ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুখের নেশায়

পর্ব 31

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃ আসরিফা সুলতানা জেবা
৫১+৫২
পর্ব___৫১

সুফিয়া বেগম কোনোদিনও সিয়াকে পছন্দ করেন নি। ওনার সবসময় ইচ্ছে ছিল ভাইয়ের মেয়েকে ছেলের বউ বানাবেন। শুধু মাত্র টাকার জন্য উপর দিয়ে মায়া দেখাতেন তিনি। একদিন মিনার মা'কে টাকার লোভ দেখিয়ে নিজের প্ল্যান কার্যকর করেন।

মিনার মা ছিলেন সুফিয়া বেগমের ডান হাত। সুফিয়া নিজের সকল জঘ*ন্য কাজ মিনার মা দ্বারাই সম্পন্ন করতেন। এমনই একটা জঘ*ন্য কাজের পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি বহুদিন,বেশ সময় নিয়ে। ছেলের পর*কীয়া সম্পর্কিত বিষয় টা তিনি সিয়ার অবগত হওয়ার আগে থেকেই জানতেন। সিয়া যখন দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হয় তিনিই আড়ালে ছেলেকে উষ্কানি দিতেন,যেন সিয়ার উপর নির্ম'ম অত্যাচার করে। এসকল কু'ক'র্মের স্বাক্ষী ছিল মিনার মা। প্রিয়ন্তীর বাবা-মা,প্রিয়ন্তী,পৃথক যখন বিয়ের জন্য নানার বাড়িতে চলে যায় সেই সুযোগ বুঝে সুফিয়া বেগম নিজের মুখ্য চাল চালেন। মিনার মা'কে আদেশ করেন যেই করে হোক কৌশলে সিয়াকে মে'রে ফেলতে হবে। আর এটাই সুযোগ। এতে কারো উপর কারো সন্দেহ হবে না। মিনার মা প্রথমে ভয় পেলেও সুফিয়া বেগমের দেওয়া টাকার লোভে পড়ে যায়। পরিকল্পনা মতে,সুফিয়া বেগম মিথ্যে হার্ট অ্যা'টা'কের বাহানা ধরে হসপিটালেরে ভর্তি হয়ে যান। তখন সারা বাড়িতে সিয়া একা এবং মিনার মা। তার উপর অগাধ বিশ্বাস ছিল সিয়ার। সাফারাতের জার্মানি যাওয়ার পর সিয়ার আপন ও সবথেকে কাছের মানুষ ছিল ফারুক, সুফিয়া বেগম,মিনা। ফারুকের মুখোশ উন্মোচন হওয়ার পর থেকে সিয়া একদম ভেঙে পরে। খাবার পর্যন্ত নামত না তার গলা দিয়ে। সারাক্ষণ একা একা বসে থাকত। সেই সময় টায় সুফিয়া বেগম ভালো মানুষ সাজার নাটক চালিয়ে যায়,সঙ্গে মিনার মা। কারো আত্মার মৃ*ত্যু ঘটাতে হলে নিঃসন্দেহে প্রথমত তার কাছের মানুষ হতে হবে, তৎপরে পিছন হতে ছু'রি গাঁথতে হবে। ঠিক এমনটাই করেছিলেন সুফিয়া বেগম ও মিনার মা।

সময়টা ছিল মধ্যাহ্ন। সিয়া তখন বেলকনিতে বসে। সুফিয়া বেগমকে সকালে একবার দেখে হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। প্রেগন্যান্ট অবস্থা, মানসিক অসুস্থতা মিলিয়ে নিজের অসুস্থ হবার জোগাড়। তাই হসপিটালে অবস্থান সম্ভব হয়নি সিয়ার। কোনোমতে গোসল সেড়ে বেলকনিতে পাতানো মোড়ায় বসতেই মিনার মা'র আগমন ঘটে। দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছেন তিনি একটা থালায়। প্রায় সময় তিনি এটা করে থাকেন। বলাবাহুল্য মিনার মা বয়সে সিয়ার থেকে বড়। মিনা ওনার একমাত্র সন্তান নই,আরো বড় বড় তিন তিনটে ছেলে আছেন ওনার। কিন্তু তিনজনই ওনাকে ফেলে আলাদা, বিচ্ছিন্নভাবে নিজেদের সংসার গড়েছেন। কখনও মা নামক মানুষটার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় নি,আর না ভুলেও একটা বার স্নেহের হাত বুলিয়েছে ছোট বোনটার মাথায়। খাবারের প্লেট টা সিয়ার সামনের টেবিলে রেখে খেয়ে নিতে বলেন তিনি। সিয়া বিনিময়ে ম্লান হাসে। কি নজরকাড়া ছিল সেই হাসিটুকু!মাঝে মাঝে মিনার মা অবাক হয়ে দেখত সিয়াকে। এত সুন্দর হয় কোনো নারী!সাফারাত যেন মায়ের অর্ধ সৌন্দর্য পেয়েছে। উনি প্লেট রেখে ভিতরে এসে লুকিয়ে থাকেন দরজার আড়ালে। খাবার খাওয়ার কয়েক মিনিট পর পরই সিয়া মেঝেতে ঢলে পড়েন। ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল সুফিয়া বেগমের আদেশক্রমে। অতঃপর সুফিয়া বেগমের পাঠানো একজন লোকের সাহায্যে সিয়াকে কিচেন রুমে শুইয়ে বাহির থেকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চোখের সামনেই যখন সিয়ার দেহে আগুন লাগতে শুরু করে মিনার মা কেটে পড়েন বাহিরে। মিনিট কয়েক বাদে চিল্লিয়ে দারোয়ানকে বলতে শুরু করেন রান্নাঘরে আগুন লেগেছে, সিয়া রান্নাঘরে। দারোয়ান যতক্ষনে পৌঁছান সিয়ার দেহ অর্ধেক জ্বলে যায়। যন্ত্রণায় ছটফট করছিল সিয়া। ছটফট করতে করতে হসপিটালে নেওয়ার পথে তার মৃ*ত্যু ঘটে। একটা মানুষ অগ্নিদাহে শেষ নিঃশ্বাস বিমোচন করে দেয় অথচ সে জানতেই পারে নি তার মনপাজরে থাকা মানুষগুলোই তার এবং তার সন্তানের নি'র্ম'ম মৃ'ত্যু'র কারণ,খু*নি।

মিনার মা'র কাছ থেকে এতটুকু জেনে ঠিক কতক্ষণ, কতক সময় স্থবির,নিস্তব্ধ ছিল চৈত্রিকা ওর সঠিক জানা নেই, তবে ইচ্ছে করছিল গলা টি'পে সেই নি'কৃ'ষ্ট মহিলাকে মে'রে ফেলতে। কাউকে খু*ন করার মতোন অপরাধ ও করতে পারবে না বলে সাথে সাথে বস্তি থেকে বেরিয়ে আসে। পিছু পিছু দৌড়ে আসে ক্রন্দনরত ছোট্ট মিনা।
সেদিন থেকে মিনা ওর মা'য়ের দিকে ফিরেও তাকায় নি। অতটুকু বয়সে তীব্র এক ঘৃ'ণা জন্মে তার মা'য়ের প্রতি।অবহেলায়,অসুস্থতায় বিছানায় শয্যাশায়ী মিনার মা'য়ের মৃ'ত্যু হয় ঠিক তার পরের দিন। সাফারাতের এক্সিডেন্টের পরের দিন সকালে সুফিয়া বেগম দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাক করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। হসপিটালে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করেন তিনি। অতঃপর প্যারালাইজড। কথা বলতে পারতেন না মুখ বেঁকিয়ে যাওয়ার ফলস্বরূপ। মাঝে মাঝে বলতেন কিন্তু তাও শুনতে হতো মানুষকে ওনার মুখের কাছে কর্ণ পেতে। বয়স্ক,চামড়া ঝুলে পরা দেহখানায় পচনও ধরে। বিশ্রী, উদ্ভট গন্ধে ওনার রুমে পর্যন্ত যাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। কারো অঙ্গ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার কারণেই হয়ত জঘ*ন্যভাবে দিনের পর দিন পঁচে পঁচে ম'রে'ছে সুফিয়া বেগম।

সুফিয়া বেগমের লা*শ বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার পর চৈত্রিকা বিছানার উপর সাফারাতের এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা ওষুধ গুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ও ওষুধের বোতল পায়। ভ্রুঁ যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে যায় চৈত্রিকার। সাফারাতের এমন কোনো ওষুধ তো দেয় নি ডাক্তার। তাহলে এটা এখানে এলো কি করে?না-কি দিয়েছে? সাফারাত যা গম্ভীর স্বভাবের কিছুই তো বলে না। চৈত্রিকা ডক্টর আদিকে কল দেয়। সাদা বোতলের গায়ে লেখা নামটা বলতেই আদি কিছুক্ষণ থেমে থেকে বলে এটা এক ধরনের বিষ,যা কোনো ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর দেহে গেলে শরীরে শীগ্রই পচন ধরবে। তৎক্ষনাৎ চৈত্রিকার মাথায় আসে সুফিয়া বেগমের কথা। ওনার ডায়াবেটিস ছিল। অল্প কয়েকদিনেই পচন ধরে ওনার সারা শরীরে হুট করে। নিমিষেই চৈত্রিকার মস্তিষ্ক সচল হয়ে যায়। ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সমস্ত কায়া অসাড়তা লাভ করে। আদি অপর পাশ হতে অনবরত হ্যালো বলতে থাকে,কিন্তু তা আর চৈত্রিকার কর্ণধার হয় না। সুফিয়া বেগমের হঠাৎ এমন পরিণতি সাফারাত করেছে?কিন্তু কেন?সাফারাত জানে সুফিয়া বেগম ওর মায়ের খু*নি?চৈত্রিকা ফোন টা কেটে দিয়ে হাতে সিরিঞ্জ টা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে সাফারাতের আশায়।

সেদিন দাফন কার্যকর্ম সম্পন্ন হওয়ার পর সাফারাত জানায় সুফিয়া বেগম ওর মায়ের খু*নি সেটা সে জানতে পারে পৃথকের মাধ্যমে। এক্সিডেন্টের ঠিক দু'দিন আগে পৃথকের সাথে জেলে দেখা করতে যায় সে। তখন পৃথক-ই জানায় সবটা। প্রথমত সাফারাত পৃথকের কথা বিশ্বাস করে নি। কিন্তু পৃথক তাকে বাড়িতে গিয়ে ওর রেখে আসা মোবাইলটা চেক করতে বলে, যেখানে সুফিয়া বেগম ও মিনার মা'র কথোপকথন সুযোগ বুঝে রেকর্ড করে ফেলে সে। ভিডিও টা প্রায় এক বছর আগের। তখনও মিনার মা এ বাড়িতে কাজ করতেন। সেখানে স্পষ্ট সুফিয়া বেগম বলছিলেন সিয়াকে আগুনে পুড়িয়েও লাভ হলো না, সাফারাতের জন্য ছেলেটাকে বাড়িতে আনতে পারি না। জার্মানি থেকেও ওর কড়া নিষেধাজ্ঞা ফারুক যেন এ বাড়িতে ঢুকতে না পারে। নিজের রক্ত বলে ছেলেটাকে কিছু করতে বিবেকে বাঁধে।
এই ভিডিওটা করে পৃথক দাদির থেকে টাকা লুটেছে ঢের। সুফিয়া এক প্রকার ভয়ে থাকতেন পৃথকের জন্য। ওর জেলে পড়ায় সবথেকে অধিক খুশি তিনিই হয়েছিলেন। জেলে বসেও ভিডিও টা কাজে লাগে পৃথকের। সাফারাতের অভ্যন্তর ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত করতে পেরেছে এটাই যেন প্রতি/শোধের চেয়ে কম নই। এতটুকু শুনে চৈত্রিকা থম মেরে যায়। এত বড় সত্য টা সাফারাত জানে অথচ একটাবারও নিজের কষ্ট টা কারো সামনে আসতে দেয় নি। নিজের মা'য়ের এত ভয়ংকর মৃ*ত্যু,আপনজনের ধো'কা কতটা নিরবে সয়ে যায় মানুষটা। শেষ পর্যন্ত এই মানুষটাকে পৃথকও ছাড় দিল না। সুযোগ বুঝে আঘা/ত করল।

হসপিটালে থাকাকালীন দিহানের মাধ্যমে সুফিয়া বেগমের শরীরে একজন নার্সকে দিয়ে এই বিষাক্ত মেডিসিন টা প্রবেশ করায় সাফারাত। তার লক্ষ্য সুফিয়া বেগমকে পুরোপুরি মা'রার উদ্দেশ্য ছিল না বরং শরীরের যন্ত্রণা কতটা কষ্ট দেয় তা-ই সুফিয়া বেগমকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছে। সাফারাত এতটুকু অব্দি বলে একটাই প্রশ্ন করে-- ' আপনি কি আমাকে খু*নি ভাবেন চৈত্র?' চৈত্রিকা প্রশ্নের জবাব দেয় নি উল্টো তার প্রাণপুরুষের বুকে মাথা রেখে বলে -- 'আপনি অনেক স্ট্রং সাফারাত,প্রচন্ড। '

কাচের দেয়ালের কাছ হতে সরে বিছানায় বসে পড়ল চৈত্রিকা। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক চিরে। সেদিন সাফারাত এতটুকুই বলে। চৈত্রিকাও আগ বাড়িয়ে দ্বিতীয় খু'নির কথা জিজ্ঞেস করে নি। তার মন বলছে সাফারাত নিজ থেকে সেই মানুষটার নাম বলবে। কি দরকার বারংবার জিজ্ঞেস করে মানুষ টাকে এলোমেলো করে দেওয়ার?সামান্য বাবার অবহেলা সহ্য হয় নি কখনও কিন্তু সাফারাত! কি করে পারছে এই লোক এত বেই'মানি সহ্য করতে? কষ্ট মানুষকে ভেঙে নতুন করে গড়ে কি?নয়ত একটা মানুষ এত গম্ভীর, কঠোর কেমন করে হয়?
____________

চৈত্রিকা গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। সিনথিয়ার হাতে একটা বড় ঝুড়ি। ঝুড়িতে বড় বড় চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংকস আরো কত কি!চৈত্রিকাকে দেখে দ্রুত গতিতে বলে উঠল,

' তোকেই ডাকতে যেতাম এখন চৈত্র। ভালো হয়েছে আর সিঁড়ি ভেঙে যেতে হলো না। চল। সবাই বাগানে অপেক্ষা করছে। '

চৈত্রিকা কপাল কুঁচকে তাকালো। সিনথিয়া বাদে ঘরের মধ্যে কাউকেই দেখতে পেল না। ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করল ,
' বাগানে কেন?'
' আজ আমাদের প্রতিবেশী আন্টি তিয়ানা ও ওনার ফ্যামিলি মেম্বারদের সাথে ছোটখাটো একটা গেট টুগেদার আছে। প্রতিবছরই করি আমরা। সাধারণত শীতকালে আমরা একসাথে পার্টি করি কিন্তু তোদের আসার উপলক্ষে তিয়ানা আন্টি ও আম্মু এখনই করতে চাইছে। '
চৈত্রিকা ভাবুক হয়ে বলল,
' সবসময় শীতকালেই কেন?'
' জার্মানিতে শীতকাল ভারী তুষারপাত হয়। বাহিরে তখন উৎসব উৎসব আমেজ থাকে। দেখলেই প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় মন। কেবল আমরা না,সকল জার্মান অধিবাসীরা আনন্দ করে অনেক। আমি তো প্রথমত দেখে পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এত সুন্দর সবকিছু। তুই যখন একেবারে পার্মানেন্ট জার্মানিতে থাকবি তখন অনেক মজা হবে। '

চৈত্রিকা সিনথিয়ার মুখের হাসি হাসি ভাব দেখে অধর ছড়িয়ে হাসে। প্রিয়ন্তীর কথা জিজ্ঞেস করতেই সিনথিয়া জানায় সবাই বাহিরে। দরজা পর্যন্ত আসতেই পা জোড়া মেঝেতে আটকে গেল উভয়ের। সাফারাত দরজার অভিমুখে দাঁড়িয়ে। নির্নিমেষ দৃষ্টি তার চৈত্রিকার মুখশ্রী পানে। বিশাল দরজা। আরো দু'জন একটা মানুষকে কাটিয়ে যেতে পারবে অনায়সে। সিনথিয়া বোকা বোকা চাহনি নিক্ষেপ করল। তড়িৎ গতিতে বেরিয়ে গেল সে। সাফারাত দুই পা এগিয়ে আসতেই তিন পা পিছিয়ে গেল চৈত্রিকা। কন্ঠে একরাশ বিস্ময় ঢেলে জিজ্ঞেস করল,
' কি হয়েছে সাফারাত?'
' আমার মন, হৃদযন্ত্র ঠান্ডায় জমে অচল হয়ে যাচ্ছিল চৈত্র আপনাকে দেখতে না পেয়ে। চৈত্র মাসের তাপ বড্ড প্রয়োজন তাই ছুটে আসা। '
কথাটা সমাপ্ত করেই সাফারাত দু হাতে চৈত্রিকাকে টেনে বাহুডোরে বন্দী করে নেয়। চৈত্রিকা হকচকিয়ে যায়। অবিন্যস্ত দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বুলায়। পুরো ড্রইং রুম জুড়ে পিনপতন নিরবতা। কেউ নেই তবুও চৈত্রিকার ভয় হচ্ছে যদি অকস্মাৎ কেউ চলে আসে!উফ!সাফারাত তো ওর হাসবেন্ড। কিশোরী বয়সে প্রেম করলে মেয়েরা যেমন ভয়ে ভয়ে থাকে,তেমনই লজ্জা, ভয়ে মাখামাখি অবস্থা ওর। সাফারাত ওষ্ঠদ্বয় গালের কাছে আনতেই মৃদু চিল্লিয়ে উঠল ও। এতেই সাফারাতের কান যেন ফেটে গেল। তীক্ষ্ণ চাউনি নিক্ষেপ করল সে। এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে বিরক্ত স্বরে প্রশ্ন করে,
' হোয়াট হ্যাপেন্ড চৈত্র? '
কাঠ কাঠ কন্ঠস্বর। বিরক্তির সঙ্গে রাগ মিশ্রিত। চৈত্রিকা রোষপূর্ণ দু'চক্ষে বিচলিত দৃষ্টিতে চেয়ে প্রতুত্তর করলো,
' কেউ দেখে ফেলবে। '
সাফারাত আগ্রহ নিয়ে চেয়ে বলল,
' আপনি কি আমার প্রেমিকা?'
চৈত্রিকা নেত্রদ্বয় নিচু করে আওড়ালো,
' বউ। '
' তাহলে আপনাকে আদর করার লাইসেন্স আছে আমার। নো টেনশন। একটা চুমুই দিব, কেউ দেখবে না৷ '
দ্রুত গতিতে সাফারাত রুক্ষ শুষ্ক ঠোঁট জোড়া দিয়ে চৈত্রিকার কপোলে চুমু খেল। তৎপরে অন্য একটা গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে গেলে দু'জনের শ্রবণগ্রন্থিতে হুড়হুড় করে পৌঁছালো একটা চিকন,সূক্ষ্ম মেয়েলি কন্ঠস্বর । চৈত্রিকা চোখ তুলে সেদিকে তাকাতে পারল না, তার পূর্বেই মেয়েটা ওদের কাছে এসে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলে উঠল,

' নিজের হবু বউ রেখে তুমি অন্য একটা মেয়েকে কিস করছো সাফারাত?ঠকালে আমাকে?তুমি এখনই আমায় কিস করবে,এখনই। '
কথাটা বলতে বলতে চৈত্রিকাকে ঠেলে সরিয়ে মেয়েটা পলকেই সাফারাতের অতি সন্নিকটে এসে হাজির হয়।

পর্ব___৫২

শক্তপোক্ত হাতের তিন তিনটে থা'প্প'ড় লাল টসটসে কপোলে মাখিয়ে ফাইয়াদের বক্ষে পড়ে আছে জাইফা। অতর্কিতে এমন এক কান্ডে মুখে হাত চৈত্রিকার। অন্যদিকে বুকে একটা মেয়ে পড়ে আছে এতে ফাইয়াদ হতভম্ব,বাকরুদ্ধ। দু' হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সে। কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা। সাফারাত, চৈত্রিকা দু'জনে বাহিরে আসছিল না অনেকক্ষণ সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরও। তাই ফাইয়াদ ডাকতে আসে,ঠিক সেই মুহুর্তে তুলোর মতো উড়ে এসে ওর বুকে হামলে পড়ে লাল চুলের,সাদা চামড়ার এক মেয়ে।

চৈত্রিকা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাফারাতের কপালের শিরা উপশিরা ভেসে উঠেছে। ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ। মেয়েটা তখন ওকে ঠেলে সাফারাতের সমুখে আসতেই ' জাইফা ' নামে চাপা গর্জন করে উঠে সাফারাত। সঙ্গে সঙ্গে চৈত্রিকার সমস্ত দেহ কেঁপে উঠে,ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মেয়েটার দিকে চাইতেই পলকেই সপাটে চড় বসিয়ে দেয় সাফারাত। চৈত্রিকা জাইফা কে ধরতে যাবে তার পূর্বেই মেয়েটা ফাইয়াদের বুকে ঠাঁই পায়। ফাইয়াদের চলাচল আয়ান ও সাফারাতের সঙ্গে হওয়ার সুবাদে ছোট খাটো গেট টুগেদারে তাকেও শামিল করা হয়।

ফাইয়াদ গিয়ে কি হাওয়া হয়ে গেল?সিনথিয়া উঠতে নিলে প্রিয়ন্তী চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললো,
' আমি যাচ্ছি ভাবী। আপনি এখানে থাকুন। '
এটা বলে প্রিয়ন্তী দরজার কাছে আসতেই ওর চক্ষু চড়কগাছ। অন্তস্থল কেমন যেন নড়ে উঠল। মনে এক সেকেন্ডের ঝড় বয়ে গেল। দীর্ঘ হলো না। তবে ঝড়ের বেশ বেগ ছিল,হৃদপিণ্ড কেমন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। ফাইয়াদের বুকে জাইফা!কিন্তু কেন?ফাইয়াদ জাইফাকে কেন বুকে নিল?নানা প্রশ্নে অভ্যন্তর হাস ফাঁস করতে আরম্ভ হয় প্রিয়ন্তীর। আকস্মিক লোহার মতোন ভারী হয়ে যাওয়া পা দু'টো টেনে টেনে ওদের কাছে এসে দাঁড়াল। দেখল,জাইফা অতীব স্বাচ্ছন্দ্যে নাক টেনে টেনে বন্যা বইয়ে দিচ্ছে ফাইয়াদের বুকে। অপরদিকে ফাইয়াদ নির্বিকার। মাথা উচিয়ে দেখতে চাইল প্রিয়ন্তী ফাইয়াদের মুখে বিরক্তি আছে কি-না। না নেই, আছে কেবল অবিশ্বাস্য ভাব। প্রিয়ন্তী ঝটপট নজর সরিয়ে আনল। জাইফার এতো নিশ্চিন্তে অশ্রুপাত, ফাইয়াদের কোনো প্রকার অভিব্যক্তি না করায় প্রিয়ন্তীর মন বলছে এরা পূর্ব পরিচিত ও দু'জন হয়ত প্রেমিক -প্রেমিকা। কিন্তু সাফারাত ও চৈত্রিকার সামনে এভাবে আলিঙ্গন? প্রিয়ন্তী লজ্জা অনুভব করল। হতে পারে এদের দেশে এসব চলে,কিন্তু ওরা তো ভিন্ন দেশের। একটুও চোখ সরমভরম নেই! যে দেশে প্রকাশ্যে ওষ্ঠাধরের মিলন হয়,তাতে আলিঙ্গন তো খুবই তুচ্ছ এক বিষয়। প্রিয়ন্তীর মনে ফাইয়াদের জন্য যে ভালো লাগার জায়গা টা তৈরি হয়েছিল তা নিমেষে খন্ড দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। গলা ধরে আসছে,কন্ঠনালিতে শব্দমালা আঁটকে যাচ্ছে, তবুও ঢোক গিলে সাফারাতকে ডাকল,

' ভাই?বাহিরে সবাই ডাকছে। '

মেয়েটার কথার সুর ঝংকার তুলে ফাইয়াদের কর্ণকুহর হলো। কোকিলের মতো বেজে উঠল যেন। মুহুর্তেই জাইফাকে বুক থেকে এক প্রকার ছিটকে ফেলে দিল। জাইফা এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পায়। থা'প্প'র খেয়ে সমস্ত দেহ অসাড়তা লাভ করেছিল। থরথর করে কাঁপছিল মেয়েটা। সাফারাত বিরক্তিসূচক কন্ঠে বলে উঠল,

' তোরা যা,আমি চৈত্রকে নিয়ে আসছি। আর সাথে এই উন্মাদ মেয়েটাকে নিয়ে যাবি। আমার চোখের সামনে যেন না পড়ে। বিবাহিত পুরুষের গায়ে লেপ্টে পড়ে। আমি এক বাচ্চার বাপ হতে যাচ্ছি এবার পিছু ছাড় বোন। '

শেষের কথাগুলো শুনে চক্ষুদ্বয় পিটপিট করে তাকালো জাইফা। এক তো থা'প্প"ড়ে ভীষণ আহত সে, তার উপর সাফারাতের রাগমিশ্রিত বাংলা শব্দাংশ,বাক্য। সে বাংলা পারে কিন্তু ঠিকঠাক নয়। সাফারাত এক বাচ্চার বাপ হতে যাচ্ছে শুনেই হুড়মুড়িয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল জাইফা। সেদিকে চেয়ে চৈত্রিকা সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছাড়ল। সাফারাত এভাবে জাইফাকে আ*ঘাত করবে ঘূনাক্ষরেও কল্পনা করে নি ও। এত ক্রোধ,জেদ এই লোকটার! আর মেয়েটাও বাচ্চামো স্বভাবের। জাইফা নামটা সাফারাতের মুখে শুনেই চৈত্রিকার চট করে মনে পড়ে যায় বাংলাদেশে থাকাকালীন আলো বলেছিলেন জাইফা নামের একটা মেয়ের সাথে উনি সাফারাতের বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছিলেন কিন্তু সাফারাত রাজি হয় নি। চৈত্রিকা মনে মনে বলল, ' এই মেয়েই তাহলে জাইফা যে সারাক্ষণ সাফারাতের কাছ ঘেষঁতে চাইত!'

ভাবী-ভাইকে একান্তে ছেড়ে প্রিয়ন্তী বেরিয়ে আসে। এখানে কি হয়েছে কিছুই ওর বোধগম্য হচ্ছে না। কিন্তু মনটা অতিশয় বেই'মানি শুরু করেছে ওর সঙ্গে। বারংবার চক্ষে ভাসছে ফাইয়াদের বুকে জাইফার অবস্থানের দৃশ্য খানা। জাইফা আয়ানদের পাশের বাসার। প্রতিবেশী। মিসেস তিয়ানার একমাত্র কন্যা। বাগানের দিক টায় যেতে নিলে বিচলিত একটা স্বর ডেকে উঠল ওকে--' প্রিয়ন। '
পা জোড়া থেমে গেল। ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল ফাইয়াদকে। ফাইয়াদ তড়িৎ বেগে উপস্থিত হলো ওর সম্মুখে। জিজ্ঞেস করলো,
' ওই মেয়েটা কে টুমি চিনো?আমার বুকে পড়েছিল। '
প্রিয়ন্তীর ভ্রুঁ যুগল কপাল ছুঁয়ে দিল তৎক্ষনাৎ। রুক্ষ কন্ঠে,গলায় তেজ ঢেলে বলে উঠল,
' আপনার গার্লফ্রেন্ডকে আপনি চিনেন না?জার্মানির বাচ্চা ন্যাকামি তো ভালোই পারেন। মিথ্যুক একটা। আরেকবার প্রিয়ন ডাকলে শরীরের ছাল তুলে ফেলব। ছোট হতে পারি,বেক্কল না। '

কথাগুলো বলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে প্রিয়ন্তী হনহনিয়ে ত্যাগ করল স্থান। ফাইয়াদ আহাম্মকের মতো চাইল। চক্ষু কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবার উপক্রম। প্রিয়ন্তী এত দ্রুত বাংলা বলেছে ছেলেটার মাথায় কিছুই ধরে নি। বিড়বিড় করতে থাকে,
' ইশ!প্রিয়ন কি বলে গেল?মোবাইলে রেকর্ড করে রাকলে তো পরে আসতে আসতে সুনে বুঝতে পারতাম। '
.
.
সাফারাত মাথার কয়েক গাছি চুল টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে নেয়। রাগ জিনিসটা নিজের উপর চওড়া হতে দেয় না সহজে। যথেষ্ট চেষ্টা করে সংবরণের। জাইফার কুরুচিপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে পারল না। মেয়েটা আগে থেকেই উড়নচণ্ডী দশার। বছরে কয়েকবার বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো তার স্বভাব। সাথে অভিনব, নতুন বিএফ তো আছেই। এ ধরনের মেয়ে একদমই পছন্দ না তার। দেখলেই মস্তিষ্কে রক্ত চাপে। খু*ন করার নেশা জাগ্রত হয়। চৈত্রিকাকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিয়ে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলো,
' ঠিক আছেন আপনি চৈত্র?'
' জ্বি। '
' চলুন তাহলে। '

কেউ চেয়ারে,কেউ ঘাসের উপর আবার কেউ কেউ দোলনায় বসে আছে। বাগানের একপাশে পাতানো বেঞ্চে খালুর পাশাপাশি একটা অপরিচিত বয়স্ক লোক কে দেখতে পেল চৈত্রিকা। আলো বেগমের পাশাপাশিও একটা অপরিচিত মহিলা বসে খুশগল্প করছেন। আলো চৈত্রিকাকে সাফারাতের পাশে দেখতে পেয়ে এক গাল হাসি হাসলেন। বিদেশি মহিলা টার দিকে চেয়ে ইংরেজি ভাষায় বলে উঠলেন,
' লুক তিয়ানা শি ইজ চৈত্র। সাফারাতের ওয়াইফ। তোমাকে ওর কথা-ই বলেছিলাম। '

মিসেস তিয়ানা হাসোজ্জল মুখে তাকালেন। চোখ দুটো বেশ টানা টানা। পুরো চেহারা জুড়ে যেন আলোর ছটা। অতীব সুন্দর নারী। চৈত্রিকার অনেক পছন্দ হলো ওনার মনোমুগ্ধকর হাসি টুকু। অতঃপর শুনতে পেল ওনার সাবলীল কন্ঠস্বর,
' হাউ আর ইউ কিউট গার্ল?ইউ আর সো প্রিটি। '

চৈত্রিকা লজ্জা পেল অল্পসল্প। রূপে সে পিছিয়ে নয়। বেশ ফর্সা ও সুন্দর। বরং এতকাল মানসিক অশান্তি, পরিবারের টানাপোড়েন, বাবার দেওয়া কষ্ট সব মিলিয়ে ফুলের ন্যায় মূর্ছে গিয়েছিল। প্রেগন্যান্ট হবার পর রূপ,সৌন্দর্য দ্বিগুণ হলো। সাফারাতের মতো জীবনসঙ্গী পেলে বোধহয় কোনো মানসিক অশান্তি জীবনে ভর করতে পারে না। প্রতি মুহুর্ত,প্রতিক্ষণ সুখের হয়। তবে যেই মানুষ টা মুঠো ভরে আঁজলা তে সুখ ঢেলে দিচ্ছে সে কি সুখী?মানসিক কষ্ট তার হৃদয় রক্তাক্ত করছে না তো?চৈত্রিকা নম্রতার সহিত জবাব দিল,
' ফাইন মিসেস তিয়ানা। হাউ আর ইউ? '
' ফাইন,প্রিটি গার্ল।'

আলো বেগম সবাইকে কফি দিয়ে, আরেক কাপ কফি হাসিমুখে সাফারাতের দিকে বাড়িয়ে দিল। সাফারাত কফি কাপের দিকে এক পলক চেয়ে ওনাকে পাশ কাটিয়ে ফাইয়াদ ও আয়ানের পাশে গিয়ে বসে পড়ল। তিয়ানা,সিনথিয়া,চৈত্রিকা বিস্মায়াবিষ্ট হয়ে পড়ে সাফারাতের আলো বেগমকে করা উপেক্ষা অবলোকন করে। চৈত্রিকা তীররেখা নজরে সাফারাতের দিকে তাকাল। সকল যোগ,বিয়োগের সমাধান তো হলো কিন্তু কোথাও আলোর দোষ খুঁজে পেল না ও। হুট করে একটা মানুষের এত ঘৃ'ণার কারণ কি? আলো বেগম কি সাফারাতের মা'য়ের মৃ/ত্যুর কারণ? দ্বিতীয় খু*নি?নয়ত সাফারাত কেন ঘৃ'ণার দৃষ্টিতে তাকায়!হুট করেই চৈত্রিকার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। ভুল ভাবছে সে। মা'য়ের মত স্নেহ,স্বার্থবিহীন উজার করে ভালোবাসা,সাফারাতকে শক্ত করে গড়ে তোলা সেই নারী বেই*মান কি করে হতে পারে!এ ভাবনা টাই যেন তুচ্ছ, নিরর্থক।
________________

বার্লিন শহরজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত। প্রভাতে এত বর্ষণ ভীষণ মন সতেজ করা অনুভূতির জন্ম দেয়। পরিবেশ রোমাঞ্চকর করে তুলে। বিশাল কাঁচের প্রাচীর টা বেয়ে পানির ধারা নেমে যাচ্ছে নিম্নদিকে। বিছানায় শুইয়ে শুইয়ে এমন এক সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য ক'জনের হয়!চৈত্রিকা দেয়ালে টার দিকে মুখ করে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। চক্ষু মুদে আবারও দৃষ্টি মেলে দিল স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল টায়। বার্লিনের বৃষ্টির কি অপরুপ দৃশ্য!

ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে সৌন্দর্য দেখায় বাঁধা পড়ল চৈত্রিকার। অনুভূতিরা ভয়ংকর, মারা/ত্মক,বেসামাল হয়ে উঠল। সাফারাত হাতের তোয়ালে টা রেখে ওর অনাবৃত দেহে একটা শুভ্র রঙের পাতলা শার্ট জড়িয়ে নিল। অধিক সুন্দর হওয়ার দরুন শার্ট টা বেশ মানিয়েছে তাকে। চৈত্রিকা নিষ্পলক, নির্নিমেষ চেয়ে রইল অনেকক্ষণ,বেশ দীর্ঘ সময়। আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে,
' এত সকাল সকাল শাওয়ার নিলেন যে?কোথাও যাচ্ছেন?'

' সকাল সকাল শাওয়ার নিয়েছি বলেই এই প্রশ্ন নাকি সন্দেহ? মধুর রাত পাড় করা ছাড়াও প্রভাতে শাওয়ার নেওয়া যায় চৈত্র মাস। রিলেক্স থাকেন। ' সুখ ' আসুক তারপর নাহয় আপনি ও আমি দু'জন একসাথে শাওয়ার নিব,একদম সক্কালে। '

সাফারাতের দুষ্টমির স্বর শুনে চৈত্রিকার দু'গাল টুকটুকে লাল বর্ণ ধারণ করল। উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজতে নিলে কানে আসে সাফারাতের কঠিন কন্ঠের কড়া নিষেধাজ্ঞা,

' ভুলেও উপুড় হবেন না চৈত্র। সুখ ব্যাথা পাবে এবং আপনিও। '

উপুড় হলে তো পেটে চাপা পড়বে তা মাথায় ছিল না চৈত্রিকার। পা দু'টো সোজা করে শুইয়ে রইল। রুমের এক কোণায় বড় বড় টলি ব্যাগগুলো দেখে বলল,
' আমরা সত্যিই চলে যাবো?খালামণি কষ্ট পাবেন। আয়ান,সিনথিয়া কাউকেই বলা হলো না। না গেলে হয় না সাফারাত?'

চৈত্রিকার শেষের কথাটা করুন শোনাল। সাফারাত আয়নার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার তাকালো। পরক্ষণেই শার্টের হাতা গুটিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল ওর দিকে। বিছানায় শুইয়ে চমকিত নয়নে চেয়ে চেয়ে দেখছে চৈত্রিকা। ধীরস্থির ভঙ্গিতে সাফারাত ওর কাছাকাছি এলো। খুবই সন্নিকটে। ওর তৈলাক্ত মুখশ্রীর পানে ঝুঁকে চেয়ে থাকল অনিমেষ নেত্রে। চৈত্রিকা নির্বাক। চোখ বুঁজতেই সাফারাত উষ্ম ঠোঁট চেপে ধরল ওর ললাটে। মুহুর্তেই কোমল দেহখানির রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বয়ে গেল। বিছানায় দু ' হাত ভর দিয়ে সাফারাত ছুঁয়ে দিল চৈত্রিকার কম্পনরত অধর। সাথে সাথে সরে এলো না। বরঞ্চ মিনিট খানেক ব্যয় করে দীর্ঘ এক চুম্বনে লিপ্ত হয়। চৈত্রিকার শ্বাস ক্রমাগত ভারী হয়ে আসে। সাফারাত তুখোড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার অবস্থা। বুকের উঠানামা, ঢেউ খেলানো। গালে এক হাত রেখে স্থির করলো ওকে। ডাকল,
' চৈত্র মাস!'
চৈত্রিকার মুহুর্তেই সাড়া--' হু!'
সাফারাত আদুরে গলায় বলে উঠল,

' আমি একটা সুন্দর, সুস্থ, সুখের জীবন চাই চৈত্র। সকল বেই'মান দের থেকে দূরে গিয়ে আপনাকে,সুখ কে নিয়ে,প্রিয়ন্তীকে নিয়ে সুখের সংসার চাই। প্লিজ আমাকে বাঁধা দিবেন না। কারো প্রতি এতটাও বিশ্বাস রাখবেন না যার আসল রূপ প্রকাশিত হলে আপনি মানসিক ভাবে ধ্বংস হয়ে যাবেন। '

সাফারাত সরে গেল। পুনর্বার তাড়া দিয়ে বলে,
' উঠুন। আমরা একটু পরেই বেরিয়ে যাব। আয়ানকে গত রাতে বলেছি আমি আলাদা থাকব। ও একটু কষ্ট পেয়েছে কিন্তু আমাকে বুঝে খুব। '
________

প্রিয়ন্তী, চৈত্রিকা রেডি হয়ে নিচে আসল। ক্যাথরিন ব্যাগগুলো বাহিরে নিয়ে যাচ্ছে। সাফারাত খালুর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। আয়ানও বেরিয়ে পড়ল ওর সাথে। সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল চৈত্রিকা। আয়মানের কথা জিজ্ঞেস করতেই ও জানায় যদি আয়মান জানে ওরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে এখানে থাকবে না তাহলে তুলকালাম বাঁধিয়ে দিবে ছেলেটা। কখনই যেতে দিবে না। এটা শুনে চৈত্রিকার খারাপ লাগল। ছেলেটার সারাক্ষণ সুখ সুখ বলে মামী মণির যত্ন নেওয়াটা ভীষণ মিস করবে ও। সবাইকে ড্রইং রুমে দেখলেও আলো কে কোথাও দেখল না। সিনথিয়া ওর চোখের দৃষ্টি দেখে বললো,
' আম্মু তোদের বিদায় দিতে পারবেন না তাই রুমের দরজা লক করে বসে আছেন। সাফারাত এখানে আসার পর আম্মুর সাথে ঠিকঠাক কথা বলছেন না। এমনকি এ বাড়ি ছেড়ে ভিন্ন জায়গায় থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তুই কি জানিস ওর এমন করার কারণ?'

মাথা নাড়িয়ে না বললো চৈত্রিকা। সিনথিয়া ছোট্ট নিঃশ্বাস ছেড়ে চৈত্রিকাকে আলো বেগমের রুমের সামনে নিয়ে গেল। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা মেললেন না তিনি। বাধ্য হয়ে ওনাকে বিদায় না জানিয়েই বেরিয়ে আসতে হলো। গাড়িতে উঠে যখন সাফারাতের পাশে বসল অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই দেখতে পেল আলো বেগম মুখে ওড়না চেপে ধরে কাঁদছেন খোলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। চৈত্রিকার বুক টা থরথর করে কাঁপল। ধীরে ধীরে চলন্ত গাড়ি থেকে জানালা দিয়ে আবারও তাকালো বারান্দার দিকে। সাফারাতের উদ্দেশ্যে তড়তড় করে ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠল,

' খালা মণি কাঁদছেন সাফারাত। গাড়ি থামান। একটা বার কথা বলে আসুন ওনার সাথে। '

চৈত্রিকার সেই স্বর আমলে নিল না সাফারাত। উল্টো চোয়াল শক্ত করে গাড়ির গতি বাড়িয়ে ছুটে চলল বার্লিন নগরীর অপর এক প্রান্তে।

# চলবে,,,,!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন