সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
৩৩+৩৪
পর্ব___৩৩
চৈত্রিকার চোখ ধাঁধিয়ে আসছে। পল্লব ঝাঁকিয়ে অভিভূত দৃষ্টি মেলে ধরে সামনের দিক। সুন্দর মানুষ শুভ্র রং পরিধান করলে ঠিক কেমন লাগে তার ব্যাখা দেওয়ার ক্ষমতা নেই চৈত্রিকার। মানস্পটে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত শব্দের অভাব। বড্ড অভাব। সাফারাতের গায়ে জড়ানো শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি দেখে ওর হিচকি উঠছে রীতিমতো। সিনথিয়া পানির গ্লাস নিয়ে ওর মুখের সামনে ধরল। একটুখানি পান করে পুনরায় সাফারাত এর দিক দৃষ্টি জ্ঞাপন করল চৈত্রিকা। সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পায় পুরুষালি গম্ভীর, ব্যগ্র স্বর।
' আপনি ঠিক আছেন চৈত্র? '
অভ্যন্তরের রণঢাকের আওয়াজে চৈত্রিকা নিজেই অতিষ্ট,বিরক্ত। সমস্ত বক্ষস্থল জুড়ে নিদারুণ কম্পন। শরীরের প্রত্যেক ভাঁজে শিহরণ। চোখ দুটো বেহায়ার ন্যায় কেবল সাফারাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কন্ঠনালি জড়িয়ে আসছে। উফ!এই পরিপক্ব বয়সে এসে কোনো পুরুষের ধারালো রূপে কপোকাত হওয়ার ব্যাপারটা চৈত্রিকার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। নিজেকে কিশোরী বয়সের, আবেগি সেই চৈত্রিকার সাথে মিলিয়ে, গুলিয়ে ফেলছে ও। ব্লাশ দেওয়া কপোল দু'টো লজ্জায় দ্বিগুণ লাল বর্ণে ছেয়ে গেল। মাথা নাড়িয়ে জানালো ঠিক আছে। তবে সাফারাত ভ্রুঁ উঁচিয়ে এক দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে আছে। যা দেখে থতমত খেয়ে যাওয়ার অবস্থা চৈত্রিকার। দ্রুতপদে চক্ষুদ্বয় নামিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ করে ও।
সাফারাত একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে একদম সমুখ বরাবর এবং নিকটে বসে। নত মস্তকে ঝুঁকে থাকা চৈত্রিকার দিকে চাইতেই অধর কার্নিশ ক্ষীণ বাঁকা হয় তার। সিনথিয়া হাত নেড়ে বলে,
' কি জামাই সাহেব? আমার ছেলে কোথায়?'
সাফারাত চৈত্রিকার দিকে নজর রেখেই রাশি ভারী কন্ঠে প্রতুত্তরে জানায়,
' এক নম্বর পেয়েছে তোমার ছেলের আসার সাথে সাথেই। আয়ান নিচে নিয়ে গেল। আসছে বোধ হয়। '
' তুমি মামা হয়ে আমার ছেলেটা কে এক নাম্বার করিয়ে আনতে পারলে না?কষ্ট করে আবার আমার জামাই টাকে পাঠালে। বউ দেখার এতো তাড়া? আমরা কি তোমার বউ গিলে খেয়ে ফেলব?'
' উনাকে গিলে তোমরা হজম করতে পারবে না। কারণ উনাকে হজম করার ক্ষমতা শুধু আমার। অযথা শক্তি ব্যয় করবে না আমি জানি। '
সাফারাতের কথা শুনে হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ে পুরো ছাঁদে। চৈত্রিকা ভীষণ অবাক হয়। সময়ের সাথে সিনথিয়া ও সাফারাত এর সম্পর্ক কি সুন্দর একটা রূপ নিয়েছে!দু'জন যেন ভাই-বোন। এত সুন্দর খুনসুটি দু'জনের মাঝে। তন্মধ্যে বিল্ডিংয়ের প্রায় সকল ভাড়াটিয়া হাজির হয়েছে অনুষ্ঠানে। মিম কে দিয়ে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সাফারাত। সে চায় না চৈত্রিকার এই রাত টা পানসে কাটুক। উপস্থিত সকলেই সাফারাত এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিছু কিছু মেয়ে তো ফিসফিস করছে সাফারাতের লুক নিয়ে। তার মধ্যে পাশ থেকে একটা মেয়েলি মিষ্ট স্বর কর্ণপাত হয় চৈত্রিকার।
' চৈত্র আপুর ভাগ্য টা অনেক ভালো। নয়ত আমরা কেন এতো সুন্দর বড়লোক ছেলে পাই না?ইশ!আমাদের হাসবেন্ড যেন এমন সুদর্শন হয়। চোখ সরানো দায় হয়ে পড়ছে। '
চৈত্রিকার স্পৃহা,অভিলাষ জাগে মেয়েটার মুখে মেহেদী লেপে দিতে। কাউকে নিজের সুখের ভাটা হতে দিবে না ও। সারাজীবন দুঃখে জর্জরিত হয়ে যাওয়া মানুষ যদি একটুখানি সুখের নাগাল পায় তবে চেষ্টা করে নিজের প্রাণপণ দিয়ে সেই সুখ টুকু আগলে রাখার। চৈত্রিকাও তার ঊর্ধ্বে বা নিম্নে নয়। একদমই তেমন।
মিম হলুদের ঢালা নিয়ে মাঝ সিঁড়িতেই পা রাখতেই হুট করে সামনে দিহান এসে হাজির হয়৷ অকস্মাৎ এহেন কান্ডে মিম ভড়কে যায়। দেহের তাল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে পশ্চাতে পড়ে যেতে উদ্যত হওয়া মাত্র হাত টা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দিহান। নিজের বুকে টেনে এনে শক্ত করে চেপে ধরল। ও নিজেই প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। মিম বুকে মাথা রেখে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে অনবরত। পাঞ্জাবি খামচে ধরে তিরিক্ষি মেজাজে বলে উঠল,
' কি করছিলেন আপনি?এখনই পড়ে ম'রে যেতাম আমি। '
দিহান মিমের রোষপূর্ণ কন্ঠ শুনে ফুৃস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
' ভুল হয়ে গেল মিম-ডিম। তবে ভুল করেও লাভ হলো। আহ কি শান্তি! '
দিহানের কথার মানে বুঝতে পেরে চট করে বুক থেকে সরে এলো মিম। কিন্তু সরে আসার পূর্বে ও এক কান্ড করে বসলো। শক্তি প্রয়োগ করে দুম করে কিল বসিয়ে দিল দিহানের বুক বরাবর। ব্যাথায় ককিয়ে উঠল দিহান। চোখ কটমট করে তাকালো ওর দিকে। কিন্তু পাত্তা পেল না। উল্টো মিমের ক্রোধান্বিত দৃষ্টি সিঁড়ি তে ছিটকে পড়ে থাকা হলুদের ঢালার পানে। দিহান সেদিকে নয়ন জোড়া রেখে বলে,
' আমি আবার আনিয়ে দিব। রেগে যেও না প্লিজ। '
' আপনি আমাকে ভীষণ জ্বালান। সবসময় জ্বালান। যেদিন থেকে জীবনে এসেছেন জ্বালিয়ে ছাড়খাড় করে ফেলছেন জীবনটা। '
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে কঠিন বাক্যগুলো আওড়ালো মিম। দিহান তা আমলে না নিয়ে এক হাত চেপে ধরে সাইডে নিয়ে এলো। নিচে হাঁটু গেড়ে বসে বলে উঠল,
' পা টা দাও তো। '
মিম ভ্রুঁ কুটি করে তাকালো। কপালে ভাজ পড়ল ওর। শঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
' কেন?'
' ভেঙ্গে দিব তাই। '
' কি আপনি আমার পা ভেঙে দিবেন?'--কিছুটা উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠে মিম। দিহান পা ধরে নিজের উরুতে রেখে বললো,
' হুম। তারপর সারাদিন রাত শুধু আমার কোলেই থাকবে। '
মিমের শ্বাস ভারী হয়ে আসতে শুরু করলো হঠাৎ, আকস্মিক। আমতা আমতা করে বলে উঠল,
' কি করছেন?'
দিহান তৎক্ষনাৎ জবাব দিল না। মুখ তুলেও চাইল না। পকেট থেকে একটা পায়েল বের করে হাতে নিল। অতঃপর লেহেঙ্গা টা একটুখানি উপরে উঠিয়ে পড়িয়ে দেয় পায়ে। তারপর মৃদু হেসে বলে উঠল,
' তোমাকে সারাক্ষণ জ্বালাতন করার জন্য হৃদয়ে পৌঁছার রাস্তা ক্লিয়ার করছি। '
মিম ঝটপট পা সরিয়ে আনল। বয়সে মোটামুটি ছোট হলেও অবুঝ নয় ও। দিহানের কথার ধাঁচ এবং মানে বুঝতে সময় লাগল না। বরং হৃদয় স্পর্শ করলো তা। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে বক্ষে বিঁধে বাক্যটা তীব্রভাবে। শিরশির করে উঠে দেহখানি। পালানোর তাগিদে বড় বড় পা ফেলে দ্রুত বেগে প্রস্থান করে দিহান কে ফেলে রেখে। দিহান প্রথমত বিস্ময়াহত হয়। পরক্ষণেই নিজেও ছুটে চলে মিমের পিছু পিছু।
চৈত্রিকার মেহেদী দেওয়া প্রায় শেষের পথে। প্রিয়ন্তী, দিহান আজকের ফটোগ্রাফার। ইচ্ছেমতো পিক তুলছে দু'জন। মেহেদী দেওয়া শেষ হলে সাফারাত চৈত্রিকার পাশে এসে দাঁড়ায়। মেয়ে দু'টো নিজের জায়গা ছেড়ে দেয়। চৈত্রিকাকে উঠতে সাহায্য করে মিম। সাফারাতের পাশে দাঁড়ায় ও। আলতো করে কোমর জরিয়ে কাছে টেনে নেয় সাফারাত। দিহান সঙ্গে সঙ্গে একটা পিক ক্লিক করে। চৈত্রিকা কেবল থ হয়ে রইল সাফারাতের মুখের দিকে তাকিয়ে। পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরতে নিলে সাফারাত কড়া সুরে বলে উঠল,
' আপনার মেহেদী লেপ্টে যাবে চৈত্র। বি কেয়ার ফুল। '
চৈত্রিকা লাজুক হাসে। সাফারাতের দিকে চেয়ে থাকে অনিমেষ নেত্রে। দৃষ্টি অপলক,নির্নিমেষ। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে দৌড়ে এসে কোমর ঝাপটে ধরে ওর। আকস্মিকতায় পড়ে যেতে নিলে সাফারাত সামলে নেয়। তবে চৈত্রিকার মনে হলো ওর পায়ের নিচের ভূতল কেঁপে উঠেছে। মাথা টা ঝিমঝিম করছে। বিদেশি বাচ্চাদের মতো অত্যাধিক ফর্সা, কিউট একটা ছেলে। চুলগুলো একদম আয়ানের মতোন ব্রাউন কালার। বাচ্চা টার মায়াবী চেহারা দেখে হতভম্ব নয় চৈত্রিকা। বরং নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এতোদিনের ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বাচ্চা ছেলে টা। চৈত্রিকার এতোকালের গোলকধাঁধা যেন হুট করেই সলভ হয়ে গেল। চক্ষু বড় বড় করে তাকালো ও সাফারাতের দিক। সাফারাত ওর সেই দৃষ্টি এড়িয়ে সিনথিয়ার ছেলে আয়মান কে কাছে টেনে আনে। ছেলেটা দাঁত দেখিয়ে মিষ্টি হাসে। চৈত্রিকার বিস্ময়ে ভরা চেহারায় নজর রেখে বললো,
' মামি মণি ইউ লুকস সো প্রিটি। '
সিনথিয়া পাশ থেকে বললো--' আমার ছেলে চৈত্র। জানি এটা তোদের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। '
চৈত্রিকা স্মিত হাসল। সত্যিই আয়মানের সাথে ওর দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। গায়ে জড়ানো জারবেরা,প্রতিদিন কারো জারবেরা দেওয়া, টিউশন হতে ফেরার সময় একটা বাচ্চা ছেলের অর্থাৎ আয়মানের মামী মণি ডেকে জারবেরা দেওয়া, বাবার অপারেশন এর টাকা,রাস্তায় পানি ও ভর্তা দেওয়া সবকিছু একটা মানুষ এর কাজ। এই মানুষ নাকি আবার প্রতি/শোধ নিতে এসেছিল। অথচ আড়ালে উজার করে ভালোবাসতে নিজেকে আটকাতে পারে নি। চৈত্রিকার ইচ্ছে করছে মানুষটার বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলতে এতো ভালো না বাসলেও পারতেন সাফারাত। এতো সুখের নেশায় আমায় উম্মাদ করার প্রয়োজন কি খুব বেশি ছিল?আমি আপনার নেশায় মত্ত হয়ে পড়েছি আজ নতুন করে। নতুন করে আপনার কাছে ছুটে যাওয়ার উদ্দীপনা খুঁজে পাচ্ছি ভালোবাসার টানে,সুখের নেশায়।
____________________
এসির ঠান্ডায় সাদা ধবধবে নরম ও তুলতুলে বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে চৈত্রিকা। খানিক সময় আগেই প্রিয়ন্তী,সিনথিয়া রুমে দিয়ে গেল ওকে। ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে পুরো কক্ষ। আবার বারান্দা হতে ধেয়ে আসা দখিনা অনিলে রুমের পর্দাগুলো উড়ছে এলোমেলো, অবিন্যস্তভাবে। গায়ে লাল খয়েরী বেনারসি জড়িয়ে চুপচাপ অপেক্ষার প্রহর গুণছে চৈত্রিকা সাফারাত এর। অন্য বেলায় তো এই লোকের অনেক তাড়া থাকে কাছাকাছি আসার অথচ আজ এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করাচ্ছে ওকে। বসে থাকার দরুন পা দুটো ব্যাথা করছে ক্ষীণ। শাড়ি সামলে চৈত্রিকা বিছানা ছাড়ে। একটু হাঁটলে ভালো লাগবে তা ভেবে। কিন্তু যার জন্য এতক্ষণ বসে বসে প্রতীক্ষা করলো সেই লোক চৈত্রিকা দাঁড়ানো মাত্র দরজা খুলে হাজির। চৈত্রিকার অন্তস্থল ধ্বক করে উঠল। শরীরের রক্ত হিম হয়ে এলো।
সাফারাত এক নজর চেয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। গাঢ় সেই দৃষ্টিতে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেল চৈত্রিকা। ওর কি করা উচিত?দাঁড়িয়ে থাকা নাকি বসে পড়া?বউরা তো বাসর ঘরে বসেই থাকে তাই না?নাকি দাঁড়িয়েও থাকে?ওর মতো এমন করে কি এই সময়টা তে সকল বউ মানুষ কনফিউজড হয়?সাফারাত যত এগিয়ে আসছে চৈত্রিকার বুকের অশনী,দুরুদুরু ততই বেড়ে চলেছে। ছাব্বিশ বছরের জীবনে এমন ফিলিংসটা খুবই ভয়ংকর মনে হচ্ছে চৈত্রিকার। শক্ত, কঠোর,পরিবার সামলানো মেয়েটা আজ একজন পুরুষের উপস্থিতিতে কেমন নেতিয়ে পড়ছে। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ছে।
সাফারাত মাঝে দূরত্ব রেখে থেমে গেল। চৈত্রিকার পা হতে মাথা অব্দি নিজের ঈগল চোখের সূক্ষ্মতা নিয়ে সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ করলো সে। চেহারার গম্ভীরতা সরে গিয়ে ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠে তার। নরম গলায় প্রশ্ন করে,
' পানি খাবেন?'
চৈত্রিকা স্তম্ভিত হয়ে যায়। মাথা নেড়ে সায় জানায়। ওর ভীষণ পিপাসা পেয়েছে। সাফারাত এক গ্লাস পানি দিতেই ও বিছানায় বসে রুদ্ধশ্বাসে পান করে পুরো গ্লাসের জল। সাফারাত আলতো করে একহাতে নিজের শক্তপোক্ত হাত ডুবিয়ে দিল। কাছে এগিয়ে গিয়ে দীর্ঘ এক চুম্বন আঁকে চৈত্রিকার কপালে। চক্ষুদ্বয় বুঁজে আসে চৈত্রিকার। গাল ছুঁয়ে গড়িয়ে যায় অশ্রুকণা। এই কান্নার মানে টা ভিন্ন। খুবই ভিন্ন। সাফারাত নাকের ডগায়ও ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। চৈত্রিকার গায়ের ভারী গহনাগুলো অতি সন্তর্পণে খুলে একপাশে রাখে সে। চৈত্রিকা নিজেকে ধাতস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবুও বারংবার লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে সে।
' বলেছিলাম চৈত্র আপনি আমার কাছাকাছি এলে একদম তুলে নিয়ে আসব আপনাকে। আজ সত্যি সত্যি নিয়ে এলাম। '
চৈত্রিকা বুঝতে পারল সাফারাত সেই রাতের কথা বলছে। বর্ষণমুখর সেই রাতে আবেগের বশে সাফারাত এর কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকেছিল ও। চৈত্রিকার তরফ হতে সেটাই ছিল সাফারাতের কাছাকাছি যাওয়া প্রথমবার। সাফারাত এর তেজী স্বরে চৈত্রিকা অল্পসল্প নড়েচড়ে উঠে। সাফারাত হাত টা শক্ত করে মুষ্টিমেয় করে কাছে টেনে নিল ওকে। চৈত্রিকার এক হাত গিয়ে ঠেকে তার বুকে। প্রগাঢ় দৃষ্টি দু'জনের। একে অপরের তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে মুখশ্রীতে। অভ্যন্তরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। উত্তাল পাতাল গর্জে উঠছে অনুভূতিরা।
সাফারাত কোলে তুলে নিলো চৈত্রিকাকে। বিছানার মাঝখানে বসিয়ে দিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ এবং হাতে একটা চেক নিয়ে এলো। চৈত্রিকার দিকে বাড়িয়ে দিতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ও।
' চেকের মাধ্যমে আপনার কাবিন নামার টাকা পরিশোধ করে দিলাম। এবং এটা এই বাড়ির দলিল। এখন থেকে আমার মায়ের বাড়িটা আপনার চৈত্র। '
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধতা চৈত্রিকা কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল। পরমুহূর্তেই দ্রুতবেগে বলে উঠল,
' কি বলছেন আপনি?'
' আমার জীবনে থাকা টা আপনার জন্য মোটেও সহজ নয়। চাঁদ যেমন সুন্দর তেমনি তার গায়ে কলঙ্ক আছে। এই বাড়ির সৌন্দর্যের মাঝেও বিষাক্ত কিছু মানুষ ছড়িয়ে আছে। যারা আপনার ক্ষতির কারণ হতে পারে চৈত্র। আপনি বাড়ির ওনার মানে আপনি সেফ। আপনাকে আমি আমার জীবনে জড়াতে চাই নি। আবার না জড়িয়েও থাকতে পারি নি। আমি জানি আপনি অবাক হচ্ছেন তবে আমি চাই আমার থেকে উপহার হিসেবে আপনি এটা গ্রহণ করুন। '
কাঁপা কাঁপা হাতে দলিল টা হাতে নেয় চৈত্রিকা। সাফারাত লহু স্বরে বলে উঠল,
' ভয় পাচ্ছেন?'
' আপনার কথায়। '
' রিলেক্স। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আপনার ঢালস্বরূপ আমায় পাবেন। '
বিনিময়ে চৈত্রিকা মৃদু হাসলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় সাফারাত চৈত্রিকার হাসি মাখা চেহারায়। হাত বাড়িয়ে বেড সাইডের পাশে অবস্থিত ল্যাম্পশেড অফ করে দিল। চৈত্রিকা চমকে গিয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরে। রুমের ড্রিম লাইটের আলোয় ওর কম্পনরত ঠোঁট দেখে বেসামাল হয়ে পড়ে সাফারাত। নিজেকে আটকাতে ব্যর্থ হয় সে। নিজের শুষ্ক ওষ্ঠজোড়া দিয়ে নরম অধর দু'টো গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে সাফারাত। ঘাড়ের নিচে হাত গলিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল চৈত্রিকাকে। চৈত্রিকা অনুভব করতে থাকে গাঢ় এই অনুভূতি। সাফারাতের নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া ওর হৃদয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ হারা করে চলেছে। বড় বড় শ্বাস ফেলতেই গলায় ছোট ছোট উষ্ম পরশ অনুভব হয়। মুহুর্তেই ঠোঁটের স্পর্শ অধিকতর প্রবল ও গাঢ় হতে শুরু করে। চৈত্রিকা সাফারাত কে ঝাপটে ধরলো। শক্ত করে আলিঙ্গনে বাঁধার প্রয়াস চালালো। বাঁকা হাসল সাফারাত। চৈত্রিকাকে শুয়ে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে অধর ছুঁয়ে দিল। ফিচেল স্বরে বললো,
' চৈত্র মাসের রুক্ষ শুষ্ক জীবনে আজ হতে অহর্নিশি বর্ষণ হয়ে ঝড়ব আমি। বর্ষণের তান্ডব সামলাতে রাজি তো আপনি চৈত্র মাস? '
সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
পর্ব___৩৪
ফজরের আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতেই সাফারাত নড়েচড়ে উঠে। বুকে গুটিসুটি মেরে ঘুমন্ত চৈত্রিকাকে টেনে সোজা করে পাশে শুইয়ে দিল। তৎপরে সাফারাত গালে হাত বুলিয়ে পাশে শুয়ে নেত্রদ্বয় নিমীলিত করে নেয়। নরম একটা স্বর চৈত্রিকার কর্ণধারে পৌঁছায় নিমেষে।
' উঠুন চৈত্র জান। '
এক বাক্যে চৈত্রিকা তৎক্ষনাৎ ক্ষীণ নড়ে উঠল। ঘুম ভীষণ পাতলা ওর। বিলম্ব না করে চক্ষুদ্বয় মেলার চেষ্টায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। মাত্র দু ঘন্টা পূর্বে ঘুমে বিভোর হয়েছিল, যার ফলে চোখ মেলা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। তবুও পিটপিট করে সাফারাত এর মুখের দিকে কপাল কুঁচকে চাইল। ও কি ভুল কিছু শুনল?জান?এটাই তো ডাকলো সাফারাত। হুট করেই চৈত্রিকার বুকের অবস্থা বেশ টালমাটাল। ভাঙা গলায় প্রশ্ন করে,
' আপনি এই মুহুর্তে আমায় ডেকেছিলেন? '
' ইয়েস ডেকেছি। উঠুন। '
' আচ্ছা আপনি কি আমাকে শুধু নাম ধরে ডেকেছিলেন? '
চৈত্রিকার এমন অদ্ভুত প্রশ্নে সাফারাতের ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে এলো। কপালে বলিরেখার ভাঁজ ফুটে উঠল। লহু স্বরে বললো,
' আপনার নাম ধরে ডেকেছি। কেন? আপনার নাম কি চৈত্র না?'
থতমত খেয়ে যায় চৈত্রিকা। আমতাআমতা করে বলে,
' হ্যাঁ। কিন্তু নামের সাথে আর কিছু ডাকেন নি?'
' আর কিছু ডাকার কথা ছিল?'-'-এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে প্রশ্ন করল সাফারাত।
' উঁহু! ফ্রেশ হতে হবে। নামাজের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। '
চৈত্রিকা সাফারাতের প্রশ্নসূচক চেহারায় দৃষ্টি রেখে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল কথা কাটানোর নিমিত্তে। নয়ত কেমন করে জিজ্ঞেস করবে যে আপনি কি আমায় জান ডেকেছিলেন? আমার মনে হলো জান ডেকেছেন। এই লজ্জাতুর শব্দটা উচ্চারণ করতে পারবে না ও। তাই যে করে হোক সাফারাতের দৃষ্টি হতে পালাতে হবে এখন,এই মুহুর্তে। বিছানা থেকে তাড়াহুড়োয় উঠতে নিলে সাফারাত উঠে বসে। কন্ঠে উদগ্রীব, উত্তেজনা।
' যেতে পারবেন?আমি কোলে করে দিয়ে আসি ওয়াশরুমে?'
চৈত্রিকা উঠতে গিয়েও থমকে গেল। শ্রবণগ্রন্থি ঝালাপালা করে উঠে ওর লজ্জায়,সংকোচে। সাফারাতের দিকে তাকানোর সাহস অব্দি নেই ওর। এটা কি প্রশ্ন ছিল নাকি লজ্জায় ফেলার,ডুবানোর মন্ত্র? শাড়ি সামলে জবাব না দিয়ে এক প্রকার দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে চৈত্রিকা। অর্ধ গোসল সেড়ে খেয়াল হলো কাপড় আনে নি। জড়তা সংকোচ নিয়ে দরজা একটুখানি খুলে ডেকে উঠল,
' সাফারাত! '
' কি কালার শাড়ি পড়বেন?'
দৈবাৎ প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল চৈত্রিকা। সাফারাত উল্টো হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তার ফর্সা দেহ দৃশ্যমান। উদোম পিঠ,তাগড়া বলিষ্ঠ দেহ অবলোকন হতেই চৈত্রিকার গলা শুকিয়ে আসছে। তার চেয়েও অত্যাধিক অবাকের বিষয় সে কি করে বুঝল চৈত্রিকার কাপড়ের জন্য হাক ছেড়েছে? চৈত্রিকা ভাবনায় এতো মগ্ন ছিল ও বুঝতেই পারে নি সামনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। গরম, উত্তপ্ত নিঃশ্বাস মুখে পড়তেই কেঁপে উঠল ও। সমুখে দৃষ্টি মেলে দেখে সাফারাত কলা পাতা রঙের একটা শাড়ি,ব্লাউজ প্রয়োজনীয় সকল জিনিস ওর দিকে বাড়িয়ে রেখেছে। কখন এলো?আগে থেকেই সব রেডি করে রেখেছিল নাকি?আর শাড়ির ও ব্লাউজের সাথে অন্যসব প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো?হোক না স্বামী তবুও সাফারাতের হাতে সবকিছু দেখে চৈত্রিকার লজ্জায় মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। হাত কাঁপছে ঠকঠক করে।
' লজ্জায় লাল-নীল হবেন নাকি এগুলো নিবেন?'
লাল-নীল?হ্যাঁ। চৈত্রিকা অনুভব করতে পারছে ওর দু'গালের উত্তাপ। নিশ্চয়ই অনেক লাল হয়ে আছে। দ্রুত গতিতে কাপড়গুলো নিয়ে সাফারাতের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিল। এতক্ষণে বোধহয় বন্দি খাঁচায় আটকে থাকা পাখির ন্যায় চৈত্রিকার নিঃশ্বাস ও মুক্তি পেল। প্রায় দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় ছিল।
.
.
.
চৈত্রিকা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসতেই দেখে সাফারাত বিছানার চাদর পাল্টে ফেলেছে। আগের চাদর টা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে নিলেই ইতস্তত কন্ঠে বলে উঠল চৈত্রিকা,
' আমাকে দিন। আমি ধুয়ে দিব। '
' নো নিড, আমি পারব। নামাজ পড়ুন আপনি। আমি আসছি। '
' কিন্তু! '
সাফারাত গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
' আমি ধুয়ে দিব চৈত্র। ইজি হোন আমার সাথে। এতো সংকোচ রাখবেন না। '
চৈত্রিকা আর কিছু বলতে পারল না। জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল। সাফারাতও ফ্রেশ হয়ে রুমেই নামাজ আদায় করে নেয়। বিছানায় গা এলিয়ে বলে উঠল,
' ঘুমাবো চৈত্র। আপনি চাইলে ঘুমিয়ে নিতে পারেন কিছুক্ষণ। '
' বাহিরে যাবো একটু।'-মিনমিন স্বরে বলে উঠল চৈত্রিকা।
সাফারাত কোনো প্রকার প্রতুত্তর করলো না। চোখ বুঁজে ফেলল। চৈত্রিকা ঠাহর করতে পারে সাফারাতের নীরবতা সম্মতির লক্ষণ।
ভেজা চুল ঝেড়ে শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিল চৈত্রিকা। দরজা হালকা করে ভিজিয়ে সিঁড়ির অভিমুখে এলো। নিচে তাকাতেই দেখতে পায় মিনা সোফায় ঘাড় হেলিয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে হাত পা ছড়িয়ে। মেয়েটা নিজের ব্যাপারে একদম বেখেয়ালি। গলা টা মৃদু ব্যাথা করছে চৈত্রিকার। গরম পানি করে খেলে কিছুটা হলেও রিলিফ পাওয়া যাবে। চৈত্রিকা ধীরস্থির ভঙ্গিতে সিঁড়ি অতিক্রম করে নেমে এলো। মিনা কে ডাকতে লাগল আস্তে-ধীরে, নিচু গলায়। চোখ মেলতেই ক্ষীণ স্বরে বললো,
' রুমে গিয়ে ঘুমাও। এখানে একটু পর মানুষ আসবে যাবে। খারাপ দেখাবে তো। '
মিনা ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠলো,
' রুম থেকেই আইলাম মাত্র ভাবী। এনে আইয়া কুদ্দুর বইতেই চোখ টা লাইগা গেছে। '
' সমস্যা নেই। রুমে যাও তুমি। '
' আপনার কি কিছু লাগব?আমারে কন কি লাগব?'
' গরম পানি। আমি নিজেই করতে পারব। তুমি যাও। '
' না না আমি এখনই কইরা আনতাছি। আপনি এনে বসেন। '
' লাগবে না। আমি পারব মিনা। তুমি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নাও। '
কথাটা বলেই চৈত্রিকা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। একটা পাতিলে পানি গরম করতে দিয়ে চোখ বুলালো পুরো রান্না ঘরে। আরেকবার এখানে আসার কারণে বৃহৎ আকারের কিচেন রুমটা দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হলো না চৈত্রিকা। গরম পানি একটা স্টিল এর গ্লাসে ঢেলে লবণ মিশিয়ে নিল। গ্লাসটা ছোট কাপড় দিয়ে ধরে তাপ যেন হাতে না লাগে। গ্লাসটা হাতে নিয়ে ড্রইং রুমে আসতেই মুখোমুখি হয় মৌসুমি বেগমের। চৈত্রিকা তব্দা খেয়ে যায়। পরক্ষণেই সালাম দেওয়া মাত্র মৌসুমি বেগম কড়া কন্ঠে বলে উঠলেন,
' লাজ শরমের অভাব নাকি তোর?বস্তির মেয়ে হয়ে অবশ্য সংস্কৃতি, আদব কায়দা জানা তোর ধাঁচের না। আমরা তো শাশুড়ির আদেশ বিহীন লজ্জায় বিয়ের পরদিন রুম থেকেই বের হয় নি। আর তুই সোজা কিচেনে ঢুকে গেলি?এতো বড় বাড়ি, কিচেন রুম দেখে লোভ সামলাতে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই!'
মৌসুমির বেগমের ব্যবহারে হতবিহ্বল চৈত্রিকা। ও জানত উনি স্বভাবে কর্কশ কিন্তু এমন ব্যবহার মোটেও আশা করে নি। অভ্যন্তরে জাগ্রত ব্যাথা,যন্ত্রণা জল হয়ে পরিপূর্ণ করলো চৈত্রিকার চক্ষু কোল। তবুও হাসিমুখে কঠিন এক জবাব দিল সে,
' আমার তো শাশুড়ী নেই ফুপু। অন্য কেউ নির্দেশ দিবে না। তাই অপেক্ষা না করে নিজেই চলে এলাম। আফটার অল সংসার টা আমার। বর বললো সংসার টা সামলানোর দায়িত্ব আমার। আমি আবার স্বামী ভক্ত। '
মৌসুমি বেগম রাগান্বিত চোখে তাকালেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
' বড়দের সাথে এভাবে কথা বলা শিখিয়েছে তোর মা?এই তোর ব্যবহার?'
' বস্তির মেয়ে তো তাই। '
সাদামাটা জবাব চৈত্রিকার। মৌসুমি বেগম ক্ষিপ্র নেত্রে তাকাতেই চৈত্রিকা পুনরায় বলে উঠল নম্রস্বরে,
' আপনার কিছু লাগবে ফুপু?আমায় বলুন। চা খাবেন?আমি বানিয়ে দিই?'
' গতকাল বউ হয়ে এসে আজ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিস?এখন কি তোর জন্য আমি আমার ভাইপোর বাড়িতে চলতেও পারব না?'
' অবশ্যই পারবেন। আমি তো আপনার হেল্প করতে চাইছিলাম। '
' তোর হেল্প নিব আমি?মৌসুমি হাওলাদারের এতো সময় খারাপ সময় আসে নি এখনও যে একটা বস্তির মেয়ের হাতের কিছু খেতে হবে আমার। আমার চোখের সামনে থেকে সরে দাড়া। '
একটা মানুষ ঠিক কতক্ষণ এসব কথা সহ্য করতে পারে চৈত্রিকার জানা নেই। চক্ষে টলমল করা জল অবাধে গড়িয়ে পড়ার তোরজোর চালাচ্ছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চৈত্রিকা সরে দাঁড়াতে যাবে ঠিক তখনই ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় ওকে মৌসুমি। সঙ্গে সঙ্গে ডান হাত টা চেপে ধরে চিল্লিয়ে উঠলো চৈত্রিকা। পানির গ্লাস কিঞ্চিৎ উঁচু হতে মেঝেতে আছড়ে পড়ে ঝংকার শব্দের সৃষ্ট করে। চৈত্রিকার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে। জ্বলে যাচ্ছে ওর হাত টা। ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে লাগল ও। সকল কান্ড দেখে মিনা হতভম্ব। দৌড়ে এসে চৈত্রিকার পাশে মেঝেতে বসল ও।
' হায় আল্লাহ! এটা কি করলেন ম্যাডাম? '
মৌসুমি মিনার ভয়ার্ত স্বর কর্ণপাত করলেন না। বরং তাচ্ছিল্য হাসলেন। গটগট করে উপরে চলে গেলেন তিনি। মিনা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
' অসভ্য মহিলা। ভাবী আপনার হাত বেশি জ্বলতাছে?আমি স্যার রে ডাইকা লইয়াই। '
চৈত্রিকা অন্য হাতে মিনার হাত ধরে আটকালো। টলমলে নয়ন জোড়া নিক্ষেপ করে মাথা নেড়ে না করলো। মিনা তড়তড় করে বলে উঠল,
' আমি বলমুই ভাবী। এই মহিলার একটা উচিত শিক্ষা দরকার। আপনের এতো সুন্দর হাত টা পুইড়া ফেললো। '
মিনার চক্ষু কোল ভিজে উঠেছে। কন্ঠে কাতরতা। চৈত্রিকা ব্যস্ত পায়ে রান্না ঘরে ছুটে এলো। পানির কল ছেড়ে দিয়ে হাত টা দিতেই ছ্যাৎ করে উঠল মন,হাত,অন্তর। বড্ড জ্বলছে। একটা মানুষ এতো নির্দয় কেমন করে হতে পারে?মৌসুমি যে ইচ্ছেকৃত এটা করেছে বুঝতে বাকি নেই চৈত্রিকার। সাফারাত তাহলে গতরাতে সঠিক কথা বলেছিল। এই বাড়িতে বসবাসরত মানুষগুলো বিষাক্ত। চৈত্রিকার চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় নোনতা গরম জল ঝরছে। দু' চোখের পাতা এক করে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
' আমার জীবনে সুখের বসবাস চিরকালের জন্য নয়। জীবনে সুখ ছিনিয়ে আনার লড়াই টা খুব কঠিন। কষ্টদায়ক। '
চলবে,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)