#Haunting_Adeline
#Translator_by_গল্প
#পর্বঃ১ (সিজন ২)
⚠️সতর্কবার্তাঃ এখানে অনেক ডার্ক সিন রয়েছে, নিজ দায়িত্বে পড়ুন। যারা অতিরিক্ত রোমান্টিকতা পছন্দ করেন না তারা চাইলে এটি স্কিপ করতে পারেন। ❌
Chapter 1
The Diamond
গন্ধ। প্রথম যে অনুভূতিটা ফিরে এলো।
ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু আগে আসত, কারণ সঙ্গে সঙ্গেই ঘামের দুর্গন্ধ, মশলাদার পারফিউম আর এমন এক ধরণের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে যেটাকে “খাঁটি শয়তানের গন্ধ” ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
তারপর আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করতে শুরু করল, সাবধানবার্তা আর তাড়াহুড়োর সুর ফিসফিস করে বলে উঠল।
আমি বিপদে।
সেই ফিসফিসানি একসময় চিৎকার আর কর্কশ শব্দে ভরে উঠল, যা আমার শরীরকে আতঙ্কে কাঁপিয়ে তুলল।
অ্যাড্রিনালিন বেড়ে গেল, আর কোনোভাবে আমি নিজেকে শান্ত রাখতে পারলাম যাতে শব্দ না হয়।
ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যাওয়া চোখ খুলতে গিয়ে দেখি চারপাশে অন্ধকার। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারি, আমার চোখে একটা ব্লাইন্ডফোল্ড বাঁধা আছে।
তারপর, যেই অচেতন শান্তি নিয়ে জেগে উঠেছিলাম, সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পুরো শরীর জুড়ে অসহনীয় ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল, যেন আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি।
হায় ঈশ্বর, বেঁচে থাকা যদি এমন হয়, তাহলে মৃত্যুই ভালো।
মৃত্যু হলে অন্তত শান্তি পেতাম। আমি হয়তো একজন স্টকারের প্রেমে পড়েছিলাম, কিন্তু আমি মরলে স্বর্গের একটা স্থান আমি প্রাপ্য।
আমি সেটা অর্জন করেছি।
মাথায় জোর করে চিন্তা আনার চেষ্টা করি, কী হয়েছে মনে করার জন্য। আবছা মনে পড়ে, Daya আমাকে মেসেজ করেছিল ওর কাছে যেতে। ফোনে উত্তর না পাওয়ায় একটা অস্থিরতা নিয়ে গাড়ি করে বেরিয়ে পড়া, হেডলাইট, হঠাৎ গাড়ি ধাক্কা খাওয়া, আর তারপর কিছু মনে নেই।
এবং এখন আমি এখানে... যেখানেই হই না কেন। কিন্তু এটা নিরাপদ কোনো জায়গা নয়।
হায় ঈশ্বর, এগুলো কি আসলেই Daya পাঠিয়েছিল? ওরও কিছু হয়েছে নাকি?
এই সম্ভাবনা নতুন করে আমাকে আতঙ্কিত করে তুলল। মনে মনে হাজার রকম দৃশ্য ঘুরতে লাগল, আমাকে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের মধ্যে ফেলল।
ওরও কিছু হতে পারে, ও বিপদে থাকতে পারে।
এবং আমি নিজেও এখন বিপদে, এবং আমি জানি না কীভাবে এখান থেকে বের হব।
আমার শ্বাস দ্রুত হচ্ছে, আর হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছে যে বুকের ভেতর ব্যথা করছে। কোনোভাবে নিজেকে চুপ করিয়ে রাখছি।
আমি কোথায়? Zade কোথায়?
তারপর কিছু মৃদু, দূরের আওয়াজ আসছে, আস্তে আস্তে জোর হচ্ছে। শুনতে চেষ্টা করি, যদিও হৃদস্পন্দন আর ব্যথা এত জোরে শোরগোল করছে যে স্পষ্ট শুনতে পারছি না।
“Z ওকে খুঁজতে আসবে,” একজন লোক নিচু গলায় বলল। “কিন্তু আমরা Garrison-এর কাছে গিয়ে ভ্যান ছেড়ে দিলে ঠিক থাকবে। তাড়াতাড়ি ওকে সেখানে নিয়ে যাই।”
একটা স্মৃতি মাথায় আঘাত করে উঠল, মনে পড়ল গাড়ি থেকে টেনে বের করার দৃশ্য আর কাঁচ আর লোহার কামড়ের মত ব্যথা। ব্যাখ্যা করে দিল কেন পিঠে এভাবে জ্বালা করছে।
আমাকে অপহরণ করা হয়েছে—এটা স্পষ্ট।
এটা অবশ্যই Society-এর কাজ। Zade আমাকে সতর্ক করেছিল যে ওরা আমাকে টার্গেট করেছে। ওর লোকজন Parsons Manor-এর বাইরে পাহারা দিচ্ছিল। ওরা Daya-কে ব্যবহার করেছে আমাকে বের করার জন্য, মানে ওকেও সম্ভবত ধরে নিয়ে গেছে।
হায় ঈশ্বর, আমি কত বোকা।
Daya ফোন না ধরায়, এটা ফাঁদ হতে পারে, সেটা একবারও ভাবিনি। ওর কোনো বিপদ হয়েছে ভেবে ছুটে গিয়েছিলাম। Zade-কে একটা ফোন করলে আমাকে যেমন বাঁচানো যেত, Daya-ও বেঁচে যেত।
চোখ শক্ত করে বন্ধ করি, গলার ভেতর কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করি। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, বুক কাঁপছে কান্না চেপে রাখতে গিয়ে।
এটা আমারই দোষ।
Zade বারবার সাবধান করেছিল, আর প্রথম ফাঁদেই আমি পা দিয়ে ফেললাম।
“তুমি কত বোকা, Addie।”
“তুমি আসলেই ভাবছো আমরা ওকে Z থেকে লুকিয়ে রাখতে পারব? এটা Z, ভাই,” অন্য একজন লোক বলে উঠল, যার কণ্ঠে হালকা Hispanic টান।
“আমরা তো কেবল Society যা চায়, সেটাই দিচ্ছি। তুমি কাকে বেশি ভয় পাও? ওদের না Z কে?”
হায় ঈশ্বর, এটা সত্যিই Society। শুনে ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আমি জানি না কেন আমাকে এই নরকের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে, কিন্তু ওদের আমাকে এখান থেকে বের করে দিতে হবে। আমি কোনো দাসব্যবস্থার জন্য জন্মাইনি।
দ্বিতীয় লোকটি বলল, “আমি বেছে নিতে চাই না।”
প্রথম লোকটি ওকে হয়তো পিঠে থাপ্পড় মেরে বলল, “তোমার হাতে কোনো বিকল্প নেই, Rio। এই মেয়েটা লাখ লাখ ডলার মূল্যের। ভাব, Z-এর মেয়ে, ওর একমাত্র মেয়ে, নিলামে উঠবে। Z-এর কত শত্রু আছে? সবাই ওর মেয়েকে কিনে ওর খেলনা বানাতে চাইবে। Max থেকে ভাগ পেয়ে যাব, Society তোদেরকেও টাকা দেবে। আমরা বিলাসে ভরপুর জীবন কাটাব।”
সে হায়নার মতো হেসে উঠল। “আমি নিজের প্রাইভেট দ্বীপ কিনে ফেলব!”
ওদের এই নোংরা কথায় আমার রাগে শরীর কাঁপতে লাগল।
“তাদের সুরক্ষার ধরণটা আমার চেয়ে আলাদা,” Rio বলল। “Z বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমাদেরও লুকিয়ে থাকতে হবে।”
প্রথম জন বলল, “ফিকির করোনা। আজ রাতে Ritual-এর পর Society Z-কে মেরে ফেলবে, ওরা আমাদের রক্ষা করবে।”
প্রথম জনের কথা শেষ হতেই Rio কটাক্ষ করে হেসে উঠল।
হায় ঈশ্বর, আমি সত্যিই ভয়ানক বিপদে। চোখে পানি এসে গেল, আর চেষ্টা করেও আর কান্না আটকানো গেল না।
Addie, গভীর শ্বাস নাও। Zade তোমাকে কী শিখিয়েছিল?
একটু সময় লাগল নিজেকে সামলাতে, তারপর Zade-এর গলার আওয়াজ মনে পড়ল।
“প্রমাণ রেখে যেও।”
দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে চুলের গোছা ধরে টেনে ছিঁড়ে নিলাম। এই ব্যথা এইটুকু বেদনার মধ্যে কিছুই নয়।
ধীরে ধীরে হাত নাড়ালাম যাতে চোখে পড়ে না। যদি ওরা আমাকে দেখতে পায়, বিপদ।
চুলগুলো আলগা করে ফেলতে গিয়ে হঠাৎ গাড়ি এমন এক ধাক্কা খেল যে মুখ দিয়ে একটুখানি চিৎকার বেরিয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
“জেগে উঠেছো নাকি, সুইটহার্ট?” প্রথম জন, যে আমাকে Diamond বলেছিল, ঠাট্টার গলায় বলল।
“আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?” আমি গলা শুকিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
“তোমার নতুন বাড়ি—তবে সাময়িক। যার কাছে বেশি দাম উঠবে, সে তোমার জন্য চিরকালীন বাড়ি দেবে,” সে হেসে উঠল।
“দারুণ,” আমি কষ্ট করে বললাম। “লটারিতে জিতেছি বোধহয়।”
Rio হাসল। “এই হাসিটা ধরে রাখো, বেবি গার্ল। যেখানে যাচ্ছ, সেখানে এগুলোর দরকার হবে।”
তার আগে আর কিছু বলার সুযোগ পেলাম না, হঠাৎ বাহুতে একটা সূচের খোঁচা লাগল। আগুনের মত জ্বালা ছড়িয়ে গেল রক্তে।
একটা তীক্ষ্ণ শ্বাস টেনে নিলাম।
এবং সেটা আমার শেষ নিঃশ্বাস ছিল, অন্ধকার নেমে এলো।
***************
“তার ভায়টালগুলো স্থির নেই, আর রক্তচাপ কমে যাচ্ছে। আমাদের দ্রুত ওকে IV দিতে হবে।”
আমি নড়েচড়ে উঠলাম; কানে বাজতে থাকা শব্দের নিচে সেই অচেনা কণ্ঠ ভেসে এলো।
প্রতিটি স্নায়ুতে যন্ত্রণার আগুন জ্বলছে, তবুও মনে হচ্ছে আমি যেন পানির তলায় ডুবে আছি, উপরে উঠতে চাইছি, আবার পেছনে সরে যাচ্ছি কারণ জানি উপরে উঠলেই ব্যথা আরও তীব্র হবে।
আমি যেন আগুনের চাদরে ঢাকা, শিখাগুলো স্নায়ুতে লেগে আছে, আর যত সচেতন হচ্ছি, তত সেই আগুনের তাপ বাড়ছে।
হঠাৎ বাহুতে একটা সূচের খোঁচা লাগল, তারপর চারদিক থেকে আসা স্তব্ধ গলাগুলো শোনা গেল।
“ডিসলোকেটেড শোল্ডার, মাথায় আঘাত, সারা গায়ে কাটাছেঁড়া।”
লোকটির গলা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে এলো, হঠাৎ কর্কশ চিৎকারে স্পষ্ট হয়ে গেল, যা আমার মেরুদণ্ড বেয়ে কেঁপে উঠল।
“শালার Rio, এটা কোনো হাসপাতাল নয় যে আমার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে। ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা জানি না।”
“আরে ভাই, কিছুক্ষণ আগেও তো ঠিক ছিল,” অন্য একজন বলল, কণ্ঠে চিন্তার ছাপ। সম্ভবত Rio-র সঙ্গী।
“ঠিক ছিল? ও কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মাথায় আঘাত লেগেছে এটা স্পষ্ট। ভেতরে রক্তক্ষরণ হতে পারে, আর কয়েক সেকেন্ডেই মারা যেতে পারে। তুমি আমাকে CT স্ক্যানার এনে দেবে?”
চুপচাপ শুনে যাওয়ার পর, লোকটি ফিসফিস করে বলল, “এটাই তো ভেবেছিলাম।”
অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি ঘিরে ধরল আমাকে, অন্ধকার আমাকে আবার টেনে নিচ্ছে। আমি কাতর স্বরে শব্দ করি, আর কেউ একজন আঙুল দিয়ে চোখ খুলে দেয়। তীক্ষ্ণ আলো চোখে পড়ল, কিন্তু আমি hardly টের পেলাম।
“মিস, বলো তোমার কোথায় ব্যথা করছে?”
একজন বৃদ্ধ লোক আলোর বদলে সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখ ঝাপসা হলেও, ফ্যাকাসে নীল চোখ, ধূসর চুলের গোছা আর মোটা গোঁফ চিনতে পারলাম।
আমি ঠোঁট ফাঁক করলাম, কিন্তু জিভ মুখের তালুতে আটকে আছে।
হায় ঈশ্বর, ওরা আমাকে কী ইনজেকশন দিয়েছে?
মাথা ঘুরছে, চোখে অন্ধকার দেখছি।
“আমি জানি তুমি এখন খুব ব্যথায় আছো, কিন্তু আমাকে বলো কোথায় ব্যথা করছে।”
সবখানেই। সবখানেই ব্যথা করছে।
শেষ পর্যন্ত কষ্ট করে ফিসফিস করে বললাম, “আমার... কাঁধ।” তারপর বললাম, “মাথা।”
“আর কোথাও? বুকে বা পেটে?”
“পিঠ,” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, গাড়ি থেকে টেনে বের করার দৃশ্য মনে পড়ল। মনে হচ্ছে কেউ পিঠটাকে চিজ গ্রেটার দিয়ে ঘষে দিচ্ছে।
“এইটুকুই?” লোকটি জানতে চাইলো।
আমি মাথা নাড়লাম, এতো প্রশ্নে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আরও হাজারটা জায়গায় ব্যথা করছে, কিন্তু শক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমি খুব, খুব ক্লান্ত।
“আমি তোমাকে অজ্ঞান করে চিকিৎসা করব, ঠিক আছে?”
আস্তে আস্তে চারপাশের দৃশ্য স্পষ্ট হতে লাগল, লোকটির মুখ আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। তার পেছনে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে, পায়ের ওপর পা নাড়াচ্ছে আর আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
“ঘুমিয়ে যাও, প্রিন্সেস।”
অন্ধকার গভীর চোখ, আর ঠোঁটে এক ধরণের নোংরা হাসি—Rio।
ও-ই আমাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করেছিল। কথোপকথনের কিছু অংশ মনে পড়ছে, কিন্তু মাথার মধ্যে যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে কিছুই স্পষ্ট করতে পারছি না।
চোখ ফোকাস করতে না করতেই আবার ঝাপসা হয়ে এলো, চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করার তীব্র আকর্ষণ টানছে।
আমি আর লড়তে চাই না।
যদি ঘুমাতে পারি, তাহলে এই অসহনীয় ব্যথা থেকে মুক্তি পাব।
***************
Addie, বেবি, আমার জন্য লড়াই করো, ঠিক আছে? আমার জন্য বেঁচে থাকো যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে পৌঁছাই।
-----
“ওর অবস্থা কতটা খারাপ?”
প্রশ্নটা আমাকে সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে বের করে আনল যেখানে আমি ভেসে যাচ্ছিলাম, শুধু Zade-এর কণ্ঠের একটুখানি ছায়া নিয়ে।
ওর কণ্ঠ আসলে নেই—তবুও এত বাস্তব লাগে, এত শান্তির মতো যে আমি ওখানেই থাকতে চাই, যেখানে ওর কণ্ঠ শুনতে পাই।
“তুমি কী ভাবছ? তুমি ওকে রাস্তায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে।”
রাগে ভরা উত্তর শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে ধীরে ধীরে ব্যথার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। কেউ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর সেই বৃদ্ধ লোকটি আবার বলল,
“ওর পিঠে কাঁচের জন্য কয়েকটা দাগ থাকবে। ভাগ্য ভালো যে কাটা গুলো পরিষ্কার, তাই দাগগুলো খুব খারাপ হবে না।”
“এতে ওর দাম কমে যাবে,” একটা গলা অস্পষ্টভাবে বলল, কে বলল বোঝা গেল না।
“চুপ কর, তবুও তো টাকা পাবি। তোর সমস্যা কী?”
“সমস্যা? তোর ভুলে আমার জীবন বিপদে পড়ছে, Rio। আমি জানতাম ওর একটু ব্যথা লেগেছে, এভাবে নয়।”
Rio কিছু বলার আগে সেই ডাক্তার গলা উঁচিয়ে বলল,
“ওর শরীরে দুইটা বড় কেটে যাওয়া দাগ সেলাই দিতে তিরিশটা সেলাই লেগেছে, কারণ ওকে তীক্ষ্ণ ধাতু আর কাঁচের উপর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাতে স্থায়ী ক্ষতি হবে না ভাবা বোকামি।”
“মাদারচোদ, Rio। এটা আমার পকেট থেকে যাবে বুঝছ তো? আমি তোকে সাহায্য করতে বলেছিলাম, সবকিছু গণ্ডগোল করতে না।”
“তাহলে কীভাবে ওকে বের করতাম, হুম? আমি সুপারম্যান নাকি যে গাড়ি তুলবো আর প্রিন্সেসের মতো ওকে কোলে করে বের করবো?” Rio ক্ষেপে গিয়ে বলল।
আমার বুক টনটন করে উঠল। ওর রুক্ষ কণ্ঠ শুনে মনে হলো খসখসে নখ দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে আঁচড় দেওয়া হচ্ছে। আমি অনেকবার এই ভয়ংকর কণ্ঠ শুনে জেগে উঠেছি। আর প্রতিবারেই মনে হয়েছে আমি দুঃস্বপ্নে আটকে আছি।
“তুমি যদি গাড়িটাকে এত জোরে ধাক্কা না দিতে , তাহলে এইসব কিছু হতো না,” অন্যজন চিৎকার করে উঠল।
“তুমি যদি নেশার ঘোরে চিৎকার না করতে, তাহলে ড্রাইভার হতে পারতে যেমন হওয়ার কথা ছিল।”
“ভাইসাব, শান্ত হও। ও জেগে উঠেছে। রক্তচাপ বাড়ছে।” ডাক্তার বলল।
আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল, কিন্তু আমি চোখ বন্ধ রাখার ভান করলাম না। ধীরে ধীরে চোখ খুললাম, দেখতে পেলাম তিনজন লোক আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো পরীক্ষার ল্যাবে ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে আছে।
একটা ভয়ংকর পরীক্ষা।
প্রথমে আমার চোখ পড়ল এক জোড়া অন্ধকার চোখে। প্রায় কালো, উষ্ণতা নেই। তার হালকা বাদামী চামড়া জুড়ে ট্যাটু, গলায় লরেল পাতা আকৃতির ট্যাটু। কালো চামড়ার জ্যাকেট পরা, হাত এবং আঙুল পর্যন্ত কালি দিয়ে আঁকা। তীক্ষ্ণ মুখের গঠন, মোটা ভ্রু, ছোট করে কাটা চুলের পাশে কাটা দাগ—সব মিলে তাকে হিংস্র দেখাচ্ছে। হয়তো দেখতে সুন্দর হতো যদি ও আমাকে মেরে ফেলতে না চাইত।
এরপর আমার দৃষ্টি গেল পাশে থাকা লোকটির দিকে—ময়লা, মুখে ঘা, নেশায় ক্ষতবিক্ষত, তেল চিটচিটে চুলের ওপর উল্টো ক্যাপ, ময়লা সাদা গেঞ্জি, বড় প্যান্ট। ও-ই আমাকে অপহরণ করেছিল, সেটা মনে পড়ল।
সবশেষে আমার চোখ গেল তৃতীয় ব্যক্তির দিকে—সম্ভবত ডাক্তার। ধূসর চুল, নীল চোখ, মোটা গোঁফ, মুখে দুশ্চিন্তার ভাজ। তার চোখে মায়ার ছাপ আছে, কিন্তু তবুও কিছু একটা অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে।
আমি অন্যদিকে মুখ ফেরালাম, হাড়ের ভেতর ঠান্ডা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল। ব্যথার তীব্রতা বাড়ছে, কিন্তু ভ্যানে যখন প্রথম জেগে উঠেছিলাম, তখনকার মতো তীব্র নয়। যা ইনজেকশন দিয়েছিল, সেটা কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে, আর আমি এখন Morphine (শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ) এর জন্য হাত জোড় করতে রাজি।
শরীরের প্রতিটি পেশী এত ব্যথায় ভরা যে মনে হচ্ছে হাড়ের ওপর শক্ত খোলস তৈরি হয়েছে। নড়াচড়া করলেই ব্যথা।
অল্প করে শ্বাস নিতে নিতে চারপাশ দেখলাম। সাদা, অন্ধকার একটি ঘর। জীবাণুমুক্ত হলেও হাসপাতালের মতো নয়, আবার কোনো অন্ধকূপও নয়।
দেয়াল সাদা, মেঝে কংক্রিট, দেয়ালের চারপাশে রূপালী আলমারি। বিছানার পাশে একটি ধাতব টেবিল, যেখানে রক্ত মাখা কাপড়ের ওপর কিছু যন্ত্রপাতি রাখা।
বিভিন্ন রকম যন্ত্র রাখা আছে, তার মধ্যে একটি বীপ করা মনিটর আর হাতে IV চেনা লাগছে।
ডাক্তার বিছানার পাশের টেবিল থেকে একটা কাপ হাতে দিয়ে বলল, “আস্তে আস্তে খাবে।”
আমি কাপ হাতে নিয়ে এক চুমুক খেলাম। ঠান্ডা পানি যেন পোড়া জায়গায় বরফ ঢালার মতো, ব্যথায় আরাম দিল।
সাদা মোটা কম্বল আমার কোমর পর্যন্ত ঢাকা। নিচে তাকাতেই দেখলাম, আমি শুধু হালকা নীল গাউন পরা।
অজানা কারণে এটা সবচেয়ে বাজে লাগল। কারণ ওরা দেখতে পাচ্ছে এখানে কতটা ঠান্ডা লাগছে আমাকে।
আমি যেখানে তাকিয়ে ছিলাম, সেটা লক্ষ্য করে ডাক্তার বলল,
“তোমার জামাকাপড় কেটে ফেলতে হয়েছে চিকিৎসা করার জন্য, এজন্য দুঃখিত।”
“তাতে Rio-কে ধন্যবাদ দাও,” Rick ফিসফিস করে বলল।
“চুপ কর Rick,” Rio গর্জে উঠল, রাগে তার উচ্চারণ ভারী হয়ে গেল। “নাহলে তোকে মেরে ফেলব, আর তোর মতো নষ্ট হীরকের জন্য কেউ কান্না কাঁদবে না।”
এই ভয়টা অন্যরকম।
Zade আমাকে যে ভয় দেখিয়েছিল, সেটা যেমন ছিল না, তেমনি সিনেমা বা হরর হাউজের সস্তা ভয়ের সঙ্গেও এর কোনো মিল নেই। এটা আসল ভয়, যখন তুমি বুঝতে পারো তুমি সত্যিই ফাঁসের মধ্যে আছো।
মনিটরের বীপ দ্রুত হতে লাগল, ডাক্তার চিন্তিত হয়ে তাকাল।
মাথার মধ্যে শুধু Rio-র সেই কণ্ঠ বাজতে লাগল, “Time to go to sleep, princess.”
“আমি কোথায়?” ফিসফিস করে বললাম, তারপর কাশলাম।
“Ritz-Carlton-এ, প্রিন্সেস। তুমি কী ভাবছ?” Rio রেগে গিয়ে বলল।
Rick ওর দিকে তাকাল, মুখে আতঙ্ক। Rio যে ভুল করেছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে, আর মনে মনে আমি চাইছিলাম ওরা ওকে মেরে ফেলুক।
“আমার নাম Dr. Garrison,” ডাক্তার পরিচয় দিল। আমি চুপ রইলাম। আমার নাম জিজ্ঞাসা করলে ওকে IV পোল ধরে পাছায় ঢুকিয়ে দিতে পারতাম।
“কেমন লাগছে?” ডাক্তার আরেক ধাপ এগিয়ে এসে বলল। আমি কিছু বলার আগেই সে বুঝে নিয়ে বলল,
“মাথা ব্যথা করছে, বমি বমি লাগছে?”
আমি ঠোঁট টিপে রইলাম।
Zade-এর সাথে যেমন ঠাট্টা করার সুযোগ ছিল, এখানে নেই। ওরা আমাকে সত্যিই মেরে ফেলবে।
“বমি বমি লাগছে,” আমি গলা শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে বললাম। ডাক্তার IV-তে নতুন ব্যাগ লাগাচ্ছে। আশা করছি এটা Morphine হবে।
আমি কাপের পানি শেষ করে ফেললাম, কিন্তু তৃষ্ণা মিটল না। ঠোঁট বারবার চাটছি, কিন্তু তাও শুষ্ক।
“তোমার concussion হয়েছে। আমাদের দেখতে হবে যেন আর কোনো ক্ষতি না হয়,” ডাক্তার বলল, Rio আর Rick-এর দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে।
আমার মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, “মনে হচ্ছে আর ক্ষতি হবে, চিন্তা করোনা।”
Rio গর্জে উঠল, “একটা শব্দ বের করবি না।”
“তোর মস্তিষ্ক নষ্ট হলেও, তোর যেটার প্রয়োজন, সেটা ঠিকই কাজ করবে।”
আমার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। ডাক্তার বিরক্ত হয়ে তাকাল।
চুপ করে থাক, Addie।
“তুমি যা-ই বলো, extensive trauma হয়েছে। আমাদের তোমাকে ঠিক রাখতে হবে।” ডাক্তার বলল।
ওরা আমাকে ঠিক রাখতে চায় যেন বিক্রি করার সময় দাম ভালো ওঠে।
কিন্তু আমি তর্ক করলাম না। কারণ বেঁচে থাকার মানে পালানোর শক্তি পাওয়া।
“আজ কী দিন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“তুমি ভাবছ এটা গুরুত্বপূর্ণ?” Rick চিৎকার করে উঠল। “প্রশ্ন করার সুযোগ তোমার নেই।”
আমার ঠোঁট কাঁপতে লাগল, রাগে কিছু বলতে চাইছিলাম। কিন্তু নিজেকে থামালাম।
“Thursday,” ডাক্তার বলল।
Thursday…
দুর্ঘটনার পর পাঁচ দিন পেরিয়ে গেছে।
এখন পর্যন্ত Zade আমাকে খুঁজতে বের হয়ে পড়েছে। নিশ্চিত ভাবেই অনেককে মেরে ফেলবে। যখন আমার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল, আমি বুঝলাম Zade আমাকে সত্যিই নষ্ট করে ফেলেছে।
“মজা লাগছে?” Rick প্রশ্ন করল। আমি মাথা নাড়লাম। কিন্তু মনে মনে ভাবলাম, আমার মৃত্যু হলেও ওরা সবাই মরবে। আর ওদের মৃত্যু হবে অনেক বেশি ভয়ংকর।
যখনই আমি Zade-এর ধ্বংসের কল্পনা করতে শুরু করলাম, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল। যতটুকু অ্যাড্রিনালিন ছিল, সব ফুরিয়ে যাচ্ছিল।
তিনজন লোক আমাকে গভীরভাবে দেখছিল, আর আমি বুঝতে পারছিলাম আমাকে যা ইনজেকশন দিয়েছে, সেটা Morphine নয়।
আমার চোখ Rio-র দিকে গেল। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আবার জোর করে খুললাম। Rio-র ঠোঁটে শুকনো এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
“ঘুমিয়ে যাও, প্রিন্সেস।”
*****************
(Dairy 📜)
২০০৮ সালের ৮ জুন
আমি কী করেছি, যার জন্য এ শাস্তি পেতে হচ্ছে? আমি মাত্র বিশ বছর বয়সী। মাত্র বিশ। আর এখন আমি মরতে যাচ্ছি। হায় ঈশ্বর।
আর আমি শুধু একটা কথাই ভাবতে পারছি—আমার ছোট বোনের কী হবে?
মা তো নিজের জীবন নিয়েও দাঁড়াতে পারবে না, সে কি ওর দায় নেবে? ধনভাগা FUCK. আমার বোনও মরবে।
এই ভেবেই বুক ফেটে যাচ্ছে। এ যন্ত্রণার চেয়ে, এদের যা করছে তার চেয়েও, Francesca যা করছে তার চেয়েও বেশি ব্যথা দিচ্ছে এটা।
ওরা যা করছে, সেটা কেবল শরীরের ওপর আঘাত। ওরা আমাকে মানসিকভাবে ভাঙতে পারবে না, কারণ আমি আগেই ভেঙে গেছি।
—মলি
চলবে