#ভালোবাসাটা_যে_হয়ে_গেল
#লেখিকা: আসরিফা সুলতানা জেবা
#পর্ব__৯
শ্রাবণ মাস ও প্রকৃতির প্রেমের প্রখরতা বেশ। তাদের প্রেমের প্রভাবে কদম ফুলের গা বেয়ে নামছে জলের ফোঁটা, সেই ফোঁটা গিয়ে মিলিত হচ্ছে পুকুরের সবুজ রঙা জলে। কামিনী, বেলি ফুলের সতেজ ঘ্রাণে ম ম করছে চতুর্দিক। রিমঝিম বর্ষণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটার সাথে মিতালি গড়ছে পুকুরের জল। গুটি কয়েক ধবধবে সাদা রাজহাঁস বর্ষণ মাথায় করে ডুব দিচ্ছে পুকুরের থৈ থৈ জলে। আনন্দে একবার ডুব মারছে,ফের সাঁতার কাটছে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে অন্তর পায়ের তলায় পিষ্ট করল অবশিষ্টাংশ। মুঠোফোনটি পকেট থেকে বের করে পুনর্বার কল দিল তার প্রার্থিত রমণীকে। প্রতিবারের মতো আশাহত হলো সে। রমণী ফোন তুলল না। রাগে ফোনটা আছাড় মা-রতে গিয়ে থমকাল। ধৈর্য ধরতে হবে তার,সহ্যশক্তি বাড়াতে হবে সীমাহীন। অন্যথায় যে, কাঙ্ক্ষিত রমণীকে তার প্রশস্ত বুকটায় আনতে অসফল হবে। দেখতে ছোটখাটো পুতুলের মতো হলেও কমবয়স্কা রমণীর যে শরীর ভরা তেজ, জেদ,অভিমান তা বোঝা কষ্টসাধ্য মনে হলো না তার। বৃষ্টির ছাটে তার তাগড়া দেহে জড়ানো ধূসর শাটর্টা ভিজে গেছে হালকা হালকা। আরেকটি বার রিনিকে ফোন করতে গিয়ে করল না। দিব্যি বুঝে গেছে, ফোন তুলবে না তার তেজি,ছোট্ট বউটা। গতকাল বাড়ি ফেরার সময় রিনির হাতে ফোন দেখতে পেয়ে জোর করে ছিনিয়ে নেয় সেটা। পাসওয়ার্ড না থাকায় তার সুবিধা হয়েছিল খুব, ফোনে নিজের নম্বর ডায়াল করে রিনির নম্বরটা ঠুকে নেয় নিজের মুঠোফোনে। সেই থেকে কয়েক বার ফোন করেছে। মেয়েটা বুঝে গেছে ফোন অন্তরই দিচ্ছে, ফলপ্রসূ ফোন তুলতে চরম অবাধ্যতা তার। যতই হেলা করুক,যতই দুঃখ দিক,যতই দূরে ঠেলে রাখুক অন্তর ঠিকি হাসিল করে নিবে তাকে,তার বাচ্চা বউটাকে।
ক্ষীণ হেসে নানার বাড়ির উঠোনের দিকে তাকায় অন্তর। ঘরের একপাশে টিনের ছাউনি ছোঁয়া কামিনী ফুল গাছটার তলে দাঁড়িয়ে আছে ওর কনিষ্ঠ মামার ছয় ও নয় বৎসরের দুই কন্যা। শুভ্র কামিনীর গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা আশ্রয় গেঁড়েছে,পাতা চুইয়ে পড়ছে জলবিন্দু। নয় বছরের মেয়েটি গাছ ধরে ঝাঁকুনি দিতেই সমস্ত জল বর্ষণের মতো তড়তড় করে পড়ল ছোট মেয়েটির গায়ে। ফোকলা দাঁত বের করে খিলখিল হাসিতে মেতে উঠল দু বোন। চোখ ধাঁধানো দৃশ্যটি উপভোগ করার সময়টিতে বেজে উঠে তার মুঠোফোন। হাতে নিয়ে দেখে শামসুল হক ফোন করেছেন। বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
" কী অবস্থা আব্বা?"
" তুমি আমার অবস্থা কাহিল করে আবার জিগান মা-রাও।"
শামসুল হকের নিস্প্রভ, নিস্তেজ মুখটা চোখের সামনে না দেখেও ঠাহর করে ফেলল। ঠোঁট বাকিয়ে নিষ্পাপ হবার ভান ধরে বলল,
" আমি কী করেছি,আব্বা? "
শামসুল হকের গলার থমথমে ভাবখানা বাড়ল আগের থেকে," ঢঙ করা লাগব না। ঢঙ না কইরা তোমার আম্মারে লইয়া বাড়িতে আইয়ো। বিকেলে যামু তোমার শ্বশুর বাড়িতে। "
" এখুনি আসতেছি।"
অন্তর কল কে-টে দিয়ে মাকে খুঁজল। তার তিন মামার উত্তর,পুব-পশ্চিমে মিলিয়ে আলাদা আলাদা তিনটে টিনের ঘর। বড়ো মামার ঘরে গিয়ে পেয়ে গেল মাকে। সালেহা ভাইয়ের বউয়ের সাথে মিলেঝুলে হাঁসের লোমশ ছাড়াচ্ছেন। খানিক্ষন আগে হাঁসটা জ-বাই করেছেন তার বড়ো ভাবি ননদ-ভাগিনাকে খিচুড়ির সাথে রেঁধে খাওয়াবেন বলে। মামীর ইচ্ছে অপূর্ণ রেখেই অন্তর বলল,
" আজ থাক মামী। পরের বার আপনাদের বউমাকে নিয়ে এসে খাবো। "
ছেলের তোড়জোড় দেখে সালেহা অসম্মতি করলেন না। একই সাথে মনের নীলাম্বরে খুশিয়াল মেঘ ঘনাল এটা ভেবে যে, শামসুল হক তাকে এখনো যুবক- যুবতী থাকা দিনগুলোর মতোই ভালোবাসে। সময়ের স্রোতে যৌবনকে বিদায় জানিয়ে বয়স্ক হওসার ধারপ্রান্তে এসেও সালেহার জন্য মোহাব্বতের যৎসামান্য কমতি হয় নি মানুষটার হৃদয়ে।
খালি হাতে পুত্রের শ্বশুর বাড়িতে যেতে নারাজ শামসুল হক। তার ওপর গ্রামের মেম্বার বলে তার নাম-খ্যাতি,সুনাম রয়েছে। পাঁচ কেজি মিষ্টি,এক কাঁদি প্রায় আধা-পাকা কলা,তিন কেজি আপেল আনিয়েছেন হাট-বাজার থেকে। লোকেদের বলে পুকুরে জাল ফেলে দশেক কেজির মতো মাছ নিয়েছেন। অপরাহ্ন মর্ত্যধামে আসার কিয়ৎক্ষণ পূর্বে পদলি ফেললেন বেয়াইয়ের বাড়িতে। অন্তর এলো বাবার পেছন পেছন। আনোয়ারকে ফোন করে সকালেই জ্ঞাত করেছিলেন আসার কথা। শৈশবের বন্ধুকে নাকচ করতে পারেন নি তিনি। বাড়িতে আসতে চাওয়া অতিথিকে মুখের ওপর 'না' শব্দখানি শোনানো বড্ড বেমানান,অপরাধমূলক কর্ম। শামসুল হকের আসতে চাওয়াতে তিনি বুঝতে পারলেন রিনিকে নিয়ে যেতে চায় তারা। স্ত্রীর সাথে আলাপ করেছেন এ ব্যাপারে। আনজু গাঁইগুঁই করে বললেন,
' দুই দিন আগেও আমি চাইতাম রিনির তালাক হইয়া যাক। অন্য ঘরে বিয়া দিমু। এহন চিন্তা করলাম অন্তর যেহেতু রিনির লগে সংসার করতে চায়,রিনির লাইগা বিদেশ থেকে আইয়া পড়ছে তাইলে একটা সুযোগ দেওন দরকার। মেম্বার সাহেব ও তার বউ ভালা মানুষ, সম্মানী পরিবার,পোলাডাও এহন আমাদের রিনিরে চাইতাছে তাই একবার চিন্তা করা উচিত আপনের। তয় কোনো জোর নাই,আমাদের রিনির মন চাইলে যাইব নইলে বাদ। মাইয়ার ওপর জোরজবরদস্তি কইরেন না।'
স্ত্রীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে ভাবলেন আনোয়ার। ফেলে দেবার মতোন না। একবার গায়ে তালাকের তকমা লাগলে জীবনভর,মৃ-ত্যু পর্যন্ত থেকে যাবে সেই তকমা। তার চেয়ে অন্তরকে একটা সুযোগ দেবার সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। আতিথিয়েতায় ত্রুটি রাখলেন না কোনো। বেলের শরবত,লেবুর শরবত, নানান জাতের পিঠা,ফল দিলেন তাদের সমুখে। অন্তর বেতের চেয়ারটায় বসে থাকলেও তার নজর ঘুর ঘুর করছে রিনির দুয়ারে। শামসুল হক এক গ্লাস বেলের শরবত সাবাড় করে আনোয়ারকে বললেন,
" খাওন পরে খাওয়া যাইব। আমার বউমারে ডাকো আগে। কথা কই একটু ওর লগে।"
আনজু মেয়েকে সবটা বলেছেন,বুঝিয়েছেন। মায়ের কথা রিনির শ্রবণ হয় অবলীলায়। মৌন হয়ে থাকে সারাটা সময়। বাহির থেকে ডাক পড়লে সিঁদুর রঙের ওড়নাটা দিয়ে চুল ঢেকে বসার ঘরে আসে। নজর মেঝেতে রেখে সালাম দেয় সবাইকে। শামসুল হকের ডাকে চোখের পল্লব ঝাঁকিয়ে ধীরে ধীরে মন্থরগতিতে আনত মাথা তুলে উপরের দিকে। দৃষ্টি স্থবির হয় হৃষ্টপুষ্ট যুবকের ওপর,যার পরনে চুনের মতো সফেদ একটি শার্ট কালো প্যান্টের সাথে ইন করে পরা,কনুইয়ে গুটানো শার্টের হাতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া বলিষ্ঠ হাতের ঘন কালো লোমশগুলো সুসজ্জিত। ঠোঁটের কার্নিশ তির্যক হাসির দখলে। চাহনি ধারালো। ওদিক থেকে চোখ সরিয়ে রিনি ঝটপট তাকাল শ্বশুরের দিকে। শামসুল হক মায়া দ্বারা আচ্ছন্ন কণ্ঠে বললেন,
" তোমার লাইগা আমার পাগল পোলাডা বিদেশ থাইকা আইয়া পড়ছে। বাড়ি লও, বউমা।"
আনোয়ার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন," তুই কী সিদ্ধান্ত নিছস,আম্মা? তুই যা কইবি তা-ই হইব। কোনো জোরজবরদস্তি নাই। তুই কি সংসার করবি অন্তরের লগে?"
রিনি একবার শ্বশুরের দিকে চাইল,আরেক পল বাবার দিকে। অন্তরের দিকে তাকাল না ভুল করে। তাকালে তার গলা দিয়ে কথাটা বের হবে না। নিজের মধ্যে স্বল্প শ্বাস টেনে নিয়ে একদমে বলল,
" আমাকে ক্ষমা করবেন,আব্বা। আপনাদের সাথে ফিরছি না আমি। বিয়েটা আপনাদের বড়োদের সিদ্ধান্তে হয়েছিল,আমাদের দুজনের সম্মতিতে নয়। আমি জোর করে এই বিয়েটা মানতে পারছি না। মুক্তি চাই আমি এটা থেকে। ক্ষমা করবেন আমাকে।"
কথা সমাপ্ত করে চোখের কোণা দিয়ে অন্তরকে দেখতেই গলা শুকিয়ে গেল ওর। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। চোখ দুটি যেন গোধূলির সবটুকু রং ধারণ করেছে, টকটকে লাল। কপালের ওপর ভেসে উঠেছে শিরা-উপশিরা। রাগের চোটে হাত মুষ্টিবদ্ধ। এক্ষুনি যেন একা পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবে রিনিকে। কর্ণকুহরে প্রবেশ করল রোষপূর্ণ অগ্নিময় স্বর,
" আমি রিনির সাথে আলাদা কথা বলতে চাই।"
রিনির কণ্ঠ কাঁপছে। কষ্টে-সৃষ্টে পড়িমরি করে বলে," আমার কারো সাথে কোনো কথা নাই।"
এক ছুটে ঘরে গিয়ে দুয়ার এঁটে দিল ও। অন্তর তার বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে রইল নির্নিমেষ। কপালের রগ দপদপ করছে রোষের ঠ্যালায়। রিনি যে শামসুল হকের সম্মুখে বাড়ি যেতে অস্বীকার করবে তা ছিল তার কল্পনাতীত। রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে।
শামসুল হক ছেলের যাওয়ার পানে একবার তাকিয়ে আনোয়ারকে বললেন,
" আজ আসি। মাইয়ারে কিছু কইয়ো না। বাচ্চা মাইয়া,হঠাৎ স্বামী ফালাইয়া গেছে গা এইজন্য অভিমানডা বেশি। রাগ কমলে সব ঠিক হইয়া যাইব।"
ফোঁস করে ছোট্ট নিঃশ্বাস ছাড়লেন আনোয়ার। বন্ধুকে বিদায় জানালেন আন্তরিকভাবে।
ঘরে এসে বুকের বা পাশে হাত দিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে রিনি। ভয়ের চোটে তার হৃৎস্পন্দন ছুটছে তেজী বুনো ঘোড়ার মতো। তার অসম্মতিতে অন্তরের র-ক্তিম চেহারাটা চক্ষে ভাসছে বারংবার। মা যখন জানিয়েছিল তাকে নিতে আসবে তার শ্বশুর তখন রিনির একমন চাইছিল সব ভুলে টুলে চলে যেতে,অপরদিকে অভিমানে,কটুক্তিতে জর্জরিত হৃদয়টা নিষেধাজ্ঞা জারি করছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল অন্তরের চাচাতো ভাবির নিকৃষ্ট নোংরা কটুক্তি,তাকে অন্তরের ছেড়ে যাওয়ার দিন। রাগে-দুঃখে তার মুখ থেকে ' না' শব্দটি বেরিয়ে আসে। রিনি নিশ্চিত প্রত্যাখাত হওয়ার কারণে অন্তর তাকে সামনে পেলে খু**ন করে ফেলবে। লোকটা ভদ্র,ঠাণ্ডা স্বভাবের, তবে মাথায় রাগ চাপলে যে সুনামির মতো অশান্ত হয়ে যায় বাসর রাতে টের পেয়েছে তা।
রাতের খাবারের পর আনোয়ার,আনজু শুয়ে পড়লেন। রিনি থালা-বাসন ধুয়েমুছে সাজিয়ে রেখে ঘরে আসল। বিদ্যুৎ পালিয়েছে কিছু সময় পূর্বে। কখন আসে ঠিক নেই। এমনও দিন যায় সারাদিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টা পাঁচেক দেখা মিলে না বিদ্যুতের। হারিকেনের সলতেটা বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখল ও। শলার ঝাড়ু দিয়ে বিছাটা ঝেড়ে নিল আরেকদফা। তন্মধ্যে টুং করে ম্যাসেজ আসে তার ফোনে। ঝাড়ুটা বিছানার মাঝামাঝি রেখে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল তার নম্বরে বার্তা এসেছে। বার্তা পাঠানো মানুষটি আর কেউ নও,বরং অন্তর। বার্তাটি পড়ে চুটকিতে লাফিয়ে উঠল তার অন্তঃস্থল। তরঙ্গিত হলো সর্ব অঙ্গ। কাঁপা কাঁপা হাতে পুনরায় দেখল ম্যাসেজটি,
" তাড়াতাড়ি বাড়ির পেছনে আসো। নাহলে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাব,তোমার বাপ-মা কেন তোমার চোদ্দগুষ্ঠিও আমাকে আটকাতে পারবে না তখন।"
রিনি বিছানায় বসে রইল ঠাঁই। বাঘের মুখে কে যেতে চায়? অন্তর তার কাছে এখন বাঘ সমতুল্য। দেখলেই ঘাড় ধরে চিবিয়ে ফেলবে তাকে বিকেলের অপমানের প্রতিশোধ নিতে। বিদ্যুৎ অভাবে গরম লাগছিল খুব,ম্যাসেজটা পাওয়ার পর শরীর ভয়ে ঘেমে জবজবে হয়ে গেল। জামাটা চিপকে গেল পিঠের সাথে। ঘণ্টা খানেক পর ম্যাসেজ আসল,
" আসবা না? তাহলে আমি আসছি।"
তড়িৎ বেগে লাফ দিয়ে জানালার কাছে গেল ও। অতি সাবধানে জানালার কপাট খুলে উঁকি দিয়ে দেখার শ্রম করল। তৎক্ষনাৎ টুং করে ম্যাসেজ আসল পুনশ্চঃ,
" এমন ভীতুর মতো জানালা দিয়ে উঁকি মা-রছ কেন? সাহস থাকলে সামনে আসো। কিছু করব না তোমাকে। কিন্তু তুমি বাহিরে না আসলে তোমার ঘরে গিয়ে আমি অনেক কিছু করব। কোনো বাধাই আমাকে রুখতে পারবে না।"
ব্যাস! হুমকি-ধমকির যাতাকলে পিষে গিয়ে রিনি বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসল। সাথে হারিকেন,ফোন কিছু আনল না। আলো পড়লে বাবা-মা টের পেয়ে যাবে। সন্ধ্যের পর পর বৃষ্টি হবার দরুন চাঁদের আলো মিইয়ে আছে। রশ্মি বিলি করছে অল্পস্বল্প। আঁধারে পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনটায় আসে রিনি। আসা মাত্র অন্ধকারে একটি হাত তাকে টেনেহিঁচড়ে কাছে নিয়ে গেল। শরীর থেকে ওড়না ছাড়িয়ে তার মুখটা বেঁধে ফেলল ফটাফট। হাত দুটো পেছনে মুড়ে ধরে তার শরীরটাকে তুলে নেয় কাঁধে। জমিনের মাঝে নেমে আইলের মাঝ দিয়ে রিনিকে কাঁধে করে বাড়ির অভিমুখে হাঁটতে লাগল অন্তর। কণ্ঠে ক্রোধ,
" ভালোভাবে নিতে আসছিলাম যাও নাই। উলটা তেজ দেখিয়ে বলো আমার সাথে সংসার করবা না? ভদ্রতার মায়েরে বাপ। তুমি বাধ্য করলা আমারে অভদ্র হইতে। "
রিনি দু হাতে কিল-ঘুষি মা-রতে লাগল অন্তরের পিঠে ছাড়া পাবার জন্যে। হাঁটার তালে নড়চড়ের কারণে মুখের শক্ত বাঁধন খুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। মুখ ছিটকে বের হচ্ছে গোঙানোর আওয়াজ। অন্তর কানে তুলল না। ঈষৎ দূরে হুতুম পেঁচা ডাকছে। রিনির মুখের অস্পষ্ট শব্দ ও পেঁচার ডাক একাকার হয়ে নিশুতির নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে খান খান করে। খরধার বাতাস এসে দোলা দিচ্ছে গায়ে। রাস্তা দিয়ে গেলে লোকে দেখলে মন্দ বলবে বলে রিনিকে কাঁধে করে জমিনের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে সে। এদিক দিয়ে গিয়ে নিজেদের বাড়ির পেছন দিয়ে উঠল। বৃষ্টি হবার কারণে স্যাঁতসেঁতে, পিচ্ছিল আইল ব্যবহার করে মোবাইলের মৃদু আলোয় রিনির মতো আঁচড়ুড়েকে নিয়ে আসতে যথেষ্ট বেগ পোহাতে হয়েছে তার। খামচে বোধহয় পিঠের চামড়া ছিড়ে ফেলেছে মেয়েটা। শয়ন কক্ষে এনে ধাম করে ফেলল বিছানার মাঝ বরাবর। দরজায় খিল এঁটে ওর কাছে এসে মুখের বাঁধন খুলে দিল। খিস্তিখেউড়ের তুবড়ি ছুটল রিনির মুখ দিয়ে অচিরে,
" আপনি একটা গুণ্ডা,অভদ্র, ফাজিল লোক,ডা-কাত..."
অন্তর পাত্তা দিল না। পরনের সাদা শার্টটার সবকটা বোতাম ছাড়িয়ে দু কাঁধ থেকে নামাল,ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। আইপিএস সংযোগ আছে অন্তরদের বাড়িতে। হলুদ বাতির উজ্জ্বল আলোতে রিনি স্পষ্ট দেখল অন্তর খ্যাপাটে দৃষ্টিতে উদোম গায়ে আগাচ্ছে তার দিকে। উদ্দেশ্য অনুধাবন করে ত্রস্ত পায়ে বিছানা ছাড়তে চাইল। বাধ সাধল অর্ধ উদোম পুরুষটি। টানাহ্যাঁচড়া করে বিছানায় এনে সটান করে শুয়ে দিল তাকে। নিজের অর্ধেক অনাবৃত শরীরের ভার ছেড়ে দিল ওর ওপর। হাত দুটো উপরের দিকে টেনে ধরে ওর আঙ্গুলের খাঁজে ডুবিয়ে দিল লম্বাটে আঙ্গুলগুলো। চোখের চাউনি উন্মত্ত, পাগলাটে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সমেত গালটা ওর নরম গলায় আলতো করে ঘষে ঘষে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল গলায়। ছুঁলো প্রগাঢ়ভাবে।
রিনি বেতাল, বেসামাল হয়ে পড়ল। অন্তরের ঠোঁটের স্পর্শ মাতাল মতিভ্রষ্ট ঝড়ো হাওয়া হয়ে কাঁপন ধরাতে লাগল দেহে। পা দুটোও নাড়াতে পারছে না সে। লোকটার দানবীয় শরীরের চাপে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়ার ক্ষমতা খুইয়ে বসেছে ও,শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। অন্তর্দেশের উন্মাদনা, শরীরের অসাড়তা নিয়ে ছাড়া পাওয়ার জন্য মিনতির সুরে ফ্যাসফ্যাসে গলায় ডাকল,
" অন্তর!"
অন্তর মুখ তুলল না। উলটো গাঢ়ভাবে উষ্ণ ঠোঁট দুটি স্থির করল ওর গলার খাঁজে। নির্মম সুরে বলল,
" আমাকে বার বার প্রত্যাখ্যান করার মজা তোমাকে বুঝাব।"
#চলবে~
( ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)