ওর নীড়ে চলে আসুক। '

চৈত্রিকা চমকে উঠে। ওর চলে আসতে হবে মা ও মিম কে ছেড়ে?ফাহমিদার মনটা খারাপ হয়ে যায়। যতই আগে চাইত চৈত্রিকার একটা সুখের সংসার দেখে যেতে কিন্তু মেয়েকে বিদায় দেওয়ার কথা ভাবলেই দম বন্ধ হয়ে আসে উনার। তবুও বাধ্য হয়ে সুফিয়া বেগমের কথায় সম্মতি জানায়।
' তাহলে অনুষ্ঠানের ডেট ঠিক করা হোক। '
সুফিয়া বেগমের কথা কটাক্ষ করে সাফারাতের গম্ভীর,তেজি কন্ঠস্বর।
' কোনো অনুষ্ঠান হবে না দাদি। পরশু দিন আমি গিয়ে আমার বউ নিয়ে আসব। কোনো অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। '

চৈত্রিকাদের বর্তমান অবস্থা ভালো না। অনুষ্ঠান করার মতো এবিলিটি এখন ওদের নেয়। সাফারাত এর কাছ থেকে কোনো প্রকার হেল্পও নিবে না অতিরিক্ত আত্মসম্মান প্রিয় ওর অর্ধাঙ্গিনী চৈত্রিকা। তা ভালোভাবেই জানা ওর। তাই অনুষ্ঠানের বিষয়টা অগ্রাহ্য করে। সুফিয়া বেগম কিছু বলতে নিলে আবারও বলে উঠে,
' চাইলে আমার পরিবার যেতে পারে কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান হবে না। বউ আমার। বিয়ে করেছি আমি। অন্যদের দিয়ে কি হবে?'

সাফারাতের কথা শুনে সবার মুখে আকাশচুম্বী অবাকতা,বিস্ময়। ফাহমিদার এখন মেয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে। মেয়ের একদম বিপরীত চরিত্রের মানুষ মনে হচ্ছে সাফারাত কে। যেখানে চৈত্রিকা শান্তশিষ্ট সেখানে সাফারাত গম্ভীর, স্পষ্টভাষী,রগচটা। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সাফারাত। মিনাকে বললো সবার জন্য লাঞ্চ রেডি করতে। ফাহমিদা তড়িঘড়ি করে বললেন উনারা খাবেন না। তবুও সাফারাতের কাছে টিকে নি এই না সূচক কথাগুলো। বাধ্য হয়ে খেতে বসতে হয় উনাদের। সাফারাত বসে চৈত্রিকার পাশের চেয়ারে। প্রিয়ন্তীর বাবা ও মা আসেন। সুফিয়া বেগম ফাহমিদার পরিচয় করিয়ে দেন উনাদের সাথে। ইচ্ছা না থাকা সত্বেও ফাহমিদার সাথে কথা বলেন। চাচী প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও উনার স্বামীর জন্য বাধ্য হয়ে বলেন। প্রিয়ন্তীর বাবা বুঝে গেছেন সাফারাতের সাথে যত দূরত্ব বাড়াবে ততই পৃথক কে জেল থেকে বের করা কঠিন হবে। হাতের বাহিরে চলে যাবে সবকিছু।

মিনা চৈত্রিকার প্লেটে বড় একটা চিংড়ি মাছ দিতেই সাফারাত সেটা উঠিয়ে একটা বাটিতে রেখে দেয়। আদেশের সুরে বলে,
' চৈত্রর এলার্জি আছে। উনাকে চিংড়ি দিও না। '
ফাহমিদা ও মিম মনে মনে খুব খুশি হলেন চৈত্রিকার প্রতি সাফারাতের যত্ন দেখে। ছেলে যেমনই হোক চৈত্রিকার ক্ষেত্রে অত্যাধিক পসেসিভ। চৈত্রিকা ছোট ছোট লোকমা মুখে পুরে নিচ্ছে। সাফারাত যেই না মুখে খাবার তুলতে যাবে সদর দরজা দিয়ে আগমন ঘটে জেরিন ও তার মায়ের অর্থাৎ বড় ফুপুর। সাফারাত হাতের চামচ টা প্লেটে ফেলে দেয়। টুং করে আওয়াজ তুলল চামচ টা সামান্য উপর থেকে পড়ার দরুন। দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলে উঠল সাফারাত,
' এক পাগল বিদায় না করতেই আরেক পাগলের আমদানি। '

চলবে,,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 20 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন