#শ্রাবণ_মেঘের_উপখ্যান — ২
#কলমে_তাসনিম_লিজা
------- কপি নিষিদ্ধ!
দোয়েলের মা জননী বেজায় ক্ষেপেছে। তাকাতে পারছে না মেঘ৷ রাগ করাটা এই ক্ষেত্রে একদম স্বাভাবিক। তার বাবা হলেও রাগ করতো ভিষণ। মেঘ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে সালামের উত্তর দিয়ে বলে উঠলেন সারিফ শিকদার,
---- কেমন আছো মেঘ মামুনি?
কন্ঠ চিনতে পেরেছে মেঘ। কালকে দু'বার গিয়েছিল সে দোয়েলের সাথে। কাগজপত্র নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিলো। ওনি খুবই ভালো মানুষ। কিছু না ভেবে আগে জবাব দিলো নরম স্বরে,
---- জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আ'আপনি?
ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেলো। অতঃপর বলল,
---- মন খারাপ একটু হয়েছিলো বাবা হয়ে ছেলের বউকে দেখে চিনতে পারলাম না। যায় হোক! আমার ছেলেটা একটু অন্যরকম আমায় সাথে তার ভিষণ অভিমান। তুমি কালকে এসেই আমার সাথে
দেখা করবে কেমন?
মেঘ বুঝলো প্রিন্সিপাল স্যার সত্যি ভাবছে সে তার ছেলের বউ। বিপাকে পড়লো মেঘ। বলতে নিল,
---- কিন্তু.....
---- আমি কোনো কিন্তু শুনতে চাই না। তুমি কাল এসে আমার অফিসে দেখা করবে। আমি তোমার স্যার প্লাস বাবা হয়। বাবার কথা রাখবে না মেঘ মা?
---- এতো আদুরে আবদার? সত্যি সত্যি শশুর যার হবেন ইনি, তার ভাগ্য অনেক ভালো হবে। উপায়ন্তর না পেয়ে আপাতত সামাল দিলো সে,
---- জ্বি আসবো।
---- আচ্ছা তাহলে রাখি?
---- জ্বি!
কল কাটতেই ছোঁ মেরে ফোনটা নিয়ে নিলো দোয়েলের মা ফাইজা বেগম। তেতে উঠলেন তিনি, বললেন,
---- তোদেরকে আমি পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলাম নাকি, বিয়ে সাদির জন্য পাঠিয়েছি? কোনটা বল? আমি কি তোর বাবাকে কথাটা জানাবো মেঘ? এমন একটা অকাজ কিভাবে করতে পারলি তুই? আমি তোকে তো আর এই বাড়িতে রাখতে পারি না।
---- আম্মু ভুল বুঝতেছো তুমি। ও তো.....
---- থাক ওর হয়ে তোমায় সাফাই গাইতে হবে না। মেঘ ছেলেটি কে? আর বিয়ে যেহেতু করেছিস তো এখানে কি করছিস তুই ? যা তার কাছে, আমার বাড়িতে তোর জায়গা নেই৷ দুদিন হলো না হলো, নাগর থেকে জামাই বানিয়ে বসে আছে। তবুও ভালো হয়েছে আমার ছ..
থেমে গেলেন ফাইজা বেগম। ভয় ভীত সব মিলিয়ে গিয়েছে মেঘ এর। না জেনে যা নয় তা বলে দিচ্ছেন চাচিমা । জানার আগ্রহ টুকু দেখাচ্ছে না। জ্ঞান বুদ্ধি এই বয়সে এসে লোভ পেয়েছে নাকি ওনার ? নাহ তো লোভ পাবে কেন? ওনি তো সুযোগ পেয়েছেন তাড়ানোর সুযোগ। হাত ছাড়া করা যায় নাকি? নয়তো সে তো এসেছেই আজ নিয়ে তিনদিন হলো। গতকাল আর আজ ভার্সিটি গিয়েছে। তার আগে শুধু এক্সাম দিতে গিয়েছিলো। সে ধীর গলায় বলল,
---- চাচিমা, আপু আমাকে দাঁড় করিয়ে ক্যান্টিনে গিয়েছিলো। তারপর কয়েকটা ছেলে আমায় র্যাগ দিচ্ছিলো অদ্ভুত কাজ করার কথা বলায়, নিজেকে
বাঁচাতে একটা মেয়ের কথায় বলেছিলাম আমি শ্রাবণ শিকদার এর বউ। তখন ভয়ে ছেলেগুলো কিছুই বলেনি উল্টো সম্মান দিয়ে চলে যায়।
সেটাই সবাই জেনে ওই ছেলেটাকে বলতেছে। তার বাবা আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার। ওনি সত্যি ভেবে আমায় যেতে বলেছেন। এখন বলো এখানে বিয়ে কিসের? আমি তো ছেলেটাকে দেখিই নি কে সে?
তবুও দমলো না ফাইজা বেগম। বলেন,
---- এসেছিসই তো সব নষ্ট করতে। আমার মেয়ের পড়াশোনা ও নষ্ট হবে আর তোর তো হবেই তার জন্য তুইই দায়ী৷ নাহ তোকে এখানে রাখা যাবে না।
আমি এমন আপদ রাখবো না যেখানে আমার ছেলে মেয়ের ক্ষতি হবে। আমি ফোন দিচ্ছি তোর বাবাকে।
করুন দৃষ্টিতে তাকালো মেঘ। কি একটা অবস্থা সৃষ্টি হলো এখন৷ তার সামান্য একটা কথায় এতো কিছু হবে জানলে হয়তো পায়ের জুতাটা খুলে প্রতিবাদ করতো তবুও ও এমন উদ্ভট কথাবার্তা বলার মতো ভুল করতো না মেঘ।
---- মা বইলো না তুমি প্লিজ ওর কোনো দোষ নেই সামান্য একটা কারনে এমন করার মানে কি? আজ যদি আমার সাথে এমন হতো তাহলে কি তুমি এমন করতা?
---- দোয়েল চুপ কর তুই। জাহিদ ভাই ফোন ধরছে না কেন? এতো বার কল করছি। কই থাকে কে জানে,
মেঘ নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। তার ইচ্ছে নেই অবুঝকে বুঝানোর। যা হওয়ার হবে অন্তত এখানে
তার বাবা সব জানলে তাকে কখনোই ভুল বুঝবে না।
ফোনে পেলো না ফাইজা বেগম। বিরক্ত হয়ে চলে
গেলেন তিনি। দোয়েল মেঘ এর কাছে এসে ভরসা দিয়ে বলল,
---- ভয় পাস না কিছুই হবে না। আর বাবা ভাইয়া থাকতে ভয় কিসের? ভাইয়ার কথার উপর মা কিছুই বলতে পারবে না।
আবার ও পড়াশোনায় মনোযোগ দিলো দু'জন মিলে।
________________
শ্রাবণ বাসায় আসলো। ফ্রেস হলো অতঃপর হালকা পাতলা নাস্তা করে তার কিছু ইন'কমপ্লিট কাজ কমপ্লিট করে ছাঁদে আসলো। বার বার মাথায় একটা নাম ঘুরছিলো, মেঘ। মেয়েটা আর কাউকে পেলো না তার নামটায় নিতে গেলো।
ছাঁদের রেলিঙের উপর ফোনটা রাখা। ফোন বাজতেই চলেছে অন্যদিকে ঘোর ভাবনায় ডুবে আছে শ্রাবণ। বিরক্ত হয় সে, রিসিভ করে স্পিকার অন করে রাখল,
---- শ্রাবণ! আমি যা শুনেছি তা কি ঠিক?
শ্রাবণ বুঝলো করোনা ভাইরাসের মতো কথাটা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এতোই ভাইরাস যে দূরে তার মা ও জেনে গিয়েছে। কিন্তু, এক্সপ্লেইন করল না। উল্টো বলল,
---- আপনার জানার প্রয়োজন আছে নাকি?
সুমনা রাহমান এর ধীর গলায় স্বর,
---- আমি তোমার মা শ্রাবণ। তোমায় জন্ম দিয়েছি আমি। ছোট থেকে বড় করেছি আমি আর আজ তোমার বিয়ের কথা আমার জানার অধিকার নেই? আমার ছেলের বউ দেখার অধিকার নেই?
হাসি পেলো শ্রাবণের। মা বাবা দু'জনের কথা এতো
সুন্দর যে তারা নিজেদের ভুল দেখেই না। দেখে না শ্রাবণের মনে মা বাবাহীন হাহাকার। আর আজ এসছেন দু'জনে অধিকারবোধ দেখাতে। শ্রাবণের সোজাসাপ্টা কথা,
---- দশ বছর আগে সেই অধিকার বোধ কোথায় ছিল আপনাদের দুজনের? দাদুভাই না থাকলে আমি শ্রাবণ শিকদারকে ছেলে বলে দাবি করতে পারতেন না। আর হ্যা আমার একাউন্টে কেন টাকা পাঠান? আমি বলেছি? আমার কারোর টাকার প্রয়োজন নেই আমার যা প্রয়োজন ছিলো তা পায়নি। আর পাওয়ার ইচ্ছে ও নেই।
নিরবতায় চেয়ে গেলো সুমনা রাহমান এর ওপাশ থেকে অতঃপর বলল,
---- আমি তো চায়নি দূরে আসতে তোমার বাবাই তো আমাকে দূরে আসতে বাধ্য করেছে।
---- সমস্যাটা আপনাদের নয়, সমস্যাটা ইগোর। থাকেন একে অপরের উপর দোষ দিয়ে। তবে ভুলে ও আমায় নিয়ে কেউ মাথাব্যথা দেখাবেন না। আমি একা, আমার কারোর প্রয়োজন নেই।
ফোন কেটে দিলো শ্রাবণ। ম্লান আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। বড্ড বিরক্ত লাগে তারা ফোন দিলে। ছেলে হয়েছে তো কি হয়েছে কষ্ট কি আর ছেলে মেয়ে দেখে হয়? কান্না পায় ভিষণ। কাউকে খুব করে বলতে ইচ্ছে হয় আমার কেউ নেই, আমাকে কেউ বুঝেনি একমাত্র দাদুভাই ছাড়া। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো,
---- দাদু তুমি কেন চলে গেলে আমায় ছেড়ে?
তোমার মতো কেউ ভালোবাসেনি আমায়। কেউ নেই আমার। আর তারা তো কেবল আপন নামের দূরের মানুষ।
দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো শ্রাবণের। পাঁচতলা বিল্ডিং
বিশাল জমিসহ শ্রাবণের নামে উইল করে গিয়েছেন তার দাদু। মা বাবার এমন মান অভিমান কখন যে ঠিক হবে তার উপর ভরসা করতে পারেননি তিনি ৷ সাথে শ্রাবণের রাগ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তিনি। মা অথবা বাবার কাছ থেকে এক টাকা ও নিবে না দরকার হলে নিজে যেকোনো কাজ করে টাকা উপার্জন করে নিজের খরচ চালাবে। এখন সেই বিল্ডিং এর ফ্ল্যাট গুলো ভাড়া দেওয়া থাকে একটা বাদে। সেখান থেকেই মাসে প্রায় মোটা অংকের টাকা আসে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করে না সে। সেখানে ওর গিল্টি ফিল হয় সেটা তো তার বাবার অধিকার সেখানে তাকে তার দাদু দিয়ে দিয়েছে।
______________
রাতুল, রামিম, ও রিফাদ প্রায় মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাসির তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এবার বলল,
---- কাজটা কি তোরা ঠিক করেছিস?
রাতুল মিনমিন করে বলল,
---- কিসের কাজ?
---- স্মৃতি শক্তি লোভ পেয়েছে তোর রাতুল?
তাসিরের তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথায় চুপ হয়ে গেলো আরো। কেউ কথা বলছে না। তাসির আবার ও বলতে লাগল,
---- নিষেধ করা কাজ করেছিস কেন? আচ্ছা করেছিস তো করেছিস তারপর মেয়েটির কথা আগে শ্রাবণকে না বলে পুরো ভার্সিটি জানলো কিভাবে? আর তোরা কোথায় ছিলিস? না ওই মেয়ে আর না তোরা কোথায় উধাও হয়েছিস?
তাদের মধ্যে থেকে রিফাদ বলল,
---- কি করে বলব কে বলেছে? আমাদের চারপাশে অনেকে ছিলো। একজন থেকে আরেকজন হতে হতে সবাই জেনে গিয়েছে।
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো তাসির। বলল,
---- তোদের কারনে আজ কত কিছুই ফেইস করতে হচ্ছে শ্রাবণকে। মেয়েগুলো ওর সাথে আমার পিছু ও লেগেছে। তার সাথে আংকেল আন্টি সবার কানে গিয়েছে। সবাই কথাটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছে। পরে আবার কি হয় কে জানে?
---- এতো কিছু হবে জানলে কিছুই বলতাম না।
রামিমের কথা শুনে বাকি দুজন ও সুর মেলায়।
তাসির বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
---- যা করার অলরেডি করেই ফেলেছেন। একদম ভাইরাস। এই রোগ নিরাময় সম্ভব নয়। আর চাই না সম্ভব হোক!
পিছু পিছু তারা তিনজন ও বেরিয়ে গেলো। কফি শপ থেকে। ভার্সিটিতে তারা আসেনি শ্রাবণের রাগের মুখে পড়তে চায়নি তারা। সব ঠান্ডা হোক তারপর যাওয়া হবে।
____________
---- দোয়েল কিছু বলবি?
দোয়েল তার ভাইয়ার রুমের বাইরে পায়চারি করছিল একপ্রকার। আসবে কি আসবে না দ্বিধায় ছিলো। তার সিদ্ধান্তের আগেই ভেতর থেকে ডাক এলো। ভেতরে আসলো তৎক্ষনাৎ দোয়েল। বলল,
---- ভাইয়া মা মেঘকে গ্রামে পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছে।
ভ্রু কুঁচকে ফেলে তৎক্ষনাৎ দিব্য। ল্যাপটপটা পাশে রেখে বলল,
---- কেন?
---- আসলে আজ ভার্সিটিতে সামান্য একটা বিষয় মা জানতে পেরে একটা উসিলা পেয়ে কাকাকে ফোন দিয়ে আসতে বলছে।
সন্দেহ জাগলো দিব্যের মনে, বলল,
---- কি হয়েছে আজ ভার্সিটিতে? কেউ কিছু বলেছে?
পুরো ঘটনা খুলে বলল দোয়েল৷ দিব্য শুনলো।
অতঃপর বলল,
---- ভয় পাওয়ার মতো কিছুই হয়নি। আমি মা কে বলবো আর হ্যা প্রিন্সিপাল স্যারকে জানিয়ে দিবো সত্যিটা।
খুশি হলো দোয়েল। বলল,
---- বাঁচালে তুমি ভাইয়া। মেঘ কান্না করছিলো। মা কেমন জানোই তো একটু হলে আর একটু বলবে কাকা যে রাগী ওর পড়াশোনা এখানেই বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দিবে।
উঠে দাঁড়ালো দিব্য। বলল,
---- কাঁদছে কেন ও? চল তো...
---- হ্যা চলো।
দোয়েলের রুমে আসলো দিব্য ও দোয়েল। মেঘ ঘুমিয়ে পড়েছে৷ চোখের পাপড়ি ভিজে একাকার এখনো গড়িয়ে পড়ছে চোখের পানি। দিব্য অস্থির হয়ে পাশে এসে বসলো। আলতো হাতে চোখের পানি মুছে দিলো। দোয়েলের দিকে তাকিয়ে বলল,
---- কাল থেকে আমি তোদের নিয়ে যাবো আসার সময় নিয়ে আসবো। আর কেউ কিছু বললে আমাকে ফোন দিবি। আর ওকে বারণ করবি কাঁদতে। কাকাই ওকে কোথাও নিতে পারবে না। আমি দিবো না ওকে কোথাও নিতে। এখানেই থাকবে ও।
---- আচ্ছা ভাইয়া।
খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলো দিব্য। মেঘ তার বাবাকে ভিষণ ভয় পায়। আর তার বাবা সম্মান হারনোর ভয় পায়। তিনি চাননি সে ঢাকা আসুক। কিন্তু মেঘ এর ইচ্ছে আর দিব্য, দোয়েল আর তার বাবার জন্য সে এতদূর আসতে পেরেছে।
_____________
---- তা তোমার জামাই কয়টা লাগে মেয়ে?
মেঘ রাগে ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলে তৎক্ষনাৎ।
চলবে,,,,