ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুখের নেশায়

পর্ব 19

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
২৭+২৮
পর্ব___২৭

হলদে আলোর ছটায় চৈত্রিকার সদ্য পিটপিট করে খোলা চক্ষুদ্বয় নিমীলিত হয়ে আসছে বারংবার। চোখ দুটো জ্বালা করছে ভীষণ। কিছু সময় চেষ্টার ফলে আঁখিদ্বয় পুরোপুরি মেলতে সক্ষম হয়। প্রথমেই চোখে পড়ল বাঁশের সিলিং। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে হালকা আলোতে তার দিকেই নির্নিমেষ দৃষ্টি মেলে রেখেছে সিনথিয়া। চেহারায় অস্থিরতা, বিচলিতা। তাকে চোখ মেলতে দেখে যেন মুহুর্তেই সকল চিন্তা কেটে গিয়ে ঠোঁট প্রসারিত হলো। উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
' ঠিক আছিস চৈত্র? '

চৈত্রিকা নিরব,নিশ্চুপ। চোখ মেলে সিনথিয়ার মুখটা দেখে জ্ঞান হারানোর পূর্বের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। না চাইতেও সিনথিয়াকে অসহ্য লাগছে। একদমই সহ্য করতে পারছে না। কোন নারীই বা পারে নিজের স্বামীর জীবনে অন্য কোনো নারীর উপস্থিতি মেনে নিতে?হতে পারে চৈত্রিকা দ্বিতীয় তবুও সাফারাতকে কিছুতেই হারাতে পারবে না। হাজার প্রতি/শোধে ক্ষতবিক্ষত করুক চৈত্রিকার হৃদপিণ্ড তবুও চৈত্রিকা সাফারাতকে ভালোবাসা বন্ধ করবে না। এক চুলও নড়বে না সাফারাতকে ছাড়া। কিন্তু সাফারাত কোথায়?চৈত্রিকা সারাঘরে চোখ বুলিয়ে দেখতে পায় কাঠের আসবাবপত্র। ছোট একটা রুম। চৈত্রিকা বুঝতে পারে এটা চিলেকোঠার ঘর। হয়ত দূর থেকে কোনো মানুষ আসলে রাতে থাকার জন্য এই ঘরগুলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এই ঘরের আনাচে-কানাচেতে কোথাও সাফারাত নেই।

বুকে পাথর সমান ওজন অনুভব করছে চৈত্রিকা। নিজের অবুঝের মতো করা ভুলগুলো এতো ভারি পড়বে কখনও ভাবে নি সে। ভিতর টা আত্মচিৎকারে ফেটে যাচ্ছে। কি করে বুঝাবে ও সাফারাতকে?সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে প্রশ্ন করল,
' সাফারাত? '
' বাহিরে। '
চৈত্রিকা অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বললো- ' আমি উনার সাথে কথা বলতে চাই। '
' ঠিক আছে। '

সিনথিয়া দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যেতেই দরজা দিয়ে সাফারাতের প্রবেশ ঘটে। হালকা আলোয় সাফারাতের চোখের দৃষ্টি, মুখ টা দেখে চোখের কোল ভিজে উঠল চৈত্রিকার। এলোমেলো শাড়ি নিয়ে এক প্রকার লাফিয়ে বিছানা ছাড়ল। ঝড়ের বেগে হামলে পড়ল সাফারাতের বুকে। আকস্মিকতায় সাফারাত এক পা পিছিয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে চৈত্রিকার পিঠে হাত রাখল আলতো করে। স্পর্শ পেয়ে চৈত্রিকা ফুপিয়ে উঠল। সারা অঙ্গ,দেহ কাঁপছে কান্নার দাপটে। অনলের দহনে শরীরের প্রতিটা স্নায়ুকোষ, অন্তর,হৃদয় পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে। ভাঙা গলায়,অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠল,

' আপনি যত অত্যাচার করবেন,কষ্ট দিবেন,শাস্তি দিবেন সব মাথা পেতে নির্দ্বিধায় সহ্য করে নিব। কিন্তু আপনাকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে পারব না। কষ্ট আপনি দিবেন, আমি তা সুখ হিসেবে গ্রহণ করব। আপনার সান্নিধ্য ছাড়া আমার আর বেঁচে থাকা সম্ভব না। দয়া করে আমায় দূর করে দিবেন না। আমি,,আমি সিনথিয়াকেও মেনে নিব৷ শুধু আপনার থেকে দূর করবেন না আমাকে। '

চৈত্রিকা সাফারাতের টিশার্ট মুঠোয় পুরে আকুতি মিনতি করতে থাকে। বাবার পর এই একটা মানুষকে জীবনে সব থেকে বেশি ভালোবাসে। বাবার আদর তো কখনও পাওয়া হয় নি কিন্তু হাতের নাগালে থাকা এই সুখ যে পায়ে ঠেলে দেওয়া সম্ভব না ওর দ্বারা। লড়াই করতে করতে আজ বড্ড ক্লান্ত দেহ,মন,মস্তিষ্ক। সাফারাতের মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হলো না। আবারও কাতর স্বরে বলে উঠল চৈত্রিকা,

' আমি জানি আমি যা করেছি ক্ষমার যোগ্য না। আমি তো মরে গেলেও আপনার মা'র সম্মান ফিরিয়ে আনতে পারব না। আর না পারব উনার কাছে ক্ষমা চাইতে। অতীতের বিষাক্ত সেই স্মৃতি, ঘটনা টুকুও মুছে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আমি আগে বুঝতে পারি নি আপনাকে ভালোবাসি আমি সাফারাত। একদমই বুঝতে পারি নি। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল তাই চলে যেতে হয়েছে আমার। কয়েকদিন কলেজে আসতে পারে নি। আসার পর আপনার,সিনথিয়ার অনেক খোঁজ করেছি। কেউ কিছু বলতে পারে নি। শুধু জেনেছি আপনি কলেজ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সেদিন প্রথম উপলব্ধি করি আমি আপনাকে ভয়ংকর রকমের ভালোবেসে ফেলেছি। আপনাকে মনে মনে,বাস্তবে অনেক খুঁজে বেড়িয়েছি। অনেক। আমার এতগুলো বছর কেটেছে আপনার ও বাবার ভালোবাসা পাওয়ার আশায়। '

একনাগাড়ে পাগলের মতোন প্রলাপ করে যাচ্ছে চৈত্রিকা। সাফারাত কোমর জড়িয়ে শূণ্যে তুলে নিল। চৈত্রিকা থমকে গেল। স্তব্ধতায় ছেয়ে গেল মুখমন্ডল। চক্ষু হতে স্রেফ অবাধে জল গড়াচ্ছে। মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে যেন ভুলে গিয়েছে। শূন্য অবস্থায় বিছানায় এনে বসালো সাফারাত। এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর ও আদেশের সুরে বললো,

' কান্না থামান। '

চৈত্রিকা হাতের উল্টো পিঠে তড়িঘড়ি করে চোখ হতে গড়িয়ে ভিজিয়ে দেওয়া গাল দুটো মুছতে আরম্ভ করে। কিন্তু এতে নাকের পানি,চোখের পানি মিলেমিশে একাকার। সাফারাত হাত বাড়িয়ে টিস্যু দিয়ে যত্ন করে পুরো মুখ মুছে দেয়। চৈত্রিকা কাঁপা কাঁপা হাতে সম্পূর্ণ পানি খেয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। সাফারাতের মুখভঙ্গির পরিবর্তন হলো এবার। দু'হাতে মাথার চুলগুলো টেনে নিজের রাগ সংবরণ করে।

' অল্পতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন? শুনেই?আপনি কি আমার অবস্থা টা অনুভব করতে পেরেছেন চৈত্র? আমার বক্ষে তড়তড় করে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা যন্ত্রণা আঁচ করতে পারছেন?'

কথাটা বলেই চৈত্রিকার হাত টা টেনে নিজের বুকে রাখে সাফারাত। তাচ্ছিল্য স্বরে বলে,

' বছরের পর বছর ধরে যন্ত্রণায় ছটফট করছি আমি। আমার যন্ত্রণার কারণ কি জানেন?আপনাকে ভালোবেসে ফেলা। '

চৈত্রিকা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো। প্রতি/শোধ শব্দটা মুহুর্তেই চাপা পড়ে গেল সাফারাতের শেষোক্ত বাক্য কর্ণপাত হতেই। সাফারাতের ভালোবাসা সত্য। চৈত্রিকার মন কিছুক্ষণ আগে ভেঙে গেলেও সে বিশ্বাস হারায় নি সাফারাতের ভালোবাসার উপর থেকে। ওর তখন মনে হয়েছে, এখনও মনে হচ্ছে সাফারাত যদি ওর খু'ন ও করে ফেলে শেষ নিঃশ্বাস ফেলা অব্দি বিশ্বাস হবে না চৈত্রিকার। এটা কি অন্ধ বিশ্বাস! হ্যাঁ। সুখের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে মাঝে মাঝে অন্ধবিশ্বাসে ডুবে যায় আমরা। লাভ, ক্ষতি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। চৈত্রিকা মুখ ফোটে কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই সাফারাত মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল,

' ইয়েস চৈত্র মাস। আই ফল ইন লাভ উইথ ইউ এন্ড ব্যাডলি নিডেড ইউ অলসো। আই কান্ট লিভ উইথআউট ইউ। বিকজ ইউ আর মাই হ্যাপিনেস। আমার সুখ আপনি। আপনাকে ঘৃণা করে দেশ ছেড়েছি। মনের গহীনে চিরতরে চাপা দিয়েছি বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কিন্তু কলেজ জীবনের শুরু থেকেই আপনার প্রতি ঝুঁকে ছিল মন। দুর্বল ছিল। যেটা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাই নি। যখন বুঝতে পারলাম তখন আমি আপনার থেকে অনেক দূরে। আমার মন জুড়ে আপনার প্রতি প্রতি/শোধের অনল দাউদাউ করে জ্বলছিল সেই মুহুর্তে। চাপা পড়ে যায় প্রেমের অনুভূতি মায়ের চোখের জলের সামনে। শত হোক আপনি দোষী ছিলেন চৈত্র। আমার প্রতিবার না করা সত্ত্বেও সিনথিয়া কে আমার কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছেন। জানেন নিজের আবেগ, অনুভূতি প্রথম প্রথম দমিয়ে রাখতে বেশ কষ্ট হত আমার।

আম্মুকে কয়েকবার বলেই ফেলেছি আমার চৈত্র কে চায়। মায়ের মন তো হাসিমুখে বলেছে জার্মানি থেকে ফিরেই আমি আপনাকে চোখের সামনে দেখব। দিন কয়েক কেটে যাওয়ার পর সেদিনের সেই তিক্ত, জঘন্য ঘটনা টা সারাক্ষণ আমার মাথায় চেপে বসে থাকত। দম বন্ধ হয়ে আসত আমার। প্রতি বার আপনাকে মে/রে ফেলার স্পৃহা জাগত। পারিবারিক এবং বিভিন্ন কারণে আমার মাঝে একবার দেশে ফেরা হলেও আবার কয়েকদিন বাদে ফিরে যেতে হয় জার্মানি। নিজেকে ততদিনে, বছরে আমি সম্পূর্ণ রূপে পরিবর্তন করে ফেলি। আশ্চর্য হয় প্রথমে নিজের আমূল পরিবর্তন দেখে। এতগুলো বছর পর ফিরে সিলেটে যায় আপনার খুঁজে। গিয়ে জানতে পারি ঢাকাতে থাকেন আপনারা। খুঁজে বের করা আমার জন্য কঠিন কিছু ছিল না। আপনার ফ্যামিলির অবস্থা সম্পর্কে জানতেও আমার সময় লাগে নি। তার মধ্যে জানতে পারি আপনার এখনও বিয়ে হয় নি। তখনই মাথায় আসে সেদিনের হিসেব-নিকেশ টা নাহয় অন্য উপায়ে করা হোক। আপনার জন্য মনে বহু বছর আগে জন্ম নেওয়া প্রেম পুনরায় জেগে উঠে। তা চেপে রেখে মিথ্যে ভালোবাসা দেখিয়ে প্রেম নামক বন্ধনে জড়িয়ে আপনাকে নিঃশেষ করে দেবার বহু কল্পনা করি। কিন্তু দিনশেষে আমি হেরে গেছি চৈত্র। যাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসি তাকে আঘা*ত করার মতো শক্তি, সাহস আমি পাচ্ছিলাম না। পারছিলাম না আপনাকে দিনের পর দিন কষ্টে দেখতে। ভালোবাসার শক্তি এতই অধিক ছিল যে প্র/তি/শো/ধ, আঘা/ত এসব নিরর্থক, অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সাফারাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চৈত্রিকার মায়াভরা মুখশ্রীর দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে,

' আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি আপনাকে ভালোবাসলে কেন আবার এসব বললাম?আমি আপনাকে কষ্ট, আঘা/ত দিতে চেয়েছি এগুলো লুকিয়ে গেলেও পারতাম তাই না?'

মাথা দুলাল চৈত্রিকা নিরব ভঙ্গিতে। সাফারাত ঠোঁট কামড়ে চোখ বুঁজে চৈত্রিকার হাতে ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিল গভীরভাবে। দমকার হাওয়ার ন্যায় কিছু একটা চৈত্রিকার বক্ষস্থল ঠান্ডায় কাঁপিয়ে তুলল। শোনা গেল সাফারাতের দৃঢ় কন্ঠস্বর।

' আমাদের একদিন না একদিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। কয়েকদিন আগেও আমি আপনার কাছে আসতাম প্রতি/শোধ নেওয়ার ভাবনা নিয়ে,নিজের ভালোবাসা একপাশে চেপে রেখে। আপনার বাবার মৃত্যুর দিন আমার মনে উদয় হয় আমি কাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করছি যে কি-না নিঃশেষ হলে আমার নিঃশেষ হওয়া নিশ্চিত। আপনার বাবার মৃত্যুর দিন প্রকাশ করেছিলেন আমার প্রতি আট বছর দূরে থাকা,বন্ধুত্ব ভেঙে কিছু না বলে চলে যাওয়ার অভিমান। আমি আজ যদি সবটা ক্লিয়ার করে না বলতাম সব তো ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন হয়ে থেকে যেত। আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার পর একটা সময় হয়ত আপনি জানতে পারতেন আমি আপনাকে হার্ট করার পরিকল্পনা করেছি তাতে আপনি ভেঙে কাঁচের ন্যায় তচনচ হয়ে পড়তেন। আমি আপনাকে হারাতে চাই না চৈত্র। তাই আমাদের এক হওয়ার আগে সবটা খোলাসা করতে চেয়েছি আমি। আপনি চাইলে আমাকে শাস্তি দিতে পারেন। সহ্য করে নিব। কারণ,আপনাকে ভালোবাসার পাল্লা টা ভীষণ ভারি চৈত্র। '

চৈত্রিকা প্রচন্ড অবাক হলো। বিমূঢ়তায় বাক হারা হয়ে পড়ে। যেই মানুষটাকে ও কষ্ট দিয়েছে নিজের করা বোকামির জন্য সেই মানুষটা উল্টো শাস্তি দিতে বলছে। ঠোঁট দুটো নাড়ানোর চেষ্টা করল। ভাঙা গলায় দুরুদুরু বুক নিয়ে প্রশ্ন করল,

' সেদিন সিনথিয়ার সাথে আপনার বিয়ে হয়েছিল?'

চৈত্রিকা প্রশ্ন টা করতে চায় নি। কিন্তু না করেও থাকতে পারছিল না। সিনথিয়ার তো কোনো দোষ নেই। যদি ও সাফারাতের প্রথম স্ত্রী হয়ে থাকে ওর পায়ে ধরে হলেও সাফারাতের জীবনে একটুখানি জায়গার জন্য অনুরোধ করবে।
' উঠুন। '
চৈত্রিকা বিনা বাক্যে উঠে দাঁড়ায়। দ্বিরুক্তি করে না। সাফারাত এগিয়ে এসে শাড়িটা ঠিক করে দেয়।
' মনে হচ্ছে আপনার স্বামী বিয়ে করে ফেলেছে। সতীনের অত্যাচারে
অবস্থা বিধস্ত। একটু ঠিকঠাক হন। আমরা বাহিরে যাবো। '
এমনই তো। চৈত্রিকা মনে মনে এটা আওড়ালেও মুখে অস্ফুটস্বরে বললো,
' কিন্তু! '
' নো মোর ওয়ার্ডস। আমি ফিরিয়ে প্রশ্ন করা পছন্দ করি না চৈত্র। '

কিছুটা ঠিক হতেই সাফারাত হাত ধরে বাহিরে নিয়ে এলো। সামনের দিকে তাকাতেই চক্ষুূ দু'টো চড়কগাছ চৈত্রিকার। সিনথিয়া একটা ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। ছেলেটাকে বিদেশি মনে হচ্ছে চৈত্রিকার। বিদেশি দের মতো গায়ের রং অত্যাধিক ফর্সা, চুলগুলো ব্রাউন কালার। চৈত্রিকা আঁড়চোখে সাফারাতের দিকে তাকালো। সাফারাতের চোখে রাগের আভাস মাত্র নেই। ফর্সা মুখটা একটুও লাল বর্ণ ধারণ করে নি। মুখের ভাব নিরলস ও স্বাভাবিক। সিনথিয়া ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে সরে এলো। লজ্জায় নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইল। বিদেশি সেই ছেলেটা এগিয়ে এসে সাফারাতকে জড়িয়ে ধরে। চৈত্রিকার দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলে উঠল,
' হাই ভাবী। আমি আয়ান। সাফারাতের কাজিন ও সিনথিয়ার হাসবেন্ড। '
চৈত্রিকা সাফারাতের হাত টা খামচে ধরল শক্ত করে। সিনথিয়া সাফারাতের বউ না?আয়ানের বলা কথাটা বার বার কানে বাজছে তার। সাফারাত একহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল ওকে। লজ্জায় গুটিয়ে গেল সে। সিনথিয়া ততক্ষণে হাসিমুখে আয়ানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
' কি ভেবেছিলি আমি সাফারাতের বউ?'
চৈত্রিকা মাথা উপর নিচ করে। সিনথিয়া আয়ানের হাত টা আঁকড়ে ধরে বলে,

' উহু!আমি তো আয়ান জামানের বউ। সেদিন সাফারাত আমাকে বিয়ে করতে কোনো ক্রমে রাজি হয় নি। তাছাড়া সাফারাতের মা'র পুরো বিশ্বাস ছিল ঘটনা টা সবার দেখার ভুল। তিনি বুদ্ধি করে বলেন এতো কম বয়সে বিয়েটা ঠিক হবে না। আন্টি আমার পরিবারকে কথা দেয় বিয়ের সময় হওয়া অব্দি আমার দায়িত্ব নিবেন। সময় হলে আমার সাথে সাফারাতের বিয়ে হবে। আমার পরিবার রাজি হলেও এলাকার কয়েকজন মানুষ রাজি হন নি। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ তো টাকার লোভী। বাধ্য হয়ে আন্টি মোটা অংকের টাকা দিয়ে দমাতে হয় তাদের। তাছাড়া কলেজের টিচার রা কলেজের সম্মান রক্ষার্থে কথাটা ছড়াতে দেয় নি। রাতের আঁধারে আমাদের কয়েকজনের মধ্যেই সেই ভয়ংকর ঘটনা টা চাপা পড়ে যায়। একটা কাকপক্ষীও টের পায় না। আয়ানের সাথে আমার দেখা জার্মানিতে। আন্টি আমাকে সাফারাতের সাথে পড়তে পাঠায় জার্মানি। ওইখানেই উনার চাচাতো বোনের ছেলে মানে সাফারাতের খালাতো ভাই আয়ানের সাথে পরিচয় হয় আমার। আয়ানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমি বুঝতে পারি সাফারাতের প্রতি যা ছিল তা কেবল মোহ। ফ্যামিলির বিপক্ষে গিয়ে আমি আয়ানের কাছে বিয়ে বসি। এতো বছরে তোর সাথে অনেকবার দেখা করতে চেয়েছি চৈত্র কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার জন্য বাংলাদেশ আসতে পারি নি। আমি এটাও জানতাম না সাফারাত সেদিনের ঘটনাকে পুষে রেখেছে মনে দিনের পর দিন। এত বছর পর যখন বাংলাদেশ এসে সাফারাতের কাছ থেকে জানলাম তোর খোঁজ পেয়েছে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। প্রথমেই দেখা করতে চাই কিন্তু সাফারাত দেয় নি। প্রায় একমাস হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে আসার। সাফারাত আমার কাছে সবটা খুলে বলে। এটাও বলে তোকে আঘা/ত করতে যেয়ে আরো তীব্র ভালোবেসে ফেলেছে। ও পারে নি তোকে বিন্দুমাত্র কষ্ট দিতে। তুই ভাগ্যবতী চৈত্র। সবাই অভিনয় করে চরম ভাবে ঠকাতে পারে,কিন্তু অভিনয় করতে গিয়ে ভালোবেসে পরাজিত হয়ে আসে খুব কম অভিনেতা। '

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
পর্ব___২৮

রাতের কালো অম্বর হুট করেই গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ডেকে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে বজ্রপাতের আওয়াজ তরঙ্গিত হতেই চৈত্রিকার পুরো শরীর নড়ে উঠল। দেহের প্রত্যেক ভাঁজে ভাঁজে কম্পন ছড়িয়ে পড়ল তৎক্ষনাৎ। সাফারাত পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে উত্তেজিত সুরে বলে উঠল,
' ঠিক আছেন আপনি চৈত্র? জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?সরে আসুন। '
চৈত্রিকা কম্পায়মান স্বরে প্রতুত্তর করে,
' ঠিক আছি আমি। অস্থির হবেন না।'
' পাগল বানিয়ে বলবেন অস্থির হবেন না। সেটাও শুনতে হবে আমার?'
সাফারাত গম্ভীর স্বরে কথাটা বলতেই চৈত্রিকার অধরযুগলে মৃদু হাসি খেলে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে মাথা উঁচিয়ে তাকালো সাফারাতের দিকে। আচ্ছা সাফারাত কি শুনতে পাচ্ছে ওর বুকের দ্রিম দ্রিম শব্দ? বজ্রপাতের আওয়াজে চৈত্রিকা কেঁপেছিল সামান্য এবং ক্ষীণ। কিন্তু সাফারাতের স্পর্শ,ছোঁয়া, আলিঙ্গন প্রকটভাবে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ,হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে তুলছে। শরীরে,গালে তীব্র উত্তাপ অনুভব করছে চৈত্রিকা। অকস্মাৎ তাপমাত্রার বেড়ে যাওয়ার ফলে কি সাফারাত দায়ী?হৃদস্পন্দন তড়িৎ বেগে স্পন্দিত হচ্ছে। কোনো মতেই স্বাভাবিক হওয়ার নাম নিচ্ছে না।

চৈত্রিকার শাড়ি ভেদ করে উন্মুক্ত কোমরে হাত দু'টো শক্ত করে চেপে সাফারাত আরো কাছে টেনে নিল। হলদে আলোতে অমায়িক লাগছে তার বুকে অবস্থিত মেয়েটার ফর্সা মুখশ্রী টা। ওষ্ঠদ্বয় কেমন কাঁপছে। নড়বড়ে করে দিচ্ছে সাফারাতের সমগ্র সত্তাকে। শক্ত মনের সাফারাত যেন নিমিষেই দুর্বল হয়ে পড়ে চৈত্রিকার সন্নিকটে। চৈত্রিকা নরম স্বরে প্রশ্ন করে,
' সিনথিয়া,আয়ান কোথায়?'
' রোমান্স করছে। বাহিরে বৃষ্টির আগমনি বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতিতে, সেই সাথে মন বার্তা দিচ্ছে রোমান্সের। আপনার কি ওদের রোমান্স করা সহ্য হচ্ছে না চৈত্র? আপনি চাইলে আমি আপনাকে নিয়ে প্রেমময় পুকুরে ডুব দিতে পারি। '
সাফারাতের তীক্ষ্ণ কন্ঠে এহেন কথা শুনে চৈত্রিকা থমকে গেল। চরম লজ্জা অনুভূত হলো ওর। নিজেকে সামলাতে সাফারাতের বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরে নত মস্তকে বলে উঠল,

' শুনুন। '
সাফারাত কোমরের বাঁধন শিথিল করে গভীর দৃষ্টিতে চৈত্রিকাকে পর্যবেক্ষণ করে বললো,
' বলুন। '
' একটা প্রশ্ন করতে চাই সাফারাত। আসলে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি আপনি বিরক্ত না হন, অনুমতি দেন তবেই করব। '

আমতা আমতা করে বলে চৈত্রিকা। সাফারাত চকিতে তাকালো। অনিমেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখতেই চোখে বিঁধে চৈত্রিকার চেহারায় ভয় ভয় ভাব। হয়ত সাফারাত রেগে যাবে ভেবে মেয়েটা ভিতরে ভিতরে ভয় পাচ্ছে। পুরুষালি ভরাট কন্ঠটা নরম করে অত্যন্ত আদরমাখা স্বরে বলে উঠল,
' করতে পারেন। '

একটু আগেই চৈত্রিকা, সিনথিয়া,আয়ান সকলে খাবারের পার্ট চুকিয়ে চিলেকোঠার ছোট ঘর টায় এসেছে। সিনথিয়া ও আয়ান একসাথে বাহির টা একটু ঘুরে দেখবে বলে রেস্ট নিতে আর ভেতরে আসে নি। ঘরের ভিতরে আসার পর চৈত্রিকার মস্তিষ্ক নানা প্রশ্নে জমে গেল। মনটা প্রচন্ড অনুশোচনায় ভুগছে। সাফারাত ও তার মাকে ওর জন্য অপমানিত হতে হয়েছে ভাবলেই চৈত্রিকার বুক টা ফেটে যাচ্ছে। চক্ষু কোটর জলে টুইটুম্বুর হয়ে উঠছে। মনে মনে পণ করেছে চৈত্রিকা সাফারাতকে সর্বোচ্চ সুখ দিবে ও। ভয়ংকর ভাবে ভালোবাসবে। কলংক মুছে দেওয়া যায় না তবে ঢেকে দেওয়া যায়। নতুনভাবে সুখে ভরিয়ে দেওয়া যায় মানুষের জীবন। তা-ই করবে ও। চৈত্রিকা মায়াময়,রিনঝিনে স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সামনের বলিষ্ঠ পুরুষের নিমিত্তে।

' দিহান ও ওর মা যে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল তাতে আপনার সম্মতি ছিল?আপনি আগে থেকে জানতেন?'
সাফারাত স্বাভাবিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। চৈত্রিকার নেত্রে প্রবল আগ্রহ,উদ্দীপনা উত্তর জানার জন্য। তাৎক্ষণিক নির্লিপ্ত জবাব তার।
' জানতাম না। '
' মানে?'
' অফিসে ছিলাম। দিহান হঠাৎ ফোন করে জানায় তার সাথে জরুরি এক জায়গায় যেতে হবে। পরে গিয়ে দেখি আপনাদের বাসা। প্রথমে চমকে যায়। পরমুহূর্তে আন্টির কাছ থেকে জানতে পারি পাত্রী দেখতে এসেছে এখানে। আমি তখন অবাকের সর্বোচ্চ সীমায়। দিহান ও আন্টিকে কিভাবে দমাবো বুঝতে পারছিলাম না। আন্টির কাছ থেকে বায়োডাটা নিয়ে বলি আপনি ভালোভাবে মেয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন আন্টি। তৎপরে উনি বলে মেয়ের বয়স একটু বেশি। মন তো মানছে না তবুও এক পলক দেখে আসি। তাতে যা বুঝার বুঝে গেলাম। আন্টি আর যা-ই হোক আপনাকে পুত্রবধূ বানাবেন না। কারণ উনার স্বভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত আমি। উনি ঠিক পাশের বাসার আন্টিদের মতো। '
চৈত্রিকা কটাক্ষ করে বললো,
' পাশের বাসার আন্টি মানে?'
সাফারাত চৈত্রিকার মাথায় হাত রেখে বলে,
' আপনাকে বেশি বেশি শাকসবজি, বাদাম,মাছ,দুধ,ডিম খাওয়াবো যেন বুদ্ধি হয়। মাথামোটা মেয়ে। পাশের বাসার আন্টি বুঝেন না?যাদের স্বভাব অন্যের সংসারে ঘাটাঘাটি করা। সমালোচনা করা। মেয়েদের বিয়ে না হলে অথবা বেশি বয়স হলে তিরস্কার করতে করতে নাওয়া খাওয়া ঘুম ছেড়ে দেওয়া। এমন টাইপ আরকি!দিহানের মা'র স্বভাবও ঠিক তেমন। '

সাফারাত চৈত্রিকাকে বুঝাতে বুঝাতে হাঁপিয়ে গেল। মুখে বিরক্তভাব স্পষ্ট ও অতীব। অতিরিক্ত কথা বলা তার ধাঁচে নেই। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে চৈত্রিকা কে বুঝাতে মাঠে নেমে পড়ল সে। চৈত্রিকা যেন এবার চট করে বুঝে নিল। মাথা দুলিয়ে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
' বুঝেছি। '
' ধন্যবাদ আপনাকে মিসেস চৈত্র। বুঝে আপনি সাফারাত এহমাদ কে ধন্য করেছেন। '
চৈত্রিকা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল সাফারাতের কথায়। সাফারাত বুঝি উপহাস করল তাকে নিয়ে?
' যা-ই হোক। আমি সেদিন অনেক বছর পর প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলাম আপনার। আপনি জানেন চৈত্র আমি আপনার ব্যাথায় বারংবার ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলা দাগ পড়ে যাওয়া হাত টা দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম প্রায়? আমার ইচ্ছে করছিল আমি আপনাকে ছুঁয়ে দিই। আপনার সকল ব্যাথা নিজের মধ্যে কেঁড়ে নেই। আঁড়চোখে আমি সারাটা সময় শুধু আপনাকেই পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার ভাবনায় ছিল আন্টি বিয়েটা নাকচ করে দিবে কিন্তু ওইভাবে অপমান করবে আমি কল্পনাও করি নি। একদম অপ্রত্যাশিত ছিল চৈত্র। আপনাকে কষ্টে দেখার ক্ষমতা আমার নেই। কেবল আমি জানি কত কষ্টে আন্টির সেই কটু বাক্য হজম করে নিজেকে সামলিয়েছি। '

সাফারাত এটুকু বলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা ঝমঝম আওয়াজ তুলছে। তীক্ষ্ণভাবে তা কর্ণ গহ্বরে প্রবেশ করছে দু'জনের। সেই সাথে চৈত্রিকা পুনরায় শুনতে পেল সাফারাতের গম্ভীর স্বর।

' সেদিন আপনার হাতে আঘাতের কারণ কি আপনার বাবা ছিলেন চৈত্র? আমি খেয়াল করেছি আপনি ঘাবড়াচ্ছিলেন, ভয় পাচ্ছিলেন আপনার বাবাকে। '

' বাবা!' এই শব্দটা চৈত্রিকার অভ্যন্তরে ঝড় তুলল। সাফারাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল চৈত্রিকা। বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে দিল না চাইতেও। সাফারাত বাহুবন্ধনে শক্ত হাতে আবদ্ধ করে জানাল,

' মানুষ একটা সময় বুঝতে পারে নিজের ভুল। কিন্তু স্বভাব ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে না। অভিমানের পাল্লায় সিক্ত হয়ে মানুষ জীবনে যেই ভুল টা করে বসে তা অনেক সময় সংশোধন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আপনার বাবার কাছেও হয়ত কঠিন ছিল। চেয়েও শেষ সময়ে হয়ত সংশোধন করতে পারেন নি। '

অবাক নেত্রে তাকালো চৈত্রিকা। সাফারাত কি বলছে এসব?এসবের অর্থ কেন উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছে না ও?কোনো প্রশ্ন করার আগেই সাফারাত তাড়া দিয়ে বলে উঠল,

' থাকবেন না-কি আজ এখানে?থাকলে কিন্তু একদম ছাড়ব না। বিয়ে করেছি অথচ বাসর টা কিন্তু এখনও বাকি। আপনি চাইলে আজ হয়ে যেতে পারে। '

চৈত্রিকার পেট মোচড় দিয়ে উঠল মুহুর্তেই। চোখের দৃষ্টি এদিক ওদিক করতে লাগল অনবরত। সাফারাতের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। চৈত্রিকার রক্তিম গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,

' একটা ছাতার ব্যবস্থা করেছি। চলুন। আর সিনথিয়ারা চলে গেছে। ওর ছেলে আবার মাকে বেশিক্ষণ দেখতে না পেলে তুফান করে ফেলে। '
হতবাক হয়ে পড়ল চৈত্রিকা।
' সিনথিয়ার ছেলে আছে?'
' ছয় বছরের। আপনার সাথে ওর মিট করাবো ইনশাআল্লাহ। '
.
.
এক ছাতার নিচে কি দু'জন আঁটে?তাও সাফারাতের মতো বলিষ্ঠ,সুঠাম দেহের পুরুষ থাকলে?চৈত্রিকা যেন না ভিজে সাফারাত সম্পূর্ণ দেহ ছাতার বাহিরে রেখে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর কোমল দেহ টা রক্ষা করে উপরে ছাতা ধরে। চৈত্রিকা অনেকবার বলার পরেও সাফারাত জানায় ও ভিজতে অভ্যস্ত। কিন্তু তা মিথ্যে কথা। নয়ত চৈত্রিকা রাজি হত না। মেয়েটার ছোট বেলায় একবার নিউমোনিয়া এসেছিল। এটা সাফারাতের জানা। তাই কোনো মতেই ভিজতে দেওয়া যাবে না ওকে। গাড়ির দরজা খুলে বসিয়ে দিল সাফারাত চৈত্রিকাকে। তন্মধ্যে ভিজে সে চুপচুপে। সাদা শার্ট গায়ের সাথে মিশে গেছে একদম। চোখ মুখ, নাক লাল হয়ে গিয়েছে।

প্রায় কয়েক ঘন্টায় লম্বা রাস্তা অতিক্রম করে চৈত্রিকারা ঢাকা পৌঁছাল। অবাক করা ব্যাপারে এখানে কোনো বৃষ্টি নেই। ছিটেফোঁটাও নেই পানির। গাড়ি চালানোর সময় বাতাসে সাফারাতের শার্ট কিছুটা শুকিয়ে গেছে।
গেইটের সামনে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল চৈত্রিকা। পিছু পিছু নামল সাফারাত। সাফারাতের দিকে এক পলক চেয়ে চৈত্রিকা আসি বলেও থেমে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে বিচলিত নয়ন নিক্ষেপ করে সাফারাতের মুখ পানে। এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায় সাফারাত। চৈত্রিকা সময় নেয় না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে লাফ দিয়ে সাফারাতের গলা আঁকড়ে ধরে। হতভম্ব, বিস্মিত হয়ে পড়ে সাফারাত। নরম দেহটা আঁকড়ে ধরতেই পা দুটো উঁচিয়ে কপালে ভালোবাসার প্রথম পরশ একেঁ দেয় চৈত্রিকা। উম্মাদ করে তুলে সাফারাতকে। নিমেষে হাতের বাঁধন তীব্র থেকে তীব্র কঠিন করে বলে,

' যেতে দিতে ইচ্ছে করছে না আর চৈত্র মাস। '
_______________

আজ সকাল সকাল অফিসে চলে আসে চৈত্রিকা। গত রাতে সাফারাতকে অনেক বুঝিয়ে বাসায় যাওয়ার সুযোগ পায় ও। সাফারাত যেন গতরাতে অতিরিক্ত জেদী ও একরোখা হয়ে গিয়েছিল। চৈত্রিকার অসহায় দৃষ্টিতে শেষমেশ ছাড়তে বাধ্য হয় সে। তবুও বাসায় গিয়ে অনেক রাত অব্দি কথা বলতে হয় ফোনে সাফারাতের সাথে। ঘন্টা পেরিয়ে যেতেই সাফারাতের গম্ভীর সেই চিরপরিচিত স্বর অন্যরকম ঠেকছিল। কেমন যেন কথাগুলো কন্ঠনালিতে জড়িয়ে আসছিল। চৈত্রিকার মনে হচ্ছে সাফারাত অসুস্থ। সকাল বেলা অনেক ফোন করেও পাওয়া যায় নি তাকে। তাই অফিসে এসেছে কি-না দেখার জন্য তাড়াতাড়ি এসে হাজির হলো। এসেই দেখে মোনা নিজের হাত ব্যাগ নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল চৈত্রিকা মোনার কাছে। তড়তড় করে উচ্চারণ করে,

' গুড মর্নিং ম্যাম। '
মোনার চোখে ক্ষোভ। মুখে বললো,
' বেড মর্নিং। আমি স্যারের বাসায় যাচ্ছি। তুমি আমার ডেস্কের ফাইলগুলো গুছিয়ে পিয়ন কে দিয়ে স্যারের বাসায় পাঠিয়ে দিও।'
' কেন?'
না চাইতেও চৈত্রিকার মুখ দিয়ে প্রশ্নটা বেড়িয়ে এলো। নিজের উদ্বিগ্নতা চেপে রাখতে পারছে না। মোনার ভ্রুঁ যুগল কিঞ্চিৎ ললাট ছুঁয়ে দেয়। সন্দেহের তীর মেরে বললো,
' স্যারের জ্বর। ভীষণ সিক তিনি। কিন্তু তুমি এতো উদগ্রীব কেন?'
সাফারাতের জ্বর?চৈত্রিকার মনে হলো কেউ ওর অন্তস্থলে ছুরি আ/ঘা/ত করেছে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
' এমনি। '
মোনার সন্দেহ গেল না। চৈত্রিকা কে একটা শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে জাগে মনে। হতে পারে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। এই মেয়েকেও সাফারাতের আশেপাশে দেখতে হবে না। মুখে মেকি হাসি টেনে বলে উঠল,
' এক কাজ করো। ফাইল গুলো নিয়ে এসো। তুমিও যাবে আমার সাথে। '

চলবে,,,!

(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 19 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন