পর্ব ১ - নতুন বাসা*
আমি যখন প্রথম এই বাসাটায় পা রাখলাম, তখন বিকেল। বৃষ্টি সবেমাত্র থেমেছে। বাড়িওয়ালা আন্টি চাবি দিয়ে বললেন, "যাও মা, ভেতরে গিয়ে দেখো। তোমার পছন্দ হবেই।"
বাসাটা ছোট, এক রুমের। কিন্তু জানালা দিয়ে অনেক আলো আসে। আমার মতো একা একটা মেয়ের জন্য একদম পারফেক্ট। আমি ব্যাগটা মেঝেতে রেখে চারপাশে তাকালাম। দেওয়ালে হালকা স্যাঁতসেঁতে দাগ, কিন্তু সব মিলিয়ে পরিষ্কার।
রাতেই আমি সব গুছিয়ে ফেললাম। আমার ছোট্ট খাট, একটা পড়ার টেবিল, আর একটা আয়না। আয়নাটা এই বাসার সাথেই ছিলো। আন্টি বলেছিলেন, আগের ভাড়াটিয়া রেখে গেছে, আমার লাগলে রাখতে পারি। আমি রেখে দিলাম।
প্রথম রাতটা ভালোই কাটলো। কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় রাত থেকে অদ্ভুত ঘটনা শুরু হলো।
রাত তখন প্রায় দুইটা। আমি পড়ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো আমার ঘরের মেঝেতে পানি। আমি নিচে তাকিয়ে দেখি, সত্যিই ভেজা পায়ের ছাপ। বাইরে থেকে ভেতরে আসছে। যেন কেউ ভেজা পায়ে হেঁটে আমার খাটের কাছে এসেছে। কিন্তু বাইরে তো বৃষ্টি হচ্ছে না। আর আমার দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ।
আমি ভয়ে লাইট জ্বালালাম। ছাপগুলো তখনো আছে। আমি টিস্যু দিয়ে মুছতে গেলাম, কিন্তু মুছতে পারলাম না। যেন মেঝের ভেতর থেকেই ভেসে উঠেছে। আমি ভয়ে কম্বলের ভেতর ঢুকে গেলাম। ভাবলাম মনের ভুল।
পরের দিন সকালে উঠে দেখি ছাপগুলো নেই। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করে সন্ধ্যায় ফিরলাম।
রাতে আবার পড়তে বসলাম। আমার টেবিলের উপর একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ে আছে। আমি তো এই ডায়েরি আগে দেখিনি। কোথা থেকে এলো? আমি কৌতূহল নিয়ে ডায়েরিটা খুললাম। প্রথম পাতায় সুন্দর হাতের লেখায় লেখা, "সাথীর ডায়েরি"।
আমার নামও তো সাথী! কাকতালীয়?
আমি পাতা উল্টাতে লাগলাম। ভেতরে অনেক লেখা, অনেক স্বপ্নের কথা। একটা ছেলের কথা বারবার লেখা আছে। তার নাম আদ্রিয়ান। "আজ আদ্রিয়ান আমাকে লাল গোলাপ দিয়েছে।" "আজ আদ্রিয়ানের সাথে ঝগড়া হয়েছে।" শেষের দিকের পাতাগুলো ছেঁড়া।
আমি ডায়েরিটা বন্ধ করে রাখলাম। হঠাৎ আমার ঘরের তাপমাত্রা কমে গেলো। খুব ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো। আমার টেবিলের উপর রাখা কলমটা নিজে নিজে গড়িয়ে পড়ে গেলো।
আমি ভয়ে ডায়েরিটার দিকে তাকালাম। ডায়েরির শেষ পাতায় নতুন একটা লেখা ভেসে উঠছে। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কেউ যেন অদৃশ্য কালি দিয়ে লিখছে।
লেখাটা হলো, "তুমি ফিরে এসেছো?"
আমার হাত থেকে ডায়েরিটা পড়ে গেলো। কে লিখলো এটা? এই ঘরে তো আমি ছাড়া কেউ নেই। আমি দৌড়ে দরজা খুলতে গেলাম, কিন্তু দরজা খুলছে না। মনে হচ্ছে বাইরে থেকে কেউ চেপে ধরে আছে।
আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। তখনই আমার আয়নার দিকে চোখ গেলো। আয়নায় আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমার পিছনে... আমার পিছনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। আবছা, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে একজন ছেলে।
আমি পিছনে ফিরলাম। কেউ নেই। আবার আয়নায় তাকালাম। সে এখনো আছে।
আমার খাটের পাশে আবার সেই ভেজা পায়ের ছাপ ভেসে উঠেছে। এবার ছাপগুলো আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
আর ডায়েরিতে আরেকটা লেখা ভেসে উঠলো, "আমাকে ভুলে গেলে? আমি আদ্রিয়ান।"
আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেলো। আদ্রিয়ান? ডায়েরির সেই আদ্রিয়ান? সে কি এই বাসাতেই আছে? সে কি আমাকে দেখছে?
অন্ধকারে আমার নিঃশ্বাসের শব্দটাও যেন অনেক জোরে শোনাচ্ছিল। আমি মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ফোনটা হঠাৎ করেই সুইচড অফ হয়ে গেল। চার্জ তো ছিলো। আমি দেয়াল হাতড়ে সুইচের কাছে গেলাম। সুইচ টিপছি, কিন্তু লাইট জ্বলছে না। পুরো ঘরটা যেন আমাকে গিলে খেতে চাইছে।
তখনই একটা ঠান্ডা হাত আমার কাঁধ স্পর্শ করলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম, কিন্তু এবার সত্যিই গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। আমি জমে গেলাম। মনে হলো কেউ আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, "ভয় পেও না।"
এটা একটা ছেলের গলা। খুবই পরিচিত, কিন্তু আমি মনে করতে পারছি না কোথায় শুনেছি। আমার চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করলো। আমি বিড়বিড় করে বললাম, "কে... কে তুমি? কি চাও আমার কাছে?"
কোনো উত্তর এলো না। কিন্তু কাঁধের উপর থেকে হাতটা সরে গেলো। আর সাথে সাথে ঘরের লাইটটা আবার জ্বলে উঠলো। সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক। দরজা খোলা, আয়নায় শুধু আমি, মেঝেতে কোনো ভেজা ছাপ নেই। যেন কিছুই হয়নি। শুধু টেবিলের উপর ডায়েরিটা খোলা পড়ে আছে, আর শেষ পাতায় এখনো জ্বলজ্বল করছে, "আমি আদ্রিয়ান।"
আমি থরথর করে কাঁপছি। এটা কি আমার হ্যালুসিনেশন? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? আমি ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। কারণ ডায়েরির ভেতরের একটা ভাঁজে একটা ছবি লুকানো ছিলো। একটা পোলারয়েড ছবি। ছবিতে একটা মেয়ে হাসছে, তার পাশে একটা ছেলে। মেয়েটাকে দেখে আমার বুক কেঁপে উঠলো। মেয়েটা দেখতে একদম আমার মতো। একদম আমার জমজ বোনের মতো।
আর তার পাশের ছেলেটা... সাদা শার্ট পরা, হাসি মুখ। তাকে আমি আয়নায় দেখেছি।
ছবির পিছনে লেখা, "সাথী আর আদ্রিয়ান, ১২ নভেম্বর"।
এই লেখাটা দেখার পর আমার হাত অবশ হয়ে গেল। ১২ নভেম্বর তো গতকাল ছিলো। তার মানে ঠিক এক বছর আগে এই ছবিটা তোলা। কিন্তু আমি তো গত বছর এই শহরেই ছিলাম না। তাহলে এই মেয়েটা কে? আমার মতো দেখতে, আমার নামের এই মেয়েটা কি আমার অতীত? আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। মনে হলো এই বাসা, এই ডায়েরি, এই ছবি সবকিছুই আমাকে কোনো এক ভয়ংকর সত্যের দিকে টানছে, যেটা আমি ভুলে গেছি।
আয়নার কোণে আবার সেই ঠান্ডা নিঃশ্বাস। কেউ ফিসফিস করে বললো, "মনে করার চেষ্টা করো সাথী, আমি তো তোমারই ছিলাম।"
আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না।
চলবে......
পর্ব 1
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান