ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভালোবাসাটা যে হয়ে গেল

পর্ব 10

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

#ভালোবাসাটা_যে_হয়ে_গেল
#লেখিকা: আসরিফা সুলতানা জেবা
#পর্ব___১০( সমাপন)

" রিনি,এই রিনি?"
" হু?"
" এভাবে ঘামছ কেন?"
রিনির সমস্ত কায়া ঘামে ভিজে জবজবে। হাত-পায়ের তালু পর্যন্ত ঘামাচ্ছে। মাথার ওপর বৃত্তাকারে ঘূর্ণনরত পাখার বাতাসকে উত্তপ্ত লাগছে প্রচণ্ড। খানিকক্ষণ পূর্বে অন্তরের দেওয়া থ্রে-টে, তার বলিষ্ঠ দেহের ভারে বুক ধড়ফড়িয়ে শরীর ঘামছে শুধু। অন্তর বোধহয় তার মনোভাবনার হদিস পেয়ে গেল। কানের পাতার নিকটস্থ ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসাল আদুরে স্বরে,
" রিলেক্স হও, বাচ্চা মেয়ে রিনি। আমি কি এতটাই খারাপ যে তোমার অনুমতি ছাড়া কিছু করব? আজ কিছু করব না,শুধু তোমার ওপর থেকে নড়ব না। তোমার ওপরেই ঘুমাব৷ এটাই তোমার শা-স্তি।"

লাজে রিনির গালগুলোয় উষ্মা ছড়িয়ে পড়ল। শ্বেত ত্বকে ভিড়ল কৃষ্ণচূড়ার র-ক্তিম লালিমা। হৃদয়স্থে বাজছে রণডাক। মিনমিনিয়ে বলল,
" আমি নড়তে পারছি না।"
" নড়তে দিব না।"
" একটু ছাড়ুন প্লিজ। পালাব না।"
" বিশ্বাস করছি না।"
" ছেড়েই দেখুন না।"
" ছাড়তে যে ইচ্ছে করছে না। আজ তোমাকেই বিছানা বানিয়ে পরম তৃপ্তিতে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।"
" তাহলে হাতটা অন্তত ছাড়ুন।"
" খাম-চাবা?"
" উঁহু, তখন ছাড়া যাওয়ার জন্য এমন করেছিলাম। "
" এখনো যদি ছাড়া পাওয়ার জন্য এমন করো?"
" যদি করি তাহলে হাত দুটি বেঁধে দিয়েন।"

অন্তর মুখ তুলে চাইল। গভীর,প্রগাঢ় চাহনি গিয়ে ঠেকল রিনির তিরতির করে কম্পনরত ওষ্ঠে। চেয়ে থাকল অনিমিষ। হরমোনের প্রবল সাড়ায় বেহায়াপনা করতে চাইল মন। উন্মত্ত হয়ে বলল,
" যদি করো তাহলে আমি তোমার পদ্মের মতো গোলাপি ঠোঁট দুটিকে আমার ঠোঁট দিয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে দিব।"

রিনির কাজল কালো আঁখিযুগল বড়ো বড়ো হয়ে গেল।
উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল দেহে। এটা শাস্তির তরিকা না-কি রিনিকে মে-রে ফেলার কুবুদ্ধি? মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করল,
" আপনি এমন ছিলেন না৷ এত অভদ্র ছিলেন না আগে।"

অন্তর ওর মুখের ওপর ঝুঁকে স্বীকার করল," ভালোবাসাটা তো আগে হয় নি তাই ভদ্র ছিলাম। ভালোবাসা হওয়ার সাথে সাথে অভদ্র হয়েছি।"

রিনির কৌতূহলী সত্তা প্রশ্ন করে বসল," কেন?"

মুহূর্তে মোহমন্ত্র জপল যেন অন্তর," ভালোবাসলে প্রিয়তমার নিকট অভদ্র হতে হয়,নাহলে ভালো প্রেমিক হওয়া যায় না। আমি যে শুধু তোমার স্বামী নই,প্রেমিক হতে চাই,আমার বউ রিনির অভদ্র প্রেমিক।"

শশব্যস্ত হয়ে এক ফালি সুখ রিনির মনের অলিন্দে ঠাঁই নিল। ঝড়ো হাওয়া এসে হৃদয় দুয়ার ধাক্কাল। অভিমানের মোমটা যেন আগুনের পরশ পেয়ে গলতে আরম্ভ করল অল্পস্বল্প। রিনি হাত ছাড়া পেয়ে চোখ বুঁজে নিল। নিষ্কৃতি পাওয়া হাত দুটো অন্তরের দেহের দু পাশে বিছানায় ফেলে রাখল। ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত দেহে ঘুম নেমে এলো ঝুপ করে।

আনোয়ার সকালের সূচনা লগ্নে চলে এলেন মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে। মুখশ্রী গম্ভীর, থমথমে। শামসুল হক বেজায় বিরক্ত ছেলের ওপর। দুইটা দিন ধৈর্য ধরলে মেয়ে সুড়সুড় করে চলে আসত,কিন্তু তর সইল না অন্তরের। রাত-বিরেতে গিয়ে তুলে নিয়ে আসল। কত বড়ো অসামাজিক,ডাকাবুকো কারবার! এতবার করে হাঁক ছাড়ার পর নিজেও আসছে না,বউকেও আসতে দিচ্ছে না। দুয়ার বন্ধ করে ঘরে বসে আছে বউকে নিয়ে। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে ফেলেছে একেবারে। শামসুল হক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে বললেন,
" চিন্তা কইরো না। মাইয়া তার জামাইয়ের লগেই আছে। চিন্তা কীয়ের,কও?"
" চিন্তা তোমার পোলা-ই। রাইতের বেলা জোর কইরা আমার মাইয়ারে নিয়া আইছে। মাথা খারাপ হইয়া গেছে তোমার পোলার?"
" হ,তোমার মাইয়ার লাইগা-ই।"

কণ্ঠটা খাদে নামিয়ে বললেও শুনতে পেলেন আনোয়ার। থ মে-রে গেলেন। তারপর বললেন,
" আমার মাইয়ার জন্যে পাগল হইলে তারে রাতের বেলা উঠায় নিয়ে আসতে হইব? যদি কোনো বিপদ হইত? এহন আবার সামনে আইতে দিতেছে না। তোমার পোলারে কও আমার মাইয়ারে নিয়া সামনে আইতে।"

রিনি ঘরের ভেতরে পায়চারি করছে ক্রমাগত। অন্তর দরজা খুলে বাহিরে যেতে দিচ্ছে না তাকে। রাতভর শরীরের ওপর ঘুমিয়ে তার কোমল দেহটাকে ব্যথা করে দিয়ে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে আছে। উপরন্তু রিনিকে সিংহের মতো হুংকার দিচ্ছে বাইরে গেলে তার অবস্থা কাহিল করে ছাড়বে। কাছে এসে রিনি অনুনয় করল,

" সবাই খারাপ ভাববে। আমি আব্বার সাথে একবার দেখা করে আসি।"
" দেখা করার নাম করে বাপের সাথে চলে যাওয়ার ধান্ধা?"- চোখ কটমট করে বলল অন্তর।
রিনি দ্রুত মাথা নেড়ে অসহায় মুখ করে বলল," আপনি ভুল ভাবছেন। যাব না আমি। শুধু একবার দেখা করি। "
" যদি বাপের সামনে তোমার সাহস বেড়ে যায়?"
" বাড়বে না। "
" ওকে,চলো। গিয়ে বাপকে সুন্দর করে বলবা, তুমি আমার সংসার করতে চাও। ঠিক আছে? "
রিনি কলের পুতুলের মতো মাথা নেড়ে বলল," ঠিক আছে। "

অন্তরের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বাবাকে পাঠিয়ে দেয় রিনি। সে বুঝে গেছে সাহস দেখিয়ে চলে গেলে ভদ্রতার খোলস ছেড়ে অভদ্র হয়ে ওঠা লোকটা পুনরায় তুলে নিয়ে আসবে তাকে। শা-স্তি জোরালো হবে তখন। পিঠের,শরীরের ব্যথায় মরো-মরো দশা তার। নতুন শা-স্তি ভোগ করার শক্তি শরীরে উদ্বৃত্ত নেই। বাবার সাথে ফিরতে পারে নি তাতে কী হয়েছে? অভদ্র লোকটাকে সে অন্যভাবে শায়েস্তা করবে৷ সালেহা কাঠের আলমারি থেকে নতুন তিনখানা শাড়ি দিল তাকে দুপুরের গোসল সেড়ে পরার জন্য। কাপড়-চোপড় লোক মারফত পাঠিয়ে দেবেন আনোয়ার। শাড়িগুলো তাঁতের। ভাঁজ ভাঙা হয় নি আগে। রিনি গোসল সেড়ে কলাপাতা রঙের একটি শাড়ি পরে নেয়। ভেজা কাপড়গুলো বালতিতে ভরে বাহিরে আসলে তার হাত থেকে বালতিটি খপ করে টেনে নেয় অন্তর। অন্য হাতে ঔষধের পাতা ধরিয়ে দিয়ে বলে,
" আমি মেলে দিচ্ছি। তুমি ঔষধটা খেয়ে নিও।"
হঠাৎ বালতি টানায় চমকে ছিল রিনি। হাতে ঔষধের পাতা ধরে বিস্ময়ে প্রশ্ন করে,
" কীসের ঔষধ? "
অন্তর আশেপাশে চোখ বুলায়। রসুইঘরে সালেহা কাজ করছেন। মায়ের কান বাঁচিয়ে বলল,
" সারারাত যে তোমার ওপর ঘুমিয়ে তোমাকে ব্যথা দিয়েছি সেটার ঔষধ। "

রিনি বাকশক্তি হারিয়ে বোবা বনে গেল। ফ্যালফ্যাল নয়নে চেয়ে রইল অন্তরের চলে যাওয়ার দিকে। চোখে পড়ল তাকে সেদিন কটুকাটব্য করা অন্তরের চাচাতো ভাইয়ের বউকে। পানি নিতে এসেছেন কলসি হাতে করে। সেদিনের তিরস্কারে দুঃখ পাওয়া মনটা রিনিকে প্রবোধ দিল তার পেছন পেছন যেতে। কলপাড়ে গিয়ে ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে প্রশ্ন করল,
" ভালো আছেন,ভাবি?"
" হ,তুমি কেমন আছ?"- কল চাপতে চাপতে উত্তর দিল সেলিনা।
" ভালো ভাবি। আপনার দেবর চলে এসেছে, শুনেছেন?"
" হু,এমন পাগলামিডা ক্যান যে করতে গেল!"
বাঁকা হাসি ফুটে উঠল রিনির ঠোঁটে। ওদিনের অপমানের কড়া জবাব দেওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সুর টেনে বলল,
" আপনার দেবর আমার মধ্যে এতোটাই তৃপ্ত যে এমন পাগ-লামি করতে বাধ্য হইল, ভাবি। থাকতে পারতেছিল না আমাকে ছাড়া। তাই ছুটে আসছে পাগল পাগল হয়ে।"

সেলিনার মুখ রাতের আকাশের ন্যায় কালো হয়ে গেল। অপমানের সূচ বিঁধল গায়ে। রিনি ঠোঁট টিপে হাসল তার আঁধার মুখখানা দেখে। পরিমিত শান্তি অনুভব করছে ও এখন। দীর্ঘদিন ধরে গেঁথে থাকা কা*টা টা থেকে অব্যাহতি মিলল পরিশেষে। রাতে খাওয়ার পর রিনি তার পরিকল্পনামাফিক দাদির ঘরে চলে গেল। তাকে দেখে দাদি উত্তপ্ত তেলে পানি পড়ার মতো ছ্যাঁৎ করে উঠেন,

" তুই এখানে আইছস ক্যান, নাতবউ।? যা যা তোর ঘরে যা।"
রিনি তার পাশে বিছানায় শুয়ে বলল," আমি আজ আপনার সাথে ঘুমাব।"
" ক্যান? তুই আমার লগে ঘুমাইবি ক্যান? আমার নাতিরে দুঃখ দেওনের লাইগা? আমি বুঝি না ভাবছস?"
রিনি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল," নাতির দুঃখ বুঝেন, আমার দুঃখ বুঝেন না?"
" তোর দুঃখ জায়েজ, আমার নাতির দুঃখও জায়েজ। তার থেকে বড়ো কথা তোরা দুইডা দুইডারে বহুত ভালোবাসস। মিল্লা যা দুইজনে। "
বাচ্চাদের মতো অভিমান করল রিনি," আমাকে ফেলে চলে গেল কেন? স্বার্থপর লোক একটা।"

" তখন ওয় তোর প্রতি ভালোবাসা বুঝতে পারে নাই, বুবু। দূরে গিয়া ভালা হইছে,যা ও দেশে থাকতে বুঝতে পারে নাই তা বিদেশ গিয়া বুঝছে। বুঝছে বইলাই বাপের টাকা-পয়সা নষ্ট কইরা তোর কাছে চইলা আছে। আমার মর্দ হইলে এমন করত না। আমার তাইনে সংসারডা করছে দায়িত্বে। কোনোদিন কয় নাই মোহাব্বত করে। মোহাব্বত করত অইন্য মাইয়ারে। মাইয়ার লগে জাত-পাত মিলে না দেইখা বাপে জোর কইয়া আমার লগে বিয়া দিল। আমিও মাইনা নিয়া তোর দাদার লগে সংসার করছি,শরীলের টানে এক হইছি,চার পুতের মা হইছি। বুড়াডা ম-রণের আগ দিয়াও একবার আমারে ভালোবাসল না। অন্তর তোর লগে এমন করলে পারত। মোহাব্বত ছাড়া যহন অন্তর তোরে মাইনা নিত,তোর দায়িত্ব পালন করত তহন তুই ভালোবাসার লাইগা কষ্টে ম-ইরা যাইতি বুবু। তহন তোর মনে হইত মোহাব্বত ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বি-ষ কচুর মতো। জ্বলতে জ্বলতে ম-রতি। অন্তর বুঝদার, ভালা পোলা দেইখা ভালোবাসা ছাড়া তোরে হুদাই একটা সম্পর্কে বাইন্ধা রাইখা যন্ত্রণা দিতে চায় নাই। বিয়াডাও করতে চায় নাই। ওর বাপে জোর করল। তোরে বিয়ের আগে জানাইল সব। তোরা দুইজনেই বাধ্য হইয়া বিয়া করলি। যহন ভালোবাসা হইল তোর লাইগা আমার বুঝদার নাতিডা নিজের স্বপ্ন,মেহনত,বাপের টাকা জলে ফালাইয়া তোর কাছে চইলা আইল। ওয় ছোডু থাকতে আমারে কইত দাদি আমি একদিন বিদেশ যামু। কত বড়ো স্বপ্ন আছিল ওর! কতডি দিন, বছর মেহনত করছে পড়তে যাওয়ার লাইগা। তোর জইন্য সব মেহনত ভুইলা আইয়া পড়ছে। নিজেরে কষ্ট দিস না,ওরেও না দিস না। দ্যাখ কেমনে কাতর হইয়া ডাকতাছে তোরে। "

বিরতিহীন দরজায় ঠুকঠুক আওয়াজ করছে অন্তর। গলার স্বরে চাপা রাগ," দাদির ঘর থেকে বেরিয়ে আসো,রিনি।"

রিনি সাড়া দিল না। চোখ খিঁচে শুয়ে রইল। দাদির কথাগুলো প্রজাপতি হয়ে উড়ছে ওর মন কাননে। ঘুরপাক খাচ্ছে মস্তিষ্কে। সে জানে ভালোবাসার মতো বিশুদ্ধ, নিষ্পাপ অনুভূতিটিকে কেউ জোর করে হাসিল করতে পারে না। ভালোবাসা বললেই হয় না। ভালোবাসার উৎপত্তি হয় মানুষের অজান্তেই,এটাতে কেউ লাগাম টেনে ধরতে পারে না,নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যেমনটা অন্তর তাকে ভালোবাসে নি বলেও ভালোবেসে ফেলল। তবে ভালোবাসা এলো ওদের মাঝে রয়েসয়ে,ধীর লয়ে। সে অন্তরের প্রেমে প্রথমে নিমজ্জিত হলেও অন্তর তার প্রেমে মজেছে গভীরভাবে। দিন-রাত তড়পাচ্ছে মানুষটা তাকে পাবার জন্য। দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে পাওয়া হাফ ফান্ডেড স্কলারশিপটার তোয়াক্কা পর্যন্ত করে নি,হেলায় মুড়িয়ে দিয়েছে নিজের সকল শ্রম,স্বপ্ন।

রাতের মধ্যভাগে দরজা খুলল রিনি। শব্দ হলো ক্যাঁচক্যাঁচ। অন্তরের দরজা ধাক্কানো থেমে গেছে ঘণ্টা হয়ে এলো। চলে গেছে বোধহয় ঘরে। দরজা ভেজিয়ে বাহিরে পা রাখতেই বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলো ও। শাড়ির নিচে হাত গলিয়ে অনাবৃত কোমর টেনে সন্নিকটে নিয়ে গেল কেউ। ভয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে যায় ওর। কণ্ঠনালি ছিটকে আর্তচিৎকার করতে নিলে ঠোঁটে চাপ পড়ল রুক্ষ হাতের।কানে বাজল মেঘমন্দ্র স্বর,
" হুঁশ,চিল্লাবে না।"
পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। অন্ধকারে পরিচিত কণ্ঠ শুনে প্রাণ ফিরে পায়। কণ্ঠ নেমে যায় নিম্নে,
" আপনি ঘুমাতে যান নি?"
" তোমাকে ছাড়া ঘুমাব কীভাবে? "
" আমি আপনার ঘুমে বাধা দিয়েছি?"
" হ্যাঁ, আমি যে অস্থিরতায় ঘুমাতে না পারি সেকারণে তুমি বুদ্ধি করে দাদির ঘরে গিয়েছ ঘুমাতে। তোমাকে আমি শান্তশিষ্ট ভেবেছিলাম, তুমি মিচকে শয়-তান বের হলে।"

রিনি গলায় তাচ্ছিল্য ঢেলে বলল," আপনাকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম, আপনি গুণ্ডা বের হলেন।"

অন্তর অট্টহাসল। পরাজিত হওয়ার ভঙ্গিমায় বলল," তুমি যা বলবে তা-ই সই, আমার বাচ্চা বউ।"
" সত্যি করে বলুন, আপনার না ঘুমানোর কারণ কী?"
" তুমি,তোমার ঘ্রাণ। "
" ঘ্রাণ!"- আশ্চর্য হয়ে উচ্চারণ করে রিনি।
অন্তর ওর আঢাকা,মোলায়েম কোমরে রুক্ষ দু হাত পেঁচিয়ে শূন্যে তুলল তাকে,নিয়ে আসল ঠোঁটের কাছাকাছি, মুখোমুখি। মেশাল বুকে। গলার কাছে নাক নিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে নিল অন্তঃপুরে। কাঁধ খামচে ধরল ও। অন্তর কানের কাছে মুখ রেখে মাতাল সুরে বলল,
" তোমার শরীরের ঘ্রাণে আমার ঘুমের মেডিসিন আছে। বাসর রাত থেকে শুরু করে তোমার শরীরের যে ঘ্রাণে আমি মাতাল হয়েছি সেই ঘ্রাণ ব্যতীত আমার ঘুম আসে না।"
" বিদেশে কীভাবে ঘুমিয়েছেন তাহলে?"
" ঘুমাতে পারি নি বলেই চলে এসেছি। প্রতিটি রাত নিশাচর হয়েছিলাম আমি তুমি বিহীনে।"

কোমর আঁকড়ে ধরে রিনির মুখের নিকটস্থে মুখ রেখে তাকে নিয়ে কামরার দিকে এগোলো অন্তর। দরজা ভেজানো ছিল,পায়ে ঠেলে ঢুকল রিনিকে ধরে রেখেই। বিছানায় নামিয়ে দিয়ে বলে,
" তুমি রাগ করো,অভিমান করো, ইগনোর করো, যা-ই করো সব আমার ঘরে থেকে করো রিনি,আমার থেকে দূরে গিয়ে নয়৷ "

রিনি খাটের একপ্রান্তে সরে গেল। অন্তর শুলো অন্য একপ্রান্তে। মাঝে রইল তফাত,বিস্তর ফারাক। ব্যবধানকে ছুটি দিয়ে কেউ কারো কাছে এগিয়ে আসছে না। রিনি ভেবেছিল গত হওয়া রাত্তিরের মতো আজও অন্তর তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে,বরং তাদের সকল দূরত্ব মিটিয়ে দিবে। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিবে তাকে। অথচ মানুষটা ছুঁইছে না তাকে,আসছে না কাছে। ঘরের উন্মুক্ত জানালার কার্নিশ ছুঁয়ে চাঁদের আলো লুটোপুটি খাচ্ছে গৃহতলে। অতি অল্প দ্যুতির ঝলকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল অন্তর অনিমেষনেত্রে চেয়ে আছে সিলিংয়ের দিক। ঘুমাচ্ছে না কেন মানুষটা? রিনির মতো তার হৃদয় কি ব্যাকুল,উৎকণ্ঠিত হচ্ছে? বুক ঢিপঢিপ করছে ওর। নিঝুম, নিস্তব্ধতার মাঝে ওর বুকের ঢিপঢিপ আওয়াজ যেন সমগ্র ঘরময় ঘুর ঘুর করছে। শোনা যাচ্ছে স্পষ্টত।

" রিনি!"
হড়বড় করে প্রতুত্তরে করে," হুম?"
" তোমার হার্টবিট এত ফাস্ট হচ্ছে কেন? কী চিন্তা করছ?"
" ক....কই,কিছু না।"- বলতে গিয়ে তোতলায়। অন্তর কি ওর মনের চাওয়া ধরে ফেলেছে? বুঝে ফেলেছে রিনির বেহায়া মন আকুল হয়ে পড়ছে তার নৈকট্য পাবার জন্য?"
" তোতলাচ্ছ কেন?"
বলতে বলতে মাঝের দূরত্বকে অনায়াসে সমাপ্ত করে দিল অন্তর। কাছে এগিয়ে এসে মুখ রাখল রিনির মুখের ওপর, একটুখানি শূন্যে। সুপুষ্ট হাত রাখল গালে। রিনি কুঁকড়েমুকড়ে যেতে লাগল,অন্তরের দৃষ্টি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার ভয়ে চোখ জোড়া বুঁজে ফেলে। অশান্ত স্বরে,মেকি রাগ দেখিয়ে ফিসফিস করে,
" একদম ছুঁবেন না।"
" হাজার বার ছুঁবো।"-একরোখা, জেদি স্বর অন্তরের।
" কেন ছুঁবেন?"
" কারণ, ভালোবাসি।"
" আমি আপনাকে ভালোবাসি না। "
" তোমার বুকের ঢিপঢিপ শব্দ,আমার হৃৎস্পন্দন এই নিঝুমপুরীতে মিলেমিশে একাকার হয়ে চিৎকার করে বলছে, তোমার আমার ভালোবাসাটা যে হয়ে গেছে।"
" মিথ্যা কথা।"
" উঁহু,তোমার হৃৎস্পন্দন মিথ্যা বলছে না। আকুল হয়ে ডাকছে আমায়। মুখ খুলে একবার অনুমতি দাও রিনি,একটাবার। এত কাছ থেকে ফিরিয়ে দিলে অনুভূতির বেড়াজালে মৃ-ত্যু হবে আমার।"

অন্তরের করুণ আর্তি রিনির শিরা-উপশিরায় যাতনা বয়ে দিল। হাহাকার বাড়িয়ে দিল মানুষটির আর্জিতে সায় দিতে। হাত বাড়িয়ে গলার কাছের টি-শার্ট মুঠোয় পুরল ও। সম্মতি মিলতেই গায়ের টি শার্ট খুলে ফেলল অন্তর। উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিল। ঘরে মৃদু নীলচে আলো ছড়ানো বাতিটি জ্বালিয়ে চলে এলো বিছানায়,রিনির ঘনিষ্ঠে। ঠোঁটের সামান্য দূরে থেমে গিয়ে মাদক কণ্ঠে বলল,

" ভালোবাসা কেন আগে আমার হৃদয় দুয়ারে এলো না রিনি? কতগুলো দিন নিজেকে বঞ্চিত করলাম তোমাকে ভালোবাসা থেকে। আমি তোমাকে এক্ষুনি, এ মুহূর্তে প্রচণ্ড ভালোবাসলে তুমি কি আমার ভালোবাসাকে গ্রহণ করবে?"

চক্ষু মুদে রেখে মাথা ওপর নিচ করে রিনি। সায় পেয়ে অন্তরের সমস্ত ধৈর্যের বাধ সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার মতো ভেসে গেল। ঠোঁট নামিয়ে আনল রিনির ঠোঁটে,ছুঁলো আলতো করে,অতিশয় যত্নে। পরক্ষণে বাহুতে নখ দাবানোর জ্বলুনিতে আলতো স্পর্শে থেমে থাকতে পারল না সে। উত্তাল হলো বুকের ভেতর। নরম,পেলব অধরযুগল টেনে নিল রুক্ষ-শুষ্ক ঠোঁটের মাঝে। গাঢ় থেকে গাঢ়ভাবে ছুঁতে থাকে ঠোঁট দুটোকে,যেন তৃপ্তি সহকারে শুষে নিচ্ছে অমৃতসুধা।
______________________________

গোসল সেড়ে বের হলো রিনি। ভেজা চুলে গামছা পেঁচিয়ে নিয়েছে। গামছার ফাঁক গলে বেশকিছু অলকচূর্ণ দোল খাচ্ছে গালে-কপালে,চেহারাটা শীতের সকালের কুয়াশায় ভেজা শুভ্র লাউ ফুলের ন্যায় স্নিগ্ধ। পরনে সালেহার দেওয়া গোলাপি রঙের তাঁতের শাড়ি। বদন নত লাজের ভারে। অন্তর গায়ে টি-শার্ট পরে কাছে আসল,হৃদয় উতলা করা হাসি হেসে ধীর গলায় বলল,

" নৌকা চড়বে?"
" রাতের বেলা?"- চমকিত স্বরে শুধায় রিনি।
" হ্যাঁ, রাতের বেলা নৌকার মাঝে তোমার-আমার ভালোবাসায় কেউ বাধা হাতে পারবে না।"
" নদী তো বহুদূর! "
" পুকুরে নৌকা ভাসাব। "
রিনি কথা না বলে পা বাড়াতে নিলে অন্তর টেনে কোলে তুলে নিল তাকে।
" হেঁটে যাচ্ছ কেন?"
অত্যন্ত অবাক হয় রিনি,"তাহলে কীভাবে যাব?"
" তোমার স্বামীর কোলে চড়ে যাবে।"
" নামান,আমি হেঁটে যেতে পারব।"
" আমি কি মুখে ভালোবাসি বলার জন্য তোমাকে ভালোবাসি? ভালোবাসা আমি প্রকাশ করব আমার কর্মে,তোমাকে কোলে নিয়ে,তোমাকে আদর করে,তোমার দুঃখগুলোকে নিজের মাঝে শুষে নিয়ে। আগে ভালোবাসি নি, এখন বাসি। অন্তর নেওয়াজ তার ছোট্ট বউয়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের বেলায় একদমই কৃপণতা করবে না।"

রিনি তার হাত দুটো নিয়ে গলা জড়িয়ে ধরল অন্তরের। কি শ্রবণসুখকর একেকটি শব্দ! ভালোবাসা কি পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর অনুভূতি? হয়তো,নইলে রিনি কেন এর আগে এমন বেসামাল সুখের নাগাল পায় নি? তাকে ঘাটলার কাছে নামিয়ে দিয়ে অন্তর একটা হারিকেন নিয়ে এসেছে। নৌকা বাধা ঘাটের একপাশে। প্রথমে নিজে উঠে হারিকেনটা নৌকায় রেখে ওর হাত ধরে নৌকায় উঠাল। দুই হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে রিনি বসে আছে একপাশে। অন্যপাশে অন্তর বৈঠা বাইছে। নৌকা চলছে পুকুরের মধ্যিখানে,শ্বেত শাপলাগুলোর অতীব কাছে। হাত বাড়িয়ে একটা শাপলা তুলে আনে রিনি। ভোর হবে বোধহয় ঘণ্টা তিনেক পর,ঘুটঘুটে নিশীথ বিরাজ করছে চারিধারে। এক দুটো জোনাকি পোকা উড়ছে পুকুরের অন্য পাড়ের ঝোপের কাছে,তাদের দেহ জুড়ে হলুদ টিমটিমে আলো। তেঁতুল গাছ থেকে ভেসে আসছে কোনো এক নাম না জানা নিশাচর পাখির ডাক। মাথার ওপর গোলাকার একটি চাঁদ আজকে রাতের জন্য অন্তরিক্ষকে নিজের নামে লিখে নিয়েছে। শাপলাটা হাতে ছুঁয়ে ক্ষীণ পল দেখল অন্তরকে লজ্জাতুর দৃষ্টিতে, মানুষটাও দৃষ্টি স্থির রেখে কেবল তাকেই দেখছে। রিনি যখন প্রকৃতির রূপ দেখার পাশাপাশি অন্তরের তার জন্য সব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে আসার বিষয়টিতে নিমগ্ন তখন বৈঠা রেখে নৌকার মাঝামাঝি এসে বসল অন্তর। শরীরটা এলিয়ে দিল পাটাতনে,মাথার নিচে এক হাত রেখে অন্য হাতে ডাকল কাছে,
" এদিকে আসো।"
নৌকা দুলছে মৃদু মৃদু। রিনি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আসল খানিকটা কাছে। মুখে বলল,
" এসেছি।"
" আরও কাছে আসো।"
" আসলাম। "- আরেকটু এগিয়ে এসে বলল রিনি।
" বুকের ওপর আসো।"

প্রচণ্ড সাবধানে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে অন্তরের বুকের কাছে আসল রিনি। শক্ত বুকটায় অসীম অধিকার নিয়ে দু হাত রেখে থুতনি ঠেকাল। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অন্তরের সৌম্য চেহারায়। অন্তর হাত বাড়িয়ে ওর গালে আঙ্গুল ঘষে অন্তঃপুর শীতল করে দেওয়া সুরে জিজ্ঞেস করল,
" কী চিন্তা করছিলে?"
রিনি নিঃসংকোচে কিছুটা মলিন স্বরে বলে উঠে,
" চিন্তা করছিলাম আপনার কথা। অন্তর আপনি জানেন,আপনি কত বড়ো বোকামি করেছেন?"
" জানি।"
" কে বলেছে এমন বোকামি করতে?"
" ভালোবাসা বলেছে।"
" ভালোবাসা বলেছে?"- বিমূঢ় হয় রিনি।
" হুম। ভালোবাসা বলেছে,অন্তর তুমি বোকা হও। তুমি বোকা হলে রিনি তোমার হবে। "
রিনি আরেকদফা বিস্মিত হয়। অধর আলগা করলে তাকে থামিয়ে দেয়। নেশাগ্রস্ত স্বরে বলে,
" রিনি? আমার বুকে মাথা রাখো,আমার হৃৎস্পন্দন শুনো। জেনে নাও তোমাকে কতটা ভালোবেসে অন্তর নেওয়াজ বোকামির সর্বোচ্চ সীমানা পার করেছে।"

রিনি লাজুক হেসে কান পাতে বুকের বা দিকে। অন্তর তার পিঠে এক হাত জড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে ভাবে,স্বপ্নের বিসর্জন, টাকাগুলো নষ্ট করার মতো বোকামি সবকিছু রিনির কাছে ফিকে। এই এক নারীকে পাওয়ার জন্য হাজারো বোকামি সে মাথা পেতে গ্রহণ করবে। তবুও যে,উপসংহারে তার ছোট্ট বউ,তার রিনিকে লাগবে।

সমাপ্ত ~

( ভালোবাসার কখনো সমাপ্তি হয় না। ভালোবাসা বাড়ে,সময়ের সাথে ধ্রুব তারার মতো জ্বলজ্বল করে। তবে আজ ভালোবাসার জন্য বোকামি করা অন্তর ও রিনির ভালোবাসামাখা গল্পটি এখানেই শেষ করতে হলো। মূলত গত দু বছর ধরে আমি লেখালেখি থেকে অনেকটাই দূরে সরে যাওয়ায় জড়তা কাজ করছিল ভীষণ, সেই জড়তাকে বিলীন করতে গল্পটি লেখা। আপাতত বিদায়,প্রিয় পাঠক।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন