---- তুই নাকি শ্রাবন ভাইয়ার বউ বলে পরিচয় দিয়েছিস নিজেকে ? পুরো ভার্সিটিতে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তুই চিনিস সে কে?
থমকাল মেঘ। শুষ্ক ডুগ গিললো সে। গলাটা শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে সেই কবে থেকেই। তাই সব বাদ দিয়ে আগে জিজ্ঞেস করলো,
---- পানি আছে আপু তোর কাছে?
অবাক হলো দোয়েল। বলল,
---- তোর ভয় হচ্ছে না? সিঙ্গেল ভদ্র ছেলেকে মিঙ্গেল
বানিয়ে দিয়েছিস একদম। তোকে তো খুঁজছে ওরা। বিশেষ করে শ্রাবণ ভাই। প্রেমই করেনি সেখানে তুই বিবাহিত ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছিস।
মেঘ মৃদু অভিমান করে বলল,
---- থাক পানি লাগবে না। আর ভয় কিসের বলতো? আমি কালকেই তো আসলাম। আর আজ তুই ক্যান্টিনে গিয়েছিলিস আমাকে একা দাঁড় করিয়ে। আমি চিনি এখানকার কোনো জায়গা ? কয়েকটা ছেলে পেলে এসে আমায় র্যাগ দিচ্ছিলো। বলছিলো, তোমার বি এফ আছে? কয়টা রিলেশন করেছো ? একজনকে গিয়ে নাকি চুমু খেতে হবে নয়তো ভালোবাসি বলতে হবে। রাগ হয়েছিল কিন্তু সাহসে কুলোয়নি কিছু বলার আর তখনই পাশ থেকে একটা মেয়ে বলেছিলো, এই কথা বললে বেঁচে যাবো ওদের থেকে। তাই এসব ফাউল পোলাপাইন গুলোর থেকে বাঁচতে বলেছিলাম আমি শ্রাবন শিকদারের বউ। তুই বিশ্বাস কর আপু, ছেলেটার নামটা বলার সাথে সাথে ছেলেগুলো যেন ভূত দেখেছে। সালাম দিয়ে সরে গেল তৎক্ষনাৎ । এতই যখন দাপট ওনার, তাহলে এই র্যাগিংটা বন্ধ করতে পারে না কেন?
দোয়েল বুঝলো কাদের কাজ এটা। সে বলল,
---- ওরা শ্রাবন ভাইয়ার বন্ধু ছিলো। র্যাগ দেওয়া নিষেধ। এমনি হয়তো মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলো। যায় হোক আজ আর ভার্সিটিতে থাকা যাবে না চল বাসায় যায়। শ্রাবণ ভাইয়ার বাবা আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার। তার উপর ডিপার্টমেন্ট টপার, স্যার ম্যামদের প্রিয় স্টুডেন্ট। আরো অনেক,
---- ভয় পাচ্ছিস তুই আপু ?
হাত ধরলো দোয়েল মেঘের। বলল,
---- তোর জন্য ভয় হচ্ছে আমার। কারন আমি জানি ভার্সিটি লাইফ কেমন হয়। সামান্য মিথ্যাটাকে ঘীরে মেয়েরা হয়ে যাবে তোর শত্রু। কিছু ফাউল মেয়ে আছে এখানো ছেলেটা পাত্তা না দিলে কি হবে তার পিছু পড়ে থাকবে এই ও আমার ও আমার বলে মেয়েরাই ঝগড়া লাগে। আর যদি তোর কথা জেনে তোকে চিনতে পারে তোর ক্ষতি করবে। আর তোকে ও আমি চিনি। শোন, এই কথাটা বাসায় পৌঁছালে কি হবে বুঝতে পারছিস তুই?
---- না আমি যাবো না। আর ভয় পাস না আপু।
আমায় কিছু বললে সত্যিটা বলে দিবো তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
---- আর ঠিক! কোনো কথা না। চল আমার সাথে। জোড় করে নিয়ে যেতে লাগল দোয়েল মেঘকে। দ্রুত রিকশা ডেকে চলে যায় বাসার উদ্দেশ্যে।
_________________
---- কেন ডেকেছেন স্যার ?
---- ছেলে বিয়ে করে ফেললো আর আমি বাবা হয়ে পরের থেকে জানতে হবে এটা আমি আশা করিনি তোমার কাছে শ্রাবণ? বিয়ে করতেই পারো তাই বলে কি আমাদের জানানোর প্রয়োজনবোধ করলে না?
মাথাটা জাস্ট ফেটে যাওয়ার অবস্থা শ্রাবনের। সে তো নিজেই জানে না আসলে যে নিজেকে তার বউ বলে পরিচয় দিয়ে পুরো ভার্সিটি রটিয়েছে সে আসলে কে? মেয়ে মানুষে এক প্রকার এলার্জি তার কাছে বলা চলে। বাবা মায়ের সাথে সে তেমন একটা কথা বলে না। কারন ওনারা সেপারেশনে আছেন প্রায় দশ বছর যাবত। শ্রাবণের মা সুমনা রাহমান একজন ডক্টর। তার বাবা তারই ভার্সিটির প্রিন্সিপাল। কথা খানা কানে আসতেই দ্রুত পিয়ন কে দিয়ে ডেকে পাঠালেন সারিফ শিকদার। কেবলই প্রিন্সিপাল এবং স্টুডেন্ট সম্পর্ককে সম্মান দিতে আসা তার অফিস কক্ষে।
---- বিয়ে, করি অথবা না করি সেটা একান্তই আমার ব্যাক্তিগত স্যার! ভার্সিটি রিলেটেড কোনো কথা জিজ্ঞেস করার হলে বলতে পারেন নয়তো আমি আসছি।
---- শ্রাবণ আমি তোমার বাবা। এভাবে বার বার কেন স্যার বলো আমার খারাপ লাগে শুনতে।
শ্রাবণ ঘুরে যেতে নিয়ে ও ফিরে তাকাল, ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল,
---- যে যা প্রাপ্য তাকে তা-ই দিতে হয়। টাকা রোজগার করেন আপনারা। আপনাদেরকে এভাবেই মানায়। খারাপ লাগলে ও মানিয়ে নিতে হয়। আমি তো তা-ই করেছি। তাই না?
চলে গেলো শ্রাবণ। মনে পাহাড় সমান যন্ত্রণা নিয়ে ও ছেলেটা দিব্যি ভালো ভাবে থাকছে। ভাগ্যিস ছেলে হয়েছিলো মেয়ে হলে মা বাবা ছাড়া থাকাটা দুষ্কর হয়ে পড়তো। মাঝে মধ্যে ভাবনায় আসে কথাটা শ্রাবণের।
আশাহত হলেন সারিফ শিকদার। ছেলে বিয়ে করেছে অথচ তিনি জানতেই পারলেন না। নাহ ছেলে তার ঠিকই বলেছে, বাবা হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার। যখন ওর আমাদের প্রয়োজন ছিল তখন আমরা ছিলাম কাজ পাগল। ঝগড়াঝাটি, তর্কাতর্কি, মানঅভিমান করে আলাদা হয়ে গেলাম। ভাবলাম না আমাদের কারনে আমাদের ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু, সুমনা ও তো ওর মা হয়। ও কেন জব করবে? আমি কি কম টাকা রোজগার করি নাকি? ও আমার সংসার সামলাবে ছেলেকে সামলাবে। তা না করে জব করবেই। থাক ওর মতো মানুষ আলাদা থাকায় ভালো৷ চলেই গিয়েছে জীবন আর ফিরে আসার দরজার নেই।
মনে মনে সেই পুরনো রাগ জেগে উঠলো সারিফ শিকদার এর মনে। ছেলের কষ্ট চাপিয়ে গেলো ওয়াইফের সিদ্ধান্তের কাছে।
______________
---- শ্রাবণ!
---- হুম!
---- আংকেল কেন ডেকেছিলো তোকে ?
শ্রাবণের কোনো অভিব্যাক্তি হলো না। সে দেওয়ালে পিট এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো। পাশে তাসির তার সবচেয়ে আপনজন, খুব কাছের। যেমনটা আপন ভাই হয় ঠিক তেমন সম্পর্ক তাদের। কাঁধে হাত রাখল শ্রাবণের। অতঃপর বলল,
---- আবার ও ওভার রিয়াক্ট করেছিস আংকেলের সাথে তাই না?
---- বাদ দে এসব। আগে ওই সয়তান গুলোরে আমার সামনে হাজির কর ওদেরকে আজ আমি বোঝাবো র্যাগিং কাকে বলে!
তাদেরই বন্ধুমহলের রাতুল, রামিম আর রিফাদ ওরা তিনজনকে বেহায়া বললেই চলে ওরা বারণ করার পরও দুষ্টুমি করবে।
---- বাদ দে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। হয়তো মেয়েটা ভয়ে বলেছিলো তোর নাম।
---- আমি মেয়েটির দোষ দিচ্ছি না তাসির। আমি
ওদের বারণ করার পর ও ওরা একই কাজ করছে। এতে যে, ওদেরকে সবাই অপছন্দ করে এমনকি এই একটা অপরাধে তাদের ভার্সিটি থেকে বের করে দিতে ও পারে। সময় থাকতে ভালো হয়ে যেতে বল নয়তো নিজেদের ক্যারিয়ার নষ্ট হবে তাতে আমার কি!
---- ওদের ভাই গন্ডারের চামড়া বুঝে ও বুঝে না।
যায় হোক বাসায় যাবি না?
---- বউ নেই এতো তাড়া কিসের তোর ?
তাসির হালকা হাসলো। বলল,
----- আমার তো বউ নেই কিন্তু তোর কি কপাল চাইলি না, তবুও বউ এসে তোর কপালে জুড়ে গেলো।
দেখার খুব ক্রেভিং হচ্ছে। তোর হচ্ছে না?
তাকাল শ্রাবণ তাসিরের দিকে শীতল দৃষ্টিতে। তাসির বোকা হাসল। শ্রাবণ বলল,
---- যেহেতু আমার বউ আমাকেই দেখতে দে তোর দেখার দরকার নেই। যা গিটারটা নিয়ে। আমি আসি।
ওঠে দাঁড়ায় শ্রাবণ। তাসির সাথে সাথে বলল,
---- ফাস্ট ইয়ার, ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট, নাম মেহেরিন মেঘ
দেখতে মিষ্টি তোর সাথে মানাবে একদম । সত্যিকারের
বউ বানিয়ে নিবি কিন্তু?
খানিকটা থমকাল শ্রাবণ। মেয়েটার পুরো ডিটেইলস তাদের জানা দেখছি। থামল কিন্তু, তাকাল না সোজা চলে গেলো। তার মধ্যে পদে পদে অনেকে প্রশ্ন করেছে, তার মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই৷ শুধু এড়িয়ে গিয়েছে শ্রাবণ। আজ তাকে মেয়েটা নাকানিচুবানি খাইয়েছে একদম ৷ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে সে। অবশ্যই মেয়েটাকে খুঁজে বের করে জানতে হবে এতো বড় মিথ্যাটা কিভাবে বলতে পারলো৷ নয়তো মানুষের কাছে এতো ইন্টারভিউ দিতে হয়?
______________
---- এতো তাড়াতাড়ি এসে পড়েছিস? ক্লাস হয়নি?
নাকি সঙ্গী পেয়ে এখন পড়াশোনায় মন বসছে না তোর দোয়েল?
মায়ের কথায় বিরক্ত হলো দোয়েল। মেঘকে পছন্দ করে না কেন জানি। মেঘ ও কখনো আগ বাড়িয়ে কিছুই বলে না। সে এখানে যেমন থাকছে তেমন সবকিছুর খরচ সে নিজেই বহন করছে। তার বাবা টাকা দেয়। চাচি বলে কথা সবাই তো এক হয় না। গ্রামের বলে তো সহ্যই করতে পারেন না তিনি। মেঘ চুপচাপ থাকে কারন মুখ খুললে উচিত কথা-ই বের হবে। তখন দেখা যাবে তার থাকার জায়গা রাস্তায়,
দুজনেই চুপচাপ রুমে চলে আসলো। দোয়েলের সাথেই থাকে মেঘ। ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসে দুজন। নয়তো আবার ও এসে মেঘের দোষ দিবে।
---- মেঘ এই মেঘ!
চাঁচির চিৎকারে দু'জনের আত্মা দেহ থেকে উড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা উঠে দাঁড়ালো। কৌতুহল বশত বের হতে গেলেই চাচি ভেতরে আসলো। কন্ঠ তার প্রচন্ড রাগ, ঘৃণা অসহ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে।
----- বুঝলাম না কিছুই একদিন যেতে না যেতে কাকে পেয়েছিস তুই? কাকে বিয়ে করেছিস হ্যাহ? সম্মান নষ্ট করতে আসছিস এখানে আমাদের ভালো থাকতে দিবি তোরা? নে তোর শশুর ফোন দিয়েছে কথা বল।
মেঘ আকাশ থেকে পড়ল, কিসের বিয়ে কিসের শশুর?
তাকাল দোয়েলের দিকে, দোয়েল কি বলবে বুঝে পেলো না। নিশ্চয়ই স্যারের কানে গিয়েছে কথাটা। আর সব ইনফরমেশন নিয়ে উফ এখন বোধহয় কথা শুনাবে।
---- ধর!
----- আ' আসসালামু আলাইকুম ক'কে বলছেন?
চলবে,,,,,,,,,
#শ্রাবণ_মেঘের_উপখ্যান
#তাসনিম_লিজা — ১
------ কপি নিষিদ্ধ.