পর্ব ৩
রনির জেল হওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম সব শেষ। কিন্তু না, সবেমাত্র শুরু হয়েছিলো।
থানা থেকে ফিরে আমি আর ওই বাসায় যাইনি। অন্য একটা মেসে উঠেছিলাম। কিন্তু আদ্রিয়ান আমার পিছু ছাড়েনি।
প্রতি রাতে, ঠিক রাত ১২টায়, আমার নতুন বাসার আয়নাতেও সে আসতো।
আমি ভয় পেতাম না। বরং একটা অদ্ভুত মায়া লাগতো।
এক রাতে আমি সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "আদ্রিয়ান, তুমি কেন যাচ্ছো না? তোমার সাথী তো বিচার পেয়েছে।"
আয়নার ভেতরে সে মাথা নিচু করে বললো, "আমি তো যেতে চাই সাথী, কিন্তু আমি আটকে আছি।"
"কেন?"
"আমার সাথীর লাশটা ওরা আজও খুঁজে পায়নি। ওরা বলেছিলো সুইসাইড, কিন্তু লাশটা গুম করে দিয়েছিলো। যতদিন ওর দাফন না হবে, আমি কোথাও যেতে পারবো না।"
আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। তার মানে ওই মেয়েটা আজও নিখোঁজ।
"আমি কি করবো?"
আদ্রিয়ান আয়নার ভেতর থেকে একটা জায়গার নাম বললো, "পুরনো বাসার পিছনের যে পরিত্যক্ত পুকুরটা আছে, ওখানে।"
পরের দিন সকালে আমি পুলিশ নিয়ে ওই পুকুরে গেলাম। পুলিশ অনেক খোঁজার পর একটা বড় ট্রাংক পেলো। ট্রাংকের ভেতর... হ্যাঁ, ওটাই ছিলো আগের সাথীর লাশ।
ওইদিনই জানাজা হলো। আমি দূর থেকে দেখছিলাম। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো আদ্রিয়ান। এই প্রথম আমি তাকে আয়নার বাইরে, খোলা আলোয় দেখলাম। তার চোখে আর কষ্ট নেই, শুধু শান্তি।
সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। ঠোঁট নড়ে বললো, "ধন্যবাদ সাথী।"
আর তারপর, হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। একটা সাদা আলো হয়ে আকাশে উঠে গেলো।
আমি কাঁদছিলাম, কিন্তু এই কান্না দুঃখের না, মুক্তির।
আজ অনেক মাস পর, আমি আর আয়নায় কাউকে দেখি না। কিন্তু মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে মনে হয়, কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, "ভালো থেকো, আমার সাথী।"
আমি জানি, আদ্রিয়ান আর তার সাথী এখন একসাথে আছে। আর আমিও... আমি নতুন করে বাঁচতে শিখেছি। এই নামটা এখন আর ভয়ের না, এই নামটা এখন দুটো ভালোবাসার মানুষের মুক্তির গল্প।
আমি জানি, আদ্রিয়ান আর তার সাথী এখন একসাথে আছে। আর আমিও... আমি নতুন করে বাঁচতে শিখেছি। এই নামটা এখন আর ভয়ের না, এই নামটা এখন দুটো ভালোবাসার মানুষের মুক্তির গল্প।
কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম। মুক্তি এত সহজে আসে না।
সেই জানাজার তিনদিন পর থেকে আবার সব শুরু হলো।
আমি যে নতুন মেসে উঠেছিলাম, সেখানে রাতে আর ঘুমাতে পারতাম না। মনে হতো কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। সাথী... সাথী... খুব মিষ্টি গলায়। আদ্রিয়ানের গলা নয়, একটা মেয়ের গলা।
এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আগের সাথী আমার খাটের পাশে বসে আছে। দেখতে হুবহু আমার মতো। সে আমার হাত ধরলো। তার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।
সে বললো, "তুমি আমার কবরটা খুঁজে দিয়েছো, কিন্তু আমার ডায়েরির শেষ পাতাটা? ওটা তো এখনো ওদের কাছে।"
আমি ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলাম। হ্যাঁ, পেনড্রাইভে ভিডিও ছিলো, কিন্তু ডায়েরির যে পাতাগুলো ছেঁড়া ছিলো, তার মধ্যে আসল প্রমাণটা ছিলো না। রনির বাবা, মানে বাড়িওয়ালা আন্টির স্বামী, অনেক ক্ষমতাবান লোক। পুলিশ রনিকে ধরলেও তার বাবাকে ছুঁতে পারেনি।
আমি বুঝলাম, আদ্রিয়ান চলে গেলেও তার সাথী যেতে পারেনি। কারণ তার মৃত্যুর পুরো বিচার এখনো হয়নি।
আমি পরদিন সকালে আবার ওই পুরনো বাসায় গেলাম। বাসাটা এখন তালাবন্ধ। আন্টিরা পালিয়ে গেছে। আমি তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকলাম।
আমার সেই পুরনো রুমটা যেমন ছিলো তেমনই আছে। ধুলো জমে আছে। আয়নাটা এখনো দেওয়ালে ঝুলছে। কিন্তু আয়নায় আর আদ্রিয়ান নেই।
আমি পুরো বাসা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। ডায়েরির ছেঁড়া পাতা কোথায় থাকতে পারে?
হঠাৎ আমার মনে পড়লো, বাড়িওয়ালার ছেলে রনি একবার বলেছিলো, তার বাবার একটা পুরনো আলমারি আছে, যেটা কেউ খোলে না।
আমি দোতলায় তাদের ফ্ল্যাটে গেলাম। দরজা ভাঙা ছিলো। ভেতরে সব এলোমেলো। পুলিশ রেইড দিয়েছিলো। কোণের দিকে একটা বিশাল লোহার আলমারি। তালা দেওয়া।
আমি পাশে পড়ে থাকা একটা শাবল দিয়ে তালা ভাঙলাম। আলমারির ভেতরে অনেক ফাইল, টাকা, আর একটা ছোট্ট ডায়েরি। সেই সাথীর ডায়েরির ছেঁড়া পাতাগুলো।
সেখানে পরিষ্কার হাতের লেখায় লেখা ছিলো, "আজ রনি আর তার বাবা দুজনেই আমার রুমে এসেছিলো। ওরা আমাকে বাজে প্রস্তাব দিয়েছিলো। আমি রাজি হইনি বলে ওরা আমাকে..."
আমার হাত কাঁপছিলো। এটাই সেই প্রমাণ, যেটা দিয়ে রনির বাবাকেও জেলে দেওয়া যাবে। আমি পাতাগুলো নিয়ে দৌড়ে বের হতে যাবো, তখনই পিছন থেকে কেউ আমার মুখ চেপে ধরলো।
বাড়িওয়ালা আঙ্কেল! তিনি পালাননি, বাসাতেই লুকিয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন, "তুই আবার এসেছিস? তোদের মতো মেয়েদের জন্যই আমার ছেলের জীবন নষ্ট হলো। আজ তোকেও ওই মেয়েটার মতো পুকুরে পাঠাবো।"
আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। মনে হলো আজই আমার শেষ দিন।
ঠিক তখনই, পুরো বাসার সব আয়না একসাথে ঝনঝন করে ভেঙে পড়লো। আর ভাঙা আয়নার প্রতিটা টুকরো থেকে একটা করে আলো বেরিয়ে এলো। সেই আলো থেকে আদ্রিয়ান আর তার সাথী, দুজনেই বেরিয়ে এলো।
আগের সাথী, যে দেখতে আমার মতো, সে তার হাতটা বাড়িয়ে দিলো। তার চোখে আর কষ্ট নেই, আছে রাগ।
আঙ্কেল ভয়ে আমাকে ছেড়ে দিলেন। তিনি পিছাতে পিছাতে বললেন, "কে... কে তোমরা?"
আদ্রিয়ান বললো, "আমরা সেই মানুষ, যাদের তোমরা মেরে ফেলেছো।"
আগের সাথী আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "বোন, ভয় পেও না। আজ থেকে তোমার জীবনে আর কোনো ভয় নেই।"
তারপর একটা অদ্ভুত বাতাসে আঙ্কেল অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
আমি কাঁদতে কাঁদতে ওই মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু ধরতে পারলাম না। সে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
যাওয়ার আগে সে বললো, "আমার নামটা তুমি বাঁচিয়ে রেখো। আমি সাথী ছিলাম, তুমিও সাথী। আমাদের নামের মানে তো সাথ দেওয়া। তুমি আমার সাথ দিয়েছো।"
আদ্রিয়ান আর তার সাথী দুজনে হাত ধরে আকাশে মিলিয়ে গেলো। এবার সত্যি সত্যি মুক্তি পেলো।
পুলিশ এসে আঙ্কেলকে নিয়ে গেলো। আমি ওই ডায়েরির পাতা জমা দিলাম। এক মাস পর কোর্টে তাদের দুজনেরই যাবজ্জীবন জেল হলো।
আজ আমি আবার ওই বাসাতেই থাকি। হ্যাঁ, ওই বাসাতেই। কারণ এখন আর ওই বাসায় কোনো ভূত নেই, কোনো ভয় নেই। আছে শুধু দুটো ভালোবাসার মানুষের আশীর্বাদ।
রাতে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই, নিজেকে দেখি আর বলি, "আমি সাথী, আমি বেঁচে আছি।"
আর মনে হয়, দূর থেকে আদ্রিয়ান আর তার সাথী আমাকে দেখে হাসছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এখন আর ভয় লাগে না, মনে হয় আদ্রিয়ান আর সাথী দূর থেকে হাসছে, বলছে ভালো থেকো আমাদের নামের ছোট বোন তোমরা যেখানেই থাকো শান্তিতে থেকো চিরদিন ভালোবাসায়।
সমাপ্ত