ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্ধকারে তুমি

পর্ব 2

লেখক: সাথী আক্তার

পর্ব ২ -
সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। হাতে ওই পোলারয়েড ছবিটা নিয়ে বসে ছিলাম। আমার মতো দেখতে মেয়েটা, আদ্রিয়ান, আর তারিখটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিলো। সকাল হতেই আমি দৌড়ে বাড়িওয়ালা আন্টির কাছে গেলাম।
"আন্টি, এই বাসায় আগে কে থাকতো?"
আন্টি আমার হাতের ছবিটা দেখে মুখটা কালো করে ফেললেন। বললেন, "ওই মেয়েটার নামও সাথী ছিলো রে মা। খুব মিষ্টি মেয়ে ছিলো।"
আমার গলা শুকিয়ে গেলো, "কোথায় গেছে সে?"
"মারা গেছে। গত বছর ১২ নভেম্বর। এই বাসাতেই। সুইসাইড করেছিলো।"
আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো।
"আর ছেলেটা? আদ্রিয়ান?"
আন্টি অবাক হয়ে বললেন, "তুমি আদ্রিয়ানকে চেনো? ওই তো ওর প্রেমিক ছিলো। মেয়েটা মরার পর ছেলেটা একদম পাগল হয়ে গিয়েছিলো। তারপর এই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।"
আমি আর কিছু শুনতে পারলাম না। রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তাহলে কি আমি কোনো মৃত মেয়ের বাসায় উঠেছি? যে দেখতে আমার মতো, যার নামও আমার নাম?
রাত গভীর হতেই আবার সেই ঠান্ডা ভাবটা ফিরে এলো।
ডায়েরিটা নিজে নিজে খুলে গেলো। সেখানে লেখা উঠলো, "তুমি সে নও। তুমি আমার সাথী।"
আয়নায় আবার সে। এবার আগের চেয়ে স্পষ্ট। লম্বা, ফর্সা, সাদা শার্ট। তার চোখে পানি।
আমি এবার ভয় পেলাম না। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি আদ্রিয়ান?"
আয়নার ভেতরের ছেলেটা মাথা নাড়লো।
"তুমি কি চাও?"
সে হাত বাড়িয়ে যেন আমাকে ছুঁতে চাইলো। কিন্তু আয়নার বাইরে আসতে পারলো না। ডায়েনরিতে লেখা ভেসে উঠলো, "তোমাকে বাঁচাতে চাই। ওরা তোমাকে মারবে। যেভাবে আমার সাথীকে মেরেছিলো।"
মেরেছিলো? সুইসাইড না খুন?
আমি চিৎকার করে বললাম, "কে মেরেছে?"
তখনই আমার ঘরের জানালায় জোরে জোরে কেউ ধাক্কা দিতে শুরু করলো। জানালার বাইরে অন্ধকারে অনেকগুলো হাত।
আদ্রিয়ান আয়নার ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠলো, "সাথী, দরজা খুলো না! ওরা এসে গেছে!"
আমি বুঝলাম, এই গল্পটা প্রেমের না। এটা একটা খুনের গল্প। আর আজ রাতে ওরা আমাকেও মারতে এসেছে।
আমি বুঝলাম, এই গল্পটা প্রেমের না। এটা একটা খুনের গল্প। আর আজ রাতে ওরা আমাকেও মারতে এসেছে।
জানালার কাঁচে তখন অনবরত টোকা পড়ছে। ঠক ঠক ঠক। আমি কানে হাত চেপে মেঝেতে বসে পড়লাম। আমার পুরো শরীর কাঁপছে। আয়নার ভেতরে আদ্রিয়ান পাগলের মতো আয়নায় ধাক্কা দিচ্ছে, বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
"সাথী, আমার কথা শোনো! ওই ডায়েরির শেষ পাতা ছিঁড়ো না। ওখানে সব সত্যি লেখা আছে!"
আমি ডায়েরিটা হাতে নিলাম। শেষের যে পাতাগুলো ছেঁড়া ছিলো, তার মধ্যে একটা পাতা তখনো অল্প একটু লেগে আছে। আমি টর্চ জ্বেলে সেটা পড়ার চেষ্টা করলাম। কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় লেখা, "আজ বাড়িওয়ালার ছেলে আর তার বন্ধুরা..."
এর পরের লেখাটা ছেঁড়া। আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো। বাড়িওয়ালার ছেলে? তার মানে আন্টির ছেলে? যে ছেলেটা কাল সকালে আমাকে দেখে হেসেছিলো?
জানালার টোকা হঠাৎ থেমে গেলো। সব চুপচাপ। এতটাই চুপচাপ যে আমার নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি।
তারপর দরজায় টোকা। খুব ভদ্রভাবে।
"সাথী আপু, ঘুমিয়ে গেছেন? মা আপনাকে খাবার পাঠিয়েছে।"
ওই তো বাড়িওয়ালার ছেলের গলা। রনি।
আমি উত্তর দিলাম না। আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।
"আপু, দরজাটা খুলুন। বাইরে অনেক ঠান্ডা।"
আয়নার ভেতর থেকে আদ্রিয়ান ফিসফিস করে বললো, "খুলবে না সাথী। খবরদার খুলবে না। ওই রাতেও ও এভাবেই ডেকেছিলো। আমার সাথী দরজা খুলেছিলো। তারপর..."
আদ্রিয়ানের চোখ দিয়ে এবার রক্তের মতো লাল পানি গড়িয়ে পড়ছে।
"তারপর কি হয়েছিলো আদ্রিয়ান? বলো আমাকে!"
"ওরা আমার সাথীকে... ওরা ওকে মেরে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো। যাতে সবাই ভাবে সুইসাইড। আমি কিছু করতে পারিনি। আমি সেদিন শহরের বাইরে ছিলাম।"
আমার চোখ থেকে পানি পড়তে লাগলো। আমার নামের ওই নিরীহ মেয়েটার জন্য, আর আমার নিজের জন্য। কারণ আজ হয়তো আমার পালা।
দরজার বাইরে থেকে রনি এবার জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে, "এই মেয়ে, নাটক করছো? দরজা খোল বলছি! তোমাকে তো আগেই ভালো লেগেছিলো!"
আমি চারপাশে তাকালাম পালানোর কোনো পথ আছে কিনা। জানালা দিয়ে লাফ দিলে আমি মরে যাবো, তিনতলা।
তখনই আদ্রিয়ান বললো, "সাথী, আয়নার পিছনে দেখো।"
আমি দৌড়ে গিয়ে ভারী আয়নাটা সরালাম। আয়নার পিছনে দেওয়ালে একটা ছোট্ট গর্ত। ভেতরে একটা ছোট্ট চাবি আর একটা পেনড্রাইভ।
"এটা নিয়ে পালাও। এই পেনড্রাইভে প্রমাণ আছে। আমার সাথী লুকিয়ে ভিডিও করেছিলো।"
আমি চাবি আর পেনড্রাইভটা নিয়ে আমার ফোন আর ব্যাগটা নিলাম। চাবিটা কিসের? বুঝলাম, এটা আমার দরজার পিছনের ছোট্ট বাথরুমের জানালার চাবি। ওই জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিং এর সানশেডে যাওয়া যায়।
আমি বাথরুমে ঢুকে জানালা খুললাম।
বাইরে থেকে রনি দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। সে চিৎকার করছে, "কোথায় গেলি?"
আমি সানশেডে লাফ দিলাম। পা টা কেটে গেলো, কিন্তু আমি থামলাম না। আমি দৌড়াচ্ছি। পিছনে রনির গালাগালি শুনতে পাচ্ছি।
আমি রাস্তায় নেমে পাগলের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে থানার দিকে যাচ্ছি। হাতে শক্ত করে ধরে আছি ওই পেনড্রাইভটা।
আর পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, আমার ওই অন্ধকার বাসার জানালায়, আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান হাসছে। সে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তার সাথীকে সে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু এই সাথীকে বাঁচিয়ে দিলো।
আমার কানে তখনো তার শেষ কথাটা বাজছে, "ভালো থেকো, আমার সাথী।"
আমি থানায় পৌঁছে পেনড্রাইভটা জমা দিলাম। পুলিশ রনিকে সেই রাতেই ধরলো। পরে জানলাম, ওই বাসায় আমার মতো দেখতে সাথীকে ওরা সত্যিই খুন করেছিলো। আজ আমি বেঁচে আছি শুধু আদ্রিয়ানের জন্য। কিন্তু রাত হলেই আমি আয়নায় তাকে দেখি, সে এখনো আমার জন্য অপেক্ষা করে।
আমি আয়নায় তাকিয়ে বলি, "আদ্রিয়ান, আমি মুক্ত।" সে মৃদু হেসে মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার ভালোবাসা রয়ে যায়।
আমি আর একা নই।
চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন